📄 অল্প সংখ্যক লোকই নাজাতপ্রাপ্ত
মহান আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে অসংখ্য আয়াতে যেমন অধিকাংশ লোকের খারাবী বর্ণনা করেছেন, তেমনভাবে আবার অল্পসংখ্যক লোকের হাক্ব বা ভালোর উপর থাকবে তাও বহু সংখ্যক আয়াতে আলোচনা করেছেন। আমরা তার থেকে কিছু আয়াতে কারীমাসহ উল্লেখ করেছি।
১. আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُونَ ﴾ “তোমরা সলাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত প্রদান করবে, অতঃপর অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ৮৩)
২. তিনি আরো বলেন, وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلًا مَّا يُؤْمِنُونَ ﴾ “তারা বলে, আমাদের অন্তর অর্ধাবৃত বরং তাদের কুফরের কারণে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। অতএব তারা অল্পলোেকই ঈমান আনে।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ৮৮)
৩. তিনি আরো বলেন, فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ ﴾ “অতঃপর যখন তাদের ওপর কিতাল বা সংগ্রামকে ফার্য করা হল তখন তাদের অল্প সংখ্যক ব্যতীত মুখ ফিরিয়ে নিল। আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে অধিক অবগত আছেন।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৪৬)
৪. তিনি আরো বলেন,
فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوتُ بِالْجُنُودِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِيْكُمْ بِنَهَرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّي وَمَنْ لَمْ يَطْعَمْهُ فَإِنَّهُ مِنِّي إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ فَشَرِبُوا مِنْهُ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ فَلَمَّا جَاوَزَةً هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو اللَّهِ كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴾
“অতঃপর তালুত যখন সৈন্য সামান্ত নিয়ে বের হল তখন তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদীর মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন। সুতরাং যে লোক সেই নদীর পানি পান করবে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর যে লোক তার স্বাদ গ্রহণ করবে না নিশ্চয় সে আমার অন্তর্ভুক্ত লোক। তবে যে লোক হাতের আজলা ভরে সামান্য খেয়ে নিবে তার কোন দোষ নেই। অতঃপর অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত সবাই পানি পান করল। পরে তালুত যখন তা পার হল এবং তার সাথে অল্প সংখ্যক ঈমানদার ছিল। তখন তারা অধিকাংশ বলতে লাগলো, আজকের দিনে জালুত এবং তার সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। যাদের ধারণা ছিল যে, আল্লাহর সাথে একদিন সাক্ষাত করতে হবে তারা বলতে লাগল, আল্লাহর হুকুমে অল্প সংখ্যক দলই বিরাট দলের মোকাবিলায় বিজয়ী হয়েছে। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৪৯)
৫. তিনি আরো বলেন, فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا )
“অতএব অল্পসংখ্যক লোক ব্যতীত তারা ঈমান আনবে না।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৪৬, ১৫৫)
৬. তিনি আরো বলেন, وَلَا تَزَالُ تَطَّلِعُ عَلَى خَائِنَةٍ مِّنْهُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ ﴾
"আপনি তাদের অল্প সংখ্যক ব্যতীত তাদের পক্ষ থেকে কোন না কোন প্রতারণা সম্পর্কে অবগত হচ্ছেন।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ১৩)
৭. তিনি আরো বলেন, ﴿مَا فَعَلُوهُ إِلَّا قَلِيلٌ مِّنْهُمْ ﴾ “তাদের অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত আল্লাহর নির্দেশকে বাস্তবায়ন করতো না।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ৬৬)
৮. তিনি আরো বলেন, ﴿وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلًا ﴾ “বলাবাহুল্য অল্প সংখ্যক লোকই তার সাথে ঈমান এনেছিল।” (সূরাহ্ হুদ ১১ : ৪০)
৯. তিনি আরো বলেন, ﴿إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّنْ أَنْجَيْنَا مِنْهُمْ﴾ “তবে অল্প সংখ্যক লোক যাদেরকে আমি তাদের মধ্য থেকে রক্ষা করেছি।” (সূরাহ্ হুদ ১১ : ১১৬)
১০. তিনি আরো বলেন, ﴿لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا﴾ “(শয়তান বলল) যদি আপনি আমাকে ক্বিয়ামাত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দেন, তাহলে অল্প সংখ্যক ব্যতীত আদমের বংশধরদেরকে সমূলে নষ্ট করে দিব।” (সূরাহ্ বানী ইসরাঈল ১৭ : ৬২)
১১. তিনি আরো বলেন, ﴿إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَّا هُمْ﴾ “তবে তারা করে না যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, অবশ্য এমন লোকেদের সংখ্যা খুবই অল্প।” (সূরাহ্ সোয়াদ ৩৮ : ২৪)
৩২. তিনি আরো বলেন, وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ لَفَاسِقُونَ ﴾ ٤٩ “মানুষের মধ্যে অনেক লোকই ফাসিক্ব।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৪৯)
১২. তিনি আরো বলেন, ﴿ وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ ﴾ “আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক লোকই কৃতজ্ঞ।” (সূরাহ্ সোয়াদ ৩৮ : ১৩)
📄 হাদীসেও মহানবী ﷺ অল্প সংখ্যক লোকেদের নাজাতের কথাই বলেছেন...
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ ل، عَنِ النَّبِيِّ لا أَنَّهُ قَالَ : لَنْ يَبْرَحَ هَذَا الدِّينُ قَائِمًا، يُقَاتِلُ عَلَيْهِ عِصَابَةٌ مِّنَ الْمُسْلِمِينَ، حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ.
'আলায়হি ওয়াসাল্লাম জাবির বিন সামুরাহ নাবী হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি () বলেছেন: মুসলিমদের থেকে অল্প সংখ্যক লোকই এই দ্বীন বা মাযহাবের উপর সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থেকে ক্বিয়ামাত পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। (মুসলিম- হাঃ ১৭২-[১৯২২])
عَنِ عَبْدِ اللهِ ابْنِ عُمَرَ ل، عَنِ النَّبِيِّ لا قَالَ: إِنَّ الْإِسْلَامَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا كَمَا بَدَأَ ، وَهُوَ يَأْرِزُ بَيْنَ الْمَسْجِدَيْنِ، كَمَا تَأْرِزُ الْحَيَّةُ فِي جُحْرِهَا.
'আনহু ওরাসাল্লাম 'আবদুল্লাহ বিন উমার নাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ( () বলেছেন, নিশ্চয় ইসলাম গরিবী অবস্থায় অর্থাৎ অল্প সংখ্যক লোকেদের মধ্যে ফিরে যাবে, যেভাবে অল্প লোক দ্বারা সূচনা হয়েছিল এবং সেই গরিবী ইসলাম দুই মাসজিদ অর্থাৎ মাসজিদে হারাম বা কাবা মাসজিদ এবং মাসজিদে নববীর মাঝের লোকেদের মধ্যে সঠিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করবে। যেভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে যায়। (মুসলিম- ২৩২-[১৪৬])
عَبْدَ اللهِ بْنَ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِى، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ل ذَاتَ يَوْمٍ وَنَحْنُ عِنْدَهُ: قَلَ رَسُولُ اللهِ ل : بَدَأَ الإِسْلَامُ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ طُوبُى
لِلْغُرَبَاءِ»، فَقِيلَ: مَنِ الْغُرَبَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ: «أُنَاسٌ صَالِحُونَ، فِي أُنَاسِ سُوءٍ كَثِيرٍ، مَنْ يَعْصِيهِمْ أَكْثَرُ مِمَّنْ يُطِيعُهُمْ».
'আবদুল্লাহ ইবনু 'আম্র ইবনুল 'আসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: দ্বীন ইসলামের সূচনা গরিবী অবস্থায় ঘটেছে। আর সূচনায় যেমন ঘটেছিল পুনরায় সেরূপ ঘটবে। অতএব গরীবরাই সৌভাগ্যবান। জিজ্ঞেস করা হলো, গরিবের তাৎপর্য কি? বা গরিব কারা? তিনি () বলেন, অধিক সংখ্যক দুষ্ট লোকেদের মাঝখানে মুষ্টিমেয় সৎলোক। অনুগত দল অপেক্ষা অবাধ্য দলের সংখ্যা বেশি হবে। (মুসনাদে আহমাদ ৬৬৫০, ৭০৭২ : হাসান লিগয়রিহী)
রসূলুল্লাহ ও তার সহাবীগণ যে দলের অনুসারী ছিলেন একমাত্র সেটিই মুক্তিপ্রাপ্ত দল এবং অধিকাংশ লোকই যে জাহান্নামী ও সামান্য সংখ্যক যে হাক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত তার জ্বলন্ত প্রমাণ নিম্নের হাদীস:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي كَمَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ، حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّةً عَلَانِيَةً لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ، وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً ، قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي.
'আবদুল্লাহ বিন 'আম্র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রসূলুল্লাহ বলেছেন : অবশ্যই আমার উম্মাতের ওপর এমন এক পর্যায় আসবে, যেরূপ অবস্থা হয়েছিল বনী ইসরাঈলদের। ... আর নিশ্চয় বানী ইসরাঈলরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল আর আমার উম্মাতবিভক্ত হবে তিহাত্তর দলে। তাদের থেকে এক দল ব্যতীত সকল দলই জাহান্নামে যাবে। সহাবীগণ বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! যে দলটি জান্নাতে যাবে সে দল
কোনটি? নাবী বললেন, আমি ও আমার সহাবীগণ যে দলের ওপর আছি, সে দলটিই জান্নাতে যাবে এবং এ দলের ওপর যাঁরা অবিচল থাকবে। (তিরমিযী- হাঃ ২৬৪১: হাসান)
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : «تَفْتَرِقُ هَذِهِ الْأُمَّةُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً». قَالُوا: وَمَا هِيَ تِلْكَ الْفِرْقَةُ؟ قَالَ: «مَا أَنَا عَلَيْهِ الْيَوْمَ وَأَصْحَابِي».
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আমার উম্মাত তেহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। তাদের মধ্যে একদল ব্যতীত সকল দলই জাহান্নামী। সহাবীগণ রদিয়াল্লাহু আনহুমা জিজ্ঞেস করলেন, সে জান্নাতী দল কোনটি? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি এবং আমার সহাবীরা আজকের দিনে যে পথের উপর অটল আছি সে দলটিই জান্নাতী। (ত্ববারানী সগীর- হাঃ ৭২৪, মিফতাহুল জান্নাহ্ ৫৮ পৃষ্ঠা)
📄 শির্কের অপর নাম যুল্ম
যুগ্ম বলা হয় কোন বস্তুকে তার আসল জায়গায় না রেখে ঐ স্থানে অন্য কোন জিনিসকে রাখা। সুতরাং যে গায়রুল্লাহর 'ইবাদাত করে সে মূলত 'ইবাদাতকে তার আসল জায়গায় না রেখে 'ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত নয় এমন কারো উদ্দেশে তা নিবেদন করে। আর এটাই হল সবচেয়ে বড় যুগ্ম এবং অন্যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
﴿إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ ﴾ “নিশ্চয় শির্ক হল বড় যুগ্ম।” (সূরাহ্ লুক্বমান ৩১ : ১৩) অত্র আয়াতের ব্যাখ্যা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে করেছেন,
عَنْ عَبْدِ اللهِ ابْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبَسُوا ﴾ [سورة الأنعام) إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ شَقَّ ذُلِكَ عَلَى النَّاسِ، وَقَالُوا : يَا رَسُولَ
اللهِ، فَأَيُّنَا لَا يَظْلِمُ نَفْسَهُ؟ قَالَ: إِنَّهُ لَيْسَ الَّذِي تَعْنُونَ، أَلَمْ تَسْمَعُوا مَا قَالَ الْعَبْدُ الصَّالِحُ: ﴿يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْ كَلَظُلْمٌ عَظِيمٌ ﴾ [سورة لقمان] إِنَّمَا هُوَ الشرك.
