📄 তাওহীদের মর্যাদা
তাওহীদ আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ ও তাঁর আনুগত্যের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। এ তাওহীদের বার্তা দিয়েই তিনি নাবী এবং রসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং এর ব্যাখ্যার জন্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ﴾ “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।” (সূরাহ্ ইব্রা-হীম ১৪ : ১)
অর্থাৎ- শিক্কের অন্ধকার থেকে তাওহীদের আলোতে। মহান আল্লাহ এ তাওহীদের পরীক্ষা নেয়ার লক্ষ্যে জিন্ জাতি ও মানবজাতি সৃষ্টি করে পাশাপাশি ইহকাল, পরকাল জান্নাত, জাহান্নামও সৃষ্টি করেছেন। যে এ তাওহীদকে গ্রহণ করবে সে চিরসুখী, সৌভাগ্যবান, আর যে তাওহীদকে প্রত্যাখ্যান করবে সে বড় হতভাগা, চিরদুঃখী।
তাওহীদবিহীন 'আমাল যত বড় কিংবা যত ভালোই হোক, তা অগ্রাহ্য, পরিত্যক্ত ও মূল্যহীন। মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেন :
وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ “যদি তারা শির্ক করত তবে তাদের কাজকর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যেত।” (সূরাহ্ আল আন'আম ৬ : ৮৮)
📄 তাওহীদ তিনভাগে বিভক্ত
'উলামায়ে কিরামগণ তাওহীদকে তিনভাগে ভাগ করেছেন।
(১) তাওহীদুর রবুবিয়্যাহ্ (সৃষ্টি ও পালনে আল্লাহর একত্ব) : )تَوْحِيْدُ الرُّبُوبِيَّةُ( রবুবিয়্যাহ্ শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে মূল ক্রিয়া “রব” থেকে, যার অর্থ সৃষ্টিকর্তা, মহানিয়ন্ত্রক ও প্রতিপালক। রব তো তিনি যিনি কোন জিনিস সৃষ্টি করেন কোন প্রকার নমুনা বা মডেল ছাড়াই। কোন কিছুকে অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দান করে, তার পূর্ণতায় পৌঁছাতে প্রতিপালনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবকিছুর আঞ্জাম যিনি মিটান তিনিই একমাত্র রব।
মূল সৃষ্টির ক্ষমতা আল্লাহর সৃষ্টির ক্ষমতা মানুষের নেই। মানুষ পারে শুধু সৃষ্ট বস্তুকে যোগ-বিয়োগ, কাটা-ছেঁড়া করে আবিস্কার করতে। মানুষ শুধু আবিষ্কারক, সৃষ্টির ক্ষমতা নেই। যার কারণে মানুষের বিনা অনুমতিতে নিজের অজান্তেই নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়, করার কিছু থাকে না।
সুতরাং তাওহীদ আর রবুবিয়্যাহ্-এর অর্থ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা হিসেবে তিনি একক। তিনি একাই সমগ্র মহাবিশ্ব ও যা কিছু এর মধ্যে রয়েছে সবকিছুরই স্রষ্টা, পালনকর্তা ও মহানিয়ন্ত্রক। তিনি এ ব্যাপারে কারো মুখাপেক্ষী নন বা কারো থেকে সুপারিশ গ্রহণকারীও নন।
একমাত্র নাস্তিকেরা ছাড়া সকল কাফির মুশরিকরা তাওহীদের এ প্রকারকে স্বীকার করে। তারপরেও তারা ইসলামে প্রবেশ করেনি।
মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন- ﴿وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ﴾ “যদি তাদেরকে প্রশ্ন করো- কে তাদের সৃষ্টি করেছেন। তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ।” (সূরাহ্ আয যুখরুফ ৪৩ : ৮৭)
(২) তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর একত্ব):
(تَوْحِيدُ الْأَسْمَاءِ وَالصَّفَاتِ) যার অর্থ আল্লাহর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলীর একত্ব বজায় রাখা। মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের যে সমস্ত সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলী রয়েছে সে সমস্ত নামে অন্য কাউকে গুণান্বিত না করে সমস্ত গুণের সার্বিক অধিকারী একমাত্র আল্লাহকে মনে করা।
আল্লাহর নাম ও গুণাবলী আল্লাহ নিজে ও তাঁর রসূল যেভাবে বর্ণনা করেছেন, কোন প্রকার রূপক অর্থ ও কল্পিত ব্যাখ্যা ছাড়া ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করা। আল্লাহর ওপর কোন নতুন নাম ও গুণাবলী আরোপ না করে তিনি নিজেকে যেভাবে উল্লেখ করেছেন সেভাবেই তার উল্লেখ করা। উদাহরণ স্বরূপ আল্লাহকে “আল গাদীব” বা ক্রোধান্বিত নামে অভিহিত করা যাবে না। যদিও তিনি বলেছেন যে, তিনি রাগান্বিত হন বা ক্রুদ্ধ হন। কারণ আল্লাহ নিজে বা তাঁর রসূল কখনো এ নাম ব্যবহার করেননি!
