📘 প্রতীক্ষিত মাহদি দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ 📄 পৃথিবীতে সুদের ভয়াবহ প্রচলন ঘটবে

📄 পৃথিবীতে সুদের ভয়াবহ প্রচলন ঘটবে


ইমাম মাহদির আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে সুদের ভয়াবহ প্রচলন ঘটবে। তখন সুদকে মানুষ কোনো গোনাহই মনে করবে না। অন্যান্য বস্তুর ন্যায় খুব সাধারণ এক বস্তুতে পরিণত হবে। আবু দাউদ, মুসতাদরাকে হাকেম, ইবনে মাজাহসহ বহু গ্রন্থে হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এমন এক জমানা আসবে যখন সকলেই সুদ ভক্ষণ করবে।

আজকের পৃথিবীর সর্বত্র সুদের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। খুব কম মানুষই এর থেকে মুক্ত। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অনুষঙ্গে সুদ অনুপ্রবেশ করেছে। সুদকে আজ তেমন গোনাহের বস্তু মনে করা হচ্ছে না। কেউ তাকে অস্বীকার করছে না। সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হলো সুদ। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের প্রচলিত রীতি-নীতি মুসলমানরা দারুণ উৎসাহের সাথে নিজেদের দেশে বাস্তবায়ন করছে। সকল মুসলমান সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে।

হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের ওপর এমন এক সময় আসবে যখন তারা ব্যাপকভাবে সুদ খাওয়া শুরু করবে। প্রশ্ন করা হলো, সকলেই কি সুদ খাবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সুদ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে, সুদের ধুলোবালি হলেও তার গায়ে লাগবে।

একদিকে নামাজ, রোজা, হজসহ অন্যান্য ইবাদত যথাযথ পালন করছে আবার অপরদিকে কোনো প্রকার অনুশোচনা ব্যতীতই সুদ ভক্ষণ করছে। নিজেদের ব্যাবসা সুদীভিত্তিতে পরিচালিত করছে। কেউ যদি সুদকে ঘৃণা করে, অস্বীকার করে তাহলে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে সুদের সাথে জড়ানোর জন্য। এ তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রতিফলন।

সুদ এতই ভয়াবহ পাপ যে, আল্লাহ তায়ালা সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানরা আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, মুসলমানরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করছে না। ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ * فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের নিকট যে সুদ বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে থাক। যদি তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখ।'

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
الربا سبعون باباً أدناها كوقع الرجل على أمه
'সুদের সত্তরটি দরজা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন হলো, আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করা।'

আল্লাহর নিকট পানাহ চাই! এমন ভয়াবহ ও জঘন্য পাপ হওয়া সত্ত্বেও আজ মুসলিম উম্মাহ কীভাবে কোনো প্রকার পরোয়াবিহীন সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

ইমাম মাহদির পৃথিবীতে আগমনের আরো একটি নিদর্শন হলো, আমানতের খেয়ানত। মানুষ একে অপরের নিকট আমানত রাখবে কিন্তু কেউ সে আমানত যথাযথ রক্ষা করবে না। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, একদা জনৈক বেদুইন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? প্রত্যুত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আমানতের খেয়ানত করা হবে। বেদুইন পুনরায় জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে আমানতের খেয়ানত করা হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নেতৃত্ব যখন অযোগ্যদের নিকট অর্পণ করা হবে।

ইমাম মাহদির আবির্ভাবের অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, কাবাঘর ধ্বংস হওয়া। বহু হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত-পূর্বকালে হাবশার জনৈক খোদাদ্রোহী ব্যক্তির হাতে বাইতুল্লাহ ধ্বংস হওয়ার কথা বলেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, '[শেষ জমানায়] হাবশার এক ছোটো নলাবিশিষ্ট ব্যক্তি কাবাঘর ধ্বংস করবে।'

হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই হলো ইমাম মাহদির আগমন ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত, যা ইতোমধ্যে একে একে সংঘটিত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে হিফাজত করুন। ইমাম মাহদির একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে কবুল করুন।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,
فَهَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَنْ تَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا فَأَنَّى لَهُمْ إِذَا جَاءَتْهُمْ ذِكْرَاهُمْ * فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ
'তবে কি তারা আকস্মিকভাবে কিয়ামতের আগমন ছাড়া আর কিছুর অপেক্ষা করছে? তার লক্ষণসমূহ তো এসেই গেছে। কিয়ামত এসে পড়লে তখন তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কীভাবে? অতএব জেনে রাখ! আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। নিজের ত্রুটির জন্য ও মুমিন নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ তোমাদের চলাফেরা ও ঠিকানা জানেন।'

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মাহদি অচিরেই আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু কখন আর কোন দিন? তা কেবল আল্লাহ তায়ালাই অধিকতর ভালো জানেন। মুসলিম উম্মাহর উচিত নয় আমল-ইবাদত ছেড়ে দিয়ে কেবল তার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকা। মাহদি কোন বছর কোন মাসে আর কোন দিন আগমন করবে এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বহু হাদিসের আলোকে এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, মাহদির আগমন সত্য। তিনি অবশ্যই আসবেন। কিন্তু কবে কখন আসবেন এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। তাই তার আগমন সত্য এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। আমাদের জন্য করণীয় হলো, নিজেদের ইবাদত-বন্দেগি যথাযথ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যেসব কাজের আদেশ করেছেন সেগুলো যথাযথ মেনে চলা। আর যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকা। হারাম ও নাজায়েজ থেকে বেঁচে থাকা। সুদ, ঘুস, মিথ্যা, আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি জঘন্য পাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে প্রতীক্ষিত মাহদির সুসংবাদ দিয়েছেন তার আগমনের অপেক্ষা করা এবং তার বাহিনীতে যোগদানের জন্য নিজেদেরকে সদা প্রস্তুত রাখা।

টিকাঃ
২৩. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭৮; কানযুল উম্মাল: ৯৭৬৩।
২৪. মুসনাদে আহমদ: ১০৪১০।
২৫. সুরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯।
২৬. কানযুল উম্মাল: ৯৭৫২।
২৭. সহিহ বুখারি: ৬৪৯৬; মুসনাদে আহমদ: ৮৭২৯; কানযুল উম্মাল: ৩৮৫০৮।
২৮. সহিহ বুখারি: ১৫১৪; সহিহ মুসলিম: ২৯০৯; সুনানে নাসায়ি: ২৯০৪; কানযুল উম্মাল: ৩৮৪৭৯; মুসনাদে আহমদ: ৭০৫৩।
২৯. সুরা মুহাম্মদ: ১৮-১৯।

📘 প্রতীক্ষিত মাহদি দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ 📄 দাজ্জালের আবির্ভাব সঙ্কট ও মোকাবেলা

📄 দাজ্জালের আবির্ভাব সঙ্কট ও মোকাবেলা


ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে ইমাম মাহদির আগমন, তার বিশদ পরিচয় এবং তার শুভাগমনের প্রেক্ষাপট, মাহাত্ম্য ও ঈমানদারদের করণীয় সম্পর্কে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন আলোচনা করব দাজ্জালের আগমন, তার ভয়ংকর আকৃতি, সে সময়কার পৃথিবীর পরিস্থিতি, লোকদেরকে বিভ্রান্তির বেড়াজাল এবং তার ফিতনার করালগ্রাস থেকে ঈমানদারদের মুক্তি সম্পর্কে।

