📄 মহান আল্লাহ তা‘আলা কোথায় আছেন? ‘আর্শে, নাকি সর্বত্র বিরাজমান?
এ প্রশ্নের জবাবে অনেকে (দলীল বিহীনভাবে) বলে থাকেন আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। এ কথা ভুল, সঠিক হলো আল্লাহ স্ব-শরীরে 'আরশের উপর বিদ্যমান এবং তার 'ইল্যু সর্বত্র বিরাজমান।
আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান নন। তিনি আসমানে 'আরশের উপর। এটি মহান আল্লাহর অন্যতম একটি গুণ। যেহেতু আল্লাহ কোথায়। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, বড় বড় 'আলিমদের মধ্যেও ভুল বিশ্বাস রয়েছে। তাই একটু বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো :
আল কুরআন : ১. আল্লাহ তা'আলা বলেন :
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ
“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের রব, যিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি 'আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছেন (উঠেছেন)।” (সূরাহ্ আল আ'রাফ ৭: ৫৪)
২. তিনি আরো বলেন : إِنَّ رَبَّكُمُ اللهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ))
“তোমাদের রব আল্লাহ যিনি ছয়দিনে আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর 'আরশে সমুন্নত হয়েছেন। দিনকে রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন, তারা একে অন্যকে দ্রুত গতিতে অনুসরণ করে এবং সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তারই আজ্ঞাবহ। জেনে রেখ, সৃষ্টি তার, হুকুমও (চলবে) তার, মহীয়ান, গরীয়ান আল্লাহ বিশ্বজগতের রব।” (সূরাহ্ আর্ রা'দ ১৩ : ০২)
৩. তিনি আরো বলেন : إِنَّ رَبَّكُمُ اللهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি 'আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই আল্লাহ তোমাদের রব। কাজেই তোমরা তাঁরই 'ইবাদাত করো, তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না।” (সূরাহ্ ইউনুস ১০ : ০৩)
৪. তিনি আরো বলেন : الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا ))
“তিনি আসমান, জমিন আর এ দুয়ের ভিতরে যা কিছু আছে তা ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর 'আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনিই রহমান, কাজেই তার সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস কর যে এ সম্পর্কিত জ্ঞান রাখে।” (সূরাহ্ আল ফুরক্বান ২৫ : ৫৯)
৫. তিনি আরো বলেন : ۞ اَللهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِّنْ دُوْنِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَّلَا شَفِيْعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ “আল্লাহ তিনিই যিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এ দুয়ের মধ্যকার সব কিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি 'আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।” (সূরাহ্ আস্ সাজদাহ্ ৩২ : ৪)
৬. তিনি আরো বলেন : ۞ هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ “তিনিই সে সত্তা যিনি ছয়দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি 'আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে, আকাশে যা কিছু উঠে। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তিনি তোমাদের (জ্ঞান শক্তির মাধ্যমে) সাথে রয়েছেন। তোমাদের কর্মকাণ্ড আল্লাহ দেখছেন।” (সূরাহ্ আল হাদীদ ৫৭:৪)
৭. তিনি আরো বলেন : ۞ أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ “তোমরা কি তোমাদেরকে নিরাপদ মনে করে নিয়েছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদেরকে জমিনে বিধ্বস্ত করে দিবেন না যখন তা হঠাৎ থর থر করে কাপতে থাকবে।” (সূরাহ্ মুল্ক ৬৭ : ১৬)
৮. তিনি আরো বলেন: أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ ) “কিংবা তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের ওপর পাথর বর্ষণকারী ঝড়ো হাওয়া পাঠাবেন না যাতে তোমরা জানতে পারো যে, কেমন (ভয়ানক) ছিল আমার সতর্কবাণী।” (সূরাহ্ আল মুল্ক ৬৭ : ১৭)
৯. তিনি আরো বলেন : تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ ) “মহাজ্ঞানী, পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ হতে কিতাবটি অবতীর্ণ হয়েছে।” (সূরাহ্ আল মু'মিন ৪০ : ২)
১০. তিনি আরো বলেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ ) “প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তার বান্দার ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।” (সূরাহ্ আল কাহফ ১৮ : ১)
