📄 শেষ কথা
ইটটার জবাব পাটকেলেও হয়
মিডিয়াতে প্রায়ই দেখতে পাবেন, তাদের নির্ধারিত কিছু মানদণ্ডে মুসলিমরা কিভাবে ‘ফেইল’ করে, এর সচিত্র প্রতিবেদন তারা প্রচার করে বেড়ায়। কখনো ইসলাম বনাম বাঙালিয়ানা, কখনো-বা দেশপ্রেম-এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে কেন যেন তারা মুসলিমদের অবস্থানকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তাদেরকে বিব্রত করে মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা বেশ সুখ অনুভব করেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই।
ধরুন, কোনো এক ‘অসাম্প্রদায়িক’ মিডিয়ার অর্বাচীন এক সাংবাদিক হঠাৎ করে এক কওমি মাদ্রাসায় গিয়ে উদয় হলো। সেখানে ক্যামেরা হাতে মাদ্রাসার শিক্ষককে প্রশ্ন করল, 'আপনি এই মাদ্রাসার শিক্ষক?' সম্মানিত শাইখ বিব্রত হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ। আমি এখানে ছাত্রদের পড়াই' । 'হুজুর, দয়া করে জাতীয় সঙ্গীত পুরোটা বলুন তো' । এই উদ্ভট প্রশ্নে শাইখ যখন বিব্রত, তখন কামান থেকে দ্বিতীয় 'গোলা' ছোড়া হয়, 'আচ্ছা হুজুর, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কয়টি সেক্টর ছিল', 'সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম বলুন তো' । যে অর্বাচীন প্রশ্ন প্রস্তুত করে নিয়ে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধে তার জেলা কোন সেক্টরে ছিল সেটাই তো সে বলতে পারবে না। কিন্তু পরের দিন সংবাদপত্রে সচিত্র প্রতিবেদন, 'মাদ্রাসাগুলোতে কী শেখানো হচ্ছে'! নিচে ছোট্ট করে লিখে দেয়া হয়, 'তোয়াক্কা নেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের' ।
এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক অপপ্রচার। অমুক সংগঠন মাদ্রাসা রাষ্ট্রযন্ত্রের করায়ত্ত্বে নেওয়ার দাবি করেন তো তমুক গোষ্ঠী মাদ্রাসা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখেন। চারদিক থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়। এ ধরনের ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার বিপরীতে দেশের আলেম সমাজের প্রতিনিধি সচরাচর রক্ষণাত্মক ভূমিকায় থাকেন। আমাদের ওস্তাদদের পক্ষ থেকে সাধারণত জবাব আসে, মাদ্রাসার ব্যাপারে ভুল ধারণা ছড়িয়েছে, সকলের প্রতি আহ্বান মাদ্রাসা ভ্রমণ করে সঠিক তথ্য জানার, মাদ্রাসায় কখনোই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সকল উত্তর যারা মাদ্রাসার বিরোধী, তারা সকলেই জানে; তাদের এমন উত্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। জবাব দেওয়া হয় আপামর জনতার প্রশ্ন ভাষা চোখগুলোর জন্য, যার প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, আমাদের এই দুর্বল অবস্থা দেখে অনেক মুসলিম ভাইয়ের অন্তরে ব্যথা অনুভূত হয়।
