📄 মনের জরা : কুরআন ও মনোবিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ভয়ভীতির মাত্রা ও অনুভূতি আলাদাভাবে চিহ্নিত করার রীতি থাকলেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষণ্ণতা, ভয় ও হিংসা স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে নিরূপিত (Calculated) হয়নি। বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, বলা হলো-কাশি কোনো রোগ নয়; রোগের উপসর্গ মাত্র। বুকে কষ্ট, শ্লেষ্মা থাকলে কাশি আসা খুবই স্বাভাবিক। সর্দির রোগ থেকে শুরু করে ফুসফুসের ব্যাধি, ইত্যাকার বহুবিধ রোগের কারণেই এটি হতে পারে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান জ্বর কিংবা কাশির মতো হিংসাকেও আলাদা কোনো মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকার করেন না। তাদের দাবি, এটি অন্য রোগের উপসর্গ মাত্র; এমনকী তারা তো বলতে চায়-ভয়, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা এগুলোর প্রত্যেকটাই ক্রুদ্ধতার একেকটি প্রকার এবং ক্রুদ্ধতাজাত উপসর্গ।
অথচ আল্লাহর রাসূল মানসিক অসুস্থার প্রতিটি প্রকার আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছেন, পৃথকভাবে মনোনিবেশ করেছেন তাদের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য আলোচনায়। আর এসব চিকিৎসার মূলনীতি রাজোল দিয়েছেন প্রথমেই-সবকিছুর আগে রোগীকে আশ্বস্ত করো, শক্তি ও সাহস জোগাও তার দুর্বল মনে। তার কথা শোনো পূর্ণ মনোযোগের সাথে, যাতে মনের যাবতীয় বেদনা উগরে দিয়ে সে হালকা করতে পারে। পরম করুণাময় প্রভুর নিকট তার জন্য আরোগ্য প্রার্থনা করো। যেকোনো চিকিৎসার ক্ষেত্রেই এমন Positive Transference বা ইতিবাচক রূপান্তর একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
তখন খন্দকের যুদ্ধ চলছে। শত্রুরা মদিনাকে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ থেকে। সাঁকো বসিয়ে পরিখার ভেতরে ঢুকে পড়েছে শত্রুসেনাদের কয়েকজন। রসদ ঘাটতি, জনবল সংকট আর অব্যাহত আগ্রাসনে মদিনাবাসী তখন মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। আতঙ্কে সকলের কলিজা বেরিয়ে আসার জোগাড়! আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আরজ করা হলো-
'আমাদের সাহস বাড়ানোর জন্য কিছু বলুন।'
তিনি বললেন-'তোমরা বারবার পড়তে থাকো-
“হে আল্লাহ! ভীতির বিপরীতে আমাদের নিরাপত্তা দান করুন। আর আমাদের দোষসমূহ রাখুন লুক্কায়িত।" মসুনাদে আহমদ : ১১০০৯
দুআটির সুফল ছিল এমনই সুদূরপ্রসারী যে, তৎক্ষণাৎ লোকদের মনোবল বিস্ময়করভাবে বেড়ে গেল। পরি কি মরি করে পালিয়ে গেল শত্রুপক্ষের সবাই। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট সুসংবাদ এলো, অচিরেই মুসলমানদের অধীনস্থ হবে রোম ও পারস্য। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের অসম্পূর্ণ প্রেসক্রিপশন মেনে এ জাতীয় মানসিক সমস্যাগুলোর সম্ভব নয়। নবিজি নির্দেশিত মনস্তাত্ত্বিক পরিচর্যা পদ্ধতিই এক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান।
