📄 তুফাইল ইবনে আমর দাউসীর ইসলাম গ্রহণ
তুফাইল ইবনে আমর দাউসী ছিলেন একজন প্রখ্যাত কবি ও নেতা। মক্কায় আসার পর কুরাইশরা তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিল যেন তিনি মুহাম্মাদের কোনো কথা না শোনেন। কিন্তু কাবা শরীফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিলাওয়াত শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি বুঝতে পারলেন যে, এটি কোনো কবির কালাম হতে পারে না, বরং এটি ঐশী বাণী। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় দাউস গোত্রের অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন।
দাওয়াতের কাজ বড় কঠিন। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন রোগনির্ণয় করেন, নবীজি তেমন উম্মাহর হৃদয়ের চিকিৎসা করতেন। তুফাইল ইবনে আমর দাউসীর মতো প্রভাবশালী নেতারা যখন রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিলেন, তখন আরবের সামাজিক চিত্র পাল্টাতে শুরু করল। তুফাইল ইবনে আমর রাসূলের অনুপম বাকশৈলী ও কুরআনের বাণীতে মুগ্ধ হয়ে সত্যের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। তিনি নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে দাওয়াতের মশাল জ্বালিয়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ বহু মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল।
টিকাঃ
১. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/১৭৫।
📄 আবু তালিব এর ইন্তিকাল
নবুওয়াতের দশম বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। আবু তালিব আমৃত্যু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরাইশদের নির্যাতন থেকে আগলে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়টি ভেঙে যায়। এর মাত্র কয়েকদিন পরই তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহাও ইন্তেকাল করেন। ইতিহাসে এই বছরটিকে 'আমুল হুজন' বা শোকের বছর হিসেবে অভিহিত করা হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের কঠিন সময়ে আবু তালিবকে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলেন। আবু তালিবের ইন্তেকাল ছিল রাসূলের জন্য এক বড় পরীক্ষা। বিপদে আপদে আবু তালিব সবসময় রাসূলের পাশে থাকতেন। তাঁর মৃত্যুর পর কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি ছিল রাসূলের জন্য শোকের বছর। কিন্তু আল্লাহ তাঁর নবীকে ধৈর্য ও অবিচলতার শিক্ষা দিয়েছিলেন। জীবনের এই শূন্যতাও রাসূলকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
টিকাঃ
১. আল মারআতু ওয়াল হুকমুস সিয়াসিয়্যাহ্ ফিল ইসলাম : ৪৫০-৪৫১।
📄 তায়িফে হিজরত
মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচার চরমে উঠলে এবং আবু তালিবের ইন্তেকালের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহায্যের আশায় তায়িফে গমন করেন। তিনি তায়িফের নেতাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন, কিন্তু তারা অত্যন্ত অভদ্রভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। তায়িফের বখাটে ছেলেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে, যার ফলে তাঁর পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। এই কঠিন মুহূর্তেও তিনি তায়িফবাসীর জন্য ধ্বংসের দুআ না করে বরং হেদায়েতের দুআ করেন এবং বলেন, 'হয়তো তাদের বংশধরদের মধ্যে কেউ আল্লাহর ইবাদতকারী হবে'।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তায়িফে দাওয়াত দিতে গেলেন, তখন সেখানকার মানুষেরা তাঁকে উপহাস করেছিল। বখাটেদের লেলিয়ে দিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামের প্রথম সেনাপতি, মানবতার প্রথম শিক্ষক হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা ধৈর্যের পরিচয় দিলেন। তিনি তায়িফবাসীকে ধমক দিলেন না বা বদদোয়া করলেন না। বরং তিনি ধৈর্য ধরলেন। এই ধৈর্য ও সহনশীলতাই ছিল তাঁর দাওয়াতের মূল ভিত্তি। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কঠিনতম বিপদেও একজন দাইকে অবিচল থাকতে হয়।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 ইসরা ও মিরাজ
তায়িফের মর্মান্তিক ঘটনার পর মহান আল্লাহ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এবং অলৌকিক নিদর্শন দেখানোর জন্য এক বিশেষ ভ্রমণে নিয়ে যান, যা ইসরা ও মিরাজ নামে পরিচিত। এক রাতে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বোরাক নামক বাহনে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস নিয়ে যান (ইসরা) এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করান (মিরাজ)। এই সফরেই মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায উপহার দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সফরে জান্নাত ও জাহান্নামের বিবিধ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন এবং পূর্ববর্তী নবীগণের সাথে সালাতে ইমামতি করেন।
আল্লাহর নিদর্শনাবলির একটি এই যে, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাকে এক রাতে মিরাজে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইসরা ও মিরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আধ্যাত্মিক জগতের উচ্চ শিখরে উন্নীত করেছিলেন। জগতবাসী যখন তাঁর ওপর জুলুম করছিল, তখন আরশের মালিক তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। এই সফর মুমিনদের জন্য নামাযের মতো অমূল্য উপহার নিয়ে এসেছিল। মিরাজের ঘটনা ছিল ঈমানের এক বড় পরীক্ষা, যা আবু বকর রাযি.-এর মতো সিদ্দীকদের ঈমানকে আরও মজবুত করেছিল।
টিকাঃ
১. সূরা রুম : ২১।