📄 মহান আল্লাহ তা‘আলা নিজের নূর থেকে মুহাম্মাদ ﷺ-কে তৈরি করেছেন, তাই নাবীও নূরের তৈরি– এ কথা বলা শির্ক
আল্লাহ নাবী-কে তার নিজের নূর থেকে তৈরি করেছেন, নাবী নূরের তৈরি। আর নাবী-এর নূরে সমস্ত জগত তৈরি। সর্বপ্রথম আল্লাহ নাবী-কে তার নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন- এভাবে তারা আল্লাহর সাথে শিক্ করে থাকে। সহীহ হাদীসে রয়েছে আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে লিখতে বলেন।
'আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বললেন : আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম ও মাছ সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর কলমকে বলেছেন, লিখ, কলম বলল, কি লিখব? আল্লাহ বললেন, ক্বিয়ামাত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে সব লিখ। (ত্ববারানী, ইবনু জারীর, ইবনু আসভকির, ইবনু আবি হাতিম, আহমাদ, তিরমিযী, ইবনু কাসীর ৪র্থ খণ্ড ৫১৪-৫১৬ পৃষ্ঠা)
আর নাবী-কে আল্লাহ মাটির তৈরি আদমের থেকে স্বাভাবিক মানুষটির যে নিয়ম আল্লাহ করেছেন সে পদ্ধতিতেই মা আমিনার গর্ভে 'আবদুল্লাহর ঔরসের মাধ্যমে পৃথিবীতে আগমন ঘটিয়েছেন। আল্লাহর নূরে মুহাম্মাদ পয়দা হলে মাতৃগর্ভে অপবিত্র রক্তের সাথে লজ্জাস্থান দিয়ে তিনি ভূমিষ্ট হতেন না। তিনি মাটির তৈরি বলেই অন্যান্য মানুষের মতই ভূমিষ্ট হয়েছেন। তবে আল্লাহ তাকে চল্লিশ বৎসর বয়সে শেষ নাবী ও রসূল বানিয়েছেন, রিসালাতের দায়িত্ব দিয়েছেন। তার নিকট আল্লাহর ওয়াহী আসত, কুরআন মাজীদ তার প্রতি নাযিল হয়েছে। তার পরও তিনি মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর একজন বান্দা ছিলেন। যার স্বীকৃতি আমরা সর্বদা দিয়ে থাকি ৫ ওয়াক্ত সলাতে, তাশাহুদে বলে থাকি তিনি আল্লাহর বান্দা ও রসূল।
মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেন,
“বল! আমি তোমাদের মতই একজন মাটির মানুষ। আমার নিকট ওয়াহী আসে, তোমাদের মা'বৃদই একমাত্র মা'বৃদ।” (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮ : ১১০)
এ কথা বলা যে, আল্লাহর নূরে নাবী মুহাম্মাদ পয়দা তার নূরে সারে, জাহান পয়দা (না'ঊযুবিল্লাহ)। এটা যেন দাদার থেকে বাপ তার থেকে ছেলে বংশীয় ধারাবাহিকতার মতো। অথচ আল্লাহ বলেন, لَمْ يَلِ 66 وَلَمْ يُولَدْ “তিনি কারো থেকে জন্ম নেননি এবং তার থেকে কেউ জন্ম নেয়নি”- (সূরাহ্ ইখলাস ১১২ : ৩)। সুতরাং আল্লাহর নূরে নাবী মুহাম্মাদ পয়দা, এমন শরীকানা থেকে তিনি মুক্ত- এ কথা বলা মস্ত বড় শির্ক। যারা বলেন, নাবী মুহাম্মাদ নূরের তৈরি তাদের কয়েকটি বানোয়াট দলীলও রয়েছে। নিম্নে তার বর্ণনা তুলে ধরা হল। প্রথমতঃ কুরআন থেকে
قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ ( অর্থাৎ- “তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে একটি নূর (জ্যোতি) এবং একটি সমুজ্জ্বল স্পষ্ট কিতাব।” (সূরাহ্ আল মায়িদাহ্ ৫ : ১৫) ভুল ব্যাখ্যাকারীরা উক্ত আয়াতের نُورٌ )জ্যোতি) দ্বারা মুহাম্মাদ-কে বুঝিয়ে থাকেন। সঠিক হল- মারেফুল কুরআন গ্রন্থের লেখক মুফতী শফী (রহঃ) বলেন, মহান আল্লাহ কুরআনুল কারীমের সূরাহ্ আল মায়িদাহ্'র ১৫ নম্বর আয়াতে নূর শব্দ দ্বারা নবৃওয়াতের জ্যোতিকে বুঝিয়েছেন। (মারেফুল কুরআন- বাংলা অনুবাদ, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ৩২০ পৃঃ)
أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللهُ نُورُ نَبِيِّكَ يَا جَابِرُ : Galat al bitca naat অর্থাৎ- হে জাবির! আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম তোমার নাবী-এর নূর সৃষ্টি করেছেন।
তাহাক্বীক্ব : এটা একটা মিথ্যা কথা, আল্লাহ বলেন : أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ অর্থাৎ- আমি সর্বপথম কলম সৃষ্টি করেছি। তারপর বলা হয়েছে, হাদীসটি মাওযূ' বা জাল, বানোয়াট, মিথ্যা। এর কোন সনদ নেই। শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, এটি কোন হাদীসই না। কেবলমাত্র মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। তার কোন সনদ খুঁজে পাওয়া যায় না। (ফাতাওয়া 'আক্বানুল ইসলাম ওয়াল ঈমান- মুহাম্মাদ বিন জামিল যাইনু, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রথম প্রকাশ- ডিসেম্বর ২০০৩ ইং, পৃষ্ঠা নং ১৬০)
