📄 মহান আল্লাহর বড়ত্ব এবং তার উচ্চ মর্যাদার বর্ণনা
মহান আল্লাহ স্বশরীরে কত বড় তার পূর্বে একটা দৃষ্টান্ত যেমন এই পৃথিবী থেকে চন্দ্র একটু ছোট্ট তবে পৃথিবী থেকে সূর্য নয় কোটি তের লক্ষ গুণ বড় সূর্য থেকে একটা নক্ষত্র কত বড় বিজ্ঞানীরা তা মেপে শেষ করতে পারেনি যে কত কোটি বিলিয়ন বড়। আর কত কোটি নক্ষত্র মহাশূন্যে ভাসছে তাও বিজ্ঞানীরা গুণে শেষ করতে পারেনি। এমন অনেক নক্ষত্র রয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে পৃথিবীর দিকে আলো বিকিরণ করছে। কিন্তু এখনও তাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছায়নি। তাহলে পাশাপাশি এই অসংখ্য নক্ষত্র যে মহাশূন্যে ভাসছে সেই মহাশূন্য কত প্রশস্ত। নক্ষত্রের চেয়ে আরো অনেক অনেকগুণ বড় গ্ল্যাক্সি এর পরিধি নক্ষত্রের চেয়ে অনেক বড় এবং সংখ্যাও নক্ষত্রের চাইতে অনেক বেশি। গ্ল্যাক্সির চাইতে আরো অনেক অনেকগুণ বড় মিল্ক ওয়ে তার পরিধি বিজ্ঞানীরা এখনও পাইনি যার সংখ্যাও গ্ল্যাক্সি থেকে অনেক বেশী। মিল্কওয়ে থেকে আরো অনেক অনেক বড় ব্লাক হোল, ব্লাক হোল যে এত বড় মহাশূন্যের এ সমস্ত কিছু পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্যা, নক্ষত্র গ্ল্যাক্সি, মিল্কওয়ে, এসব কিছু যদি একটি ব্লাক হোল খেয়ে নেয় তার পরেও তার পেটের এক কিয়দংশ ভরবে না। যার সংখ্যাও সবচেয়ে বেশী আর এ মহাশূন্যে এত অসংখ্য ব্লাক হোল রয়েছে যা বিজ্ঞানীরা গুণে এখনও শেষ করতে পারেনি। তাহলে এ সমস্ত কিছুর উপর যে আকাশ বিস্তৃত হয়ে আছে সে আকাশ কত বড়। আর সমস্ত আকাশকে ঘিরে আছে আল্লাহর 'আরশ যে সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেন-
وسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ )
“তাঁর কুরসী আকাশ ও পৃথিবী পরিবেষ্টন করে আছে।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৫৫)
আর এ সমস্ত 'আরশের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত মহান আল্লাহ। তাহলে সেই মহান আল্লাহ কত বড়। তার এই বড়ত্বের পরিধি অনুমান করা মানুষের এই ক্ষুদ্রজ্ঞানে সম্ভব নয়।
সপ্ত আকাশ সপ্ত জমিন এবং উভয়ের ভিতর যা কিছু আছে সমস্ত কিছুকে একত্র করে মহান আল্লাহর হাতের তালুতে রাখলে এতই নগণ্য ও ছোট মনে হবে। যত না ছোট ও নগণ্য মনে হয় একজন মানুষের হাতের তালুতে একটি সরিষার দানা রাখলে। (তাফসীর ইবনে জারীর, ত্বাবারানী ২৪/৩২)
তাহলে সহজেই অনুধাবনযোগ্য যে আল্লাহ স্বশরীরে কত বড় সে আল্লাহর পক্ষে আদৌ প্রয়োজন হয় না যে তিনি পৃথিবীর সর্বদা বিচরণ করবেন। পৃথিবীর আনাচে কানাচে পাক-নাপাক জায়গায় ঘুরে বেড়াবেন। তিনি হলেন সমস্ত পবিত্রতার অধিকারী। সুতরাং তার জন্য প্রয়োজন হয় না মানুষের শরীরের নাপাক রক্তমাংশের টুকরা কলবে অবস্থান করা বা পায়খানা প্রস্রাবের টেংকির উপরে বসে থাকা। বরং তার জ্ঞান এত প্রখর যে তিনি জ্ঞানের দ্বারাই সব পরিচালনা করেন তাই তো তিনি বলেছেন,
