📄 দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির উপায়
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করার পাশাপাশি মুক্তির পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন নামাজে তাশাহুদ পড়ে তখন সে যেন চারটি বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে প্রার্থনা করে—
اللهم انى اعوذ بك من عذاب جهنم ومن عذاب القبر ومن فتنة المحيا والممات ومن شر فتنة المسيح الدجال
'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। জীবন-মরণের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই।'
নামাজ সর্বোত্তম ইবাদত। নামাজের মধ্যে বান্দা আল্লাহর অধিকতর নিকটবর্তী হয়। তখন কায়মনোবাক্যে তার নিকট দাজ্জালের ফিতনা ও অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। সহিহ বুখারিতে হজরত আয়েশা রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাজের ভেতর দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাইতে শুনেছি।'
দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য বিশেষভাবে সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা। হজরত আবুদ্দারদা রাদি. থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্ত থাকবে।'
অপর হাদিসে বলা হয়েছে সুরা কাহাফের শেষের দশ আয়াতের কথা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের শেষের দশ আয়াত পড়বে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।' অপর হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের প্রথম তিন আয়াত পড়বে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।'
সহিহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দাজ্জালকে পাবে সে যেন সুরা কাহাফের শুরু থেকে পড়ে। দাজ্জাল শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী খাল্লা নামক স্থান থেকে আবির্ভূত হবে।'
হজরত আয়েশা রাদি. থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি ঘুমানোর পূর্বে সুরা কাহাফের দশ আয়াত পড়বে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।' এছাড়াও আরো বহু হাদিসে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তি ও নিরাপদ থাকতে সুরা কাহাফ পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত সুরা কাহাফ পড়ার প্রতি যত্নবান হওয়া।
টিকাঃ
৫৩. সহিহ মুসলিম: ৫৮৮।
৫৪. সহিহ বুখারি: ৮৩৩।
৫৫. সুনানে আবু দাউদ: ৪৩২৩।
৫৬. কানযুল উম্মাল: ২৫৯৯।
৫৭. সুনানে তিরমিজি: ৩০৪৭।
৫৮. সহিহ মুসলিম: ২৯৩৭।
৫৯. কানযুল উম্মাল: ২৬০৯।
📄 কোথায় আছে দাজ্জাল?
হে আল্লাহর বান্দারা! আমরা এক মহা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি, আর তা হল, দাজ্জাল কি সত্যিই আছে? যদি থাকে তাহলে এখন কোথায় আছে? আর তার সমাপ্তিই-বা হবে কবে ও কীভাবে?
হজরত ফাতেমা বিনতে কায়স রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমি মসজিদে গমন করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে নামাজ আদায় করলাম। আমি ছিলাম মহিলাদের কাতারে। তিনি নামাজ শেষে হাসতে হাসতে মিম্বারে উঠে বসলেন। প্রথমেই তিনি বললেন, প্রত্যেকেই যেন আপন আপন জায়গায় বসে থাকে। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জানো আমি কেন তোমাদেরকে একত্রিত করেছি? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তার রাসুলই অধিক ভালো জানেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে এ সংবাদ দেওয়ার জন্য একত্রিত করেছি যে, তামিম দারি ছিল একজন খ্রিষ্টান লোক। সে আমার কাছে আগমন করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। অতঃপর সে মিথ্যুক দাজ্জাল সম্পর্কে এমন ঘটনা বলেছে যা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতাম। লাখম ও জুযাম গোত্রের ত্রিশ জন লোকের সাথে সে সাগরপথে ভ্রমণে গিয়েছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার শিকার হয়ে এক মাস পর্যন্ত তারা সাগরেই ছিল। অবশেষে তারা সাগরের মাঝখানে একটি দ্বীপে অবতরণ করল। দ্বীপের ভেতরে প্রবেশ করে তারা মোটা মোটা এবং প্রচুর চুলবিশিষ্ট একটি অদ্ভুত প্রাণীর সন্ধান পেল। চুল দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত থাকার কারণে প্রাণীটির অগ্রপশ্চাৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম হলো না। তারা বলল, অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বলল, আমি সংবাদ গ্রহণকারী গোয়েন্দা। তারা বলল, কীসের সংবাদ সংগ্রহকারী? তারপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে একটি ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভেতর অবস্থানরত লোকটির নিকট যাও। সে তোমাদের কাছে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
তামিম দারি বলেন, প্রাণীটি যখন একজন লোকের কথা বলল, তখন আমাদের ভয় হলো, হতে পারে সে একটি শয়তান। তথাপিও আমরা ভীত হয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়ে ঘরটির ভেতর প্রবেশ করলাম। সেখানে প্রবেশ করে আমরা বৃহদাকার একটি মানুষ দেখতে পেলাম। এত বড়ো আকৃতির মানুষ আমরা ইতঃপূর্বে আর দেখিনি। তার হাত দুটিকে ঘাড়ের সাথে একত্রিত করে হাঁটু এবং গোড়ালির মধ্যবর্তী স্থানে লোহার শিকল দ্বারা বেঁধে রাখা হয়েছে। আমরা বললাম, মরণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বলল, তোমরা আমার নিকট আসতে সক্ষম হয়েছো। তাই আগে তোমাদের পরিচয় দাও। আমরা বললাম, আমরা একদল আরব মানুষ। আমরা নৌকায় আরোহণ করলাম। সাগরের প্রচণ্ড ঢেউ আমাদেরকে নিয়ে এক মাস পর্যন্ত খেলা করেছে। অবশেষে তোমার দ্বীপে উঠতে বাধ্য হলাম। দ্বীপে প্রবেশ করেই আমরা প্রচুর লোমবিশিষ্ট এমন একটি জন্তুর সাক্ষাৎ পেলাম, প্রচুর পশমের কারণে যার অগ্রপ্রশ্চাৎ চেনা যাচ্ছিল না। আমরা বললাম, অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বলল, আমি সংবাদ সংগ্রহকারী। আমরা বললাম, কীসের সংবাদ সংগ্রহকারী? তারপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে এই ঘরটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভেতর অবস্থানরত লোকটির নিকট যাও। সে তোমাদের নিকট থেকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তাই আমরা তার ভয়ে দ্রুত তোমার কাছে আসলাম। হতে পারে তুমি একজন শয়তান। এ ভয় থেকেও আমরা নিরাপদ নই।
সে বলল, আমাকে তোমরা বাইসান সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললাম, বাইসানের কী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? সে বলল, আমি তথাকার খেজুর বাগান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি। সেখানের গাছগুলো কি এখনো ফল দেয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। সে বলল, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন গাছগুলোতে কোনো ফল ধরবে না। তারপর সে বলল, আমাকে বুহাইরাতুত তাবারিয়া সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললাম, বুহাইরাতুত তাবারিয়ার কী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? সে বলল, আমি জানতে চাই, সেখানে কি এখনো পানি আছে? আমরা বললাম, সেখানে প্রচুর পানি আছে। সে বলল, অচিরেই সেখানকার পানি শেষ হয়ে যাবে। সে পুনরায় বলল, আমাকে জুগার নামক ঝরনা সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললাম, সেখানকার কী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? সে বলল, আমি জানতে চাই, সেখানে কি এখনো পানি আছে? লোকেরা কি তা দিয়ে চাষাবাদ করে? আমরা বললাম, সেখানে প্রচুর পানি আছে। লোকেরা সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে। সে আবার বলল, আমাকে উম্মীদের নবী সম্পর্কে জানাও। আমরা বললাম, সে মক্কায় আগমন করে বর্তমানে মদিনায় হিজরত করেছে। সে বলল, আরবরা কি তার সাথে যুদ্ধ করেছে? বললাম, হ্যাঁ। সে বলল, ফলাফল কী হয়েছে? আমরা তাকে অবহিত করলাম যে, পার্শ্ববর্তী আরবদের ওপর তিনি জয়লাভ করেছেন। ফলে তারা তার আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। সে বলল, তাই নাকি? আমরা বললাম, হ্যাঁ, তাই। সে বলল, তার আনুগত্য করাই তাদের জন্য ভালো।