দাজ্জালের ফিতনা মানবজাতির সুদীর্ঘকাল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনা। হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এমন কোনো নবী-রাসূল আগমন করেননি যিনি তার উম্মতকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করেননি। তন্মধ্যে সর্বাধিক বেশি সতর্ক করেছেন আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কেননা, পূর্ববর্তী সকল নবী তার কওমকে সতর্ক করেছেন কিন্তু তাদের ওপর দাজ্জালের ফিতনা আসেনি। সর্বশেষ আগমন করেছেন আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তার পর আর কোনো নবী ও রাসুল নতুন শরিয়ত নিয়ে আগমন করবেন না। এবং আমরাই হলাম পৃথিবীর সর্বশেষ উম্মত। সুতরাং আমাদের সময়ে দাজ্জালের ফিতনার আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী। সেই জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় উম্মতকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে বেশি বেশি সতর্ক করেছেন। দাজ্জালের আবির্ভাব পৃথিবীতে মানবজাতির ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। চারদিকে ধ্বংস ও পতনের আওয়াজ বেজে উঠবে। তখন পৃথিবীময় এমন ভয়ংকর ফিতনা ও কঠিন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে যার পরিণাম ও পরিণতি একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই অধিক ভালো জানেন। কোনো মানুষের পক্ষে এর কল্পনা করাও সম্ভব নয়। এ জন্যই তো আমরা প্রত্যেক নামাজের পর দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করি।

দাজ্জাল একটি জনপদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। সে জনপদের লোকেরা হবে প্রকৃত ঈমানদার। তারা দাজ্জালকে চিনতে পারবে। ফলে তারা দাজ্জালকে মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবে। তাকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করবে না। দাজ্জাল তখন প্রচণ্ড রাগান্বিত হবে। ক্রোধে তার চোখ-মুখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বের হবে। দাজ্জাল তখন উক্ত জনপদের সকল মানুষ ও প্রাণী নির্মমভাবে হত্যা করবে। তারপর অন্য আরেকটি জনপদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। তারা দাজ্জালকে সত্য বলে মেনে নেবে। তারা কাফের হয়ে যাবে। দাজ্জাল তখন তাদের প্রতি দারুণ খুশি হবে। আসমানকে আদেশ করবে যেন তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করে। জমিনকে আদেশ করবে যেন নানাবিধ সবুজ উদ্ভিদ, ফল-ফসলে ভরে দেয়। এভাবে দাজ্জাল পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করবে। যারা তাকে প্রভু হিসেবে মেনে নেবে তাদের সাথে প্রভুসুলভ আচরণ করবে। তাদেরকে প্রভূত নেয়ামতরাজিতে পরিপূর্ণ করে দেবে। যারা তাকে অস্বীকার করবে তাদের ওপর নেমে আসবে অত্যাচার-নিপীড়নের খড়ক। তাদেরকে সে অত্যন্ত পৈশাচিকভাবে হত্যা করবে। আল্লাহ দাজ্জালকে সেদিন এতই ক্ষমতা প্রদান করবেন যে, দাজ্জাল যা কিছু বলবে, যা কিছু করতে চাইবে তাই হবে। তার কথায় আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে। জমিন থেকে উৎপন্ন হবে রকমারি উদ্ভিদ আর ফল-ফসল।

আল্লাহর কসম! দাজ্জালের আবির্ভাব হবে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহতম বিপর্যয়। সূচনা হবে এক কালো অধ্যায়ের। এ জন্যই যুগে যুগে প্রেরিত সকল নবী-রাসুল দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এর থেকে উত্তরণের উপায় বলে দিয়েছেন। আর সকল নবী-রাসুলের চেয়ে অধিক সতর্ক করেছেন আমাদের নবী। কেননা, শেষ জমানা হওয়ার কারণে এ কথা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতই দাজ্জালের ফিতনার সম্মুখীন হবে।