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ )
“তোমার শাহারগের চাইতেও আমি তোমার নিকটে, অর্থাৎ সেটা তার জ্ঞানের দ্বারা।” (সূরাহ্ ক্বাফ ৫০: ১৬)
তিনি আরো বলেন, وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ ﴾ "গাছের এমন কোন পাতাও ঝরে পড়ে না যা তিনি জানেন না। জমিনের গহীন অন্ধকারে কোন শস্য দানা নেই, নেই কোন ভেজা ও শুকনো জিনিস যা সুস্পষ্ট কিতাবে (লিখিত) নেই।” (সূরাহ্ আল আন'আম ৬: ৫৯)
আল্লাহ তা'আলার বাণী- وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ) “তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা নিরূপণ করতে পারেনি। ক্বিয়ামাতের দিন সমগ্র পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোতে থাকবে।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ৬৭)
'আনহু থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একজন ইবনু মাস্ঊদ ইয়াহূদী পণ্ডিত রসূল-এর নিকট এসে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাত কিতাবে) দেখতে পাই যে, আল্লাহ তা'আলা সমস্ত আকাশমণ্ডলীকে এক আঙ্গুলে, সমস্ত জমিনকে এক আঙ্গুলে, বৃক্ষরাজিকে এক আঙ্গুলে, পানি এক আঙ্গুলে ভূতলের সমস্ত জিনিসকে এক আঙ্গুলে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতকে এক আঙ্গুলে রেখে বলবেন, আমিই সম্রাট।'
'আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে রসূল ইয়াহূদীয় পণ্ডিতের কথার সমর্থনে এমনভাবে হেসে দিলেন যে, তাঁর দন্ত মুবারাক দেখা যাচ্ছিল। অতঃপর তিনি এ আয়াতটুকু পড়লেন : وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ) “তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা নিরূপণ করতে পারেনি। ক্বিয়ামাতের দিন সমগ্র পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোতে থাকবে।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ৬৭)
মুসলিমের হাদীসে বর্ণিত আছে, পাহাড়-পর্বত এবং বৃক্ষরাজি এক আঙ্গুলে থাকবে, তারপর এগুলোকে ঝাকুনি দিয়ে তিনি বলবেন, 'আমিই রাজাধিরাজ, আমিই আল্লাহ।'
বুখারীর অপর এক বর্ণনায় আছে, সমস্ত আকাশমণ্ডলীকে এক আঙ্গুলে রাখবেন। পানি এবং ভূতলে যা কিছু আছে তা এক আঙ্গুলে রাখবেন। (বুখারী- ও মুসলিম)
ইবনু 'উমার মারফু' হাদীসে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ বলেন:
“ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা সমস্ত আকাশমণ্ডলীকে ভাঁজ করবেন। অতঃপর সেগুলোকে ডান হাতে নিয়ে বলবেন, 'আমি হচ্ছি শাহানশাহ (মহারাজা)। অত্যাচারী আর যালিমরা কোথায়? অহংকারীরা কোথায়?” (মুসলিম- হাঃ ২৪-[২৭৮৮], ইবনু মাজাহ হাঃ ৪২৭৫, আবূ দাউদ হাঃ ৪৭৩২)
ইবনু 'আব্বাস বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ বলেন:
مَا السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالأَرَضُونَ السَّبْعُ فِي كَفِّ الرَّحْمَنِ إِلَّا كَخَرْدَلَةٍ فِي يَدِ أَحَدِكُمْ.