আজকাল চিকিৎসকরা রোগীকে ভীতি ও দুশ্চিন্তামুক্ত রাখার জন্য সাময়িক স্বস্তিকারক ঘুমের ওষুধ দিয়ে থাকেন। রোগী কিছুটা স্থিরতায় ফিরলে বিস্তারিত বর্ণনা জিজ্ঞাসা করে রোগের উৎস উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের ওপর রোগীর পূর্ণ আস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তার কোনো পরামর্শের ব্যাপারে রোগীর আপত্তি করা চলবে না; বরং প্রতিটি কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে। তাহলেই কেবল যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব, কিন্তু এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেও পূর্ণ আরোগ্য লাভ করতে কখনো কখনো দুই-তিন বছর অতিবাহিত।
এ প্রসঙ্গে আয়িশা (রা.) একটি চমৎকার ঘটনা বিবৃত করেছেন। সে সময়ের প্রথানুযায়ী গোত্রের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করলে প্রতিবেশী মহিলারা শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে আসত। তারা চলে গেলে সারাদিনের ধকল ও মানসিক বিধ্বস্ততা থেকে চাঙা হতে রান্না করা হতো 'তালবিনা'২ ও বিশেষ একধরনের স্যুপ। এরপর স্যুপে রুটি ভিজিয়ে তালবিনার সঙ্গে পরিবেশন করা হতো ঘরের লোকদের সামনে। আয়িশা (রা.) বলেন-'এই খাবারের ফর্মুলাটি আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ-এর কাছ থেকে।' বুখারিতে এসেছে- 'তালবিনা অসুস্থ মানুষের হৃৎপিণ্ডে শক্তি জোগায়, দূর করে মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতা।' বুখারি : ৫০১
খেয়াল করুন, মনের ভার লাঘবের উদ্দেশ্যে রীতিমতো একটি পথ্য বাতলে দিয়েছেন রাসূল। সেটা এমন এক বিশেষায়িত খাবার, শরীরে পুষ্টি জোগানোর পাশাপাশি যা মনকেও করবে চনমনে। হৃদয় ভারাক্রান্ত অবস্থায় একটি মনস্তাত্ত্বিক নীতি উপস্থাপন করেছে পবিত্র কুরআন- 'এমনভাবে তোমার রবের ইবাদত করো, যেন কাঙ্ক্ষিত বস্তু প্রাপ্তির ব্যাপারে সন্দেহাতীত বিশ্বাস অর্জিত হয়।' সূরা হিজর : ৯৯
টিকাঃ
২. যব, ছোলা ও চালের ছাতু দিয়ে বানানো একধরনের চমৎকার খাবার। তালবিনার উপকারিতা: • ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করে • কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় • ব্লাড গ্লুকোজ কমাতে সাহায্য করে • পেটের জ্বালাপোড়া কমিয়ে দেয় • সহজে হজম হয় এবং • ক্লান্তি, দেহের ঘাম কমায়।
📄 ভয় সম্পর্কিত বর্ণনায় কুরআনের স্বাতন্ত্র্য
যে মুসিবতের ভয়ে মানুষ তটস্থ ছিল, তা হাজির হওয়া অবধি ভয়ভীতি ও আশঙ্কা বিদ্যমান থাকে। এই অবস্থার পরিষ্কার বর্ণনা পেশ করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা কেবল বিশ্বাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং ব্যক্ত করেছেন নিরাপত্তার সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি- 'যারা বলে-আল্লাহ আমাদের রব এবং এ কথার ওপর অবিচল থাকে; তাদের না আছে কোনো ভয় আর না কোনো দুশ্চিন্তা। সূরা আহকাফ : ১৩
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলছেন- 'সেসব লোকদের আল্লাহ নিজেই সুরক্ষা দেবেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে (আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয় করেছে)। তাদের জন্য ক্ষতির আশঙ্কাও নেই, এমনকী উদ্বিগ্নও হতে হবে না।' সূরা জুমার: ৬১
অনুরূপ বলা হয়েছে- 'তোমরা মনোযোগ দিয়ে শুনে রাখো, তারা আল্লাহর বন্ধু। তাদের কোনো কিছুর ভয় আর অনিষ্টের উৎকণ্ঠা নেই।' সূরা ইউনুস: ৬২
