📘 প্রোপাগান্ডা 📄 আফগানিস্তান যুদ্ধ

📄 আফগানিস্তান যুদ্ধ


আফগানিস্তানে হামলা করে তালিবান সরকার হটানোর পর সেখানে অ্যামেরিকা ও তাদের তাঁবেদাররা কায়েম করে এক ত্রাসের রাজত্ব। আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর পর অ্যামেরিকা সেখানে মানুষ হত্যা করে লাশের পাহাড় জমাতে শুরু করে, যাদের সংখ্যার কোনো হিসেবই তারা রাখত না। মার্চ ২০০২-এ রামম্ফেল্ড সিবিএসকে বলেন, '... (অ্যামেরিকা) ভিয়েতনামে (মৃতদেহ গণনার) চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটি (আল্টিমেটলি) কাজ করেনি।' পরে আফগানিস্তানের দায়িত্বে থাকা চিফ জেনারেল টমি ফ্র্যাঙ্কস বলেন, 'তোমরা তো জানোই, আমরা মৃতদেহ গণনা করি না' (Moses, 2010)। ২০০৩-এ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্টে দেখা যায়, আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থিত বাহিনী কিভাবে আফগানিস্তানকে ধর্ষণ, খুন, অরাজকতার স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে। তারা যখন-তখন যে-কারও বাসায় হামলা করে ধর্ষণ, লুটতরাজ চালাত। এমনকি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থার মহিলা কর্মীকে ধর্ষণ করেও তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আফগানিস্তানে অ্যামেরিকার কায়েম করা সন্ত্রাসের রাজ্যের যে চিত্র আমাদের সামনে দৃশ্যমান, তার সাথে সেক্যুলার আগ্রাসী অ্যামেরিকা-ব্রিটেন ও তাদের সেবাদাসদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতির কোনো মিল নেই (HRW, 2003)। পুতুল সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিলিশিয়া বাহিনীরা তখনো দেদারসে সাধারণ জনগণকে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করত। হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ এ সকল নির্যাতন নিয়ে বিশদ রিপোর্ট-ও পাবলিশ করে (HRW, 2015)।

শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষই নয়; ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেরাও অ্যামেরিকা আর তাদের পোষা বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায়নি। আফগানিস্তানে মার্কিনীদের সহযোগী আঞ্চলিক যুদ্ধবাজরা তালিবানের বিদায়ের পর তালিবানের লুপ্ত করা ছেলেশিশুদের বলাৎকার করার সংস্কৃতি পুনরায় 'উজ্জীবিত' করে। মার্কিনীদের কাছে তারা এতটাই 'স্বাধীনতা' পায় যে, মিলিটারি বেইসেও তারা এ ঘৃণ্য অপরাধটি করত। কোনো মার্কিন সৈন্য এ বিষয়ে বিরোধিতা করলে তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো চুপ থাকতে (Goldstein, 2015)। আফগানিস্তানে এই অপসংস্কৃতিকে বলা হয় 'বাচ্চাবাজি'। অ্যামেরিকান মিলিটারিরা আঞ্চলিক সাহায্যকারী যুদ্ধবাজদের বিভিন্ন গ্রামের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিত—সেখানে তারা শিশু ধর্ষণের মৃত 'সংস্কৃতি'র গোঁড়ায় পানি ঢালে।