উপরের বর্ণনা দু'টি দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, তাদের নূরের দলীল ভিত্তিহীন। আসল হল উক্ত نُورٌ (জ্যোতি) দ্বারা নবৃওয়াতের নূর-কে বুঝিয়েছেন। কারণ জাহিলী যুগটা ছিল অন্ধকারের যুগ Might is right “জোর যার মুল্লুক তার”। নারীরা ছিল অবহেলিত। সামান্য কারণে যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ চলছিল। তখনও মুহাম্মাদ ৪০ বছর ধরে তাদের সমাজে ছিল। কই মুহাম্মাদ তখন তো কিছুই করতে পারেননি। হ্যাঁ যখনই ৪০ বছর বয়সে আল্লাহ তাকে নবুওয়াত দান করলেন তখন সেই নবৃওয়াতের নূর বা আলোর শক্তিতে সমস্ত জাহিলিয়্যাতের অন্ধকার দূরীভূত হল। নবুওয়াতের পূর্বে এটা সম্ভব হয়নি। সুতরাং উক্ত نُورٌ (জ্যোতি) দ্বারা নবৃওয়াতের জ্যোতিই যুক্তিসঙ্গত।
📄 নাবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে তৈরি না করলে আল্লাহ আকাশ-জমিন সৃষ্টি করতেন না– এ কথা বলা শির্ক
এ ব্যাপারে একটি জাল হাদীস, لَوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ. অর্থাৎ- আপনি যদি না হতেন, তাহলে আমি আকাশ-জমিন সৃষ্টি করতাম না।
* হাদীস বিশারদগণের মধ্যে ইমাম সাগানী “আল আহাদীদুল মাওযূ'আত” গ্রন্থে ৭ পৃষ্ঠায় বলেন, হাদীসটি জাল।
* যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, হাদীসটি যে দুর্বল, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
* ইবনুল জাওযী তার “মাওযূ'আত” গ্রন্থে (১/২৮৮-২৮৯) দীর্ঘ এক হাদীসে সালমান থেকে বর্ণনা করে বলেন, إِنَّهُ مَوْضُوعٌ হাদীসটি জাল।
* ইমাম সুয়ূতী “আল লাআলী” গ্রন্থে (১/২৭২) বলেন, إِنَّهُ مَوْضُوعٌ হাদীসটি জাল। (য'ঈফ ও জাল হাদীস সিরিজ ১/২৭৬ পৃঃ)
মহান আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন একমাত্র আল্লাহর নিজের জন্য। তাই তিনি বলেন,
لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ )
“জমিন ও আসমানে যা কিছু আছে সব সৃষ্টি আল্লাহর জন্য।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৮৪)
যেখানে আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিলেন যে, সকল কিছু একমাত্র আল্লাহর জন্য সেখানে নাবীর জন্য বলা মানে আল্লাহর সাথে নাবীকে ভাগ বসানো। এটাই শির্ক।
📄 নাবীদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ্ : হায়াতুন্ নাবী, জিন্দা নাবী– এ কথা বলা শির্ক
অনেকে বলে থাকেন হায়াতুন্ নাবী, জিন্দা নাবী। নাবীরা দুনিয়াবী ক্ববরে জীবিত এবং নামাযরত- এ ব্যাপারে একটা জাল দলীলও রয়েছে। যেমন নিম্নে বর্ণিত হাদীসটি,
إِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَا يُتْرَكُوْنَ فِي قُبُورِهِمْ بَعْدَ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً - وَلَكِنَّهُمْ يُصَلُّوْنَ بَيْنَ يَدَعِ اللَّهِ حَتَّى يُنْفَخَ فِي الصُّورِ.
অর্থাৎ- নাবীগণকে তাঁদের ক্ববরে চল্লিশ রজনীর পরে অবশিষ্ট রাখা হয় না। (অর্থাৎ- তাদেরকে জীবিত করা হয়) তাই তারা সলাত আদায় করতে থাকবেন যতক্ষণ না আল্লাহর সম্মুখে শিঙ্গায় ফুঁক না দেয়া হবে। (অর্থাৎ- ক্বিয়ামাতের পূর্ব পর্যন্ত।)
* হাদীসটি জাল : এটিকে ইমাম বায়হাক্বী “কিতাবুল হায়াতিল আম্বিয়া” গ্রন্থের (৪ পৃষ্ঠায়) উল্লেখ করেছেন।
হাদীসটি সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, সনদটি জাল, সনদে আহমাদ ইবনু 'আলী আল হাসনাবী মিথ্যার দোষে দোষী।
* তিনি হাকিম-এর শায়খ, হাকিম নিজেও তাকে দুর্বল বলেছেন এবং বলেন, তার হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
* আল খতীব বলেন : তিনি হাদীসের ব্যাপারে নির্ভরশীল ছিলেন না। তার সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ জুরজানী আল কুশশী বলেন, তিনি একজন মিথ্যুক রাবী। তার হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।
* ইমাম সুয়ূত্বী হাদীসটি “আল লাআলী” গ্রন্থে (১/২৮৫) উল্লেখ করে বলেন, হাদীসটি উভয় দিক থেকে সঠিক নয়।
* এছাড়া এ হাদীসটি সহীহ হাদীস এবং কুরআন বিরোধী যা এটির জাল হওয়ার প্রমাণ বহন করছে- পরবর্তীতে যার আলোচনা আসছে। সুতরাং উক্ত কুরআন বিরোধী কথায় বিশ্বাস করলে ঈমান তার থাকবে না। অনন্ত জীবন একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।