📄 উম্মাহর প্রতি রাসুলের আহ্বান
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে আহ্বান করে বলেছেন, ইমাম মাহদি যখন আগমন করবে, তখন পৃথিবীতে যারা বেঁচে থাকবে তারা যেন হকের কাফেলায় শরিক হয়ে যায়। তারা যেন ইমাম মাহদির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে বর্ণিত,
বিহিনা নাহনু ইনদা রাসুলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম... (আরাবি টেক্সট)
'একদা আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় বনু হাশিমের কতিপয় যুবক আগমন করল। তাদেরকে দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ লাল হয়ে গেল। চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার চেহারায় অপছন্দনীয় বিষয় প্রত্যক্ষ করছি। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন, আমার পরিবারস্থ লোকজন-আল্লাহ তাদের জন্য দুনিয়ার পরিবর্তে আখেরাতকে প্রাধান্য দিয়েছেন-আমার মৃত্যুর পর তারা অনেক বিপদাপদ, দেশ থেকে বিতাড়ন এবং বঞ্চিতকরণের সম্মুখীন হবে। শেষ পর্যন্ত পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকাবাহী লোকেরা আসবে। তারা এসে নেতৃত্ব চাইবে। কিন্তু তখনকার নেতৃস্থানীয়রা তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করবে। ফলে তারা যুদ্ধ করবে। যুদ্ধে তাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য করা হবে। ফলে তারা বিজয় লাভ করবে। অতঃপর তাদেরকে নেতৃত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু এবার তারা নেতৃত্ব গ্রহণ না করে আমার পরিবারস্থ একজন লোকের হাতে নেতৃত্বের ভার অর্পণ করবে। সে পৃথিবীকে ন্যায়-ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দেবে। ঠিক যেমনভাবে ইতঃপূর্বে জুলুম-অত্যাচারের মাধ্যমে ভরে দেওয়া হয়েছিল। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারাই তখন উপস্থিত থাকবে, সে যেন কালো পতাকাবাহী দলে এসে শামিল হয়ে যায়। যদিও এর জন্য তোমাদেরকে বরফের ওপর দিয়ে হাটু গেড়ে আসতে হোক না কেন।'
টিকাঃ
১৬. মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল: ৫৩৭৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৮২; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১/২৫৬।
📄 ইমাম মাহদির আগমনের নিদর্শন
ইমাম মাহদির আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে কয়েকটি ঘটনা সংঘটিত হবে যা বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। পৃথিবী যখন যুদ্ধ-বিগ্রহ, জুলুম-নিপীড়ন হত্যা ও ধ্বংসলীলায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, একের-পর-এক যুদ্ধের দামামা বাজতে থাকবে, মুসলমানগণ সর্বদিক থেকে পরাজিত বিধ্বস্ত ও হতে থাকবে, সমগ্র পৃথিবীতে মুসলমানদের ওপর ইহুদি-খ্রিস্টানদের আধিপত্য বিস্তার লাভ করবে, যখন কুফরের আধিপত্যে আরবের শান শওকত পর্যন্ত নিভে যাবে, আসতে আসতে তারা খায়বারের নিকটে এসে পড়বে, মুসলমানরা এসে মদিনায় আশ্রয় নেবে, তখন প্রয়োজন দেখা দেবে একজন মহামানবের যিনি এসে মুসলমানদের নেতৃত্ব প্রদান করবেন, সেই কঠিন মুহূর্তে পাশ্চাত্যের কোনো এক দেশ থেকে ইমাম মাহদির আগমন ঘটবে।
হজরত আবু সাইদ খুদরি রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মত এমন এক মুসিবতের সম্মুখীন হবে যে, সেদিন তাদের কেউই জুলুম থেকে বাঁচার কোনো আশ্রয় খুঁজে পাবে না। আল্লাহ তখন আমার পরিবার থেকে একজনকে প্রেরণ করবেন যে পৃথিবীকে ন্যায়-ইনসাফে ভরে দেবে, যেমন জুলুম নির্যাতনে ভরপুর ছিল। আসমান ও জমিনের সকল অধিবাসী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। জমিন প্রচুর ফসল উৎপন্ন করবে। তিনি সাত কিংবা আট বছর জীবিত থাকবেন।
