📄 সওর পর্বতের গুহায় অবস্থান
মক্কা থেকে বেরিয়ে নবী করীম (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) দক্ষিণ দিকে সওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। কুরাইশরা যখন দেখল যে নবীজি তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছেন, তখন তারা চারদিকে লোক পাঠিয়ে দেয় এবং তাঁর মাথার জন্য বিশাল পুরস্কার ঘোষণা করে। তিন দিন পর্যন্ত তাঁরা এই গুহায় অবস্থান করেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর পুত্র আব্দুল্লাহ দিনের বেলা মক্কায় তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং রাতে গুহায় এসে নবীজিকে জানাতেন। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে গুহায় খাবার ও পানি পৌঁছে দিতেন। এক পর্যায়ে কুরাইশদের একটি দল গুহার একেবারে মুখে পৌঁছে যায়। হযরত আবু বকর (রা.) বিচলিত হয়ে পড়লে নবী করীম (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন'। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) তখন অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর দাদা আবু কুহাফা যখন অন্ধ অবস্থায় ঘরে আসবাবপত্রের খোঁজ নিলেন, তখন আসমা পাথরের টুকরো কাপড়ে ঢেকে দাদাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে আবু বকর পরিবারের জন্য অনেক সম্পদ রেখে গেছেন।
টিকাঃ
১. সীরাত ইবনে হিশাম : ২/২৪০।
📄 গারে সওর থেকে মদীনা অভিমুখে রওনা
তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর কুরাইশদের তল্লাশি কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসলে নবী করীম (সা.) ও হযরত আবু বকর (রা.) গুহা ত্যাগ করে পুনরায় মদীনার পথে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্দুল্লাহ ইবনে আরীকাত নামক একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক দুটি উট নিয়ে গুহার সামনে উপস্থিত হন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর সেরা উটটি নবীজিকে হাদিয়া দিতে চাইলে নবীজি তা মূল্যের বিনিময়ে গ্রহণ করেন। তাঁরা পরিচিত রাজপথ পরিহার করে উপকূলীয় দুর্গম ও অপ্রচলিত পথ দিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর ভৃত্য আমির ইবনে ফুহাইরাও তাঁদের সাথে ছিলেন।
📄 পথিমধ্যে সুরাকা ইবনে মালেকের উপস্থিতি ও তার ঘোড়া মাটিতে ধবসে যাওয়ার ঘটনা
হিজরতের পথে নবী করীম (সা.)-কে ধরার জন্য কুরাইশদের ঘোষিত পুরস্কারের লোভে সুরাকা ইবনে মালেক ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের পিছু নেয়। সুরাকা যখন নবীজির কাছাকাছি পৌঁছে গেল, তখন নবীজি ধীরস্থিরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সুরাকা নবীজিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে অলৌকিকভাবে তার ঘোড়ার পা বালিতে বা শক্ত মাটিতে ধবসে যায়। সুরাকা নিচে পড়ে গেল এবং ভাগ্য পরীক্ষার জন্য তীরের মাধ্যমে লটারি করল যা তার বিপক্ষে এল। সে পুনরায় চেষ্টা করল এবং দ্বিতীয়বারও তার ঘোড়ার পা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত মাটিতে দেবে গেল। সুরাকা বুঝতে পারলেন যে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি নবীজিকে রক্ষা করছে এবং তার আর কোনো সাধ্য নেই তাঁকে ধরার।
📄 সুরাকার মুখে নবী করীম (সা.) এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি
অলৌকিক ঘটনার সম্মুখীন হয়ে সুরাকা ইবনে মালেকের মন থেকে নবীজির প্রতি শত্রুতা দূর হয়ে গেল। সে নবীজির কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানাল এবং তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করল। নবী করীম (সা.) তাকে অভয় দিলেন এবং সুরাকা যখন নবীজির কাছে কিছু করার আরজ করল, তখন নবীজি তাকে বললেন কুরাইশদের তথ্য গোপন রাখতে। নবীজি সুরাকাকে এক মহিমান্বিত ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে বলেন, 'সুরাকা! তোমার কেমন লাগবে যখন তুমি পারস্য সম্রাট কিসরার স্বর্ণের কঙ্কন পরিধান করবে?' সুরাকা অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.)-এর আমলে পারস্য বিজয়ের পর সুরাকা ইবনে মালেককে সত্যি ই সেই কঙ্কন পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।