📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 لاَ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ এর দ্বিতীয় অংশ إِلَّا ٱللَّٰهُ যা গ্রহণীয়

📄 لاَ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ এর দ্বিতীয় অংশ إِلَّا ٱللَّٰهُ যা গ্রহণীয়


إِلَّا اللهُ যা হল আল্লাহই হলেন একমাত্র সত্য ইলাহ যাকে পঞ্চম স্তম্ভ ধরা হয়েছে। যার দাবী হল মাত্র একটি। পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে প্রথম অংশের চারটি বর্জনীয় বিষয় সম্পর্কে আগে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করে চার প্রকার শিক্, অর্থাৎ এক সত্য আল্লাহ ছাড়া আর যত মিথ্যা ও বাতিল অসংখ্য রব রয়েছে, ইলাহ রয়েছে, মা'বৃদ রয়েছে, যত প্রকার ত্বাগূত রয়েছে সব কিছুকে প্রথমেই বর্জন করে হৃদয় আত্মাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে। ভয়-ভীতি সহকারে হৃদয়ের সমস্তটুকু মুহাব্বত এবং ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর জন্য উজাড় করে দিয়ে এ বিশ্বাস রাখা যে, সমস্ত প্রকার 'ইবাদাত পাওয়ার হাক্বদার একমাত্র আল্লাহ। সৃষ্টি ও পরিচালনার হাক্বদার এবং তার যে সমস্ত গুণবাচক বা সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে সকল কিছুর হাক্বদার একমাত্র তিনিই, যিনি হলেন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা।
এ বিশ্বাসে বদ্ধমূল হয়ে যিনি দ্বিতীয় অংশের সাক্ষ্য দিবেন إِلَّا الله। একমাত্র তিনিই হবেন إِلَهَ إِلَّا اللَّهُর্ণ এর পরিপূর্ণ হাক্বদার। আর তখনই হবে সে খাঁটি মু'মিন, যার শানে রসূলুল্লাহ বলেন: সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، دَخَلَ الْجَنَّةَ. অর্থাৎ- যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই সে ব্যক্তিই প্রবেশ করবে জান্নাতে। (বুখারী- হাঃ ৫৮২৭, মুসলিম- হাঃ ৪৩-[২৬], ১৫৪-[৯৪])
'ইবাদাত বলতে বুঝায়, বান্দা যা কিছু করে আর যা বলে সবই 'ইবাদাত। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴾ “জিন্‌ আর ইনসানকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার 'ইবাদাতের জন্য।” (সূরাহ্ আয যা-রিয়া-ত ৫১ : ৫৬)

📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 لاَ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ এর শিক্ষা

📄 لاَ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ এর শিক্ষা


তাহলে 'ইবাদাত হয় না এমন কোন কাজ নেই। হয় সেটা আল্লাহর জন্য না হয় সেটা শয়তানের জন্য মূলত দু'টোই 'ইবাদাত। এখন 'ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়ার শর্ত হল বান্দা যেভাবে ঈমান আনলে, যেভাবে কাজ করলে বা যে কথা বললে আল্লাহ তার ঐ বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান, খুশি হয়ে যান এটাই হল আল্লাহর 'ইবাদাত। যেমন সাহাবায়ে কেরাম -দের ব্যাপারে বলা হয়েছে। তাদের 'আমালে আল্লাহ নিজেই তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। পক্ষান্তরে যে কাজে বা যে কথায় বান্দার প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্টি হন আর শয়তান খুশি হয়ে যায় সে 'ইবাদাত শয়তানের জন্য আল্লাহর জন্য নয়। যাকে বলা হয় গায়রুল্লাহর 'ইবাদাত।
মহান আল্লাহ রব্বুল 'আলামীনের কাছে সবচাইতে নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত পাপ হল শিকের গুনাহ। আর বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত শিকের পাপে হাবুডুবু খেতে থাকবে যতক্ষণ সে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ এর প্রকৃত অর্থ না বুঝবে। যে গ্রহণের আগে কি বিষয় তাকে বর্জন করতে হবে। আর কি গ্রহণ করতে হবে। তাই একজন মানুষের পক্ষে শির্ক থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত বাঁচা সম্ভব হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে কালিমাতুত্ ত্বইয়িবার সঠিক জ্ঞান অর্জন না করবে। একমাত্র لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ এর জ্ঞানই পারে বান্দাকে শির্ক থেকে বাঁচাতে। এবং পরিপূর্ণ তাওহীদে প্রবেশ করাতে। কারণ কালিমার জ্ঞান যখনই অর্জন করতে পারবে এবং বর্জনীয় বিষয়গুলোকে ত্যাগ করতে পারবে তখনই সে তার হৃদয় আত্মায় একটা প্রশান্তি অনুভব করবে। তখন শত স্ফূর্তভাবেই সে সাক্ষ্য দিবে। সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ছাড়া সত্য আর কোন মা'বুদ নেই। সমস্ত প্রকার 'ইবাদাত বন্দেগীতে তার একত্ব বজায় রাখা তখনই সম্ভব হবে। তাকে ছাড়া আর কাউকে না ডাকা। আর কারো কাছে সাহায্য না চাওয়া। আল্লাহ ব্যতীত আর কারো জন্য নযর, নিয়ায, মানত, যবেহ বা কুরবানী না করা। সকল প্রকার 'ইবাদাত একমাত্র খালিসভাবে আল্লাহর জন্যই নির্ধারণ করা। যেমন, সলাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত, নযর, নিয়ায, যবেহ কুরবানী, রুকু, সিজদা, দু'আ, যিক্র- আযকার সব তার জন্যই নিবেদিত। সকল কিছুতে একমাত্র তার মনসন্তুষ্টি কামনা করা, আর সে পদ্ধতি রয়েছে একমাত্র মুহাম্মাদ ﷺ-এর তরীকার মধ্যে যা হল কালিমাতুশ্ শাহাদাতের দ্বিতীয় অংশ। এক কথায় প্রথম বর্জনীয় বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে নিষ্ঠা ও দৃঢ়তাসহকারে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নিশ্চিতভাবে এ ঘোষণা দেয়া যে, সকল প্রকার 'ইবাদাত পাওয়ার সত্যিকার মালিক একমাত্র আল্লাহ। সৃষ্টিজগতের সকল কিছু পরিচালনার মালিক-গুণবাচক নামের অধিকারী একমাত্র তিনিই। আর এটাই হল কালিমাতুত্ ত্বইয়িবাহ্'র প্রকৃত শিক্ষা।

📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 لاَ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ পড়ার পরেও মুসলিম কেন মুশরিক

📄 لاَ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ পড়ার পরেও মুসলিম কেন মুশরিক


কোন ব্যক্তি ঈমান এনে কালিমা পড়ে মুসলিম হওয়ার পরেও মুশরিকের গণ্ডি থেকে বের হতে না পারার কারণ সম্পর্কে পূর্বযুগীয় মুশরিকদের একটা দৃষ্টান্ত পেশ করলে বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করা যাবে। মুশরিকদের অবস্থা এমন ছিল যে, তাদের ধর্মগুরু পীর পুরোহিত বা বাপ দাদা, মুরুব্বীগণ যা বলত তাই তারা ধর্ম হিসেবে মানত। তাদের মাঝে যখনই কোন নাবী এবং রসূলগণ সত্যের দা'ওয়াত নিয়ে আসত তখনই তারা বলত, وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴾
“তাদের কওমের নেতারা বলত তোমরা কখনও তোমাদের ঐ সমস্ত ইলাহদেরকে (দেবদেবীদেরকে) পরিত্যাগ করবে না এবং পরিত্যাগ করবে না ওয়াদ্, সুওয়া'আ, ইয়াগূস, ইয়া'ঊকু, ও নাস্ত্র-কে (এগুলো হল পূর্ববর্তী নাবীদের নামে তৈরিকৃত মূর্তিসমূহ)।” (সূরাহ্ নূহ ৭১ : ২৩)
আলোচ্য আয়াতে وَقَالُوا শব্দের ফায়েল হল তাদের ঐ সমস্ত মুশরিক ধর্মগুরু পীর পুরোহিত বাপ, দাদা ও মুরুব্বীগণ তারা সাধারণ জনগণকে বুঝাইত তোমরা কখনও ঐ সমস্ত নাবী এবং রসূলদের কথায় কখনও পরিত্যাগ করবেনা তোমাদের এই সমস্ত মূর্তিনামক ইলাহদেরকে। তারা হল আয়াতে বর্ণিত নামসমূহ যারা ছিল পূর্বযুগীয় নাবী আলায়হিস-গণ বা কিছু সৎ বান্দাদের প্রতিচ্ছবি যাদের মৃত্যুর পর তাদের নামে মূর্তি বানিয়ে তাদেরকে তারা ইলাহ, উপাস্য, মা'বুদ বানিয়ে বা আল্লাহকে পাওয়ার মাধ্যম সাব্যস্ত করে তাদের নামে 'ইবাদাত করত।
কিতাবুল বুখারীতে ইবনে 'আব্বাস 'আনহু থেকে উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে এরা ছিলেন নূহ আলায়হিল-এর স্বজাতির মধ্যকার ভালো ও নেককার লোক। যখন তারা মারা গেলেন তখন শয়তান তাদের জাতির লোকেদের কাছে গোপনে বলল। তারা যেখানে বসত সেখানে তাদের প্রতিমূর্তি তৈরি করতে এবং তাদেরকে তাদের নামে বিভূষিত করতে। তারা তাই করল। কিন্তু তখনও পর্যন্ত তাদের 'ইবাদাত করা হত না। যখন এ লোকগুলো মারা গেল তখন পরবর্তী বংশধরেরা কেন যে এই মূর্তি বানানো হয়েছিল তা ভুলে গেল। তখন শয়তান তাদেরকে আবার বলল তোমাদের পূর্বেকার লোকেরা তো এদের পূজা করত। তোমরা কেন তাদের পূজা করছ না? তাদের তখন শয়তানের এই প্ররোচনায় তারা ঐ মূর্তিদের নামে পূজা অর্চনা শুরু করে দিল। তারপর নূহ আলমারিস-এর পর হতে শুরু করে যত নাবী এবং রসূলগণ আলায়হিস এসেছিলেন প্রত্যেকেই মানুষদেরকে এক আল্লাহর 'ইবাদাতের দিকে আহ্বান করতে শুরু করলেন। আর ঐ সমস্ত মা'বৃদদেরকে তারা ত্যাগ করতে বললেন। কিন্তু ওরা নাবীদের ডাকে কর্ণপাত না করে তাদের পূজায় রত ছিল। দেখা যায় পূর্বযুগীয় মুশরিকরা নিজেদের হাতে গড়া মাটি আর পাথরের তৈরি মূর্তির সামনে সিজদা করত। বিপদে পড়লে তাদেরকে আহ্বান করত। বিপদ উদ্ধারকারী মনে করত। আর ঐ বাপদাদারা যা বলত বিনা দলীলে বিনা বাক্যে অন্ধের মত তাদের তাকলীদ করত বা তাদের কথামত চলত। ঠিক তদ্রূপই বর্তমান যুগের অনেক لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ পড়া মুসলিমরাও ঠিক একই নিয়মে মাটি আর পাথরের তৈরি মাজারে যেয়ে সেখানে সিজদা দিচ্ছে।
বিপদে পড়লে তাদেরকে আহ্বান করছে এবং বিপদ উদ্ধারকারী মনে করছে। তাদের মনোসন্তুষ্টি কামনা করে তাদের নামে কুরবানী মানত, নযর, নেয়ায দিয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে তাদেরকে পরকালে বিপদ উদ্ধারকারীও মনে করেছে। তাদেরকে অসিলা বানিয়ে তাদের উসিলায় দু'আ করছে। মুশরিকরা তাদের মুরুব্বী বাপ দাদাদের তৈরিকৃত ধর্মকে যেমনভাবে বিনা দলীলে মেনে নিতো। সত্যের দা'ওয়াত পেলে বলত-
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ .
“যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঐ জিনিসের অনুসরণ কর যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে, বরং আমরা তারই উপর চলব, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি, যদিও তাদের বাপ- দাদারা কিছুই বুঝত না এবং সঠিক পথে চলত না তবুও।” (সূরাহ্ আল বাক্বারাহ্ ২ : ১৭০)
অনুরূপভাবে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ পড়ুয়া অনেক মুসলিমও কুরআন এবং সহীহ হাদীস বিদ্যমান থাকার পরেও সেটাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে তাদের মাঝে যারা নাম মাত্র আলেম, ধর্মীয় ইমাম, পীর, মাশায়েখ-সমাজপতি নেতা। এমনকি মাযহাবের নামে তাক্বলীদে শাখছী বা অন্ধের পূজা করে যাচ্ছে। মূল কথা হল একমাত্র আল্লাহ এবং তার রসূলের কথা ছাড়া আর কারো কথাকে বিনা দলীলে বিনা বাক্যে চোখ বুজে মেনে নেয়ার অর্থই হল তাকে রবের আসনে বসিয়ে দেয়া। এ মর্মে মহান আল্লাহর ঘোষণা :
إِتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ )
"আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের 'আলিম আর দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৩১)
এভাবে বিভিন্ন দিক থেকে অনেক لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ পড়া মুসলিমদের 'ইবাদাত বন্দেগী কাজ কারবার পূর্বযুগীয় মুশরিকদের 'ইবাদাত বন্দেগী ও কাজ কারবারের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। যার দরুন لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ পাঠ করেও অনেক মুসলিম মুশরিকদের গণ্ডি থেকে বের হতে পারছে না। তাই এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ )
"অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর ওপর ঈমান আনা সত্ত্বেও তারা মুশরিক।” (সূরাহ্ ইউসুফ ১২ : ১০৬)

📘 প্রথমে বর্জন পরে গ্রহণ > 📄 কালিমার হাক্ক আদায়কারীদের যেভাবে কষ্ট সহ্য করতে হয় যুগে যুগে

📄 কালিমার হাক্ক আদায়কারীদের যেভাবে কষ্ট সহ্য করতে হয় যুগে যুগে


যুগে যুগে নাবী-রসূলগণ কালিমার দা'ওয়াত দিতে গিয়ে অসংখ্য মার খেয়েছেন দা'ওয়াত দিতে গিয়ে সংঘাত বেঁধেছে কারণ মুশরিকেরা لَائِلَ - এর দাবীকে গ্রহণ করতে পারেনি। বদর প্রান্তরে একদিকে আবূ জাৰ্ল, অন্যদিকে আবূ বাক্স, সাথে রসূল 'আলায়হি ওরাসাল্লাম নিজেই, আবূ জাহ্ন ও সৃষ্টিকর্তাকে 'আনহু বিশ্বাস করে আবূ বা নাবী মুহাম্মাদ-ও সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে। নাবী মুহাম্মাদ 'আলায়হি ওরাসাল্লাম আবূ জাহ্ন একরক্তে আপন চাচা-ভাতিজা। তার 'আলায়হি ওরাসাল্লাম পরেও উভয়ের মাঝে জীবন-মরণ যুদ্ধ কারণ একটাই আবূ জাহ্ন-এর দল কালিমাহ্ -এর দাবী সহ্য করতে পারে না বিধায়। আর যারা এর দাবীকে মেনে নিয়েছে আবূ জাহ্ন-এর দল তাদেরকে কষ্ট দিয়েছে। বিলাল ইবনু রবাহ 'আনহু ইসলামের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মুয়াযয্যিন। বিলাল বিন রবাহ 'আলায়হি কুরায়শ নেতা 'উমাইয়াহ্ ইবনু খাল্‌ল্ফ-এর হাবশী ক্রীতদাস ছিলেন। ইসলাম কুকূল করার অপরাধে তাকে তার মনিব নানাবিধ নির্যাতন করে তার হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে প্রখর রোদ্রে উত্তপ্ত বালুকার উপর উপুড় করে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হত। কখনো তার গলায় দড়ি বেঁধে গরু-ছাগলের মতো ছেলে-ছোকরাদের দিয়ে পাহাড়ে ও প্রান্তরে টেনে-হিঁচড়ে নেয়া হত। যাতে তার গলার চামড়া রক্তাক্ত হয়ে যেত। খানা-পিনা বন্ধ রেখে ক্ষুৎ পিপাসায় কষ্ট দেয়া হত। কখনো উত্তপ্ত কংকর- বালুর উপরে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে বুকে পাথর চাপা দেয়া হত। আর বলা হত- لَا تَزَالُ هَكَذَا حَتَّى تَمُوْتَ أَوْ تَكْفُرْ بِمُحَمَّدٍ.
অর্থাৎ- মুহাম্মাদের দ্বীন পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তোমাকে আমৃত্য এভাবেই পড়ে থাকতে হবে। কিন্তু বিলাল শুধু বলতেন: “আহাদ” "আহাদ”।
একদিন রসূলুল্লাহ পাশ দিয়ে যাবার সময় এ দৃশ্য দেখে বললেন : أَحَدُيُنْجِيْكَ (আহাদ) ।
অর্থাৎ- আল্লাহ তোমাকে মুক্তি দিবেন। অতঃপর তিনি আবূ বাক্রকে গিয়ে বললেন : يَا أَبَا بَكْرٍ إِنَّ بِلَا لَّا يُعَذِّبُ فِي اللهِ.
