📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 আল্লাহর সমকক্ষ তৈরির ব্যাপারে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ্

📄 আল্লাহর সমকক্ষ তৈরির ব্যাপারে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ্


মুশরিকদের একটা নিয়ম ছিল তারা কোন প্রকার সমস্যায় পড়ে গেলে তাদের যে মক্কা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি বা আরো বেশি দেব-দেবি ছিল যাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে রেখেছিল তাদের প্রকার ভেদে একেক জনের কাছে একেক প্রকার সমস্যা দূর করার জন্য অভিযোগ পেশ করত। এক আল্লাহই যে সমস্ত প্রকার অভিযোগ শুনবেন এবং পূরণ করতে পারেন এই বিশ্বাস তাদের ছিল না। তাই বিভিন্ন দেব দেবীর কাছে তারা ছুটাছুটি করত।
অনুরূপ দেখা যায় ঠিক একই নিয়মে অনেক কালিমা পড়া মুসলিমেরাও কোন প্রকার বিপদে পড়ে গেলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর দিকে ধাবিত না হয়ে বা হওয়ার পরেও দেখা যায় কোন না কোন মাখলুকের কাছে যেয়ে ধর্ণা দেয়। কেউ আবার কোন পীর বা ক্বর ওলার কাছে যেয়ে বলছে ওহে, মেরে মকছুদ পূরা করদে। অনুরূপ আরেকজনের কাছে যেয়ে সন্তানের জন্য, চাকরীর জন্য, ব্যবসায় উন্নতির জন্য, তার মনসন্তুষ্টি কামনা করে, মাকছুদ হাসিলের জন্য তার নিকট আবেদন করছে। কেউ বা বলছে ওহে, গুরু ভজনা, গুরু বিনা মুক্তি পাবি না। গুরু নামে আছে শুধা যিনি গুরু তিনি খোদা, না'ঊযুবিল্লাহ। দেখা যায় এ ধরনের একশ্রেণীর لَا إِلَهَ إِلَّا الله। পড়া মুসলিমদের সামনে পূর্ব যুগীয় মুশরিকেরাও হেরে যাচ্ছে।
মুক্তির মালিক সমস্ত প্রকার সাহায্যের মালিক শুধুমাত্র মহান আল্লাহ। তবে মানুষ মানুষের কাছে এতটুকু চাইতে পারে যতটুকু দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন তাও শুধু জীবিত মানুষের কাছে কোন মৃত মানুষের কাছে নয়, যেটা মানুষের দেয়া সম্ভব নয় সেটাও যদি কারো কাছে যেয়ে পেয়ে যায়। যেমন তাবীয, তাগা, বালা ব্যবহার করার পর যদি দেখা যায় রোগ ভালো হয়েছে তাহলে বুঝতে হবে এটা তার তাকদীরের ফায়সালা আগের থেকে হয়ে রয়েছে যে অমুক সময় তার রোগ ভালো হবে অমুক সময় সন্তান হবে চাকুরী হবে তাই তাকদীর অনুযায়ী এটা হয়েছে। দুনিয়ার কোন মাখলুক তাবীয, তাগা, বালার ক্ষমতায় এটা হয়নি। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। মাঝখানে শয়তান এসে মাজারের প্রতি তাবীযের প্রতি বিশ্বাস জন্মিয়ে তাকে ঈমানহারা করে শিরকের মাঝে ফেলে যাচ্ছে।