এখানে আল্লাহ তায়ালা লোকদের সাথে বন্ধুত্বের ঘোষণা দিয়েছেন, যারা সৎকর্মশীল এবং ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী। আর খোদ রবের সঙ্গেই যাদের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা, তাদের আর শঙ্কা কি! তারা তো তখন পরম রবের জিম্মায়, বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তায়ালাই তাদের উদ্ধার করবেন দুঃসময়ের যাবতীয় দুর্যোগ থেকে; কিন্তু রবের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের উপায় কী? মহান আল্লাহ সেই পদ্ধতি নির্দেশ করছেন পবিত্র কুরআনে-
'নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, সালাত প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জাকাত দিয়েছে; তাদের প্রতিদান রয়েছে রবের নিকট। আর তাদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।' সূরা মায়েদা : ৬৯
অন্যত্র বলা হয়েছে- 'সেসব লোক যারা ঈমান এনেছে, ভালো কাজ করেছে, নামাজ আদায় করেছে, জাকাত প্রদান করেছে; তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সেরা পুরস্কার রয়েছে। তাদের জন্য না কোনো ভীতিপ্রদ বিষয় আছে আর না তাদের কখনো ভয় পেতে হবে।' সূরা বাকারা: ২৭৭
মহান আল্লাহ তায়ালা আরও ঘোষণা করেছেন- 'যারা আমার (দেওয়া) হিদায়াতের অনুসরণ করবে, কোনো ভয় তাদের স্পর্শ করবে না। তাদের কোনো দুর্ভাবনারও কারণ নেই।' সূরা বাকারা: ৩৮
আরবের সম্ভ্রান্ত বংশ কুরাইশদের প্রতি প্রদত্ত নিয়ামত ও মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন-
'অতএব, তারা যেন ইবাদত করে এই ঘরের পালনকর্তার, যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং যুদ্ধভীতি থেকে নিরাপদ করেছেন।' সূরা কুরাইশ : ৩-৪
ভয়ের দৃশ্যপট-১
পবিত্র কুরআনে চল্লিশবারেরও বেশি জায়গায় মানুষকে ভয়ভীতি থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বিবৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা উদাহরণ পেশ করে বলেন-
'মানুষ বিপদে ফেঁসে গেলে অথবা সংকট উত্তরণের জন্য আমার কাছে সাহায্য চায়। যেমন: মুসা (আ.), তাঁর শৈশব এরূপ একটি দৃষ্টান্ত। আমি মুসার মাতাকে জানিয়ে দিলাম-তুমি নিশ্চিন্তে তোমার নবজাতককে সিন্দুক ভরে সাগরে ভাসিয়ে দাও। এজন্য তোমাকে কোনোরূপ ভীত আর আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তোমার বাচ্চাকে কেবল তোমার কাছে ফিরিয়েই দেবো না; বরং তাঁকে আমার প্রেরিত পুরুষ হিসেবেও নির্বাচন করলাম।' সূরা কাসাস : ৭
এটি সেই ভয়াল সময়ের কথা, যখন ফেরাউন প্রতিটি নবজাতককে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করছিল। ফেরাউনের দৃষ্টান্ত ছিল এ কালের ভয়ংকর নরপশু বিন ইয়ামিন নেতানিয়াহু, বাশার আল আসাদ ও নরেন্দ্র মোদির অনুরূপ। একদিন জ্যোতিষীরা তাকে খবর দিলো-যে মানবশিশুটি বড়ো হয়ে তোমাকে হত্যা করবে, তার জন্মের সময় সমাগত। এরপর নিজেকে আশু বিপদের কবল থেকে বাঁচাতে সে একে একে হত্যা করে চলল প্রত্যেকটি নবজাতক ছেলেসন্তান। এমন গভীর সংকটের সময়ে অবধারিত মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে জন্ম নিলেন মুসা (আ.)। আল্লাহ মুসা (আ.)-এর মা'কে জানিয়ে দিলেন-'নবজাতককে সমুদ্রে ভাসিয়ে দাও।' এক অমোঘ নিয়তিতে খোদ ফেরাউনেরই স্ত্রী ভাসমান শিশুকে উদ্ধার করল সমুদ্র থেকে। এভাবে আল্লাহর ইশারায় মুসা (আ.) পালিত হলেন তাঁর ভবিষ্যৎ শত্রুর গৃহে, রাজকীয় আদর-যত্নে। আর সবশেষে ফেরাউনের পতনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাঁর কথা পূর্ণ করলেন, যেই নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি তিনি সংকটাপন্ন নবির মাতাকে দিয়েছিলেন।
ভয়ের দৃশ্যপট-২
মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরতের সময় শত্রুরা রাসূল -এর পিছু নেয়। সফরসঙ্গী আবু বকর (রা.) সহ তিনি আশ্রয় নিলেন সত্তর পর্বতের গুহায়। অনুসরণকারী শত্রুরা সেখানেও এসে হাজির! বিপদ আঁচ করতে পেরে আঁতকে উঠলেন রাসূলের বিশ্বস্ত সহচর আবু বকর (রা.)। ঘটনাটি পবিত্র কুরআনে বিবৃত হয়েছে এভাবে-
'যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো সাহায্য করেছিলেন-যখন কাফিররা তাঁকে বহিষ্কার করেছিল এবং তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয়জন। উভয়ে গুহার মধ্যে থাকাকালীন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন- "বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” অতঃপর আল্লাহ তাঁর ওপর প্রশান্তি নাজিল করেন। আর তাঁকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা-যা তোমরা দেখনি। এ ছাড়াও তিনি কাফিরদের কথাকে হেয় করেন। আর আল্লাহর কথাই সমুন্নত-তিনিই পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।' সূরা তাওবা: ৪০
চিন্তা করুন সেই গা ছমছমে পরিস্থিতির কথা। শত্রুরা পিছু ধাওয়া করতে করতে প্রায় ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে। যে গর্তে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন, সেখান থেকে বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। এমন অনিশ্চিত আর বিপজ্জনক অবস্থায় ভড়কে যাওয়া মোটেই বিচিত্র ব্যাপার নয়। কিন্তু রাসূল -এর ভরসা ছিল এমন এক শক্তির প্রতি, যিনি তাঁর অনুগত বান্দাদের সকল প্রকার ভয়ভীতি থেকে মুক্তিদানের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মুমিন ব্যক্তি যেকোনো মুসিবতে সর্বাগ্রে সাহায্য চায় তার প্রতিপালকের নিকট। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মেলে ইয়াকুব (আ.)-এর প্রার্থনায়। পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে হারিয়ে বিপদগ্রস্ত নবি বাকি ছেলেদের উদ্দেশে বলেছিলেন-
'তিনি বলেন, আমি তো আমার মুসিবত ও কষ্টের কথা কেবল আমার আল্লাহর কাছে পেশ করে থাকি।' সূরা ইউসুফ: ৮৬
বিপদ কেটে গেলেও মুমিনের উচিত সেই সত্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা; যিনি গোটা সৃষ্টিকুলের একান্ত সহায়, তামাম জাহানের ওপর সর্বোত্তম দায়িত্বশীল। আল্লাহ তায়ালা মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করছেন এভাবে-
'তারা বলে, সেই আল্লাহর জন্য অযুত প্রশংসা, যিনি আমার দুশ্চিন্তা বিদূরিত করেছেন। আর আমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও কৃতজ্ঞ।' সূরা ফাতির : ৩৪
কুরআন মাজিদের এ আয়াতগুলো থেকে প্রতিভাত হয়-বিপদ যেখানে যেভাবেই হাজিব হোক না কেন, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে উদ্ধারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একাধিক ঘটনার দৃষ্টান্ত পেশ করে আল্লাহ তায়ালা দেখাচ্ছেন, যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনকারীদের ডাকে তিনি কীভাবে সাড়া দিয়েছেন। সেই একই সূত্র ধরে তিনি মুমিন বান্দাদের জন্য ব্যক্ত করছেন ভবিষ্যৎ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি। আর এটা তার জন্য আদৌ কোনো কঠিন বিষয় নয়। সুতরাং নিজেকে সকল বন্ধন ও দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে নয়; বরং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনাই এনে দিতে পারে উৎকণ্ঠা থেকে পূর্ণাঙ্গ মুক্তি। আর রবের পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ সন্দেহাতীত এবং শতভাগ নিশ্চয়তাপূর্ণ। কুরআন মাজিদ এই বাস্তবতা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। কেননা, দয়াময় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থীদের শাহরগের চাইতেও অধিক নিকটবর্তী।
📄 ভয়ের প্রকৃতি : উত্তরণের নীতি-কৌশল
যে বিপদ থেকে পালানোর কোনো পথ থাকে না, তা স্বমূর্তিতে সামনে হাজির হলেই কেবল জীবনের কঠোরতম রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। আর আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট এসব মানসিক বিপর্যয় বদলাতে থাকে সময় ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সঙ্গে।
শিশুরা সাধারণত নতুন পরিবেশে সন্ত্রস্ত হয়, কিন্তু প্রত্যেক শিশুর ভীতির উৎস ও প্রকৃতি এক না-ও হতে পারে। একবার এক লোক বাচ্চাদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবেই টেলিভিশনে ভীতিপ্রদ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করছিল। তখন চার বছরের ছেলেটি তার বছর দুয়েকের বড়ো বোনকে বলল-'তুমি এই ফিল্ম দেখ না, দেখলে কিন্তু রাতে ভূত এসে ভয় দেখাবে।' তবে বড়ো বোনটির মধ্যে ভয়ের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। এর কারণ কী?
মূলত শিশুর বয়স আট বছরে পৌঁছার পর থেকে তার ভয়ের ধরনগুলো ক্রমেই পরিবর্তিত হতে থাকে। কিছু শিশু দীর্ঘ সময় ধরে বন্দি থাকে কল্পিত ভয়ের জগতে। কিন্তু কালক্রমে অবয়বধারী বস্তুর সাথে সাথে অন্ধকার, একাকিত্ব; উঁচুতে আরোহণ, দুর্গম পথে যাত্রা কিংবা বেপরোয়া ও দুরন্ত বাহনে চলাচল ইত্যাদি বিষয়গুলোও ভয়ের ধারণায় যোগ করে নতুন মাত্রা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক ব্যক্তি টানা দুই বছর চিকিৎসা গ্রহণ করে শুধু ঊর্ধ্বারোহণের ভয় কাটাতে। সুস্থ হওয়ার পর তাকে ঊর্ধ্বারোহণের পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক।
একদিন যথারীতি শহরের সুউচ্চ প্রাসাদের চূড়ায় উঠে পড়ল সে। আর নিচে তাকিয়ে আওড়াতে শুরু করল পড়ানো পাঠের বুলি-'আমি ওপরে বা নিচে যেদিকেই তাকাই, কিছুই পরোয়া করি না।' তৃতীয়বার এই মন্ত্র জপতে জপতে সে মাথা ঘুরে পড়ে যায় এবং বেঘোরে প্রাণ হারায়। এই হলো আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত আধুনিক মনোবিজ্ঞানের চিকিৎসাপদ্ধতি ও তার প্রতিফল।
অনেক সমঝদার ও শিক্ষিত লোককে আপনি বলতে শুনবেন-একাকী থাকলে ভয় লাগে, লোকজনের মাঝে থাকলে তেমনটা হয় না। এমন রোগীও দেখা গেছে, সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ হয়েও যাদের দুই-চার কিলোমিটার সফরের হিম্মত নেই। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়-'আপনি তো বুদ্ধিমান একজন মানুষ, তারপরও গাড়ি-ঘোড়ায় মুখরিত ব্যস্ত সড়কে একাকী সফর করতে ভয় পান কেন?' তিনি হয়তো ঠিক বোঝাতে পারেন না, কিন্তু সত্যিই যে ভড়কে গেছেন-সেই লক্ষণ স্পষ্টতই ফুটে ওঠে। একাকী সফরের আতঙ্কে তার হৃৎকম্পন বেড়ে যায়, দরদর করে ঘামতে থাকেন অনবরত। অথচ সঙ্গে একটি দশ বছরের বাচ্চা থাকলেও এ ধরনের লোকেরা নির্ভার ও নিশ্চিন্ত বোধ করেন।
