📄 হাদিসের আলোকে ইমাম মাহদি
ইমাম মাহদির আগমনের ব্যাপারে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বহু হাদিসে তার আগমনের সুসংবাদ এসেছে।
হজরত আলি রাদি. থেকে ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ ও সহিহ আল- জামে গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
المهدي منا آل البيت، يصلحه الله في ليلة
'মাহদি আমার বংশ থেকে হবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে একরাতে খিলাফতের যোগ্য বানাবেন।'
এ হাদিসে يصلحه الله في ليلة 'আল্লাহ তাকে একরাতে খিলাফতের যোগ্য বানাবেন' এর মর্ম হলো ইমাম মাহদি তাওবা করবেন। সংশোধিত হবেন। আল্লাহ তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। ফলে তখন তিনি খিলাফতের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হবেন।
হজরত আবু সাইদ খুদরি রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
المهدي مني أي: من آل البيت- أجلى الجبهة أي: واسع الجبهة، منحسر الشعر أقنى الأنف أي: حাদ الأنف، ليس بأفطس ولا معوج مع دقة أرنبته- يملأ الأرض قسطاً وعدلاً كما ملئت ظلما وجوراً، يملك سبع سنين
'মাহদি আমার বংশধর। তিনি উজ্জ্বল ও প্রশস্ত ললাটের ও সুউচ্চ নাসিকাবিশিষ্ট হবেন। তার দ্বারা গোটা দুনিয়ায় ইনসাফ কায়েম হবে। যেমনিভাবে ইতঃপূর্বে পুরো দুনিয়ায় অন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তিনি সাত বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন।'
মুসতাদরাকে হাকেমে হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদি. থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
يخرج في آخر أمتي المهدي يسقيه الله الغيث، وتخرج الأرض نباتها، ويعطي المال صحاحاً، قال رجل: وما صحاحاً يا رسول الله؟ قال: أن يعطيه بين الناس بالسوية، وتكثر الماشية، وتعظم الأمة، ويعيش سبعاً أو ثمانياً
'আখেরি জমানায় আমার উম্মতের ভেতর মাহদির আগমন ঘটবে। তার শাসনকালে আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। জমিন প্রচুর ফসল উৎপন্ন করবে। তিনি মানুষের মাঝে সমানভাবে সেগুলো বণ্টন করবেন। গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। উম্মতে মুহাম্মদির সম্মান বৃদ্ধি পাবে। তিনি সাত বছর কিংবা আট বছর জীবিত থাকবেন।'
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদি. থেকে মুসনাদে আহমদ ও নাসায়িতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لن تهلك أمة أنا في أولها وعيسى بن مريم في آخرها، والمهدي في وسطها
'আমার উম্মত কখনোই ধ্বংস হবে না। কেননা এর শুরুতে রয়েছি আমি, শেষে রয়েছেন ইসা ইবনে মারইয়াম এবং মাঝে রয়েছেন মাহদি।'
হজরত উম্মে সালামা রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: المهدي من عترتي من ولد فاطمة
'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মাহদি আমার বংশে ফাতেমার সূত্র ধরে আগমন করবে।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لو لم يبق من الدنيا إلا يوم لطول الله ذلك اليوم حتى يبعث فيه رجلاً مني أو من أهلي يواطئ اسمه اسمي، واسم أبيه اسم أبي
'যদি দুনিয়ার মাত্র একটি দিনও বাকি থাকে আল্লাহ তায়ালা সেই দিনটিকেই দীর্ঘায়িত করবেন যতক্ষণ না তিনি আমার পরিবার থেকে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন। আমার নামেই তার নাম, তার পিতার নাম আমার পিতার নামেই থাকবে।'
