📄 দুনিয়ার বুকে ইসলাম প্রচার : তাবলীগের প্রথম পর্যায়
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এটি ছিল দাওয়াতের প্রথম পর্যায়। এ সময় তিনি তাঁর নিকটাত্মীয় এবং বিশ্বস্ত বন্ধুদের মাঝে এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত পৌঁছাতেন। ইসলামের এই প্রাথমিক আহবানে প্রথম সাড়া দেন নারীদের মধ্যে হযরত খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহা, পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, শিশুদের মধ্যে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে হযরত যায়দ ইবনে হারিসা রাদিয়াল্লাহু আনহু। প্রায় তিন বছর পর্যন্ত এই গোপন দাওয়াতের কাজ অব্যাহত থাকে। এ সময়ে মুসলমানরা অত্যন্ত সংগোপনে আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে একত্রিত হয়ে সালাত আদায় এবং দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
যিনি আল্লাহর পথের দাই হবেন, তার অন্তর হতে হবে প্রশান্ত, চিন্তা-চেতনা হতে হবে মহৎ। তাঁর আচরণ হবে দয়া ও করুণাপূর্ণ, ক্ষমা ও মার্জনাভিত্তিক। তা হলেই মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেওয়া হবে সহজসাধ্য। দাওয়াতের এই প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষকে সমবেত করতে দাইকে অবশ্যই হতে হবে বিনীত। হাজার উপেক্ষা ও হাজার অত্যাচার বরণ করে নিতে হবে অম্লান বদনে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতের প্রথম পর্যায়ে আমরা এই ধৈর্যের অনুপম আদর্শ দেখতে পাই। তিনি তাঁর দাওয়াতের শুরুতে মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে গিয়ে ব্যক্তিগত মায়ামোহ ত্যাগ করে উম্মাহর হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে নিজেকে পেশ করেছিলেন।
টিকাঃ
১. সূরা নাহল : ১২৫।
📄 প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন নির্দেশ এল— 'আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন', তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের সকল গোত্রকে ডেকে সমবেত করেন। তিনি তাঁদের লক্ষ্য করে বললেন, 'হে কুরাইশগণ! আমি যদি বলি এই পাহাড়ের অপর প্রান্তে এক বিশাল শত্রু বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ওত পেতে আছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?' সকলে সমস্বরে বলল, 'হ্যাঁ, কারণ আমরা আপনাকে কখনোই মিথ্যা বলতে শুনিনি'। তখন তিনি বললেন, 'তবে জেনে রাখুন, আমি আপনাদের এক ভয়াবহ আজাবের সংবাদ দিচ্ছি। আপনারা এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনুন'। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই প্রকাশ্যে তাওহীদের আহবানে কুরাইশ নেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাঁর চাচা আবু লাহাব অত্যন্ত অশালীন আচরণ করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বাইয়াত করাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আপনারা শপথ করুন যে, কখনো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেন না।’ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বাইয়াতের মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পর্দার আড়ালে ছিলেন। রাসূলের কথা শুনে হিন্দ বললেন, ‘আপনি তো আমাদের থেকে এমন প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন যা পুরুষদের থেকেও নেন না; ঠিক আছে, শপথ করছি।’ এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘কখনো কিছুতেই চুরি করবেন না।’ হিন্দ বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি শুধু আবু সুফিয়ানের মাল থেকে একটু আধটু জিনিস সরাতে চাইতাম।’ আবু সুফিয়ানও মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আগে যা হয়েছে, হয়েছে। ওগুলো মাফ করে দিলাম।’ এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘কখনো ব্যভিচার করবেন না।’ হিন্দ বললেন, ‘মুহাম্মাদ, কী বলেন! কোনো স্বাধীন নারীও ব্যভিচার করতে পারেন?’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইয়াতের পরবর্তী বাক্য উচ্চারণ করে বললেন, ‘কখনো সন্তানদের হত্যা করবেন না।’ হিন্দ বললেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের ছোটবেলায় আদর-যত্ন ও লালন-পালন করে বড় করেছি। আর বড়বেলায় বদরের যুদ্ধে আপনি ও আপনার অনুসারীরা তাদের হত্যা করে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং আপনি এবং আমাদের সন্তানরাই আমাদের সম্পর্কে ভালো জানেন।’ হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হেসে ফেললেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে দাওয়াতের ক্ষেত্রে কতটা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।