“সাত তবক আসমান ও জমিন আল্লাহ তা'আলার হাতের তালুতে ঠিক যেন তোমাদের কারো হাতে একটা সরিষার দানার মতো।” (তাফসীর ইবনু জারীর লিত্ব ত্ববারী হাঃ ২৪/৩২)
ইবনু যায়দ বলেন, 'আমার পিতা আমাকে বলেছেন, রসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
“কুরসীর মধ্যে সপ্তাকাশের অবস্থান ঠিক যে, একটি ঢালের মধ্যে নির্দিষ্ট সাতটি দিরহামের (মুদ্রার) মতো।” তিনি বলেন, আবূ যার বলেছেন, 'আমি রসূলুল্লাহ -কে এ কথা বলতে শুনেছি: “আর্শের মধ্যে কুরসীর অবস্থান হচ্ছে ঠিক ভূ-পৃষ্ঠের কোন উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকা একটি আংটির মতো।” (তাফসীর ইবনু জারীর লিত্ব ত্ববারী হাঃ ৪৫২২, আসমা ওয়াস্ সিফাত্ লিল বায়হাক্বী হাঃ ৫১০)
ইবনু মাস্'ঊদ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন :
بَيْنَ السَّمَاءِ الدُّنْيَا وَالَّتِي تَلِيهَا مَسِيرَةُ خَمْسُ مِائَةِ عَامٍ، وَمَا بَيْنَ كُلِّ سَمَاءٍ وَسَمَاءٍ مَّسِيْرَةُ خَمْسُ مِائَةِ عَامٍ، وَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ السَّابِعَةِ وَالْكُرْسِيِّ مَسِيرَةَ خَمْسُ مِائَةِ عَامٍ، وَالْعَرْشُ فَوْقَ الْمَاءِ، وَاللهُ فَوْقَ الْعَرْشِ لَا يَخْفَى عَلَيْهِ شَيْءٌ مِّنْ أَعْمَالِكُمْ.
“দুনিয়ার আকাশ এবং এর পরবর্তী আকাশের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ' বছরের পথ। আর এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ' বছরের পথ। এমনিভাবে সপ্তম আকাশ ও কুরসীর মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ' বছরের পথ। কুরসী এবং পানির মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ, আর 'আর্শ হচ্ছে পানির উপরে। আর আল্লাহ তা'আলা রয়েছেন 'আরশের উপর। তোমাদের 'আমালের কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই।” (দারিমী ২৬, ইবনু খুযায়মাহ্ ৫৯৪, ত্ববারী ৮৯৮৭)
হাদীসটি ইবনু মাহ্দী হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ হতে তিনি 'আসিম হতে, তিনি যির হতে এবং যির 'আবদুল্লাহ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ হাদীস মাস্'ঊদী 'আসিম হতে তিনি আবী ওয়ায়েল হতে এবং তিনি 'আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেছেন।
'আব্বাস ইবনু 'আবদুল মুত্ত্বালিব বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
((هَلْ تَدْرُونَ كَمْ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ؟ قَالَ: قُلْنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: بَيْنَهُمَا مَسِيرَةُ خَمْسِ مِائَةِ سَنَةٍ، وَمِنْ كُلِّ سَمَاءٍ إِلى سَمَاءٍ مَسِيرَةُ خَمْسِ مِائَةِ سَنَةٍ،))