১১. তিনি আরো বলেন : مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ وَالَّذِينَ يَمْكُرُونَ السَّيِّئَاتِ لَهُمْ عَدَابٌ شَدِيدٌ وَمَكْرُ أُولَئِكَ هُوَ يَبُورُ “কেউ সম্মান-সুখ্যাতি চাইলে (আল্লাহকে উপেক্ষা করে তা লাভ করা যাবে না) সে জেনে নিক যাবতীয় সম্মান-সুখ্যাতির অধিকারী হলেন আল্লাহ। তারই দিকে উত্থিত হয় পবিত্র কথাগুলো আর সৎকাজ সেগুলোকে উচ্চে তুলে ধরে। যারা মন্দ কাজের চক্রান্ত করে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের চক্রান্ত নিষ্ফল হবে।” (সূরাহ্ আল ফা-ত্বির ৩৫ : ১০)
১২. তিনি আরো বলেন :
إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ ﴾
“(স্মরণ করো) যখন আল্লাহ 'ঈসাকে বলেছিলেন, হে 'ঈসা! আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিব এবং তোমাকে আমার কাছে উঠিয়ে নিব এবং তোমাকে কাফিরদের (অতিরহিত কথা) হতে মুক্ত করব আর তোমার অনুসরণকারীদেরকে ক্বিয়ামাত পর্যন্ত অবিশ্বাসীদের ওপর বিজয়ী রাখব; অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন, তখন আমি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিবো যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করছ।” (সূরাহ্ আ-লি 'ইমরান ৩ : ৫৫)
بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللهُ عَزِيزًا حَكِيمًا )
“বরং আল্লাহ তাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন।” (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪ : ১৫৮)
১৩. তিনি আরো বলেন :
وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ وَهُوَ الْحَكِيمُ الْخَبِيرُ ﴾
“তিনি সকল বান্দার ওপর পরাক্রমশালী। তিনি প্রজ্ঞাময় জ্ঞানী।” (সূরাহ্ আল আন'আম ৬ : ১৮)
১৪. তিনি আরো বলেন :
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ )
“ফেরেশতা এবং রূহ (অর্থাৎ জিবরীল) আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।” (সূরাহ্ আল মা'আরিজ ৭০ : ৪)
১৫. তিনি আরো বলেন:
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى )
“তোমার মহান রবের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো." (সূরাহ্ আল আ'লা ৮৭: ১)
১৬. তিনি আরো বলেন :
هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً لَكُمْ مِنْهُ شَرَابٌ وَمِنْهُ شَجَرٌ فِيهِ تُسِيمُونَ )
“তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন যাতে আছে তোমাদের জন্য পানীয় আর তাতে জন্মে বৃক্ষলতা যা তোমাদের পশুগুলোকে খাওয়াও।” (সূরাহ্ আন্ নাহ্ল ১৬ : ১০)
১৭. তিনি আরো বলেন :
يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ )
“তিনি আসমান হতে পৃথিবীর সবকিছু পরিচালনা করেন, অতঃপর একদিন সব কিছু তার সমীপে উঠানো হবে।” (সূরাহ্ আস্ সাজদাহ্ ৩২ : ৫)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ প্রমাণ করে আল্লাহ আসমানের উপর।
সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত আল্লাহ 'আরশের উপর : ১. আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান নন। তিনি আসমানের উপর। রসূলুল্লাহ বলেন, মহান আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এ কথা ভুল। সঠিক কথা হলো মহান আল্লাহর আকার রয়েছে তিনি 'আরশের উপর স্ব-শরীরে বিরাজমান।
সহীহ হাদীস থেকে দলীলসমূহ,
ওয়াসাল্লাম আবূ হুরায়রাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকে? আমি তার ডাকে সাড়া দিবো। কে আমার কাছে প্রার্থনা করে? আমি তাকে দান করে দিবো। কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো। (বুখারী- হাঃ ১১৪৫, মুসলিম- হাঃ ১৮০৮, আবু দাউদ হাঃ ৪৭৩৫, তিরমিযী- হাঃ ৩৮৩৭, আহমাদ হাঃ ৭৮০৪, ইবনে মাজাহ হাঃ ১৪২৮)
২. রসূলুল্লাহ আরো বলেন: 'আলায়হি ওরাসাল্লাম
'আনহু 'আলায়হি ওরাসাল্লাম আবূ হুরায়রাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন : প্রত্যেক সপ্তাহে দুইবার সোমবার ও বৃহস্পতিবার সমস্ত মানুষের 'আমল আল্লাহ তা'আলার দরবারে পেশ করা হয় এবং প্রত্যেক মু'মিন বান্দাকে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না যে, আপন কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। তাদের সম্পর্কে বলা হয় আপোষ হতে পারে সেই পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দাও। (সহীহ মুসলিম- হাঃ ৩৬-[২৫৬৫], মিশকাত- হাঃ ৪৮১০)
উক্ত হাদীসে সোমবার ও বৃহস্পতিবারে আল্লাহর নিকট 'আমাল উঠানোর কথা এসেছে। সুতরাং আল্লাহ আসমানের উপর রয়েছেন।
৩. তিনি () আরো বলেন :
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو اِمْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا، فَتَأْبَى عَلَيْهِ، إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا.
“সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন। যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বিছানার দিকে ডাকবে কিন্তু সে বিছানায় আসতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে যিনি আকাশের উপর রয়েছেন তিনি তার প্রতি রাগান্বিত থাকবেন যে পর্যন্ত না তার স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট হবে।" (সহীহ মুসলিম- হাঃ ২১-[১৪৩৬])
৪. রসূলুল্লাহ আরো বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ، قَالَ: لَمَّا قَضَى اللَّهُ الخَلْقَ، كَتَبَ عِنْدَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي.
যখন আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল সৃষ্টি করলেন। তখন তার নিকট 'আরশের উপরে একটি কিতাবে লিখেছেন, নিশ্চয় আমার রহমত আমার গজবের উপর জয় লাভ করেছে। (সহীহুল বুখারী- হাঃ ৭৪৫৩, সহীহ মুসলিম- হাঃ ৭১৪৫, মুসনাদে আহমাদ হাঃ ৭৭৪০, তিরমিযী- হাঃ ৩৮৮৮)
নিশ্চয় 'আর্শ সপ্তম আসমানের উপর। এর উপর আল্লাহ রয়েছেন।
সহাবীদের বক্তব্য :
১. প্রথম খলীফা আবূ বাক্স সিদ্দীক্ব বলেন,
فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ : أَمَّا بَعْدُ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا ﷺ، فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ، وَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَيٌّ لَا يَمُوتُ.
যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ -এর 'ইবাদাত করে সে জেনে রাখুন মুহাম্মাদ মৃত্যু বরণ করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর 'ইবাদাত করে সে জেনে রাখুক আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপর রয়েছেন তিনি চিরঞ্জীব। তার মৃত্যু নেই। (সহীহুল বুখারী- হাঃ ১১৬৫)
২. দ্বিতীয় খলীফা 'উমার ইবনুল খাত্ত্বাব হতে বর্ণিত, তিনি একদা এক বৃদ্ধা মহিলার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন ঐ মহিলা তাকে দাড়াতে বললেন। 'উমার দাঁড়ালেন এবং তার সাথে কথাও বললেন। ইতোমধ্যে একলোক 'উমার এর উদ্দেশে বলল, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি তো এ মহিলার জন্য লোকেদেরকে আটকে 'আনহু ফেললেন (অর্থাৎ সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে)। 'উমার বললেন, সর্বনাশ! তুমি জান কি এই মহিলাটি কে? তিনি সেই মহিলা যার অভিযোগ সাত আসমানের উপর থেকে আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন। (শারহে আকীদাতুত্ তাহাবী পৃঃ ৩৭৯, ইসদুল গাবা ৭/৯১-৯২, কিতাবুর রদ্দ জাহমিয়া ২৬, তাফসীর ইবনু কাসীর ৪/৩৩৬)
ইমামদের অভিমত :
১. ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) [জন্ম ৮০ মৃত্যু ১৫০ হিঃ] বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ 'আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন এ অবস্থায় যে, 'আরশের প্রতি তার কোন প্রয়োজন নেই এবং তার উপর স্থির হয়ে থাকারও কোন প্রয়োজন নেই। (শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃঃ ৬১)
২. ইমাম মালিক (রহঃ) (জন্ম ৯৩- মৃত্যু ১৭৯ হিঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপর রয়েছেন। আর তার জ্ঞান রয়েছে সর্বত্র। কোন স্থানই তার জ্ঞানশূন্য নয়। (আল ইন্তিকা পৃঃ ৩৫, মাজমা'উল ফাতাওয়া ৫/৫৩, ইতিকাদুল আয়িম্মাহ্ আল আরবায়া ৩০, মাসাইলুল ইমাম আহমাদ পৃঃ ২৬৩)