'আবদুল্লাহ বিন মাস্'উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হল, “যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে যুল্মের সাথে মিশ্রিত করে না”- (সূরাহ্ আল আন'আম ৬ : ৮২)। এটা লোকেদের ওপর কঠিন হয়ে পড়ল, তারা বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মধ্যে কে যুল্ম করে না? নাবী (সাঃ) বললেন, যারা যুল্ম করে না তারা হলো ঐ অনুগত লোক, তোমরা কি শুননি সৎ বান্দা যা বলছে, “হে আমার ছেলে আল্লাহর সাথে শির্ক করো না, নিশ্চয় শিকই হচ্ছে বড় যুল্ম”- (সূরাহ্ লুক্বমান ৩১ : ১৩)। সে যুল্মই হলো শির্ক। (বুখারী- হাঃ ৩৪২৯, মুসনাদে আহমাদ হাঃ ৩৫৮৯, মুসলিম- হাঃ ১৯৭-[১২৪], ইবনু কাসীর- ১ম খণ্ড, ২০৬ পৃষ্ঠা)
عَن أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ (রাঃ) وَبِإِسْنَادِهِ، عَنِ النَّبِيِّ (ﷺ) قَالَ: الظُّلْمُ ثَلَاثَةٌ فَظُلْمٌ لَا يَغْفِرُ اللهُ وَظُلْمٌ يَغْفِرَهُ اللهُ وَظُلْمٌ لَا يَتْرُكُهُ اللهُ فَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَغْفِرُهُ اللَّهُ فالشرك، وقال اللهُ ﴿إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمِ﴾ وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي يَغْفِرُهُ اللَّهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ لِأَنْفُسِهِمْ فِيمَا بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَبِّهِمْ وَأَمَّا الظُّلْمُ الَّذِي لَا يَتْرُكُهُ اللهُ فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضَهُمْ بَعْضًا حَتَّى يَدِينَ لِبَعْضِهِمْ مِنْ بَعْضٍ.
আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি (ﷺ) বলেছেন: যুল্মের ফলাফল তিন প্রকার। ১. এক প্রকার যুল্ম আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। ২. এক প্রকার যুল্ম আল্লাহ ক্ষমা করবেন। ৩. আর এক প্রকার যুল্ম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না।
১- যে যুল্ম আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, তা হচ্ছে শির্ক আর আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় শিক্ হচ্ছে বড় যুল্ম।
২- যে যুলম আল্লাহ ক্ষমা করবেন। তা হচ্ছে বান্দার যুলুম। যা সে তার নিজের সাথে এবং তার প্রভুর সাথে করে।
৩- যে যুলম আল্লাহ ছেড়ে দিবেন না। তা হচ্ছে, বান্দার যুলুম; যা তাদের মধ্যে একে অপরের সাথে করে, এমনকি একে অপরের কাছে ঋণী হয়ে যায়। (মুসনাদে বাযযার হাঃ ৬৪৯৩, ইবনু কাসীর ১ম খণ্ড ৬৭৬ পৃষ্ঠা)
عَنْ أَبِي ذَرٍّ، عَنِ النَّبِيِّ , فِيمَا رَوَى عَنِ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَنَّهُ قَالَ: يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تُظَالِمُوا.
আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি নাবী হতে বর্ণনা করেন, যা তিনি () বলেছেন: মহান আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দারা! আমি আমার ওপর যুলম হারাম করে দিয়েছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করে দিয়েছি। অতএব তোমরা যুলম করো না। (মুসলিম- হাঃ ৫৫-[২৫৭৭], মিশকাত- হাঃ ২৩২৬)
যালিমের পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেন, وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ )
“আর যারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করবে তারাই হলো যালিম।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২২৯)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ )
“যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই যালিম।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৪৫)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وَالْكُفِرُونَ هُمُ الظَّلِمُونَ )
“বরং কাফিররাই হল প্রকৃত যালিম।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৫৪)
بَلِ الظَّالِمُونَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ))
“বরং যালিমরা স্পষ্ট পথভ্রষ্ট।” (সূরাহ্ লুক্বমান ৩১ : ১১)
وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ )
“আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ৭২)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল, যারা মুশরিক তারা যালিম এবং যারা কাফির তারাও যালিম। অতএব যে কাফির সে যালিম। আর যে যালিম সে মুশরিক। আর মুশরিকদের জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ সকল ফিতনা থেকে রক্ষা করুন, আমীন।
📄 যেভাবে শির্কের উৎপত্তি
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴾
“তারা বলছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ওয়াদ, সুওয়া'আ, ইয়াগূস, ইয়া'ঊকু এবং নাস্ত্র-কে পরিত্যাগ করো না।” (সূরাহ্ নূহ ৭১ : ২৩)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، صَارَتِ الْأَوْثَانُ الَّتِي كَانَتْ فِي قَوْمِ نُوحٍ فِي العَرَبِ بَعْدُ أَمَّا وَدُّ كَانَتْ لِكَلْبِ بِدَوْمَةِ الجَنْدَلِ، وَأَمَّا سُوَاعٌ كَانَتْ لِهُذَيْلٍ، وَأَمَّا يَغُوتُ فَكَانَتْ لِمُرَادٍ، ثُمَّ لِبَنِي غُطَيْفٍ بِالْجَوْفِ عِنْدَ سَبَةٍ، وَأَمَّا يَعُوقَ فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ، وَأَمَّا نَسْرٌ فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ لِأُلِ ذِي الْكَلَاعِ، أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِينَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ، أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمُ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُونَ أَنْصَابًا وَسَمُّوهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، فَلَمْ تُعْبَدُ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُولَئِكَ وَتَنَسَّخَ العِلْمُ عُبِدَتْ.
'আবদুল্লাহ বিন 'আব্বাস রাযিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূহ আলাইহিস সালাম এর কওমে যেসব মূর্তির প্রচলন ছিল পরবর্তী সময়ে তা আরবদের মধ্যেও চালু হয়েছিল। ওয়াদ ছিল কাল্ব গোত্রের দেব-মূর্তি, দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে ছিল এর মন্দির। সুওয়া ছিল মক্কার নিকটবর্তী হুযায়ল গোত্রের মূর্তি। ইয়াগূস ছিল প্রথমে মুরাদ গোত্রের এবং পরে (মুরাদের শাখা গোত্রে) বানী গাতিফের দেবতা হিসেবে সাবা'র নিকটবর্তী জাওফ নামক আস্তানায় ছিল। ইয়া'উক ছিল হামদান গোত্রের দেবমূর্তি। আর নাস্ত্র ছিল যুলকালা' গোত্রের হিয়ার শাখার দেবমূর্তি। নাস্ত্র নূহ আলাইহিস সালাম এর কাওমের কিছু সৎ লোকের নামও ছিল। এ লোকগুলো মারা গেলে তারা যেখানে বসে মজলিস করত, শয়তান সেখানে কিছু মূর্তি তৈরি করে স্থাপন করতে তাদের কাওমের লোকের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। তাই তারা সেখানে কিছু মূর্তি তৈরি করে এবং তাদের নামে সে মূর্তির নাম রেখে স্থাপন করে। কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। পরে ঐ লোকগুলো মৃত্যুবরণ করলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকার জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে। (বুখারী- হাঃ ৪৯২০; তাফসীর ইবনু কাসীর ৪র্থ খণ্ড, ৫৪৮ পৃষ্ঠা)
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: لَمَّا اشْتَكَى النَّبِيُّ ﷺ ذَكَرَتْ بَعْضُ نِسَائِهِ كَنِيسَةً رَأَيْنَهَا بِأَرْضِ الْحَبَشَةِ يُقَالُ لَهَا: مَارِيَةٌ، وَكَانَتْ أُمُّ سَلَمَةَ، وَأُمُّ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَدْ أَتَنَا أَرْضَ الْحَبَشَةِ، فَذَكَرَنَا مِنْ حُسْنِهَا وَتَصَاوِيرَ فِيهَا، فَرَفَعَ رَأْسَهُ، فَقَالَ: أُولَئِكَ إِذَا مَاتَ مِنْهُمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، ثُمَّ صَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّورَةَ أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
'আয়িশাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নাবী আলাইহিস ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন তার কোন স্ত্রী হাবাসাহ্ দেশের একটি গির্জার কথা উল্লেখ করলেন। যাকে মারিয়াহ্ বলা হত। উম্মু সালামাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহা ও উম্মু হাবীবাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহা ইতিমধ্যে হাবাসাহ্ এলাকা হতে সফর করে এসেছেন, তারা ঐ গির্জার সৌন্দর্য এবং অনেকগুলো মূর্তির কথা উল্লেখ করলেন।
'আয়িশাহ্ াহ্ আনহা বললেন, অতঃপর তিনি (সালাম) বললেন, এরা ঐ সমস্ত লোক যখন তাদের মধ্যে কোন সৎ লোক বা সৎ বান্দা মারা যায় তখন তারা তার ক্বত্রের উপর মাসজিদ ('ইবাদাতখানা) বানিয়ে নেয় এবং তাতে এ ছবিগুলো তারা তৈরি করে। আল্লাহর নিকটে ক্বিয়ামাত দিবসে এরাই হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি। (বুখারী- হাঃ ১৩৪১, মুসলিম- হাঃ ১৬-[৫২৮)
وَفِي الصَّحِيحِ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ...... فِي قَوْلِ الله تَعَالَى .... وَنَسْرَا.... إِلَى قَوْمِهِمْ.
নূহ্ আলায়হিস-এর জাতিতে শিৰ্কের অনুপ্রবেশ। নূহ আলায়হিস-এর জাতি যে শিকে নিমজ্জিত ছিল তা হলো, সৎ ব্যক্তি ও তাঁদের রূহের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি। শাইত্বান সে জাতির নিকট বুজুর্গ ব্যক্তির আকৃতিতে আগমন করে এবং তার বুজুর্গী ও আল্লাহর নৈকট্যের দাবী করে বলে, যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক গড়বে তার জন্য আমি শাফা'আত করব।
অতএব শাইত্বান তাদেরকে সম্মানের এ পর্যায় থেকে নিয়ে যায় প্রতিকৃতি, মূর্তি, আস্তানাও দরগাহ পর্যন্ত। যেমন- আলোচ্য অংশে ইবনু 'আব্বাস এ শিক্ক পতিত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে বলেন: “তারা যখন ধ্বংস হয়ে যায়, শাইত্বান তাদের জাতির অন্তরে ইলহাম করে দেয় যে, তারা যেখানে অবস্থান করত সেখানে আস্তানা বা দরগাহ গড়ে তোলো এবং তাদের নামে নামকরণ করো। অতঃপর তারা তাই করল, তবে 'ইবাদাত শুরু হলো না। অতঃপর যখন তারা মারা গেল, জ্ঞান ও উঠিয়ে নেয়া হলো। তাদের 'ইবাদাত শুরু হয়ে গেল।”
وَقَالَ ابْنُ الْقَيمِ : قَالَ غَيْرِ وَاحِدٌ..... فَعْبُدُوهُمْ. : তারা যখন ঐ বুজুর্গ ব্যক্তিদের ছবি তৈরি করার ইচ্ছা করে তখন তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তারা ঐ সমস্ত ছবির পূজা করবে না কেননা তারা জ্ঞানী ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটল তখন ঐ ছবিগুলোর পূজা করা সৎ লোক ও বুজুর্গদের নৈকট্য অর্জনের ওয়াসীলা ও কারণ মনে করতে লাগল। শাইত্বান কখনো কখনো উক্ত ছবি প্রতিকৃতির নিকট এসে তার দর্শকদের বা উপস্থিত ব্যক্তিদের মনে এ ধরনের প্রভাব ফেলত যে এ
প্রতিকৃতি তো কথা বলতে পারে এবং তার কথাও শ্রবণ করতে পারে ও এ ধরনের বহু ধারণা তাদেরকে দিয়ে থাকে। যার ফলে তাদের অন্তর সৎ ব্যক্তিদের রূহ্রে প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। পরিশেষে শাইত্বান তাদেরকে বুজুর্গদের পূজার প্রতি আকৃষ্ট করে ফেলে।
বর্তমানে এ অবস্থা হলো ঐ লোকেদের যারা কবর-মাযারে গিয়ে নামাযের মতো করে বসে ও আল্লাহ তা'আলার 'ইবাদাতের সাথে তাদেরও 'ইবাদাত করে। তার এই 'আমালই আল্লাহর সাথে শির্ক করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।