📄 বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা
বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ শিশু-কিশোরই সেক্যুলার কারিকুলামে পড়াশোনা করে, তাই এই কারিকুলামের শিক্ষার ব্যাপারে কিছু কথা বলা দরকার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে স্বাভাবিকভাবেই স্কুল-কলেজের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী মুসলিম। সেজন্য তাদের জন্য সঠিক ও মানসম্মত ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা করা শাসকের দায়িত্ব। মুসলিম অভিভাবকদের দাবিও সেরকমই হওয়া দরকার। অল্পসংখ্যক অন্যান্য ধর্মের যে-সকল শিশুরা রয়েছে, শাসকের কর্তব্য হচ্ছে তাদের জন্যও তাদের ধর্মের সঠিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেন শিশুরা তাদের প্রাপ্য অধিকার লাভ করে ও সঠিক কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়। যেকোনো স্বাভাবিক মস্তিষ্কের অধিকারী ব্যক্তিই এই দাবিগুলোর সাথে একমত হবেন বলেই আশা করি।
কিন্তু স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সন্তানরা কী ধরনের শিক্ষা পাচ্ছে? মুসলিম ভূখণ্ডে সম্পদ লুটতে আসা ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া গোলাম বানানোর শত বছরের পুরনো শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তির মাঝে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?
২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫-এ T. B. Macaulay ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর রাখা প্রস্তাবনায় বলেন,
'...আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে (ভারতীয়) জনগণের পুরো কাঠামোকে (পাশ্চাত্য শিক্ষায়) শিক্ষিত করার চেষ্টা করা অসম্ভব। [তাই] এই মুহূর্তে আমাদের অবশ্যই এমন এক শ্রেণি গঠনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যারা আমাদের এবং আমাদের শাসন করা লক্ষ লক্ষ জনগণের মাঝে দোভাষী হিসেবে কাজ করবে—এমন এক শ্রেণির মানুষ, যারা রক্তবর্ণে ইন্ডিয়ান; কিন্তু রুচি, মন-মর্জি, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ।'
অর্থাৎ, ব্রিটিশদের প্রস্তাবিত এবং পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল—এ দেশে তাদের তৎকালীন গোলামদেরকে 'মননে ইংরেজ' হিসেবে তৈরি করা, যারা ইউরোপীয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গ্রহণ করবে। আর বাকি ভারতীয়দেরকে গোলামির পাঠশালায় পাঠদানে নেতৃত্ব দান করবে। দুঃখের ব্যাপার হলো, আজ দুই শতাব্দী পর এসে তাদের এ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চূড়ান্ত হয়েছে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সত্তর বছর পরও ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু পরিমার্জন, সংকোচন, পরিবর্ধন ছাড়া তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আমরা দেখতে পাইনি। ফলে ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া 'দেহে বাঙালি, মননে ইংলিশ' শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের মাঝেও ছড়িয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা মূল্যবোধ।
কিন্তু, ইসলামের বিধান, বিশ্বাস আর নৈতিকতার ধারণার সঙ্গে পশ্চিমা সভ্যতার ধারণাসমূহের একেবারে মৌলিক অনেক সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে। যার ফলে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিমদের অন্তরে ইসলাম ও পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ (বলা যায় ধর্ম বিরোধী)—উভয় ধরনের বিশ্বাসের মাঝখানে সৃষ্টি হয় এক গভীর সংকট। আর অভ্যন্তরীণ এই সংকটের ফলাফল কয়েক ধরনের হয়ে থাকে—
* কেউ ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য অনুসন্ধান করে, অনুধাবন করে, তারপর রবের পথে করে প্রত্যাবর্তন। সে তার পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে মহান আল্লাহ ও তাঁর নাযিলকৃত বিধানের ওপর।
* কেউ কেউ ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার উপাদানের কারণে সৃষ্ট মানসিক দ্বন্দ্বে কোনটি উত্তম—সেটি নির্ধারণ করে উঠতে পারে না। তাই, সে উভয় সভ্যতাকে নিজের ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিনিয়ত আংশিক গ্রহণ-বর্জন করে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো আদর্শের ওপর সে অটল নয়।
* আর সবচেয়ে হতভাগা তারা, যারা ইসলামকে সন্দেহ করতে শুরু করে। ইসলামের বিধানগুলোকে পশ্চিমা মানদণ্ড দিয়ে বিচার করতে গিয়ে তার মনে হয়, ইসলাম সেকেলে কিংবা পশ্চিমা সভ্যতা থেকে অনুত্তম। অনেকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিজেদের মতো করে রদবদল করে নেয়, অনেকে পা বাড়ায় ইরতিদাদের দিকে। অস্বীকার করে বসে রবের সাথে তাদের রূহের সম্পর্ক।
মোটা দাগে, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিমরা এই তিন শ্রেণির ভিতরেই পড়ে। অনেকেই এই শ্রেণিগুলোর মাঝামাঝি পর্যায়ে ঝুলে থাকেন, কেউ-বা জীবনের কোনো এক পথের বাঁকে এ পাশ থেকে চলে যান ওপাশে। যাই হোক, ইসলামের কষ্টিপাথর দিয়ে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা যদি যাচাই করি, তাহলে তার কী রকম চিত্র আমরা দেখতে পাই?
অপ্রিয়—কিন্তু সত্য—বাস্তবতা হলো, সময় যত যাচ্ছে, শিশুদের দেয়া শিক্ষার গুণগত মান ততই হ্রাস পাচ্ছে। কিছুকাল পূর্বে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে তো অবস্থা এমন হয়েছিল, পাঠ্য পুস্তকের পাতায় পাতায় ছিল মুরতাদ আর ইসলাম-বিদ্বেষীদের জয়জয়কার। পরে হেফাজতের অভিযোগে সরকার লালনের রতি বিষয়ক কবিতা 'সময় গেলে সাধন হবে না' কিংবা নারীর সন্তানধারণকে পশুর পশুত্বের সঙ্গে তুলনা করা হুমায়ুন আজাদের কুরআন-বিদ্বেষী কবিতা 'বই'-সহ বেশ কিছু গল্প-কবিতা বাদ দেয়। পরের বছর, ২০১৭-তে প্রথম শ্রেণির অক্ষর পরিচয়তে 'ও-তে ওড়না' কেন দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে আবার শুরু হলো সেক্যুলারদের চিৎকার-চেঁচামেচি। তাদের অভিযোগ, 'ওড়না' শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি জেন্ডার বৈষম্য প্রকাশ পেয়েছে।
বিবিসিতে 'বিশিষ্টজনেরা' মত প্রকাশ করেন, এই সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। অথচ, সেক্যুলারদের প্রতিনিধিদের কেউই কিন্তু হেফাজতের কিংবা মুসলিম চিন্তাবিদদের সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি। কখনো নেয়ও না। প্রথম আলোর মতে, 'হেফাজত পাঠ্যপুস্তক থেকে যেসব কবিতা বা গদ্য বাদ দিতে বলেছে, তা মেনে নেয়া ধর্মান্ধতা, হিন্দুবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেয়া।' তাদের মতে, হুমায়ুন আজাদের 'বই' কবিতাটি 'খুবই উৎকৃষ্ট কবিতা'। অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, '... প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ্যে 'ও' বর্ণের পরিচয়ে 'ওল' এর পরিবর্তে 'ওড়না'কে উপস্থাপন করা হলো, যা মূলত মুসলিম কিশোরীরা বয়ঃসন্ধির সময় থেকে ব্যবহার শুরু করে। কিছু বুদ্ধিজীবীর কাছে এগুলো ইসলামি মৌলবাদের দিকে সরকারের ধাবিত হওয়ার অশনি সংকেত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।'
এরপর প্রথম আলো দাবি করল, '১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ এবং পরবর্তী দশকগুলোতে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এ দেশ। কিন্তু তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলে, 'বেশ কয়েক বছর ধরে ... বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাভাবনা দ্রুত অপসারিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন বলেন, “দেখে মনে হচ্ছে, এই ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের মধ্যে দারুণ ঐক্য হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্রে লোকরঞ্জনবাদের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়”। বাঙালি সেক্যুলারদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ঠিক কী পর্যায়ের—ভেবে দেখুন। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠদের কোনো সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে যায়, তখন গণতন্ত্রই সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা, আর যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ সেক্যুলারদের স্বার্থবিরোধী কোনো মনোভাব পোষণ করে এবং সরকার তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়, তখন তাদের ভাষায় গণতন্ত্র হয়ে যায় 'লোকরঞ্জনবাদ'।
প্রথম শ্রেণির ক্লাসে সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পাওয়া সুশীলরা কিন্তু 'র-তে রথ টানি' কিংবা 'ঋ-তে ঋষি ওই বসে আছে' নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। এই দ্বিমুখী স্বভাবের কারণ কী? তাদের আকাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের অসাম্প্রদায়িক বাচ্চারা রথটানা শিখলে ওড়না পরিধান করা শিখতে পারবে না কেন? তাছাড়া ওড়না শুধু মুসলিম কন্যারাই ব্যবহার করে না, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও করেন। কিন্তু কোনো মুসলিম কখনো রথ টানতে যায় না। প্রথম শ্রেণির শিশুরা রথটানা শিখে কী করবে, সেটা নিয়ে সিলেক্টিভ 'অভিভাবক' আর 'বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ'রা কোনো প্রশ্ন তুললেন না, রথ-ঋষিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে নিলেন।
সামগ্রিকভাবে, কোনো সচেতন মুসলিম ব্যক্তি যদি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শ্রেণির বইগুলো পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে তিনি বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখতে পাবেন—
• ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বাচ্চাদেরকে শেখানো হয় বটে, তবে অনেক মৌলিক ও অত্যাবশ্যকীয় বিষয়াবলি বাদ থেকে যায়।
• অনেক সামাজিক বিষয়ের ব্যাখ্যা তো বটেই, গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইসলামি বিষয়ের বর্ণনাও ইসলামের 'বিশুদ্ধ' শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক।
• যেসব বিষয়ে ইসলামের প্রকৃত বিধান লুকানো হয়, সেগুলোর অনেকগুলোকেই আবার অন্য কোনো পাঠ্যবইতে বা পাতায় উপস্থাপিত তথ্য খারিজ করে দেয়। অনেক বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে যে শিক্ষা দেয়া হয়, দেখা যায় সমাজে সেসব শিক্ষা প্রয়োগ করার চেষ্টা করলে আবার সেই বঙ্গীয় মিডিয়া আর প্রতিষ্ঠিত শক্তিই প্রয়োগকারীদের বিপক্ষে ওঠেপড়ে লাগে। কোটা-বিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসীদের হামলা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে দেশের সরকার অনুমোদিত দশ হাজার আলিয়া মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সরকার প্রণীত পাঠ্যবই পড়ানো অত্যাবশ্যক করা হয়। আশা করা হয়, এতে করে শিশু-কিশোরেরা 'রক্ষণশীল' পটভূমি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরকে সরকারি সিলেবাসে ঠিক কী শেখানো হচ্ছে, আর রক্ষণশীল পটভূমি থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে দাদাদের কোন 'উদার' সাগরে ভেসে বেড়ানো শিখছে, তা জানতে তাদের পাঠ্যসূচীর বিভিন্ন শ্রেণির বই পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায়—
ক্লাস ফোর: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
এই বইটিতে নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য শেখাতে গিয়ে বলা হয়, 'নারী ও পুরুষ উভয়ের সব ধরনের কাজ করার যোগ্যতা রয়েছে।... নারী ও পুরুষের মাঝে কোনো বৈষম্য করা উচিত নয়'। নারী, পুরুষ উভয়ের সব ধরনের কাজ করার যোগ্যতা থাকলে সন্তান গর্ভধারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরুষদের দায়িত্ব ঘোষণা করা হোক। বাস্তবতা তো এটাই যে, আল্লাহ মানুষকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের সুবিধামতো সেভাবেই তাদের কর্তব্য নির্ধারণ করেছেন। কোনো কলাবিজ্ঞানী যদি হুট করে বলে নারী-পুরুষ উভয়ের যোগ্যতা (শারীরিক, মানসিক) সমান, তাদের উচিত তাদের এ দাবির প্রমাণ উপস্থাপন করা।
তারা দাবি করে নারী পুরুষ সমান, অথচ নারীদের জন্য আলাদা কোটার ব্যবস্থা করে রাখে। সকলের জন্য সমানাধিকার থাকলে তো কোটা থাকার কথা নয়, যে যোগ্য সে-ই যোগ্যতর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার অধিকার রাখে। ধরে নিলাম, সেক্যুলারদের বিশ্বাস অনুযায়ী, নারী-পুরুষ সমান সুযোগের অধিকার দেয়া যেতেই পারে। কিন্তু উভয়ের জন্য সমান ফলাফলের অধিকার আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখাটা কি লিঙ্গবৈষম্য নয়? সমান সুযোগ কখনোই সমান ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় না, আইন করে সেটা জোরপূর্বক প্রয়োগ সুস্পষ্টরূপে যোগ্যদের প্রতি জুলুম। আবার, একদিকে অবাধ যৌনতার সমর্থনে আইন করে রাখা হয়েছে। অপরদিকে বহু বছর ধরে নারীদের জন্য 'বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ'-এর মতো উদ্ভট মামলার সুব্যবস্থা রাখা ছিল। পুরুষদের বাদ দিয়ে নারীদের জন্য আলাদা 'নারী ও শিশু নির্যাতন আইন' করা হয়েছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কে দিবে?
