📄 যেভাবে শির্কের উৎপত্তি
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴾
“তারা বলছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ওয়াদ, সুওয়া'আ, ইয়াগূস, ইয়া'ঊকু এবং নাস্ত্র-কে পরিত্যাগ করো না।” (সূরাহ্ নূহ ৭১ : ২৩)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، صَارَتِ الْأَوْثَانُ الَّتِي كَانَتْ فِي قَوْمِ نُوحٍ فِي العَرَبِ بَعْدُ أَمَّا وَدُّ كَانَتْ لِكَلْبِ بِدَوْمَةِ الجَنْدَلِ، وَأَمَّا سُوَاعٌ كَانَتْ لِهُذَيْلٍ، وَأَمَّا يَغُوتُ فَكَانَتْ لِمُرَادٍ، ثُمَّ لِبَنِي غُطَيْفٍ بِالْجَوْفِ عِنْدَ سَبَةٍ، وَأَمَّا يَعُوقَ فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ، وَأَمَّا نَسْرٌ فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ لِأُلِ ذِي الْكَلَاعِ، أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِينَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ، أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمُ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُونَ أَنْصَابًا وَسَمُّوهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، فَلَمْ تُعْبَدُ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُولَئِكَ وَتَنَسَّخَ العِلْمُ عُبِدَتْ.
'আবদুল্লাহ বিন 'আব্বাস রাযিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূহ আলাইহিস সালাম এর কওমে যেসব মূর্তির প্রচলন ছিল পরবর্তী সময়ে তা আরবদের মধ্যেও চালু হয়েছিল। ওয়াদ ছিল কাল্ব গোত্রের দেব-মূর্তি, দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে ছিল এর মন্দির। সুওয়া ছিল মক্কার নিকটবর্তী হুযায়ল গোত্রের মূর্তি। ইয়াগূস ছিল প্রথমে মুরাদ গোত্রের এবং পরে (মুরাদের শাখা গোত্রে) বানী গাতিফের দেবতা হিসেবে সাবা'র নিকটবর্তী জাওফ নামক আস্তানায় ছিল। ইয়া'উক ছিল হামদান গোত্রের দেবমূর্তি। আর নাস্ত্র ছিল যুলকালা' গোত্রের হিয়ার শাখার দেবমূর্তি। নাস্ত্র নূহ আলাইহিস সালাম এর কাওমের কিছু সৎ লোকের নামও ছিল। এ লোকগুলো মারা গেলে তারা যেখানে বসে মজলিস করত, শয়তান সেখানে কিছু মূর্তি তৈরি করে স্থাপন করতে তাদের কাওমের লোকের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। তাই তারা সেখানে কিছু মূর্তি তৈরি করে এবং তাদের নামে সে মূর্তির নাম রেখে স্থাপন করে। কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। পরে ঐ লোকগুলো মৃত্যুবরণ করলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকার জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে। (বুখারী- হাঃ ৪৯২০; তাফসীর ইবনু কাসীর ৪র্থ খণ্ড, ৫৪৮ পৃষ্ঠা)
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: لَمَّا اشْتَكَى النَّبِيُّ ﷺ ذَكَرَتْ بَعْضُ نِسَائِهِ كَنِيسَةً رَأَيْنَهَا بِأَرْضِ الْحَبَشَةِ يُقَالُ لَهَا: مَارِيَةٌ، وَكَانَتْ أُمُّ سَلَمَةَ، وَأُمُّ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَدْ أَتَنَا أَرْضَ الْحَبَشَةِ، فَذَكَرَنَا مِنْ حُسْنِهَا وَتَصَاوِيرَ فِيهَا، فَرَفَعَ رَأْسَهُ، فَقَالَ: أُولَئِكَ إِذَا مَاتَ مِنْهُمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، ثُمَّ صَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّورَةَ أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