কোন মৃত মানুষ জীবিতদের কিছু দিতে পারে না। এমনকি নাবীরাও পর্যন্ত মৃত্যুর পরে কাউকে কোন উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। যদি পারতেন তাহলে নাবী মুহাম্মাদ মৃত্যুর পর 'আয়িশাহ্ সিদ্দীক্বা এবং মু'আবিয়ার মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হলে মুসলিমদের যে বিপুল ক্ষতি হয়েছিল অবশ্যই তিনি তা ফিরাতেন। কলিজার টুকরা হুসায়ন-কে যে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল তিনি তা ফিরাতেন। 'উমার ইস্তিষ্কার সলাত আদায় করতে যেয়ে মৃত্যু নাবী মুহাম্মাদ -এর ওয়াসীলাহ্ না দিয়ে জীবিত চাচা 'আব্বাস-এর ওয়াসীলায় দিয়ে দু'আ করেছিলেন। কারণ তিনি ভালো করেই জানতেন মৃত্যুদের কোন ক্ষমতা নেই কারো কিছু করার। এমনকি তাদের ওয়াসীলাহ্ দিয়ে দু'আ করলে সেটাও হবে শিক।
নাবী আলায়হিস সালাম-গণ এবং শহীদরাও কিছু কিছু নেক বান্দাদের যদিও মৃত্যুর পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে রিযিক দেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তারা জীবিত। সেটা হল ক্বরের জিন্দেগীতে দেহগতভাবে তাদের অক্ষত রাখা হবে। কিন্তু রূহ চলে যাবে ইল্লিয়্যিন নামক স্থানে।
এ মর্মে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِن لَّا تَشْعُرُونَ ) “যারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বুঝবে না।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৫৪)
তারা জীবিত কিন্তু এ ব্যাপারে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই। তোমরা তা বুঝবে না। তাদের জীবিত অর্থ হচ্ছে দেহগতভাবে তারা ক্বরের জিন্দেগীতে জীবিত। কিন্তু রূহ বা আত্মা নফস্ নিয়তগতভাবে তারা মৃত্যুবরণ করে দুনিয়ার জীবন থেকে পাড়ি দিয়ে পরপারে চলে গেছেন।
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন নিজেই নাবী মুহাম্মাদ ওয়াসাল্লাম -কে সম্বোধন করে বলেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيْتُونَ ﴾ “তুমিও মরবে আর তারাও মরবে।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ৩০)
অর্থাৎ- হে নাবী! আপনার পূর্বে যারা এসেছিল তারা মরে গেছে, সুতরাং আপনিও একদিন মৃত্যুবরণ করবেন।
রসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুবরণ করলেন তখন 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ওয়াসাল্লাম না মৃত্যুবরণ করেননি। তখন আবূ বাক্ রদিয়াল্লাহু আনহু আয়াত পেশ করলেন,
"কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে?" (সূরাহ্ আ-লি 'ইমরান ৩: ১৪৪)
অর্থাৎ পূর্ব ধর্মে ফিরে যাবে। 'উমার তখন থরথর করে কাঁপছিলেন এবং আয়াত মনে না থাকায় বলছিলেন আমার মনে হয় এই আয়াত সবেমাত্র নাযিল হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
উক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় নাবী অবশ্যই মৃত্যুবরণ করেছেন। যারা তাদের সম্পর্কে জীবিত ধারণা করেন এবং দুনিয়াবী ক্ববরে জিন্দা নাবী হায়াতুন নাবী বলে সম্বোধন করেন, তাদের ক্বরের পাশে যেয়ে সালাম দিলে তিনি শুনতে পান এবং সালামের জবাব দেন ডাক দিলে হাত বের করে দেন, কারো বা এই বিশ্বাস নাবীরা করে জিন্দা এবং সলাতরত অবস্থায় তাদের এসব ভ্রান্ত ধারণাকে খণ্ডন করার জন্য মহান আল্লাহ নিজেই বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ
“তার চেয়ে অধিক গুমরাহ কে, যে আল্লাহ্র পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা ক্বিয়ামাত পর্যন্ত তাকে সাড়া দেবে না, আর তাদের ডাকাডাকি সম্পর্কেও তারা (একদম) বেখবর?।” (সূরাহ্ আল আহাক্বাফ ৪৬ : ৫)

📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 আল্লাহর সম্পর্কে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ্ পোষণ করা মুশরিকদের নীতি

📄 আল্লাহর সম্পর্কে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ্ পোষণ করা মুশরিকদের নীতি


আল্লাহর প্রতি ভ্রান্ত 'আক্বীদাহ্ ছেড়ে দেয়া ফার্য। এমনকি ভ্রান্ত, মন্দ, খারাপ 'আক্বীদাহ্ বাদ না দিলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। আল্লাহ বলেন,
وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ
“এবং মুনাফিক্ব পুরুষ, মুনাফিক্ব নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিকা নারী যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা রাখে তাদেরকে আল্লাহ শাস্তি দিবেন।” (সূরাহ্ আল ফাত্‌হ ৪৮: ৬)
খুবই আশ্চর্যের বিষয় অধিকাংশ মুসলিম এর 'আক্বীদাহ্ সঠিক নয়। কারণ তারা সঠিকভাবে আল্লাহকে চেনেন না। এর মধ্যে শামিল রয়েছেন সাধারণ মানুষ। উচ্চশিক্ষিত ও বহু পি-এইচ.ডি সম্মান অর্জনকারী। ইসলামী সংগঠনের নেতা ও কর্মীগণ, মুরশিদ ও মুরীদগণ, কতিপয় 'আমীর ও মামুরগণ, দেশ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন 'আলিমে দ্বীনগণ, যুগ যুগ ধরে তাফসীর ও হাদীস পাঠদানকারী শিক্ষক ও ছাত্রগণ, হাদীসের অনুবাদক ও ব্যাখ্যাকারী শাইখুল হাদীস ও মুফাস্সিরগণ।
নিম্নে মানব সমাজে বিভিন্ন 'আক্বীদায় বিশ্বাসীদের আল্লাহর সম্পর্কে ভ্রান্ত 'আক্বীদার একটি প্রতিবেদন আলোচনা করা হলো :
জাহমিয়াহ্: আল্লাহ এমন একটি শূন্য সত্তা, যার শ্রবণ, দর্শন ও দয়াগুন কিছুই নেই। আল্লাহ হলো নাম ও গুনহীন সত্তা। তিনি সর্বত্র বিরাজমান, তিনি 'আরশের উপর নেই। এদের নিকট আল্লাহর হাত অর্থ শক্তি, এরাই আল্লাহর গুণাবলীকে প্রথম পরিবর্তন করে। এরা হলো জাহমিয়াহ্। জাম ইবনু সাওয়ান সমরকন্দী (১২৮ হিঃ) ইয়াহূদীদের প্রবঞ্চনের শিকার হয়ে ইসলামের মধ্যে এ বিভ্রান্তির অনুপ্রবেশ করান। অবশ্য এ অপরাধে আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে তাকে ফাঁসী দেয়া হয়- (ইমাম তাকিউদ্দীন আহমাদ ইবনু তাইমিয়াহ্ [৬৬১-৭২৮ হিঃ], মাজমা'উল ফাতাওয়াহ্- ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৬৬)। তার ফাঁসী হলেও তার অনুসারীরা এ ভ্রান্ত 'আক্বীদাহ্ পোষণ করতে থাকে। এর ফলে তার নামে জাহমিয়াহ্ মাযহাব সৃষ্টি হয়।