প্রকৃত বাস্তবতা হলো, আল্লাহ নারী ও পুরুষের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখেছেন। এই সাইন্সকে অস্বীকার করা কূপমণ্ডুক কলা-বিজ্ঞানীরা যতই বলুক নারীর সবকিছু করার যোগ্যতা রয়েছে, তাদের সেই দাবি তারা নিজেরাই বিশ্বাস করে না। আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে, এমন ব্যক্তি কখনোই দাবি করবে না—নারী-পুরুষের ফিজিওলজি, সাইকোলজি, কাজ করার সক্ষমতা এক ও অভিন্ন। অথচ, নারী পুরুষ সমান দাবি করা 'প্রথম বিশ্বে'র দেশগুলোর নিরাপত্তা বাহিনীতেই দেদারসে নারী নির্যাতন চলছে। অন্যদিকে, এ দেশীয় সেক্যুলাররা আজ নিজেদের ইচ্ছামতো আইন করে নারীদের অন্যায্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। কিছু নারী সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিনা অপরাধে পুরুষদের জেল-জরিমানা করাচ্ছে। আর এই ধরনের ঘটনায় দিনদিন বিয়ের প্রতি নতুন প্রজন্মের বিতৃষ্ণা জন্ম নিচ্ছে। একে অপরের পরিপূরক হওয়ার বদলে নারীবাদীদের আবিষ্কৃত প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়ছে নারীরা, সহযোগী হওয়ার বদলে তারা স্বামীকে ভাবছে প্রতিদ্বন্দ্বী। আর উভয় জাতির মনেই সৃষ্টি হচ্ছে প্রচণ্ড পুরুষ আর নারী-বিদ্বেষ, যার দায় লিবারেল-সেক্যুলার, কর্পোরেট সোসাইটির 'টিস্যু' ফেমিনিস্ট আর এই তথাকথিত শিক্ষাবিদদের।
পরমতসহিষ্ণুতার ব্যাপারে বলা হয়েছে, 'যেকোনো বিষয়ে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মত থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ মানুষ যে মতটি সঠিক মনে করে সেটিই গ্রহণ করা উচিত। এই প্রক্রিয়াকে গণতন্ত্র বলা হয়'। আজ আমরা নতুন একটা বিষয় শিখতে পারলাম—সত্য হলো গণতান্ত্রিক। যেকোনো বিষয়ে অধিকাংশের মতকেই সঠিক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত? অধিকাংশের মত যে সঠিক হবে, তার ভিত্তি কী? এমনও তো হতে পারে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধিকাংশের জ্ঞানই নেই। ইরাক যুদ্ধের সময় যেই বিষয়টি স্বচ্ছ জলের মতো প্রমাণিত হয়ে গেছে। কিংবা ধরুন, ভারতের নাগরিকরা গণভোটে কিংবা অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি কাশ্মীরে নির্যাতন চালানোর পক্ষে মত দিলেই সেটি সঠিক হয়ে যাবে? গণতন্ত্র আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা আবার সত্য-মিথ্যা আর নৈতিকতার মানদণ্ড হলো কবে থেকে?
ইসলামি খিলাফত আর গণতন্ত্র—উভয়ের মাঝে মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে। উভয়েই আলাদা স্বতন্ত্র দুটি শাসন পদ্ধতি। ইসলামি খিলাফত সিস্টেমে রাজ্যের সকল প্রজার ভোটে শাসক নির্বাচিত হয় না, হয় মুসলিম সমাজের মুত্তাকী, বিশ্বস্ত, জ্ঞানী ও বিচক্ষণদের পরামর্শের ভিত্তিতে। গণতান্ত্রিক সিস্টেমে বুদ্ধিমান ও নির্বোধ উভয়কে একই পাল্লায় মাপা হয়। যে সিদ্ধান্ত ইতিপূর্বে বহুবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। ইরাক যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বে থাকা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে জনমত বদলাতে সক্ষম। তাছাড়া গণতন্ত্র নির্ভর করে মনুষ্যসৃষ্ট সেক্যুলার আইনের ওপর, আর খিলাফত নির্ভর করে আল্লাহপ্রদত্ত আইনের ওপর। সেক্যুলার আইনের ওপর আল্লাহর আইন নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। আজ অর্থের অসীম প্রবাহ সত্ত্বেও পশ্চিমা সমাজে হতাশা বৃদ্ধি, সুইসাইড মহামারি, বিয়ে ও পরিবার ব্যবস্থার ভাঙন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। তাই, ইসলামি খিলাফত এক্ষেত্রে গণতন্ত্র থেকে অধিক নির্ভুল হওয়ার দাবি রাখে।
তাছাড়া খিলাফত ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয় কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে। আধুনিক সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শাসনে এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইসলামি খিলাফতে প্রতিটি ধর্মের অধিকার তাদের ধর্মমতে নিশ্চিত করা হয়। অপরদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষের মনগড়া আইন বানিয়ে সকল ধর্মের নাগরিককে সেই একই আইনে মাপা হয়। আল্লাহর আইনের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয় মানুষের ভুলেভরা বোধশক্তিকে—যেটি সুস্পষ্ট জুলুম।
অনেকেই অধুনালব্ধ মনুষ্যসৃষ্ট আইনের ওপর আল্লাহর আইনের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি ঠিক অনুধাবন করে উঠতে পারেন না। অনেকেই দেখা যায়, নিজেকে মুসলিম দাবি করেন, কিন্তু সেক্যুলার আইনের ওপর তাঁর অগাধ আস্থা। অথচ একটা সহজ প্রশ্ন দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে শুধু ষষ্ঠ শতাব্দীর জন্য প্রেরণ করেননি; বরং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্যই ইসলামকে মনোনীত করেছেন। তাই বর্তমান সময়ে কেউ যদি মনে করেন, খিলাফত-শারীয়া চৌদ্দ শ বছর আগে এসেছিল, এখন সেগুলো পুরনো হয়ে গিয়েছে, তাই আমাদের নিজেদের বিচার-বুদ্ধিকেই অধিক প্রাধান্য দেয়া দরকার; তাহলে তাঁর এই চিন্তার মানে দাঁড়ায়—আল্লাহ কুরআন নাযিলের সময় বর্তমান সময়ের কথা চিন্তা করেননি; কিংবা আল্লাহর জীবনব্যবস্থার চাইতে কাফিরদের মস্তিষ্কপ্রসূত জীবনব্যবস্থা উন্নত।
নাউযুবিল্লাহ! এরকমটি কি কখনো হতে পারে? আল্লাহ কি পূর্বাপর সকল মানুষের অধিকার কোন শাসন-ব্যবস্থায় সর্বোত্তমভাবে নিশ্চিত হবে সেটি জানেন না? এই পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন থেকে অনন্ত মহাকাশ যে মহান রব সৃষ্টি করেছেন, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিয়মে সবকিছু সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন, পরিচালনা করছেন, তিনি এই ছোট্ট পৃথিবীতে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু মানুষের তৈরি আইন থেকে উত্তম আইন প্রণয়নে সক্ষম নন, এই ধরনের চিন্তা আল্লাহর প্রতি কুধারণা। যিনি এই সমগ্র জাহানের স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক—একজন মুসলিমের পক্ষে তাঁর বিধানগুলো থেকে কাফিরদের সৃষ্ট বিধানসমূহকে উত্তম ভাবা কিভাবে সম্ভব? এই শ্রেণির চিন্তা আল্লাহর প্রতি বেইনসাফি। আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে আমাদের প্রকৃত ধারণা না থাকায় আমরা এই ধরনের বিদ্রোহী চিন্তায় পতিত হই। আর এই শ্রেণির চিন্তা-ভাবনা থেকেই হয় ধর্মত্যাগের সূচনা। আল্লাহ আমাদের সকল প্রকার কুফরি চিন্তাভাবনা থেকে রক্ষা করুন।
বইটিতে পরবর্তীকালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর পদ্ধতিতে বলা হয়, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের যথাযথ শিক্ষা থাকলে তারা পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের কাজ করতেন’।
শিক্ষা কাকে বলে? শিক্ষার উদ্দেশ্য কি অর্থ উপার্জন, নাকি প্রকৃত ধার্মিক মানুষ হওয়া—যা ব্যক্তিকে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যোগ্য করে তুলবে এবং নিজের ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে সক্ষম করে তুলবে? হ্যাঁ, অর্থ উপার্জন বেশ জরুরি বিষয়, একটি পরিবার পরিচালনা করতে আয়ের বৈধ উৎস থাকা প্রয়োজন। তাই বলে কি নারীদেরও অর্থ উপার্জন করতে হবে? যেসকল নারীরা অর্থ উপার্জন করে না, তারা কি অশিক্ষিত? এটা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নারীদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন? ইসলামের ভিত্তিতে প্রকৃত শিক্ষা কাকে বলে? পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চার নারী হলেন মারইয়া, আসিয়া, খাদীজা, ফাতিমা। তাঁদের কে অর্থ উপার্জন করতেন? সালফে সালেহীনদের কয়জন নারী শারীয়া পূর্ণতা পাবার পর অর্থ উপার্জন করেছেন? একজন ব্যক্তি কতটুকু 'শিক্ষিত' সেটি নির্ণয়ের মানদণ্ড কি অর্থের পরিমাণ? এই মানদণ্ড কে নির্ধারণ করেছে? এত সব প্রশ্নের উত্তর কি কোনো প্রগতিশীল 'ফেমিনিস্ট' আমাদেরকে দিবে, নাকি সমাধান পাব ইসলামে?
'আমাদের সংস্কৃতি' শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, শাড়ি বাংলাদেশের মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। কিন্তু, হাস্যকর বিষয় হলো, বোরকার কোনো উল্লেখই সেখানে নেই। অথচ বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বোরকা এ দেশের নারীদের পোশাক হিসেবে বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত, যার ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শোষকশ্রেণির তাঁবেদার দেশীয় কিছু গোলামরা বর্গীদের কালচার বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করে এ দেশে পশ্চিমা নগ্ন-অর্ধ নগ্ন সংস্কৃতির গোড়াপত্তন করে।
ক্লাস ফাইভ: আমার বাংলা বই
প্রথম অধ্যায়েই ঘোষণা করা হয়েছে, 'ধর্ম যার যার, উৎসব যেন সবার'। অথচ আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে এ কথা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে আদেশ করেছেন যে,
'তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন।' (সূরা কাফিরুন, ১০৯ : ০৬)
ব্যাঙের ছাতার মতো হঠাৎ গজিয়ে উঠা 'জাতীয় উৎসব' মঙ্গল শোভাযাত্রায় পেঁচাসহ অন্যান্য মূর্তি নিয়ে পালন করা প্রথাগুলোর উৎস কোথায়? মূর্তি নিয়ে মিছিল করে কার কাছে অশুভের বিনাশ, মঙ্গল কামনা করা হয়? পেঁচার কাছে, নাকি অন্য কোনো মূর্তির কাছে? অথচ মুসলিমরা একমাত্র আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করে; কোনো গাইরুল্লাহর কাছে নয়। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে মুয়াজ্জিন আমাদেরকে 'হাইয়া আলাল ফালাহ' বলে আহ্বান করেন প্রকৃত কল্যাণের পথে। মুসলিমদের কল্যাণ তো কেবল ইসলামেই। আল্লাহ ছাড়া কল্যাণ দানের ক্ষমতা আর কার রয়েছে? এইসব শিরকি উৎসবে মুসলিম শিশুদের উৎসাহিত করার পিছনে 'ফায়দা' কার?
দুই শতাব্দী ধরে ভারতীয় সম্পদ লুট করার সুবিধার্থে সড়ক ও রেলপথের যে উন্নয়ন করেছিল ব্রিটিশরা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে এখন সেটার ভালো দিক পড়ানো হয়। দুইশত বছর দাস হিসেবে কাটিয়ে ব্রিটিশরা তো চলেই গেছে, কিন্তু গোলামির শেকল এখনো অনেকে গলা থেকে খুলতে পারেনি। তাছাড়া, হিন্দুরা ব্রিটিশদের অধীনে জমিদার হয়ে মুসলিম প্রজাদের যে অকথ্য নির্যাতন করত, পূর্বের বইগুলোতে থাকা সেই তথ্যটিও বর্তমানে সব বই থেকে গায়েব হয়ে গেছে।
ক্লাস সিক্স : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
বইটিতে সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, 'সংস্কৃতি বা Culture যেকোনো শব্দেই তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হোক না কেন, সংস্কৃতি আসলে মানুষের জীবনধারা। ... মানুষ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, সমাজজীবনে কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে যা কিছু চিন্তা ও কর্ম করে তা-ই তার সংস্কৃতি।'
'বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে যে সুরটি প্রধান, সেটিকে বলা হয় মানবতাবাদ। অর্থাৎ, মানুষের জন্য ভালোবাসা, মানুষে মানুষে সম্প্রীতি। এসব কথার প্রতিফলন আমরা পাই লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গানে।'
পরবর্তীকালে বলা হয়েছে, 'সুতরাং প্রতিনিয়ত অন্য সংস্কৃতির উপাদান গ্রহণ, বর্জন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে চর্চা করব এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাব'। এ দেশে প্রায়শই দেখা যায়, বোরকা-নিকাবের মতো ইসলামের বিধানকে সেক্যুলাররা 'আরবীয় সংস্কৃতি' বলে অবজ্ঞা করেন এবং সেগুলোকে আগেকার ব্রাহ্মণ-হিন্দুদের মতো 'অচ্ছুৎ' হিসেবে গণ্য করেন। তাহলে, গ্রহণীয় 'অন্য সংস্কৃতি' কি শুধুই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, আর ইসলামের সংস্কৃতি গ্রহণ করা অপছন্দনীয়?
এছাড়াও আফগানিস্তানের শাসকরা বোরকাকে বাধ্যতামূলক করলে বাঙালি সেক্যুলার লিবারেলরা 'সংস্কৃতি গেল' বলে হায় হায় রব তোলেন। তাহলে, পশ্চিমা উপনিবেশীয় আমলে পশ্চিমারা এবং পরবর্তীকালে তাদের তাঁবেদার সেক্যুলার শাসকরা যে পশ্চিমা সংস্কৃতিকে মুসলিম জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল—যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তুরস্ক—তাদের ক্ষেত্রে সেক্যুলাররা পশ্চিমা ও পশ্চিমা গুণমুগ্ধ শাসকদের চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতিকে পূর্বের রূপে (ইসলামি শাসনামলে যেমনটি ছিল) ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি তোলে না কেন?
বাংলাদেশের আপামর নারীজাতি কখনোই নৃত্য কিংবা সংগীতের প্রতি অনুরক্ত ছিল না। ব্রিটিশরা আসার পূর্বে এ ধরনের কাজে যুক্ত ছিল নটী-বাইজীরা, সমাজ যাদেরকে দেখত ঘৃণার চোখে। বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে এই সকল বিষয় কখনোই সংযুক্ত ছিল না। এই কাজগুলো নাটকীয় গতি পায় পাকিস্তানী শাসনামলে, ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হওয়া যে সাবেক রাষ্ট্রকে আজ সেক্যুলাররা 'ইসলামি রাষ্ট্র' বলে দাবি করে। তাহলে, আজ কেন নর্তক-নর্তকী আর নট-নটীদের কাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলা হয়? অপরদিকে, বঙ্গভূমিতে অল্প বয়সে বিয়ের ইতিহাস হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। তাহলে অল্প বয়সে বিয়েকে আজ কেন সংস্কৃতি বলা হয় না? এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ইতিহাসে তো কখনো বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের প্রচলন ছিল না, তাহলে আজ কেন 'লিভ টুগেদার'কে বৈধ করা হয়েছে? লিভ টুগেদার বৈধ আর পছন্দনীয় হলে আমাদের প্রশ্ন, কোনটি সংস্কৃতি আর কোনটি অপ-সংস্কৃতি, এটার মানদণ্ড কী? এই মানদণ্ডগুলো কে বা কারা নির্ণয় করবে? গুটিকয়েক সেক্যুলারের কলকাতামুখী 'চেতনাই' যদি সবকিছুর মানদণ্ড হয়, তাহলে 'হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি' বলে চমকপ্রদ হাতসাফাই করার দরকার কী?
ব্রিটিশদের আগমনের পর ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু দেশীয় 'চামড়ায় বাদামী' আর মননে ব্রিটিশ, মানে এ দেশীয় দালালদের উত্তরসূরিরা গত শতাব্দী থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ আর প্রগতিশীল সংস্কৃতির নামে মুসলিম বাঙ্গালীদের সংস্কৃতিতে পৌরাণিক ও পৌত্তলিক সংস্কৃতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার, অনুপ্রবেশ করানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। আজকের মুসলিম তরুণসমাজকে সেই অপসংস্কৃতির ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে চাইলে আবারও সমৃদ্ধ করতে হবে ইসলামি সংস্কৃতি। ইসলামে অনুমোদিত সংস্কৃতির তুমুল প্রচার ও প্রসার করে পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি মুসলিম পরিবারে। ভুল হবে, সংশোধন চলবে—কিন্তু থেমে থাকা যাবে না। তরুণদের অনুধাবন করাতে হবে, বাঙালিয়ানা আমাদের সম্পত্তি, আমরাই বাঙালি। ব্রিটিশ আমলে বিষফোঁড়ার মতো আবির্ভাব ঘটা হিন্দু জমিদারেরা শত বছর আমাদের পূর্বপুরুষদের শোষণ করেছে। ব্রিটিশদের পতনের পর তাদের সেই শোষণব্যবস্থা এখন নেই বটে, তবে সেই জমিদারদের প্রেতাত্মা এখনো বাংলার বুকে ঘুরে বেড়ায়। তাদের উত্তরসূরিরা এখনো এ দেশকে নিজেদের জমিদারী মনে করে। তারা ভাবে, তারা যে কলকাতার সংস্কৃতি পালন করে, তাই সেরা আর অদ্বিতীয়। বাদবাকি 'অচ্ছুৎ' মুসলিমরা যদি সে সংস্কৃতি মানতে পারে, তাহলেই তারা 'জাতে' উঠতে পারবে।
আমাদের কাজ, তাদের এই জমিদারী চিন্তার মূলে কুঠারাঘাত করা। আমরা যেমন বখতিয়ার খলজির উত্তরসূরি, তেমনি এই মাটির আদি বাসিন্দাও আমরাই, ব্রিটিশদের গোলামি করা জমিদাররা নয়; তারাই আসল শেকড় কাটা, অত্যাচারী ব্রিটিশদের তাঁবেদারি করে এ মাটিকে তারা নিজেদের দাবি করার অধিকার হারিয়েছে। তাই, অযথা কলকাতার অনুসারী বাঙালি 'সাজতে' গিয়ে মূর্তি নিয়ে পৌত্তলিকদের মতো বাজহাঁস, প্যাঁচার কাছে অশুভের বিনাশ কামনা করলে ঈমান ভঙ্গ হয়ে মুশরিক হওয়ার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। পথভ্রষ্ট মুসলিম তরুণ সমাজ ইসলামের আহ্বানে ফিরে আসতে চাইলে তারা যেন কোনো আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে না ভোগে, তাকে সেই আত্মবিশ্বাস দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় উপাদান জোগান দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। আজ না হোক, কালকের দিনটি যেন আমাদের হয়, আমাদের উত্তরাধিকারীদের হয়। সেই সুন্দর সোনালি সমাজ প্রস্তুত করার লক্ষ্যে মুসলিমদেরই অবিরত কাজ করে যেতে হবে।
'বাংলাদেশে শিশু অধিকার' শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, 'শিশুরা ছোট বলে তার গায়ে শক্তি কম। একই কারণে তার জ্ঞানও কম। কিন্তু ... তার ওপর কোনো ব্যাপারে জোর খাটানো চলবে না। শিশুও কতগুলো ব্যাপারে স্বাধীনতা ভোগের অধিকারী।' সেখানে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের উল্লেখ করে কয়েকটি ধারা তুলে ধরা হয়েছে। যেমন: '১৮ বছরের কমবয়সী যেকোনো মানুষ শিশু'। তো, দেশীয় আইনে শিশুদের কী ধরনের 'স্বাধীনতা' রয়েছে? 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০' এর ৯নং ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, 'কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত ষোলো বৎসরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোলো বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।'
অর্থাৎ, আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত সকলে শিশু, তাই তারা বিয়ে করতে পারবে না। কিন্তু ষোলো বছর বয়স হলেই তারা স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক করতে পারবে, সেটা তাদের অধিকার। শারীরিক সম্পর্ক করা না করার ব্যাপারে তাদের ওপর জোর খাটানো যাবে না। যৌনতার ক্ষেত্রে আইন করে দিয়ে তাদেরকে দেয়া হয়েছে অবাধ স্বাধীনতা।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—সতেরো বছর এগার মাস ঊনত্রিশ দিন হলেও যদি সব 'শিশু'ই থাকে, তাদের বিয়ে করার অধিকার না থাকে, বিয়ে দিলে সেটা 'বাল্য বিবাহ' ও 'নারী নির্যাতন' হয়ে যায়, তাহলে ষোলো বছর বয়সী 'শিশু'র শারীরিক সম্পর্কের অধিকার কিভাবে হয়? তাদের সাথে কেউ শারীরিক সম্পর্ক করলে সেটা 'শিশু নির্যাতন' হবে না কেন? ষোলো বছর বয়সী কোনো মেয়ে 'শিশু'কে যদি আনভীরের মতো ব্যক্তিরা সুযোগ-সুবিধা, টাকার বিনিময়ে মাসের পর মাস ভোগ করে, তাহলে সেটিকে 'যৌনদাসত্ব' বলা হবে না কেন? যে-সকল সেক্যুলাররা এসবের প্রোমোটার তাদেরকে 'দাস/যৌন ব্যবসায়ী' বলা হবে না কেন? এটা তো বিনিময়ের মাধ্যমে শিশুর কাছ থেকে যৌন আচরণ কেনা, তাহলে এই ধরনের কাজকে 'শিশুশ্রম' বলা হবে না কেন? বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াই যেসব সেক্যুলাররা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়, আবহমান বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি অনুযায়ী তাদেরকে পতিতা কিংবা রক্ষিতা বলা হবে না কেন? আর যারা এর প্রচার-প্রসার করে, তাদেরকে 'পতিতা'র ডিলার বলা উচিত নয়? এখানে এসে 'সংস্কৃতি রক্ষা'র তাগিদ কোথায় হারিয়ে যায়? এই ধরনের আইন করে ছেলেমেয়েদের ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার নাম কি ধর্মীয় স্বাধীনতা? এই যে এত 'কেন কেন কেন', নবপ্রজন্মকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দিবে? হয়তো-বা দেশীয় সেক্যুলার শিক্ষাবিদদের কাছ থেকে আমরা এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আশা করতেই পারি।
ক্লাস এইট : গণিত
জেনারেল কারিকুলামে 'সুদ'কে মুনাফা নাম দিয়ে ছোট ছেলেমেয়েদের শেখানো হয় যে, এটি হলো ব্যবসা। বইতে লেখা আছে, 'ব্যাংকে টাকা রাখলে ব্যাংক সেই টাকা ব্যবসা, গৃহনির্মাণ ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে ঋণ দিয়ে মুনাফা করে।' বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংক ঋণ দিয়ে যেই নীতি অনুযায়ী টাকা ফেরত নেয়, তার সঙ্গে ব্যবসা আর ইসলামি অর্থনীতির ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। তারা একটি নির্দিষ্ট সুদের হার ধার্য করে টাকা ধার দেয়। এমনকি বইতে মুনাফা নির্ধারণের যে রুলস শেখানো হয়েছে, সেটিও সুদ নির্ধারণেরই রুলস, ইসলামি অর্থনীতি অনুযায়ী ঋণগ্রহীতার লাভক্ষতি হিসেব করার পূর্বেই মুনাফা এভাবে নির্ধারিত হয় না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সুস্পষ্টভাবে সুদের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,
'যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচাকেনা সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন'।
এরপর আল্লাহ আবারও বলেন,
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদেরও জুলুম করা হবে না।'
এই হলো বাংলাদেশের শিক্ষার বাস্তবতা। এখানে সুদকে মুনাফা নাম দিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে যথাযথ 'শিক্ষা' প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিপক্ষে যুদ্ধের, আর সেটিও করা হয় শব্দের লুকোচুরির মাধ্যমে।
এ তো গেল আলিয়া মাদ্রাসা ও জেনারেল কারিকুলামের সাধারণ বিষয়গুলো; আলিয়া ও জেনারেল—উভয়ক্ষেত্রেই যে বিষয়গুলোর বইয়ের মৌলিক উপাদান এক ও অভিন্ন। অন্যদিকে শুধু জেনারেল কারিকুলামের জন্য প্রণীত ইসলাম শিক্ষা বইয়ের নাম বদলে করা হয়েছে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা। জেনারেল কারিকুলামের ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইগুলোতে খোলা চোখেই বেশ কিছু সমস্যা দেখা যায়। যেমন—
পঞ্চম শ্রেণি : অন্য ধর্মের প্রতি 'শ্রদ্ধাশীল' হওয়া শেখাতে দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাতান্ন পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, 'হযরত মুহাম্মদ মদিনায় হিজরত করেই মদীনা ও তার আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলোর সাথে একটি বিশ্বখ্যাত সনদপত্র সম্পাদন করেন ইতিহাসে যা 'মদীনা সনদ' হিসেবে খ্যাত। ... এ সনদের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা- নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার তথা মানবাধিকার স্বীকৃত ও নিশ্চিত হয়।'
এখানে লেখক মহোদয় শুভঙ্করের ফাঁকির আশ্রয় নিয়েছেন। বিশুদ্ধ সিরাহ গ্রন্থ সীরাত ইবনু হিশাম-এ মদীনা সনদের সকল ধারা সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত রয়েছে; যার মধ্যে কয়েকটি ধারা উপরিউক্ত দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। উল্লিখিত ধারাগুলো হলো-
* কোনো মুমিন ব্যক্তি কোনো কাফিরের জন্য কোনো মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে না বা কোনো মুমিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো কাফিরকে সাহায্য করবে না।
* আর কোনো মুশরিক বা পৌত্তলিক ব্যক্তি কোনো কুরাইশের সম্পদ বা প্রাণের আশ্রয়দাতা হবে না এবং কোনো মুমিন ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে বাধা দিতে পারবে না।
* আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে আর সাক্ষ্য-প্রমাণে তা প্রমাণিতও হয়ে যাবে, তার ওপর থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে—হত্যার বদলে তাকে হত্যা করা হবে। হ্যাঁ, যদি নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়, আর সমস্ত মুমিনের তাতে সায় থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই (অর্থাৎ এটা অবশ্য করণীয়)।
* আর যখন তোমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ তাআলা ও মুহাম্মাদ-এর নিকট তা উত্থাপন করতে হবে।
* বনু আওফের ইহুদিরা মুমিনদের সাথে একই উম্মতরূপে গণ্য হবে। ইহুদিরা জন্য তাদের ধর্ম, মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্ম, তাদের গোলামদের এবং তাদের নিজেদের ব্যাপারে একথা প্রযোজ্য হবে।
