📘 প্রোপাগান্ডা 📄 প্রোপাগান্ডা কিভাবে প্রতিরোধ করব

📄 প্রোপাগান্ডা কিভাবে প্রতিরোধ করব


এ প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এত এত থিওরি, হিস্ট্রি কপচিয়ে দিনশেষে যদি প্রোপাগান্ডাকে প্রতিরোধই করতে না পারি, তাহলে এসবের কোনো ফায়দা নেই। তবে, এখানে একটি কথা স্পষ্টভাবে বলে নেওয়া ভালো। প্রোপাগান্ডা খুবই জটিল একটি বিষয়, এর বিস্তৃতিও বিশাল। সামান্য কয়েক পাতায় যেমন এর মৌলিক বিষয়গুলোই কেবল উল্লেখ করা যাবে, তেমনি এর প্রতিরোধ, প্রতিকারও অল্প কিছু বাক্যে তুলে ধরা রীতিমতো অসম্ভব। তাই, আমি আমার স্বল্প জ্ঞানে যতটুকু সম্ভব, এর সমাধানের বিষয়ে অল্প আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। অনেক বর্ষীয়ান লোক রয়েছেন যারা এ ফিল্ডে ইতিমধ্যেই অনুসরণযোগ্য কাজ করেছেন। এ পরিচ্ছেদের বিভিন্ন অংশে আমি তেমনই কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির নাম ও তাদের হাতে গড়া কিছু রিসোর্স উল্লেখ করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধী প্রজেক্টকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।
১. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিরোধ
২. সামাজিক প্রতিরোধ
৩. রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিরোধ
প্রোপাগান্ডার সর্বপ্রথম ধাক্কাটা এসে পড়ে ব্যক্তির ওপর। ব্যক্তি যখন এতে আক্রান্ত হয়, তারপর সেটা সমাজে প্রভাব ফেলে। তাই, আমাদের সর্বপ্রথম ব্যক্তিগতভাবে প্রোপাগান্ডা মোকাবিলা করতে সক্ষম হতে হবে। এটা কিভাবে বাস্তবায়ন হবে? সব কিছু হয়তো আমার পক্ষে জড়ো করা সম্ভব নয়, তবুও কিছু বিষয় পয়েন্ট আকারে বলি,

নিজেকে প্রস্তুত করা: প্রোপাগান্ডা যে বর্তমান পৃথিবীতে অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটার স্বীকারোক্তি দেওয়াই প্রথম প্রস্তুতি। উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। প্রোপাগান্ডা কী, কেন এটি ব্যবহৃত হয়, কিভাবে এটি প্রয়োগ করা হয়; এছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কোন কোন অংশে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী প্রোপাগান্ডা চলছে, সেগুলো সম্পর্কে ন্যূনতম পর্যায়ের জ্ঞান সবারই রাখা উচিত। আমার নিজের কাছে ইসলাম কী দাবি করে, আর প্রোপাগান্ডিস্টরা সে দাবির বিপরীতে কী অপব্যাখ্যা দেয়, সেগুলো না জানা থাকলে বিপদে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বোপরি, নিজের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সেক্যুলারিস্টদের প্রোপাগান্ডার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অন্তত এই ইচ্ছাটা পোষণ করা জরুরি যে, আমি প্রোপাগান্ডার অংশ হতে ইচ্ছুক নই।

আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা: ব্যক্তিগত আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন একটা কাজ। ইসলাম মানুষের আবেগকে অস্বীকার করে না, কিন্তু আবেগের রশি টেনে ধরতে শেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সন্দেহজনক, উত্তেজনাকর কোনো তথ্য দেখলেই সেটি শেয়ার করার তীব্র ইচ্ছা কিংবা অমুক বিধর্মী ইসলাম অবমাননা করেছে শুনেই তমুক দলীয় নেতার নেতৃত্বে মূর্তি ভাঙার অদম্য আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখা দরকার। নতুবা আবেগকে ভুল জায়গায় ব্যবহারের দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক সময়ে বিরল কোনো বিষয় নয়। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, মিডিয়া নিজেদের কাটতি বাড়ানোর লক্ষ্যে উল্টাপাল্টা শিরোনাম দিয়ে কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এমন সব অবিশ্বাস্য আর বিস্ময়কর তথ্য 'প্রসব' করেছে। এর কিছুদিন—কখনো বহুদিন, মাস, এমনকি বছরও পেরিয়ে যায়–পর বের হয়ে আসে, আসলে পুরো বিষয়টাই মিডিয়ার হাতসাফাই। এ প্রসঙ্গে কুরআনের সেই অমূল্য আয়াতটি আবারও বলতে চাই, 'হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।'

নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা রাখা: শত্রুপক্ষ জানার আগেই নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিক ধারণার ঘাটতি রয়েছে, সেসব বিষয়ে ধারণা ও জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অতঃপর ইসলামের মানদণ্ডে যাচাই করে দেখতে হবে, শত্রুপক্ষের প্রচারিত আদর্শ সত্য না মিথ্যা। আমাদের অন্যতম দুর্বলতা মিডিয়ার অভাব এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তি-সংগঠনের ওপর আমাদের প্রভাবহীনতা। এ বিষয়কে সামনে রেখে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেমন কাজের অবকাশ আছে, তেমনি ব্যক্তিগতভাবেও কিছু কাজ করা যায়। প্রভাবশালী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইসলামপন্থীদের পক্ষে নানান ভূমিকা রাখতে পারেন।

শত্রুপক্ষের টার্গেট করা বিষয়ে সতর্ক থাকা: আপনার বিপক্ষে যে প্রোপাগান্ডা চলছে, সে সম্পর্কে আপনি ওয়াকিবহাল না থাকলে সেটা শত্রুর জন্য সোনায় সোহাগা। তাই শত্রু কোন লক্ষ্য হাতে নিয়ে ছোট ছোট উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করছে সেগুলো চিহ্নিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধরুন, পশ্চিমা ওয়ার্ল্ড চায় সমকামিতা, ফ্রি-সেক্স, ওয়েস্টার্ন সেক্স-এডুকেশন ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। এখন, আপনি কিংবা আমি যদি মনে করি, তারা শুধু 'অধিকার' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এর প্রচার করছে, তাহলে সেটি হবে চরম পর্যায়ের ভুল। আপাতদৃষ্টিতে যা দেখা যায়, সব সময় সেটি ধরে বসে থাকলেই চলবে না। বরং, শত্রু তার পা ফেলার আগে আমাদের ধারণা রাখতে হবে, সে কি করতে চাচ্ছে, কেন করতে চাচ্ছে।

প্রশ্ন করতে শিখুন: শত্রুপক্ষ বা তাদের প্রতি সফট কর্নার রাখা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সংশয় রাখা প্রয়োজন। তাদের সব তথ্যই বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করা যাবে না। মিথ্যার চর্চা কাফিরদের মাঝে ইসলামের প্রারম্ভিক কাল থেকেই প্রসিদ্ধ। আপনার কিংবা আপনার ভাইবোনের সন্তানকে তারা 'শিক্ষা'র নামে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়াচ্ছে, সেটি যাচাই করুন। যদি মনে হয়, ইসলাম-বিরোধী কিছু নেই, তাহলে ঠিক আছে। আর যদি দেখতে পান, 'ডালমে কুছ কালা হ্যায়', তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। সেক্যুলারদের পদক্ষেপ খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, তাই এই সতর্কতা সার্বক্ষণিক কাম্য। আজ স্কুল কলেজের কারিকুলাম একটু সহনীয় পর্যায়ে আছে, কাল সেটা বদলে কোনো পাতালপুরিতে নিয়ে যাওয়া হবে সেটি খেয়াল রাখুন। মনে রাখা দরকার, আমাদের শিক্ষা যতটুকু কর্মমুখী আছে, সেটি এর সিকিভাগও 'ধর্মমুখী' নয়।

বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানার্জন: শাহবাগে বামদের জাগরণের পর অনলাইনে তারা প্ল্যানমাফিক কিছু কাজ করেছিল। যেমন- মুসলিমদের কাছে শ্রদ্ধেয় ভাজন রাসূল ও সাহাবায়ে কেরাম, ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লাগাতার আক্রমণ ও মিথ্যাচার। মিথ্যাগুলো তরুণ প্রজন্মের সামনে উপস্থিত করা ও তাদের ঈমানকে সংশয়ের মুখে ফেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কুরআন-হাদিসের ভুল অনুবাদ ও ব্যাখ্যা-সহ অনেক বিষয়েই তারা বেশ 'মুনশিয়ানা' দেখিয়েছে। পরবর্তীকালে বেশ কয়েকজন যোগ্য ভাই কাফিরদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কলম হাতে তুলে নিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মকে দেখিয়েছেন আশার আলো। এই ঘটনায় মুসলিমদের জন্য রয়েছে বিশাল এক শিক্ষা। এক আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমরা যদি চেষ্টা করি, তাহলে আল্লাহ চাহে তো কোনো পরিকল্পনাই এই দ্বীনের বিপরীতে বিজয়ী হতে পারবে না, আর আল্লাহর পরিকল্পনাই বড় পরিকল্পনা। এক দশক আগেও ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের মনে যেসব প্রশ্ন উদয় হতো, সেসব প্রশ্নের জবাব সচরাচর আমরা কোথাও খুঁজে পেতাম না। আলহামদুলিল্লাহ পরিস্থিতি বদলেছে। কারো মনে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন জাগলে তার জন্য যথেষ্ট রিসোর্স এখন সহজলভ্য। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক কয়েকজন লেখকের বই তরুণদের জিজ্ঞাসার জবাব দিতে সক্ষম হয়েছে। ইসলাম নিয়ে সংশয়বাদী ও ইসলাম-বিদ্বেষীদের প্রশ্নের সঠিক জবাব জানতে এভাবে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানার্জনের কোনো বিকল্প নেই।

মূলধারার মিডিয়া বর্জন: দেশে নিজেদের অনুকূলে যেসব সেক্যুলার 'আগাছা' মিডিয়া আজ বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে, তাদের প্রভাব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। কারণ, সেক্যুলাররা যে বিষ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করায়, সেই ইঞ্জেকশন পুশ করার প্রধান সিরিঞ্জ হলো মিডিয়া। হয়তো-বা বাংলাদেশে 'মূলধারা'র কোনো ইসলামি মিডিয়া নেই বা থাকতে দেওয়া হয়নি। তাই বলে বিনা প্রশ্নে সেক্যুলার মিডিয়াকে গ্রহণ করা সমীচীন হবে না। যেটুকু মিডিয়া নিজেদের কাজে ব্যবহার না করলেই নয়, সেটুকু ক্ষেত্রেও পূর্ণ সতর্ক থাকতে হবে। যেন দুধ ভেবে মদ ঘরে না ঢোকে। এছাড়া, মূলধারার না হলেও হাতেগোনা কয়েকটি নির্ভরযোগ্য মুসলিম মিডিয়া রয়েছে, সেগুলোর অধিক প্রচার ও প্রসার জরুরি। সেক্যুলার মিডিয়া মুসলিমদের বিভিন্ন বিষয়ে বিষোদগার করে, এ ব্যাপারে আমরা প্রায় সবাই জ্ঞাত। তবে, অনেক সময় দেখা যায়, নিজ 'ঘরানা'র বাইরের কারো বিপক্ষে মিডিয়ার কোনো নিউজ দেখলে আমরা সেগুলো কোনো সন্দেহ প্রয়োগ ছাড়াই গ্রহণ করে ফেলি। এটি বেশ অদূরদর্শী পদক্ষেপ। কারণ, যে মিডিয়া তাদের স্বার্থের জন্য আপনার বিরুদ্ধে নিউজ করতে পারে, সে মিডিয়া তাদের স্বার্থ রক্ষায় আপনার অন্য ভাইদের বিপক্ষেও মিথ্যাচার করতে সক্ষম। তাই, নিজেদের মিত্রের ব্যাপারে মিডিয়ার অবস্থানই যেন আমাদের অবস্থান হয়ে না দাঁড়ায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।

সামাজিক প্রতিরোধ
গণমাধ্যমের কপটতা নিশ্চয়ই সবার সামনে স্পষ্ট, এখন প্রশ্ন হলো- এর প্রতিরোধে সামাজিকভাবে আমাদের কি করণীয়? বাংলাদেশের মুসলিমরা কি চিরকাল শুধুই পক্ষপাতিত্বের শিকার হয়ে বসবাস করতে বাধ্য হয়ে থাকবে? বর্তমান সময়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের ইসলাম বিষয়ক ধ্যান-ধারণা কিংবা দ্বীনদারিতার একটা অংশও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। তাছাড়া, 'তিল'কে যারা 'তাল' করে আর 'তাল'কে করে 'তিল', খোদ সেই মিডিয়া কর্মীদেরকে এই আত্মবিধ্বংসী মিথ্যার অন্ধকূপ থেকে উদ্ধার করাও তো মুসলিমদেরই ঈমানী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। এসব সমস্যার সমাধানে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি-

এক. লেখা, বলা, প্রচার করার যত জায়গা আছে, সবকিছুই আমাদের ব্যবহারযোগ্য হাতিয়ার। দৈনিক পত্রিকার 'মতামত' থেকে শুরু করে ইসলামি সাময়িকী, মাসিক পত্রিকা, মসজিদের মিম্বার, এমনকি স্বয়ং দৈনিক পত্রিকাকে কিভাবে ব্যবহার করা যায়, আমাদেরকে সেই ফিকির করা প্রয়োজন। এর জন্য একঝাঁক তরুণ প্রয়োজন, যারা বিষাক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসলামি মননে সুস্থ ধারার সাংবাদিকতাকে সামনে তুলে ধরবে। বিভিন্ন স্থানে লেখালেখির সুযোগটা তাদেরকে কৌশলের সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। নিজেদের হাত পাকাতে হবে, যেন যখনই কোনো ইসলামি প্লাটফর্ম তৈরির সুযোগ আমাদের সামনে আসবে, তখন যোগ্য কর্মীদের অভাব যেন কারো মনে অনুভূত না হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে তরুণরা—যাদের আছে অদম্য উদ্যম আর সময়ের প্রাচুর্য—সংগঠন তৈরি করে তার মাধ্যমে নিজেদের কাজকে একীভূত করে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে দক্ষতা অর্জন করতে গিয়ে যেন কাফিরদের অন্ধ অনুকরণ হয়ে না যায়, সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন, নতুবা অনুসরণের সেই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী প্রমাণিত হবে।