“তোমরা কি জানো, আসমান ও জমিনের মধ্যে দূরত্ব কত?' আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূলই সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনি বললেন, 'আসমান ও জমিনের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ' বছরের পথ। এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। প্রতিটি আকাশের ঘনত্বও (পুরু ও মোটা) পাঁচশ বছরের পথ। সপ্তম আকাশ ও 'আরশের মধ্যখানে রয়েছে একটি সাগর। যার উপরিভাগ ও তলদেশের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে আকাশ ও জমিনের মধ্যকার দূরত্বের সমান। আল্লাহ তা'আলা এর উপরে রয়েছেন। আদাম সন্তানের কোন কর্মকাণ্ডই তাঁর অজানা নয়।” (আবূ দাউদ- অধ্যায়- জাহমিয়াহ্, হাঃ ৩৭২৩, মুসনাদে আহমাদ- হাঃ ১/২০৬, ২০৭)
উপরের আলোচনা থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, সেই আল্লাহ কত বড়। তাঁর এসব মহৎ ও পূর্ণাঙ্গ গুণাবলীই হচ্ছে, 'তিনি যে একক মা'বূদ তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।' আল্লাহ তা'আলার বাণী : “তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা নিরূপণ করতে পারেনি”। অর্থাৎ- আল্লাহ যে মর্যাদা ও বড়ত্বের অধিকারী বান্দা তা তাঁকে দিতে পারেনি অন্যথায় তারা তাঁর ব্যতীরেকে অন্য কারো 'ইবাদাত বা উপাসনা করত না। যখন তুমি তোমার পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় রবের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করবে তখন জানতে পারবে যে, তিনি মর্যাদাপূর্ণ গুণাবলীর অধিকারী 'আরশের উপর উন্নীত। এ প্রশস্ত ও বিশাল জগতে তাঁরই আদেশ ও নিষেধ বলবৎ রয়েছে, এ জগতে তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অফুরন্ত রহমাত ও নি'আমাত দ্বারা ধন্য করেন। যার থেকে ইচ্ছা বালা-মুসীবাত দূর করেন। তিনিই যাবতীয় অনুগ্রহ ও অবদানের মালিক। তুমি জেনে রাখো আকাশমণ্ডলীতে তাঁরই কর্তৃত্ব এবং আকাশমণ্ডলী ফেরেস্তারাজী তাঁরই। 'ইবাদাতে মশগুল ও তাঁরই দিকে তাদের যাবতীয় প্রবণতা। তাঁর বিশাল রাজত্ব আকাশমণ্ডলীতে তাঁর পুরা কর্তৃত্ব বিদ্যমান, সত্ত্বেও তোমার মতো এক নগন্য ও তুচ্ছের প্রতি সম্বোধন করে 'ইবাদাতের আদেশ করেন, এতে কি তুমি নিজেকে ধন্য মনে করবে না? তেমনি তোমাকে তাক্তওয়া অর্জনের হুকুম দেন, যদি তোমার বুঝ থাকে তবে তুমি এতে ধন্য। তুমি যদি আল্লাহ তা'আলার হাক্ব বুঝতে পার এবং তাঁর উচ্চ গুণাবলীর জ্ঞান হয় তবে তুমি অবশ্যই তাঁর বশ্যতা অনুগত্য প্রকাশ না করে থাকতে পারবে না। ফলে তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে পারলে তুমি নিজেকে ধন্য মনে করবে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টা চালাবে এবং যখন তুমি তাঁর কালাম তিলাওয়াত করবে তখন দেখবে যে মহান আল্লাহর ব্যাপারে তোমার সে আগের সম্মান, মর্যাদা ও বড়ত্বের ব্যাপারে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে। হৃদয়ে ঈমানের দৃঢ়তার অন্যতম কারণ হচ্ছে আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা এবং তাঁর আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে বিশাল রাজত্ব ও কর্তৃত্বের ব্যাপারে চিন্তা গবেষণা করা। যে ব্যাপারে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।
📄 মহান আল্লাহ কেমন?