ড্যান কুইন নামের সাবেক এক স্পেশাল ফোর্স ক্যাপ্টেন বলেন, তারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে যায়; কারণ তারা শুনেছিল, তালিবানরা 'মানবাধিকার' কেড়ে নিয়েছে। 'কিন্তু এখন আমরা এমন লোকদের ক্ষমতায় এনেছি, যারা তালিবানদের থেকেও বাজে কাজ করছে...'। অ্যামেরিকা-সমর্থিত এক মিলিশিয়া কমান্ডার এক ছেলেশিশুকে শেকল দিয়ে ওর বিছানার সঙ্গে যৌনদাস হিসেবে বেঁধে রেখেছিল। কুইন এজন্য ওই কমান্ডারকে ধরে পেটায়। তাকে পেটানোর 'অপরাধে' অ্যামেরিকান আর্মি কুইনকে তাঁর ক্যাপ্টেন্সি থেকে অব্যাহতি দেয় এবং তাকে অ্যামেরিকায় ফেরত পাঠায়। এছাড়াও অ্যামেরিকান কন্ট্রাক্টররাও আফগান শিশুদের পেছনে অর্থ ব্যয় করত, যাদেরকে তারা বলত 'ড্যান্সিং বয়েজ'। মিডিয়াতে এ খবর প্রকাশ হলে আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হানিফ আতমার মার্কিন দূতাবাসে এ সংবাদ জোরপূর্বক ধামাচাপা দেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরে উইকিলিকস সে তথ্য ফাঁস করে দেয় (Boone, 2010)। ড্যান্সিং বয়েজদের কাজ কী ছিল? এই ছোট ছোট ছেলে শিশুদের নারী সাজিয়ে পুরুষদের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে মনোজ্ঞ 'সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা'য় নাচানো হতো, আর তারপর তাদেরকে করা হতো ধর্ষণ।¹

শিশুগামিতা সমর্থন করা এক জাতি যখন মুসলিমদের সভ্যতা শেখাতে যায়, তখন তা আশ্চর্যের কারণই বটে! তালিবানদের শাসনামলে 'বাচ্চাবাজি'র শাস্তি ছিল প্রাণদণ্ড। পরবর্তীকালে অ্যামেরিকা আফগানিস্তানে গিয়ে মৃতপ্রায় এই কুকর্মকে পুনরায় বাঁচিয়ে তুলল। আর মুসলিমদের জনপদগুলোতে এইসব শিশুধর্ষকদের সেবাদাস, (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধর্ষিত) সেক্যুলার-লিবারেল মতাদর্শে বিশ্বাসী তথাকথিত 'সংস্কৃতিমনা' লেজকাটা শিয়ালগুলো আজ শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্তাব্যক্তি সেজে বসে আছে। আর নিজেদের মতাদর্শকে দাবি করছে সার্বজনীন!

অক্টোবর ২০০৯, তৎকালীন আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমাদ জিয়া মাসউদ—সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সাবেক নেতা আহমাদ শাহ মাসউদ-এর ছোট ভাই—$৫২ মিলিয়ন অর্থসহ দুবাই বিমানবন্দরে আটক হন। পরবর্তীকালে কোনো জবাব দেওয়া ছাড়াই তাকে যেতে দেওয়া হয়। এই সংবাদ পরে ফাঁস করে উইকিলিকস (Steele & Boone, 2010)।