কবরের অন্ধকার, এর প্রকাণ্ড সাপ-বিচ্ছু প্রভৃতি নিঃসন্দেহে ভীত হওয়ার উপযুক্ত কারণ। কিন্তু এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মৃত্যু অবধারিত নিয়তি এবং ওখানে কারও কোনো চেষ্টাই কাজ দেবে না। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হলো-অধিকাংশ মানুষ নিজের ভীতির কথা স্বীকার না করে আতঙ্কের কারণ ও যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী। অধিকাংশ রোগী আরোগ্যের ব্যাপারে হতাশ ও মরিয়া হয়ে গেলে কেবল চিকিৎসকই নয়; বরং হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীদের কাছে হাতজোড় করে আকুতি জানায়। ব্যাকুল কণ্ঠে বলতে থাকে- 'যেভাবেই হোক আমাকে বাঁচান! ঘরে আমার ছোটো ছোটো সন্তান। তাদের কী উপায় হবে? আমি শুধু তাদের জন্যই বাঁচতে চাই।' এমন পরিস্থিতিতে কোনো চিকিৎসাই আর কাজে আসে না, মনোবিজ্ঞানের সমুদয় তত্ত্ব এখানে চূড়ান্ত ব্যর্থ। মানসিক বিপর্যয়ের এই স্তরটি অতিক্রম করতে হলে অন্তরে থাকা চাই রবের প্রতি অগাধ আস্থা ও পরিপূর্ণ বিশ্বাস। কেননা, মুমিনমাত্রই বিশ্বাস করে, সুস্থতা কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এখানে আসল কৃতিত্ব কোনো চিকিৎসকের নয়; বরং করুণাময় রবের অশেষ মেহেরবানিই পারে মানুষকে যাবতীয় জরা ও ব্যাধির কবল হতে পূর্ণাঙ্গ শেফা নিশ্চিত করতে।
📄 মানসিক চাপ দূর করার টোটকা
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন- 'আল্লাহ এমন কোনো রোগ পৃথিবীতে সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা পাঠানো হয়নি। ওষুধের গুণাগুণ যখন রোগের প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যায়, তখন আল্লাহর নির্দেশে তা কার্যকর হয় এবং রোগী সেরে ওঠে।' মুসলিম
ইসলামের এটি সর্বজনস্বীকৃত বিষয়, শেফা বা আরোগ্য বান্দার প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। কাজেই মানুষের সামনে সুস্থতা ভিক্ষা করে কোনো লাভ নেই; বরং চাইতে হবে সেই সত্তার কাছে, সমগ্র সৃষ্টিকুলের জীবন ও মৃত্যু যাঁর হাতের মুঠোয়। এজন্য আল্লাহর রাসূল পীড়িত অবস্থায় বেশি বেশি দুআ ও ইস্তেগফারের নির্দেশ দিয়েছেন। আনাস (রা.) বলেন, আমি রাসূল-কে বলতে শুনেছি-
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ اشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
'হে মানবকুলের রব! আমার কষ্ট দূর করে দিন। আপনিই তো আরোগ্য দানকারী। আপনার শেফা ব্যতীত কোনো সুস্থতা নেই। আমাকে এমন শেফা দান করুন, যার পর আর কোনো ব্যাধিই বাকি না থাকে।' বুখারি: ৫৪১১
এভাবে জরাগ্রস্ত দশাতেও মুমিন সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে চলে। এটা ঈমানদার ব্যক্তির চারিত্রিক সৌন্দর্য। রাসূল এমন বিশুদ্ধ আখলাককে ইসলামের প্রতীক হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। জনসমাজে সচ্চরিত্রের সর্বজনীন সুফলও বিস্তর। এর ফলে এমন এক সমাজব্যবস্থা তৈরি হবে, যেখানে একজন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্য অকাতরে এগিয়ে আসবে পাশে থাকা মুমিনগণ। আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, তাঁকে ও মুয়াজ (রা.)-কে ইয়েমেন প্রেরনকালে রাসূল নির্দেশ করেন-
'মানুষকে ইসলামের পথে ডাকবে। তাদের উদ্বিগ্ন নয়; আশ্বস্ত করবে। জটিলতার বদলে পেশ করবে সহজ উপায়। উদ্যোগী হবে ঐক্য নির্মাণে। আর বিভাজনের পথে কখনোই হাঁটবে না।' আবু দাউদ, নাসায়ি