হজরত আবু উমামা আল বাহিলি রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অধিকাংশ ভাষণে আমাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করতেন। একদিন বলেন, হে লোক সকল! আল্লাহ যখন থেকে আদম সন্তানকে সৃষ্টি করেছেন তখন থেকে দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড়ো কোনো ফিতনা পৃথিবীতে সংঘটিত হয়নি। নিশ্চয় আল্লাহ এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি যিনি তার উম্মতকে দাজ্জালের ভয় দেখাননি। আমি সর্বশেষ নবী আর তোমরা হলে সর্বশেষ উম্মত। জেনে রাখ, দাজ্জাল অবশ্যই তোমাদের মাঝে আত্মপ্রকাশ করবে। আমি তোমাদের মাঝে থাকাবস্থায় যদি দাজ্জাল বের হয় তাহলে আমি প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করব। আর যদি সে আমার পরে বের হয় তাহলে তোমাদের প্রত্যেককে নিজের পক্ষে দলিল পেশ করতে হবে। তখন মহান আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আমার খলিফা স্বরূপ হবেন (তত্ত্বাবধানকারী হবেন।) নিশ্চয় দাজ্জাল বের হবে সিরিয়া ও ইরাকের খাল্লা নামক স্থান থেকে। আর সে তার ডানে ও বামে সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ঈমানের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। প্রথমে সে বলবে, আমি নবী এবং আমার পর আর কোনো নবী নেই। অতঃপর সে দাবি করবে, আমি তোমাদের প্রভু। অথচ তোমরা তোমাদের প্রভুকে মৃত্যুর পূর্বে দেখবে না। দাজ্জাল হবে কানা। আর তোমাদের প্রভু তো কানা নন। তার দুই চোখের মাঝে লেখা থাকবে কাফের। এই লেখা প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তিই পড়তে পারবে। চাই সে শিক্ষিত হোক কিবা অশিক্ষিত।

হজরত আনাস বিন মালেক রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'এমন কোনো নবী নেই যিনি স্বীয় উম্মতকে মিথ্যাবাদী কানা দাজ্জাল সম্পর্কে সাবধান করেননি। জেনে রাখ, সে হবে কানা আর তোমাদের প্রভু কানা নন। তার দুই চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে কাফ, ফা, রা।'

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট আসলেন। এ সময় আমি কাঁদছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, কোন জিনিস তোমাকে কাঁদাচ্ছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! দাজ্জালের কথা স্মরণ হওয়াতে আমি কাঁদছি। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার জীবদ্দশায় যদি দাজ্জাল বের হয় তাহলে আমি তোমাদের পক্ষে যথেষ্ট হব। আর যদি আমার পরে বের হয় তাহলে জেনে রাখ, তোমাদের রব কানা নন। সে বের হবে আসবাহানের ইহুদিদের মধ্য থেকে। এমনকি সে মদিনাতে আসবে এবং তার এক প্রান্তে নামবে সেদিন মদিনার সাতটি দরজা থাকবে। প্রতিটি প্রবেশদ্বারে দুইজন করে ফেরেশতা নিযুক্ত থাকবে। মদিনার মন্দ অধিবাসীদের দাজ্জাল তার দলে বের করে আনবে এমনকি সে ফিলিস্তিনের কাছে লুদে চলে আসবে। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও ইনসাফকারী শাসক হিসেবে।

দাজ্জালের আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে বড়ো বড়ো যুদ্ধ সংঘটিত হবে। কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে ঈমানদার সৈনিকরা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে। আল্লাহ তায়ালা তার দলকে বিজয় দান করবেন। কাফেরদের তিনি পরাজিত করবেন। বাতিলের শক্তি খর্ব করবেন। সেই সঙ্গে এও পার্থক্য করবেন যে, কারা প্রকৃত মুমিন আর কারা মুনাফিক। সেদিন সত্যিকার ঈমানদারদের হৃদয়ের বারুদ আগুন হয়ে জ্বলে উঠবে।

টিকাঃ
৩০. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২/৫১২।
৩১. সহিহ বুখারি: ১৩/৮৫; সহিহ মুসলিম: ৮/১৯৫।
৩২. মুসনাদে আহমদ: ৫/৭৫; সহিহ ইবনে হিব্বান: ১৯০৫।

📘 প্রতীক্ষিত মাহদি দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ 📄 আমাকের যুদ্ধ

