📘 প্রোপাগান্ডা 📄 লাশের দীর্ঘ মিছিল

📄 লাশের দীর্ঘ মিছিল


ইরাকি সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, ২০০৩-২০০৮, এই পিরিয়ডে কমপক্ষে ১৪০,০০০ ইরাকি নিখোঁজ হয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। নব্য প্রতিষ্ঠিত শিয়া পুলিশদের আতংক সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনগণের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মিলিশিয়া ডেথ স্কোয়াডের সঙ্গে শিয়াদের আঁতাত ছিল (Kukis, 2011)। মার্চ ২০০৩-অক্টোবর ২০১৮—এই সময়ের ভিতর ইরাকে বেসামরিক নাগরিক নিহত হয় প্রায় ১৮২,২৭২- ২০৪,৫৭৫ জনের মতো। আর মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৬৮,০০০- ২৯৫,০০০ (Crawford N., 2018)। সেই সাথে উপসাগরীয় যুদ্ধে ধ্বংস করা ইরাকের নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যখাতকে পুনরায় আরও একবার প্রচণ্ডভাবে দুমড়ে মুচড়ে দেয় স্বাধীনতার ফেরিওয়ালা পশ্চিমা ও তাঁদের দোসররা।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটি-র এক জরিপে দেখা যায়, ২০০১ থেকে এপ্রিল ২০২১–এই সময়ের মধ্যে আফগানিস্তান যুদ্ধে মোট হতাহতের সংখ্যা কমপক্ষে ২৪১,০০০ (Crawford et al., 2021b)। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবার সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু অ্যামেরিকা মৃতদেহ গণনা করেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ছাড়াও উদ্বাস্তু হয়েছে আট মিলিয়ন আফগান জনগণ, দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ২.৮ মিলিয়ন নাগরিক। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা, ভঙ্গুর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা—দুই দশকের যুদ্ধে আফগানরা অ্যামেরিকার প্রকৃত চেহারা বেশ ভালো করেই অবলোকন করতে সক্ষম হয়। 'হিউম্যান রাইটস' নামক চকচকে শব্দের মোড়কে অ্যামেরিকা (ও ব্রিটেনসহ সহযোগী রাষ্ট্রগুলো) ইরাক, আফগানিস্তান-এ (সেই সাথে সিরিয়া, লিবিয়া) জনগোষ্ঠীর জীবন যেভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে, তাঁর খেসারত ইরাকি-আফগানীদের আরও বহু বছর দিয়ে যেতে হবে। আজকের পৃথিবীতে যারা লিবারেল সেক্যুলারিজমের সমর্থক, বিশ্বের জনপদগুলো আর কতটা মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলে তারা এই ভ্রান্ত মতবাদগুলোর সমর্থন পরিত্যাগ করবেন? যুদ্ধের প্রকৃত সত্য (যুদ্ধাপরাধ) হয়তো একসময় প্রকাশিত হয়। তবে অধিকাংশ সময়-ই পশ্চিমারা সেগুলোকে প্রকাশ করে রাখঢাক রেখে, আর সেটিও হয় 'যথেষ্ট' সময় পর, যখন এসকল অপরাধের তথ্য প্রকাশিত হলে ততটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না।

দুটো জাতির জনগণকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া অ্যামেরিকা ও তাঁদের দোসররা এই যুদ্ধ থেকে ঠিক কী পেয়েছে, আমার জানা নেই। তবে, ২০২১-এর আগস্টে যখন তালিবান পুনরায় কাবুল দখল করে নেয়, তখন এতদিন কল্পনার জগতে বাস করা পশ্চিমা নাগরিকরা লাভক্ষতির হিসেব কষে দেখতে পেল, তাঁদের নগদ কোনো ‘লাভ'-ই হয়নি; বরং যুদ্ধে মারা গেছে প্রায় ৭,০০০ মার্কিন সেনা, (Crawford N., 2018), আত্মহত্যা করে মারা গেছে ৩০,০০০-এরও বেশি মার্কিন যোদ্ধা, (Kube, 2021)। অ্যামেরিকার জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার (Crawford N. C., 2021a)। যোদ্ধাদের ভাতা আর অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ভবিষ্যতে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণটি আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু, যে দলটিকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার টার্গেট নিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়, সেই দলটি এখন পূর্বের যেকোনো সময় থেকে শক্তিশালী। আর আফগানিস্তানে তালিবান যেখান থেকে পিছু হটেছিল, ঠিক সেখান থেকেই তারা আবার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারদের লাভের খাতায় বড় এক 'শূন্য'। মুসলিমদের ওপর তাঁদের এত অত্যাচারের পরও যখন দিনশেষে দেখা যায়, কাফিররা তাঁদের নিহত সঙ্গী-যোদ্ধা আর অর্থের ব্যাপারে তীব্র হতাশা লুকিয়ে রাখতে পারছে না, তখন কুরআনের সেই পবিত্র আয়াতের কথাই মনে পড়ে যায়, যেখানে আল্লাহ বলেছেন—
'নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, তারা নিজেদের সম্পদসমূহ ব্যয় করে, আল্লাহর রাস্তা হতে বাধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। তারা তো তা ব্যয় করবে। অতঃপর এটি তাঁদের ওপর আক্ষেপের কারণ হবে। এরপর তারা পরাজিত হবে। আর যারা কুফরি করেছে, তাদেরকে জাহান্নামে সমবেত করা হবে।' (সূরা আনফাল, ৮: ৩৬)

সুবহানআল্লাহ। দয়াময় আল্লাহ সত্য বলেছেন। কাফিরদের যেসকল সঙ্গী মুসলিমদের হত্যা করতে গিয়ে নিহত হয়েছে, তারা তো জাহান্নামের অধিবাসী। আর তাঁদের হাজার কোটি ডলার খরচও আজ তাঁদের মনোবেদনার কারণ হয়েছে। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে অপূর্ব সব নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করে ঈমানকে দৃঢ় করার, তাঁর পথে শক্ত হয়ে টিকে থাকার শক্তি প্রদান করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px