উপরিউক্ত নির্দেশনা স্থান-কাল নির্বিশেষে যেকোনো মানুষের মানসিক চাপ দূর করতে টনিকের কাজ করবে। জীবনকে করবে অধিকতর উদ্যমী ও কর্মচঞ্চল। এ ধরনের অর্থবহ জীবনযাপনের প্রতি যারপরনাই গুরুত্বারোপ করেছেন রাসূল । আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, একবার আল্লাহর রাসূল দিনের বেলা মসজিদে এসে আনসারি সাহাবি আবু উমামাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- 'এই সময়ে তুমি মসজিদে কেন?'
তিনি জবাব দিলেন- 'ঋণ ও নানাবিধ পেরেশানি এখানে আমায় তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।'
আল্লাহর রাসূল বললেন- 'তাহলে তো তোমাকে এই কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তির পথ বাতলে দিতে হয়। আল্লাহ তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেবেন। তুমি সকাল-সন্ধ্যা এই দুআটি পড়বে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْهَةِ وَالْحَزَنِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدِّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
“হে আল্লাহ! তোমার কাছে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ থেকে সুরক্ষা চাই। মুক্তি চাই দুর্বলতা ও অলসতা থেকে। কাপুরুষতা, কৃপণতা, ঋণের ভার এবং মানুষের অভিশাপ থেকে তোমার আশ্রয় চাই।" আবু দাউদ: ১৫৫৫
সাহাবি বলেন- 'নবিজির নির্দেশনা মোতাবেক দুআটি সকাল-বিকাল পাঠের কল্যাণে আমি ক্রমেই দুশ্চিন্তা ও ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম।' বুখারি
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, অপর একটি হাদিসে মারাত্মক বিষণ্ণ ও উদ্বিগ্ন ব্যক্তিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সে যেন বেশি বেশি পড়ে-
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
আল্লাহ ব্যতীত অনিষ্ট দূর করার এবং কল্যাণ লাভের কোনো শক্তি নেই। হাদিসটি বর্ণনা করে ইমাম বুখারি ও মুসলিম যোগ করেন, এটি জান্নাতের কোষাগার ও ভান্ডারের অংশ। ইমাম তিরমিজি একে বলেছেন জান্নাতের দরজা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন-
'আল্লাহর রাসূল কখনো উদ্বিগ্ন ও ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আসমানের দিকে মুখ তুলে سُبْحَانَ الله الْعَظِيمِ তিনবার পড়তেন। মাঝে মাঝে পৌনঃপুণিক আবৃত্তি করতেন يَا حَيُّ يَا قَيُّوْمُ।' তিরমিজি
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন- 'আমার ভাই ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তির জন্য যে দুআ পড়েছিলেন, তা সকল মুসলমানের উদ্বেগ ও ভয়ভীতি থেকে মুক্তির চিরন্তন ও সর্বোত্তম পন্থা।' দুআটি ছিল-
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ -
'আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য এর চাইতে ভালো আর কোনো সমাধানসূত্র নেই।' তিরমিজি: ৩৫0৫
এ প্রসঙ্গে আসমা বিনতে আমিস (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল তাঁকে বলেছেন- 'দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবে এমন একটি দুআ শিখিয়ে দিচ্ছি। এই বাক্যগুলো সকাল-সন্ধ্যা সাতবার পাঠ করবে।'
اللَّهُ رَبِّي لَا يُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا -
আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন- 'রাসূলুল্লাহ প্রায়শই মানসিক চাপ, বিপদ ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে নামাজ পড়তে পরামর্শ দিতেন। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন- "তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো।" মুসনাদে আহমদ
ভয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর রাসূল যে পথ দেখিয়েছেন, তা শত বছরের পরীক্ষিত ও প্রমাণিত বিষয়। আল্লাহর রাসূল সকাল ও সন্ধ্যায় পাঠ করার জন্য যেসব দুআ শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলোর ফলাফল বিস্ময়কর রকমের ইতিবাচক। আমরা এ সম্পর্কে জরিপ চালিয়ে দেখেছি, প্রচুরসংখ্যক মানুষ এর সুফল হাতেনাতে পেয়েছেন এবং এখনও পাচ্ছেন। এক ব্যক্তি নিজের এমনই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন- 'একবার আমি গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে গলির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি কুকুর দূর থেকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তেড়ে এলো আমার দিকে। একবার ভাবলাম, দৌড়ে সটকে পড়াই শ্রেয়। পরক্ষণেই ভয় হলো, যদি প্রাণীটি আমার পিছু নেয়! আত্মরক্ষার জন্য কোনো পাথর কিংবা লাঠিও ছিল না হাতের কাছে, তখন বিপদ থেকে রক্ষার একটি দুআ আমি যেই না পাঠ করলাম, কুকুরটি তৎক্ষণাৎ চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে চলে গেল অন্যদিকে।'
মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর (রহ.) তাঁর তিব্বে নববি কিতাবে ভয়ভীতি, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা সম্পর্কে নানা বিশ্লেষণের পর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন এর নানাবিধ সমাধান-যার সবকটি রাসূল -এর হাদিসের আলোকে নির্দেশিত। এ নির্দেশনাগুলো আমল করলে কারও ভয়ভীতি ও বিপদ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই।
আল্লাহর রাসূল ভয়ভীতিকে পবিত্র কুরআনের আলোকে বিন্যস্ত করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি ঘোষণা করেছেন-যদি অন্তরে দৃঢ় ও অবিচল বিশ্বাস থাকে, তবে কোনোরূপ দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক কাউকে স্পর্শও করতে পারে না। সুতরাং বিপদের সংশয় ও প্রবল আশঙ্কা দূর করার উপায় মুমিনের জন্য এতই সহজ যে, এজন্য তার কোনো গবেষকের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পৃথিবীতে ইসলাম ছাড়াও বহু ধর্মমত ও মতার্দশ নিজেদের ব্যাপারে সত্যের দাবিদার। কিন্তু ইসলাম ভিন্ন কোনো ধর্মে মানুষের মনোজগৎ ও মানসিক সমস্যার এত সুবিন্যস্ত সমাধান বিবৃত হয়নি। বিপদ কাটানোর জন্য বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মে একধরনের বিশেষ ত্রিরত্ন বন্দনা ও ভজনের রীতি আছে, যেখানে কিছু মন্ত্র পাঠ করে খাঁটি ঘি ঢালতে হয় জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে। অথচ এ ধরনের সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি কোনো ব্যক্তির হাতে নেই। ১৯৪২ সালে এমনই একটি আয়োজনে খরচ হয়েছিল ৪ লক্ষ ভারতীয় রুপি। অথচ ইসলাম সর্বসাধারণের জন্য এই সমস্যার সমাধান বাতলে দিয়েছে কোনো রকম ব্যয় বা সামষ্টিক আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই। ফলে প্রত্যেক মুসলিমই লাভ করেছে নির্ভার ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবন উপভোগের অবারিত সুযোগ।