عن عمرو بن شعيب عن أبيه عن جده قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم في ذي القعدة تجاذب القبائل وتغادر فينهب الحاج فتكون ملحمة بمنى يكثر فيها القتلى ويسيل فيها الدماء حتى تسيل دماؤهم على عقبة الجمرة وحتى يهرب صاحبهم فيأتي بين الركن والمقام فيبايع وهو كاره يقال له إن أبيت ضربنا عنقك يبايعه مثل عدة أهل بدر يرضى عنهم ساكن السماء وساكن الأرض
'হজরত আমর বিন শুআইব তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিলকদ মাসে বংশীয় গোত্রসমূহের মাঝে পারস্পরিক মতানৈক্য দেখা দেবে। প্রতিশ্রুতি ভেঙে দেওয়া হবে। ফলশ্রুতিতে হাজিদেরকে লুট করা হবে। মিনা প্রান্তরে যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তাতে প্রচুর পরিমাণে হত্যাযজ্ঞ হবে। রক্তের বন্যা বয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত আকাবাতুল জামরাতেও রক্ত বইতে থাকবে। পরিস্থিতি এই পর্যন্ত পৌঁছবে যে, তাদের সাথি [ইমাম মাহদি] পালিয়ে কাবা শরিফের রুকন এবং মাকামে ইবরাহিমের মাঝামাঝি স্থানে চলে আসবে। অতঃপর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তার হাতে সকলকে বাইআত করা হবে। তাকে বলা হবে, আপনি আমাদের বাইআত নিতে অস্বীকার করলে আমরা আপনার গর্দান উড়িয়ে দেব। অতঃপর বদর যুদ্ধের সংখ্যা পরিমাণ [৩১৩ জন] লোক বাইআত গ্রহণ করবে। তাদের প্রতি আসমান ও জমিনের বাসিন্দাগণ সকলেই খুশি থাকবে।'
হজরত আবু উমামাহ রাদি. থেকে বর্ণিত,
خطبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم وذكر الدجال فقال: فتنفي المدينة الخبث كما ينفي الكير خبث الحديد، ويدعى ذلك اليوم يوم الخلاص، قالت أم شريك : فأين العرب يا رسول الله يومئذ ؟ قال صلى الله عليه وسلم: هم يومئذ قليل، وجلهم ببيت المقدس، وإمامهم المهدي رجل صالح-، فبينما إمامهم المهدي تقدم ليصلي بهم الصبح إذ نزل عيسى بن مريم وقت الصبح، فيرجع ذلك الإمام ينكص يمشي القهقري ليتقدم عيسى، فيضع عيسى يده بين كتفيه ثم يقول له: تقدم فإنها لك أقيمت، فيصلي بهم إمامهم يعني: المهدي.
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল বিষয়ে আমাদেরকে বলেন, মদিনা তার ভেতরকার ময়লা দূরীভূত করে দেবে যেভাবে হাপর লোহার মরিচা দূর করে দেয়। সেদিনের নাম হবে নাজাত দিবস। অতঃপর উম্মু শারিক বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেদিন আরবের লোকজন কোথায় থাকবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেদিন তারা সংখ্যায় হবে খুব অল্প। তাদের অধিকাংশ মুমিন বান্দা সেদিন বাইতুল মুকাদ্দাসে অবস্থান করবে। তাদের ইমাম হলেন মাহদি। তিনি একজন সৎ ব্যক্তি। এমন অবস্থায় একদিন ইমাম মাহদি তাদের নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। তখন ঈসা ইবনে মারিয়াম সকাল বেলা আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। তাকে দেখে ইমাম মাহদি পেছনে সরে যাবেন যেন ঈসা আলাইহিস সালাম সামনে গিয়ে নামাজের ইমামতি করতে পারেন। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম তার হাত ইমাম মাহদির দুই কাঁধের ওপর রেখে বলবেন, আপনি সামনে যান এবং নামাজের ইমামতি করুন। কেননা, এই নামাজ আপনার জন্যই কায়েম হয়েছিল। অতঃপর তিনি তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করবেন।’
এ উম্মতের জন্য এটি বিরাট সম্মান ও গৌরবের যে, হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম ওই ব্যক্তির পেছনে নামাজ আদায় করবেন। একজন নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক উম্মতের পেছনে নামাজ আদায় করবেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مُلْكُ الْأَرْضِ أَرْبَعَةٌ مُؤْمِنَانِ وَكَافِرَانِ، فَالْمُؤْمِنَانِ: ذُو الْقَرْنَيْنِ وَسُلَيْمَانُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، وَالْكَافِرَانِ: النَّمْرُودُ وَبُخْتَنَصَّرُ، وَسَيَمْلِكُهَا خَامِسٌ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي
'চার জন ব্যক্তি সমগ্র পৃথিবীকে শাসন করেছে। দুইজন কাফের আর দুইজন মুমিন। মুমিন দুইজন হলো জুলকারনাইন ও সুলাইমান আলাইহিস সালাম। কাফের দুইজন হলো নমরুদ ও বুখতেনসর। আর অচিরেই পঞ্চমজন আমার বংশ থেকে আগমন করবে।'
ইমাম মাহদির আগমনের আরো একটি নিদর্শন:
মসজিদে নববি একটি সাদা প্রাসাদে পরিণত হবে। হজরত মিহজান ইবনে আদরা রাদি. থেকে বর্ণিত,
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ النَّاسَ فَقَالَ يَوْمَ الْخَلَاصِ وَمَا يَوْمُ الْخَلَاصِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ مَا يَوْمُ الْخَلَاصِ فَقَالَ يَجِيءُ الدَّجَّالُ فَيَصْعَدُ أُحُدًا فَيَطَّلِعُ فَيَنْظُرُ إلَى الْمَدِينَةِ فَيَقُولُ لِأَصْحَابِهِ أَلَا تَرَوْنَ إِلَى هَذَا الْقَصْرِ الْأَبْيَضِ هَذَا مَسْجِدُ أَحْمَدَ ثُمَّ يَأْتِي الْمَدِينَةَ فَيَجِدُ بِكُلِّ نَقْبِ مِنْ نِقَابِهَا مَلَكًا مُصْلِتًا فَيَأْتِي سَبْحَةَ الْجُرْفِ فَيَضْرِبُ رِوَاقَهُ ثُمَّ تَرْجُفُ الْمَدِينَةُ ثَلَاثَ رَجَفَاتٍ فَلَا يَبْقَى مُنَافِقٌ وَلَا مُنَافِقَةٌ وَلَا فَاسِقٌ وَلَا فَاسِقَةٌ إِلَّا خَرَجَ إِلَيْهِ فَتَخَلَّصَ الْمَدِينَةُ وَذَلِكَ يَوْمُ الْخَلَاصِ
'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন, মুক্তির দিন, মুক্তির দিন, মুক্তির দিন। একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! মুক্তির দিন কী? উত্তরে তিনি বললেন, দাজ্জাল আসবে। উহুদ পর্বতের ওপর আরোহণ করে মদিনার দিকে ইঙ্গিত করে তার সাথিদেরকে বলবে, তোমরা কী ওই সাদা প্রাসাদটি দেখতে পাচ্ছ? এটি হচ্ছে আহমদের মসজিদ। অতঃপর সে মদিনার দিকে আসতে থাকলে মদিনায় প্রবেশ করার প্রতিটি রাস্তায় ধারালো তরবারি নিয়ে দাঁড়ানো ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। ফলে সে সাবখাতুল জারফ নামক স্থানে স্বীয় ঘাটিতে ফিরে এসে সর্বশক্তি দিয়ে ভূমিতে আঘাত করবে। ফলে মদিনাতে বড়ো ধরনের তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হবে। জান-প্রাণের ভয়ে সকল ফাসেক-মুনাফেক নারী-পুরুষ মদিনা থেকে বের হয়ে দাজ্জালের সাথে চলে যাবে। এভাবেই মদিনা সকল প্রকার পাপিষ্ঠকে দূরে নিক্ষেপ করে পূত-পবিত্র হয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে মুক্তির দিন।'
আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, আজ মসজিদে নববি দেখতে কেমন? তা কি হাদিসে বর্ণিত অবয়বের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে না? এ প্রশ্নের উত্তর আপনারা নিজেরাই খুঁজে নিন। আর উপলব্ধি করতে থাকুন, কতটা ঘনিয়ে এসেছে ইমাম মাহদির আগমন।
টিকাঃ
৫. ইবনে মাজাহ: ৪০৮৫।
৬. আবু দাউদ: ৪২৮৬।
৭. মুসতাদরাকে হাকেম: ৭১১।
৮. আবু দাউদ: ৩৬০৩।
৯. তিরমিজি: ২২৩২।
১০. মুসতাদরাক হাকেম: ৮৫৩৭।
১১. সুনানে ইবনে মাজাহ: ২/৫১২।
১২. তারিখে ইবনুল জাওযি।
২১. মুসলিম, কিতাবুল ফিতান।
২২. মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৬৩১; কানযুল উম্মাল: ৩৮৮৩৩; মুসনাদে আহমদ: ১৮৯৭৫।
📄 সালাফদের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে
ইমাম মাহদির আগমন এবং তার খিলাফতের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের যেসব বক্তব্য রয়েছে তা সত্য। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'যেসব হাদিসে মাহদির আগমনের কথা বর্ণিত হয়েছে সেগুলো সহিহ হাদিস। শাইখুল ইসলাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রহ. বলেন, 'দলিল-প্রমাণের আলোকে এ কথাই প্রমাণিত যে, মাহদি হবেন হজরত হাসান রাদি.-এর বংশধর। যেমনটি আবু দাউদ ও অন্যান্য গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।'
প্রখ্যাত মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে কাসির রহ. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেছেন, মাহদি হলেন খুলাফায়ে রাশেদা এবং পথিকৃত ইমামদের মধ্য থেকে একজন। তিনি রাফেজিদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। ভূগর্ভস্থ থেকে বের হবেন না। প্রচলিত এসব কথাবার্তার কোনো ভিত্তি নেই।'
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, 'মুসলমানরা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের অপেক্ষা করছে। তিনি এসে ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্য থেকে যারা তার শত্রু তাদেরকে হত্যা করবেন। এবং মুসলমানরা মাহদির আগমনের অপেক্ষা করছে যিনি আহলে বাইতের মধ্য থেকে হবেন। পৃথিবীতে ন্যায় ও ইনসাফের শাসন কায়েম করবেন।
ইমাম মাহদির আলোচনা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কিতাবসমূহেও বর্ণিত হয়েছে। কাব আল-আহবার বলেন, 'আমি পূর্ববর্তী নবীদের কিতাবসমূহে মাহদির আগমনের সংবাদ পেয়েছি। তার রাজত্বে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। কোনো প্রকার জুলুম থাকবে না।'
ইহুদিদের এক কিতাবে তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, 'যখন পৃথিবীতে তোমাদের সন্তান-সন্ততি অধিক হবে, তোমাদের ক্ষমতা ও রাজত্ব চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে, পার্থিব ঐশ্বর্যে যখন তোমরা শীর্ষে উন্নীত হবে, যখন তোমরা তোমাদের রবের অবাধ্যতা ও নাফরমানির চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করবে, আমি এই আসমান ও জমিনকে সাক্ষী রেখে বলছি, তখনই তোমাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসবে। তোমাদের পতন হবে এক প্রতীক্ষিত যুবকের হাতে।'
আল্লাহু আকবার! কে সেই প্রতীক্ষিত যুবক যার হাতে পতন ঘটবে অভিশপ্ত ইহুদিদের? পৃথিবীর সকল অন্যায় অপরাধের মূলোৎপাটন করে কোন প্রতিশ্রুত যুবক প্রতিষ্ঠা করবে ইনসাফের রাজ? তিনি মাহদি-যার বরকতময় আগমন হবে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ থেকে। পৃথিবীবাসী অধীর প্রতীক্ষায় থাকবে তার আগমনের। ইহুদিদের জুলুম ও নিপীড়নে পৃথিবী তখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। ইহুদিদের কিতাবে বর্ণিত উল্লিখিত বক্তব্যের সাথে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এই আয়াত মিলিয়ে নাও। দেখো কত চমৎকার সামঞ্জস্য।
وَقَضَيْنَا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ فِي الْكِتَابِ لَتُفْسِدُنَّ فِي الْأَرْضِ مَرَّتَيْنِ وَلَتَعْلُنَّ عُلُوًّا كَبِيرًا * فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ أُولاهُمَا بَعَثْنَا عَلَيْكُمْ عِبَادًا لَنَا أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ فَجَاسُوا خِلالَ الدِّيَارِ وَكَانَ وَعْدًا مَفْعُولًا * ثُمَّ رَدَدْنَا لَكُمُ الْكَرَّةَ عَلَيْهِمْ وَأَمْدَدْنَاكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَجَعَلْنَاكُمْ أَكْثَرَ نَفِيرًا * إِنْ أَحْسَنتُمْ أَحْسَنتُمْ لِأَنفُسِكُمْ وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الآخِرَةِ لِيَسُوءُوا وُجُوهَكُمْ وَلِيَدْخُلُوا الْمَسْجِدَ كَمَا دَخَلُوهُ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَلِيُتَبَّرُوا مَا عَلَوْا تَتْبِيرًا