এখন আমার কথা শোনো। আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভেতর পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করব। তবে মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদিনায় প্রবেশ করতে চাইব তখনই ফেরেশতাগণ কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদিনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দেবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বরে আঘাত করতে করতে বললেন, এটাই মদিনা! এটাই মদিনা! দাজ্জাল এখানে আসতে পারবে না। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে লক্ষ্য করে বললেন, তামিম দারির হাদিসটি আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। তার বর্ণনা আমার বর্ণনার অনুরূপ হয়েছে। বিশেষ করে মক্কা ও মদিনা সম্পর্কে। শুনে রাখ, সে আছে শাম দেশের সাগরে [ভূমধ্যসাগরে] অথবা আরব সাগরে। তা নয় সে আছে পূর্বদিকে। এই বলে তিনি পূর্বের দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন। ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে এই হাদিসটি মুখস্থ করে রেখেছি।
হজরত ফাতেমা বিনতে কায়স রাদি. থেকে বর্ণিত এ হাদিসটি সহিহ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে হাদিসটির সত্যতা প্রমাণিত। সুতরাং এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, দাজ্জাল আছে। তার আগমন অবশ্যম্ভাবী। শেষ জমানায় তার আবির্ভাব ঘটবে। আসবাহান নামক স্থানের সত্তর হাজার ইহুদি দাজ্জালের অনুসারী হবে। হজরত আনাস বিন মালেক রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আসবাহানের সত্তর হাজার ইহুদি দাজ্জালের অনুসারী হবে। তাদের শরীরে থাকবে কালো চাদর।' হজরত উম্মু শারিক রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, লোকেরা দাজ্জালের আতঙ্কে পর্বতে পালিয়ে যাবে। এ কথা শুনে উম্মু শারিক বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেদিন আরবের মানুষেরা কোথায় থাকবে? জবাবে তিনি বললেন, তখন তারা সংখ্যায় নগণ্য হবে।'
টিকাঃ
৬০. বাইসান শহরটি বর্তমানে ইসরাইলের অধীনস্থ। ১৯৪৮ সালের পূর্বে এটি ছিল জর্ডানের দখলে।
৬১. বুহাইরাতুত তাবারিয়া বর্তমানে ইসরাইলে অবস্থিত। এটি একটি মিঠা পানির ঝিল। এর পানির মূল উৎস হচ্ছে জর্ডান সাগর।
৬২. জুগার ঝরনা বর্তমানে ডেথ সি তথা মৃত সাগরের পূর্বদিকে অবস্থিত। উল্লেখ্য যে, জুগার ছিলেন হজরত লুত আলাইহিস সালামের কনিষ্ঠ কন্যা। আল্লাহ যখন তার সম্প্রদায়ের ওপর আসমান থেকে আজাব প্রেরণ করেন তখন লুত আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তিনি জনপদ থেকে বেরিয়ে পড়েন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তার দুই কন্যা রাব্বা ও জুগারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। রাব্বা যখন ইন্তেকাল করেন তখন তাকে একটি ঝরনার পাশে কবর দেওয়া হয়। ফলে উক্ত ঝরনার নাম হয় 'আয়নে রাব্বা' তথা রাব্বা ঝরনা। তারপর ছোটো কন্যা জুগারের ইন্তেকালের পর তাকে অপর একটি ঝরনার পাশে কবর দেওয়া হয়। যথারীতি এর নাম হয়ে যায় আয়নে জুগার তথা জুগার ঝরনা। [মুজামুল বুলদান]
৬৩. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান।
