📄 নবীজী (সা.) এর সিরিয়া ভ্রমণ
এ পর্যায়ে আমরা আলোচনা করব ভবিষ্যৎ-প্রজন্ম নিয়ে। প্রকারান্তরে এটা হবে মানুষের আলোচনা। বরং সমগ্র মানব জগতের আলোচনা— দেশে, বিদেশে; পশ্চিমে, সর্বত্র। মানুষের যে মৌলিক অধিকার, বরং মূল গোড়ার অধিকার, সেটিই যদি আলোচনায় না আসে, তা হলে মানুষের অধিকার আলোচনার কী সার্থকতা থাকে? এজন্যই ইসলামের নবী, মানবতার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, যা আমাদের মানুষের জন্মলগ্ন থেকে তার সমগ্র অধিকার আদায়ে সাহায্য করে।
জন্মলগ্নে করণীয়:
১. শিশুর কানে আযান দেওয়া: জন্মগ্রহণের অব্যবহিত পরেই শিশুর কানে আযান দেওয়া। তাৎপর্য এই যে, এতে পৃথিবীর বুকে আগমন করে প্রথম যে বাণীটি তার কানে ধ্বনিত হবে, তা হলো আল্লাহর একত্ব ও বড়ত্বের বাণী।
২. তাহনীক করা: অর্থাৎ শিশুর মুখে খেজুর বা এ জাতীয় কোনো মিষ্টান্ন লাগিয়ে দেওয়া।
৩. সুন্দর নাম রাখা: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
৪. আকীকা: জন্মের সপ্তম দিনে পশু জবেহ করা এবং শিশুর মাথা মুণ্ডানো ও নাম রাখা।
৫. সদকা: মাথা মুণ্ডানোর পর চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা করা।
৬. খতনা: শিশুকে খতনা করানোর উদ্দেশ্য হলো পরবর্তীতে বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে শিশুর স্বাস্থ্যসুরক্ষা।
৭. স্তন্যদান: শিশুকে পূর্ণরূপে খাদ্য যোগানোর জন্য স্তন্যদানের বিকল্প নেই। এটি শিশুর লালন-পালন ও তত্ত্বাবধানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর লালন-পালনে মায়ের ভূমিকা মুখ্য। শিশুকে পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা ও অভ্যাসে গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিশুর কচি মনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং রাসূলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করতে হবে।
সাত বছর বয়স থেকে শিশুকে ইবাদতের প্রতি মনোযোগী করতে হবে। নামায ও রোযার প্রতি উৎসাহিত করার পাশাপাশি ইখলাস ও নিষ্ঠা শিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন সে সব সময় আল্লাহর সান্নিধ্য ও নজরদারি অনুভব করে। এটিই হবে শিশুর ঈমানী তরবিয়তের চূড়ান্ত সফলতা।
সামাজিক শিষ্টাচার হিসেবে অন্যদের প্রতি ভালোবাসা, পানাহারের নিয়ম, শোয়ার আদব এবং অনুমতি প্রার্থনা করার শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়াও চার বছর বয়স থেকে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি সাধনে সচেষ্ট হতে হবে।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, তিরমিযী।
১. আবু দাউদ।
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. তারবিয়াতুল আওলাদ ফিল ইসলাম : ১/২৫৫।
১. ইবনে মাজাহ।
২. তাবারানী।
📄 নবীজী (সা.) সম্পর্কে ইহুদীদের এক বড় আলিমের ভবিষ্যদ্বাণী
সন্তান লালনপালনের জন্য হিকমাহ ও মাওয়াইয়ায়ে হাসানা অর্থাৎ প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশ হলো সবচেয়ে সফল পদ্ধতি। সন্তানকে মসজিদমুখী করে তোলা এবং আল্লাহর সাথে তার দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এতে শিশুর অন্তরে ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় এবং সে আত্মপরিচয় ও আত্মোপলব্ধি লাভ করতে পারে।
সন্তানকে একজন কামেল ও মুত্তাকী শিক্ষকের হাতে সঁপে দিতে হবে, যিনি তাকে ধর্মের মর্ম এবং উত্তমর চরিত্র-মাধুরী শিক্ষা দেবেন। এছাড়াও সন্তানের জন্য সৎ সঙ্গ নিশ্চিত করা মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব। শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাকে শরীরচর্চা ও খেলাধুলায় উৎসাহিত করা উচিত।
তদারকি ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে পরোক্ষ উপদেশ প্রদান করা বেশি কার্যকর, যাতে সন্তানের ব্যক্তিত্বে আঘাত না লাগে। সন্তানের সাথে নিয়মিত গল্প করা এবং তার মনের কথা শোনা উচিত। কোনো ভুল করলে সরাসরি শাসনের চেয়ে প্রজ্ঞার সাথে সংশোধন করা ভালো। তবে শাসনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, নিন্দা যেন সন্তানের আচরণের হয়, তার সত্তার নয়। ভালো কাজের জন্য প্রশংসা ও পুরস্কার প্রদান করা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
মনে রাখতে হবে, শিশু ফিতরাত বা স্বভাবজাত পবিত্রতা নিয়ে জন্মায়। মা-বাবাই তাকে পরিবেশ অনুযায়ী গড়ে তোলেন। তাই নিজেরা উত্তম আদর্শ স্থাপন করে সন্তানকে সত্যবাদিতা, বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ করার মতো মহৎ গুণাবলিতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