'আমি বনি ইসরাইলের প্রতি কিতাবে ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, দুনিয়ায় তোমরা দু-বার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং বড়ো রকমের ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করবে। অতঃপর যখন ওই দুটির প্রথমটির প্রতিশ্রুতি এসেছিল তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার প্রচণ্ড শক্তিশালী বান্দাদের পাঠিয়েছিলাম। তারা ঘরবাড়ির ভেতর প্রবেশ করেছিল। এটি একটি কার্যকর প্রতিশ্রুতি ছিল। তারপর তাদের বিরুদ্ধে আবার তোমাদের পালা [ক্ষমতা] ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ধন-সম্পদ, পুত্রসন্তান দ্বারা তোমাদের সাহায্য করেছিলাম এবং তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করেছিলাম। তোমরা ভালো কাজ করলে নিজেদের জন্যই করবে। আর খারাপ কাজ করলে তাও নিজেদের জন্যই। তারপর যখন দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতির সময় এসেছিল তখন তাদেরকে পাঠিয়েছিলাম যাতে তারা তোমাদের মুখমণ্ডল বিকৃত করে। প্রথমবার যেভাবে মসজিদে প্রবেশ করেছিল সেভাবে মসজিদে প্রবেশ করে এবং যেখানেই চড়াও হয় সবকিছু তচনছ করে দেয়।
টিকাঃ
১৩. সুরা ইসরা: ৪-৭।
📄 মাহদি বলে নামকরণের কারণ
ইমাম মাহদির আগমনের ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সকলের অন্তরে প্রশ্ন হলো, তাহলে সর্বত্র তিনি মাহদি নামে পরিচিত কেন? মাহদি নামকরণের পেছনে প্রকৃত কারণ কী? এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের একাধিক বক্তব্য রয়েছে।
হজরত কাব আল-আহবার রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মাহদি নামকরণের কারণ হলো, তিনি পৃথিবীতে আগমন করে সকল মানবজাতিকে একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি হিদায়াত তথা পথপ্রদর্শন করবেন। তিনি এসে ইন্তাকিয়া শহর থেকে আসল তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাব বের করবেন।
আল্লামা ইবনুল আসির রহ. বলেন, 'মাহদি ওই ব্যক্তি যিনি মানবজাতিকে হকের দিকে হিদায়াত তথা পথপ্রদর্শন করবেন। তাই তাকে মাহদি বলা হয়।'
আল্লামা সুয়ুতি রহ. বলেন, 'তাকে মাহদি বলে নামকরণের কারণ হলো, আল্লাহ তায়ালা তাকে শামের একটি পাহাড়ের সন্ধান [হিদায়াত] দেবেন। তিনি সেখান থেকে ইহুদিদের আসল গ্রন্থ তাওরাত উদ্ধার করবেন।'
সুতরাং বোঝা গেল, মাহদি বলে নামকরণ করা হয়েছে মূলত তার কাজ ও কর্মপন্থার আলোকে। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য তাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং তাকে সঠিক পথের ওপর অটল ও অবিচল রেখেছেন। হকের ঝান্ডাবাহী একটি সৈন্যদল দিয়ে তাকে সাহায্য করবেন। তিনি পৃথিবী থেকে সকল প্রকার জুলুম-নিপীড়ন দূরীভূত করে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। কুফর শিরক দূর করে আল্লাহর একত্ববাদ সর্বত্র কায়েম করবেন। এ উম্মতকে তিনি সম্মান ও মর্যাদার আসনে ফের সমাসীন করবেন।
📄 ইমাম মাহদির গুণাবলি
ইমাম মাহদির গুণাবলি ও শারীরিক গঠন সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে বর্ণিত হাদিসের আলোকে জানা যায়,
المهدي فتى أجلى الجبهة أي واسع الجبهة، أقنى الأنف أي: طويل الأنف مع دقة أرنبته-، يملأ الأرض قسطاً وعدلاً كما ملئت ظلما وجوراً، يملك سبع سنين