৬৪. আসবাহান বর্তমানে ইরানের একটি প্রদেশ। উল্লেখ্য যে, অন্যান্য হাদিসে বলা হয়েছে, দাজ্জাল আগমন করবে খোরাসান থেকে। এখানে বলা হচ্ছে আসবাহান থেকে। উভয় ধরনের হাদিসের মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা, আসবাহান ইরানে অবস্থিত আর ইরানও পূর্বে খোরাসানের অন্তর্গত ছিল।
৬৫. সহিহ মুসলিম, ফিতান: ৭১২৫।
৬৬. সহিহ মুসলিম: ৭১২৬।
📄 দাজ্জাল ও তার অনুসারীদের পতন
হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী অচিরেই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। রাসুলের কথা কখনো মিথ্যা হতে পারে না। দাজ্জাল যখন পৃথিবীতে ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, অত্যাচার ও জুলুম নিপীড়নে অতিষ্ঠ করে তুলবে মানবজাতিকে, আল্লাহ তায়ালা তখন হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে আসমান থেকে অবতরণের নির্দেশ দেবেন। হজরত ইসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করে খ্রিষ্টানদের তৈরি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন। শূকর হত্যা করবেন। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়ত অনুযায়ী ফয়সালা করবেন।
উলামায়ে কিরাম বলেন, ইহুদিরা এ দাবি করে যে, তারা হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করে এ কথা সুস্পষ্ট করে দেবেন যে তাদের দাবি মিথ্যা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি। বরং তারা ধাঁধায় পড়েছিল।' হজরত ইসা আলাইহিস সালামের অবতরণ এ কথার প্রমাণস্বরূপ যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জাল ও তার অনুসারীদের মূলোৎপাটন করবেন।
হজরত ইসা আলাইহিস সালাম হলেন মাসিহুল হুদা আর দাজ্জাল হলো মাসিহুদ দাজ্জাল। দাজ্জাল যখন হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে দেখবে তখন লবণ যেমন পানিতে গলে যায় তেমনি দাজ্জালও গলে যাবে। হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল এমন সময় বের হবে যখন মানুষ ধর্মকে কিছুই মনে করবে না। সে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে চল্লিশ রাত। তার একটি দিন হবে এক বছরে সমান, আরেক দিন হবে এক মাসের সমান এবং আরেক দিন হবে এক সপ্তাহের সমান। সে লোকদেরকে বলবে, আমি তোমাদের প্রভু। সে হবে কানা। তোমাদের প্রভু কানা নন। অক্ষর ও নিরক্ষর প্রতিটি মুমিন তার কপালে লেখা 'কাফের' শব্দটি পড়তে পারবে। অতঃপর ভোর বেলায় ইসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন। তিনি এই বলে তাদেরকে আহ্বান করবেন, 'হে লোক সকল! কিসে তোমাদেরকে বাধ্য করলো মিথ্যাবাদী খবিশের দিকে বের হতে?' তারা বলবে, 'এই লোকটি তো জিন।' তারা ইসা আলাইহিস সালামের সাথে থাকা অবস্থায়ই নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হবে। তিনি বলবেন, 'তোমাদের ইমামকে এগিয়ে দাও যেন তিনি তোমাদেরকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন।' অতঃপর ফজরের নামাজ শেষে তারা দাজ্জালের দিকে রওনা হবেন। দাজ্জাল তাকে দেখামাত্র বিগলিত হয়ে যাবে যেমন লবণ পানিতে বিগলিত হয়ে যায়। অতঃপর তিনি তার দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে হত্যা করবেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আজাদকৃত গোলাম সাফিনাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, দাজ্জালের সাথে দুটি উপত্যকা থাকবে। একটি জান্নাত এবং অপরটি জাহান্নাম। তার জাহান্নাম হবে জান্নাত আর জান্নাত হবে জাহান্নাম। অতঃপর সে ভ্রমণ করবে এমনকি সিরিয়ায় এসে উপস্থিত হবে। মহান আল্লাহ তাকে আকাবায়ে আফিকের নিকটে ধ্বংস করবেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল এই অনুর্বর বালুময় ভূমির নালার পাশে অবতরণ করবে। তার কাছে যারা আগমন করবে তাদের অধিকাংশই থাকবে মহিলা। তারপর আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে তার ওপর কর্তৃত্ব দেবেন। তারা তাকে ও তার অনুসারীদেরকে হত্যা করবেন। এমনকি ইহুদিরা গাছ অথবা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে। তখন পাথর অথবা গাছ মুসলমানদের ডেকে বলবে, 'এইতো আমার পেছনে ইহুদি, সুতরাং তাকে হত্যা করো।'