হে আবূ বাক্র! বিলাল আল্লাহর পথে শান্তি ভোগ করতেছে। আবূ বাক্স ইঙ্গিত বুঝলেন। অতঃপর 'উমাইয়ার দাবী অনুযায়ী নিজের কাফির গোলাম نِسْطَاسُ (নিসত্বাস)-এর বিনিময় এবং একটি মূল্যবান চাদর ও দশটি উকিয়ার (স্বর্ণমুদ্রা) বিনিময়ে তাকে খরিদ করে মুক্ত করে দেন। তিনি ২০ হিজরী সনে ৬৩ বছর বয়সে দামেস্কে মৃত্যুবরণ করেন। (কুরতুবী, সূরাহ্ আল লায়ল ৯২: ১৯-২০ নং আয়াতের তাফসীর)
যখন বিলাল -কে তারা বলল: বিলাল মুহাম্মাদের দ্বীন না ছাড়া পর্যন্ত তোমাকে শাস্তি দিতেই থাকব। কারণ ছিল তাদের সমস্ত ইলাহদের ত্যাগ করে এক ইলাহর উবৃদিয়াত গ্রহণ করেছিল এ একটি মাত্র কারণ ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাদের জবাবে বিলাল বললেন : “আহাদ” “আহাদ”। অর্থাৎ- বিলাল যেন 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ'-এর দাবীকে মেনে বলতেছে। আমি যখন সমস্ত ইলাহদের সমস্ত রবদের ত্যাগ করে এক ইলাহের উবুদিয়াতকে গ্রহণ করেছি শত যন্ত্রণা দিলেও আমি আর ফিরব না।
প্রবাদে আছে, প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করা ছাড়া যেমনি সন্তানের মা হওয়া যায় না, তেমনি ইসলামের শত্রুদের আঘাত না খাওয়া ছাড়া জান্নাতি মানুষ হওয়া যায় না। কালিমার প্রকৃত শিক্ষা ও দা'ওয়াত বড় কঠিন। এ দা'ওয়াত দিলে মার খেতেই হবে। স্বয়ং রসূলুল্লাহ ও আবূ বাক্র একদিন এ দা'ওয়াত দিতে যেয়ে যখনই কালিমার বর্ম শব্দ উচ্চারণ করলেন ওরা বুঝতে পারল যে, কালিমার এ র্ব আহ্বান দ্বারা আমাদের সকল রবদেরকে ছাড়তে বলতেছে। তখন 'উতবাহ্ ইবনু রাবী'আহ্ তার লোকজন নিয়ে তাদের প্রতি আক্রমণ করে বসল। মর্মান্তিক প্রহারে আবূ বাক্স চেহারা এমন ফুলে যায় যে, তাকে চিনাই যাচ্ছিল না। বানু তামীম তাকে অজ্ঞান অবস্থায় বাড়ি নিয়ে আসে। সন্ধ্যার পর জ্ঞান ফিরলে প্রথম জিজ্ঞেস করেন। রসূল কেমন আছেন। শত চেষ্টার পরও তিনি কোন আহার মুখে দিলেন না। অবশেষে খাত্ত্বাব কন্যা উম্মু জামীল গোপনে এসে তাকে খবর দেন যে, রসূল ভালো আছেন এবং এখন আর কামের গৃহে অবস্থান করছেন। তারপর রাত্রি অধিক হলে উম্মে জামীলের সাথে তিনি 'আশামের গৃহে যান। সেখানে রসূলকে দেখার পর কুশল জেনে নিয়ে পরে আহার গ্রহণ করেন। (ইবনু কাসীর- আল বিদায়াহ্, ২য় খণ্ড, ৩০ পৃঃ)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00