📄 কুফ্র ও তার পরিণতি
কুফ্রের আভিধানিক অর্থ- আচ্ছাদান করা ও গোপন করা। আর শারীয়াতের পরিভাষায় ঈমানের বিপরীত বিষয়কে যা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে বাধা দেয় তাকে কুফর বলে। কুফর দু'প্রকার।
১. বড় কুফ্র যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। অর্থাৎ সে মুসলিম থাকে না এবং সমস্ত 'আমলকে নষ্ট করে দেয় আর চিরস্থায়ী জাহান্নাম ভোগ করতে হবে।
২. ছোট কুফ্র যা ইসলাম থেকে মানুষকে বের করে দেয় না ও 'আমলকে নষ্ট করে দেয় না, তবে 'আমালে সাওয়াবের ঘাটতি হবে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।
মহান আল্লাহ তা'আলা কুফ্রীর পরিণতি সম্পর্কে বলেন, وَأَعْتَدْنَا لِلْكُفِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴾ “আর আমি কাফিরদের জন অপমানজনক শাস্তি তৈরি করে রেখেছি।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৫১)
وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخُسِرِينَ ﴾
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে কুফরী করে তার 'আমাল বাতিল হয়ে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৫)
وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴾
“যারা কাফির এবং আমার আয়াতকে মিথ্যা বলে তারা জাহান্নামী।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ১০)
📄 মুনাফিক্বের পরিচয় ও তার শেষ পরিণতি
যার ভিতরের অবস্থা বাহ্যিক প্রকাশ্যের বিপরীত তাকে নিফাক্ব বলে। যার মধ্যে নিফাক্ব রয়েছে সে মুনাফিক্ব। মুনাফিকের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ ﴾
“তারা যখন ঈমানদার লোকেদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু যখন নির্জনে তারা তাদের শাইতানদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলে, আসলে আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি, আর আমরা তাদের সাথে ঠাট্টাই করি মাত্র।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২: ১৪)
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُوْلِ رَأَيْتَ الْمُنْفِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا ﴾
“তাদেরকে যখন বলা হয় যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সেই দিকে এবং রসূলের দিকে আসো। তখন মুনাফিক্বদের দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার নিকট আসতে ইতস্তত করছে ও পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৬১)
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ جَٰهِدِ ٱلْكُفَّارَ وَٱلْمُنَٰفِقِينَ وَٱغْلُظْ عَلَيْهِمْ ۚ وَمَأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ ٱلْمَصِيرُ﴾
“হে নাবী! কাফির ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের সম্পর্কে কঠোর নীতি অবলম্বন করুন। আর তাদের পরিণতি হচ্ছে জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্থান।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৭৩)
﴿إِنَّ ٱلْمُنَٰفِقِينَ فِى ٱلدَّرْكِ ٱلْأَسْفَلِ مِنَ ٱلنَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَّصِيرًا﴾
“নিশ্চয় মুনাফিক্বরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করবে। আর আপনি তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবেন না।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৪৫)
﴿وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلْمُنَٰفِقِينَ وَٱلْمُنَٰفِقَٰتِ وَٱلْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَٰلِدِينَ فِيهَا ۚ هِىَ حَسْبُهُمْ ۚ وَلَعَنَهُمُ ٱللَّهُ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ﴾
“মুনাফিক্ব পুরুষ ও নারী এবং কাফিরদের জন্য আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের আগুনের ওয়াদা করেছেন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে, ওটাই তাদের উপযুক্ত। তাদের ওপর আল্লাহর লা'নাত এবং তাদের জন্য চিরস্থায়ী 'আযাব রয়েছে।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৬৮)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِّنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ.
'আবদুল্লাহ বিন 'আম্র (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে খাটি মুনাফিক্ব। আর যার মধ্যে উক্ত স্বভাবগুলোর কোন একটি থাকে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিক্বীর একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. তার কাছে কোন আমানত রাখলে সে তার খিয়ানত করে। ২. সে কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। ৪. ঝগড়া করলে গাল-মন্দ করে।
(বুখারী- হাঃ ৩৪, মুসলিম- হাঃ ১০৬-[৫৮])
📄 গর্ব অহংকারের মাধ্যমে শির্ক
মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ﴾ “আর ভূ-পৃষ্ঠের উপর গর্বভরে চলো না, আল্লাহ কোন আত্ম অহংকারী দাম্ভীক লোককে ভালোবাসেন না।” (সূরাহ্ লুক্বমান ৩১ : ১৮)
إِنَّا كَذلِكَ نَفْعَلُ بِالْمُجْرِمِينَ إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ
“আমি অপরাধী লোকেদের সাথে এরূপই ব্যবহার করে থাকি, তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তখন তারা অহংকারে ফেটে পড়ে।” (সূরাহ্ আস্ স-ফফা-ত ৩৭ : ৩৪-৩৫)
فَادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا فَلَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِرِينَ )
“এখন যাও জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ করো। সেখানেই তোমাদের চিরদিন অবস্থান করতে হবে, বস্তুতঃ ওটা হচ্ছে অহংকারীদের নিকৃষ্ট স্থান।” (সূরাহ্ আন্ নাহ্ন ১৬ : ২৯)
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ مِّنْ كِبْرٍ قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً، قَالَ: إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ.
'আবদুল্লাহ বিন মাস্'উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি (সাঃ) বলেছেন: যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এক ব্যক্তি বলল, কোন ব্যক্তি যদি পোষাক ও জুতা উত্তম হওয়া পছন্দ করে? তিনি (সাঃ) বললেন, অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হলো হাক্ব বা সত্য হতে বেপরোয়া হওয়া এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। (মুসলিম- হাঃ ১৪৭-[৯১], মিশকাত- হাঃ ৫১০৮)
عَنْ حَارِثَةَ ابْنِ وَهْبٍ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَاظُ وَلَا الْجَعْظَرِي.
হারিসাহ্ বিন ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, অহংকারী ও অহংকারের মিথ্যা ভানকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (আবূ দাউদ- হাঃ ৪৮০১, মিশকাত- হাঃ ৫০৮০ : সহীহ)
عَنْ حَارِثَةَ عَنِ النَّبِيِّ اللهِ ﷺ قَالَ : أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ؟ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَاعِفٍ، لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللهِ لَأَبَرَهُ أَلا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ كُلُّ عُتُلٍ جَوَاظٌ مُسْتَكْبِرٍ.
হারিসাহ্ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসীদের সংবাদ দিবো না? প্রত্যেক বদমেজাজী, দাম্ভিক, অহংকারী ব্যক্তিরা জাহান্নামী। (বুখারী- হাঃ ৬০৭১, মুসলিম- হাঃ ৪৬-[২৮৫৩])
📄 মুশরিকদের জন্য দু‘আ করাও নাজায়িয
শিক এমনই মারাত্মক গুনাহ যে, শিককারীর জন্য আল্লাহর নিকট দু'আও করা যাবে না। যেমন স্বয়ং রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পিতা-মাতার জন্য দু'আ করার অনুমতি পাননি। বরং মহান আল্লাহ স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন তাদের জন্য দু'আ করা যাবে না।
মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴾
“নাবী ও যারা ঈমান এনেছে তাদের উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য দু'আ করবে। যদিও তারা তাদের নিকটাত্মীয় হয়, এ কথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১১৩)