উম্মু শারিক বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! যেদিন ইসা আলাইহিস সালাম আসমান থেকে অবতরণ করবেন সেদিন আরবের লোকজন কোথায় থাকবে? উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেদিন তারা সংখ্যায় হবে খুব অল্প। তাদের ইমাম হলেন মাহদি। তিনি একজন সৎ ব্যক্তি। এমন অবস্থায় একদিন ইমাম মাহদি তাদের নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। তখন ইসা ইবনে মারইয়াম সকাল বেলা আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। তাকে দেখে ইমাম মাহদি পেছনে সরে যাবেন যেন ইসা আলাইহিস সালাম সামনে গিয়ে নামাজের ইমামতি করেন। তখন ইসা আলাইহিস সালাম তার হাত ইমাম মাহদির দুই কাঁধের ওপর রেখে বলবেন, আপনি সামনে যান এবং নামাজের ইমামতি করুন। কেননা, এই নামাজ আপনার জন্যই কায়েম হয়েছিল। নামাজ শেষে ইসা আলাইহিস সালাম বলবেন, দরজা খুলে দাও। আর দরজার পেছনে থাকবে দাজ্জাল। তার সঙ্গে থাকবে সত্তর হাজার ইহুদি। দাজ্জাল যখন ইসা আলাইহিস সালামকে দেখবে তখন সে বিগলিত হয়ে যাবে। পরিশেষে তিনি তাকে বাবে লুদের পূর্ব দিকে পাবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। আল্লাহ ইহুদিদের পরাজিত করবেন। তখন ইহুদিরা আল্লাহর সৃষ্ট যে-কোনো বস্তুর আড়ালে লুকিয়ে থাকুক না কেন সে বস্তুকে আল্লাহ বাকশক্তি দান করবেন। তবে একটি গাছ হবে ব্যতিক্রম, যার নাম গারকাদ।
টিকাঃ
৬৭. সুরা নিসা: ১৫৭।
৬৮. সুরা ফাতহ: ২৯।
৬৯. মুসনাদে আহমদ: ২৩/২২১।
৭০. মুসনাদে আহমদ: ৩৬/২৫৮।
৭১. মুসনাদে আহমদ: ৫৩৬৩।
৭২. সুরা মুহাম্মদ: ১৮-১৯।
📄 ইয়াজুজ-মাজুজ সুন্দর পৃথিবীর দুশমন
ইতঃপূর্বে কিয়ামতের বড়ো দুই নিদর্শন হজরত ইমাম মাহদির আগমন ও দাজ্জালের ফিতনা সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোকপাত করেছি। দাজ্জাল হবে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করে তার উম্মতকে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের খবর শুনবে, সে যেন তার থেকে দূরে সরে যায়। আল্লাহর কসম! নিজেকে মুমিন ধারণকারী একজন ব্যক্তি দাজ্জালের কাছে আসবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সৃষ্ট অলৌকিক বিষয়গুলো দেখে তার অনুসারী হয়ে যাবে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে যখন কেউ নামাজে তাশাহুদ পড়বে তখন সে যেন চারটি বস্তু থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে—১. জাহান্নামের শাস্তি থেকে, ২. কবরের শাস্তি থেকে, ৩. জীবন-মরণের ফিতনা থেকে এবং ৪. দাজ্জালের অনিষ্টতা থেকে।
এই পর্যায়ে আলোচনা করব, কিয়ামতের অন্যতম নিদর্শন ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব সম্পর্কে। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, লোকদেরকে উপদেশ দেওয়া। গাফলত ও উদাসীনতার নিদ্রা থেকে জাগ্রত করা। যেন তারা অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে ফিরে আসে। আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাত কামনার প্রতি অনুপ্রাণিত করা। কিয়ামতের বিভীষিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ দেওয়া। ভীতি ও শঙ্কা সৃষ্টি করা। অন্তরে ভয় যেমন মানুষকে অন্ধকার রজনীতে দূর কোনো পাহাড়ি গুহায় প্রবেশ করতে বারণ করে তেমনি মৃত্যু, কবর, পরকাল, হাশর, পুলসিরাত মুমিনদেরকে পাপ ও হারাম কাজে মগ্ন হওয়া থেকে শক্তভাবে বিরত রাখবে। নিছক রহস্য উন্মোচন এবং রোমাঞ্চ অনুভব করা এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়।
টিকাঃ
৭৩. সুনানে নাসায়ি: ১৩০৯।