📄 ছোট শির্ক আবার দুই প্রকার– তার ব্যাখ্যা
ক) শিক্ জাহির বা প্রকাশ্য শিক্, খ) শিক্ খফী বা গোপনীয় শিক্।
ক) শিক্ জহির বা প্রকাশ্য শিক্ : শিক্ জহির বা প্রকাশ্য শির্ক এটি দু' দিক হয়ে থাকে। এক. কথা-বার্তার মাধ্যমে। দুই. কাজ-কর্মের মাধ্যমে। এক. কথাবার্তার দ্বারা শিরকের দৃষ্টান্ত এ রকম। গায়রুল্লাহর নামে কুসম বা শপথ করা। যেমন- রসূল বলেন: مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ وَأَشْرَكَ.
যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কুসম বা শপথ করল সে ব্যক্তি কুফরী অথবা শির্কী করল। (মুসনাদ আহমাদ- হাঃ ৬০৭২; আলবানী'র সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্- হাঃ ২০৪২)
আল্লাহ তা'আলা যা চান এবং আপনি যা চান এ ধরনের উক্তিও প্রকাশ্য করা। যেমন- উদ্ধৃত হয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রসূল-কে বললেন যে, مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ ؟ فَقَالَ : جَعَلْتَنِي لِلَّهِ عَدْلًا، بَلْ مَا شَاءَ اللهُ وَحْدَهُ.
আল্লাহ তা'আলা যা চান এবং আপনি যা চান। রসূলুল্লাহ তাকে বললেন : তুমি কি আল্লাহ তা'আলার সাথে আমাকে শরীক করতে চাও। তুমি এভাবে বলো যে, আল্লাহ তা'আলা এককভাবে যা চান। (মুসনাদ আহমাদ- হাঃ ২৫৬১, সানাদ হাসান; আলবানী'র সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্- হাঃ ১০৯৩)
যদি আল্লাহ তা'আলা এবং অমুক না থাকত- এটিও প্রকাশ্য শির্কের পর্যায়ভুক্ত। এ কথাগুলো বিশুদ্ধভাবে এ নিয়মে বলা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান তারপর অমুক যা চান এভাবে বলা।
দুই. কাজকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ্য শির্কের উদাহরণ হলো, কানের দুল জাতীয় অলংকার এবং তাগা ইত্যাদি বিপদ-আপদকে ধ্বংস ও দূর করার
নিয়্যাতে পরিধান করা। এমনভাবে বদ নজর ইত্যাদি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাবিজ ব্যবহার করা।
সুতরাং ঐ বস্তুগুলোকে যখন কোন ব্যক্তি এ ‘আক্বিদাহ্ রেখে ব্যবহার করবে যে, এগুলো হলো বিপদ-আপদ দূর করার মাধ্যম। তখনই তা ছোট শির্কের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা উল্লেখিত জিনিসকে বিপদ-আপদ দূর করার মাধ্যম হিসেবে সৃষ্টি করেননি।
আর যদি উল্লেখিত জিনিসগুলো এ ‘আক্বীদাহ্ রেখে ব্যবহার করে যে, এগুলো স্বয়ং বালা-মুসীবাত দূর করতে এবং ধ্বংস করতে সক্ষম। তখন তা হবে বড় শিক। কেননা এ অবস্থাতে গায়রুল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং নৈকট্যতা রাখা প্রমাণিত হয়।
খ) শিক্ক খফী বা গোপনীয় শিক্ক :
ছোট শিরকের দ্বিতীয় প্রকার হলো গোপনীয় শিক্ক। এ শিক্ক সাধারণতঃ মানুষের ইচ্ছা-ইরাদা এবং নিয়্যাতের মধ্যে হয়ে থাকে। যেমন- অন্তরের মধ্যে লোক দেখানো বা শুনানোর খেয়াল থাকা। দৃষ্টান্তস্বরূপ যে নেক ‘আমালগুলোর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভ করতে পারে, ঐ সকল কাজ মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা ও বাহবা পাওয়ার জন্য করা। যেমন- মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশেই উত্তমরূপে সলাত আদায় করা। অথবা মানুষকে শুনানোর উদ্দেশে স্বশব্দে যিক্র করা এবং মধুর কণ্ঠে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা। যাতে লোকজন তার প্রসংশা ও গুণকীর্তন করে। এরূপ করা শিক।
মহান আল্লাহ বলেন :
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ﴿
“বলো, আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ, আমার নিকট ওয়াহী করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল এক ইলাহ। কাজেই যে ব্যক্তি তার
রবের সঙ্গে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎ নেক করে আর তার রবের 'ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।” (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮: ১১০)
রসূলুল্লাহ বলেন:
إِنْ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ الرَّيَاءُ.
তোমাদের ওপর আমার ভয়কৃত বস্তুসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো ছোট শির্ক। সহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন : হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কি? রসূলুল্লাহ জবাব দিলেন : রিয়া বা লোক দেখানো। (মুসনাদে আহমাদ- হাঃ ২৩৬৩০ : হাসান)
আর পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশে নেক কাজ করাও গোপন শির্কের পর্যায়ভুক্ত। যেমন- কোন ব্যক্তি হাজ্জ করল, আযান দিলো বা ইমামাতি করল অর্থ উপার্জনের অভিপ্রায়ে। অথবা শারী'আতের 'ইল্যু শিক্ষা দিলো সম্পদ লাভের উদ্দেশে। যেমন-
রসূলুল্লাহ এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন :
تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَعَبْدُ الدِّرْهَمِ، وَعَبْدُ الخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ.
ধ্বংস দীনার-দিরহামের, অর্থাৎ- অর্থ-কড়ির লোভী। ধ্বংস হোক কারুকার্য খচিত চাদরের অভিলাষী। ধ্বংস হোক লেপ-তোষকের পূজারী। যদি তাকে অর্থ সম্পদ দেয়া হয় তবে সন্তুষ্ট হয় আর যদি না দেয়া হয় তবে বিক্ষুব্ধ হয়। (সহীহুল বুখারী- হাঃ ২৮৮৭)
ইমাম ইবনুল কাইয়ূম বলেন যে, মানুষের ইচ্ছা অভিপ্রায় এবং নিয়্যাতের মধ্যে যে শির্ক হয়ে থাকে তা কূল-কিনারা বিহীন মহা সমুদ্রতুল্য। এ হতে অতি অল্প সংখ্যক ভাগ্যবানই নিস্কৃতি লাভ করতে পেরেছে। মোটকথা যে ব্যক্তি স্বীয় নেক 'আমালের বিনিময়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত দুনিয়াবী কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করে এবং মহান
আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা ও তার কাছ থেকে প্রতিদান চাওয়া ব্যতীত অন্য কোন বস্তু কামনা করে, সে ব্যক্তি নিয়্যাত ও ইরাদার মধ্যে শির্ক করল।
বড় শির্ক ও ছোট শিরকের মধ্যে পার্থক্য: উপরে বর্ণিত বিষয়বস্তুর আলোকে শিকে আকবার (বড় শিক্) ও শিকে আসগার (ছোট শিক্)-এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য বোধগম্য হয়। পার্থক্যগুলো এই-
(১) বড় শির্কের দ্বারা মানুষ ইসলাম হতে বের হয়ে যায়। কিন্তু ছোট শিরকের দ্বারা দ্বীন হতে বের হয় না।
(২) বড় শির্ক তার কর্তাকে চিরদিনের জন্য জাহান্নামের অধিবাসী করে দেবে। পক্ষান্তরে ছোট শিক্ তার কর্তাকে চিরদিনের জন্য জাহান্নামের অধিবাসী করবে না। যদিও ঐ ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
(৩) বড় শিক্ সমস্ত নেক কাজের মূলোৎপাটন তথা ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ছোট শির্ক সমস্ত নেক 'আমালকে ধ্বংস করে না। বরং তা শুধু রিয়াকারী এবং পার্থিব স্বার্থ সিদ্ধির নিমিত্তে কৃত 'আমালসমূহকে এবং 'আমালগুলোর সাথে উক্ত দু' জিনিস মিশ্রিত হয়েছে এগুলোকে বিনষ্ট করে দেয়।
(৪) বড় শিক্ করার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জান ও মালের নিরাপত্তা খতম হয়ে যায়। কিন্তু ছোট শিক্ করলে জান ও মালের নিরাপত্তা লুপ্ত হয় না।
অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! আসুন জীবনের সকল বিভাগ থেকে সকল প্রকার শিককে পরিহার করে এবং আল্লাহর সাথে পবিত্র অবস্থায় মুলাকাত করার জন্য তৈরি হয়ে যাই।
📄 শির্ক করলে শেষ পরিণতি যা হয়
যারা আল্লাহর সাথে শিক্ করে সেসব মুশরিকদের পরিণতির কয়েকটি অবস্থা :
১. মহান আল্লাহ মুশরিকদের ক্ষমা করবেন না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا
“নিশ্চয় আল্লাহ যে তার সাথে শরীক করবে তাকে ক্ষমা করবেন না। এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শারীক করে সে সুদূর পথভ্রষ্টে পতিত হয়।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১১৬)
إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ যে তার সাথে শারীক করে তাকে ক্ষমা করবেন না। এছাড়া যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শারীক করল সে যেন বড় অপবাদ আরোপ করল।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৪৮)
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَا مِنْ نَّفْسٍ تَمُوْتُ لَا تُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا إِلَّا حَلَّتْ لَهَا الْمَغْفِرَةُ إِنْ شَاءَ اللهُ عَذَّبَهَا، وَإِنْ شَاءَ اللهُ غَفَرَ لَهَا.
জাবির বিন 'আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যে কোন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শির্ক করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করবে তার জন্য ক্ষমা বৈধ। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন আর ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিবেন। (ইবনু কাসীর- ১ম খণ্ড, ৬৭৮ পৃঃ)
عَنْ جَابِرٍ؛ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: «لَا تَزَالُ الْمَغْفِرَةُ عَلَى الْعَبْدِ مَا لَمْ يَقَعِ الْحِجَابُ». قِيلَ : يَا نَبِيَّ اللهِ، وَمَا الْحِجَابُ؟ قَالَ: «الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ».
জাবির বিন আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী (সঃ) বলেছেন, বান্দার জন্য সর্বদাই ক্ষমা রয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত হিজাব বা পর্দা পতিত না
হয়। বলা হলো, হে আল্লাহর নাবী! হিজাব বা পর্দা কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শির্ক করা। (মুসনাদে আবু ইয়া'লা, ইবনু কাসীর ১ম খণ্ড ৬৭৮ পৃষ্ঠা)
২. মুশরিকদের জন্য জান্নাত হারাম : إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ﴾
“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শারীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নামা। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৭২)
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ : مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ. সহারা- 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম
জাবির কাবিয়াল্লা মাহতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শির্ক করার অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে জাহান্নামে যাবে। (বুখারী- হাঃ ১২৩৮, মুসলিম- ১৫০-[৯২], মিশকাত- হাঃ ৩৮)
৩. মুশরিকদের সকল 'আমল বাতিল : আল্লাহ তা'আলা বলেন, أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ) وَلَوْ
“যদি তারা শির্ক করত তাহলে তাদের 'আমল বাতিল হয়ে যেত।” (সূরাহ্ আল আন'আম ৬ : ৮৮)
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ )
“আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওয়াহী করা হয়েছে, যদি আপনি আল্লাহর সাথে শারীক করেন তাহলে আপনার 'আমল বাতিল হয়ে যাবে। আর আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ৬৫)
وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا ﴾ “আমি তাদের 'আমালের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপ করে দিব।” (সূরাহ্ আল ফুরক্বান ২৫: ২৩)
৪. মুশরিকদের পৃথিবীতে থাকার অধিকার নেই : فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ ﴾ “অতএব মুশরিকদেরকে তোমরা যেখানে পাও হত্যা করো, তাদেরকে বন্দি করো এবং আটক করো। আর প্রত্যেক ঘাটিতে তাদের সন্ধানে ওত পেতে বসে থাকো।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৫)
📄 কুফ্র ও তার পরিণতি
কুফ্রের আভিধানিক অর্থ- আচ্ছাদান করা ও গোপন করা। আর শারীয়াতের পরিভাষায় ঈমানের বিপরীত বিষয়কে যা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে বাধা দেয় তাকে কুফর বলে। কুফর দু'প্রকার।
১. বড় কুফ্র যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। অর্থাৎ সে মুসলিম থাকে না এবং সমস্ত 'আমলকে নষ্ট করে দেয় আর চিরস্থায়ী জাহান্নাম ভোগ করতে হবে।
২. ছোট কুফ্র যা ইসলাম থেকে মানুষকে বের করে দেয় না ও 'আমলকে নষ্ট করে দেয় না, তবে 'আমালে সাওয়াবের ঘাটতি হবে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।
মহান আল্লাহ তা'আলা কুফ্রীর পরিণতি সম্পর্কে বলেন, وَأَعْتَدْنَا لِلْكُفِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴾ “আর আমি কাফিরদের জন অপমানজনক শাস্তি তৈরি করে রেখেছি।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৫১)
وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخُسِرِينَ ﴾
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে কুফরী করে তার 'আমাল বাতিল হয়ে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৫)
وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴾
“যারা কাফির এবং আমার আয়াতকে মিথ্যা বলে তারা জাহান্নামী।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ১০)
📄 মুনাফিক্বের পরিচয় ও তার শেষ পরিণতি
যার ভিতরের অবস্থা বাহ্যিক প্রকাশ্যের বিপরীত তাকে নিফাক্ব বলে। যার মধ্যে নিফাক্ব রয়েছে সে মুনাফিক্ব। মুনাফিকের পরিচয় সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ ﴾
“তারা যখন ঈমানদার লোকেদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু যখন নির্জনে তারা তাদের শাইতানদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলে, আসলে আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি, আর আমরা তাদের সাথে ঠাট্টাই করি মাত্র।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২: ১৪)
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُوْلِ رَأَيْتَ الْمُنْفِقِينَ يَصُدُّونَ عَنْكَ صُدُودًا ﴾
“তাদেরকে যখন বলা হয় যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সেই দিকে এবং রসূলের দিকে আসো। তখন মুনাফিক্বদের দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার নিকট আসতে ইতস্তত করছে ও পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৬১)
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ جَٰهِدِ ٱلْكُفَّارَ وَٱلْمُنَٰفِقِينَ وَٱغْلُظْ عَلَيْهِمْ ۚ وَمَأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ ٱلْمَصِيرُ﴾
“হে নাবী! কাফির ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের সম্পর্কে কঠোর নীতি অবলম্বন করুন। আর তাদের পরিণতি হচ্ছে জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্থান।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৭৩)
﴿إِنَّ ٱلْمُنَٰفِقِينَ فِى ٱلدَّرْكِ ٱلْأَسْفَلِ مِنَ ٱلنَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَّصِيرًا﴾
“নিশ্চয় মুনাফিক্বরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করবে। আর আপনি তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবেন না।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৪৫)
﴿وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلْمُنَٰفِقِينَ وَٱلْمُنَٰفِقَٰتِ وَٱلْكُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خَٰلِدِينَ فِيهَا ۚ هِىَ حَسْبُهُمْ ۚ وَلَعَنَهُمُ ٱللَّهُ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّقِيمٌ﴾
“মুনাফিক্ব পুরুষ ও নারী এবং কাফিরদের জন্য আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের আগুনের ওয়াদা করেছেন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে, ওটাই তাদের উপযুক্ত। তাদের ওপর আল্লাহর লা'নাত এবং তাদের জন্য চিরস্থায়ী 'আযাব রয়েছে।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৬৮)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِّنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ.
'আবদুল্লাহ বিন 'আম্র (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে খাটি মুনাফিক্ব। আর যার মধ্যে উক্ত স্বভাবগুলোর কোন একটি থাকে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিক্বীর একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. তার কাছে কোন আমানত রাখলে সে তার খিয়ানত করে। ২. সে কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। ৪. ঝগড়া করলে গাল-মন্দ করে।
(বুখারী- হাঃ ৩৪, মুসলিম- হাঃ ১০৬-[৫৮])