'ইমাম মাহদি হবেন উজ্জ্বল ও প্রশস্ত কপালবিশিষ্ট। উঁচু ও সরু নাক হবে তার। পৃথিবীতে তিনি ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন, ইতঃপূর্বে যেমন জুলুম ও নিপীড়নে পূর্ণ ছিল। তিনি সাত বছর রাজত্ব করবেন।'
হজরত আবু জাফর ইবনে আলি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত আলি রাদি.-কে ইমাম মাহদির গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছেন, প্রতীক্ষিত মাহদি মাঝারি গড়নের এক সুদর্শন যুবক। তার চুল গর্দানে নেমে আসবে। তার মুখমণ্ডলে, চুলে, দাড়ি ও মাথায় নূর চমকাতে থাকবে।'
‘কিতাবুল মাসিহিদ দাজ্জাল ও আসরারুস সাআহ' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ইমাম মাহদি শারীরিক গঠনে হবেন মাঝারি গড়নের। অতিরিক্ত লম্বা এবং খাঁটো নয়। খুব বেশি চিকন ও মোটা নয়। তার কপাল হবে প্রশস্ত ও উজ্জ্বল। নাক হবে সরু ও খাড়া। চক্ষু হবে কালো, ডাগর ডাগর। উভয় উরু থাকবে পৃথক পৃথক, বেটে মানুষের মতো একটি অপরটির সাথে লেগে থাকবে না। আর তার বয়স হবে ত্রিশ থেকে চল্লিশের মাঝমাঝি। অত্যন্ত বিনয় ও নম্র প্রকৃতির হবেন।'
ইমাম মাহদির রাজত্ব ও খেলাফত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, হজরত সাওবান রাদি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يقتتل عند كنزكم ثلاثة كلهم ابن خليفة ثم لا يصير إلى واحد منهم، ثم تطلع رايات سود من قبل المشرق فيقتلونكم قتلاً لم يقتله قوم، قال: ثم نسيت ما قال، ثم قال: فإذا رأيتموه فبايعوه ولو حبواً على الثلج، فإنه المهدي
'তোমাদের খনিজ ভান্ডারের কাছে তিন ব্যক্তি [তিনটি বড়ো বাহিনী] যুদ্ধ করবে। তারা তিন জনই হবে শাসকের ছেলে। খনিজ ভান্ডার কারো নিকটই স্থানান্তরিত করা হবে না। এরপর পূর্বদিক থেকে কালো পতাকাবাহী লোকেরা আগমন করবে। তারা তোমাদের বিরুদ্ধে এত কঠোরভাবে যুদ্ধ করবে যে, এমন যুদ্ধ ইতঃপূর্বে কেউ করতে সক্ষম হয়নি। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী যেন বললেন, কিন্তু আমি তা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারিনি। অতঃপর বলেন, যখন তোমরা মাহদিকে দেখবে তখন তার হাতে বাইআত হয়ে যেয়ো। অর্থাৎ, তার বাহিনীতে তোমরা শামিল হয়ে যেয়ো। যদি এর জন্য তোমাদেরকে দূর-দূরান্ত এলাকা থেকে বরফের পাহাড়ের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আসতে হয় তাহলে তোমরা তাই করো।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. বলেন, উল্লিখিত হাদিসে যে ধন-ভান্ডারের কথা বলা হয়েছে তা হলো কাবাঘরের ধন-ভান্ডার। তিনজন শাসকের পুত্র তা দখল করার জন্য লড়াই করবে। কেউ তা দখল করতে পারবে না। সবশেষে আখেরি জমানায় পাশ্চাত্যর কোনো একটি দেশ থেকে ইমাম মাহদি আগমন করবেন। কতিপয় মূর্খ দাবি করে তিনি সামেরার গর্ত থেকে আত্মপ্রকাশ করবেন। তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। তারা এ ধরনের আরো বহু হাস্যকর কথার অবতরণ করেছে যার কোনো ভিত্তি নেই। তাদের দাবির পেছনে কোনো যুক্তি প্রমাণ নেই।
ইমাম ইবনে কাসির রহ. আরো বলেন, 'পূর্বাঞ্চলীয় মুসলমানরা ইমাম মাহদিকে সাহায্য করবে। পৃথিবীতে তারা ইমাম মাহদির শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের পতাকা হবে কালো। কেননা কালো সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পতাকা ছিল কালো। যার নাম ছিল ইকাব।'
টিকাঃ
১৪. সুনানে আবু দাউদ: ৪২৮২; কানযুল উম্মাল: ৩৮৬৭৬।
১৫. সুনানে নাসায়ি: ৪০৮৪; কানযুল উম্মাল: ৩৮৬৫৮।