৩. ইমাম শাফি'ঈ (রহঃ) [জন্ম ১৫০- মৃত্যু ২০৪ হিঃ] বলেন, আল্লাহ তা'আলা আসমানে 'আরশের উপর রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি যেভাবে ইচ্ছে করেন নিজ সৃষ্টির নিকটবর্তী হন এবং তিনি যেভাবে ইচ্ছা করেন দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। (ই'তিকাদুল আয়িম্মাহ্ আল আরবায়া ৪০, ইজতিমাউল জুযুশ ১৬৫, মাজমা'উল ফাতাওয়া ৪/১৮১, মুখতাসারুল উলুলিল আলবানী ১৭৬)
ইমাম শাফি'ঈ (রহঃ) আরো বলেছেন, আখেরাতে আল্লাহ তা'আলাকে চাক্ষুষ দেখা যাবে, ঈমানদারগণ তার দিকে তাকিয়ে থাকবেন। তারা তার কথা শুনতে পারবেন এবং তিনি 'আরশের উপর রয়েছেন। (মাজমু'আ ফাতাওয়া 'আব্দুল হাই, পৃঃ ২৬)
৪. ইমাম আহমাদ (রহঃ) (জন্ম ১৬৪ - মৃত্যু ২৪১ হিঃ) বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর রয়েছেন। (ই'তিকাদুল আয়িম্মাতিল আরবায়া পৃঃ ৬৪)
📄 আল্লাহর আকৃতি
মহান আল্লাহর আকৃতি বা আকার রয়েছে। যা আমরা ইতিপূর্বে কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করেছি। কিন্তু তার আকার কেমন, কি অবস্থায় তিনি আছেন, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেমন, এটা তিনি আমাদেরকে বলে দেননি। তাই আমাদের বিশ্বাস তার অবস্থান, আকৃতি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার শান অনুযায়ী হবে।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোন কিছুই তার সাদৃশ্য নেই, তিনি সবকিছুই শুনেন এবং দেখেন।” (সূরাহ্ আশ্ শূরা ৪২: ১১)
আল্লাহর আকার সম্পর্কে ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) বলেন,
وَلَهُ وَجْهُ وَنَفْسٌ كَمَا ذَكَرَ اللهُ تَعَالَى فِي الْقُرْآنِ : فَهُمَا ذَكَرَ اللَّهُ تَعَالَى فِي الْقُرْآنِ مِنْ ذِكْرِ الْوَجْهِ وَالْيَدِ وَالنَّفْسِ فَهُوَ لَهُ صِفَاتٌ بِلَا كَيْفٍ وَلَا يُقَالُ إِنَّ يَدَهُ قُوَّتُهُ أَوْ نِعْمَتُهُ لِأَنَّ فِيْهِ ابْطَالُ الصِّفَةِ وَهُوَ قُوْلُ أَهْلِ الْقَدْرِ وَالْإِعْتِزَالِ.
আল্লাহর মুখমণ্ডল ও দেহ আছে যেমন মহান আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন। কুরআনের বর্ণনায় আল্লাহর চেহারা, হাত, দেহের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা আল্লাহর দৈহিক বৈশিষ্ট্য। আমরা তার ঐ সকল অঙ্গের বিষদ বিবরণ অবগত নই। কেউ যেন আল্লাহর হাতকে কুদরতী হাত বা তার নিয়ামত না বলে। কেননা তাতে তার সিফাত বা গুণাবলীকে অস্বীকার করা হয়। আর যারা কুদরতী হাত বলে তারা কাদরিয়াহ ও মু'তাযিলাহ্ সম্প্রদায়ের লোক। (ইমাম আবু হানীফার ফিকহুল আকবার মোল্লা 'আলী ক্বারী হানাফীর শরাহসহ দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ্, বৈরুত ৫৮-৫৯ পৃষ্ঠা)
📄 আল্লাহর সুরত বা আকার
সুরত বা আকার আল্লাহর একটি বিশেষ গুণ। যা তার সত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহর আকার জানতে হলে আমাদের সমাজে প্রচলিত নিরাকার শব্দের আলোচনা করা প্রয়োজন। নিচে তা বর্ণনা করা হলো-
নিরাকার বিশ্লেষণ: নিরাকার বাংলা শব্দ। বাংলা গ্রামারানুসারে শব্দটি সন্ধি হয়েছে। সূত্রটি হলো অ + কার কিংবা আ + কার আকারের পর অ-কার কিংবা আ- কার থাকলে উভয় মিলে আকার হয় এবং আকার পূর্ব বর্ণে যুক্ত হয়। যেমন নিরাক্ষর, নিরাকৃতি, নিরাশয় ও নিরাকার। আসলে ছিল নির + অক্ষর, নির + আকৃতি, নির + আকার। নির অর্থবিহীন, বর্জিত, রহিত। আর আকার অর্থ হলো দেহ, শরীর, চেহারা, আকৃতি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিরাকার অর্থ হল দেহ, শরীর, চেহারা, আকার, আকৃতি, অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ, বিহীন, বর্জিত, রহিত। তাই নিরাকার শব্দটি আল্লাহর ব্যাপারে ব্যবহার করা চরম অপরাধ ও মুসলিম পরিপন্থী 'আক্বীদাহ্ বা বিশ্বাস। কারণ আল্লাহর আকার আছে তা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং কোন অবস্থাতেই মহান আল্লাহকে নিরাকার বলা যাবে না।
