📄 দাজ্জালের আবির্ভাব সঙ্কট ও মোকাবেলা
ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে ইমাম মাহদির আগমন, তার বিশদ পরিচয় এবং তার শুভাগমনের প্রেক্ষাপট, মাহাত্ম্য ও ঈমানদারদের করণীয় সম্পর্কে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন আলোচনা করব দাজ্জালের আগমন, তার ভয়ংকর আকৃতি, সে সময়কার পৃথিবীর পরিস্থিতি, লোকদেরকে বিভ্রান্তির বেড়াজাল এবং তার ফিতনার করালগ্রাস থেকে ঈমানদারদের মুক্তি সম্পর্কে।
দাজ্জালের ফিতনা মানবজাতির সুদীর্ঘকাল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনা। হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এমন কোনো নবী-রাসূল আগমন করেননি যিনি তার উম্মতকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করেননি। তন্মধ্যে সর্বাধিক বেশি সতর্ক করেছেন আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কেননা, পূর্ববর্তী সকল নবী তার কওমকে সতর্ক করেছেন কিন্তু তাদের ওপর দাজ্জালের ফিতনা আসেনি। সর্বশেষ আগমন করেছেন আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তার পর আর কোনো নবী ও রাসুল নতুন শরিয়ত নিয়ে আগমন করবেন না। এবং আমরাই হলাম পৃথিবীর সর্বশেষ উম্মত। সুতরাং আমাদের সময়ে দাজ্জালের ফিতনার আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী। সেই জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় উম্মতকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে বেশি বেশি সতর্ক করেছেন। দাজ্জালের আবির্ভাব পৃথিবীতে মানবজাতির ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। চারদিকে ধ্বংস ও পতনের আওয়াজ বেজে উঠবে। তখন পৃথিবীময় এমন ভয়ংকর ফিতনা ও কঠিন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে যার পরিণাম ও পরিণতি একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই অধিক ভালো জানেন। কোনো মানুষের পক্ষে এর কল্পনা করাও সম্ভব নয়। এ জন্যই তো আমরা প্রত্যেক নামাজের পর দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করি।
দাজ্জাল একটি জনপদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। সে জনপদের লোকেরা হবে প্রকৃত ঈমানদার। তারা দাজ্জালকে চিনতে পারবে। ফলে তারা দাজ্জালকে মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবে। তাকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করবে না। দাজ্জাল তখন প্রচণ্ড রাগান্বিত হবে। ক্রোধে তার চোখ-মুখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বের হবে। দাজ্জাল তখন উক্ত জনপদের সকল মানুষ ও প্রাণী নির্মমভাবে হত্যা করবে। তারপর অন্য আরেকটি জনপদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। তারা দাজ্জালকে সত্য বলে মেনে নেবে। তারা কাফের হয়ে যাবে। দাজ্জাল তখন তাদের প্রতি দারুণ খুশি হবে। আসমানকে আদেশ করবে যেন তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করে। জমিনকে আদেশ করবে যেন নানাবিধ সবুজ উদ্ভিদ, ফল-ফসলে ভরে দেয়। এভাবে দাজ্জাল পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করবে। যারা তাকে প্রভু হিসেবে মেনে নেবে তাদের সাথে প্রভুসুলভ আচরণ করবে। তাদেরকে প্রভূত নেয়ামতরাজিতে পরিপূর্ণ করে দেবে। যারা তাকে অস্বীকার করবে তাদের ওপর নেমে আসবে অত্যাচার-নিপীড়নের খড়ক। তাদেরকে সে অত্যন্ত পৈশাচিকভাবে হত্যা করবে। আল্লাহ দাজ্জালকে সেদিন এতই ক্ষমতা প্রদান করবেন যে, দাজ্জাল যা কিছু বলবে, যা কিছু করতে চাইবে তাই হবে। তার কথায় আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে। জমিন থেকে উৎপন্ন হবে রকমারি উদ্ভিদ আর ফল-ফসল।
আল্লাহর কসম! দাজ্জালের আবির্ভাব হবে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহতম বিপর্যয়। সূচনা হবে এক কালো অধ্যায়ের। এ জন্যই যুগে যুগে প্রেরিত সকল নবী-রাসুল দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এর থেকে উত্তরণের উপায় বলে দিয়েছেন। আর সকল নবী-রাসুলের চেয়ে অধিক সতর্ক করেছেন আমাদের নবী। কেননা, শেষ জমানা হওয়ার কারণে এ কথা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতই দাজ্জালের ফিতনার সম্মুখীন হবে।
হজরত আবু উমামা আল বাহিলি রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অধিকাংশ ভাষণে আমাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করতেন। একদিন বলেন, হে লোক সকল! আল্লাহ যখন থেকে আদম সন্তানকে সৃষ্টি করেছেন তখন থেকে দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড়ো কোনো ফিতনা পৃথিবীতে সংঘটিত হয়নি। নিশ্চয় আল্লাহ এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি যিনি তার উম্মতকে দাজ্জালের ভয় দেখাননি। আমি সর্বশেষ নবী আর তোমরা হলে সর্বশেষ উম্মত। জেনে রাখ, দাজ্জাল অবশ্যই তোমাদের মাঝে আত্মপ্রকাশ করবে। আমি তোমাদের মাঝে থাকাবস্থায় যদি দাজ্জাল বের হয় তাহলে আমি প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করব। আর যদি সে আমার পরে বের হয় তাহলে তোমাদের প্রত্যেককে নিজের পক্ষে দলিল পেশ করতে হবে। তখন মহান আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আমার খলিফা স্বরূপ হবেন (তত্ত্বাবধানকারী হবেন।) নিশ্চয় দাজ্জাল বের হবে সিরিয়া ও ইরাকের খাল্লা নামক স্থান থেকে। আর সে তার ডানে ও বামে সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ঈমানের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। প্রথমে সে বলবে, আমি নবী এবং আমার পর আর কোনো নবী নেই। অতঃপর সে দাবি করবে, আমি তোমাদের প্রভু। অথচ তোমরা তোমাদের প্রভুকে মৃত্যুর পূর্বে দেখবে না। দাজ্জাল হবে কানা। আর তোমাদের প্রভু তো কানা নন। তার দুই চোখের মাঝে লেখা থাকবে কাফের। এই লেখা প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তিই পড়তে পারবে। চাই সে শিক্ষিত হোক কিবা অশিক্ষিত।
হজরত আনাস বিন মালেক রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'এমন কোনো নবী নেই যিনি স্বীয় উম্মতকে মিথ্যাবাদী কানা দাজ্জাল সম্পর্কে সাবধান করেননি। জেনে রাখ, সে হবে কানা আর তোমাদের প্রভু কানা নন। তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে কাফ, ফা, রা।'
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট আসলেন। এ সময় আমি কাঁদছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, কোন জিনিস তোমাকে কাঁদাচ্ছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! দাজ্জালের কথা স্মরণ হওয়াতে আমি কাঁদছি। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার জীবদ্দশায় যদি দাজ্জাল বের হয় তাহলে আমি তোমাদের পক্ষে যথেষ্ট হব। আর যদি আমার পরে বের হয় তাহলে জেনে রাখ, তোমাদের রব কানা নন। সে বের হবে আসবাহানের ইহুদিদের মধ্য থেকে। এমনকি সে মদিনাতে আসবে এবং তার এক প্রান্তে নামবে সেদিন মদিনার সাতটি দরজা থাকবে। প্রতিটি প্রবেশদ্বারে দুইজন করে ফেরেশতা নিযুক্ত থাকবে। মদিনার মন্দ অধিবাসীদের দাজ্জাল তার দলে বের করে আনবে এমনকি সে ফিলিস্তিনের কাছে লুদে চলে আসবে। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী শাসক হিসেবে।
দাজ্জালের আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে বড়ো বড়ো যুদ্ধ সংঘটিত হবে। কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে ঈমানদার সৈনিকরা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে। আল্লাহ তায়ালা তার দলকে বিজয় দান করবেন। কাফেরদের তিনি পরাজিত করবেন। বাতিলের শক্তি খর্ব করবেন। সেই সঙ্গে এও পার্থক্য করবেন যে, কারা প্রকৃত মুমিন আর কারা মুনাফিক। সেদিন সত্যিকার ঈমানদারদের হৃদয়ের বারুদ আগুন হয়ে জ্বলে উঠবে।
টিকাঃ
৩০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২/৫১২।
৩১. সহিহ বুখারি: ১৩/৮৫; সহিহ মুসলিম: ৮/১৯৫।
৩২. মুসনাদে আহমদ: ৫/৭৫; সহিহ ইবনে হিব্বান: ১৯০৫।
📄 আমাকের যুদ্ধ
হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের পূর্বে এ ঘটনা অবশ্যই সংঘটিত হবে যে, রুমান সৈনিকরা আমাক বা দাবেক প্রান্তরে এসে একত্রিত হবে। তখন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি মুসলিম বাহিনী রুমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মদিনা থেকে রওনা হবে। অতঃপর যখন উভয় দলই যুদ্ধের জন্য কাতারবন্দি হবে, তখন রুমিগণ মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবে, তোমরা আমাদের এবং ওই সকল লোকদের মধ্যে বাধা হয়ে এসো না যারা আমাদের লোকদেরকে বন্দি করে নিয়ে এসেছে। তখন মুসলমানগণ বলবে, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমরা আমাদের ভাইদেরকে ছেড়ে সরে যাব না। অতঃপর মুসলমানরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধে মুসলমানদের একতৃতীয়াংশ সৈনিক পালিয়ে যাবে, যাদের তাওবা আল্লাহ তায়ালা কখনো কবুল করবেন না। আর একতৃতীয়াংশ সৈনিক শহিদ হবে। আল্লাহর নিকট তারা সর্বোত্তম শহিদ হিসেবে গণ্য হবে। অবশিষ্ট একতৃতীয়াংশ সৈনিকের হাতে আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন। পরবর্তীতে তাদেরকে কখনোই ফিতনা গ্রাস করতে পারবে না। তারা কুসতুনতুনিয়া বিজয় করবে। অন্য বর্ণনায় আছে, তারা রোমও বিজয় করবে। তারপর তারা তাদের তরবারিগুলো যাইতুন বৃক্ষের সাথে ঝুলিয়ে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করতে থাকবে, এমন সময় শয়তান এসে ঘোষণা করবে যে, ওদিকে দাজ্জাল এসে তোমাদের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করে ফেলেছে। তা শোনামাত্রই সেখান থেকে বাহিনী রওনা হয়ে যাবে। যদিও সংবাদটি ছিল মিথ্যা। কিন্তু মুসলমানগণ যখন শামে এসে পৌঁছবে তখন ঠিকই ঈসা বিন মারইয়াম আসমান থেকে অবতরণ করবেন এবং মুসলমানদের আমির ইমাম মাহদিকে ফজর নামাজের ইমামতি করার আদেশ করবেন। আল্লাহর দুশমন দাজ্জাল হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমন নাকি লবণ পানিতে পড়ে গলে যায়। তিনি যদি তাকে এই অবস্থায় ছেড়ে দিতেন তাহলে সে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাকে ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে হত্যা করবেন। হত্যার পর তিনি মানুষের কাছে এসে স্বীয় বর্শায় দাজ্জালের রক্ত দেখাবেন।
টিকাঃ
৩৩. দাবেক শহর বর্তমানে সিরিয়ার হালাব থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে তুর্কি সীমান্তের কাছকাছি একটি ছোটো এলাকার নাম। আমাক এলাকাটি এখানেই অবস্থিত।
৩৪. সহিহ মুসলিম: ২৮৯৭।
📄 রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে
হজরত মিখবার রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমরা রোমানদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা চুক্তি করবে। অতঃপর তোমরা এবং রোমানরা মিলে তৃতীয় কোনো শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তোমাদের সাহায্য করা হবে। ফলে তোমরা প্রচুর পরিমাণে গনিমতের মাল লাভ করবে। তারপর তোমরা নিরাপদে ফিরে আসবে। যখন তোমরা সবুজ-শ্যামল উঁচু টিলাময় এক ভূমিতে অবতরণ করবে তখন একজন খ্রিষ্টান ক্রুশ উঁচু করে বলবে যে, ক্রুশের বিজয় হয়েছে। এই কথা শুনে মুসলমানদের মধ্য থেকে একজন 'না, বরং আল্লাহর বিজয় হয়েছে' বলে প্রচণ্ড রাগে তার ক্রুশটি ভেঙে ফেলবে। ফলে রোমানরা পূর্বের কৃত চুক্তি বাতিল করে মহাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। তখন ঈমানদারগণও অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুসলমানদের এ দলটিকে আল্লাহ তায়ালা শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবেন।
টিকাঃ
৩৫. মুজামুল কাবির: ৪২৩০; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৬৭; কানযুল উম্মাল: ৩৮৪৫১।
📄 আত্মঘাতী যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়
হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে এই হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে নিম্নোক্ত ঘটনাবলি অবশ্যই সংঘটিত হবে, মিরাস [মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্যসম্পদ] বণ্টনের সুযোগ থাকবে না। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পেয়ে আনন্দ উল্লাস করার সুযোগ থাকবে না। কেননা, শামে অবস্থানকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী একত্রিত হয়ে আসবে। এদের সমোচিত জবাব দেওয়ার জন্য মুসলমানরাও একত্রিত হবে। বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করেন, শত্রুরা কি রোমবাসী? উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। সুতরাং সেখানে উভয় দলের মাঝে তুমুল লড়াই হবে। মুসলমানগণ তাদের মধ্য থেকে একটি বিশেষ দলকে নির্বাচন করবে, যাদের শর্ত থাকবে হয়তো মৃত্যু নয়তো বিজয়। অর্থাৎ, মুসলমান দলটি হবে আত্মঘাতী মুজাহিদ বাহিনী। তারা গিয়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত রাত হয়ে যাবে। কোনো পক্ষই জয়লাভ করবে না। মুসলমানদের আত্মঘাতী দলটির সকলে শহিদ হয়ে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয় দিন মুসলমানরা পুনরায় একদল আত্মঘাতী দল নির্বাচন করে পাঠাবে এই শর্তে যে, হয়তো বিজয় নয়তো মৃত্যু। তারা গিয়ে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধ করতে করতে রাত নেমে আসবে। কোনো পক্ষই বিজয় লাভ করবে না। মুসলমানদের আত্মঘাতী দলটি শহিদ হয়ে যাবে।
তৃতীয় দিন মুসলমানরা আরো একদল নির্বাচন করে প্রেরণ করবে এই শর্তে যে, হয়তো বিজয় নয়তো মৃত্যু। তারা গিয়ে যুদ্ধ করতে থাকবে। সারাদিন যুদ্ধ চলবে। অবশেষে রাত নেমে আসবে। কোনো পক্ষই বিজয় লাভ করবে না। যথারীতি মুসলমানদের এই দলটিও শহিদ হয়ে যাবে। চতুর্থ দিন মুসলমানদের অবশিষ্ট সকল সৈনিক লড়াইয়ের জন্য বের হয়ে যাবে। এবার আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের মূলোৎপাটন করে মুসলমানদেরকে বিজয় দান করবেন। সেদিন এত মারাত্মক ও ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হবে যে, এরকম যুদ্ধ ইতঃপূর্বে পৃথিবীবাসী কোনো দিন প্রত্যক্ষ করেনি। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে এত অসংখ্য পরিমাণ লাশ পড়ে থাকবে যে, এসকল লাশের ওপর দিয়ে পাখি উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে কিন্তু লাশগুলি এত বিস্তৃত ময়দান পর্যন্ত পড়ে থাকবে বা এত মারাত্মক দুর্গন্ধ সৃষ্টি হবে যে, ময়দানের অপর প্রান্তে পৌঁছার পূর্বেই পাখি মারা যাবে। বাহিনী প্রেরণকারীগণ মৃতের সংখ্যা গণনা করে দেখবে যে, একশ ভাগের মধ্যে নিরানব্বই ভাগই নিহত হয়েছে। এক ভাগ মাত্র বেঁচে আসতে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. বলেন যে, এখন বলো, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে কি তখন আনন্দ উল্লাস করার সুযোগ থাকবে? মৃতদের ত্যাজ্যসম্পদ বণ্টন করার জন্য কি তখন মন চাইবে? তারপর তিনি বলেন, ঠিক তখন তারা এমন এক যুদ্ধের সংবাদ পাবে যা পূর্বের যুদ্ধের থেকেও বেশি ভয়ানক। সংবাদটি হবে, দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছে। সে আত্মপ্রকাশ করে মুসলমানদের পরিবারগুলো ফিতনায় ফেলার চেষ্টা করছে। এ সংবাদ শোনামাত্রই মুসলমানরা সকল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ফেলে দেবে। তাদের পরিবার-পরিজনের খবর এবং দাজ্জালের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের জন্য মুসলমানরা দশজনের একটি অগ্রগামী দল প্রেরণ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে বলেছেন, 'আমি তাদের নাম, তাদের পিতাদের নাম, এমনকি তাদের ঘোড়ার রং পর্যন্ত খুব ভালো করে চিনি। তারাই হচ্ছে ওই সময়কার শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী।'
হে আল্লাহর বান্দারা! নিঃসন্দেহে দাজ্জালের ফিতনা ভয়াবহ ফিতনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ সংবাদ দিয়েছেন যে, মানুষ যতদিন আল্লাহর আনুগত্য করবে, যতদিন তারা আল্লাহকে স্মরণ করবে ততদিন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে না। মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যাবে, তার আনুগত্য ছেড়ে দেবে, অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ব্যাপকহারে লিপ্ত হবে, তখন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। হে আল্লাহর বান্দারা! জেনে রাখ, এমন এক সময় আসবে যখন ইমামগণ দাজ্জালের আলোচনা ছেড়ে দেবে। তারা লোকদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করবে না যেভাবে সতর্ক করেছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আজকে আমি আপনাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করছি, যেন মসজিদের মিম্বরসমূহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করার ব্যাপারে চুপ না থাকে।
টিকাঃ
৩৬. মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৪৭১; সহিহ মুসলিম: ২৮৯৯; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১/২০৩; মুসনাদে আহমদ: ৩৬৪৩।