হজরত উম্মে সালামা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কাবাগৃহের পাশে একজন লোক আশ্রয় নেবে। তার বিরুদ্ধে একদল সৈনিক প্রেরণ করা হবে। সৈন্যরা যখন বাইদা নামক স্থানে পৌঁছবে তখন জমিন তাদেরকে গ্রাস করবে। উম্মে সালামা রাদি. বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও যারা তার সঙ্গে যাবে তাদের কী অবস্থা হবে? উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে সহ জমিন ধ্বসে যাবে। তবে কিয়ামতের দিন সে আপন নিয়তের ওপর পুনরুত্থিত হবে।
হজরত মুজাহিদ রহ. বলেন, আমার নিকট রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক সাহাবি বর্ণনা করেছেন, মাহদি ততক্ষণ পর্যন্ত আগমন করবে না, যতক্ষণ না পবিত্র আত্মাকে শহিদ করা হবে। তখন আসমান ও পৃথিবীর সকল বাসিন্দাগণ হত্যাকারীদের ওপর রাগান্বিত হয়ে যাবে। এরপর লোকেরা মাহদির কাছে এসে তাকে এমন সুসজ্জিত করবে, যেমন নাকি নববধূকে সাজিয়ে বাসর রাতে তার স্বামীর গৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। মাহদি পৃথিবীকে ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের মাধ্যমে ভরে দেবে। তার সময়ে পৃথিবী তার অভ্যন্তরে থাকা উদ্ভিদগুলো উত্তমরূপে প্রকাশ করবে এবং আসমান তার বরকতময় বৃষ্টি দ্বারা জমিনকে পূর্ণ করে দেবে। আমার উম্মত তার সময়ে এমন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করবে যে, এরকম সুখের জীবন তারা ইতঃপূর্বে যাপন করেননি।
উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জনৈক খলিফার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হবে। মদিনার একজন লোক তখন পালিয়ে মক্কায় চলে আসবে। মক্কার লোকেরা তাকে খুঁজে বের করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুকন এবং মাকামে ইবরাহিমের মাঝামাঝি স্থানে বাইআত গ্রহণ করবে। বাইআতের খবর শুনে শামের দিক থেকে এক বিশাল বাহিনী প্রেরিত হবে। মক্কা-মদিনার মাঝামাঝি বাইদা প্রান্তরে তাদেরকে মাটির নিচে ধসে দেওয়া হবে। বাহিনী ধসের সংবাদ শুনে শাম ও ইরাকের শ্রেষ্ঠ মুসলমানগণ মক্কায় এসে রুকন ও মাকামে ইবরাহিমের মাঝামাঝি তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। অতঃপর বনু কালব সম্বন্ধীয় এক কুরাইশির আবির্ভাব হবে। শামের দিক থেকে সে বাহিনী প্রেরণ করবে। মক্কার নব উত্থিত মুসলিম বাহিনী তাদের ওপর বিজয়ী হয়ে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করবে। সেদিন বনু কালবের সর্বনাশ ঘটবে। যে বনু কালব থেকে অর্জিত সম্পদ প্রত্যক্ষ করেনি, সেই প্রকৃত বঞ্চিত। অতঃপর মানুষের মাঝে তিনি সম্পদ বণ্টন করবেন। নববি আদর্শের বাস্তবায়ন ঘটাবেন। উট যেমন প্রশান্তচিত্তে গলা বিছিয়ে আরাম পায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইসলামও সেদিন ভূ-পৃষ্ঠে প্রশান্তচিত্তে স্থির পাবে। সাত বৎসর এভাবে রাজত্ব করে তিনি ইন্তেকাল করবেন, মুসলমানগণ তার জানাজায় শরিক হবে।
হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদি. বলেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের একটি দল হকের ওপর অবিচল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত লড়াই করতে থাকবে। অতঃপর ইসা ইবনে মারইয়াম আসমান থেকে অবতরণ করবেন। তাকে দেখে মুসলমানদের আমির বলবেন, আসুন! আপনি আমাদের নামাজের ইমামতি করুন। ঈসা আলাইহিস সালাম বলবেন, না, বরং তোমাদের আমির তোমাদের মধ্য থেকেই। এই উম্মতের সম্মানের কারণেই তিনি এ মন্তব্য করবেন।'
টিকাঃ
১৭. মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৭/৩১৩-৩১৪।
১৮. মুসলিম, কিতাবুল ফিতান।
১৯. মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ৩৮৮০৮।
২০. সুনানে আবু দাউদ।
২১. মুসলিম, কিতাবুল ফিতান।
📄 ইমাম মাহদির আগমনের আরো একটি নিদর্শন
