📄 আরবের সকল গোত্রের বিরুদ্ধে রাসূল (সা.) এর জবাব
কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য গোত্র যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য নানা চাপ দিতে থাকে, তখন তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁদের জবাব দেন। কুরাইশরা যখন তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে গিয়ে রাসূলকে থামানোর দাবি জানায়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচাকে বলেছিলেন, 'হে চাচাজান! আল্লাহর কসম, তাঁরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় তবুও আমি এই সত্য প্রচার থেকে বিরত হব না; যতক্ষণ না আল্লাহ এই দ্বীনকে বিজয়ী করেন অথবা আমি এই পথে মৃত্যুবরণ করি'। তাঁর এই অকুতোভয় জবাব কুরাইশদের স্তম্ভিত করে দেয়।
তাগুতি শক্তি ইসলাম ও আহলে ইসলামের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। তারা মানবসভ্যতার নিয়ন্ত্রণ দখল করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে মানবতাকে নিয়ে গেছে বর্বরতার চরম পর্যায়ে। তাদের অন্যায় হস্তক্ষেপে ধর্ম ও চরিত্র-বিবর্জিত মানবতা যেন সর্বস্বান্ত। ঈমান ও কুফরের চিরন্তন লড়াইয়ে বিগত শতাব্দীকাল ফলাফল যদি এই হয় যে, ইসলাম বিতাড়িত হয়েছে, তাহলে এটা যে শুধুই অন্ত নির্দেশ করে তা নয়; কেননা, অন্তের পর আছে নতুন উদয়। আবারও শিশিরসিক্ত সোনালি ঊষা হেসে উঠবে পৃথিবীর বুকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের সকল প্রতিকূলতার মুখে এই বিশ্বাসের বাণীই প্রচার করেছিলেন।
টিকাঃ
১. সূরা রুম : ২১।
📄 মানুষের মাঝে ঘৃণ্যতা বিস্তার এবং এর বিপরীত ফল
কুরাইশরা যখন দেখল নির্যাতনের মাধ্যমেও ইসলামের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না, তখন তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের প্রতি মানুষের মনে ঘৃণা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। তারা মক্কায় আগত হাজীদের কাছে প্রচার করত যে, মুহাম্মাদ একজন জাদুকর এবং তিনি বাপ-দাদার ধর্মের অপমানকারী। কিন্তু এই অপপ্রচার হিতে বিপরীত ফল দেয়। মানুষ কৌতূহলী হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসতে থাকে এবং তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও কুরআনের অলৌকিক বাণীতে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।
ইসলামবিদ্বেষীরা বিভিন্ন অপতৎপরতা চালিয়েছে। তাদের প্রোপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কিন্তু তাদের কথায় কান দিয়ে নারী কতটুকু কী পায়, আর কতখানি কী হারায়—তা আজ স্পষ্ট। ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকরা যতোই ঘৃণ্যতা বিস্তার করুক না কেন, সত্যের আলো কখনোই নেভানো সম্ভব নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, যতোই ইসলামকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, ইসলাম ততোই বিকশিত হয়েছে। মানুষের হৃদয়ে ইসলামের শাশ্বত প্রতিচ্ছবি মুছতে গিয়ে তারা নিজেরাই ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে গেছে।
টিকাঃ
১. আল ওয়াও আল ইসলাম : ৪৭১।
📄 কুরাইশদের নির্যাতন: রাসূল (সা.) এর দৃঢ়তা
ইসলামের প্রসারে আতঙ্কিত হয়ে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নওমুসলিমদের ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাবা প্রাঙ্গণে সালাত আদায় করতেন, তখন তাঁর ওপর উটের ওজড়ি চাপিয়ে দেওয়া হতো, তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো। কুরাইশ নেতাদের উসকানিতে আবু জেহেল ও ওতবা ইবনে রাবিয়ার মতো লোকেরা তাঁর সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করত। এমনকি তাঁকে হত্যা করার অপচেষ্টাও চালানো হয়। কিন্তু এই কঠিন নির্যাতনের মধ্যেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তা ও ধৈর্য ছিল অতুলনীয়।
হযরত সুমাইয়া রাযি.-কেই দেখুন। তিনি ছিলেন ইসলামের পথে শাহাদতবরণকারী প্রথম নারী। কাফেররা তাঁকে, তাঁর ছেলে ও স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে নিয়ে গিয়ে পুরো পরিবারকে কী নির্মম অত্যাচার করল। কিন্তু হযরত সুমাইয়া রাযি. ধৈর্য ও অবিচলতার কী জীবন্ত উদাহরণই না রেখে গেলেন যুগ যুগের মুসলিম নারী সমাজের জন্য। তিনি আপন ছেলেকে ও স্বামীকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাহে, প্রাণ সঁপে দিলেন আপন প্রভুর সমীপে; কিন্তু নিজের ঈমানকে কাফের বেইমানের সামনে বিসর্জন দিতে রাজি হলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই চরম নির্যাতনের মুখেও ঈমানের পথে পাহাড়ের মতো অটল ও অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. সালাহুল উম্মাহ কী উসুলুল হিম্মাহ ৫/১৬৭।
📄 রাসূল (সা.) কে হত্যার পরিকল্পনা এবং তাঁর স্পষ্ট মু'জিয়া
কুরাইশরা যখন দেখল কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে থামানো যাচ্ছে না, তখন তারা দারুন নদওয়ায় এক বৈঠকে বসে তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের প্রস্তুতি নেন। তাঁর ঘর ঘেরাও করা থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর অলৌকিক মু'জিজায় তিনি শত্রুদের চোখের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যান। তিনি এক মুঠো ধুলো নিয়ে শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করলে তারা সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে দিয়েই মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
আল্লাহ তাআলার প্রাজ্ঞ নীতিই এই যে, তিনি মানুষের হাতে পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতা রাখেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরতের প্রাক্কালে শত্রুদের বেষ্টনীর মধ্যে ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে এক অলৌকিক উপায়ে রক্ষা করেছিলেন। শত্রুরা যখন তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করল, তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের চোখের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেলেন। এই মু'জিজা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সর্বদাই রক্ষা করেন এবং বাতিল শক্তির সকল পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দেন।
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম।