📄 কুরাইশদের নির্যাতন: রাসূল (সা.) এর দৃঢ়তা
ইসলামের প্রসারে আতঙ্কিত হয়ে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নওমুসলিমদের ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাবা প্রাঙ্গণে সালাত আদায় করতেন, তখন তাঁর ওপর উটের ওজড়ি চাপিয়ে দেওয়া হতো, তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো। কুরাইশ নেতাদের উসকানিতে আবু জেহেল ও ওতবা ইবনে রাবিয়ার মতো লোকেরা তাঁর সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করত। এমনকি তাঁকে হত্যা করার অপচেষ্টাও চালানো হয়। কিন্তু এই কঠিন নির্যাতনের মধ্যেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তা ও ধৈর্য ছিল অতুলনীয়।
হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাঁকে, তাঁর ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে ও স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই চরম নির্যাতনের মুখেও ঈমানের পথে পাহাড়ের মতো অটল ও অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
📄 রাসূল (সা.) কে হত্যার পরিকল্পনা এবং তাঁর স্পষ্ট মু'জিয়া
কুরাইশরা যখন দেখল কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে থামানো যাচ্ছে না, তখন তারা দারুন নদওয়ায় এক বৈঠকে বসে তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের প্রস্তুতি নেন। তাঁর ঘর ঘেরাও করা থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর অলৌকিক মু'জিজায় তিনি শত্রুদের চোখের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যান। তিনি এক মুঠো ধুলো নিয়ে শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করলে তারা সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে দিয়েই মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
আল্লাহ তাআলার প্রাজ্ঞ নীতিই এই যে, তিনি মানুষের হাতে পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতা রাখেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরতের প্রাক্কালে শত্রুদের বেষ্টনীর মধ্যে ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে এক অলৌকিক উপায়ে রক্ষা করেছিলেন। শত্রুরা যখন তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করল, তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের চোখের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেলেন। এই মু'জিজা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সর্বদাই রক্ষা করেন এবং বাতিল শক্তির সকল পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দেন।
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।
📄 কুরাইশদের বিভিন্ন প্রকার প্রলোভন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জবাব
নির্যাতনে কাজ না হওয়ায় কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য বড় বড় প্রলোভন দিতে শুরু করে। তারা ওতবা ইবনে রাবিয়াকে রাসূলের কাছে পাঠিয়ে প্রস্তাব দেয় যে, তিনি যদি এই প্রচার বন্ধ করেন তবে তাঁকে আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী বানিয়ে দেওয়া হবে, কুরাইশদের বাদশাহ হিসেবে গ্রহণ করা হবে অথবা আরবের সুন্দরীতম নারীর সাথে তাঁর বিয়ে দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তভাবে সব প্রস্তাব শুনে সূরা ফুসসিলাতের আয়তসমূহ তিলাওয়াত করেন। তাঁর এই দ্ব্যর্থহীন প্রত্যাখ্যান প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো পার্থিব মোহ বা ক্ষমতার জন্য নয়, বরং শুধুমাত্র আল্লাহর হুকুম পালনের জন্যই ইসলাম প্রচার করছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিভিন্ন পার্থিব প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। ক্ষমতা, সম্পদ ও নারী—সবই তাঁর সামনে তুলে ধরা হয়েছিল যেন তিনি ইসলামের দাওয়াত থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু তিনি ছিলেন দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত। তিনি জানতেন এই দুনিয়া সামান্য উপকরণ মাত্র। তাঁর জবাব ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ঈমানী শক্তির সামনে দুনিয়ার কোনো বিলাসিতাই টিকতে পারে না। তাঁর এই অটল জওয়াবই পরবর্তীতে ইসলামের প্রসারে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কে হাবশায় হিজরতের অনুমতি প্রদান
মক্কায় মুসলমানদের ওপর কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। তিনি বলেছিলেন, 'হাবশায় এমন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ আছেন যাঁর রাজ্যে কেউ অত্যাচারিত হয় না'। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে প্রথম দফায় ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী হাবশায় হিজরত করেন। পরবর্তীতে আরও অনেক মুসলমান সেখানে আশ্রয় নেন। হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী মুসলমানদের আশ্রয় দান করেন এবং কুরাইশদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তাঁদেরকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেন।
এই যে উম্মে শারিক গাযিয়া বিনতে জাবের বিন হাকিম। ইনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। কুরাইশ নারীদের কাছে গিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন। একদিন কুরাইশ কাফেররা তাঁকে ধরে ফেলল। উম্মে শারিক বলেন, আমার কওমের লোকেরা আমাকে একটি উটের পিঠে ফেলে দিল। নিচে কিছু দিল না। তারা আমাকে না কিছু খেতে দিত, না কিছু পান করতে দিত। প্রচণ্ড রোদে আমার প্রাণ বের হওয়ার উপক্রম হলো। হঠাৎ অনুভব করলাম পানির বালতি। আমি তৃপ্ত হয়ে পান করলাম। কাফেররা ভাবল আমি তাদের পানি চুরি করেছি, কিন্তু তারা অবাক হয়ে দেখল তাদের পানির পাত্র ঠিকই আছে। এই মু'জিজা দেখে তারা ইসলাম গ্রহণ করল। সাহাবাদের এই হিজরত ও কুরবানিই ছিল হাবশায় গমনের ক্ষেত্রপ্রস্তুতকারী।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ ৮/২৮৫।