দুই. আমাদের নিজেদের মাঝে একতা বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নেই। কোথাও কোনো সেক্যুলার বা ব্রাহ্মণবাদী অপরাধী ইসলামের কোনো বিষয়ে অবমাননা করে জনগণের রোষের মুখে পড়লে, সেক্যুলাররা যেভাবে এক হয়ে যায়—সেটা আমাদের জন্য বড় দৃষ্টান্ত। তার সমর্থনে সব সেক্যুলার শাহবাগে জড়ো হয়, স্লোগান দেয়, ইলেকট্রিক বাল্বের নিচে মোমবাতি প্রজ্বলিত করে। আমাদেরকেও ঐক্যবদ্ধ হবার পাঠ শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কখনো কোনো মুসলিম সেক্যুলারদের রোষানলে পড়লে সকলের উচিত তার সমর্থনের কথা উচ্চকিত কণ্ঠে প্রকাশ করা। সেক্যুলারদের বুঝিয়ে দেওয়া—আমরা কেউই একা নই, সবাই মিলেই আমরা 'এক উম্মত'। মিডিয়ার কিছু কাজ আছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। নাগরিক অধিকার আদায় এবং নানাবিধ দুর্নীতি রোধে বামপন্থী মিডিয়া কর্তা-কর্মীরা 'সীমিত' পর্যায়ে যেসব প্রচেষ্টা চালায়। সেসব কাজের প্রশংসা করায় কৃপণতা প্রদর্শন আমাদের কাম্য নয়। তবে, আদর্শের প্রশ্নে কখনো কখনো ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করে। সেই ক্রান্তিকালীন সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মুসলিমরা যদি একতাবদ্ধ থাকতে না পারে, তাহলে অল্প সময়ে প্রতিপক্ষ অনেক বেশি ফায়দা তুলে নেয়। তাই, সংবেদনশীল মুহূর্তে সেক্যুলারদের চক্রান্তের ব্যাপারে সকলের উচিত সবাইকে সতর্ক করা।

তিন. সেক্যুলার মিডিয়া এবং তার পুরোধা ব্যক্তিত্বরা প্রায়শই ইসলামের বিভিন্ন বিধান কিংবা ইসলামি সংগঠন ও সমমনা ব্যক্তি-দলের বিভিন্ন কাজ, মতামত নিয়ে একচোখা চুলচেরা 'বিশ্লেষণ' করে থাকে। বলা চলে এই কাজটা তাদের বেশ প্রিয়। এর প্রতিরোধে আমাদেরও কিছু কাজ করার আছে। প্রতিটি সেক্যুলার মিডিয়া ও তাদের কাণ্ডারি 'সুশীল'রা অতীতে ইসলাম-বিরোধী যেসব কুকর্ম করেছে, মুসলমানদের কাছে তাদের দাবি করা স্ট্যান্ডার্ডগুলো নিজেদের জীবনে তারা কিভাবে প্রতিনিয়ত সেসবের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখে চলে—সেগুলোর ফিরিস্তি জনগণের সামনে ঘোষণা করা। এই ক্ষেত্রে দল-মত-ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা সর্বদা জরুরি নয়, মুখে নাম না নিয়েও বহু হাতি-ঘোড়া ঘায়েল করা যায়। এসব সাংবাদিকদের মাঝে অনেকেই আছে, যারা ইসলামের গণ্ডি থেকে ইতিমধ্যেই বেরিয়ে গেছে, নিজেদের গণ্ডদেশ থেকে প্রকাশ্যেই খুলে ফেলেছে ঈমানের রজ্জু। চিন্তা চেতনা আর কর্মে দৈন্যদশার শিকার সেই ব্যক্তিরা কিভাবে ইসলামি শিক্ষা ও আদর্শের সংস্কারের দাবি তুলে—সেই উদ্ভট চিত্রটা সুস্পষ্ট ও বিশালাকারে সবার সামনে তুলে ধরা যায়। ভূমিদস্যুদের কোম্পানিগুলো কিভাবে পত্রিকা, টিভি চ্যানেল খুলে জাতির নৈতিকতার মানদণ্ড উন্নতির 'প্রকল্প' হাতে নিয়েছে, সেসব বিষয়ে আলোচনা প্রকাশ্যে নিয়ে আসা যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে তাদের করা অসঙ্গতি আর বহুরূপী চেহারার জলছবির আর্কাইভ সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। যেন কিছুকাল নীরব থেকে পুনরায় কোনো অর্বাচীন তাদের অপকর্ম পুনঃপরিচালনা আরম্ভ করতে সাহস না পায়। আর এসবের জন্য চাই নিজস্ব শক্তিশালী গণমাধ্যম। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদেরকেও কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হবে। ওরা বলে, আদর্শ ইসলাম হলো সুফিবাদী ইসলাম। ধর্ম পবিত্র জিনিস, এর সাথে রাজনীতি মেশানো ধর্মের জন্য অপমানজনক। আমাদের ওস্তাদরা বলবে, 'দেখুন। ইসলাম আপনি কার কাছ কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করবেন, সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসব ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যক্তি জীবনে লিভ টুগেদার, মাদক দ্রব্যের মতো অপকর্মে জড়িত থাকে, তাদের কাছ থেকে ইসলাম শেখাটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর দিকে লক্ষ্য করুন। এদের কোনটির মালিক ভূমিদস্যু, কোনটির মালিক যিনার পর নারী হত্যার অভিযোগে জড়িত। কিন্তু সেসব বিষয়ে এরা কখনো রা করে না। এমন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা ব্যক্তিরা কিভাবে ইসলামের ব্যাপারে "গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল" হতে আসে? এভাবে চললে আপনাদের ঈমান আমলের হেফাজত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।' এদের ব্যাপারে সাধারণ জনগণকে সতর্ক করতে হবে, মসজিদে মিম্বারে ইমাম-খতীবরা কৌশলে মিডিয়ার বিষবাষ্পের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করলে ইনশাআল্লাহ অবস্থার পরিবর্তন হবে।

চার. সেক্যুলারদের কাছ থেকে প্রশংসা শুনে আনন্দিত হওয়ার মতো কাঁচা কাজের ব্যাপারে আরও সতর্কতার অবকাশ রয়েছে। “আবহমান কাল থেকে এ দেশের মুসলিম 'মধ্যমপন্থী', উদার। তারা ধর্মের নামে উন্মাদ নয়; এ দেশের মুসলিমদের রক্তের সাথে মিশে আছে 'লোকজ' ইসলাম। কওমি মাদ্রাসাগুলোই জঙ্গি তৈরির কারখানা। তাই 'অমুক সংরক্ষণ' দলের মতো কট্টরপন্থী, মৌলবাদী ইসলামের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।”—এ দেশে এই ধরনের কথা বলার মতো লোক কিংবা মিডিয়ার অভাব নেই। তাদের এসব কথাবার্তা ইসলামের সুরক্ষাকারী সংগঠন ও আপামর জনসাধারণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির এজেন্ডা ব্যতীত আর কিছুই নয়। তারা চায়, সম্মানিত আলেম শ্রেণির সংস্পর্শ থেকে সাধারণ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে, তাহলেই তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ সহজতর হবে; যদিও তারা নিজেরাই সাধারণ জনগণের সেই 'ইসলাম'কে ধারণ করে না। শহুরে শিক্ষিত মানুষগুলো সচরাচর এ ধরনের কথা শুনে বেশ প্রভাবিত হয়। তারা ভাবে, কথা তো মিথ্যা বলেনি। আমরা মসজিদে যাই, নামাজও পড়ি। আমরাই আদর্শ মুসলিম। নিশ্চয়ই মাদ্রাসাগুলোতে সমস্যা আছে, নয়তো সব পত্রিকাগুলোতে তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করবে কেন? কিন্তু, তারা এভাবে ভেবে দেখে না যে, এই কথাগুলো যেসব ব্যক্তি আর মিডিয়া প্রচার করে, তাদের অনেকে ব্যক্তিজীবন থেকে ইসলাম থেকেই খারিজ করে দিয়েছে। তারা ঐসব মুসলিমকে আদর্শ বলে, যারা শুধু কিছু ইবাদতের মধ্যে নিজেদের ইসলাম পালনকে সংকীর্ণ করে রাখে। আর যারা চায় মুসলিম উম্মাহর সকল সদস্য পুরো জীবনকেই ইসলামের রঙে রঙিন করুক, তারাই মিডিয়ার চোখের বালি। তাই, নাস্তিক্যবাদীরা মডারেট মুসলিমদের আদর্শ মুসলিম হিসেবে প্রচার করে বেড়ায়। ওদের টার্গেট, উম্মাহর নেতৃত্ব দানকারী ত্যাগী আলেম সমাজের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করা। তাই এ ধরনের 'স্বতঃসিদ্ধ' (?) কথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে, এর বিপরীতে আলিমদের সাথে সাধারণ জনতার চিরায়ত আত্মিক সম্পর্কের কথা আলেম শ্রেণি এবং জনসাধারণের প্রতিনিধি—উভয় পক্ষকে দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করতে হবে। সেই সঙ্গে সেক্যুলারদের সাথে জনতার বিচ্ছিন্নতার কথা ব্যক্ত করে তাদের অলীক স্বপ্নময় ঘুমে পানি ঢেলে দেওয়ার ব্যবস্থা সর্বদা জারি রাখা জরুরি, যেন তাদের সার্বজনীন মিথ্যা কথায় কেউ বিভ্রান্ত না হয়, আর মুসলিমদের মাঝে নতুন করে কোনো ফাটল কিংবা দেওয়াল সৃষ্টি হতে না পারে। তবে, সত্য প্রকাশের পাশাপাশি এখনকার প্রতিকূল পরিবেশে যুদ্ধাংদেহী মিডিয়ার সঙ্গে মুসলিমদের 'সমঝোতা'র চেষ্টা অব্যাহত রাখা যেতে পারে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইসলামের প্রতি আবেগ ভালোবাসা মিডিয়ার হর্তা-কর্তাদের অজানা নয়, তারাও এখন সরাসরি ইসলামের ওপর আঘাত হানতে ভয় পায়। তাই, মিডিয়া কর্মীদের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা একেবারেই বাতিল না করে তাদের সাথে মতবিনিময়, শুভেচ্ছা আদান-প্রদানের সম্পর্ক চালু রাখা যেতে পারে।

পাঁচ. আমাদের নিজেদের আরও কিছু প্রকাশনা আসা দরকার, খুবই দরকার। কোনো প্রকাশনী কাজ করবে শিশুদের নিয়ে, কোনটা গল্প-উপন্যাস প্রকাশ করবে কিশোরদের জন্য। ইসলামি বইয়ের জগতে খেদমত আঞ্জাম দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রকাশনী আমাদের আছে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হলো, শিশু-কিশোরদের নিয়ে আমরা তেমন চিন্তা করি না। সেক্যুলাররা কিন্তু বসে নেই, শিশু-কিশোরদের নিজেদের চিন্তার ছাঁচে ফেলে গড়তে তারা অমুক 'আলো', তমুক 'চিন্তা' ইত্যাদি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে চলেছে। আর সেসব প্রকাশনায় সেক্যুলাররা ইসলাম-বিরোধী কাজগুলোকে 'সাহসী', 'স্বাধীন' হিসেবে অভিহিত করে চালিয়ে যাচ্ছে স্লো-পয়জনিং। আজ যদি আমরা এর সমাধানে এগিয়ে না যাই, কাল হয়তো দেখতে পাব, ভবিষ্যতে যেই ছোট্ট কিশোর হতে পারত এই উম্মাহর কর্ণধার, হতে পারত উমর মুখতারের মতো সিংহ-পুরুষ, যেসব কোমলমতি নারীরা জন্ম দিত খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো বীর সেনানী, সেক্যুলারদের ফাঁদে পড়ে সেই ছেলেটা মিছিলে শাড়ি আর টিপ পরে লিপস্টিক লাগিয়ে সমকামিতার পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে, আর সেই মেয়েটার গর্ভের সন্তান পড়ে আছে ভার্সিটির ডাস্টবিনে।

ছয়. যারা প্রোপাগান্ডা বিশ্লেষণে সক্ষম, তাদের উচিত সম্মুখসারিতে থেকে সবাইকে প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেওয়া। আমাদের মাঝে এমন একটা দল থাকা প্রয়োজন, যারা হবে মিথ্যার জগতের বাসিন্দাদের কাছে গলার কাঁটার মতো। তাদের কাজ হবে সিস্টেম্যাটিক ধারায় প্রোপাগান্ডিস্টদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা। অতঃপর সবচে কার্যকরী উপায়ে তাদের গোমর ফাঁস করতে হবে দ্রুততম সময়ে। তবে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে যেন কোনো পদস্খলন না হয়; কিংবা অপরের ওপর মিথ্যা অপবাদের জুলুম না হয়ে যায়। প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু করে বসলে দুইটা ক্ষতি হয়:
ক) প্রতিবাদের নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতার ব্যাপারে সংশয়ের সৃষ্টি হয়; স্বপক্ষের অনেক লোকজনও প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডা মিথ্যা হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহে পড়ে যায়।
খ) দীর্ঘমেয়াদে দল বা সংগঠনটির গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়।
আবার, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রোপাগান্ডা ফাঁসকারী ব্যক্তিদেরকে প্রতিষ্ঠিত শক্তি নিজেদের চক্ষুশূল হিসেবে দেখে। তাই, প্রোপাগান্ডা এক্সপোজ বা ফাঁস করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম সতর্কতা এবং হেকমত প্রয়োগ কাম্য।

সাত. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একদল তরুণ থাকা প্রয়োজন, যারা ইসলামকে অন্তরে ধারণ করবে এবং এই মহৎ কাজের পেছনে নিজেদের নিয়োজিত রাখবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই বেশিরভাগ মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা সুযোগ পায়। কিন্তু তাদের অধিকাংশের মেধাই দুঃখজনকভাবে মননশীল কোনো কাজে আসে না। কারণ, পাঠ্যপুস্তকের বাইরের দুনিয়ায় সরব আর উৎসাহী অনেক ছাত্রকে নিজেদের জালে আবদ্ধ করে ফেলে রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী 'ছাত্র'রা। গোড়াতেই এই পথ বন্ধ করার উদ্যোগ প্রয়োজন। মেধাবীদের জন্য ইসলামি চিন্তা-চর্চা করার প্লাটফর্ম তৈরি প্রয়োজন। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে না, তবে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ক্ষেত্রে তারা হবে কঠোরপ্রাণ। শত শত দ্বীনি বৈঠক, ক্যাম্পেইন হবে। খ্যাতনামা লেখক, শাইখরা ভার্সিটি থেকে ভার্সিটিতে গিয়ে প্রোগ্রাম করবে। কয়েক বছর পর আমাদের ছাত্ররা সেক্যুলার ইসলামোফোব প্রফেসরদের টেক্কা দেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করবে, এটি আমাদের বিশ্বাস এবং দুয়ায় স্থান দখল করুক। নতুন প্রজন্মের নবীনেরা মিডিয়া, এডুকেশন কারিকুলাম, কালচারের নামে চলা অসঙ্গতিকে সবার সামনে দিনের আলোর মতো ফুটিয়ে তুলে ধরবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে ঈমানের ফুলে সুরভিত, মস্তিষ্কের ক্যানভাসে পড়বে অরুণ প্রাতের তরুণদের হাজারও চিন্তার তরতাজা তুলির আঁচড়।

আট. সাধারণ মানুষের অনুধাবনযোগ্য পোস্টার, ব্যেনার, লিফলেট ইত্যাদি তৈরি করে জনগণের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। হিটলার এ ব্যাপারে সঠিক ছিলেন যে, অধিকাংশ জনগণই প্রফেসরদের মতো মেধা কিংবা চিন্তা নিয়ে বসবাস করেন না। তাই তাদেরকে তাদের চিন্তার দক্ষতা অনুসারে টোটকা দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ধরনের কাজের ব্যাপারে লস্ট মডেস্টি গ্রুপ ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, আল্লাহ তাদের কাজে আরও বারাকাহ দান করুন। আমরা তাদের কাছ থেকে এই শ্রেণির কাজের ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ এবং তাদের সাথে সমন্বিত কাজের আয়োজন করতে পারি।

প্রোপাগান্ডা স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী উভয় প্রকারই হতে পারে। কোনো প্রোপাগান্ডার স্থায়িত্ব হয় অল্পকালব্যাপী, যেগুলোর উদ্দেশ্য-স্বল্প সময়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে অধিক লাভ অর্জন। আবার কিছু প্রোপাগান্ডা হয় দীর্ঘমেয়াদি; ধীরে ধীরে, অল্প অল্প করে বিষ শত্রুপক্ষের মস্তিষ্কে পুশ করা হয়, যার প্রভাব সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু সূক্ষ্মবোধ, ওজনদার অভিজ্ঞতা, সুতীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টি আর শক্ত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি বা দল যদি পূর্বাপর পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করেন, তাহলে তার অন্তর্চক্ষুতে পরিবর্তন ধরা পড়তে বাধ্য। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, কোনো এক বর্ষীয়ান আলেমের বিপক্ষে মিডিয়া কর্মীরা মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন। এটি মিথ্যা হবার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ইসলামপন্থীরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানালেন, সঠিক তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হলো, সেক্যুলার মিডিয়া তাদের প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হলো। এটি হলো ক্ষণস্থায়ী প্রোপাগান্ডা—যদিও তা দীর্ঘস্থায়ী প্রোপাগান্ডারই একটি অংশ। আবার ধরুন, কয়েক বছর আগে জেনারেল শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইতে ইসলাম-বিদ্বেষী নাস্তিকদের লেখা বাতিল করে ইসলামের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু সংস্কার করা হয়। এর মাঝে প্রাথমিক শিক্ষার কোনো এক বইতে অক্ষর চেনাতে গিয়ে লেখা হয়, 'ও-তে ওড়না চাই'। এ নিয়ে বাংলা মিডিয়া-কর্মীদের সেকি কান্না! একাত্তরের যুদ্ধে 'বিশেষ' ভূমিকা রাখা শাহরিয়ার কবির তো বলেই বসলেন, অতে অযু, আতে আল্লাহ—এসব যে প্রতিষ্ঠানে শেখানো হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিশুরাই বড় হয়ে জঙ্গি হয়। এখন, এই যে ক্ষণস্থায়ী প্রোপাগান্ডা, এর প্রভাব এবং এটির বিরোধিতা করার ফলাফল তাৎক্ষণিক উপলব্ধিযোগ্য। কিন্তু, আপনি যদি শিক্ষাব্যবস্থা ও মিডিয়ায় ইসলামি পোশাকের ব্যাপারে সেক্যুলারদের মিথ্যা তথ্য প্রচারের কথা চিন্তা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন—তারা খুব দ্রুত সফলতা পায় না, সেটি তারা আশাও করে না। আপনি আজ পত্রিকায় পড়লেন, বোরকা-হিজাব ইসলামে আবশ্যক নয়। আপনি জানেন, পত্রিকায় মিথ্যা বলা হয়েছে, তাই আপনার মাঝে কোনো ভাবান্তর হলো না। কিন্তু, হয়তো আপনার ছোট ভাই অথবা বোন, কিংবা আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একসময় বারবার এই কথাটি দেখতে দেখতে ভাববে—'ঠিকই তো, বোরকা হিজাব না পড়লেও তো চলে। পর্দা হয়তো এত জরুরি না।' এভাবেই তারা আমাদের মস্তিষ্কে বিষ ঢুকায়; যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে সমাজে দৃশ্যমান হয়। তাই, স্বল্পমেয়াদে প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে যেমন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ময়দানে সক্রিয় হওয়া জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদী প্রোপাগান্ডাকে প্রতিরোধ করতে যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে একতাবদ্ধ, শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। মুসলিম কমিউনিটির সময় এসেছে আরও বড় কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেওয়ার। আপনি রক্ষা পেয়েছেন, আপনার পরবর্তী প্রজন্মকেও রক্ষার ব্যবস্থা আপনাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নিরাশ-হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চেষ্টা করার দায়িত্ব আমাদের; সফলতা, কবুল করার দায়িত্ব আমাদের রবের।

রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ
বর্তমান সময়ে 'মুসলিম'রা যেহেতু ক্ষমতাচ্যুত, তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধের ক্ষমতার চাবিকাঠি আমাদের হাতে নেই। তবে, এর একটি আদর্শ চিত্র আমরা সদ্য বিজয়ী ইমারতে ইসলামিয়ার ছাত্রভাইদের গৃহীত পদক্ষেপগুলোতে দেখতে পাই, যেখানে মিথ্যা প্রচার করা সাংবাদিকদের চাবুক পেটা করা হয়। আমাদের হাতে যেহেতু সে সুযোগ নেই, তাই আমাদের ভিন্নভাবে এগোতে হবে। আমাদের দেশে ইসলামপন্থিদের বলার মতো কোনো মিডিয়া নেই। আগামীকাল যদি কোনো দেশবরেণ্য আলেম ঘোষণা করেন, 'আমাদের মাদ্রাসা জালেমদের আক্রমণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। এই মুহূর্তে তাদের প্রতিহত করার শক্তি আমাদের নেই, তাই আমরা অন্য জায়গায় কালকের মধ্যে আমাদের মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চাই, যেন ইসলাম-বিরোধী শক্তিরা নিজেদের বিজয়ী পক্ষ ভাবতে না পারে। এই মাদ্রাসা আপনাদের সকলের, আমি চাই দেশের সবাই, বিশেষ করে আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যেন দরাজ হস্তে আমাদের এই সংকট দূর করতে দরাজ দিলে এগিয়ে আসেন'। এ ঘোষণা করার এক দিনের মাথায় ঢাকায় কয়েক কোটি টাকা খরচ করে মাদ্রাসা তৈরি করার অর্থ সম্মানিত আলেমের হাতে পৌঁছে যাবে ইনশাআল্লাহ। এটা আমার আশা নয়, বরং এটিই বর্তমানে শহুরে সমাজের ইতিবাচক বাস্তবতা। কোনো দুর্যোগকালীন মুহূর্তে যদি দেশের সকল মুসলিম এভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তাহলে দেশে মুসলিমদের পক্ষে বলিয়ে-র অভাবে দিনের পর দিন আমাদের আওয়াজগুলো যে মাটিচাপা পড়ে যাচ্ছে, আমাদের কথাগুলোর জায়গা দখল করছে বিষাক্ত ইসলাম-বিদ্বেষীদের চিৎকার, সেটি কি দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না?
এ দেশের আলেম সমাজ যদি সমাজের বিত্তশালী ইখলাসপূর্ণ মুসলিমদের সাথে নিয়ে বসেন, কয়েকটি বড় মাপের শক্তিমান মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করার মতো টাকা জোগাড় করা তেমন কঠিন কোনো বিষয় না। এক্ষেত্রে আমাদের অনেক কাজ করা বাকি রয়েছে। সাধারণত একটি মসজিদ কিংবা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের আবেগ ও কর্মের যে সক্রিয়তা দেখা যায়, মিডিয়ায় নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরির উদ্যোগের ক্ষেত্রে সেরকম তৎপরতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অথচ একটি শক্তিশালী প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা টিভি চ্যানেল শত শত মসজিদ-মাদ্রাসা এবং এদের পরিচালিত সামাজিক কর্মকাণ্ডের ভাবমূর্তি উন্নয়নে অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম, এ দেশের বৈরী আবহাওয়ায় যেটি অত্যন্ত কার্যকরী উপায় হতে পারতো। যদিও এটি একদিনে বাস্তবায়নের কোনো বিষয় নয়; ব্যাপারটা বেশ আলোচনা-সমালোচনার দাবি রাখে।
আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টা হতাশাজনক মনে হলেও হতাশার কোনো কারণ নেই। আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আকাবির আর মেধাবী টগবগে এক ঝাঁক তরুণ আছে; উদ্যম, শক্তি, দৃঢ় সংকল্প আর আল্লাহর ওপর সীমাহীন আস্থায় যারা অতুলনীয়। তাই, এখন প্রয়োজন সমন্বয়, ইচ্ছা ও সামর্থ্যকে পুঁজি করে ময়দানে হাতে কলমে কাজে নেমে পড়া। এ জন্য নেতৃস্থানীয় ওস্তাদদের দৃষ্টি আকর্ষণ আশু জরুরি বলেই আমার বিশ্বাস। সর্বশেষ যে পদক্ষেপটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল আনতে সক্ষম হতে পারে, সেটি হলো প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর 'নেতাকর্মী'দের মাঝে দাওয়াতি কাজ অব্যাহত রাখা। এটি আদতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও দুআর প্রভাব ও ক্ষমতা সেই সীমা পর্যন্ত, আমার রবের ক্ষমতার সীমা যতটুকু। কারণ, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, হিদায়াত দান করার একমাত্র মালিক সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা। তিনি কখন তাঁর কোনো বান্দার দুআ কবুল করে নেন, বলা তো যায় না। তাই আমাদের বিশেষ কর্তব্য হলো, একদিকে সেক্যুলার গোষ্ঠীর নেতাকর্মীদের মাঝে কৌশলের সঙ্গে দাওয়াতি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা; আর এর সাথে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দুআ অব্যাহত রাখা। এমনটি হওয়া অসম্ভব নয় যে, আজ যে নেতা-কর্মী ইসলামের বিরুদ্ধে, কাল সে ইসলাম-বিদ্বেষীদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে। আর শত্রু শিবিরের সেনাপতিরা যখন যুদ্ধের ময়দানে প্রকাশ্যে দল বদলে ফেলে, তার প্রভাব নিশ্চয়ই কারো অজানা নয়।
দুটি বিষয় আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। এক, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী; দুই, গণমাধ্যম। এর একটি কাজ করে শিশু-কিশোরদের কোমল মস্তিষ্ক নিয়ে; অপরটি ছোট-বড় সবার চিন্তা-চেতনাকে বদলে দেওয়ার সার্বক্ষণিক চেষ্টায় লিপ্ত। এই দুটি জিনিসকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা যতদিন আমাদের হাতে না আসবে, ততদিন প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধের সব চেষ্টাই অপ্রতুল বিবেচিত হবে। কারণ, যুদ্ধের ময়দানে তলোয়ার ফেলে শুধু ঢাল হাতে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব নয়। আপনি দাওয়াতের মাধ্যমে প্রতিবছর এক-দু হাজার অমুসলিমকে ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনলেন, ভালো কথা। কিন্তু মিডিয়া আর পাঠ্যসূচির প্রভাবে মুসলিম দম্পতির ঘরে ঘরে কিশোর তরুণরা যেভাবে মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে, সেটিকে আটকানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কোথায়? আল্লাহ না করুক, পরিস্থিতি যেদিকে এগুচ্ছে, মুসলিম নামধারী নাস্তিকদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে একসময় ব্যাপারটা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে, তখন সেটি আমাদের জন্য কতটা বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়াবে-সেটি নিয়ে কয়জন চিন্তা করি? সময় থাকতে এই দিকগুলো নিয়ে ফিকর করা দরকার, নিজে মুমিনদের দুর্গের বাসিন্দা হয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনো সুযোগই আমাদের সামনে নেই।
আরও একটি কথা না বললেই নয়, প্রোপাগান্ডার প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। ক্ষুদ্র এক অধ্যায়ে পুরোটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রায় অসম্ভবই বলা যায়। বইয়ের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেক কিছুই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না। তাই, গোটা একটি বই মিডিয়া প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধের বিষয়ে পড়তে পারলে তা ভালো কাজে আসবে। এ বিষয়ে খোঁজাখুঁজি করে আমি এমন এক অমূল্য রত্নের খোঁজ পাই, যেটিকে এ টপিকে 'দেশসেরা' বই বললেও অত্যুক্তি হবে না। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বাস্তবিকভাবেই একজন শরীফ মানুষ, ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন সাংবাদিক, লেখক, সম্পাদক; এবং উনার সবচে বড় পরিচয়, উনি একজন আলেমে দ্বীন। লেখালেখিতে সিদ্ধহস্ত এই বর্ষীয়ান আলেম সেই ২০১৬ সালেই মিডিয়ার হঠকারিতা নিয়ে মাস্টারপিস এক বই লিখেছেন, যার শিরোনাম, 'মিডিয়ার বিচিত্র ভ্রষ্টাচার'। অল্পজ্ঞান নিয়ে এ বিষয়ে আমি যখন লিখতে বসলাম, তখন একটা সময়ে এসে আমার মাথায় হাত পড়ে, প্রোপাগান্ডার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তো হলো, কিন্তু এর প্রতিরোধ, প্রতিকারের ব্যাপারে সমাধান কোথায় পাব? ঠিক ঐ মুহূর্তে আল্লাহর অশেষ কুদরতে আমি এই বইটির খোঁজ পাই। আর অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি, যে বিষয়ে আমরা আজ ভাবছি, সে বিষয়ে তিনি আরও ছয় বছর আগেই পূর্ণাঙ্গ কাজ করে ফেলেছেন। বইটিতে তিনি বর্তমানের করণীয় এবং নিজেদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠার কর্মকৌশল এবং মূলনীতি সম্পর্কে সাবলীল আলোচনা রেখেছেন। অভিজ্ঞতা আর দূরদৃষ্টিতে সম্মানিত শায়েখের কোনো তুলনা নেই, সেই তুলনায় আমি বলতে গেলে ধর্তব্যই না। তাই, কেউ যদি 'প্রোপাগান্ডার সমাধান' সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে উদ্যোগ নিতে চান, তাহলে তার উচিত উনার এই বইটি অধ্যয়ন করা; এটি আমার সবিনয় নিবেদন। এছাড়াও দেশের আপামর জনসাধারণের মাঝে পড়তে সক্ষম এমন সকলের উচিত এই বইটির মতো একটি বই অধ্যয়ন করা, যা তাদের চশমাটির ময়লা সাফ করে দিবে। আমার বিশ্বাস, সহজবোধ্য ভাষায় লেখা বইটি সব বয়সের মানুষই অনুধাবন করতে পারবে, এবং এটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১. এই পরিচ্ছেদটির উল্লেখযোগ্য তথ্য অভিজ্ঞ সাংবাদিক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের 'গণমাধ্যমের বিচিত্র ভ্রষ্টাচার' (২০১৬) বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে; সংগত কারণে শ্রদ্ধেয় শায়েখকে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো স্পর্ধা আমার নেই, মহান রব আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম জাযা দান করুন।
২. সূরা হুজুরাত, ৪৯: ৬।
৩. যেমনঃ পাশ্চাত্য ও ইসলামের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আসিফ আদনান, বিজ্ঞানবাদ সম্পর্কে রাফান আহমেদ, ইসলাম ও বিজ্ঞানের বিস্ময়কর যোগসূত্র ও সামগ্রিকভাবে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে ডাঃ শামসুল আরেফিন, জেনারেল পাঠকদের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি এবং তাদেরকে বইমুখী করতে অদ্বিতীয় আরিফ আজাদ; এ ছাড়াও আরও অনেক দায়ী ভাই, আলিম, শাইখ-ই দ্বীনকে সহজবোধ্য ও সহজলভ্য করতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। তাদের এক একটি বই মানে এক একটি বিপ্লব, নতুন কোনো জাগরণ। মহান রব, দয়াময় প্রভু আল্লাহ তাআলা তাদের কাজকে কবুল করে নিন।
৪. উদাহরণস্বরূপ, ধরুন, সর্বজনগৃহীত কোনো আলিমের বিপক্ষে সেক্যুলার মিডিয়া যখন মানহানিমূলক সংবাদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রচার করে, তখন সকলেই এর প্রচার করে, তখন আপামর জনতা মিডিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষোভ উগড়ে দেয়। কারণ, তারা জানে মিডিয়ার এ বিদ্বেষের উৎস কি। কিন্তু, যখন দেখা যায় নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার কিংবা স্বল্প পরিচিত কোনো আলিমের বিপক্ষে মিডিয়া উল্টাপাল্টা সংবাদ প্রচার করছে, তখন সেটা অনেকেই বিশ্বাস করে ফেলে। এই চিন্তাটা তাদের মাথায় আসে না যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বল্প পরিচিত হলেও, এমনটিও তো হতে পারে যে, উক্ত ব্যক্তিটিও মিডিয়ার কোনো স্বার্থে আঘাত করেছে, তারা মিডিয়া এভাবে ফণা তুলেছে ছোবল মারার আশায়।
৫. আমার অল্পজ্ঞানে হয়তো সবকিছু বইয়ের পাতায় তুলে আনতে পারিনি। আমি নিশ্চিত অনেকেই আমার চাইতে এসব বিষয়ে অধিক ইলম রাখেন আলহামদুলিল্লাহ। তাই, এ বিষয়ে কারো কোনো যৌক্তিক পরামর্শ, উপদেশ, আলোচনা, সমালোচনা সাদরে গ্রহণযোগ্য ও কাম্য।
৬. ইউটিউবে Risalatul Islam BD নামক চ্যানেলে শায়েখের "সময়ের পাঠ” নামক একটি প্লেলিস্ট রয়েছে। ইসলাম, দেশীয় রাজনীতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মূল্যবান মতামত প্লেলিস্ট রয়েছে আপনার কাজে আসবে ইনশাআল্লাহ।