মহান আল্লাহ তিনি তার মতই। তার মত কেউ নেই এবং তিনিও কারো মত নন। সৃষ্টির কোন কিছুর সঙ্গে তার তুলনা দেয়া যাবে না। যেমন তিনি বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾
“তার মত কিছুই নয়। তিনি সব শুনেন এবং জানেন।” (সূরাহ্ আশ্ শু'আরা ২৬ : ৬৫)
তিনি নিরাকার নন, বরং তার আকার রয়েছে, অস্তিত্ব রয়েছে আর এ কারণেই নাবী মুহাম্মাদ মি'রাজ রজনীতে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে তার অবস্থান স্থান 'আরশে 'আযীমে পৌঁছান এবং তার আকার আছে বিধায় ডাইরেক তার সঙ্গে কথা বলেন। পাঁচ ওয়াক্ত সলাত 'আরশে বসেই আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। চর্ম চোখে তাকে দেখা সম্ভব নয় এ কারণেই নাবী মুহাম্মাদ পর্দার আড়ালে বসে তার সঙ্গে কথা বলেন। মা 'আয়িশাহ্ সিদ্দীক্বা বলেন যে বলবে নাবী মুহাম্মাদ স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছে সে মিথ্যাবাদী। (বুখারী)
ক্বিয়ামাতের দিনের আগে কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় তাকে স্বচক্ষে দেখা। মানুষ তো এমন যে, যে জিনিস চোখে দেখা যায় না সে জিনিস স্বপ্নেও দেখে না। তাই দুনিয়াবী জীবনে স্বপ্নে হোক আর স্বচক্ষে হোক কোন অবস্থায়ই আল্লাহকে দেখা যাবে না। মূসা আলায়হি আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিলেন কিন্তু দুনিয়াবী জীবনে দেখা সম্ভব নয়। তাই মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেন,
لَنْ تَرَانِي وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا وَخَرَّ مُوسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ *
“তিনি (মহান আল্লাহ) বললেন : 'তুমি আমাকে কক্ষনো দেখতে পাবে না, বরং তুমি পাহাড়ের দিকে তাকাও, যদি তা নিজ স্থানে স্থির থাকতে পারে তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পাবে।' অতঃপর তার প্রতিপালক যখন পাহাড়ে নিজ জ্যোতি বিচ্ছুরিত করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল আর মূসা চৈতন্য হারিয়ে পড়ে গেল। যখন চেতনা ফিরে পেল, তখন সে বলল, পবিত্র তোমার সত্বা, আমি অনুশোচনাভরে তোমার পানেই ফিরে এলাম, আর আমি প্রথম ঈমান আনছি।” (সূরাহ্ আল আ'রাফ ৭ : ১৪৩)
এ থেকে শিখার বিষয় হল কোন মানুষ যদি বলে আল্লাহকে একবার, শতবার, হাজার বার দেখেছে, সে মিথ্যুক।
মহান আল্লাহ স্বশরীরে সাত আসমানের উপরে 'আরশে 'আযীমে অবস্থিত। তিনি সেখানে অবস্থান করেই সব পরিচালনা করেন। এবং শুধু পৃথিবী নয় রবং এ মহাশূন্যে ভাসমান পৃথিবীর চাইতে বহুগুণে বড় এ রকম অসংখ্য জগত রয়েছে আর এ সমস্ত জগতের মাঝে কোথায় কে কি করছে, কোথায় কি আছে, কি হচ্ছে, 'আর্শে বসেই তিনি সব কিছু শুনেন এবং দেখেন, তার 'ইল্ম, জ্ঞান, শক্তি, প্রতিপত্তি, মাগফিরাত, রহমত সর্বত্র বিরাজমান।
পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীসসমূহে অসংখ্য দলীল রয়েছে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলারও রয়েছে একটি পবিত্রতম দেহ বা শরীর। যা অনেক শক্তিশালী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারাই গঠিত। যার প্রমাণ নিম্নে বর্ণিত হল।
📄 আল্লাহর সঠিক পরিচয় জানবেন কেন?
আল্লাহ সম্পর্কে জানবেন কেন? এর বহু কারণ রয়েছে; এর মধ্যে চারটি কারণ অন্যতম। কারণ চারটি এই : (ক) আল্লাহর সম্পর্কে ভ্রান্ত 'আক্বীদাহ্ বর্জনের জন্যে (খ) আল্লাহর প্রতি সঠিক 'আক্বীদাহ্ গ্রহণের জন্যে (গ) আল্লাহর পরিচয়ের সাথে কাউকে শরীক না করার জন্য (ঘ) ভয়াবহ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যে।
📄 আল্লাহর সমকক্ষ তৈরির ব্যাপারে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ্
মুশরিকদের একটা নিয়ম ছিল তারা কোন প্রকার সমস্যায় পড়ে গেলে তাদের যে মক্কা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি বা আরো বেশি দেব-দেবি ছিল যাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে রেখেছিল তাদের প্রকার ভেদে একেক জনের কাছে একেক প্রকার সমস্যা দূর করার জন্য অভিযোগ পেশ করত। এক আল্লাহই যে সমস্ত প্রকার অভিযোগ শুনবেন এবং পূরণ করতে পারেন এই বিশ্বাস তাদের ছিল না। তাই বিভিন্ন দেব দেবীর কাছে তারা ছুটাছুটি করত।
অনুরূপ দেখা যায় ঠিক একই নিয়মে অনেক কালিমা পড়া মুসলিমেরাও কোন প্রকার বিপদে পড়ে গেলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর দিকে ধাবিত না হয়ে বা হওয়ার পরেও দেখা যায় কোন না কোন মাখলুকের কাছে যেয়ে ধর্ণা দেয়। কেউ আবার কোন পীর বা ক্বর ওলার কাছে যেয়ে বলছে ওহে, মেরে মকছুদ পূরা করদে। অনুরূপ আরেকজনের কাছে যেয়ে সন্তানের জন্য, চাকরীর জন্য, ব্যবসায় উন্নতির জন্য, তার মনসন্তুষ্টি কামনা করে, মাকছুদ হাসিলের জন্য তার নিকট আবেদন করছে। কেউ বা বলছে ওহে, গুরু ভজনা, গুরু বিনা মুক্তি পাবি না। গুরু নামে আছে শুধা যিনি গুরু তিনি খোদা, না'ঊযুবিল্লাহ। দেখা যায় এ ধরনের একশ্রেণীর لَا إِلَهَ إِلَّا الله। পড়া মুসলিমদের সামনে পূর্ব যুগীয় মুশরিকেরাও হেরে যাচ্ছে।
মুক্তির মালিক সমস্ত প্রকার সাহায্যের মালিক শুধুমাত্র মহান আল্লাহ। তবে মানুষ মানুষের কাছে এতটুকু চাইতে পারে যতটুকু দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন তাও শুধু জীবিত মানুষের কাছে কোন মৃত মানুষের কাছে নয়, যেটা মানুষের দেয়া সম্ভব নয় সেটাও যদি কারো কাছে যেয়ে পেয়ে যায়। যেমন তাবীয, তাগা, বালা ব্যবহার করার পর যদি দেখা যায় রোগ ভালো হয়েছে তাহলে বুঝতে হবে এটা তার তাকদীরের ফায়সালা আগের থেকে হয়ে রয়েছে যে অমুক সময় তার রোগ ভালো হবে অমুক সময় সন্তান হবে চাকুরী হবে তাই তাকদীর অনুযায়ী এটা হয়েছে। দুনিয়ার কোন মাখলুক তাবীয, তাগা, বালার ক্ষমতায় এটা হয়নি। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে। মাঝখানে শয়তান এসে মাজারের প্রতি তাবীযের প্রতি বিশ্বাস জন্মিয়ে তাকে ঈমানহারা করে শিরকের মাঝে ফেলে যাচ্ছে।
কোন মৃত মানুষ জীবিতদের কিছু দিতে পারে না। এমনকি নাবীরাও পর্যন্ত মৃত্যুর পরে কাউকে কোন উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। যদি পারতেন তাহলে নাবী মুহাম্মাদ মৃত্যুর পর 'আয়িশাহ্ সিদ্দীক্বা এবং মু'আবিয়ার মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হলে মুসলিমদের যে বিপুল ক্ষতি হয়েছিল অবশ্যই তিনি তা ফিরাতেন। কলিজার টুকরা হুসায়ন-কে যে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল তিনি তা ফিরাতেন। 'উমার ইস্তিষ্কার সলাত আদায় করতে যেয়ে মৃত্যু নাবী মুহাম্মাদ -এর ওয়াসীলাহ্ না দিয়ে জীবিত চাচা 'আব্বাস-এর ওয়াসীলায় দিয়ে দু'আ করেছিলেন। কারণ তিনি ভালো করেই জানতেন মৃত্যুদের কোন ক্ষমতা নেই কারো কিছু করার। এমনকি তাদের ওয়াসীলাহ্ দিয়ে দু'আ করলে সেটাও হবে শিক।