মসজিদে নববি একটি সাদা প্রাসাদে পরিণত হবে। হজরত মিহজান ইবনে আদরা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন, মুক্তির দিন, মুক্তির দিন, মুক্তির দিন। একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! মুক্তির দিন কী? উত্তরে তিনি বললেন, দাজ্জাল আসবে। উহুদ পর্বতের ওপর আরোহণ করে মদিনার দিকে ইঙ্গিত করে তার সাথিদেরকে বলবে, তোমরা কী ওই সাদা প্রাসাদটি দেখতে পাচ্ছ? এটি হচ্ছে আহমদের মসজিদ। অতঃপর সে মদিনার দিকে আসতে থাকলে মদিনায় প্রবেশ করার প্রতিটি রাস্তায় ধারালো তরবারি নিয়ে দাঁড়ানো ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। ফলে সে সাবখাতুল জারফ নামক স্থানে স্বীয় ঘাটিতে ফিরে এসে সর্বশক্তি দিয়ে ভূমিতে আঘাত করবে। ফলে মদিনাতে বড়ো ধরনের তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হবে। জান-প্রাণের ভয়ে সকল ফাসেক-মুনাফেক নারী-পুরুষ মদিনা থেকে বের হয়ে দাজ্জালের সাথে চলে যাবে। এভাবেই মদিনা সকল প্রকার পাপিষ্ঠকে দূরে নিক্ষেপ করে পূত-পবিত্র হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে মুক্তির দিন।
ইমাম মাহদির আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে সুদের ভয়াবহ প্রচলন ঘটবে। তখন সুদকে মানুষ কোনো গোনাহই মনে করবে না। অন্যান্য বস্তুর ন্যায় খুব সাধারণ এক বস্তুতে পরিণত হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এমন এক জমানা আসবে যখন সকলেই সুদ ভক্ষণ করবে। আজকের পৃথিবীর সর্বত্র সুদের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। খুব কম মানুষই এর থেকে মুক্ত। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অনুষঙ্গে সুদ অনুপ্রবেশ করেছে। সুদকে আজ তেমন গোনাহের বস্তু মনে করা হচ্ছে না। কেউ তাকে অস্বীকার করছে না। সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হলো সুদ। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের প্রচলিত রীতি-নীতি মুসলমানরা দারুণ উৎসাহের সাথে নিজেদের দেশে বাস্তবায়ন করছে। সকল মুসলমান সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের ওপর এমন এক সময় আসবে যখন তারা ব্যাপকভাবে সুদ খাওয়া শুরু করবে। প্রশ্ন করা হলো, সকলেই কি সুদ খাবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সুদ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে, সুদের ধুলোবালি হলেও তার গায়ে লাগবে। একদিকে নামাজ, রোজা, হজসহ অন্যান্য ইবাদত যথাযথ পালন করছে আবার অপরদিকে কোনো প্রকার অনুশোচনা ব্যতীতই সুদ ভক্ষণ করছে। নিজেদের ব্যাবসা সুদীভিত্তিতে পরিচালিত করছে। কেউ যদি সুদকে ঘৃণা করে, অস্বীকার করে তাহলে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে সুদের সাথে জড়ানোর জন্য। এ তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রতিফলন।
সুদ এতই ভয়াবহ পাপ যে, আল্লাহ তায়ালা সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানরা আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, মুসলমানরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করছে না। ইরশাদ হয়েছে, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের নিকট যে সুদ বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে থাক। যদি তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখ।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'সুদের সত্তরটি দরজা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন হলো, আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করা।' আল্লাহের নিকট পানাহ চাই! এমন ভয়াবহ ও জঘন্য পাপ হওয়া সত্ত্বেও আজ মুসলিম উম্মাহ কীভাবে কোনো প্রকার পরোয়াবিহীন সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