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


ইটটার জবাব পাটকেলেও হয়
মিডিয়াতে প্রায়ই দেখতে পাবেন, তাদের নির্ধারিত কিছু মানদণ্ডে মুসলিমরা কিভাবে ‘ফেইল’ করে, এর সচিত্র প্রতিবেদন তারা প্রচার করে বেড়ায়। কখনো ইসলাম বনাম বাঙালিয়ানা, কখনো-বা দেশপ্রেম-এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে কেন যেন তারা মুসলিমদের অবস্থানকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তাদেরকে বিব্রত করে মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা বেশ সুখ অনুভব করেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই।

ধরুন, কোনো এক ‘অসাম্প্রদায়িক’ মিডিয়ার অর্বাচীন এক সাংবাদিক হঠাৎ করে এক কওমি মাদ্রাসায় গিয়ে উদয় হলো। সেখানে ক্যামেরা হাতে মাদ্রাসার শিক্ষককে প্রশ্ন করল, 'আপনি এই মাদ্রাসার শিক্ষক?' সম্মানিত শাইখ বিব্রত হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ। আমি এখানে ছাত্রদের পড়াই' । 'হুজুর, দয়া করে জাতীয় সঙ্গীত পুরোটা বলুন তো' । এই উদ্ভট প্রশ্নে শাইখ যখন বিব্রত, তখন কামান থেকে দ্বিতীয় 'গোলা' ছোড়া হয়, 'আচ্ছা হুজুর, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কয়টি সেক্টর ছিল', 'সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম বলুন তো' । যে অর্বাচীন প্রশ্ন প্রস্তুত করে নিয়ে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধে তার জেলা কোন সেক্টরে ছিল সেটাই তো সে বলতে পারবে না। কিন্তু পরের দিন সংবাদপত্রে সচিত্র প্রতিবেদন, 'মাদ্রাসাগুলোতে কী শেখানো হচ্ছে'! নিচে ছোট্ট করে লিখে দেয়া হয়, 'তোয়াক্কা নেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের' ।

এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক অপপ্রচার। অমুক সংগঠন মাদ্রাসা রাষ্ট্রযন্ত্রের করায়ত্ত্বে নেওয়ার দাবি করেন তো তমুক গোষ্ঠী মাদ্রাসা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখেন। চারদিক থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়। এ ধরনের ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার বিপরীতে দেশের আলেম সমাজের প্রতিনিধি সচরাচর রক্ষণাত্মক ভূমিকায় থাকেন। আমাদের ওস্তাদদের পক্ষ থেকে সাধারণত জবাব আসে, মাদ্রাসার ব্যাপারে ভুল ধারণা ছড়িয়েছে, সকলের প্রতি আহ্বান মাদ্রাসা ভ্রমণ করে সঠিক তথ্য জানার, মাদ্রাসায় কখনোই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সকল উত্তর যারা মাদ্রাসার বিরোধী, তারা সকলেই জানে; তাদের এমন উত্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। জবাব দেওয়া হয় আপামর জনতার প্রশ্ন ভাষা চোখগুলোর জন্য, যার প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, আমাদের এই দুর্বল অবস্থা দেখে অনেক মুসলিম ভাইয়ের অন্তরে ব্যথা অনুভূত হয়।

এসব অনাচার দেখলে হতাশ লাগাটাই স্বাভাবিক। আমরা তো সত্য নবির উম্মত, তবু কেন আমরা এত দুর্বল? এক মুমিন ভাইয়ের ব্যথায় অপর ভাইয়ের ব্যথিত হওয়ার দরকার আছে, তবে সেটাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন বানানো যাবে না। ঈমানের কালিমা যে বুকে ধারণ করেছে, তার তো হতাশ হওয়া মানায় না। মুমিন তো চিরকালই শক্তিশালী, তার সাথে তো আছেন মহান রব, আমাদের সৃষ্টিকর্তা রহমান আল্লাহ; যিনি সকল পরিকল্পনাকারীর মহাপরিকল্পনাকারী। তাই চলুন, দশ বছর পর আমরা কোন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছাতে চাই, সেই মঞ্জিলের দৃশ্যটা একবার মনের চিলেকোঠার জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে দেখি-

চিন্তা করুন, দশ বছর পরের কোনো একদিন। দেশের প্রধান ও প্রভাবশালী দশটা মিডিয়ার কয়েকটা আমাদের। তখন কিন্তু 'খেলার' কৌশল আর রক্ষণাত্মক থাকবে না; তখন আমরা গোলবারে শট নিব, তারা নাকেমুখে সেই শট ঠেকাতে ব্যস্ত থাকবে, খাবি খাবে। সেটা কিভাবে হবে? ধরুন, আগের দিন পত্রিকায় মাদ্রাসা বন্ধের জোর দাবি জানানো 'লক্ষণ সেন বিশ্ববিদ্যালয়ে'র ভিসির কাছে কোনো মাদ্রাসার সদ্য ফারেগ হওয়া তরতাজা টগবগে তরুণ সাংবাদিক ক্যামেরাম্যান হিসেবে সেই ভার্সিটিরই ছাত্র সহ হাজির হয়ে বলল, 'স্যার আসসালামু আলাইকুম। আমরা “মোল্লা টিভি”র পক্ষ থেকে এসেছি। শোনা যাচ্ছে, দেশের মাদ্রাসাগুলোতে লেখাপড়ার মান ক্রমশ অধঃপতিত হচ্ছে। আমরা মনে করি মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি'?

