📄 ইতিহাসের ভয়াবহতম ফিতনা
আল্লাহ আমাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। দাজ্জালের সকল প্রকার অনিষ্ঠতা থেকে আমাদেরকে বিরত রাখুন। বর্ণিত আছে, দাজ্জালের সঙ্গে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম। কিন্তু সে জান্নাত হবে জাহান্নাম। আর জাহান্নাম হবে জান্নাত। যারা ঈমান পরিত্যাগ করে দাজ্জালের জান্নাতকে বেছে নেবে তারা জাহান্নামে পতিত হবে। আর যারা ঈমানের ওপর অটল ও অবিচল থেকে দাজ্জালের জাহান্নামকে বেছে নেবে তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করবেন।
হযরত আবু সাইদ খুদরি রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, 'জেনে রাখ, প্রত্যেক নবী স্বীয় উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আমি এমন এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে প্রতিজ্ঞা আমার পূর্বের কোনো নবী তার উম্মতকে দেননি। সাবধান! তার ডান চোখ হবে মেশানো, যা ফুলে উঠে থাকবে। বিষয়টি কারো কাছে গোপন থাকবে না। তা যেন দেয়ালের পার্শ্বে নিক্ষিপ্ত শ্লেষা। তার বাম চোখ হবে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তার সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম সদৃশ বস্তু থাকবে। তার জাহান্নাম হবে প্রকৃতপক্ষে সবুজ বাগান আর জান্নাত হবে ধুম্রময় নিকৃষ্ট স্থান।'
হজরত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'দাজ্জালের বাম চোখ কানা হবে। ঘন কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট হবে। তার সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। তার জাহান্নাম হলো জান্নাত এবং জান্নাত হলো জাহান্নাম।'
যারা সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে তারা দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্ত থাকবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা দাজ্জালের হাতে ঈমান হরণ থেকে তাদেরকে হিফাজত করবেন। দাজ্জাল যখন তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে তখন জাহান্নামের আগুন ঠান্ডা হয়ে যাবে। যেমন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নিকট। দাজ্জালের জাহান্নাম ঈমানদারদের জ্বালাতে পারবে না। কেননা দাজ্জালের নিকট যে জাহান্নাম থাকবে তা মূলত জান্নাত। আর যে জান্নাত থাকবে তা মূলত জাহান্নাম। অপর বর্ণনায় আছে, দাজ্জালের সঙ্গে থাকবে দুটি প্রবহমান নদী। একটি নদীর পানি থাকবে শীতল ও সাদা। অপরটির পানি থাকবে উত্তপ্ত। ঈমানদারগণ যখন দাজ্জালকে প্রভু হিসেবে মেনে নেবে না তখন সে তাদেরকে উত্তপ্ত পানি পান করানোর জন্য আহ্বান করবে। কিন্তু তারা যখন পানি পান করবে তখন তারা সে পানিকে শীতল পাবে। তাদের নিকট তা উত্তপ্ত হবে না। এভাবেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঈমানদারদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করবেন।
ইবনে আবু উমাইয়া থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক সাহাবির নিকট এসে তাকে বলেছি, আপনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শোনা দাজ্জাল বিষয়ক একটি হাদিস বর্ণনা করুন। তিনি আমাকে বললেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা সম্পর্কে ভীতিপ্রদর্শন করছি। এমন কোনো নবী নেই যিনি স্বীয় সম্প্রদায় বা উম্মতকে দাজ্জালের ভয় না দেখিয়েছেন। সে হবে কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট। তার বাম চোখ হবে কানা। সে বৃষ্টি বর্ষাবে কিন্তু গাছ উৎপন্ন করতে পারবে না। সে এক ব্যক্তির ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে হত্যা করার পর তাকে পুনরায় জীবিত করবে। কিন্তু এ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো ওপর সে কর্তৃত্ব করতে পারবে না। তার সাথে থাকবে জান্নাত, জাহান্নাম, নহর, পানি এবং রুটির পাহাড়। তার জান্নাত হবে জাহান্নাম আর জাহান্নাম হবে জান্নাত। সে তোমাদের মাঝে চল্লিশ সকাল অবস্থান করবে। এ সময়ের মধ্যে সে প্রত্যেক ঘাটে পৌঁছাবে। কিন্তু চারটি মসজিদ ব্যতীত। মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদ, তুর এবং মসজিদুল আকসা। যদি তাকে চিনতে তোমাদের অসুবিধা হয় বা তোমরা সন্দিহান হও তাহলে জেনে রাখ, মহান আল্লাহ কানা নন।'
হে আল্লাহর বান্দারা! সেদিন দাজ্জালের নিকট থাকা জান্নাত হবে জাহান্নাম। আর জান্নাত হবে জাহান্নাম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। সত্যিই এ এক ভয়াবহ ফিতনা। এর থেকে কেবল তারাই মুক্তি পাবে যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা হিফাজত করবেন।
দাজ্জালের আরেকটি ফিতনা হলো, দাজ্জাল এক গ্রাম্য ব্যক্তিকে বলবে, আমি তোমার মৃত পিতা-মাতাদের পুনরায় জীবিত করে দেখাব তবুও কি তুমি আমাকে তোমার প্রভু হিসেবে স্বীকার করবে না। তখন সে বলবে, হ্যাঁ, যদি আমার পিতা-মাতাকে মৃত থেকে জীবিত করে দেখাতে পার তাহলে আমি তোমাকে প্রভু হিসেবে মেনে নেব। দাজ্জাল তখন দুইজন শয়তানকে তার পিতা-মাতার আকৃতিতে তার সামনে হাজির করবে। তারা তাকে বলবে, হে আমার সন্তান! তুমি তার অনুসরণ করো।
টিকাঃ
৩৭. মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৬২১।
৩৮. সহিহ মুসলিম: ৮/১৯৫।
৩৯. মুসনাদে আহমদ: ২৩৬৮৪।
📄 দাজ্জাল আবির্ভাবের নিদর্শন
নিশ্চয় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ অত্যন্ত ভয়াবহ। মানবজাতির জন্য এক নিদারুণ ক্রান্তিকাল ডেকে আনবে। সময়টি হবে মুমিনদের জন্য নিদারুণ কঠিন পরীক্ষার। এ জাতীয় ফিতনার আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার নীতি হলো, এর পূর্বে কতিপয় নিদর্শন প্রকাশ করা। সেসবের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন উল্লেখ করছি।
প্রথম নিদর্শন:
নবুওয়াতের দাবি করা। দাজ্জালের আগমনের পূর্বে কতিপয় ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবি করবে। তারা নিজেদেরকে প্রেরিত নবী বলে দাবি করবে। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'নিকট অতীতে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বে কিয়ামত সংঘটিত হবে না। তারা প্রত্যেকে নিজেদেরকে নবী দাবি করবে।'
দ্বিতীয় নিদর্শন:
দাজ্জালের আবির্ভাবের একটি শক্তিশালী নিদর্শন হলো কুসতুনতুনিয়া বিজয়। দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বে মুসলমানগণ কুসতুনতুনিয়া বিজয় করবে। হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বড় হত্যাকাণ্ড, কুসতুনতুনিয়ার বিজয় এবং দাজ্জালের আবির্ভাব; এ সবকিছু মাত্র সাত মাসে সংঘটিত হবে।'
তৃতীয় নিদর্শন:
দাজ্জালের আবির্ভাবের একটি নিদর্শন হলো অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন এবং বস্তু ও সময়ের অদলবদল। দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর স্বাভাবিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। বিভিন্ন বস্তুর রূপ, আকার-আকৃতি পাল্টে যাবে। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'অচিরেই এমন কিছু ধোঁকার বছর আসবে যখন সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানানো হবে। বিশ্বাসঘাতককে বিশ্বস্ত আর বিশ্বস্তকে বিশ্বাসঘাতক মনে করা হবে। তখন রুয়াইবুজা কথা বলবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, রুয়াইবুজা কে? উত্তরে তিনি বললেন, পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা জনগণের [কল্যাণের] ব্যাপারে কথা বলবে।'