আল্লাহর আকার : আল্লাহর আকার বিষয়ে বহু দলীল বিদ্যমান। নিম্নে একটি হাদীস উদ্ধৃত করা হলো, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ النَّاسَ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، هَلْ نَرَى رَبُّنَا يَوْمَ القِيَامَةِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ لا : هَلْ تُضَارُّونَ فِي القَمَرِ لَيْلَةَ البَدْرِ؟ ، قَالُوا: لَا يَا
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাব? তিনি বললেন, মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে তোমাদের কি অসুবিধা হয়? তারা বললেন, না; হে আল্লাহর রসূল। তিনি বললেন, মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার রাতের চাঁদ দেখতে তোমাদের কি কোন অসুবিধা হয়? তারা উত্তরে বললেন, না; হে আল্লাহর রসূল। তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমরা এমনি ভাবে ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাবে। আল্লাহ মানুষকে একত্র করে বলবেন, যে ব্যক্তি যে বস্তুর 'ইবাদাত করত, সে যেন (আজ) তার অনুসরণ করে। তখন যে সূর্যের 'ইবাদাত করত, সে সূর্যের অনুসরণ করবে, আর যে চাদের 'ইবাদাত করত, সে চাদের অনুসরণ করবে। আর যে বিভিন্ন ত্বাগূতের অনুসরণ করত, সে তাদের অনুসরণ করবে। শুধু মাত্র বাকী থাকবে এই উম্মাত তাদের মধ্যে মুনাফিক্বগণও থাকবে। তখন যে আকারে এই উম্মাতের লোকেরা আল্লাহকে চিনবে তা বাদ দিয়ে অন্য আকৃতিতে তিনি তাদের সামনে আসবেন এবং দাবী করবেন আমি তোমাদের রব, তারা বলবে, তোমার কাছ থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। আমরা এখানেই থাকব, আমাদের রব, আমাদের নিকট না আসা পর্যন্ত। আমাদের রব আমাদের নিকট আসলে আমরা তাকে চিনতে পারব। তারপর আল্লাহ তার আপন আকার নিয়ে তাদের সামনে হাজির হবেন যাতে তারা চিনতে পারে। তখন তারা বলবে আপনি আমাদের রব এরপর তারা তাঁর অনুসরণ করবে। (সহীহ আল বুখারী, আধুনিক প্রকাশনী ৬ষ্ঠ খণ্ড)
হাদীসের শিক্ষা : এই হাদীসে দু'টি প্রধান শিক্ষা রয়েছে। যথা : আল্লাহকে ক্বিয়ামতের ময়দানে জান্নাতিরা দেখতে পাবেন। আর যাকে দেখা যাবে তিনি নিরাকার নন।
আল্লাহ তার বান্দাদের সামনে ক্বিয়ামতের ময়দানে দুইবার হাজির হবেন।
ক) নিজের আকার যা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে মুসলিমগণ বিশ্বাস করেন, সে আকার পরিবর্তন করে আল্লাহ তাদের সামনে এসে আল্লাহ দাবী করবেন। কিন্তু মুসলিমদের আক্বীদার বিরোধ হওয়ায় তাকে আল্লাহ হিসেবে তারা স্বীকৃতি দিবেন না। বরং প্রকৃত আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাবেন।
খ) আল্লাহ তার আপন আকার নিয়ে ক্বিয়ামতের দিন মুসলিমগণের সামনে আসবেন।
📄 আল্লাহ নিজেই তার কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বর্ণনা দিয়েছেন
কুরআন ও সহীহ হাদীসে আল্লাহর বহু গুণাবলী রয়েছে। অনুরূপ আল্লাহর বহু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রমাণও রয়েছে। নিম্নে তার কিছু বর্ণিত হলো,