উত্তরে স্যার তো অবশ্যই হ্যাঁ বলবে। তারপর তরুণ বলবে, 'স্যার, গোসলের ফরজগুলো কি কি বলুন তো' । এ প্রশ্নে ভিসি যখন হতভম্ব হয়ে চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করবে, 'কী বলতে চাচ্ছ তোমরা'? তখন তরুণ জানাবে, 'স্যার, গতকাল আপনি ইসলাম শিক্ষার ঠিক-ভুল সম্পর্কে পেপারে বিশাল প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে আপনি দেখিয়েছেন, দেশের সম্মানিত আলেমরা ইসলামের শিক্ষা কী, সেটাই বুঝে না। কোনটা পড়ানো প্রয়োজন, কোনটি পড়ানো বন্ধ হওয়া উচিত, সেসব নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। তার মানে আপনি নিশ্চয়ই ইসলামের বড় এক পণ্ডিত। স্যার প্লিজ, একটু যদি বলতেন গোসলের ফরজগুলো কী কী'? এ সম্পাদনা কোনোমতেই উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, এসকল সুশীলদের অধিকাংশই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না, লেজেগোবরে করে ফেলবে। তারপর প্রশ্ন হবে, 'স্যার, আপনি কি পঞ্চাশোর্ধ/ষাটোর্ধ নন'? ইতিবাচক উত্তর আসলে বলা হবে, 'তাহলে দেশীয় আইন অনুযায়ী আপনি এত বছর ধরে প্রাপ্তবয়স্ক' । এর উত্তরও 'হ্যাঁ' হলে পরের প্রশ্ন হবে, 'তাহলে স্যার আপনি এতগুলো বছর ধরে নাপাক হয়ে ঘুরাঘুরি করছেন'!

তারপর ভিসি যতই চিৎকার চেঁচামেচি করুক, পরের দিন সবগুলো পত্রিকায় হেডলাইন হবে, 'অমুক ভার্সিটির ভিসি এত বছর ধরে নাপাক'! সাথে ছোট্ট করে লেখা, 'একই অবস্থা আরও দশ জনের' । বিষয়টা কেমন হবে ভাবতে পারছেন? ইসলাম-বিদ্বেষী মহল্লায় আগুন ধরে যাবে, সবাই মিলে ইসলামি পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করবে। কিন্তু ততক্ষণে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে গুল্মবনে আগুন লেগে গেছে, দাউদাউ করে জ্বলছে দাবানল। 'নেভানোর' ক্ষমতা সেক্যুলারদের নেই। ক্ষমতা আর প্রভাবের কারণে কেউ ইসলামিস্টদের টুপিটাও ছুতে পারবে না। কলকাতামুখী, পুঁজিবাদী সেক্যুলাররা তখন নিজেদের নষ্ট হওয়া ইমেজ উদ্ধারের আশায় নানাভাবে তাদের অবস্থানকে ব্যাখ্যা করবে। এসব সুশীলদের হাল দেখে ইসলাম-বিরোধী, ভূমিদস্যু আর পুঁজিবাদী রক্তচোষা কর্পোরেট কোম্পানির প্রসব করা মিডিয়াগুলোও সতর্ক হয়ে যাবে, মুসলিমদেরকে সমঝে চলবে। নাস্তিকদের ইসলাম-বিরোধী গল্প কবিতা প্রবন্ধ আর শিক্ষাক্রমে প্রবেশ করানো হবে না।

আমরা কখনোই ইসলাম-বিদ্বেষীদের মতো এমন নিচুশ্রেণির কাজে লিপ্ত হবো না। কিন্তু তাদেরকে তাদের ওষুধ দিয়ে নাজেহাল করার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে। এই সক্ষমতার পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে, দ্বীনের প্রচারের জন্য এমন একটি পরিবেশ জরুরি, জরুরি এমন ক্ষমতা। মোট কথা, আমাদের বলার, লেখার, বক্তব্য দেওয়ার প্লাটফর্মের সাথে সাথে প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে হবে, যে প্লাটফর্ম জনসাধারণের দৃষ্টিসীমার আওতাধীন; আর জনগণ যে প্রভাবের আওতাধীন। আজ তারা আমাদের ওস্তাদ, হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে বসা আলেমদের নিয়ে যেভাবে অপপ্রচার করে, আমাদের হাতে যদি শক্তিশালী মিডিয়া থাকত, তাহলে আমরাও তাদেরকে ঠিক একইভাবে ঘায়েল করার শক্তি হাতে রাখতাম। হয়তো মুসলিমরা এভাবে নিকৃষ্ট পন্থায় আক্রমণ করত না, তবে বিরোধীরা সর্বদা ভয়ে থাকত, মুসলিমদের হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। বাড়াবাড়ি করার আগে প্রতিটি দুশ্চরিত্র দুবার ভেবে নিত, কারণ তখন মুসলিমদের সম্মানের চাদরে হাত দিলে নিজের লজ্জা নিবারণের হাফপ্যান্ট খুলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি। যেদিন আমরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই গন্তব্যে পৌঁছুব। সেদিন আর কোনো অর্বাচীন আমাদের রব, দ্বীন, রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে টিটকারি করার সাহস পাবে না। সেদিন আর কোনো ইমামকে মসজিদ সভাপতি, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দ অকারণে অপমান করার আগে দশ বার ভাববে। যারা তখনো ইসলামের বিপক্ষে বাড়াবাড়ি করবে, তাদের মুখোশ সেদিন খুলে ফেলা হবে সকলের সামনে। তারপরও যারা সেদিন ইসলামের ওপর কুফরের ঝাণ্ডা উড়াতে চাইবে, তাদেরকেও নিজ অবস্থানে নিরপেক্ষ করে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রশাসন, শিক্ষা-সহ গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে তথাকথিত অভিজাত সাংস্কৃতিক জমিদার আর ইসলাম-বিদ্বেষীরা বসে থাকবে? থাকুক, দ্বিতীয় 'প্রশাসন' তখন আমাদের আয়ত্বে, আমরা ইচ্ছা করলে তাদের জায়গায় উঠাতে পারব, আবার ইচ্ছা করলে তাদের যথাযোগ্য স্থানে ধরে নিয়ে বসাতে পারব। এর জন্য দরকার মিডিয়ার লাগামের নিয়ন্ত্রণ। আসুন, আমরা সবাই সেই দিনটির স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করতে কাজ করি। যেদিন নতুন এক সতেজ আকাশের নিচে স্নিগ্ধ ভোরের বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস বুকভরে টেনে নিবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। নাস্তিকতার কালো মেঘে আর ঢাকা পড়বে না কোনো কিশোরের আকাশে উদিত হওয়া ইসলামের রাঙা প্রভাতের সূর্যটা। এতটুকু আশা করা তো বাতুলতা নয় নিশ্চয়ই; সেই সোনালী দিনের স্বপ্ন তো দেখাই যায়, তাই না?

ফন্ট সাইজ
15px
17px