চতুর্থ নিদর্শন:
দাজ্জালের আবির্ভাবের একটি নিদর্শন হলো পৃথিবীজুড়ে ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ ও অভাব দেখা দেবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'দাজ্জাল বের হওয়ার তিন বছর পূর্বে আকাশ বৃষ্টি আটকে রাখবে। প্রথম বছরে এক তৃতীয়াংশ বৃষ্টি বন্ধ রাখবে এবং জমিন এক তৃতীয়াংশ ফসল উৎপন্ন বন্ধ রাখবে। দ্বিতীয় বছর আকাশ দুই তৃতীয়াংশ বৃষ্টি বন্ধ রাখবে এবং জমিন দুই তৃতীয়াংশ ফসল উৎপন্ন বন্ধ রাখবে। তৃতীয় বছর আকাশ সম্পূর্ণ বৃষ্টি বন্ধ রাখবে এবং জমিন কোনো ফসল উৎপন্ন করবে না। এমনকি প্রত্যেক দাঁত ও খুরবিশিষ্ট প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাবে। তার বড়ো ফিতনার একটি হলো, সে এক বেদুইনকে বলবে তোমার কী অভিমত, আমি যদি তোমার মৃত উটকে বড়ো স্তন ও লম্বা কুঁজবিশিষ্ট করে তোমার জন্য জীবিত করে দিই তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু বলে মেনে নেবে? তখন লোকটি বলবে, হ্যাঁ। তারপর শয়তান তার জন্য ওই উটের আকৃতি ধারণ করবে। এ দেখে সে দাজ্জালের অনুসারী হয়ে যাবে।'
হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রয়োজনে বের হলেন। তার জন্য ওজুর পানি রাখা হলো। এমন সময় লোকেরা কাঁদতে লাগল। এমনকি তাদের কান্নার আওয়াজ উঁচু হলো। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরজার চৌকাঠ ধরে বললেন, 'মাহইয়াম' অর্থাৎ, কী ব্যাপার? আসমা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! দাজ্জালের চিন্তায় তাদের অন্তর বিভোর। তখন রাসুল বললেন, তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকাবস্থায় যদি দাজ্জাল বের হয় তাহলে আমি তাকে প্রতিহত করব। আর যদি আমি মৃত্যুবরণ করি তাহলে প্রত্যেক মুমিনের জন্য আল্লাহ তায়ালাই আমার পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধানকারী। আসমা রা. বললেন, আমাদের মনের অবস্থা সেদিন কি এমন থাকবে হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, হ্যাঁ, অথবা ভালো থাকবে। তার নিকট পৃথিবীর সকল ধরনের ফল ও খাদ্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাবে। আসমা রাদি. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার পরিবারবর্গ তাদের খামির বানাতে থাকবে কিন্তু উপযুক্ত হবার পূর্বেই আমরা ক্ষুধার ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা করছি। সেদিন মুমিনরা কী খাদ্য দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করবে? তিনি বললেন, তারা ক্ষুধা নিবারণ করবে যেভাবে আকাশের বাসিন্দারা নিবারণ করে থাকেন। আসমা রাদি. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা জানি যে, ফেরেশতারা খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করেন না। তিনি বললেন, বরং তারা তাসবিহ ও তাকদিস পাঠ করতে থাকেন। আর এটাই সেদিন মুমিনদের খাদ্য-পানীয়।
টিকাঃ
৪০. সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম।
৪১. সুনানে তিরমিজি।
৪২. মুসনাদে আহমদ: ১৩৩২।
৪৩. মুজামুল কাবির লিত-তাবরানি: ২৪/১৫৯; মুসান্নাফে ইবনে আব্দুর রাজ্জাক: ২০৮২১।
📄 তখন কেমন হবে মানুষের অবস্থা?
দাজ্জাল যখন পৃথিবীতে আগমন করবে তখন মানুষের অবস্থা হবে অত্যন্ত করুণ। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, মূর্খতা-অজ্ঞতা, জুলুম, নিপীড়ন ও চারিত্রিক মারাত্মক অবক্ষয় দেখা দেবে। মানবজাতি তখন অতিক্রম করবে দুঃখ ও দুর্দশার এক নিদারুণ ক্রান্তিকাল। দাজ্জাল একে নিজের আধিপত্য ও প্রচার-প্রসারের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে। সে তাদেরকে সাহায্যের প্রলোভন দেখাবে। তাদের সকল দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার কথা বলবে। তাদের দারিদ্র্য-ক্ষুধা দূর করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করবে। যারা তার অনুসরণ করবে তাদেরকে সাময়িক সুখ ও প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ করে দেবে। সত্তর হাজার ইহুদি তার অনুসরণ করবে। সত্তর হাজার ধনী মুসলমান দাজ্জালের অনুসারী হয়ে যাবে। আর দাজ্জালের অনুসারীদের অধিকাংশই হবে ইহুদি ও নারী।
দাজ্জাল লোকদেরকে কীভাবে বিভ্রান্ত করবে এর একটি ধারণা পাওয়া যায় এর থেকে যে, দাজ্জাল এক গ্রাম্য ব্যক্তি-বিপদ-মুসিবত যাকে জরাজীর্ণ করে ফেলেছে—তাকে এসে বলবে, আমি তোমার পিতা-মাতাকে মৃত থেকে জীবিত করে তোমার সম্মুখে হাজির করব, তবুও কি তুমি আমাকে তোমার রব হিসেবে মেনে নেবে না? গ্রাম্য লোকটি বলবে, হ্যাঁ, যদি তুমি আমার মৃত পিতা-মাতাকে মৃত থেকে জীবিত করে আমার সামনে হাজির করতে পারো তাহলে আমি তোমাকে আমার রব হিসেবে মেনে নেব। দাজ্জাল তখন দুজন শয়তানকে তার পিতা-মাতার আকৃতিতে তার সামনে হাজির করবে। এ দেখে গ্রাম্য লোকটি দাজ্জালের অনুসারী হয়ে যাবে এবং কাফের হয়ে যাবে।
সেদিন দাজ্জালের সঙ্গে থাকবে রুটির এক বিশাল পাহাড় এবং স্বচ্ছ ও মিষ্টি পানির নদী। আর মানুষ থাকবে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। তাদের নিকট খাবার বলতে কিছু থাকবে না। দাজ্জাল তখন তাদেরকে রুটি ও পানির প্রলোভন দেখাবে। যারা তাকে প্রভু হিসেবে মেনে নেবে তাদেরকে সে রুটি ও পানি পান করতে দেবে। এভাবে বহু মানুষ সেদিন ঈমানহারা হয়ে যাবে।
নিশ্চয় দাজ্জাল ঈমানদারদের জন্য এক বড়ো ফিতনা। এক ভয়াবহ ফিতনা। সেদিন ধনীরা চাইবে আরো অধিক ধনী হতে। দরিদ্ররা চাইবে তাদের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে। আর এ জন্য তারা দাজ্জালের অনুসরণকে বেছে নেবে। যারা গ্রাম্য-বেদুইন তারা থাকবে মূর্খ। মূর্খতার কারণে তারা দাজ্জালের ফেতনায় জড়িয়ে পড়বে। নারীদের তো এমনিতেই জ্ঞান-বুদ্ধি কম। আর ইহুদিরা স্বভাবতই দাজ্জালের অনুসরণ করবে। কেননা, দাজ্জালও একজন ইহুদি। এক বর্ণনায় এসেছে, সত্তর হাজার পুরুষ ও পঞ্চাশ হাজার নারী তারা দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্ত থাকবে। দাজ্জালকে তারা চিনতে পারবে। ফলে তারা তাদের ঈমানকে বাঁচানোর জন্য জনপদ ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবে।
📄 দাজ্জাল আবির্ভাবের সময়কাল
দাজ্জালের আবির্ভাব কখন হবে, কোথায় থেকে সে আগমন করবে এসবের সুনির্দিষ্ট তথ্য একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যা কিছু ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন এবং রাসুল আমাদের নিকট যা কিছু বর্ণনা করেছেন এর বাহিরে দাজ্জালের কোনোকিছুই কেউ জানে না।
হজরত আবু বকর রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'নিশ্চয় দাজ্জাল পূর্বদিকের খোরাসান থেকে বের হবে। কিছু সম্প্রদায় তার অনুসরণ করবে। তাদের চেহারা হবে চওড়া আকৃতির।'
হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা শুনেছি তাই তোমাদের নিকট বর্ণনা করছি। তিনি বলেন, যখন লোকদের মাঝে মতানৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা দেখা দেবে তখন দাজ্জাল পৃথিবীর পূর্ব দিক থেকে বের হবে। সে হবে কানা। আল্লাহ তাকে যেখানে যেতে দেবেন সে চল্লিশ দিনে সেখানে পৌঁছে যাবে। এর পরিমাণ একমাত্র আল্লাহই জানেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদি. থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমার উম্মতের মাঝে দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। তার অবস্থানকাল হবে চল্লিশ।' বর্ণনাকারী বলেন, আমি জানি না, তা কী চল্লিশ দিন নাকি চল্লিশ মাস নাকি চল্লিশ বছর।
হজরত নাওয়াস ইবনে সামআন রাদি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা সকালে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, দাজ্জাল নয়, বরং তোমাদের ব্যাপারে আমি অন্য কিছুর ভয় করছি। তবে শোনো, আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয় তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকা অবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয় তবে প্রত্যেক মুমিন লোক নিজের পক্ষ থেকে তাকে প্রতিহত করবে।
আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! সে পৃথিবীতে কতদিন অবস্থান করবে? উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চল্লিশ দিন। এর প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের সমান। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের সমান। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতোই হবে। আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! যেদিন এক বছরের সমান সেটাতে একদিনের নামাজই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, বরং তোমরা হিসাব করে তোমাদের দিনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নেবে।
আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! দুনিয়াতে দাজ্জালের অগ্রসরতা কীরকম বৃদ্ধি পাবে? তিনি বললেন, বাতাসের প্রবাহ মেঘমালাকে যেরকম হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। সে এক সম্প্রদায়ের কাছে এসে তাদেরকে কুফরির দিকে ডাকবে। তারা তার ওপর ঈমান আনবে। অতঃপর সে আকাশকে আদেশ করবে, আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে। ভূমিকে নির্দেশ দেবে, ফলে ভূমি শস্য উৎপন্ন করবে। তারপর দাজ্জাল অপর এক সম্প্রদায়ের কাছে আসবে। তাদেরকে সে কুফরির দিকে আহ্বান করবে। কিন্তু তারা তার আহ্বানে সাড়া দেবে না। ফলে সে তাদের নিকট থেকে প্রত্যাবর্তন করবে। অমনি তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও পানির অভাব দেখা দেবে। তখন দাজ্জাল এক পতিত স্থান অতিক্রমকালে সেটিকে সম্বোর্ডন করে বলবে, তুমি তোমার গুপ্তধন বের করে দাও। তখন জমিনের ধনভান্ডার বের হয়ে তার চতুষ্পার্শে একত্রিত হতে থাকবে। অতঃপর দাজ্জাল এক যুবক ব্যক্তিকে ডেকে আনবে এবং তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে দুই টুকরো করে ফেলবে। তারপর সে আবার তাকে আহ্বান করবে। যুবক আলোকময় হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় তার সম্মুখে এগিয়ে আসবে।
এ সময় আল্লাহ তায়ালা ইসা ইবনে মারইয়ামকে প্রেরণ করবেন। তিনি দামেস্ক নগরীর পূর্ব দিকের উজ্জ্বল মিনারে অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করতে থাকবেন। অবশেষে তাকে বাবে লুদ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। তারপর ইসা আলাইহিস সালাম ওই সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। এমন সময় আল্লাহ তায়ালা ইসা আলাইহিস সালামের প্রতি এ মর্মে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটিয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোরই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়কে প্রেরণ করবেন। তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। তারা আল্লাহর নবী ইসা আলাইহিস সালাম এবং তার সাথিদেরকে অবরোধ করে রাখবে। তখন আল্লাহর নবী ইসা আলাইহিস সালাম এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। আল্লাহ তাদের দুআ কবুল করবেন। ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়ের ওপর তিনি আজাব প্রেরণ করবেন। তাদের ঘাড়ে একপ্রকার পোকা হবে। এতে সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ইসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীগণ পাহাড় থেকে জমিনে অবতরণ করবেন। এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে জমিন বিধৌত হয়ে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
টিকাঃ
৪৪. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৭২; মুসনাদে আহমদ: ১২; কানযুল উম্মাল: ৩৮৭৫০; মেশকাত: ৫৪৮৭।
৪৫. সহিহ মুসলিম: ২৯৪০।
৪৬. সহিহ মুসলিম: ৭১০৬।