নাবী আলায়হিস সালাম-গণ এবং শহীদরাও কিছু কিছু নেক বান্দাদের যদিও মৃত্যুর পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে রিযিক দেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তারা জীবিত। সেটা হল ক্বরের জিন্দেগীতে দেহগতভাবে তাদের অক্ষত রাখা হবে। কিন্তু রূহ চলে যাবে ইল্লিয়্যিন নামক স্থানে।
এ মর্মে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِن لَّا تَشْعُرُونَ ) “যারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বুঝবে না।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৫৪)
তারা জীবিত কিন্তু এ ব্যাপারে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই। তোমরা তা বুঝবে না। তাদের জীবিত অর্থ হচ্ছে দেহগতভাবে তারা ক্বরের জিন্দেগীতে জীবিত। কিন্তু রূহ বা আত্মা নফস্ নিয়তগতভাবে তারা মৃত্যুবরণ করে দুনিয়ার জীবন থেকে পাড়ি দিয়ে পরপারে চলে গেছেন।
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন নিজেই নাবী মুহাম্মাদ ওয়াসাল্লাম -কে সম্বোধন করে বলেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيْتُونَ ﴾ “তুমিও মরবে আর তারাও মরবে।” (সূরাহ্ আয যুমার ৩৯ : ৩০)
অর্থাৎ- হে নাবী! আপনার পূর্বে যারা এসেছিল তারা মরে গেছে, সুতরাং আপনিও একদিন মৃত্যুবরণ করবেন।
রসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুবরণ করলেন তখন 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ওয়াসাল্লাম না মৃত্যুবরণ করেননি। তখন আবূ বাক্ রদিয়াল্লাহু আনহু আয়াত পেশ করলেন,
"কাজেই যদি সে মারা যায় কিংবা নিহত হয়, তবে কি তোমরা উল্টাদিকে ঘুরে দাঁড়াবে?" (সূরাহ্ আ-লি 'ইমরান ৩: ১৪৪)
অর্থাৎ পূর্ব ধর্মে ফিরে যাবে। 'উমার তখন থরথর করে কাঁপছিলেন এবং আয়াত মনে না থাকায় বলছিলেন আমার মনে হয় এই আয়াত সবেমাত্র নাযিল হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)
উক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় নাবী অবশ্যই মৃত্যুবরণ করেছেন। যারা তাদের সম্পর্কে জীবিত ধারণা করেন এবং দুনিয়াবী ক্ববরে জিন্দা নাবী হায়াতুন নাবী বলে সম্বোধন করেন, তাদের ক্বরের পাশে যেয়ে সালাম দিলে তিনি শুনতে পান এবং সালামের জবাব দেন ডাক দিলে হাত বের করে দেন, কারো বা এই বিশ্বাস নাবীরা করে জিন্দা এবং সলাতরত অবস্থায় তাদের এসব ভ্রান্ত ধারণাকে খণ্ডন করার জন্য মহান আল্লাহ নিজেই বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ
“তার চেয়ে অধিক গুমরাহ কে, যে আল্লাহ্র পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা ক্বিয়ামাত পর্যন্ত তাকে সাড়া দেবে না, আর তাদের ডাকাডাকি সম্পর্কেও তারা (একদম) বেখবর?।” (সূরাহ্ আল আহাক্বাফ ৪৬ : ৫)