শাসন করার ক্ষেত্রে চরম কঠোরতা পরিহার করা উচিত। মাত্রাতিরিক্ত শাসন বা মা-বাবার মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ সন্তানকে বিপথগামী করে তুলতে পারে। অতিরিক্ত বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশ সন্তানকে অলস ও পরনির্ভরশীল করে ফেলে। তাই সন্তানদের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখা এবং সবার প্রতি সমান আচরণ করা সফল লালনপালনের চাবিকাঠি।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. সহীহ মুসলিম।
১. সহীহ মুসলিম।
১. সহীহ বুখারী।
১. আহমাদ।
📄 ব্যবসার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয়বার সিরিয়া সফর
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মন-মানসিকতা ও চিন্তাভাবনায় এক ধরনের পরিপক্বতা আসে। এ সময় শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে তারা প্রায়ই অস্থিরতা ও কৌতূহলের শিকার হয়। বর্তমান সময়ের বেপরোয়া অপসংস্কৃতি, অশ্লীল মিডিয়া এবং অবাধ মেলামেশার সুযোগ তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই নাজুক সময়ে মা-বাবার উচিত সন্তানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া। তাদের সাথে সময় কাটানো, মনের ভাব বুঝতে চেষ্টা করা এবং প্রতিটি কাজে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। ঘরের ভেতর আন্তরিক পরিবেশ না থাকলে সন্তান বাইরে গিয়ে খারাপ আশ্রয়ে চলে যেতে পারে, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়।
ইসলামী সমাজব্যবস্থায় বয়ঃসন্ধিকালীন এই বিচ্যুতি রোধে দৃষ্টির হেফাজত ও পবিত্র জীবনযাপনের গুরুত্ব অপরিসীম। সক্ষমতা থাকলে দ্রুত বিবাহ সম্পন্ন করা দৃষ্টি রক্ষায় এবং চরিত্রের সুরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর। তরুণদের বোঝাতে হবে যে তারা পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য অত্যন্ত মহৎ।
আমাদের সন্তানদেরকে পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ থেকে রক্ষা করে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান করতে হবে। ইলম ও আমলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চরিত্র গঠন করাই হবে তাদের সফলতার মূল ভিত্তি।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. তিরমিযী।
১. আল ওয়াও আল ইসলাম : ৪৭১।
📄 হযরত খাদীজা (রা.) এর সঙ্গে নবীজীর বিবাহ
বর্তমান যুগের তথ্যপ্রযুক্তি ও মিডিয়া একটি দ্বিধারী তলোয়ারের মতো। এর সঠিক ব্যবহার যেমন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, তেমনি অপব্যবহার ধ্বংস করে দিতে পারে একটি আস্ত প্রজন্ম। মুসলিম উম্মাহর উচিত মিডিয়া শক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া এবং একে দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করা।
প্রচারমাধ্যমগুলো বর্তমানে জনমত গঠন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান হাতিয়ার। বিশেষ করে মুসলিম পরিবার ও মূল্যবোধের ওপর আঘাত হানার জন্য সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের সন্তানদের ওপর মিডিয়ার কুপ্রভাব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাদের সময়ের হিসাব নিতে হবে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
একজন মা তার সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনো পেশায় দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি তাকে দীনের দাই হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। নিজের পেশাগত ক্ষেত্রে থেকেও ইসলামের বাণী প্রচার করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের স্বকীয়তা ও ঈমানী মজবুতি বজায় রাখার সাহস জোগাতে হবে।
ইমাম বুখারী ও ইমাম শাফেঈর মতো মহান মনীষীদের জীবন থেকে আমরা দেখতে পাই, মায়েদের আন্তরিক চেষ্টা ও দুআ কীভাবে তাঁদেরকে বিশ্ববিখ্যাত করেছেন। আজকের মায়েদেরও সেই ধৈর্য ও অবিচলতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়তে হবে যেন তারা মিডিয়া আগ্রাসনে ভেসে না যায়, বরং স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সত্যের কথা বলতে পারে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
১. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১২/৩৩১।