'আয়িশাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নাবী আলাইহিস ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন তার কোন স্ত্রী হাবাসাহ্ দেশের একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। যাকে মারিয়াহ্ বলা হত। উম্মু সালামাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহা ও উম্মু হাবীবাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহা ইতিমধ্যে হাবাসাহ্ এলাকা হতে সফর করে এসেছেন, তারা ঐ গির্জার সৌন্দর্য এবং অনেকগুলো মূর্তির কথা উল্লেখ করলেন।
'আয়িশাহ্ াহ্ আনহা বললেন, অতঃপর তিনি (সালাম) বললেন, এরা ঐ সমস্ত লোক যখন তাদের মধ্যে কোন সৎ লোক বা সৎ বান্দা মারা যায় তখন তারা তার ক্বত্রের উপর মাসজিদ ('ইবাদাতখানা) বানিয়ে নেয় এবং তাতে এ ছবিগুলো তারা তৈরি করে। আল্লাহর নিকটে ক্বিয়ামাত দিবসে এরাই হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি। (বুখারী- হাঃ ১৩৪১, মুসলিম- হাঃ ১৬-[৫২৮)
وَفِي الصَّحِيحِ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ...... فِي قَوْلِ الله تَعَالَى .... وَنَسْرَا.... إِلَى قَوْمِهِمْ.
নূহ্ আলায়হিস-এর জাতিতে শিৰ্কের অনুপ্রবেশ। নূহ আলায়হিস-এর জাতি যে শিকে নিমজ্জিত ছিল তা হলো, সৎ ব্যক্তি ও তাঁদের রূহের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি। শাইত্বান সে জাতির নিকট বুজুর্গ ব্যক্তির আকৃতিতে আগমন করে এবং তার বুজুর্গী ও আল্লাহর নৈকট্যের দাবী করে বলে, যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক গড়বে তার জন্য আমি শাফা'আত করব।
অতএব শাইত্বান তাদেরকে সম্মানের এ পর্যায় থেকে নিয়ে যায় প্রতিকৃতি, মূর্তি, আস্তানাও দরগাহ পর্যন্ত। যেমন- আলোচ্য অংশে ইবনু 'আব্বাস এ শিক্ক পতিত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে বলেন: “তারা যখন ধ্বংস হয়ে যায়, শাইত্বান তাদের জাতির অন্তরে ইলহাম করে দেয় যে, তারা যেখানে অবস্থান করত সেখানে আস্তানা বা দরগাহ গড়ে তোলো এবং তাদের নামে নামকরণ করো। অতঃপর তারা তাই করল, তবে 'ইবাদাত শুরু হলো না। অতঃপর যখন তারা মারা গেল, জ্ঞান ও উঠিয়ে নেয়া হলো। তাদের 'ইবাদাত শুরু হয়ে গেল।”
وَقَالَ ابْنُ الْقَيمِ : قَالَ غَيْرِ وَاحِدٌ..... فَعْبُدُوهُمْ. : তারা যখন ঐ বুজুর্গ ব্যক্তিদের ছবি তৈরি করার ইচ্ছা করে তখন তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তারা ঐ সমস্ত ছবির পূজা করবে না কেননা তারা জ্ঞানী ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটল তখন ঐ ছবিগুলোর পূজা করা সৎ লোক ও বুজুর্গদের নৈকট্য অর্জনের ওয়াসীলা ও কারণ মনে করতে লাগল। শাইত্বান কখনো কখনো উক্ত ছবি প্রতিকৃতির নিকট এসে তার দর্শকদের বা উপস্থিত ব্যক্তিদের মনে এ ধরনের প্রভাব ফেলত যে এ
প্রতিকৃতি তো কথা বলতে পারে এবং তার কথাও শ্রবণ করতে পারে ও এ ধরনের বহু ধারণা তাদেরকে দিয়ে থাকে। যার ফলে তাদের অন্তর সৎ ব্যক্তিদের রূহ্রে প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। পরিশেষে শাইত্বান তাদেরকে বুজুর্গদের পূজার প্রতি আকৃষ্ট করে ফেলে।
বর্তমানে এ অবস্থা হলো ঐ লোকেদের যারা কবর-মাযারে গিয়ে নামাযের মতো করে বসে ও আল্লাহ তা'আলার 'ইবাদাতের সাথে তাদেরও 'ইবাদাত করে। তার এই 'আমালই আল্লাহর সাথে শির্ক করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
📄 শির্ক কি ও কেন
শিরকের পরিচয় : শির্ক হচ্ছে আল্লাহর সাথে এমন বিষয়ে সমকক্ষ স্থির করা যেটা আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য; যেমন, তার সাথে অন্য কাউকে ডাকা, অন্যকে ভয় করা। অন্যের কাছে আশা করা, আল্লাহর চাইতে অন্যকে বেশি ভালোবাসা, অর্থাৎ আল্লাহর 'ইবাদাতের কোন একটি অন্যের দিকে সম্বোধন করাকে শির্ক বলে।
মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন :
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ﴾
“তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর 'ইবাদাত করবে।” (সূরাহ্ আল বাইয়্যিনাহ্ ৯৮ : ৫)
فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ ﴾
“অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে 'ইবাদাত করুন।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ২)
قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ )
“বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর 'ইবাদাত করতে আদিষ্ট হয়েছি।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ১১)
﴿ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا “আর যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে সে যেন সৎ কর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ‘ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।” (সূরাহ্ আল কাহ্ফ ১৮ : ১১০)
📄 শির্ক কত প্রকার ও কি কি?
শির্কের প্রকার : শির্ক দু'প্রকার। ১. الشَّرْكُ الْأَكْبَرُ বড় শির্ক। ২. الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ ছোট শির্ক। ১. الشَّرْكُ الْأَكْبَرُ বা সবচেয়ে বড় শির্ক : আল্লাহর কোন সমকক্ষ স্থির করে 'ইবাদাতের কোন এক প্রকার আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য করা। যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে যবেহ করা, অন্যের নামে মানৎ করা, অন্যকে ডাকা, অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা, যেমন মূর্তি, জিন্ এর নিকট সাহায্য চাওয়া অথবা ক্ববর বা মাজারবাসীর নিকট সন্তান চাওয়া, রোগমুক্তি কামনা করা, অলী, আওলিয়া, সৎ লোকেদের নিকট সাহায্য চাওয়া যাতে তারা আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْقُى “যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে আওলিয়া বা উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে তারা বলে যে, আমরা তাদের ‘ইবাদাত এজন্যেই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ৩)
যে ব্যক্তি এ প্রকার শির্ক করবে সে কাফির হয়ে যাবে এবং ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। তার কোন ফার্য, নফল ‘ইবাদাত ক্ববূল হবে না। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যাবে।
عَنْ عَبْدِ اللهِ ابْنُ مَسْعُودٍ ﷺ : قَالَ : قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيُّ الذَّنْبِ أَكْبَرُ عِنْدَ اللهِ؟ قَالَ أَنْ تَدْعُو لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ وَفِي رَوَاتِ أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ.
'আবদুল্লাহ বিন মাস্'ঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় অপরাধ কোনটি? রসূলুল্লাহ বললেন, আল্লাহকে তুমি অংশীদারের সাথে আহ্বান করছ অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। অপর বর্ণনায় আছে তুমি আল্লাহর সাথে শরীক করছ অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সহীহ মুসলিম- হাঃ ১৪২-[৮৬])
আর রসূলুল্লাহ বলেছেন, এটা সবচেয়ে বড় গুনাহ বা অপরাধ।
عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ: أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ ثَلَاثًا الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَشَهَادَةُ الرُّورِ - أَوْ قَوْلُ الرُّورِ - وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مُتَّكِنًا، فَجَلَسَ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا: لَيْتَهُ سَكَتَ.