এসব অনাচার দেখলে হতাশ লাগাটাই স্বাভাবিক। আমরা তো সত্য নবির উম্মত, তবু কেন আমরা এত দুর্বল? এক মুমিন ভাইয়ের ব্যথায় অপর ভাইয়ের ব্যথিত হওয়ার দরকার আছে, তবে সেটাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন বানানো যাবে না। ঈমানের কালিমা যে বুকে ধারণ করেছে, তার তো হতাশ হওয়া মানায় না। মুমিন তো চিরকালই শক্তিশালী, তার সাথে তো আছেন মহান রব, আমাদের সৃষ্টিকর্তা রহমান আল্লাহ; যিনি সকল পরিকল্পনাকারীর মহাপরিকল্পনাকারী। তাই চলুন, দশ বছর পর আমরা কোন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছাতে চাই, সেই মঞ্জিলের দৃশ্যটা একবার মনের চিলেকোঠার জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে দেখি-
চিন্তা করুন, দশ বছর পরের কোনো একদিন। দেশের প্রধান ও প্রভাবশালী দশটা মিডিয়ার কয়েকটা আমাদের। তখন কিন্তু 'খেলার' কৌশল আর রক্ষণাত্মক থাকবে না; তখন আমরা গোলবারে শট নিব, তারা নাকেমুখে সেই শট ঠেকাতে ব্যস্ত থাকবে, খাবি খাবে। সেটা কিভাবে হবে? ধরুন, আগের দিন পত্রিকায় মাদ্রাসা বন্ধের জোর দাবি জানানো 'লক্ষণ সেন বিশ্ববিদ্যালয়ে'র ভিসির কাছে কোনো মাদ্রাসার সদ্য ফারেগ হওয়া তরতাজা টগবগে তরুণ সাংবাদিক ক্যামেরাম্যান হিসেবে সেই ভার্সিটিরই ছাত্র সহ হাজির হয়ে বলল, 'স্যার আসসালামু আলাইকুম। আমরা “মোল্লা টিভি”র পক্ষ থেকে এসেছি। শোনা যাচ্ছে, দেশের মাদ্রাসাগুলোতে লেখাপড়ার মান ক্রমশ অধঃপতিত হচ্ছে। আমরা মনে করি মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি'?
উত্তরে স্যার তো অবশ্যই হ্যাঁ বলবে। তারপর তরুণ বলবে, 'স্যার, গোসলের ফরজগুলো কি কি বলুন তো' । এ প্রশ্নে ভিসি যখন হতভম্ব হয়ে চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করবে, 'কী বলতে চাচ্ছ তোমরা'? তখন তরুণ জানাবে, 'স্যার, গতকাল আপনি ইসলাম শিক্ষার ঠিক-ভুল সম্পর্কে পেপারে বিশাল প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে আপনি দেখিয়েছেন, দেশের সম্মানিত আলেমরা ইসলামের শিক্ষা কী, সেটাই বুঝে না। কোনটা পড়ানো প্রয়োজন, কোনটি পড়ানো বন্ধ হওয়া উচিত, সেসব নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। তার মানে আপনি নিশ্চয়ই ইসলামের বড় এক পণ্ডিত। স্যার প্লিজ, একটু যদি বলতেন গোসলের ফরজগুলো কী কী'? এ সম্পাদনা কোনোমতেই উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, এসকল সুশীলদের অধিকাংশই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না, লেজেগোবরে করে ফেলবে। তারপর প্রশ্ন হবে, 'স্যার, আপনি কি পঞ্চাশোর্ধ/ষাটোর্ধ নন'? ইতিবাচক উত্তর আসলে বলা হবে, 'তাহলে দেশীয় আইন অনুযায়ী আপনি এত বছর ধরে প্রাপ্তবয়স্ক' । এর উত্তরও 'হ্যাঁ' হলে পরের প্রশ্ন হবে, 'তাহলে স্যার আপনি এতগুলো বছর ধরে নাপাক হয়ে ঘুরাঘুরি করছেন'!