ইমাম মাহদির পৃথিবীতে আগমনের আরো একটি নিদর্শন হলো, আমানতের খেয়ানত। মানুষ একে অপরের নিকট আমানত রাখবে কিন্তু কেউ সে আমানত যথাযথ রক্ষা করবে না। একদা জনৈক বেদুইন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? প্রত্যুত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আমানতের খেয়ানত করা হবে। বেদুইন পুনরায় জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে আমানতের খেয়ানত করা হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নেতৃত্ব যখন অযোগ্যদের নিকট অর্পণ করা হবে।
ইমাম মাহদির আবির্ভাবের অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, কাবাঘর ধ্বংস হওয়া। বহু হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত-পূর্বকালে হাবশার জনৈক খোদাদ্রোহী ব্যক্তির হাতে বাইতুল্লাহ ধ্বংস হওয়ার কথা বলেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, '[শেষ জমানায়] হাবশার এক ছোটো নলাবিশিষ্ট ব্যক্তি কাবাঘর ধ্বংস করবে।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই হলো ইমাম মাহদির আগমন ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত, যা ইতোমধ্যে একে একে সংঘটিত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে হিফাজত করুন। ইমাম মাহদির একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে কবুল করুন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, 'তবে কি তারা আকস্মিকভাবে কিয়ামতের আগমন ছাড়া আর কিছুর অপেক্ষা করছে? তার লক্ষণসমূহ তো এসেই গেছে। কিয়ামত এসে পড়লে তখন তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কীভাবে? অতএব জেনে রাখ! আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। নিজের ত্রুটির জন্য ও মুমিন নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ তোমাদের চলাফেরা ও ঠিকানা জানেন।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! মাহদি অচিরেই আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু কখন আর কোন দিন? তা কেবল আল্লাহ তায়ালাই অধিকতর ভালো জানেন। মুসলিম উম্মাহর উচিত নয় আমল-ইবাদত ছেড়ে দিয়ে কেবল তার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকা। মাহদি কোন বছর কোন মাসে আর কোন দিন আগমন করবে এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বহু হাদিসের আলোকে এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, মাহদির আগমন সত্য। তিনি অবশ্যই আসবেন। কিন্তু কবে কখন আসবেন এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। তাই তার আগমন সত্য এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। আমাদের জন্য করণীয় হলো, নিজেদের ইবাদত-বন্দেগি যথাযথ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যেসব কাজের আদেশ করেছেন সেগুলো যথাযথ মেনে চলা। আর যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকা। হারাম ও নাজায়েজ থেকে বেঁচে থাকা। সুদ, ঘুস, মিথ্যা, আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি জঘন্য পাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে প্রতীক্ষিত মাহদির সুসংবাদ দিয়েছেন তার আগমনের অপেক্ষা করা এবং তার বাহিনীতে যোগদানের জন্য নিজেদেরকে সদা প্রস্তুত রাখা। কেননা, মাহদি এসে পৃথিবী থেকে জুলুম-নিপীড়নের মূলোৎপাটন করবেন। সকল প্রকার কুফর-শিরক সমূলে উৎখাত করবেন। সর্বত্র আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করবেন। আর তার সাথে যোগ দেবে একদল মুমিন, যারা তাকে সাহায্য করবে। তারা সকলেই হবে সৌভাগ্যবান। তাদের চেয়ে দ্বিগুণ সৌভাগ্যবান আর কারা রয়েছে যারা পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে? সেই কাফেলার সদস্য হওয়ার জন্য নিজেদেরকে সর্বদা প্রস্তুত রাখা। এর বাহিরে সকল প্রকার ভ্রান্ত ও প্রতারণামূলক ধ্যান-ধারণা থেকে বেঁচে থাকা। বহু মিথ্যুক আগমন করবে যারা নিজেদেরকে মাহদি বলে দাবি করবে। ঈমানবিধ্বংসী কর্মসূচি নিয়ে তারা হাজির হবে। তাদের ষড়যন্ত্র থেকে নিরাপদ থাকা। আল্লাহ তায়ালার নিকট কায়মনো প্রার্থনা করা।
টিকাঃ
২২. মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৬৩১; কানযুল উম্মাল: ৩৮৮৩৩; মুসনাদে আহমদ: ১৮৯৭৫।
২৩. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭৮; কানযুল উম্মাল: ৯৭৬৩।
২৪. মুসনাদে আহমদ: ১০৪১০।
২৫. সুরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯।
২৬. কানযুল উম্মাল: ৯৭৫২।
২৭. সহিহ বুখারি: ৬৪৯৬; মুসনাদে আহমদ: ৮৭২৯; কানযুল উম্মাল: ৩৮৫০৮।
২৮. সহিহ বুখারি: ১৫১৪; সহিহ মুসলিম: ২৯০৯; সুনানে নাসায়ি: ২৯০৪; কানযুল উম্মাল: ৩৮৪৭৯; মুসনাদে আহমদ: ৭০৫৩।
২৯. সুরা মুহাম্মদ: ১৮-১৯।
📄 পৃথিবীতে সুদের ভয়াবহ প্রচলন ঘটবে
ইমাম মাহদির আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে সুদের ভয়াবহ প্রচলন ঘটবে। তখন সুদকে মানুষ কোনো গোনাহই মনে করবে না। অন্যান্য বস্তুর ন্যায় খুব সাধারণ এক বস্তুতে পরিণত হবে। আবু দাউদ, মুসতাদরাকে হাকেম, ইবনে মাজাহসহ বহু গ্রন্থে হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এমন এক জমানা আসবে যখন সকলেই সুদ ভক্ষণ করবে।
আজকের পৃথিবীর সর্বত্র সুদের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। খুব কম মানুষই এর থেকে মুক্ত। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অনুষঙ্গে সুদ অনুপ্রবেশ করেছে। সুদকে আজ তেমন গোনাহের বস্তু মনে করা হচ্ছে না। কেউ তাকে অস্বীকার করছে না। সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হলো সুদ। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের প্রচলিত রীতি-নীতি মুসলমানরা দারুণ উৎসাহের সাথে নিজেদের দেশে বাস্তবায়ন করছে। সকল মুসলমান সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের ওপর এমন এক সময় আসবে যখন তারা ব্যাপকভাবে সুদ খাওয়া শুরু করবে। প্রশ্ন করা হলো, সকলেই কি সুদ খাবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সুদ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবে, সুদের ধুলোবালি হলেও তার গায়ে লাগবে।
একদিকে নামাজ, রোজা, হজসহ অন্যান্য ইবাদত যথাযথ পালন করছে আবার অপরদিকে কোনো প্রকার অনুশোচনা ব্যতীতই সুদ ভক্ষণ করছে। নিজেদের ব্যাবসা সুদীভিত্তিতে পরিচালিত করছে। কেউ যদি সুদকে ঘৃণা করে, অস্বীকার করে তাহলে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে সুদের সাথে জড়ানোর জন্য। এ তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রতিফলন।
সুদ এতই ভয়াবহ পাপ যে, আল্লাহ তায়ালা সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানরা আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, মুসলমানরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করছে না। ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ * فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের নিকট যে সুদ বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে থাক। যদি তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
الربا سبعون باباً أدناها كوقع الرجل على أمه
'সুদের সত্তরটি দরজা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন হলো, আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করা।'
আল্লাহর নিকট পানাহ চাই! এমন ভয়াবহ ও জঘন্য পাপ হওয়া সত্ত্বেও আজ মুসলিম উম্মাহ কীভাবে কোনো প্রকার পরোয়াবিহীন সুদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
