📄 মদীনা তাইয়িবায় ইসলাম
মক্কায় দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হওয়ার পর হজ্জের মৌসুমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আগত বহিরাগতদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। এ সময়ে মদীনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) খাজরাজ গোত্রের ছয়জন ব্যক্তি রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে 'আকাবা' নামক স্থানে মদীনার মানুষেরা রাসূলের কাছে বাইয়াত বা শপথ গ্রহণ করেন। এভাবেই মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে যেতে থাকে এবং মদীনা ইসলামের এক নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদীনায় হিজরত করলেন তখন আনসারিদের ভালোবাসা ও উদ্দীপনা ছিল দেখার মতো। মদীনা হয়ে উঠেছিল ইসলামের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে এক অপূর্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে উঠল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাকে একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করলেন। সেখানকার প্রতিটি ধূলিকণা যেন ইসলামের সুবাসে মৌ মৌ করতে লাগল।
টিকাঃ
১. সীরাত ইবনে হিশাম : ২/২৪০।
📄 মদীনায় সর্ব প্রথম মাদরাসা
মদীনার মানুষেরা যখন ইসলাম গ্রহণ শুরু করেন, তখন তাঁদের দ্বীনি শিক্ষা প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম মুয়াল্লিম বা শিক্ষক হিসেবে হযরত মুস'আব ইবনে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সেখানে প্রেরণ করেন। হযরত মুস'আব রাদিয়াল্লাহু আনহু মদীনার বিশিষ্ট সাহাবী আস'আদ ইবনে যুরারাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে অবস্থান করে মানুষদের কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দিতে শুরু করেন। এটিই ছিল মদীনার ইতিহাসের সর্বপ্রথম মাদরাসা বা দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্র। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই মদীনার প্রতিটি ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্র ছিল মসজিদ। মদীনা হিজরতের পর মসজিদে নববী হয়ে উঠল ইসলামের প্রথম পাঠশালা। সেখানে সাহাবীরা সরাসরি রাসূলের কাছ থেকে কুরআনের তালীম গ্রহণ করতেন। জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জনের এই অধিকার ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কেই দিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী সাহাবীদের জন্যও একটি বিশেষ দিন নির্ধারণ করেছিলেন তাঁদের হিতোপদেশ ও আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ শিক্ষা দান করার জন্য। এই মাদরাসা থেকেই গড়ে উঠেছিল ইসলামের স্বর্ণালী প্রজন্ম।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী।
📄 মদীনায় হিজরতের সূচনা
মদীনার মানুষেরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার দিলেন, তখন তিনি মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। সাহাবীরা ছোট ছোট দলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মক্কা ত্যাগ করে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কুরাইশরা পথে বাধা দিলেও ঈমানি বলে বলীয়ান সাহাবীরা একে একে মদীনায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। সবশেষে মহান আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে মদীনার পথে যাত্রা করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে।
মক্কার অত্যাচার চরমে উঠলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মদীনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। এটি ছিল এক কঠিন বিসর্জনের যাত্রা। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রাযি.-এর বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার কথা এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি হিজরতের সময় গুহায় খাবার পৌঁছে দিতেন। যখন আবু কুহাফা অন্ধ অবস্থায় সম্পদের কথা জিজ্ঞেস করলেন, তখন আসমা পাথরের টুকরো কাপড়ে ঢেকে দাদাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। হিজরতের এই যাত্রা ছিল ইসলামের ইতিহাসে নতুন এক সোনালী ঊষার হাতছানি। পাখি যেমন নীড়ে ফিরে আসে, মুসলমানরাও তেমন মদীনার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছিল।
টিকাঃ
১. সীরাত ইবনে হিশাম : ২/২৪০।