'আবদুর রহমান বিন আবূ বাকরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ-এর নিকট ছিলাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় গুনাহের সংবাদ দিব না? তা হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া অথবা মিথ্যা কথা বলা। রসূলুল্লাহ ঠেস দিয়ে বসা ছিলেন, অতঃপর তিনি বসে বার বার আওড়াতে লাগলেন। এমনকি আমরা বললাম, তিনি যদি চুপ হতেন। (মুসলিম- হাঃ ১৪৩-[৮৭])
২. الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ সবচেয়ে ছোট শির্ক : 'আমালের কাঠামো ও মুখের কথায় আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করা। এতে
তার আকীদার ত্রুটি ও কমতির সৃষ্টি করে। এটি শির্কে আকবারে লিপ্ত হওয়ার শামিল ও কারণ। এটা শির্ক আকবার বা বড় শির্কের মতো নয়। তবে এটা দ্বারা কাবীরাহ গুনাহ হবে। যে এ শির্ক করবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে না। আর চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না বরং এটা আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিবেন অথবা ক্ষমা করে দিবেন, যেমন অন্যান্য গুনাহের বেলায় যেগুলো বড় শির্কের মত হবে না। এটি শির্ক আকবারে লিপ্ত হওয়ার ওয়াসীলাহ্ বা কারণ।
কিন্তু এ ছোট শিককে নাবী (সা.) উম্মাতের জন্য সবচেয়ে বেশী ভয় করেছেন। যেমন তিনি বলেন,
عَنْ مَحْمُودِ بْنِ لَبِيدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: إِنَّ أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ.
মাহমূদ বিন লাবীদ হতে বর্ণিত যে, রসূলুললাহ (সা.) বলেছেন: আমি তোমাদের ওপর সবচেয়ে বেশী ভয় করছি শিৰ্কে আসগার বা ছোট শিকের। (মুসনাদে আহমাদ- হাঃ ২৩৬৩০ : হাসান, মিশকাত- হাঃ ৫৩৩৪, ইবনু কাসীর ২য় খণ্ড ৬৫০ পৃষ্ঠা)
এছাড়াও আর এক প্রকার শিক্ক রয়েছে যা মানুষ অজান্তেই করে ফেলে। এ শির্ক থেকে বেঁচে থাকার জন্য রসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে দিয়েছেন।
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ خَطَبَنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا هَذَا الشِّرْكَ؛ فَإِنَّهُ أَخْفَى مِنْ دَبِيْبِ النَّمْلِ.
আবূ মূসা আল আশ্'আরী (রা.) হতে বর্ণিত; রসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে একদিন খুত্ববাহ্ দিয়ে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা এ শিক থেকে নিজেদেরকে রক্ষা কর। কেননা, এটা ক্ষুদ্র পিপিলিকার চাইতেও অধিক গোপন। (সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ১/৯ পৃঃ, হাঃ ৩৬ : হাসান লিগয়রিহী, ইবনু কাসীর- ২য় খণ্ড, ৬৫১ পৃষ্ঠা)
📄 ছোট শির্ক আবার দুই প্রকার– তার ব্যাখ্যা
ক) শিক্ জাহির বা প্রকাশ্য শিক্, খ) শিক্ খফী বা গোপনীয় শিক্।
ক) শিক্ জহির বা প্রকাশ্য শিক্ : শিক্ জহির বা প্রকাশ্য শির্ক এটি দু' দিক হয়ে থাকে। এক. কথা-বার্তার মাধ্যমে। দুই. কাজ-কর্মের মাধ্যমে। এক. কথাবার্তার দ্বারা শিরকের দৃষ্টান্ত এ রকম। গায়রুল্লাহর নামে কুসম বা শপথ করা। যেমন- রসূল বলেন: مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ وَأَشْرَكَ.
যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কুসম বা শপথ করল সে ব্যক্তি কুফরী অথবা শির্কী করল। (মুসনাদ আহমাদ- হাঃ ৬০৭২; আলবানী'র সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্- হাঃ ২০৪২)
আল্লাহ তা'আলা যা চান এবং আপনি যা চান এ ধরনের উক্তিও প্রকাশ্য করা। যেমন- উদ্ধৃত হয়েছে যে, কোন এক ব্যক্তি রসূল-কে বললেন যে, مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ ؟ فَقَالَ : جَعَلْتَنِي لِلَّهِ عَدْلًا، بَلْ مَا شَاءَ اللهُ وَحْدَهُ.
আল্লাহ তা'আলা যা চান এবং আপনি যা চান। রসূলুল্লাহ তাকে বললেন : তুমি কি আল্লাহ তা'আলার সাথে আমাকে শরীক করতে চাও। তুমি এভাবে বলো যে, আল্লাহ তা'আলা এককভাবে যা চান। (মুসনাদ আহমাদ- হাঃ ২৫৬১, সানাদ হাসান; আলবানী'র সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্- হাঃ ১০৯৩)
যদি আল্লাহ তা'আলা এবং অমুক না থাকত- এটিও প্রকাশ্য শির্কের পর্যায়ভুক্ত। এ কথাগুলো বিশুদ্ধভাবে এ নিয়মে বলা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান তারপর অমুক যা চান এভাবে বলা।
দুই. কাজকর্মের মাধ্যমে প্রকাশ্য শির্কের উদাহরণ হলো, কানের দুল জাতীয় অলংকার এবং তাগা ইত্যাদি বিপদ-আপদকে ধ্বংস ও দূর করার
নিয়্যাতে পরিধান করা। এমনভাবে বদ নজর ইত্যাদি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাবিজ ব্যবহার করা।
সুতরাং ঐ বস্তুগুলোকে যখন কোন ব্যক্তি এ ‘আক্বিদাহ্ রেখে ব্যবহার করবে যে, এগুলো হলো বিপদ-আপদ দূর করার মাধ্যম। তখনই তা ছোট শির্কের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা উল্লেখিত জিনিসকে বিপদ-আপদ দূর করার মাধ্যম হিসেবে সৃষ্টি করেননি।
আর যদি উল্লেখিত জিনিসগুলো এ ‘আক্বীদাহ্ রেখে ব্যবহার করে যে, এগুলো স্বয়ং বালা-মুসীবাত দূর করতে এবং ধ্বংস করতে সক্ষম। তখন তা হবে বড় শিক। কেননা এ অবস্থাতে গায়রুল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং নৈকট্যতা রাখা প্রমাণিত হয়।
খ) শিক্ক খফী বা গোপনীয় শিক্ক :
ছোট শিরকের দ্বিতীয় প্রকার হলো গোপনীয় শিক্ক। এ শিক্ক সাধারণতঃ মানুষের ইচ্ছা-ইরাদা এবং নিয়্যাতের মধ্যে হয়ে থাকে। যেমন- অন্তরের মধ্যে লোক দেখানো বা শুনানোর খেয়াল থাকা। দৃষ্টান্তস্বরূপ যে নেক ‘আমালগুলোর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভ করতে পারে, ঐ সকল কাজ মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা ও বাহবা পাওয়ার জন্য করা। যেমন- মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশেই উত্তমরূপে সলাত আদায় করা। অথবা মানুষকে শুনানোর উদ্দেশে স্বশব্দে যিক্র করা এবং মধুর কণ্ঠে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করা। যাতে লোকজন তার প্রসংশা ও গুণকীর্তন করে। এরূপ করা শিক।
মহান আল্লাহ বলেন :
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ﴿
“বলো, আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ, আমার নিকট ওয়াহী করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল এক ইলাহ। কাজেই যে ব্যক্তি তার
রবের সঙ্গে সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎ নেক করে আর তার রবের 'ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।” (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮: ১১০)
রসূলুল্লাহ বলেন:
إِنْ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشَّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ الرَّيَاءُ.