ইমাম মাহদির পৃথিবীতে আগমনের আরো একটি নিদর্শন হলো, আমানতের খেয়ানত। মানুষ একে অপরের নিকট আমানত রাখবে কিন্তু কেউ সে আমানত যথাযথ রক্ষা করবে না। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, একদা জনৈক বেদুইন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? প্রত্যুত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আমানতের খেয়ানত করা হবে। বেদুইন পুনরায় জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে আমানতের খেয়ানত করা হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নেতৃত্ব যখন অযোগ্যদের নিকট অর্পণ করা হবে।
ইমাম মাহদির আবির্ভাবের অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, কাবাঘর ধ্বংস হওয়া। বহু হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত-পূর্বকালে হাবশার জনৈক খোদাদ্রোহী ব্যক্তির হাতে বাইতুল্লাহ ধ্বংস হওয়ার কথা বলেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, '[শেষ জমানায়] হাবশার এক ছোটো নলাবিশিষ্ট ব্যক্তি কাবাঘর ধ্বংস করবে।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই হলো ইমাম মাহদির আগমন ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলামত, যা ইতোমধ্যে একে একে সংঘটিত হচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে হিফাজত করুন। ইমাম মাহদির একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে কবুল করুন।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,
فَهَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَنْ تَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا فَأَنَّى لَهُمْ إِذَا جَاءَتْهُمْ ذِكْرَاهُمْ * فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ
'তবে কি তারা আকস্মিকভাবে কিয়ামতের আগমন ছাড়া আর কিছুর অপেক্ষা করছে? তার লক্ষণসমূহ তো এসেই গেছে। কিয়ামত এসে পড়লে তখন তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কীভাবে? অতএব জেনে রাখ! আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। নিজের ত্রুটির জন্য ও মুমিন নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ তোমাদের চলাফেরা ও ঠিকানা জানেন।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! মাহদি অচিরেই আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু কখন আর কোন দিন? তা কেবল আল্লাহ তায়ালাই অধিকতর ভালো জানেন। মুসলিম উম্মাহর উচিত নয় আমল-ইবাদত ছেড়ে দিয়ে কেবল তার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকা। মাহদি কোন বছর কোন মাসে আর কোন দিন আগমন করবে এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বহু হাদিসের আলোকে এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, মাহদির আগমন সত্য। তিনি অবশ্যই আসবেন। কিন্তু কবে কখন আসবেন এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। তাই তার আগমন সত্য এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। আমাদের জন্য করণীয় হলো, নিজেদের ইবাদত-বন্দেগি যথাযথ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যেসব কাজের আদেশ করেছেন সেগুলো যথাযথ মেনে চলা। আর যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকা। হারাম ও নাজায়েজ থেকে বেঁচে থাকা। সুদ, ঘুস, মিথ্যা, আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি জঘন্য পাপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে প্রতীক্ষিত মাহদির সুসংবাদ দিয়েছেন তার আগমনের অপেক্ষা করা এবং তার বাহিনীতে যোগদানের জন্য নিজেদেরকে সদা প্রস্তুত রাখা।
টিকাঃ
২৩. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭৮; কানযুল উম্মাল: ৯৭৬৩।
২৪. মুসনাদে আহমদ: ১০৪১০।
২৫. সুরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯।
২৬. কানযুল উম্মাল: ৯৭৫২।
২৭. সহিহ বুখারি: ৬৪৯৬; মুসনাদে আহমদ: ৮৭২৯; কানযুল উম্মাল: ৩৮৫০৮।
২৮. সহিহ বুখারি: ১৫১৪; সহিহ মুসলিম: ২৯০৯; সুনানে নাসায়ি: ২৯০৪; কানযুল উম্মাল: ৩৮৪৭৯; মুসনাদে আহমদ: ৭০৫৩।
২৯. সুরা মুহাম্মদ: ১৮-১৯।