জানুয়ারি ১৫, ২০১০, কান্দাহারে গুলমুদ্দিন² নামক এক পনেরো বছর বয়সী আফগান কিশোরকে অ্যামেরিকান সৈন্যরা যুদ্ধের 'মঞ্চ' সাজিয়ে নাটকীয়ভাবে হত্যা করে। তারা গুলমুদ্দিনকে একটি মাটির দেয়ালের পেছনে দাঁড়াবার নির্দেশ দিয়ে তাঁর দিকে গ্রেনেড ছুড়ে মারে, অতঃপর কাছ থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করে। শিকারিরা পশু শিকারের পর যেভাবে ফটোশুট করে, তার অনুকরণে তারা গুলমুদ্দিনের লাশকে উলঙ্গ করে চুল টেনে ধরে হাস্যোজ্জ্বল ছবি তোলে। তাদের মধ্যে একজন, সার্জেন্ট গিবস³ ছুরি দিয়ে ওর আঙুল কেটে ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংগ্রহ করে। পরে গিবস শহীদ গুলমুদ্দিনের আঙুলটি আফগানিস্তানে তাঁর প্রথম 'হত্যা'র স্মৃতি হিসেবে প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস হোমসকে উপহার দেয়। হোমস সে আঙুলটি সংরক্ষণ করে তাঁর ব্যাগে রেখে দেয়। গিবস আফগান মুক্তিযোদ্ধাদের শহীদ করার পর তাঁদের সঙ্গে কোনো অস্ত্র পেলে সেটি সংরক্ষণ করে রাখত। যাতে করে পরবর্তীকালে কোনো বেসামরিক নাগরিক হত্যা করলে সেই অস্ত্র পাশে রেখে তাদেরকে 'তালিবান যোদ্ধা' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। অ্যামেরিকান সৈন্যরা যখন গাড়িতে করে গ্রামে যেত, অনেকেই ছোট বাচ্চাদের চকলেট ছিটিয়ে দিত। বাচ্চারা চকলেট নিতে ছুটে আসলে কখনো কখনো তাদের দিকে ছোড়া হতো গুলি। কখনো হয়তো বাচ্চাদের ওপরই গাড়ি তুলে দেওয়া হতো। আবার কখনো সাধারণ কৃষকদের হত্যা করে প্রচার করা হতো তালিবান হিসেবে (Rolling Stone, 2011)।

২০০৯-২০১০, এই সময়ে অ্যামেরিকান পাঁচজন সৈন্য—যারা নিজেদের 'কিল টিম' হিসেবে পরিচয় দিত—‘অন্তত’ তিনজন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে, যাদের মধ্যে গুলমুদ্দিন একজন। পরে হত্যার দায়ে এই পাঁচজনকে এবং ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার দায়ে আরও সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়। নির্মম হত্যার দায়ে দায়ী এই পাঁচজন নিকৃষ্ট খুনির কী সাজা হয়, জানেন?
* স্টাফ সার্জেন্ট ডেভিড ব্রাম⁴: তিন বছর চার মাস পর প্যারোলের অপশন-সহ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড (Porterfield, 2011)।
* স্টাফ সার্জেন্ট গিবস: দশ বছর পর প্যারোলের অপশন-সহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (Oppmann, 2011)।
* প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস হোমস⁵: সেপ্টেম্বর ২০১১-তে সাত বছরের সাজা ঘোষণার পর ২০১৫ সালেই বের হয়ে যায় (Idaho soldier convicted, 2015)।
* স্পেশালিষ্ট মোরলক⁶: সাত বছর পর প্যারোলের সুবিধা-সহ ২৪ বছরের সাজা (Reuters Staff, 2011)।
* স্পেশালিষ্ট উইনফিল্ড⁷: তিন বছরের সাজা (Cole, 2011)।

অবশ্য শুধু এই পাঁচজনের বেলায়ই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার ক্ষেত্রে অ্যামেরিকার আগে থেকেই যথেষ্ট 'সুখ্যাতি' রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর যে সংস্কৃতি, তাতে অপরাধ প্রকাশ হয় কম, আর হলেও তারা খুব বেশি সাজাপ্রাপ্ত হয় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ৭০ জনের মতো যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করেন। ব্ল্যাকওয়াটার⁸-এর মতো প্রাইভেট ভাড়াটে খুনি প্রতিষ্ঠানের সন্ত্রাসীদের যেসব খুনের ঘটনা (কোনো কারণ ছাড়া সতেরো জন হত্যা, বিশজন আহত) প্রকাশ হয়ে পড়ে, সেগুলোতেও খুনিদের নিঃশর্ত ক্ষমা ঘোষণা করা হয় (VanLandingham & Corn, 2020; Haberman & Schmidt, 2020)।