টিকাঃ
১. আল ইছাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ : ৪/২৫৫।
📄 গোটা আরবের শত্রুতা ও বিরোধিতা এবং নবী করীম (সা.) এর অবিচলতা
প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত শুরু করার পর মক্কার কুরাইশরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম শত্রুতে পরিণত হয়। তারা তাঁর ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাতে থাকে এবং তাঁকে জাদুকর, পাগল ও কবি বলে অপবাদ দেয়। মক্কার প্রতিটি অলি-গলিতে তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো শুরু হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সত্যের পথে অটল ও অবিচল। কোনো প্রকার গালিগালাজ বা সামাজিক বয়কট তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কুরাইশদের এই সম্মিলিত বিরোধিতার মুখেও তিনি ধীরস্থিরভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিয়োজিত থাকেন।
শত্রুরা আমাদের ইতিহাস ঘেঁটে ঘেঁটে আমাদের ঐতিহ্য ও শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য বের করে ফেলেছে। তারা ধরে ফেলেছে আমাদের মাহাত্ম্যের মূল, আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠি। তাই তাদের টার্গেট—আমাদের ধর্ম, আমাদের বিশ্বাস। তারা উঠে পড়ে লেগেছে আমাদের হৃদয় থেকে আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাস হরণ করার জন্য। তাদের সর্বতোমুখী ষড়যন্ত্রের শিকার মুসলিম-জাতি ইসলাম থেকে দূরে সরে চলেছে—একটু একটু করে, অনেক অনেক দূরে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সতর্ক করে গেছেন বিজ্ঞ পথপ্রদর্শকদের মতো। ইসলামী আদর্শ ও জীবনদর্শন থেকে সরে গিয়ে আমাদের কী পরিণতি হতে পারে, তাও ব্যক্ত করে গেছেন প্রাজ্ঞ অভিভাবকদের মতো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘অচিরেই সকল জাতি ও সম্প্রদায় এক হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে রব তুলবে; খাদকরা যেমন পরম আনন্দে দস্তরখানে পরস্পরকে ডাকাডাকি করে ঠিক তেমন করে।’
টিকাঃ
১. আবু দাউদ।
📄 আরবের সকল গোত্রের বিরুদ্ধে রাসূল (সা.) এর জবাব
কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য গোত্র যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য নানা চাপ দিতে থাকে, তখন তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁদের জবাব দেন। কুরাইশরা যখন তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে গিয়ে রাসূলকে থামানোর দাবি জানায়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচাকে বলেছিলেন, 'হে চাচাজান! আল্লাহর কসম, তাঁরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় তবুও আমি এই সত্য প্রচার থেকে বিরত হব না; যতক্ষণ না আল্লাহ এই দ্বীনকে বিজয়ী করেন অথবা আমি এই পথে মৃত্যুবরণ করি'। তাঁর এই অকুতোভয় জবাব কুরাইশদের স্তম্ভিত করে দেয়।
তাগুতি শক্তি ইসলাম ও আহলে ইসলামের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। তারা মানবসভ্যতার নিয়ন্ত্রণ দখল করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে মানবতাকে নিয়ে গেছে বর্বরতার চরম পর্যায়ে। তাদের অন্যায় হস্তক্ষেপে ধর্ম ও চরিত্র-বিবর্জিত মানবতা যেন সর্বস্বান্ত। ঈমান ও কুফরের চিরন্তন লড়াইয়ে বিগত শতাব্দীকাল ফলাফল যদি এই হয় যে, ইসলাম বিতাড়িত হয়েছে, তাহলে এটা যে শুধুই অন্ত নির্দেশ করে তা নয়; কেননা, অন্তের পর আছে নতুন উদয়। আবারও শিশিরসিক্ত সোনালি ঊষা হেসে উঠবে পৃথিবীর বুকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের সকল প্রতিকূলতার মুখে এই বিশ্বাসের বাণীই প্রচার করেছিলেন।
টিকাঃ
১. সূরা রুম : ২১।