তোমাদের ওপর আমার ভয়কৃত বস্তুসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো ছোট শির্ক। সহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন : হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কি? রসূলুল্লাহ জবাব দিলেন : রিয়া বা লোক দেখানো। (মুসনাদে আহমাদ- হাঃ ২৩৬৩০ : হাসান)
আর পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশে নেক কাজ করাও গোপন শির্কের পর্যায়ভুক্ত। যেমন- কোন ব্যক্তি হাজ্জ করল, আযান দিলো বা ইমামাতি করল অর্থ উপার্জনের অভিপ্রায়ে। অথবা শারী'আতের 'ইল্যু শিক্ষা দিলো সম্পদ লাভের উদ্দেশে। যেমন-
রসূলুল্লাহ এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন :
تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَعَبْدُ الدِّرْهَمِ، وَعَبْدُ الخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ.
ধ্বংস দীনার-দিরহামের, অর্থাৎ- অর্থ-কড়ির লোভী। ধ্বংস হোক কারুকার্য খচিত চাদরের অভিলাষী। ধ্বংস হোক লেপ-তোষকের পূজারী। যদি তাকে অর্থ সম্পদ দেয়া হয় তবে সন্তুষ্ট হয় আর যদি না দেয়া হয় তবে বিক্ষুব্ধ হয়। (সহীহুল বুখারী- হাঃ ২৮৮৭)
ইমাম ইবনুল কাইয়ূম বলেন যে, মানুষের ইচ্ছা অভিপ্রায় এবং নিয়্যাতের মধ্যে যে শির্ক হয়ে থাকে তা কূল-কিনারা বিহীন মহা সমুদ্রতুল্য। এ হতে অতি অল্প সংখ্যক ভাগ্যবানই নিস্কৃতি লাভ করতে পেরেছে। মোটকথা যে ব্যক্তি স্বীয় নেক 'আমালের বিনিময়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত দুনিয়াবী কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করে এবং মহান
আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা ও তার কাছ থেকে প্রতিদান চাওয়া ব্যতীত অন্য কোন বস্তু কামনা করে, সে ব্যক্তি নিয়্যাত ও ইরাদার মধ্যে শির্ক করল।
বড় শির্ক ও ছোট শিরকের মধ্যে পার্থক্য: উপরে বর্ণিত বিষয়বস্তুর আলোকে শিকে আকবার (বড় শিক্) ও শিকে আসগার (ছোট শিক্)-এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য বোধগম্য হয়। পার্থক্যগুলো এই-
(১) বড় শির্কের দ্বারা মানুষ ইসলাম হতে বের হয়ে যায়। কিন্তু ছোট শিরকের দ্বারা দ্বীন হতে বের হয় না।
(২) বড় শির্ক তার কর্তাকে চিরদিনের জন্য জাহান্নামের অধিবাসী করে দেবে। পক্ষান্তরে ছোট শিক্ তার কর্তাকে চিরদিনের জন্য জাহান্নামের অধিবাসী করবে না। যদিও ঐ ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
(৩) বড় শিক্ সমস্ত নেক কাজের মূলোৎপাটন তথা ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ছোট শির্ক সমস্ত নেক 'আমালকে ধ্বংস করে না। বরং তা শুধু রিয়াকারী এবং পার্থিব স্বার্থ সিদ্ধির নিমিত্তে কৃত 'আমালসমূহকে এবং 'আমালগুলোর সাথে উক্ত দু' জিনিস মিশ্রিত হয়েছে এগুলোকে বিনষ্ট করে দেয়।
(৪) বড় শিক্ করার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জান ও মালের নিরাপত্তা খতম হয়ে যায়। কিন্তু ছোট শিক্ করলে জান ও মালের নিরাপত্তা লুপ্ত হয় না।
অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! আসুন জীবনের সকল বিভাগ থেকে সকল প্রকার শিককে পরিহার করে এবং আল্লাহর সাথে পবিত্র অবস্থায় মুলাকাত করার জন্য তৈরি হয়ে যাই।