মুতাযিলাহ্ : আল্লাহ হলেন এমন সত্তা যার কোন গুণাবলী নেই। এদের মতে আল্লাহ 'ইল্‌ম (জ্ঞান) ছাড়াই 'আলিম (সর্বজ্ঞ), কুদরত (শক্তি) ছাড়াই ক্বদীর (সর্বশক্তিমান) হায়াত (জীবন) ছাড়াই হাই (চিরঞ্জীব) ইত্যাদি- (মুহাম্মাদ বিন 'আবদুল করীম শাহরস্তানী, আল মিনাল ওয়ান নিহাল- বৈরুত : দারুল মারিফাহ্ তাবি ১ম খণ্ড, পৃঃ ৮৫-৯১)
এরা হলো মুতাযিলাহ্ মাযহাবের অনুসারী। এদেরই ইমাম হলেন ওয়াসিল বিন 'আত্বা (৮০-১৩১)।
আশ্আরিয়াহ্: আল্লাহ হলেন এমন সত্তাত যিনি 'আলিম (সর্বজ্ঞ) ক্বদীর (সর্বশক্তিমান), হাই (চিরঞ্জীব), মুরীদ (ইচ্ছাকারী), মুতাকাল্লিম (কথক), সামী (শ্রোতা), বাসীর (দ্রষ্টা)। এই কয়টি গুণ ছাড়া তাঁর আর কোন গুণ নেই। তারা আল্লাহর অন্যান্য গুণাবলী অস্বীকার করেন। (প্রাগুক্ত)
এরা হলো আশ্আরিয়াহ্ মাযহাবের অনুসারী। এদের ইমাম হলেন আবুল হাসান 'আলী বিন ইসমা'ঈল আশ্'আরী। আল্লাহর রহমাতে ইমাম সাহেব তার ভুল বুঝতে পেরে ৩০০ হিঃ মুসলিম হয়ে যান। (প্রাগুক্ত) কিন্তু তার মাযহাবটি থেকে যায়।
মুজাজ্জামি'আহ্ : আল্লাহ এমন সত্তা যার নাম ও গুণাবলী আছে। তার আকার আছে, যেমন- মানুষের আকার আছে। এরা হলো মুজাজ্জামি'আহ্ (কায়াবাদী) মাযহাবের অনুসারী। (ইমাম আবুল হাসান আল আশ্আরী, আল ইবানাহ্ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ)
হুলূলিয়াহ্ : আল্লাহ এমন নাম ও গুণাবলী সম্পূর্ণ সত্তা যিনি সৃষ্টিজীবের সঙ্গে মিশে থাকেন। এরা হুলূলিয়াহ্ সর্বেশ্বরবাদ মাযহাবের অনুসারী। (শরহস্তানী, আল মিলাল, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৯৩, ১০৫, ১০৮) এদের 'আক্বীদাহ্ হলো মু'মিনদের হৃদয় আল্লাহর 'আর্শ। এরা ভাবেন মানুষ, পশু ও পৃথিবীর সব কিছুই মূলতঃ আল্লাহ। না'ঊযুবিল্লাহ।
হিন্দুয়ানী 'আক্বীদাহ্:
আল্লাহ তিনি যিনি অদৃশ্য ও নিরাকার অথচ সর্বত্র বিরাজমান- (ইমাম তায়মিয়্যাহ্, আল ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা, ইসকানদারিয়া, দারুল বাসিয়া, তাবি, পৃঃ ৪১)। এখানে আল্লাহর পরিচয়ে তিনটি শব্দ এসেছে। যথা:
(১) অদৃশ্য, (২) নিরাকার ও (৩) সর্বত্র বিরাজমান।
এই তিনটির মধ্যে আল্লাহ অদৃশ্য তা ঠিক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শব্দদ্বয় ঠিক নয়। কারণ এটি জাহমিয়াহ্ ও হিন্দুয়ানী 'আক্বীদাহ্- (ইসলাম শিক্ষা, নবম-দশম শ্রেণী, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তক, ঢাকা বোর্ড, পৃঃ ২৩-২৫)। যেমন- হিন্দু ধর্মে রয়েছে। ঈশ্বর। তিনি এক অদ্বিতীয়। তিনি নিরাকার ও সর্বব্যাপী। আল্লাহ নিরাকার ও সর্বত্র বিরাজমান- এই 'আক্বীদাহ্ জাহমিয়া ও হিন্দুদের নিকট থেকে আমদানী হয়ে ভারত উপমহাদেশের প্রায় মুসলিমদের 'আক্বীদায় পরিণত হয়েছে।