লেখক মহোদয় সম্ভবত এটাও ভুলে গেছেন, মদীনা সনদ ছিল অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি; এটিই শারীয়ার চূড়ান্ত রূপ নয়। শারীয়া মদীনা সনদের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করেনি, বরং শারীয়া পরিপূর্ণতা লাভ করে বিদায় হজের সময়। আল্লাহ তাআলা ওই সময়ে নাযিলকৃত কুরআনের আয়াতে বলেন,
'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামাত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।'
তাছাড়া, শারীয়া আইন অনুযায়ী কাফিররা ইসলামি খিলাফতে থাকবে যিম্মি হিসেবে। তাদের নিরাপত্তার পুরো দায়ভার থাকবে মুসলিম শাসকের ওপর, ইসলামি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা রক্ষার কর্তব্যভার থেকে তারা থাকবে মুক্ত। সেই সঙ্গে তাদের ব্যাপারে কিছু বিধি-নিষেধও রয়েছে। গনিমতের কোনো ভাগ কাফিররা লাভ করবে না। হ্যাঁ, তারা তাদের জন্য নির্ধারিত ইনসাফ লাভ করবে এবং কোনো মুসলিম তাদের ওপর জুলুম করলে ইসলামি বিধান অনুযায়ী সেই মুসলিম সাজা ভোগ করবে, মুসলিম বলে কেউ জুলুম করে পার পাবে না। তাছাড়া মদীনা সনদে মুসলিমসহ সকল ধর্মের জনগণ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার সুযোগ পেত। বর্তমানে প্রচলিত সেক্যুলার রাষ্ট্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ইসলামসহ, প্রতিটি ধর্মের ধর্মীয় বিধানকে দমন করে নিজেদের কল্পনাপ্রসূত বিধান সকল ধর্মের ওপর চাপিয়ে দেয়, যেটি মদীনা সনদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আর বিষয়গুলো শিশুদের বইতে বিকৃত করে উপস্থাপিত হয়।
এর ঠিক পরের পৃষ্ঠায় দাবি করা হয়েছে, 'মহানবী ও মুসলিমগণ আক্রান্ত না হলে কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন না।' এখানে মূলত ইকদামী জিহাদকে (আক্রমণাত্মক জিহাদ) সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। যেটা আল্লাহ তাআলা'র বিধান নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার: ইসলামের ব্যাপারে চূড়ান্ত পর্যায়ের জঘন্যতম ধৃষ্টতা। রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবিত থাকতেই তিনি কিসরা ও কায়সারের পতনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। উমার-এর সময়ে সাহাবিরা আক্রমণাত্মক জিহাদে নিজেদের জীবন আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। আক্রমণাত্মক জিহাদের মাধ্যমেই মুসলিম খলীফারা পূর্ব ইউরোপ থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত ইসলামের বিজয়-কেতন উড়িয়েছিলেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে কি কেউ আক্রমণ করেছিল, যে তিনি নিজেকে 'রক্ষা' করতে গিয়ে সিন্ধু জয় করে ফেলেছিলেন? রক্ষণাত্মক জিহাদ ফরজে আইন, আর দ্বীনের শাসন ছড়িয়ে দিতে আক্রমণাত্মক জিহাদও ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান। চৌদ্দশত বছরে ইসলামের পুরো ইতিহাস জুড়ে কোথাও সর্বজনগৃহীত কোনো ফকিহ, মুহাদ্দিস বা মুফাসসির ইকদামী জিহাদকে অস্বীকার করার নজির নেই। কিন্তু, 'ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা' বইটির 'সম্মানিত' লেখকগণ সালফে সালেহীনদের পালন করা ইসলামের বিধানকে কী করে বেমালুম অস্বীকার করে বসলেন, তার 'কারণ' আঁচ করা আমার পক্ষে ঠিক সম্ভব হয়নি।
তৃতীয় অধ্যায়ে 'আখলাক বা চরিত্র ও নৈতিক মূল্যবোধ' অধ্যায়ে শুরুতেই শেখানো হয়েছে সৃষ্টির সেবা। এরপরই ব্যাখ্যা করা হয়েছে 'দেশপ্রেম'। সেখানে মক্কার প্রতি রাসূল-এর ভালোবাসার বর্ণনা করতে গিয়ে হিজরতের সময় মক্কার দিকে তাকিয়ে বলা রাসূল-এর কথাগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। অতঃপর তারা এক জাল হাদীস বর্ণনা করে বললেন, 'তাই তো জ্ঞানীরা বলেছেন, দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।' এই বাক্যের সাথে কোনো রেফারেন্স নেই। তাই কোন শ্রেণির জ্ঞানী ব্যক্তিরা এটা বলেছেন, সেটা বাচ্চারা জানতে পারছে না। 'দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ' কথাটি হাদীস হিসেবে বানোয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মোল্লা আলী কারীসহ পূর্ববর্তী বহু আলিম এটিকে বানোয়াট হিসেবে বাতিল করেছেন। রাসূল-এর সময়ে বর্তমানে পশ্চিমাদের আবিষ্কৃত জাতিরাষ্ট্র বা দেশভিত্তিক শাসন-ব্যবস্থা ছিল না। তখনকার শাসন-ব্যবস্থা ছিল গোত্র ভিত্তিক, এর সঙ্গে বড় বড় সাম্রাজ্যও ছিল। পরবর্তীকালে ইসলামই বিশ্বকে খিলাফতের মতো আদল ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় করায়। অন্যদিকে, বর্তমানে প্রচলিত পশ্চিমা জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের সাংঘর্ষিক।
ষষ্ঠ শ্রেণি : ষষ্ঠ শ্রেণিতে দ্বিতীয় অধ্যায়ে একটি কৌতূহল জাগানো উদ্দীপক দেয়া আছে, উদ্দীপকটিতে বলা হয়েছে, 'লুতফুর সাহেব বেশ ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। একদিন বেড়াতে গিয়ে সীতাকুণ্ডে একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন। তখন আসরের সময় হয়ে গেছে। তখনই তিনি এক দলা মাটি দিয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে সমস্ত মুখমণ্ডল ও কনুইসহ দুই হাত মাসেহ করে আসরের নামাজ আদায় করলেন।'
দুইজন মাদ্রাসাছাত্র কাকতালীয়ভাবে ঠিক এই গল্পের মতোই সীতাকুণ্ডে পাহাড়ে গিয়ে আযান দিয়ে নামাজ পড়েন। কিন্তু, সেখানে আযান দেয়ায় দেশের সেক্যুলার গোষ্ঠী 'ভীত' হয়ে পড়ে। পরে এই দুই মুসলিম ভাইকে গ্রেফতার করা হয়। আর এই ঘটনা আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয়, বইয়ের শিক্ষা বইয়ের পাতায় রেখে দেয়াই 'বুদ্ধিমানের পরিচয়'। নৈতিক শিক্ষার নামে বইতে গেলানো অসাম্প্রদায়িক নীতি নিজ জীবনে প্রয়োগ করে মুসলিমরা যতই অসাম্প্রদায়িক সাজার চেষ্টা করুক না কেন, দিনশেষে রাষ্ট্রের সকলেই সাম্প্রদায়িক; কেউ 'সেক্যুলার' সম্প্রদায়ের, কেউবা ধর্মীয়।
সপ্তম শ্রেণি : তৃতীয় অধ্যায়ের শেষে নৈতিক গুণাবলি বিষয়ক তিনটি হাদীসের শেষ হাদীসটি হলো ইসলামি খিলাফতে কাফির, মুশরিক অর্থাৎ যিম্মিদের অধিকার সম্পর্কিত। সেখানে বলা হয়েছে, 'অমুসলিমদের ধর্ম নিয়ে অবহেলা প্রদর্শন করা যাবে না।' অতি উত্তম কথা, বাচ্চারা অন্য ধর্মকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবে না। এই বিষয়টিকে ছোট বেলায়ই মুসলিম কিশোর-কিশোরীদের শিখে রাখা দরকার।
কিন্তু, রাসূল ﷺ তাঁর পুরো নবুওয়াতি জীবন ব্যয় করেছেন কাফির-মুশরিকদের ঈমানের ছায়াতলে নিয়ে আসার দাওয়াতি কাজে। আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কুরআনে বলেছেন, 'আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, “নিশ্চয় আমি জমিনে একজন খলীফা সৃষ্টি করছি”...'
রাসূল পৃথিবীতে এসেছেন রিসালাত নিয়ে, কাফির-মুশরিকদের জাহান্নামের পথ থেকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনতে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ, যা প্রত্যেক দায়িত্বশীল মুসলিমের পালন করা প্রয়োজন; কারণ আল্লাহ আমাদের এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করেছেন, সেটার ব্যাপারে বইতে কোনো শিক্ষা নেই কেন? প্রতিটি কাফির অনবরত ধাবিত হচ্ছে প্রজ্বলিত অনন্ত আগুনের দিকে, তাদেরকে আগুনের বাসিন্দা হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার শিক্ষা কোথায়?
তাছাড়া, রাসূল কি সাহাবিদেরকে তেইশটি বছর কাফিরদের সাথে কেবল মিলেমিশে চলার শিক্ষাই দিয়েছেন? নাকি রাসূল স্বয়ং দাওয়াতি কাজ বন্ধ করে আবু জাহল, আবু লাহাব, হুয়াই ইবনু আখতাবের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে বসবাস করেছেন? মক্কার মুশরিকদের ধর্ম নিয়ে নাযিল হওয়া কুরআনের আয়াতগুলো শুনলে মুশরিকরা কষ্ট পাবে এই ভয়ে তিনি কি কুরআনের আয়াত কাফিরদের থেকে লুকিয়ে রাখতেন? আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না।'
এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শিশু-কিশোরদের শেখানো হয় না। মুসলিম শিশুরা যেন (প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর) তাদের মুশরিক সহপাঠীদের আখিরাতের মুক্তির পথে আহ্বান জানাতে পারে, তাদেরকে সেই তাগিদ বা শিক্ষা দেয়া হয় না। শুধু শেখানো হয় মিলেমিশে শিন্নি আর প্রসাদ খাওয়া, আর হাতি-ঘোড়া বাঘ-সিংহ পেঁচার কাছে মঙ্গল প্রার্থনা করা। মুসলিমরা যদি মুশরিকদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান আরম্ভ করে, তাহলে আল্লাহ চাইলে তারা হয়তো চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে বাঁচার তাগিদ অনুধাবন করলেও করতে পারে। কিন্তু, মুসলিমরা যদি শুধু একসঙ্গে হুতোম পেঁচা নিয়ে অ-মঙ্গল শোভাযাত্রা করে, তাহলে মুশরিকরা তো এ কথাই চিন্তা করবে যে, 'ওদের আর আমাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই; তাহলে আর মুসলিম হয়ে আমাদের কী লাভ'? কথাগুলো শুনলে হাস্যকর মনে হতে পারে, তবে এতে চিন্তার অবকাশ রয়েছে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই ধরনের ভারসাম্যহীন শিক্ষা কখনোই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না; এই শ্রেণির শিক্ষাকে বড়জোর 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' গোছের সেক্যুলার শিক্ষা বলা যেতে পারে।
অষ্টম শ্রেণি : আখলাক অধ্যায়ে দেশপ্রেমের পাঠে লেখা হয়েছে, 'দেশপ্রেম মানবজীবনের একটি মহৎ গুণ। দেশপ্রেমের মূলেই আছে দেশের ভূখণ্ডকে ভালোবাসা। দেশের জনগণকে ভালোবাসা, দেশের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষা করা এবং দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রথা, রীতি-নীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান করা কর্তব্য। দেশপ্রেমের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম দেশপ্রেমের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।'
বদর থেকে শুরু করে মক্কা বিজয়ের পূর্বে প্রতিটি যুদ্ধে মুহাজিররা মক্কার যেসব কাফিরদের হত্যা করেছিলেন, তারা তো মুহাজিরদের নিজ ভূখণ্ডের (বইয়ের ভাষায় দেশের) জনগণ। মুহাজিররা কি নিজ দেশের জনগণকে (মক্কাবাসী কাফির) ঘৃণা করে ভুল করেছিল? মক্কা বিজয়ের সময়ে এবং এর পূর্বের যুদ্ধগুলোতে যে-সকল কাফিররা রাসূল-এর বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তারাও তো দেশের 'স্বাধীনতা', 'সার্বভৌমত্ব' ও 'স্বকীয়তা' রক্ষার উদ্দেশ্যেই যুদ্ধ করে। মক্কার ইতিহাস ছিল কুফরের ইতিহাস, মক্কার ঐতিহ্য ছিল সুদ আর ব্যাভিচারের ঐতিহ্য, মক্কার প্রথা ছিল উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করা, মক্কার রীতি-নীতি ছিল মেয়েশিশুদের জীবন্ত কবর দেয়া, মক্কার ধর্মীয় মূল্যবোধ ছিল কাবাঘরের বাইরে মূর্তি পূজা করা আর মুশরিকদের কাবায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া, মক্কার সংস্কৃতি ছিল মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত হওয়া। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এগুলোর প্রত্যেকটিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ইতিহাসের ছিন্ন পাতায় এগুলোর স্থান নির্ধারণ করে দেন। মক্কা বিজয়ের পর সাহাবিরা কাবাঘরে থাকা মূর্তিগুলোকে কোনো সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাননি, ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন সেগুলোর নোংরা অস্তিত্ব। আমাদের শিশু-কিশোরেরা তাহলে কোনটা মেনে নিবে, ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষা, নাকি সেক্যুলার কারিকুলামের দেওয়া শিক্ষা?