আল্লাহর প্রতি কখনোই তার সৃষ্টির গুণাবলী আরোপ করা যাবে না। আল্লাহর বর্ণনায় অতি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যেন কোনক্রমেই তার গুণাবলী সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে না যায়। যেমন- আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনায় এ মূলনীতিটি তিনি নিজেই পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেন।
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾
“কোন কিছুই তাঁর সাদৃশ্য নয়, তিনি সব শুনেন ও দেখেন।” (সূরাহ্ আশ্ শূরা- ৪২ : ১১)
যদিও শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি মানাবীয় গুণ। তবুও এ গুণগুলো যখন আল্লাহর ওপর আরোপ করা হয় তখন সেগুলো হবে তুলনাহীন ও ত্রুটিহীন।
মানুষের ওপর আল্লাহর গুণাবলী আরোপ না করা। যেমন-
عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ )
“মহান আল্লাহ গায়েব এবং প্রকাশ্য সবই জানেন, তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।” (সূরাহ্ আল হাশ্র ৫৯ : ২২)
এখন দুনিয়ার কেউ গায়েব বা অদৃশ্যের খবর রাখে এ ধারণাও তাওহীদ বিরোধী কথা।
আল্লাহর গুণাবলী মানুষের ওপর আরোপ করাই হলো তাওহীদের মূলনীতির বিরোধী। যেমন- কোন মানুষ আদি বা অন্তহীন বলে অভিহিত করা। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস মনে করা।
আল্লাহর সুন্দরতম ও একক নামসমূহ কোন সৃষ্টির প্রতি আরোপ না করা। যদি নামের পূর্বে আবদ (বান্দা) সংযোগ না করা হয় তাহলে সৃষ্টিকে আল্লাহর কোন নামে নামকরণ করা যাবে না। রউফ ও রহীম এর মতো কিছু স্বর্গীয় নাম (আলিফ লাম ছাড়া) অনির্দিষ্টভাবে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। কারণ আল্লাহ সেগুলো রসূল-এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু আর্ রউফ ও আর্ রহীম যখন (আলিফ ও লাম যোগে আসবে তখন) এর পূর্বে 'আব্দ (দাস বা বান্দা) শব্দ সংযোজন করে এ নামগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- 'আবদুর রউফ (আর্ রউফ-এর বান্দা), 'আবদুর রাহীম (আর্ রহীম-এর বান্দা) ইত্যাদি।
আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ। সুতরাং তাকে ঐসব নামে ডাকো। আল্লাহ কুরআনুল কারীমে নিজের কতিপয় গুণ ও কাজ সূরাহ্ আল হাশ্র-এর ২৩-২৪ নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক। পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপাম্বিত মাহাত্মশীল।
তারা যাকে অংশীদার করে, আল্লাহ তা'আলা তা থেকে পবিত্র।
(৩) তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ্ বা 'ইবাদাতে তাওহীদ ('ইবাদাত বা উপাসনায় একত্ব বজায় রাখা) :
(تَوْحِيدُ الْعِبَادَةِ) 'ইবাদাত শব্দটি আরবী ('আব্দ) থেকে উদ্ধৃত। যার অর্থ বান্দা বা দাস, 'ইবাদাত বা উপাসনায় একত্ব বজায় রাখা, আল্লাহর আনুগত্য বা দাসত্ব করা। সলাত হচ্ছে 'ইবাদাতের সর্বোচ্চ স্তর। সর্বশক্তিমান আল্লাহর 'ইবাদাত বা উপাসনা বলতে লোকজন শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতিকেই বুঝে থাকে। যা মারাত্মক ভুল। ইসলামে আল্লাহর 'ইবাদাত বলতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যকেই বুঝায়। আল্লাহর বিধান মেনে চলা ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকা এটাই আল্লাহর 'ইবাদাত। মূলতঃ 'ইবাদাত হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে নিবেদিত।
নামায, রোযা, হাজ্জ, যাকাত যেমন 'ইবাদাত তেমনি দু'আ করাও একটি 'ইবাদাত। আত্ তিরমিযী-তে সহীহ সনদে বর্ণিত- রসূল 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন : الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَة( “দু'আই 'ইবাদাত”। সমস্ত প্রকার দু'আ, সাহায্য প্রার্থনা, চাওয়া-পাওয়া সব আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। দ্বীনের ক্ষেত্রে মুহাব্বাত-ভালোবাসা, ভয় করা, আশা-ভরসা, কুরবানী, দান- সাদাক্বাহ্ মহানের হুকুম-আহকাম মানা ইত্যাদি সবকিছুই 'ইবাদাত। আর এসব কিছু একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়াই তাওহীদ ফিল 'ইবাদাহ্। মোটকথা- যেভাবে আল্লাহ এবং তার রসূল-এর প্রতি ঈমান আনলে 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও বান্দার যে কথায় ও কাজে আল্লাহ খুশি হন সেটাই তাওহীদে উলুহিয়্যাহ্। নাবী মুহাম্মাদ-এর দা'ওয়াত পাওয়ার পরেও যারা 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম মুশরিকের গণ্ডি থেকে বের হতে পারেনি তার একটাই কারণ ছিল যে, তারা তাওহীদ ফিল 'ইবাদাতকে মানতে পারেনি। প্রথম দু' প্রকারের তাওহীদ মানতে তাদের কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। তারা বিশ্বাস করত আল্লাহ তা'আলা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু তাওহীদ ফিল 'ইবাদাত মানলেই তাদের সকল দেব-দেবী বা যাদেরকে তারা মাধ্যম বানিয়ে 'ইবাদাত করত তারা সকলেই বাদ পড়ে যায়। যার কারণে তাওহীদে উলুহিয়্যাহ্ বা 'ইবাদাত গত তাওহীদকে তারা মানতে পারেনি।