📄 ইসরা ও মিরাজ
তায়িফের মর্মান্তিক ঘটনার পর মহান আল্লাহ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এবং অলৌকিক নিদর্শন দেখানোর জন্য এক বিশেষ ভ্রমণে নিয়ে যান, যা ইসরা ও মিরাজ নামে পরিচিত। এক রাতে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বোরাক নামক বাহনে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস নিয়ে যান (ইসরা) এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করান (মিরাজ)। এই সফরেই মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায উপহার দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সফরে জান্নাত ও জাহান্নামের বিবিধ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন এবং পূর্ববর্তী নবীগণের সাথে সালাতে ইমামতি করেন।
আল্লাহর নিদর্শনাবলির একটি এই যে, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাকে এক রাতে মিরাজে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইসরা ও মিরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আধ্যাত্মিক জগতের উচ্চ শিখরে উন্নীত করেছিলেন। জগতবাসী যখন তাঁর ওপর জুলুম করছিল, তখন আরশের মালিক তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। এই সফর মুমিনদের জন্য নামাযের মতো অমূল্য উপহার নিয়ে এসেছিল। মিরাজের ঘটনা ছিল ঈমানের এক বড় পরীক্ষা, যা আবু বকর রাযি.-এর মতো সিদ্দীকদের ঈমানকে আরও মজবুত করেছিল।
টিকাঃ
১. সূরা রুম : ২১।
📄 ইসরায়ে নববী সম্পর্কে চাক্ষুস সাক্ষ্য
মিরাজ থেকে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই ভ্রমণের কথা বর্ণনা করলেন, তখন মক্কাবাসীরা একে অসম্ভব বলে উপহাস করতে থাকে। বিশেষ করে যারা বায়তুল মোকাদ্দাস দেখেছিল, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এর দরজা, জানালা ও কাঠামোর বিবরণ সম্পর্কে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। মহান আল্লাহ তখন রাসূলের চোখের সামনে বায়তুল মোকাদ্দাসের দৃশ্য তুলে ধরেন এবং তিনি প্রতিটি প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর প্রদান করেন। যারা সেই স্থানটি দেখেছিল, তারা রাসূলের বিবরণের নির্ভুলতা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়।
মিরাজ থেকে ফিরে আসার পর কাফেররা রাসূলকে নানাভাবে জেরা করতে শুরু করল। তারা বায়তুল মাকদিসের বর্ণনা জানতে চাইল। আল্লাহ তাআলা রাসূলের চোখের সামনে সেই চিত্র তুলে ধরলেন এবং তিনি নিখুঁতভাবে সব বর্ণনা দিলেন। এমনকি পথে ফিরে আসার সময় কুরাইশদের যে কাফেলাটি তিনি দেখেছিলেন, তারও নিখুঁত বিবরণ দিলেন। এই চাক্ষুষ সাক্ষ্যগুলো ইসলামের সত্যতাকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। যারা সত্যের সন্ধানী ছিল, তারা এই মু'জিজা দেখে ঈমান এনেছিল।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী।
📄 স্বয়ং কুরাইশদের প্রত্যক্ষ সাক্ষী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজের সত্যতা প্রমাণের জন্য কুরাইশদের জানিয়েছিলেন যে, ফেরার পথে তিনি তাদের একটি কাফেলা দেখেছেন যা মক্কার দিকে আসছে এবং একটি উট হারিয়ে যাওয়ার কারণে তারা বিপদে ছিল। তিনি কাফেলাটি কবে মক্কায় পৌঁছাবে তার সঠিক সময়ও বলে দিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ে সেই কাফেলাটি মক্কায় পৌঁছালে এবং রাসূলের বলা প্রতিটি কথা সত্য প্রমাণিত হলে কুরাইশদের আর কোনো অজুহাত থাকে না। তবুও হঠকারিতার বশবর্তী হয়ে তারা ঈমান আনা থেকে বিরত থাকে।
কুরাইশরা নিজেদের চোখে রাসূলের অনেক মু'জিজা প্রত্যক্ষ করেছিল। তারা জানত তিনি 'আল-আমীন' বা পরম বিশ্বস্ত। কিন্তু অহংকার ও আভিজাত্যের মোহে তারা সত্যকে অস্বীকার করত। মিরাজের ঘটনার সত্যতা যখন কাফেলার বর্ণনার সাথে মিলে গেল, তখন তারা নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তাদের এই প্রত্যক্ষ সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও তারা কেবল শত্রুতার খাতিরেই ঈমান আনা থেকে বিরত ছিল। এটি ছিল তাদের হঠকারিতার এক চরম প্রকাশ।
টিকাঃ
১. তিরমিযী।
📄 মদীনা তাইয়িবায় ইসলাম
মক্কায় দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হওয়ার পর হজ্জের মৌসুমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আগত বহিরাগতদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। এ সময়ে মদীনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) খাজরাজ গোত্রের ছয়জন ব্যক্তি রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে 'আকাবা' নামক স্থানে মদীনার মানুষেরা রাসূলের কাছে বাইয়াত বা শপথ গ্রহণ করেন। এভাবেই মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে যেতে থাকে এবং মদীনা ইসলামের এক নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদীনায় হিজরত করলেন তখন আনসারিদের ভালোবাসা ও উদ্দীপনা ছিল দেখার মতো। মদীনা হয়ে উঠেছিল ইসলামের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে এক অপূর্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে উঠল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাকে একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করলেন। সেখানকার প্রতিটি ধূলিকণা যেন ইসলামের সুবাসে মৌ মৌ করতে লাগল।
টিকাঃ
১. সীরাত ইবনে হিশাম : ২/২৪০।