নোট : উক্ত ‘আক্বীদাগুলো সব পথভ্রষ্ট 'আক্বীদাহ্। কোন সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ হলেন নাম ও গুণাবলী সংযুক্ত সত্তা। তাঁর গুণাবলী আশ্'আরীদের ন্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তেমনি হুলুলিয়্যাহ্-সর্বেশ্বরবাদীদের ও কায়াবাদীদের ন্যায় সাদৃশ্যমূলক নয়। বরং আল্লাহর গুণাবলী আল্লাহর মতই। তিনি নিরাকার ও সর্বত্র বিরাজমান নয়। কেউ জেনে বুঝে স্বজ্ঞানে আল্লাহকে নিরাকার ও সর্বত্র বিরাজমান ও উপরের বর্ণিত 'আক্বীদাহ্ বিশ্বাস করলে সে তাদের মাযহাবেরই অন্তর্ভুক্ত হবেন। চিন্তা করে দেখুন আপনি মুসলিম থাকবেন কিনা। উযূ করার পর বায়ু (বাতাস) বের হলে যেমন উযূ থাকে না। রোযা অবস্থায় দুপুরে জেনে বুঝে খাবার খেলে যেমন রোযা থাকে না। কোন একজন 'আলিম ব্যক্তিও যদি সুন্দর টুপি পরে সুন্নাতী লেবাস পরে উত্তম খুশবু মেখে সলাতের জন্য মাসজিদে আসে কিন্তু সে উযূ করেনি। এই ব্যক্তির সলাত যেমন হবে না ঠিক তেমনি উক্ত 'আক্বীদাহ্ পোষণ করলে ঈমান তার থাকবে না।
উপরোল্লিখিত সকল ভ্রান্ত 'আক্বীদাহ্ হতে আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন।

📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 আল্লাহর সাথে সাদৃশ্য করা শির্ক

📄 আল্লাহর সাথে সাদৃশ্য করা শির্ক


আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান নন বরং তিনি আসমানে। এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে তারা বলে, আল্লাহ মানুষের অন্তরে বিদ্যমান এবং এক শ্রেণী রয়েছে যারা বলে আল্লাহ সর্বত্র বিদ্যমান। মানুষের অন্তরে আল্লাহ থাকলে একজন মানুষের অন্তরে একজন আল্লাহ স্বীকার করলে বহু আল্লাহর স্বীকৃতি প্রদান হয়। বর্তমানে ছয়শ' কোটি মানুষের জন্য ছয়শ' কোটি আল্লাহর প্রয়োজন হয়। আর এটা শির্ক। অপর দিকে আল্লাহকে সর্বত্র বিরাজমান বিশ্বাস করলে আল্লাহকে অপবিত্র মানা হয়। কেননা, পৃথিবীর সকল স্থানই পবিত্র নয়। যে স্থান অপবিত্র সে স্থানে আল্লাহ থাকলে তাঁর মহত্ব থাকে না তাই তিনি সর্বত্র নয়। বরং তার ক্ষমতা ও ইলম সবত্র রয়েছে। মহান আল্লাহ আসমানে 'আশের উপর রয়েছেন। কুরআন মাজীদে তিনি বলেন,
﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ ﴾
“তোমরা কি ঐ আল্লাহ থেকে নিরাপত্তা লাভ করেছ যিনি আসমানে রয়েছেন? তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীর মধ্যে ধ্বসিয়ে দিবেন। অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে। না তোমরা ঐ আল্লাহ থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ যিনি আকাশে রয়েছেন। তিনি তোমাদের ওপর পাথর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী।” (সূরাহ্ মুল্ক ৬৭ : ১৬-১৭)
﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾
“তিনি পরম দয়াময় 'আরশের উপর সমাসীন রয়েছে।” (সূরাহ্ ত্ব-হা- ২০ : ৫)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মাওলানা মুহিউদ্দীন খান-এর বাংলা মা'আরেফুল কুরআনে যা দেয়া হয়েছে তা হুবহু তুলে ধরা হলো,
اِسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ - عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى. অর্থাৎ 'আরশের উপর সমাসীন হওয়া।
এ সম্পর্কে পূর্ববর্তী বুযুর্গগণের উক্তি হচ্ছে যে, এর স্বরূপ ও অবস্থা কারও জানা নেই। এটা مُتَشَبِهَاتٌ তথা দুর্বোধ্য বিষয়াদির অন্যতম। এরূপ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, 'আরশের উপর সমাসীন হওয়া সত্য। এ অবস্থা আল্লাহর শান অনুযায়ী হবে। জগতের কেউ তা উপলব্ধি করতে পারে না। (মা'আরেফুল কুরআন- ৮৪৫ পৃষ্ঠা)
আল্লাহর আকার বা আকৃতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট নমুনা পাওয়া যায় না। তাই সেদিকে না যাওয়াই মু'মিনের কর্তব্য। তবে আল্লাহর আকার বা আকৃতি আছে এটার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে অন্যথায় অসংখ্য আয়াত এবং হাদীস মিথ্যা হয়ে যায়।
ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন, الْإِسْتَوَاءُ مَعْلُومٌ، وَالْكَيْفِيَةُ مَجْهُولٌ وَالسُّؤَالُ عَنْ هَذَا بِدْعَةٌ، وَالْإِيْمَانُ بِهِ وَاجِبٌ. ইসতাওয়া বা সমাসীন হওয়ার কথা জ্ঞাত, অবস্থা বা স্বরূপ অজ্ঞাত, সমাসীনের উপর ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত। (মুয়াত্ত্বা মালিক হাঃ ৫, দারিমী ৩৩ পৃষ্ঠা)
মু’আবিয়াহ্ বিন হাকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ-কে বললাম, একটি দাসী উহুদ ও জাওয়ানিয়্যাহ্’র পাশে আমার বকরী চড়াত। হঠাৎ করে বাঘ এসে একটি বকরী নিয়ে চলে গেল। আর আমি বানী আদমের একজন আফসোসকারী ব্যক্তি, যেমন তারা আফসোস করে। আমি দাসীকে একটি চড় মারলাম। আর এটা রসূলুল্লাহ আশায়ারী-এর নিকট বড় অপরাধ বলে গণ্য হল। অতঃপর আমি বললাম, তবে কি আমি তাকে আযাদ করে দিব? তিনি বললেন, তাকে নিয়ে আস। আমি তাকে নিয়ে আসলাম। নাবী দাসীকে বললেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। রসূলুল্লাহ বললেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রসূল। রসূলুল্লাহ বললেন, তাকে আযাদ করে দাও। কেননা সে মু’মিনাহ্। (মুসলিম- হাঃ ৩৩-[৫৩৭], আবূ দাউদ হাঃ ৯৩০, মিশকাতুল মাসাবীহ হাঃ ৩৩0৩, বুখারী’র “জুযউল ক্বিরাআত”)

📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 অস্তিত্ব ও আকার আকৃতিতে যে বিশ্বাস আনতে হবে তার কিছু আলোচনা

📄 অস্তিত্ব ও আকার আকৃতিতে যে বিশ্বাস আনতে হবে তার কিছু আলোচনা


আল্লাহ কেমন। এই প্রশ্ন করলেই তার গুণাবলী চলে আসবে। এ ধরনের প্রশ্ন মানুষ করতে পারে। তাই আল্লাহ তা’আলা এর জবাবে বলেন,
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾
“তাঁর (আল্লাহর) মতো কোন কিছু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরাহ্ আশ্ শূরা ৪২ : ১১)
অতএব তার গুণাবলী ঠিক তেমনি যেমন তার জন্যে উপযোগী হয়। এই বিষয়ে আলোচনার পূর্বে তাওহীদ সম্পর্কে যারা গভীর জ্ঞান রাখেন তারা ৬টি শর্তারোপ করেছেন।