ইসলাম জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম সমর্থন করে না; এমন দেশপ্রেম—যা মানুষকে তার স্রষ্টার চাইতে দেশকে বেশি প্রাধান্য দিতে শেখায়। হ্যাঁ, এটা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য যে, সে তার জন্মভূমিকে ভালোবাসবে; ইসলাম সেটাকে নিষিদ্ধ করেনি। কিন্তু, যখন তার জনপদ ইসলামের বিপক্ষে চলে যায়, তখন একজন মুসলিম কখনোই তার জনপদের সঙ্গ দিতে পারে না। মক্কার মুহাজিররা যখন মদীনার আনসারদের সঙ্গে বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের একে একে হত্যা করেছিলেন, তখন প্রশ্নটা দেশপ্রেমের ছিল না। প্রশ্ন ছিল ইসলামের। আর দেশপ্রেমকে যদি পজিটিভ অর্থে নিতে হয়, তাহলে 'নিজ জনপদে ইসলাম প্রতিষ্ঠা' করা আর নিজ ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা—এ দুটি বিষয়কে প্রকৃত দেশপ্রেমের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ, রাসূল তার জন্মভূমিতে যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে ব্যাখ্যা না করে কেবল 'দেশের মাটি', 'সার্বভৌমত্ব', 'স্বাধীনতা'র মতো বিমূর্ত বিষয়ের উল্লেখ ছাত্রদের জ্ঞানকে সঠিকভাবে বিকশিত করে না; বরং তাদেরকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দিকে ঠেলে দেয়।
খিলাফতের অভ্যন্তরে সকল মুসলিম ছিল একটি অখণ্ড উম্মাহ। কিন্তু বর্তমান দেশপ্রেম আমাদেরকে শেখায় আরাকানিরা মিয়ানমারের নাগরিক, কাশ্মীরীরা ভারতীয়; ওরা নির্যাতিত হলে সেটা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অন্য দেশের মুসলিমদের নির্যাতিত হওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনাকে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রচার করে উগ্রবাদ হিসেবে। বাস্তবতা হলো, খিলাফতের পরিবর্তে বর্তমানে পশ্চিমাদের এক্সপোর্ট করা জাতিরাষ্ট্র নিজেই একটি ধর্মে পরিণত হয়েছে; আর সবাইকে এই ধর্মের অনুসারী হতে করা হচ্ছে বাধ্য। এই ধর্মের নাম—নাগরিক ধর্ম। এ ধর্মে 'প্রভু'র আসন দখল করেছে রাষ্ট্র; আসমানি কিতাবের জায়গা নিয়েছে সংবিধান আর জাতীয় নেতারা হয় এই ধর্মের পয়গম্বর। ইসলামি বিশুদ্ধ চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক পশ্চিমা সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকে প্রোমোট করতে প্রতি ক্লাসেই দেশপ্রেমের অস্পষ্ট ধারণা আর জাল হাদীস শেখানোটা খুবই দুঃখজনক।
'সন্ত্রাস' শীর্ষক অনুচ্ছেদে সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় বলা হয়, 'ভয় দেখিয়ে বা জোর খাটিয়ে মানুষের কাছ থেকে কিছু আদায় করা বা আদায়ের পরিবেশ সৃষ্টির নীতিকে সন্ত্রাস বলে'। একটা দৃশ্যপট চিন্তা করুন। চিন্তা করবার দরকার নেই, আশেপাশের ঘটনাগুলোর দিকে একটু নজর বুলান। সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতা দখল করে নিজেদেরকে জাতির উদ্ধারকর্তা দাবি করে জেঁকে বসা অল্প কিছু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি গোটা জনপদকে কব্জা করে স্বার্থ আদায়ের উদাহরণ আমাদের চারপাশে অহরহ দেখা যায়। হ্যাঁ, এই ব্যক্তিরা ডেমোক্রেটিক সিস্টেমেই নির্বাচিত হয়, আর তারপর কায়েম করে নিজেদের স্বর্গরাজ্য: যেখানে তারা বসে রাজার আসনে, আর বাকি সবাই হলো প্রজা, যাদের প্রধান কাজ ট্যাক্স-ভ্যাট দেয়া; ২০%, ৩০%, ৪০%, যেভাবে লুটেপুটে নেওয়া যায়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে 'উধাও' করে দেয়া হয়। তাদের লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে অসহায় জনগণ জিম্মি। কেউ কেউ জনগণের অর্থ-সম্পদ লুট করে গড়ে তোলে অবৈধ সম্পদের পাহাড়। কিন্তু এই কাজগুলো যারা করে, তাদেরকে কেন যেন 'সন্ত্রাসী' বলা হয় না।
কিংবা ধরুন, বহির্বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র আপনার দেশে হামলা চালিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অরাজকতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সাহায্য করছে স্বদেশীয় কিছু মীরজাফর, জগত শেঠ, রায় বল্লভ, উমিচাঁদের মতো ব্যক্তিরা। ভিনদেশী ওই শত্রুরা আপনার রাষ্ট্রে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে নির্বিঘ্নে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ভিনদেশী গোষ্ঠী আর তাদের পুতুল সরকার—উভয়কে কী বলে সম্বোধন করা হবে? তাদের কার্যক্রমকে কি ইসলামি বিধান অনুযায়ী বিচার করা হবে নাকি বর্তমান সেক্যুলার আইন অনুযায়ী?
ওই পৃষ্ঠাতেই বলা হয়েছে, 'ইসলাম সন্ত্রাস প্রতিরোধে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থেকে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।' এখন ওপরের দুটি প্রেক্ষাপটে—ধরুন ভারতের কাশ্মীরে কিংবা ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তানে—যদি কোনো মুসলিম জনপদের অত্যাচারিত মজলুম মানুষগুলো অন্যায়কারী দলগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে ওই মুসলিম গোষ্ঠীকে কী বলা উচিত? দেশপ্রেমিক? নাকি সন্ত্রাসী? দেশীয় মিডিয়া ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের ব্যাপারে কি ধারণা প্রচার করে?
পরের পৃষ্ঠাতে সন্ত্রাসের কারণ হিসেবে পরোক্ষভাবে দারিদ্রতা, অশিক্ষা, বেকারত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়কে দাবি করা হয়েছে। অথচ গত এক শতাব্দীতে বেসামরিক নাগরিক হত্যার কারণগুলোর মাঝে সবচেয়ে গুরুতর কারণ হলো রাষ্ট্রীয় যুদ্ধবিগ্রহ। ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, উইঘুর—প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সরকারযন্ত্রগুলোই সবচে বেশি বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছে এবং করছে। এসকল ভূখণ্ডে পরিচালিত সন্ত্রাসের পেছনে কোনো অশিক্ষিত, বেকার ও দরিদ্র লোক জড়িত ছিল না। অথচ বইতে রাষ্ট্রীয় এই সন্ত্রাসের ব্যাপারে কোথাও কোনো তথ্য নেই।
আদর্শ জীবনচরিত অধ্যায়ে মুহাম্মাদ-এর জীবনীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় মক্কার সকলের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষভাবে আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী হিন্দাকে ক্ষমা করার কথা সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ যে দশজন চূড়ান্ত শ্রেণির অপরাধী কাফিরের বেলায় রাসূল ﷺ বলেছিলেন তাদেরকে কাবার গেলাফ জড়িত অবস্থায় পেলেও হত্যা করতে হবে, মহাক্ষমার দিনে সেই বিশেষ ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই, যদিও সেটি ইসলামের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। এই একটি বিধানের কারণেই আজ পর্যন্ত কাফির-নাস্তিকরা কুরআন ও ইসলাম অবমাননা করতে ভয় পায়।
১২৩তম পৃষ্ঠায় রাসূল-এর ব্যক্তিগত আদর্শ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ... অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি-সহ অনুসরণীয় গুণাগুণ রাসূল ﷺ-এর জীবনে বিদ্যমান ছিল। ১২৫ পৃষ্ঠায় দাবি করা হয়েছে, রাসূল রাষ্ট্র পরিচালনায় আল-কুরআনের সার্বজনীন গণতন্ত্রের নীতি অনুসরণ করেন। ... রাসূল দেশ পরিচালনায় জনগণের মতামতের স্বীকৃতি দেন। যা গণতন্ত্রের মূল কথা।... রাষ্ট্রের সকলের সমঅধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেন। ... আইনের চোখে মুসলিম-অমুসলিম, ধর্ম, বর্ণ-গোত্র সকলে সমান এ নীতির বাস্তবায়ন করেন’।
কোনো কাফিরও রাসূল ﷺ এর নামে এরকম জঘন্যতম অপবাদ দিতে দুইবার ভাববে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ? এই মূল্যবোধ রাসূল ﷺ-এর জীবনের কোথায় ছিল? গণতন্ত্রের উৎপত্তি ইউরোপে, রাসূল এর নুবুওয়াতি জীবন থেকে তেরোশত বছর মুসলিমদের শাসনব্যবস্থায় সেক্যুলার গণতন্ত্রের কোনো চিহ্নও কোথাও ছিল না। মক্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফিররা যখন তাঁর ইসলাম প্রচারের বিরোধিতা করছিলেন, তখন যদি রাসূল গণতন্ত্রের অনুসরণ করতেন, তাহলে তো রাসূল ইসলাম প্রচারই বন্ধ করে দিতেন। চিন্তা করতে পারছেন, কত বড় নিকৃষ্ট এক অপবাদ দেয়া হয়েছে রাসূল ﷺ-এর নামে? রোমান আর পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার পর সেখানে ইসলামি খিলাফত কায়েম করা হয়, সেখানে তো মুসলিমরা সংখ্যালঘু ছিলেন, আর শাসনব্যবস্থা ছিল শারীয়াভিত্তিক, তাহলে সাহাবিরা কি রাসূল-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করতেন না? আউযুবিল্লাহ। সূরা আনআমে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন,
'সাবধান! হুকুম প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই।'
অর্থাৎ, আল্লাহর দেয়া হুকুমের বাইরে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কী বলল, সেটা মুসলিমদের ধর্তব্য বিষয় নয়। আল্লাহ সে বিষয়ে তাঁর রাসূল ﷺ-কে সতর্ক করে বলেছেন,
'আর যদি তুমি যারা জমিনে আছে তাদের অধিকাংশের অনুসরণ করো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা শুধু ধারণারই অনুসরণ করে এবং তারা শুধু অনুমানই করে।'
কুরআনের কোথায় সর্বজনীন গণতন্ত্রের নীতি বর্ণিত আছে? পবিত্র কুরআনে তো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার প্রতি মানবজাতিকে আহ্বান করা হয়েছে এবং আল্লাহর আইন অমান্যের কঠোর পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তিরা মিলে 'সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি' অনুযায়ী হারামকে হালাল বা হালালকে হারাম করলে সেটি হালাল বা হারাম হয়ে যাবে, কুরআনের কোথাও কি এরকম কোনো ইঙ্গিত রয়েছে? দেশ পরিচালনায় জনগণের মতামতের স্বীকৃতিই যদি হয় গণতন্ত্রের মূল কথা, তাহলে রাসূল মক্কা বিজয়ের দিনই কাবা চত্বরের ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গণতন্ত্রের মূলনীতিকেও ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করেছেন। কারণ, মক্কার অধিকাংশ জনগণ ছিল কাফির, মূর্তি ধ্বংস করতে রাসূল তাদের কোনো পরামর্শ নেননি, ভোটের আয়োজনও করেননি।
প্রকৃত বাস্তবতা হলো, গণতন্ত্রের যে মূলনীতির কথা সেক্যুলাররা বলে, 'সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ', এ নীতিও এখন আর সবখানে সর্বদা মানা হয় না। রাসূল দেশ পরিচালনায় আল্লাহর নির্দেশিত শারীয়া ভিত্তিক পথ অনুসরণ করেন, কাফিরদের আবিষ্কৃত কোনো তন্ত্রমন্ত্রের স্থান সেখানে ছিল না। কারণ, ঈমান ও কুফর কখনো একসাথে পথ চলতে পারে না। আর মজলিশে শূরার কথা যদি বলতেই হয়, তাহলে সেটিও গণতন্ত্রের কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ, মজলিশে শূরা ইসলামের মৌলিক বিধান বা আইন বাতিল করার অধিকার রাখে না; কিংবা ইসলামের সুস্পষ্ট বিধানের পরিপন্থী কোনো আইন—যেমন: রাষ্ট্রীয়ভাবে পতিতালয়ের লাইসেন্স প্রদান—নতুন করে প্রণয়ন করতে পারে না। ইসলামে পরামর্শ করার বিধান রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই রাসূল সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন, কিন্তু সেই পরামর্শ পরিচালিত হতো আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসারে, সেক্যুলার বৈধ-অবৈধের দর্শন অনুযায়ী নয়। এই মৌলিক পার্থক্যের বিষয়টি শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো প্রয়োজন, অথচ সেটি না করে উল্টো রাসূল এর নামে নিকৃষ্ট মিথ্যাচার করা হচ্ছে পাঠ্যবইতে।
রাসূল রাষ্ট্রের সকলের 'সমঅধিকার' নিশ্চিত করেন—এই দাবি করার পরের প্যারাতেই দেখা যায়, বইতে স্বীকার করা হয়েছে, রাজস্বের উৎস হিসেবে রাসূল মুসলিমদের থেকে যাকাত ও কাফির মুশরিকদের থেকে জিযিয়া গ্রহণ করতেন। যাকাত ও জিযিয়া—উভয়ের পরিমাণও ভিন্ন ছিল, সচরাচর যাকাতের পরিমাণ ছিল জিযিযর চাইতে অধিক। অর্থাৎ, রাসূল রাজস্বের ক্ষেত্রে ঈমান ও কুফরের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য করেছেন। তাহলে এই দাবির উৎস কোথায় যে, রাসূল-এর দৃষ্টিভঙ্গী ছিল অসাম্প্রদায়িক? এটা অবশ্যই সত্যি যে, আল্লাহর রাসূল কাফিরদের জন্য নির্ধারিত অধিকার ভঙ্গের ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণের ব্যাপারে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করেননি। কিন্তু, রাসূল ছিলেন মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন,
'তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।'
এছাড়াও আল্লাহ বলেন,
'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সিজদাহরত দেখবেন।'
সূরা মাইদায় আল্লাহ তাআলা বলেন,
'হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় দ্বীন থেকে ফিরে যাবে, অচিরেই আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি বিনম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ—তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।'
অর্থাৎ, আল্লাহ সেই কওমকে ভালোবাসেন যারা মুমিনদের প্রতি বিনম্র হয় এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হয়। এছাড়াও আল্লাহ তাআলা সূরা তাওবাতে বলেন,
'হে নবি, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন, তাদের প্রতি কঠোর হোন; এবং তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কতই-না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল!'
আবার আল্লাহ তাআলা বলেন,
'হে নবি, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন; আর তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম এবং তা কত নিকৃষ্ট ফিরে যাওয়ার স্থান!'
জিহাদ চলাকালীন কিংবা স্বাভাবিক—উভয় সময়েই রাসূল মুমিনদের প্রতি ছিলেন স্নেহশীল ও কল্যাণকামী। অপরদিকে তিনি কাফিরদের কল্যাণও কামনা করেছেন—তাদেরকে ঈমানের পথে আহ্বান করার মাধ্যমে; যে সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত বইতে অনুপস্থিত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর কাছে কাফির ও মুমিন সমমর্যাদার হতে পারে না; এটি অসম্ভব বিষয়।
তাই, 'আইন'-এর চোখে সকলে সমান—রাসূল এই নীতির বাস্তবায়ন করেছিলেন—এটি একটি মিথ্যা অপবাদ। ইসলামে হক ও ইনসাফ স্বীকার করে, কাফিরদের জন্য নির্ধারিত অধিকার বাস্তবায়ন করে। কিন্তু সেক্যুলারদের আবিষ্কৃত তথাকথিত 'সমঅধিকার'কে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না। ইসলামি শরীয়া অনুযায়ী যার যার বিশ্বাস ও ধর্ম অনুসারে আইনের প্রয়োগ বাস্তবায়িত করা হয় এবং কেউ যদি ইসলামি আইনে বিচার প্রার্থনা করে, তখন তাকে ইসলামি আইনে বিচারের অনুমতি দেওয়া হয়। তাই, 'আইন' বলতে বর্তমানের সেক্যুলার বিশ্বাসভিত্তিক আইন— যেমন : পরস্পর সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কের কোনো সাজা নেই—এই ধরনের কোনোকিছু রাসূল বাস্তবায়ন করেননি এবং চার খলীফা-সহ পরবর্তী শাসকরাও এরকম কোনো আইন প্রণয়ন করেননি। এই ধরনের আইনকে বরং আকবরের 'দ্বীনে ইলাহি'র সঙ্গেই তুলনা করা যায়; যার অবস্থান ঈমানের সীমানার বাইরে।
আল্লাহর আয়াতের ওপর যাদের ভরসা নেই, তারা কুরআন, হাদীস, ফিকহ, শারীয়া, হুদুদ-এর কিতাব কিংবা সালফে সালিহীনদের জীবনাচরণ (আমল), কিতাবাদি খুলে যাচাই করে দেখুক, কোথাও পশ্চিমা গণতন্ত্র তো দূর, গণতন্ত্রের সমর্থক এমন কোনো শব্দও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা রাসূল ও তাঁর পরবর্তী তিন প্রজন্ম অনুসরণ করতেন। আজ বাংলাদেশে অধিকারের মুলো ঝুলানো গণতান্ত্রিক শাসন-শোষণ ব্যবস্থা জারি। তাই বিদ্যমান ব্যাবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে রাসূল-এর জীবনের সঙ্গে কাফিরদের আবিষ্কৃত মূল্যবোধকে জড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আর সেটিও পড়ানো হচ্ছে ইসলাম শিক্ষার নামে। ইসলাম গ্রহণের পর সামগ্রিকভাবে মুসলিম বাঙালিদের ঈমানি জীবনে এত করুণ দুর্দিন এর পূর্বে কখনো এসেছিল কি? আমরা কি এতটাই দেউলিয়া হয়ে গেছি যে, ইংরেজদের শিখিয়ে যাওয়া মূল্যবোধের সাথে খাপ খাওয়াতে নবিজির জীবনীকে বিকৃত করতে হচ্ছে?
নবম-দশম শ্রেণি:
নবম-দশম শ্রেণির বইতে জিহাদের ব্যাপারে বেশকিছু মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়,
'জিহাদ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ পরিশ্রম, সাধনা, কষ্ট, চেষ্টা ইত্যাদি। আর ইসলামি পরিভাষায় জান-মাল, ইলম, আমল, লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর দ্বীনকে (ইসলামকে) সমুন্নত করাই হলো জিহাদ। অনেকেই জিহাদ বলতে শুধু রক্তপাত ও কতল (হত্যা) বোঝেন। এটা সঠিক নয়। কেননা জিহাদ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। পৃথিবীর যা কিছু 'উত্তম' তাতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই শুধু জিহাদ হতে পারে।' আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, “তোমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো, যেভাবে জিহাদ করা উচিত।” (সূরা হজ, ২২ : ৭৮)
বস্তুত সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব ধরনের চেষ্টা, শ্রম ও সাধনাই হলো জিহাদা।
পরবর্তীকালে জিহাদের প্রকারভেদ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়— ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদ তিন প্রকার—
১. স্বীয় নফসের (প্রবৃত্তির) সাথে জিহাদ করা। যেমন : মুহাম্মদ বলেছেন— ‘প্রকৃত মুজাহিদ সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্য করার ব্যাপারে নিজের নফসের (কুপ্রবৃত্তির) সাথে জিহাদ করে।' (মুসনাদে আহমাদ) এরূপ জিহাদকে রাসূলুল্লাহ ﷺ সবচাইতে বড় জিহাদ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বদর যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বলেছেন— 'আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের (কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ) দিকে ফিরে এসেছি।' (কানযুল উম্মাল)
২. জ্ঞানের সাহায্যে জিহাদ করা। এরূপ জিহাদকে পবিত্র কুরআনে জিহাদে কাবির (বড় জিহাদ) বলা হয়েছে।
'সুতরাং আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না এবং আপনি কুরআনের (জ্ঞানের) সাহায্যে তাদের সাথে প্রবল জিহাদ চালিয়ে যান।' (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৫২)
৩. ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। এটি হলো জিহাদের সর্বোচ্চ স্তর। কেউ ধর্মদ্রোহী হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে আঘাত হানলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।
ওপরে উল্লিখিত নফসের বিরুদ্ধে জিহাদকে বড় জিহাদ দাবি করা যে হাদীসটি উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেটি সহীহ নয়। সন্দেহাতীতভাবে নফসের জিহাদ কুফরের বিরুদ্ধে জিহাদের আগে আসে; কারণ, স্বীয় নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ না করে কেউ কুফরের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশগ্রহণ করার সাহস করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
'তোমাদের ওপর লড়াই করাকে লিখে দেয়া হয়েছে, যদিও তোমাদের নিকট এটা অপ্রিয়। কিন্তু তোমরা যা অপছন্দ করো, হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা ভালোবাসো, হতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।' (২: ২১৬)
এরপর বইটিতে আবারও বলা হয়েছে,
'ইসলামি জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এক শ্রেণির লোক জিহাদ ও সন্ত্রাসকে এক করে ফেলেছে। বস্তুত উভয়ের মাঝে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। বলা যায়, এ দুটো পরস্পর বিপরীত। রাজ্য জয়, ক্ষমতা দখল, সম্পদের লোভ, খুন-খারাবি, লুটতরাজ এবং অন্যায় রক্তপাত জিহাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসা এবং জুলুম ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে ইনসাফ ও ন্যায়ের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে আসাই জিহাদের উদ্দেশ্য। ... আল্লাহ তাআলা বলেন—
এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে, যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৩৯)
ইসলাম জিহাদের মাধ্যমে মুসলমানদের রক্তপাত করতে শেখায়নি। রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় তিনি প্রায় একশত-এর কাছাকাছি জিহাদে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সবগুলো জিহাদ মিলিয়ে উভয়পক্ষে পাঁচশ-এর কম লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।
বর্তমান যুগে জিহাদের নামে যেভাবে বোমাবাজি, জঙ্গিবাদ, খুন-খারাবি ও নিরীহ লোকজনকে হত্যা করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটা সন্ত্রাসেরই নামান্তর। বস্তুত জিহাদ ও সন্ত্রাসবাদ এক নয়।'
বিগত চৌদ্দশত বছরে জিহাদের মাসাইল অর্থাৎ জিহাদ সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, জিহাদের হুকুম, বিধিনিষেধ ও জিহাদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ও সুস্পষ্টভাবে অসংখ্য ফিকহের কিতাবসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে। সে-সকল ব্যাখ্যার সঙ্গে উপরিউক্ত সেক্যুলার ব্যাখ্যার যে বিশাল ফারাক বিদ্যমান, সেটির বিস্তারিত চিত্র বাংলাদেশের অন্যতম হাদীস বিশারদ জনাব মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক হাফি. সাহেবের বক্তব্যে তুলে ধরছি—
'জিহাদ শব্দটির একটি সাধারণ অর্থ এবং একটি পারিভাষিক অর্থ রয়েছে। জিহাদের সাধারণ অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, শারীয়াতের শিক্ষা ও নির্দেশনা অনুযায়ী ইসলামের কালিমা বুলন্দ করার জন্য যে ত্যাগ, তিতিক্ষা, কষ্ট ও মুশাককাত সহ্য করা হয় তা-ই জিহাদ, তা যেকোনো পথেই হোক বা যেকোনো পন্থায়ই হোক না কেন। কিন্তু 'জিহাদ' যা শারীয়াতের একটি বিশেষ পরিভাষা, তার অর্থ হলো, আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করা, ইসলাম ও মুসলিমদেরকে রক্ষা করা, মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি করা ও কাফির-মুশরিকদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে চূর্ণ করার জন্য আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাফির-মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করা। 'জিহাদে শরয়ী'র আসল অর্থ তা-ই। যা সাধারণ অবস্থায় ফরযে কিফায়া এবং বিশেষ অবস্থায় ফরযে 'আইন' হয়ে যায়।
জিহাদ বিধিবদ্ধ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যাবলী নিম্নরূপ :
১. জুলুম ও অত্যাচারের প্রতিউত্তর দেয়া।
২. অত্যাচারিত মুসলিমদের সাহায্য করা।
৩. অঙ্গীকার ভঙ্গের শাস্তি প্রদান করা।
৪. ফিতনা-ফাসাদ নির্মূল করা। এবং ন্যায় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা।
৫. কুফরের কর্তৃত্ব নির্মূল করা। ও আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করা।'
‘দ্বীন প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টাই কি জিহাদ?' এই প্রশ্নের জবাবে মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, 'কোনো কোনো বন্ধুকে বলতে শোনা যায় যে, ই'লায়ে কালিমাতুল্লাহ, দ্বীন প্রতিষ্ঠা বা দ্বীনের প্রচার প্রসারের নিমিত্ত যেকোনো কর্ম-প্রচেষ্টাই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। বলা বাহুল্য 'জিহাদ' আভিধানিক অর্থে শারীয়াত সম্মত সকল দীনি প্রচেষ্টাকেই বোঝায় এবং শারীয় নুসুসসমূহের (কুরআন-হাদীসের ভাষা) কোথাও কোথাও এই শব্দটি জিহাদ ছাড়া অন্যান্য দ্বীনি মেহনতের ব্যাপারেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু জিহাদ যা শারীয়াতের একটি বিশেষ পরিভাষা এবং যার অপর নাম 'কিতাল ফী সাবিলিল্লাহ' তা কখনো সাধারণ কর্ম-প্রচেষ্টার নাম নয়; বরং এই অর্থে 'জিহাদ' হলো, ‘আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করার জন্য, ইসলামের হিফাজত ও এর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, কুফরের শক্তিকে চুরমার করার জন্য এবং এর প্রভাব প্রতিপত্তিকে বিলুপ্ত করার জন্য কাফির-মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করা।'
ফিকহের কিতাবসমূহে এই জিহাদের বিধিবিধানই উল্লিখিত হয়েছে। সীরাত গ্রন্থসমূহে এই জিহাদেরই নববি যুগের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে, কুরআন-হাদীসে জিহাদের ব্যাপারে যে বড় বড় ফযীলাতের কথা বলা হয়েছে, তা এই জিহাদের ব্যাপারেই বলা হয়েছে এবং এই জিহাদে শাহাদাতের মর্যাদায় বিভূষিত ব্যক্তিই হলেন প্রকৃত 'শহীদ'।
শারয়ী নুসুস এবং শারয়ী পরিভাষাসমূহের ওপর নেহায়েত জুলুম করা হবে যদি আভিধানিক অর্থের অন্যায় সুযোগ নিয়ে পারিভাষিক জিহাদের আহকাম ও ফাযাইল দ্বীনের অন্যান্য মেহনত ও কর্ম প্রচেষ্টার ব্যাপারে আরোপ করা হয়। এটা এক ধরনের অর্থগত বিকৃতি সাধন, যা থেকে বেঁচে থাকা ফরয। তা'লীম, তাযকিয়া, দাওয়াত ও তাবলীগ, ওয়ায়-নসীহত বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিকভাবে কোনো কর্মপ্রচেষ্টা (যদি শারয়ী নীতিমালা ও ইসলামি নির্দেশনা মোতাবেক হয়...) এসবই স্ব স্ব স্থানে কাম্য; বরং এসব কর্মপ্রচেষ্টার প্রত্যেকটাই খিদমতে দ্বীনের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এসবের ভিন্ন ফাযাইল, ভিন্ন আহকাম এবং ভিন্ন মাসাইল রয়েছে এবং কোনটিকেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কিন্তু এসবের কোনোটাই এমন নয়, যাকে পারিভাষিক জিহাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং যার ব্যাপারে জিহাদের ফাযাইল ও আহকাম আরোপ করা যায়। এই বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করা ও মনে রাখা নেহায়েত জরুরি। কেননা, আজকাল জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে ইসলামের বহু পরিভাষার মধ্যে পূর্ণ বা আংশিক তাহরিফের (বিকৃতি সাধন) প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কেউ তাবলীগের কাজকে 'জিহাদ' বলে চালিয়ে দিচ্ছেন, কেউ তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির কাজকে, আবার কেউ রাজনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টা বরং ইলেকশনে অংশগ্রহণ করাকেও জিহাদ বলে দিচ্ছেন। কারও কারও কথা থেকে তো এ-ও বোঝা যায় যে, পাশ্চাত্য রাজনীতির অন্ধ অনুসরণও জিহাদের শামিল। আল্লাহর পানাহ! জিহাদে আকবর কীসের নাম?
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই ঐসব লোকের ভ্রান্তি স্পষ্ট হয়ে গেছে যারা 'জিহাদ মাআল কুফফার' ও 'ক্বিতাল ফী সাবিলিল্লাহ'র গুরুত্বকে খাটো করার জন্য জিহাদে আকবর (বড় জিহাদ) ও জিহাদে আসগরের (ছোট জিহাদ) দর্শন ব্যবহার করেন। তাদের বক্তব্য হলো, নফসের (প্রবৃত্তি) বিরুদ্ধে জিহাদই বড় জিহাদ এবং কিতাল ফী সাবিলিল্লাহ হলো ছোট জিহাদ! এই ভুল ধারণার ভ্রান্তি প্রমাণের জন্য আমি নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলার পরিবর্তে হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)-এর একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা উদ্ধৃত করে দিচ্ছি। হযরত বলেন—
'আজকাল সাধারণভাবে মানুষের ধারণা এই যে, কাফেরদের সাথে লড়াই করা জিহাদে আসগর (ছোট জিহাদ) এবং নফসের মুজাহাদা (কুপ্রবৃত্তির দমন ও আত্মশুদ্ধি) জিহাদে আকবর (বড় জিহাদ)। যেন তারা নিভৃতে নফসের মুজাহাদায় নিমগ্ন হওয়া থেকে কাফিরদের সাথে লড়াই করাকে সকল ক্ষেত্রেই নিম্নমানের মনে করে। এই ধারণা ঠিক নয় বরং বাস্তব কথা হলো, কাফিরদের সাথে লড়াই করা ইখলাসশূন্য হলে বাস্তবিকপক্ষেই তা নফসের মুজাহাদা থেকে নিম্নস্তরের কাজ। এ ধরনের লড়াইকেই জিহাদে আসগর এবং এর বিপরীতে নফসের মুজাহাদাকে জিহাদে আকবর বলা হয়েছে। কিন্তু কাফিরদের সাথে লড়াই যদি ইখলাসপূর্ণ হয় তবে এই লড়াইকে জিহাদে আসগর বলা গাইরে মুহাক্কিক (অগভীর জ্ঞানের অধিকারী) সুফিদের বাড়াবাড়ি এবং এই লড়াই অবশ্যই জিহাদে আকবর এবং তা নিভৃতে নফসের মুজাহাদায় নিমগ্ন হওয়া থেকে উত্তম। কেননা, যে লড়াই ইখলাসপূর্ণ হবে তাতে নফসের মুজাহাদাও বিদ্যমান থাকবে। সুতরাং, এতে উভয় জিহাদের ফযীলতই একত্রিত হচ্ছে।'
জিহাদ কি ইকদামী (আক্রমণমূলক) না শুধুই দিফায়ী (প্রতিরোধমূলক)? এই শেষ জামানার কোনো কোনো লেখকের রচনা থেকে—যা তারা জিহাদ বিধিবদ্ধ হওয়ার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং জিহাদের তাৎপর্য, উপকারিতা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করার জন্য লিখেছেন—এই ধারণা জন্মায় যে, ইসলামে শুধু দিফায়ী জিহাদ (প্রতিরোধমূলক জিহাদ) অনুমোদিত, ইকদামী জিহাদের (আক্রমণমূলক জিহাদ) অনুমোদন ইসলামে নেই। তাদের এ জাতীয় কথাবার্তার কারণ হয়তো জিহাদ সম্পর্কীয় কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এবং রাসূলুল্লাহ ও খুলাফায়ে রাশিদীনের বরকতময় জীবনচরিত সম্পর্কে অজ্ঞতা অথবা পাশ্চাত্যের অন্যায় আপত্তিসমূহের কারণে ভীত কম্পিত মানসিকতা।
বাস্তবতা হলো, জিহাদের মূল উদ্দেশ্য ই'লায়ে কালিমাতুল্লাহ বা ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং কুফরের প্রভাব প্রতিপত্তি চুরমার করা। এতদুদ্দেশ্যে ইকদামী বা আক্রমণমূলক জিহাদ শুধু অনুমোদিতই নয়; বরং কখনো কখনো তা ফরয ও প্রভৃত সাওয়াবের কারণও বটে। কুরআন-সুন্নাহর দলীলসমূহের পাশাপাশি পুরো ইসলামি ইতিহাস (রাসূলুল্লাহ ও খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগ থেকে) এ ধরনের ঘটনায় পরিপূর্ণ। মুফতী তকী উসমানী (দা.বা.) এর ভাষায়—
'অমুসলিমদের আপত্তিতে ভীত হয়ে এসব বাস্তব বিষয়কে অস্বীকার করা বা এতে ওজরখাহীমূলক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা একটি অর্থহীন কাজ। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, একজন ব্যক্তিকেও জবরদস্তি করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হয় নাই এবং এর অনুমোদনও শারীয়ায় নেই। অন্যথায় জিযিয়ার পুরো ব্যবস্থাপনাই অর্থহীন হয়ে যাবে। হ্যাঁ, ইসলামের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই তরবারি উঠানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত পর্যায়ে কুফরের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকতে চায় থাকুক। কিন্তু আল্লাহর বানানো এই পৃথিবীতে বিধান আল্লাহরই চলা উচিত এবং মুসলিম আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করার জন্য এবং আল্লাহদ্রোহীদের প্রভাব প্রতিপত্তিকে চুরমার করার জন্যই জিহাদ করে। আমরা এই বাস্তব সত্য প্রকাশ করতে ঐসব লোকের সামনে কেন লজ্জানত হব, যাদের পুরো ইতিহাস সাম্রাজ্য বিস্তারের উন্মত্ত নেশায় হত্যাযজ্ঞ সংঘটনের ইতিহাস এবং যারা শুধু নিজেদের প্রবৃত্তির জাহান্নাম পূর্ণ করার জন্য কোটি কোটি মানুষের প্রাণ সংহার করেছে! যাদের নিক্ষিপ্ত গোলামির জিঞ্জিরে এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ জাতির দেহ আজও রক্তাক্ত।'
মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) এর ভাষায়, 'যে উদ্দেশ্যে ইকদামী জিহাদ অতীতে জায়েয ছিল, ঠিক সেই একই উদ্দেশ্যে আজও তা জায়েয এবং শুধু এজন্য এই বৈধতাকে আড়াল করার কোনো অর্থ নেই যে, 'এটম বোমা' ও 'হাইড্রোজেন বোমা' আবিষ্কার ও উৎপাদনকারী শান্তি প্রিয় ব্যক্তিবর্গ একে নিতান্তই অপছন্দ করেন এবং এতে ঐসব মহান ব্যক্তিবর্গের নাক-মুখ কুঁচকে যায়, যাদের নিক্ষিপ্ত গোলামির জিঞ্জিরে এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ জাতির শরীর রক্তে রঞ্জিত। মূলত এই বিষয়টিও কুফরের প্রভাব প্রতিপত্তিরই অবাঞ্চিত ফলাফল বলে আমার বিশ্বাস যে, মানুষ ভালো-মন্দ নির্ধারণের মাপকাঠিও এই বিশ্বব্যাপী প্রচারণাকেই বানিয়ে নিয়েছে, যা দিনকে রাত ও রাতকে দিন করে মানুষের মন-মগজে স্থাপন করেছে এবং শুধু অনুসলিমই নয়, খোদ মুসলিমরাও এই প্রচারণায় কাবু হয়ে নিজেদের দ্বীন ও ধর্মের বিধানাবলীর ব্যাপারে ওজরখাহীর পথ অবলম্বন করতে আরম্ভ করেছে। যদি অন্যায়, অসত্যের এই প্রতিপত্তিকে চুরমার করা 'সাম্রাজ্যবাদের' সংজ্ঞায় আসে, তবে এ জাতীয় সাম্রাজ্যবাদের অভিযোগ পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা পেতে গ্রহণ করা উচিত।'
মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, 'জিহাদের উভয় প্রকার, (ইকদামী ও দিফায়ী) ইসলামের চিরন্তন ফরযসমূহের অন্যতম। যতদিন পর্যন্ত ভূপৃষ্ঠে কুফর ও শিরকের প্রভাব প্রতিপত্তির ফিৎনা বিদ্যমান থাকবে, ততদিন পর্যন্ত সত্য-ন্যায়ের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য জিহাদের দায়িত্বও অবশ্যপালনীয় থাকবে। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
'আমার প্রেরিত হওয়ার সময় থেকে নিয়ে আমার উম্মাতের শেষ ভাগ দাজ্জালের সাথে লড়াই করা পর্যন্ত জিহাদ চলমান থাকবে। কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসকের ন্যায়পরায়ণতা এবং কোনো জালিমের জুলুম একে রহিত করবে না।' (সুনানু আবী দাউদ, ১/৩৪৩)'।
অর্থাৎ, জিহাদের ব্যাপারে লেখকগণ নিজেদেরই কোনো জ্ঞান নেই, তার ওপর তারা এ বিষয়ে একটা জাতির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারিদের শেখানোর দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন। এখানে তারা বেশ কিছু মারাত্মক তথ্যবিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন—
১. জিহাদের আভিধানিক অর্থকে পারিভাষিক অর্থ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২. 'জান ও মাল' দিয়ে করা সর্বোত্তম জিহাদকে 'ছোট জিহাদ' হিসেবে সাব্যস্ত করে এর গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলতে 'ব্যর্থ' হয়েছেন।
৩. রাজ্য জয় ও ক্ষমতা দখলকে জিহাদ থেকে আলাদা করার বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছেন। তাদের মতে, ব্যাপারটা যেন এরকম যে, জিহাদ শেষে কাফির শাসকদেরই ক্ষমতায় বহাল রাখতে হবে, যেন তারা তাদের অপকর্ম পুনরায় চালিয়ে যেতে পারে। বদরের যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের পর আল্লাহ বলেন, 'আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে এবং সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎ কার্য হতে নিষেধ করবে। সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে' খুলাফায়ে রাশিদীনের অধীনে যখন মুসলিম মুজাহিদরা এশিয়া পেরিয়ে পূর্ব ইউরোপ থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত কাফিরদের পরাজিত করে তাদের রাজ্যকে ইসলামি খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তখন তারা কেন কাফির শাসকদের অপসারণ করে মুসলিম শাসককে ক্ষমতায় নিয়োগ দিয়েছেন, সে ব্যাপারে পরিষ্কার কোনো ধারণা বইতে দেয়া হয়নি।
৪. বর্তমান কুফফার রাষ্ট্র, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে কাফিরদের তাঁবেদার শাসকগণ এবং কুফফার মিডিয়া ইসলামের সাথে সম্পর্কহীন হামলাকে যে জিহাদ হিসেবে উল্লেখ করে এবং জিহাদকে যে 'জঙ্গিবাদ' বলে অভিহিত করে, অন্যদিকে সেক্যুলার শাসকদের আগ্রাসনকে তারা কী কারণে বৈধতা প্রদান করে, সে ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদেরকে কোনো সতর্কবার্তা দেয়া হয়নি।
জিহাদের ব্যাপারে আজ আমাদের আচার-আচরণ হয়ে গেছে কাফিরদের মতো। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে, জাহিলিয়াতের আমলে কাফিররা বলত, হাজীদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারাম আবাদ করা ঈমান আনা ও জিহাদ করা থেকে উত্তম (০৯: ১৯)। আজ আমাদেরকেও জিহাদ এমনভাবে শিখানো হচ্ছে, যেন জিহাদ বলতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কাফিরদের বিপক্ষে জিহাদকে বোঝাননি; ইসলামি বিধিবিধানে জিহাদ বলতে শুধু মসজিদের খেদমত করা আর সারাজীবন নফসের সঙ্গে জিহাদ করা।
অন্যদিকে, তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো একটি বইতেও ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপারে বলা নেই। নৈতিকতার সঙ্গে ইসলামের কী সম্পর্ক, কতটুকু 'নৈতিকতা' ইসলাম অনুমোদন দেয়, নৈতিকতার প্রচলিত ধারণার সঙ্গে ইসলামের কোনো বিধানের সংঘর্ষ বাঁধলে ছাত্রছাত্রীরা কিভাবে সেই সমস্যার সমাধান করবে—এই ধরনের বহু অত্যাবশ্যকীয় প্রশ্নের উত্তর লেখকগণ এড়িয়ে গেছেন।
এভাবেই ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ইসলাম-বিরোধী অপকর্মকে 'সামাজিক' রূপ দিয়ে সেগুলোকে কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সহজে গ্রহণ করার মানসিকতা তাদের ভিতর তৈরি করে দেয়া হয়। কিন্তু, পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতির প্রভাবে প্রতিনিয়ত যেসব ফিতনার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে এই ভূখণ্ডে, সেসব বিষয় প্রতিরোধ করার ব্যাপারে শিক্ষার কোনো বালাই নেই। আজ দেশের লক্ষ-লক্ষ তরুণ বাস্তব জীবনে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর পৌত্তলিক উপাদানে ভরপুর 'বাঙালি সংস্কৃতি'র হামলার শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারে কোনো সতর্কবার্তা নেই। বর্তমানে এ-দেশের বাবা-মা'রা সন্তানের চাকরির শিক্ষার ব্যাপারে যতটা গুরুত্ব দেন, সন্তানের ইসলামি শিক্ষার ব্যাপারে তাদের ততটা—বলতে গেলে কোনো মাথাব্যথাই নেই। নতুবা শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান এইসব ঈমান বিধ্বংসী উপাদান নিয়ে তারা বহু আগেই সচেতন হতো। আর যারা দেশের উদীয়মান তরুণ মুসলিম প্রজন্মকে নিয়ে চিন্তা করেন, তারা এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী কিছু করার পরিকল্পনা হাতে নিলে কতই না উত্তম হতো। দেশে কি এরকম কোনো উদ্যমী চিন্তাবিদ নেই, যারা দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে দুনিয়াবি শিক্ষার মিশেলে মুসলিমদের জন্য স্পেশাল একটা শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড় করাবে? শুরুতেই ইউনিভার্সিটি না হলেও, অন্তত প্রাথমিক পর্যায় নিয়ে তো কাজ শুরু করা উচিত।
ইসলামি শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক এই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার দ্রুত প্রসারে মুসলিমদের মাঝে আজ এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, দ্বীন সম্পর্কে যাদের জ্ঞানের ভিত্তি মজবুত নয়। বর্তমানে ইসলামি শারীয়া-ভিত্তিক শাসন-ব্যবস্থা ও তার সুফলের দুর্লভতা; সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মুসলিমদের দুর্দশা দ্বীন সম্পর্কে তাঁর সুধারণার ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়। সে তখন নিজের দ্বীনকে আর অদ্বিতীয় ভাবতে পারে না; ইসলামের অনেক বিষয় নিয়ে তাঁর অন্তরে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। বর্তমান শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার বদলে সেগুলোকে আরও ঘনীভূত করে। একটা সময় দেখা যায়, ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় যেমন : শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, নারী-পুরুষের অধিকার ও কর্তব্যের সীমারেখা, আইনব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে সেক্যুলারিজমের সঙ্গে ইসলামের যে বিরোধ, সেখানে সে ইসলামের নিরঙ্কুশ সমর্থক হওয়ার বদলে লিবারেলিজম আর সেক্যুলারিজমের গুণমুগ্ধ হয়ে পড়ে। অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, কুরআনের অনেক বিষয়েও সে সন্দেহের সুরে প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করে। ঈমান ধ্বংসের এই পথে একবার চলতে শুরু করলে জাহান্নামে পৌঁছার আগ পর্যন্ত অনেকেই আর পিছু ফিরে আসতে পারে না; যদি না আল্লাহর খাস রহমত তাঁর ওপরে নাযিল হয়।
দ্বীনবিরোধী কুশিক্ষার এই কালো ধোঁয়া আজ যেন আমাদের চতুর্দিক থেকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে; যারা ছোটবেলা থেকেই ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় ছিলেন, তারা এই ভয়াবহতার পুরোটা সহজে আঁচ করতে পারে না। সভ্যতার এ চলমান সংঘাত, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা ঠেকাতে মুসলিম জনপদে প্রয়োজন একদল তরুণ কর্মী, যারা লিবারেল-সেক্যুলারদের 'মূলধারার' প্রচলিত কুপ্রথা এবং কুযুক্তিগুলোকে পালটা আক্রমণ করে স্তব্ধ করে দেবে। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে— আমাদের প্রতিপক্ষ এমন একটি দল, যারা শত বছর ধরে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট; লেখনী, চলচ্চিত্র, বক্তব্য, মিডিয়া আর রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় মুসলিমদের মাঝে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে নিয়েছে, কিন্তু তাদের সে অবস্থান মুসলিমদের ঈমানের ক্ষতি-বৃদ্ধি ব্যতীত আর কোনো কাজেই আসেনি। তাই, দীর্ঘস্থায়ী প্রোপাগান্ডার মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং ঐক্য খুবই জরুরি।
টিকাঃ
১. এই ঘটনার সাথে রাসূল এর শিক্ষার তুলনা করে দেখুন; ১৪০০ বছর পূর্বেই তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেতে, তাকে সান্ত্বনা দিতে, তার জন্য দুআ করতে। রাসূল এর চাচাতো ভাই জাফর রা. যখন শহীদ হলেন, তিনি নিজেই তার পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন। তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন শহীদদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার, কিন্তু এ সবই মুসলিমরা করে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্য। কিন্তু সেই কাজ Lee করতে বললেন দুর্নীতিগ্রস্থ এক কোম্পানির ভাবমূর্তি উদ্ধারের উদ্দেশ্যে—মার্কেটিং পলিসির যেই পরিক্রমাটি পশ্চিমা সভ্যতার কর্ণধাররা আজও ধরে রেখেছে।
১. As I've encountered earlied; maybe in Bangladesh, thousands more are fighting "battle of hearts and minds".
২. গুণগত মান বলতে বস্তুবাদীদের মতো শুধুই বইয়ের উন্নত পাতা আর রঙিন কাগজ বোঝানো হয়নি, বরং ইসলামের মানদণ্ডে কতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন, তার কথা বলা হয়েছে।
১. দেশীয় সেক্যুলাররা প্রায়ই বলে, 'ফ্রান্স হলো সভ্যতার সূতিকাগার।' তবে তারা 'অসভ্য' শব্দটা বলতে ভুলে যায়। পোশাক খুলে জনসম্মুখে দেহপ্রদর্শনে পশুদের সাথে প্রতিযোগিতা করার দৌড়ে তারাই বাকিদের পথ দেখিয়েছে।
২. অর্থাৎ, তখনকার সময়ে নারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কেবল পতিতাদের ভিতর ধূমপান করার অভ্যাস পরিলক্ষিত হতো। লক্ষ্য করুন, এখনকার ফেমিনিস্টরা একে দাবি করে অধিকার হিসেবে! অথচ যেকোনো সুবিবেচক ব্যক্তি বা দলের কর্তব্য হলো, ক্ষতিকর বিষয়কে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা। পুরুষরা ধূমপান করায় সেটির ক্ষতিকর দিক কখনোই হ্রাস পায়নি যে, এটাকে অধিকার হিসেবে দাবি করতে হবে। তারা যদি সত্যিই সঠিক পথে থাকত, তাহলে তারা বরং পুরুষদের ধূমপানকে নিষিদ্ধ করার আন্দোলন করত। সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞান নিয়ে আসা বঙ্গীয় সেক্যুলার-ফেমিনিস্টরা মাদক দ্রব্যের ক্ষেত্রে 'বিজ্ঞান' শব্দটা কেন ভুলে যায়, সেই রহস্য আর কখনোই উন্মোচিত হবে না।
১. হাজার বছরের বিয়ের রক্ষণশীল সংস্কৃতি ভেঙে ছেলেরা সবাই আনভীরের মতো 'উদার' হবে, 'যৌনদাসী' রাখবে। মৌলবাদীদের ন্যায় বিয়ের মতো রক্ষণশীল সংস্কৃতির প্রয়োগ করতে চাইলে তাদেরকে 'দমন' করা হবে।
১. ধরুন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে থেকেই নারীদের জন্য পঞ্চাশ শতাংশ কোটা বরাদ্ধ। নারী-পুরুষ সকলেই সেখানে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন পেল। ভর্তি পরীক্ষার পর দেখা গেল, সর্বশেষ মেয়েটি যে মার্ক পেয়ে সেখানে চান্স পেল, তার চেয়ে অনেক বেশি মার্ক পেয়েও অনেক ছেলে সেখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল না। এটাকে কী বলবেন? সমান অধিকার না কি লিঙ্গ-বৈষম্য?
২. বর্তমানে এ ধরনের মামলার বিপক্ষে রায় হয়েছে।
৩. নারী নির্যাতন মামলার ৮০ শতাংশই মিথ্যা: আইনমন্ত্রী, প্রথম আলো বিশেষ প্রতিনিধি (২২ জুন ২০১৩), নারী নির্যাতন মামলার অধিকাংশই বানোয়াট, যুগান্তর ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ভুয়া যৌতুকের মামলার শিকার সিংহভাগ পুরুষ, ডিবিসি নিউজ ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২০
১. এই পর্যায়ের কাজগুলো যারা করে থাকে, তাদের প্রধান কাজই হলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। অথচ তারা জনগণকে এই বিশ্বাস করাতে চায় যে, তারা এটি জনগণের মঙ্গলের জন্য করছে।
২. 'দেশীয় (কোম্পানির) পণ্য কিনুন, দেশের অর্থ দেশেই রাখুন।' অথচ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কিনলে ক্রেতার আত্মিক, আর্থিক কোনো লাভ হয় না; তার কষ্টার্জিত অর্থ চলে যায় কর্পোরেট ইন্সটিটিউটের সত্ত্বাধিকারীর ব্যাংক একাউন্টে।
৩. যেমনঃ 'দেশীয় (কোম্পানির) পণ্য কিনুন, দেশের অর্থ দেশেই রাখুন।' অথচ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কিনলে ক্রেতার আত্মিক, আর্থিক কোনো লাভ হয় না; তার কষ্টার্জিত অর্থ চলে যায় কর্পোরেট ইন্সটিটিউটের সত্ত্বাধিকারীর ব্যাংক একাউন্টে।
১. কিছু অপরিপক্ক ব্যক্তি কুরআন নাযিলের পূর্বে খাদীজা রাঃ-এর ব্যবসায় অর্থলগ্নির উদাহরণটি সামনে নিয়ে আসে, যেটি সম্পূর্ণ হাস্যকর দাবি। যদিও মডারেট আর সিওডো-সেক্যুলারদের সবেধন নীলমণি এই তথ্যটি তারা বারবার ঘোষণা করতে খুবই ভালোবাসে।
২. হিন্দুদের দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা।
৩. মূর্তির মিছিলে অশুভের বিনাশ, মঙ্গল কামনা করার কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করে, এটি কোনো কন্সপিরেসি থিওরি না। "বর্ণিল উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ: সব অশুভ অকল্যাণ দূর করার প্রত্যয়" সমকাল প্রতিবেদক (১৬ এপ্রিল ১৬)
১. ২০০০ সালে সম্মতি ভিত্তিক 'বৈধ' যৌনতার সীমারেখা ছিল সর্বনিম্ন চোদ্দ বছর! কয়েক বছর পর তা ষোলো করা হয়।
১. ০২:২৭৫
২. ব্যাংক ব্যবস্থার বিস্তারিত জানতে পড়ুন 'ব্যাংক ব্যবস্থা ও টাকার গোপন রহস্য', লেখকঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক মোহাইমিন পাটোয়ারী, ঐতিহ্য প্রকাশন।
১. ০৩:০৩
২. সপ্তম শ্রেণিতে উল্লেখকৃত এক হাদীসে শুধুমাত্র যিম্মি শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। (p. ৭৯)
১. ইমাম কুদূরী রহ. বলেন: জিহাদ হলো ফরজে কিফায়া (আক্রমণাত্মক জিহাদ)। একদল লোক পালন করলে অবশিষ্টদের থেকে ফরজ রহিত হয়ে যায়। কিন্তু কেউ তা পালন না করলে সকল মানুষ তা তরক করার কারণে গুনাহগার হবে, কেননা সকলের ওপরেই তা ওয়াজিব। যেহেতু আয়াত ও হাদিস নিঃশর্ত ও সাধারণ, সেহেতু কাফিররা সূচনা না করলেও (প্রয়োজন হওয়া মাত্র) তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ফরজ। অপ্রাপ্তবয়স্ক, দাস, স্ত্রীলোক, অন্ধ, প্রতিবন্ধী, কর্তিত অঙ্গ ব্যক্তির ওপর ফরজ নয়। কিন্তু শত্রুপক্ষ যদি কোনো শহরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন সকলের ওপর প্রতিরোধ ওয়াজিব হয়ে যাবে (রক্ষণাত্মক জিহাদ)। স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া এবং দাস মনিবের অনুমতি ছাড়াই বের হয়ে পড়বে। কেননা তা ফরজে আইন হয়ে পড়েছে আর ফরজে আইনের মোকাবিলায় দাসত্ব ও বিবাহ বন্ধন বিবেচিত হবে না। যেমন সালাত ও সিয়ামের ক্ষেত্রে। [আল-হিদায়া ই.ফা. ২/৪২৯- ৪৩০] মুসলিম ভূখণ্ড এক বিঘত পরিমাণও কাফিরদের অধীনে চলে গেলে ঐ অঞ্চলের মুসলিমদের ওপর জিহাদ ফরজে আইন, বাকি মুসলিমদের জন্য ফরজে কিফায়া। তারা শত্রুর বিরুদ্ধে অপারগ হলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জন্য ফরজে আইন, বাকিদের জন্য কিফায়া। এভাবে ক্রমান্বয়ে পাশের এলাকা, তারা না পারলে তার পাশের এলাকা, এভাবে ফরজে আইনের হুকুম বর্তাবে। এটা গেল রক্ষণাত্মক জিহাদ। কোনো আলিম বলে দিক বা না দিক, কেউ যাক বা না যাক, প্রত্যেকের ওপর এই হুকুম। (মাআরেফুল কুরআন, সূরা বাকারার ২১৬ নং আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য) আর নতুন এলাকা বিজয়ের জন্য আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজে কিফায়া। বছরে একবার বা দু'বার খলিফা যদি কাফেরদের রাষ্ট্রে মুজাহিদ বাহিনী পাঠান, তাহলে উম্মতের পক্ষ থেকে ফরজ আদায় হয়ে যাবে। যদি একবারও না পাঠান, তাহলে সবাই গুনাহগার হবে।
১. বারবার দেশপ্রেম শেখানোর আসল উদ্দেশ্য সম্ভবত এই বাক্যে উন্মোচিত হয়েছে।
১. ০২:৩০
২. ০৩:১১৮
১. ০৬: ৬২
১. ৬: ১১৬
১. কমিউনিজম কায়েম থাকলে হয়তো রাসূল (সা.)-এর জীবনের সঙ্গে তারা কমিউনিজমের মূল্যবোধের মিল খুঁজে পেতেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের যে জোয়ার এসেছিল, তখন অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নেতা এবং কিছু সংখ্যক আলিম সমাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের 'মিল' খুঁজে পেয়েছিলেন।
১. অর্থাৎ, কাফির, মুশরিকরা দান করলে সেটাও জিহাদ হয়ে যাবে। কারণ, দান 'উত্তম' একটি কাজ, ন্যায়নিষ্ঠ কাজ। সেক্ষেত্রে উত্তম কাজ করলে কাফিরদেরকেও মুজাহিদ হিসেবে অভিহিত হবে, ক্রুসেডার থেকে পদোন্নতি পেয়ে তারা হয়ে যাবে মুজাহিদ! যেমন ধরুন: কোনো চ্যারিটিতে অর্থ সংগ্রহে বুশ সক্রিয় অংশগ্রহণ করার পর স্বয়ং কয়েক হাজার ডলার দান করলে আমরা বলতে পারি, 'মুজাহিদ বুশ জান ও মাল ব্যয় করে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করলেন!'
২. ওপরের আয়াত দিয়ে তাদের এই দাবি কিভাবে সত্যায়িত হলো, সেটা ঠিক বোঝা গেল না। আল্লাহ সেভাবে জিহাদ করতে বলেছেন যেভাবে করা উচিত, এটা তো আর বলেননি যে, বাংলাদেশের নবম-দশম শ্রেণির 'ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা' বইতে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে করা উচিত। জিহাদ কিভাবে করা উচিত, সেটি আমরা জানতে পারি রাসূল (সা.) ও পরবর্তী সর্বোত্তম তিন প্রজন্ম—সালফে সালেহীনদের আমল থেকে।
১. সর্বপ্রথম বদরের যুদ্ধ ছিল এই পর্যায়ের যুদ্ধ (২২:৩৯)।
২. মক্কা বিজয়।
৩. রিদ্দাহর যুদ্ধ।
৪. ইসলামি শাসন কায়েম (২২:৪১)
১. পাঠ্যবইতে যেমন করে আল্লাহর রাসূল এর সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি করে গণতন্ত্রকেই অনেকে জিহাদ বলে প্রচার করেন।
২. মাওলানা আব্দুল মালেক (হাফিঃ)
১. অঙ্ক, রসায়ন, পদার্থ ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান।