📄 আমাকের যুদ্ধ
হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের পূর্বে এ ঘটনা অবশ্যই সংঘটিত হবে যে, রুমান সৈনিকরা আমাক বা দাবেক প্রান্তরে এসে একত্রিত হবে। তখন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি মুসলিম বাহিনী রুমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মদিনা থেকে রওনা হবে। অতঃপর যখন উভয় দলই যুদ্ধের জন্য কাতারবন্দি হবে, তখন রুমিগণ মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবে, তোমরা আমাদের এবং ওই সকল লোকদের মধ্যে বাধা হয়ে এসো না যারা আমাদের লোকদেরকে বন্দি করে নিয়ে এসেছে। তখন মুসলমানগণ বলবে, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমরা আমাদের ভাইদেরকে ছেড়ে সরে যাব না। অতঃপর মুসলমানরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধে মুসলমানদের একতৃতীয়াংশ সৈনিক পালিয়ে যাবে, যাদের তাওবা আল্লাহ তায়ালা কখনো কবুল করবেন না। আর একতৃতীয়াংশ সৈনিক শহিদ হবে। আল্লাহর নিকট তারা সর্বোত্তম শহিদ হিসেবে গণ্য হবে। অবশিষ্ট একতৃতীয়াংশ সৈনিকের হাতে আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন। পরবর্তীতে তাদেরকে কখনোই ফিতনা গ্রাস করতে পারবে না। তারা কুসতুনতুনিয়া বিজয় করবে। অন্য বর্ণনায় আছে, তারা রোমও বিজয় করবে। তারপর তারা তাদের তরবারিগুলো যাইতুন বৃক্ষের সাথে ঝুলিয়ে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করতে থাকবে, এমন সময় শয়তান এসে ঘোষণা করবে যে, ওদিকে দাজ্জাল এসে তোমাদের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করে ফেলেছে। তা শোনামাত্রই সেখান থেকে বাহিনী রওনা হয়ে যাবে। যদিও সংবাদটি ছিল মিথ্যা। কিন্তু মুসলমানগণ যখন শামে এসে পৌঁছবে তখন ঠিকই ঈসা বিন মারইয়াম আসমান থেকে অবতরণ করবেন এবং মুসলমানদের আমির ইমাম মাহদিকে ফজর নামাজের ইমামতি করার আদেশ করবেন। আল্লাহর দুশমন দাজ্জাল হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমন নাকি লবণ পানিতে পড়ে গলে যায়। তিনি যদি তাকে এই অবস্থায় ছেড়ে দিতেন তাহলে সে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাকে ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে হত্যা করবেন। হত্যার পর তিনি মানুষের কাছে এসে স্বীয় বর্শায় দাজ্জালের রক্ত দেখাবেন।
টিকাঃ
৩৩. দাবেক শহর বর্তমানে সিরিয়ার হালাব থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে তুর্কি সীমান্তের কাছকাছি একটি ছোটো এলাকার নাম। আমাক এলাকাটি এখানেই অবস্থিত।
৩৪. সহিহ মুসলিম: ২৮৯৭।
📄 রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে
হজরত মিখবার রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমরা রোমানদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা চুক্তি করবে। অতঃপর তোমরা এবং রোমানরা মিলে তৃতীয় কোনো শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তোমাদের সাহায্য করা হবে। ফলে তোমরা প্রচুর পরিমাণে গনিমতের মাল লাভ করবে। তারপর তোমরা নিরাপদে ফিরে আসবে। যখন তোমরা সবুজ-শ্যামল উঁচু টিলাময় এক ভূমিতে অবতরণ করবে তখন একজন খ্রিষ্টান ক্রুশ উঁচু করে বলবে যে, ক্রুশের বিজয় হয়েছে। এই কথা শুনে মুসলমানদের মধ্য থেকে একজন 'না, বরং আল্লাহর বিজয় হয়েছে' বলে প্রচণ্ড রাগে তার ক্রুশটি ভেঙে ফেলবে। ফলে রোমানরা পূর্বের কৃত চুক্তি বাতিল করে মহাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। তখন ঈমানদারগণও অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুসলমানদের এ দলটিকে আল্লাহ তায়ালা শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবেন।
টিকাঃ
৩৫. মুজামুল কাবির: ৪২৩০; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৬৭; কানযুল উম্মাল: ৩৮৪৫১।
📄 আত্মঘাতী যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়
হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে এই হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে নিম্নোক্ত ঘটনাবলি অবশ্যই সংঘটিত হবে, মিরাস [মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্যসম্পদ] বণ্টনের সুযোগ থাকবে না। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পেয়ে আনন্দ উল্লাস করার সুযোগ থাকবে না। কেননা, শামে অবস্থানকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী একত্রিত হয়ে আসবে। এদের সমোচিত জবাব দেওয়ার জন্য মুসলমানরাও একত্রিত হবে। বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করেন, শত্রুরা কি রোমবাসী? উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। সুতরাং সেখানে উভয় দলের মাঝে তুমুল লড়াই হবে। মুসলমানগণ তাদের মধ্য থেকে একটি বিশেষ দলকে নির্বাচন করবে, যাদের শর্ত থাকবে হয়তো মৃত্যু নয়তো বিজয়। অর্থাৎ, মুসলমান দলটি হবে আত্মঘাতী মুজাহিদ বাহিনী। তারা গিয়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত রাত হয়ে যাবে। কোনো পক্ষই জয়লাভ করবে না। মুসলমানদের আত্মঘাতী দলটির সকলে শহিদ হয়ে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় দিন মুসলমানরা পুনরায় একদল আত্মঘাতী দল নির্বাচন করে পাঠাবে এই শর্তে যে, হয়তো বিজয় নয়তো মৃত্যু। তারা গিয়ে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধ করতে করতে রাত নেমে আসবে। কোনো পক্ষই বিজয় লাভ করবে না। মুসলমানদের আত্মঘাতী দলটি শহিদ হয়ে যাবে।
তৃতীয় দিন মুসলমানরা আরো একদল নির্বাচন করে প্রেরণ করবে এই শর্তে যে, হয়তো বিজয় নয়তো মৃত্যু। তারা গিয়ে যুদ্ধ করতে থাকবে। সারাদিন যুদ্ধ চলবে। অবশেষে রাত নেমে আসবে। কোনো পক্ষই বিজয় লাভ করবে না। যথারীতি মুসলমানদের এই দলটিও শহিদ হয়ে যাবে। চতুর্থ দিন মুসলমানদের অবশিষ্ট সকল সৈনিক লড়াইয়ের জন্য বের হয়ে যাবে। এবার আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের মূলোৎপাটন করে মুসলমানদেরকে বিজয় দান করবেন। সেদিন এত মারাত্মক ও ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হবে যে, এরকম যুদ্ধ ইতঃপূর্বে পৃথিবীবাসী কোনো দিন প্রত্যক্ষ করেনি। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে এত অসংখ্য পরিমাণ লাশ পড়ে থাকবে যে, এসকল লাশের ওপর দিয়ে পাখি উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে কিন্তু লাশগুলি এত বিস্তৃত ময়দান পর্যন্ত পড়ে থাকবে বা এত মারাত্মক দুর্গন্ধ সৃষ্টি হবে যে, ময়দানের অপর প্রান্তে পৌঁছার পূর্বেই পাখি মারা যাবে। বাহিনী প্রেরণকারীগণ মৃতের সংখ্যা গণনা করে দেখবে যে, একশ ভাগের মধ্যে নিরানব্বই ভাগই নিহত হয়েছে। এক ভাগ মাত্র বেঁচে আসতে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. বলেন যে, এখন বলো, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে কি তখন আনন্দ উল্লাস করার সুযোগ থাকবে? মৃতদের ত্যাজ্যসম্পদ বণ্টন করার জন্য কি তখন মন চাইবে? তারপর তিনি বলেন, ঠিক তখন তারা এমন এক যুদ্ধের সংবাদ পাবে যা পূর্বের যুদ্ধের থেকেও বেশি ভয়ানক। সংবাদটি হবে, দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছে। সে আত্মপ্রকাশ করে মুসলমানদের পরিবারগুলো ফিতনায় ফেলার চেষ্টা করছে। এ সংবাদ শোনামাত্রই মুসলমানরা সকল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ফেলে দেবে। তাদের পরিবার-পরিজনের খবর এবং দাজ্জালের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের জন্য মুসলমানরা দশজনের একটি অগ্রগামী দল প্রেরণ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে বলেছেন, 'আমি তাদের নাম, তাদের পিতাদের নাম, এমনকি তাদের ঘোড়ার রং পর্যন্ত খুব ভালো করে চিনি। তারাই হচ্ছে ওই সময়কার শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী।'
হে আল্লাহর বান্দারা! নিঃসন্দেহে দাজ্জালের ফিতনা ভয়াবহ ফিতনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ সংবাদ দিয়েছেন যে, মানুষ যতদিন আল্লাহর আনুগত্য করবে, যতদিন তারা আল্লাহকে স্মরণ করবে ততদিন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে না। মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যাবে, তার আনুগত্য ছেড়ে দেবে, অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ব্যাপকহারে লিপ্ত হবে, তখন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। হে আল্লাহর বান্দারা! জেনে রাখ, এমন এক সময় আসবে যখন ইমামগণ দাজ্জালের আলোচনা ছেড়ে দেবে। তারা লোকদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করবে না যেভাবে সতর্ক করেছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আজকে আমি আপনাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করছি, যেন মসজিদের মিম্বরসমূহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করার ব্যাপারে চুপ না থাকে।
টিকাঃ
৩৬. মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৪৭১; সহিহ মুসলিম: ২৮৯৯; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১/২০৩; মুসনাদে আহমদ: ৩৬৪৩।
📄 মাসিহ বলে নামকরণের কারণ
দাজ্জালকে মাসিহ বলে নামকরণের একাধিক কারণ রয়েছে। আল্লামা ইবনুল ফারিস বলেন, দাজ্জাল একজন হতভাগ্য ও দুষ্কর্মপরায়ণ ব্যক্তি। তার চেহারা হবে অত্যন্ত ঘৃণিত ও নিকৃষ্টতার প্রলেপযুক্ত। কেউ কেউ বলেছেন, দাজ্জালের চোখ হবে অন্ধ। অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এ মতটিকে গ্রহণ করেছেন। আর কেউ কেউ বলেছেন, দাজ্জালকে মাসিহ বলে নামকরণের কারণ হলো, দাজ্জাল সমগ্র পৃথিবী চল্লিশ দিনে প্রদক্ষিণ করবে। পৃথিবীর সর্বত্র তার পায়ের স্পর্শ লাগবে।
দাজ্জালকে মাসিহ বলে নামকরণের এতসব কারণ দেখে কেউ কেউ এ কথা বলেছেন যে, তাহলে হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে কেন মাসিহ বলে নামকরণ করা হলো? হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে মাসিহ বলে নামকরণের কারণ সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের একাধিক বক্তব্য রয়েছে। কতক উলামায়ে কেরাম বলেন, হজরত ইসা আলাইহিস সালামকে মাসিহ বলে নামকরণের কারণ হলো, তিনি কোনো অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীর দেহ স্পর্শ করলে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা রোগ থেকে সুস্থ হয়ে যেত। এমনিভাবে তিনি কোনো মৃত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে আল্লাহর রহমতে উক্ত মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে যেত। সকল নবী-রাসুলকে আল্লাহ তায়ালা কিছু মুজেযা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। এ ছিল হজরত ইসা আলাইহিস সালামের মুজেযা।
কেউ কেউ বলেছেন, 'হজরত ইসা আলাইহিস সালাম মায়ের গর্ভ থেকে এমনভাবে বের হয়েছেন যেন তার পুরো শরীর তেলের প্রলেপযুক্ত ছিল। এমনও কেউ কেউ বলেছেন যে, হজরত ইসা আলাইহিস সালামের মুখমণ্ডল ছিল অত্যধিক সুন্দর। আর সুন্দর মুখমণ্ডলকে পরিভাষায় মাসিহ বলা হয়। তাই তাকে মাসিহ বলে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও নামকরণের আরো বিভিন্ন কারণ ইমাম ও আলেমদের থেকে বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো যে, মাসিহ দুই জন। একজনের মুখমণ্ডল হবে সুন্দর। তিনি হজরত ইসা আলাইহিস সালাম। আরেকজনের মুখমণ্ডল হবে কুৎসিত। বীভৎস। সে হবে অভিশপ্ত দাজ্জাল। এক মাসিহ মানবজাতিকে ধ্বংস ও পতনের দিকে ঠেলে দেবে। আরেক মাসিহ মানবজাতিকে ধ্বংস ও পতনের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলবেন। এক মাসিহ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করবে। আরেক মাসিহ লোকদের সঠিক পথের দিশা দেবেন। এক মাসিহের হাতে থাকবে কুফরের মশাল। আরেক মাসিহের হাতে থাকবে ঈমানের মশাল। এক মাসিহের অনুসারীদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আরেক মাসিহের অনুসারীদের ঠিকানা হবে জান্নাত। একজন মিথ্যা। আরেকজন সত্য।