১. تَأْوِيلٌ )তা’বীল) করা যাবে না; তাবীল অর্থ হচ্ছে, অপব্যাখ্যা করা, যেমন আরবী يَدٌ )ইয়াদুন) শব্দের অর্থ হচ্ছে হাত। ‘ইয়াদুন’ শব্দের অর্থ হাত না করে যদি অর্থ করা হয় শক্তি, সামর্থ্য, বল বা ক্ষমতা তাহলে ‘ইয়াদুন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করা হলো।
আল্লাহ তা'আলার সুমহান গুণাবলীর মধ্যে একটি গুণ হলো আল্লাহর হাত। এখানে অন্য কোন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বা অন্য কোন ব্যাখ্যা করা যাবে না। কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই বিশ্বাস করতে হবে আল্লাহ তা'আলার হাত আছে।
২. تَجْسِيمٌ (তাজসীম) ঠিক করা যাবে না, তাজসীম অর্থ হচ্ছে, দেহগঠন বা গঠনাকৃতি প্রকৃতি নির্ধারণ করা। যেমন এভাবে বলা যে আল্লাহর দেহ মানুষের মতো বা ফেরেশতার মতো বা অন্য কোন সৃষ্টির মতো (না'ঊযুবিল্লাহ)। আল্লাহর ব্যাপারে এমন ধরনের কোন ধারণা পোষণ করা যাবে না।
৩. تَمْثِيلُ وَتَشْبِيَهُ (তাম্সীল ও তাম্বীহ) পেশ করা যাবে না। তামসীল অর্থ হচ্ছে উদাহরণ পেশ করা বা নমুনা পেশ করা। আর তাশবীহ অর্থ হচ্ছে সাদৃশ্য স্থাপন করা। এভাবে বলা যে যেহেতু আল্লাহর হাত আছে, সেহেতু আল্লাহর হাত মানুষের হাতের মতো বা অন্য কোন সৃষ্টির হাতের মতো (না'ঊযুবিল্লাহ)। বিশ্বাস করতে হবে আল্লাহর হাত অবশ্যই আছে, তবে আল্লাহর হাত আল্লাহর হাতের মতই। কোন সৃষ্টির সাথে তার উদাহরণ পেশ করা যাবে না। কোন সৃষ্টির সাথে আল্লাহর হাতের সাদৃশ্য নেই।
৪. تَكْيِف (তাকয়িফ) ধারণা করা যাবে না। তাকয়ীফ অর্থ হচ্ছে প্রকৃতি বর্ণনা করা বা তার ধরণ নির্ধারণ করা। আল্লাহর ব্যাপারে কোন প্রকৃতি বা ধরন বা কোন ধরনের আকৃতি ধারণা করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা মানব কল্পিত সব ধরনের প্রকৃতি, ধরণ বা আকৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তিনি সর্বশ্রোতা-সর্বদ্রষ্টা আর তার শুনা ও দেখা তার মতই। কোন সৃষ্টি তার মত নয়। তিনি অতুলনীয় তার অনুরূপ সাদৃশ্য আর কেউ নেই।
৫. تَعْطِيلٌ)তা'ত্নীল) মনে করা যাবে না। তা-তীল অর্থ হচ্ছে কোন কিছুকে অকার্যকর মনে করা, ভঙ্গ করা, বাদ দেয়া, এক পর্যায় অস্বীকার করা। আল্লাহ তা'আলার সুমহান গুণাবলীকে অকার্যকর মনে করা, বাদ দেয়া বা অস্বীকার করা যাবে না। মহান আল্লাহর সুমহান গুণাবলীকে সত্য বলে স্বীকার করা এবং তার গুণাবলীতে তিনি এক ও অদ্বিতীয় এ কথার ঘোষণা দেয়াই হচ্ছে ঈমান।
৬. আল্লাহ তা'আলা সকল সুমহান গুণাবলী জ্ঞাত ও পরিচিত, তার কৈফিয়ত বা ধরণ অদৃশ্য, সমস্ত গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা অর্থাৎ সমস্ত গুণাবলীকে সত্য হিসেবে মেনে নেয়া ফার্য আর এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা বিদআত ও গুমরাহী। আল্লাহ তা'আলা ও আল্লাহর রসূল আল্লাহর যে সিফাত বা গুণ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, কোন প্রশ্ন ছাড়াই সীফাত বা গুণকে মেনে নেয়াই হচ্ছে প্রকৃত ঈমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00