তারপর ভিসি যতই চিৎকার চেঁচামেচি করুক, পরের দিন সবগুলো পত্রিকায় হেডলাইন হবে, 'অমুক ভার্সিটির ভিসি এত বছর ধরে নাপাক'! সাথে ছোট্ট করে লেখা, 'একই অবস্থা আরও দশ জনের' । বিষয়টা কেমন হবে ভাবতে পারছেন? ইসলাম-বিদ্বেষী মহল্লায় আগুন ধরে যাবে, সবাই মিলে ইসলামি পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করবে। কিন্তু ততক্ষণে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে গুল্মবনে আগুন লেগে গেছে, দাউদাউ করে জ্বলছে দাবানল। 'নেভানোর' ক্ষমতা সেক্যুলারদের নেই। ক্ষমতা আর প্রভাবের কারণে কেউ ইসলামিস্টদের টুপিটাও ছুতে পারবে না। কলকাতামুখী, পুঁজিবাদী সেক্যুলাররা তখন নিজেদের নষ্ট হওয়া ইমেজ উদ্ধারের আশায় নানাভাবে তাদের অবস্থানকে ব্যাখ্যা করবে। এসব সুশীলদের হাল দেখে ইসলাম-বিরোধী, ভূমিদস্যু আর পুঁজিবাদী রক্তচোষা কর্পোরেট কোম্পানির প্রসব করা মিডিয়াগুলোও সতর্ক হয়ে যাবে, মুসলিমদেরকে সমঝে চলবে। নাস্তিকদের ইসলাম-বিরোধী গল্প কবিতা প্রবন্ধ আর শিক্ষাক্রমে প্রবেশ করানো হবে না।
আমরা কখনোই ইসলাম-বিদ্বেষীদের মতো এমন নিচুশ্রেণির কাজে লিপ্ত হবো না। কিন্তু তাদেরকে তাদের ওষুধ দিয়ে নাজেহাল করার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে। এই সক্ষমতার পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে, দ্বীনের প্রচারের জন্য এমন একটি পরিবেশ জরুরি, জরুরি এমন ক্ষমতা। মোট কথা, আমাদের বলার, লেখার, বক্তব্য দেওয়ার প্লাটফর্মের সাথে সাথে প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে হবে, যে প্লাটফর্ম জনসাধারণের দৃষ্টিসীমার আওতাধীন; আর জনগণ যে প্রভাবের আওতাধীন। আজ তারা আমাদের ওস্তাদ, হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে বসা আলেমদের নিয়ে যেভাবে অপপ্রচার করে, আমাদের হাতে যদি শক্তিশালী মিডিয়া থাকত, তাহলে আমরাও তাদেরকে ঠিক একইভাবে ঘায়েল করার শক্তি হাতে রাখতাম। হয়তো মুসলিমরা এভাবে নিকৃষ্ট পন্থায় আক্রমণ করত না, তবে বিরোধীরা সর্বদা ভয়ে থাকত, মুসলিমদের হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। বাড়াবাড়ি করার আগে প্রতিটি দুশ্চরিত্র দুবার ভেবে নিত, কারণ তখন মুসলিমদের সম্মানের চাদরে হাত দিলে নিজের লজ্জা নিবারণের হাফপ্যান্ট খুলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি। যেদিন আমরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই গন্তব্যে পৌঁছুব। সেদিন আর কোনো অর্বাচীন আমাদের রব, দ্বীন, রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে টিটকারি করার সাহস পাবে না। সেদিন আর কোনো ইমামকে মসজিদ সভাপতি, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দ অকারণে অপমান করার আগে দশ বার ভাববে। যারা তখনো ইসলামের বিপক্ষে বাড়াবাড়ি করবে, তাদের মুখোশ সেদিন খুলে ফেলা হবে সকলের সামনে। তারপরও যারা সেদিন ইসলামের ওপর কুফরের ঝাণ্ডা উড়াতে চাইবে, তাদেরকেও নিজ অবস্থানে নিরপেক্ষ করে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রশাসন, শিক্ষা-সহ গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে তথাকথিত অভিজাত সাংস্কৃতিক জমিদার আর ইসলাম-বিদ্বেষীরা বসে থাকবে? থাকুক, দ্বিতীয় 'প্রশাসন' তখন আমাদের আয়ত্বে, আমরা ইচ্ছা করলে তাদের জায়গায় উঠাতে পারব, আবার ইচ্ছা করলে তাদের যথাযোগ্য স্থানে ধরে নিয়ে বসাতে পারব। এর জন্য দরকার মিডিয়ার লাগামের নিয়ন্ত্রণ। আসুন, আমরা সবাই সেই দিনটির স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করতে কাজ করি। যেদিন নতুন এক সতেজ আকাশের নিচে স্নিগ্ধ ভোরের বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস বুকভরে টেনে নিবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। নাস্তিকতার কালো মেঘে আর ঢাকা পড়বে না কোনো কিশোরের আকাশে উদিত হওয়া ইসলামের রাঙা প্রভাতের সূর্যটা। এতটুকু আশা করা তো বাতুলতা নয় নিশ্চয়ই; সেই সোনালী দিনের স্বপ্ন তো দেখাই যায়, তাই না?