📄 আমাকের যুদ্ধ


হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের পূর্বে এ ঘটনা অবশ্যই সংঘটিত হবে যে, রুমান সৈনিকরা আমাক বা দাবেক প্রান্তরে এসে একত্রিত হবে। তখন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি মুসলিম বাহিনী রুমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মদিনা থেকে রওনা হবে। অতঃপর যখন উভয় দলই যুদ্ধের জন্য কাতারবন্দি হবে, তখন রুমিগণ মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবে, তোমরা আমাদের এবং ওই সকল লোকদের মধ্যে বাধা হয়ে এসো না যারা আমাদের লোকদেরকে বন্দি করে নিয়ে এসেছে। তখন মুসলমানগণ বলবে, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমরা আমাদের ভাইদেরকে ছেড়ে সরে যাব না। অতঃপর মুসলমানরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধে মুসলমানদের একতৃতীয়াংশ সৈনিক পালিয়ে যাবে, যাদের তাওবা আল্লাহ তায়ালা কখনো কবুল করবেন না। আর একতৃতীয়াংশ সৈনিক শহিদ হবে। আল্লাহর নিকট তারা সর্বোত্তম শহিদ হিসেবে গণ্য হবে। অবশিষ্ট একতৃতীয়াংশ সৈনিকের হাতে আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন। পরবর্তীতে তাদেরকে কখনোই ফিতনা গ্রাস করতে পারবে না। তারা কুসতুনতুনিয়া বিজয় করবে। অন্য বর্ণনায় আছে, তারা রোমও বিজয় করবে। তারপর তারা তাদের তরবারিগুলো যাইতুন বৃক্ষের সাথে ঝুলিয়ে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করতে থাকবে, এমন সময় শয়তান এসে ঘোষণা করবে যে, ওদিকে দাজ্জাল এসে তোমাদের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করে ফেলেছে। তা শোনামাত্রই সেখান থেকে বাহিনী রওনা হয়ে যাবে। যদিও সংবাদটি ছিল মিথ্যা। কিন্তু মুসলমানগণ যখন শামে এসে পৌঁছবে তখন ঠিকই ঈসা বিন মারইয়াম আসমান থেকে অবতরণ করবেন এবং মুসলমানদের আমির ইমাম মাহদিকে ফজর নামাজের ইমামতি করার আদেশ করবেন। আল্লাহর দুশমন দাজ্জাল হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখে এমনভাবে গলে যাবে যেমন নাকি লবণ পানিতে পড়ে গলে যায়। তিনি যদি তাকে এই অবস্থায় ছেড়ে দিতেন তাহলে সে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাকে ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে হত্যা করবেন। হত্যার পর তিনি মানুষের কাছে এসে স্বীয় বর্শায় দাজ্জালের রক্ত দেখাবেন।

টিকাঃ
৩৩. দাবেক শহর বর্তমানে সিরিয়ার হালাব থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে তুর্কি সীমান্তের কাছকাছি একটি ছোটো এলাকার নাম। আমাক এলাকাটি এখানেই অবস্থিত।
৩৪. সহিহ মুসলিম: ২৮৯৭।

📘 প্রতীক্ষিত মাহদি দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ 📄 রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে

📄 রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে


হজরত মিখবার রাদি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমরা রোমানদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা চুক্তি করবে। অতঃপর তোমরা এবং রোমানরা মিলে তৃতীয় কোনো শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তোমাদের সাহায্য করা হবে। ফলে তোমরা প্রচুর পরিমাণে গনিমতের মাল লাভ করবে। তারপর তোমরা নিরাপদে ফিরে আসবে। যখন তোমরা সবুজ-শ্যামল উঁচু টিলাময় এক ভূমিতে অবতরণ করবে তখন একজন খ্রিষ্টান ক্রুশ উঁচু করে বলবে যে, ক্রুশের বিজয় হয়েছে। এই কথা শুনে মুসলমানদের মধ্য থেকে একজন 'না, বরং আল্লাহর বিজয় হয়েছে' বলে প্রচণ্ড রাগে তার ক্রুশটি ভেঙে ফেলবে। ফলে রোমানরা পূর্বের কৃত চুক্তি বাতিল করে মহাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। তখন ঈমানদারগণও অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুসলমানদের এ দলটিকে আল্লাহ তায়ালা শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবেন।

টিকাঃ
৩৫. মুজামুল কাবির: ৪২৩০; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৬৭; কানযুল উম্মাল: ৩৮৪৫১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px