চলুন, পুরো চিত্রটা আরও একবার আমরা কল্পনা করি। কোনো ভিনদেশী বাহিনী এসে আপনার ভাইয়ের সন্তানকে খেলাচ্ছলে হত্যা করে। তাঁর আঙুল কেটে নিয়ে শিকারের 'ট্রফি' হিসেবে সংরক্ষণ করে। আর এত বড় অপরাধের পর তাঁদের সাজা হয় কয়েক মাস জেল। অথচ দিনশেষে ওরাই আবার নিজেদের ঘোষণা করে 'স্বাধীনতা' আনয়নকারী হিসেবে! কী, দৃশ্যটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে? এর উত্তরে কেউ যদি বলেন এগুলো স্বাভাবিক কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাহলে তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন খাঁটি, বিকৃত মস্তিষ্কের পশ্চিমা সভ্যতার গোলাম। গৃহপালিত পশুর গলায় বাঁধা শেকল খালি চোখে দেখা যায়, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দাসদের গলায় থাকা শেকল হয় অদৃশ্য, ওরা আল্লাহর পরিবর্তে ভিনদেশী জাতির গোলামির চিহ্ন নিজেদের কথায়-কাজে ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু, কোনো স্বাভাবিক মানুষের কাছে এই দৃশ্য স্বাভাবিক, সহনীয় মনে হবে না। আর এই দৃশ্যগুলোই আফগান যুদ্ধ জুড়ে আফগানিস্তানের মানুষদের নিকট পরিচিত আর 'স্বাভাবিক' ছিল।

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, অ্যামেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সকল জাতীয় (ও আন্তর্জাতিক) ফোনকল রেকর্ড ও স্টোরিং করছে। পরবর্তীকালে উইকিলিকস প্রকাশ করে, নির্দিষ্ট সেই দেশটি হলো আফগানিস্তান (Assange, 2014)। স্বীয় 'নৈতিক উচ্চমর্যাদা'র ব্যাপারে লিবারেল সেক্যুলারদের ধারণার স্বরূপ দেখুন। তারা আফগানিস্তানের সকল জনগণের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে। তাঁর ওপর তারা জানায়, উক্ত রাষ্ট্রের নাম প্রকাশ করলে 'সহিংসতা' বৃদ্ধি পাবে, তাই তারা নাম প্রকাশ করবে না। অর্থাৎ, আফগানিস্তানের মতো কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের গোপনীয়তা যে লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটা জানার অধিকার পর্যন্ত তাঁদের নেই। এই হলো লিবারেল-সেক্যুদের 'হিউম্যান রাইটস'।

১১ মার্চ, ২০১৬, মার্কিন সার্জেন্ট রবার্ট বেলস⁹ তাঁদের ঘাঁটি থেকে আফগান বসতিতে গিয়ে ষোলো জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে, এর মধ্যে নয়জনই শিশু। বেলস তাঁদের হত্যা করে তাঁদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ষোলো জন তরতাজা অসহায় 'মানুষ' হত্যার আসামি বেলসের সাজা দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (Healy, 2013)।

আদিবাসীদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে 'সভ্য' হওয়া আরেক রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার ডিফেন্স ফোর্সের লিক হওয়া গোপন ফাইলের শত শত পাতা জুড়ে দেখা যায়, ২০০৯-২০১৩ এই পাঁচ বছরে 'অন্তত' দশটি ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা আফগান যোদ্ধাদের সাথে সাথে বেসামরিক পুরুষ ও নারী হত্যা করে (see Oakes & Clark, 2017c, for more details)। ২০১২, কান্দাহারে অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা এক কিশোর ছেলেকে হত্যা করে এবং সে তথ্য উচ্চপদস্থ অফিসারদের কাছ থেকে গোপন করে। সেপ্টেম্বর ২০১৩, উরুজগান প্রদেশে বিসমিল্লাহ আজাদি ও তাঁর ছেলে সাদিকুল্লাহ বিছানার চাদর জড়িয়ে এক সঙ্গে ঘুমাচ্ছিল। অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা সেই অবস্থাতেই তাঁদের দুজনকে একত্রে শহীদ করে দেয় (Oakes & Clark, 2017c)।

১৬ নভেম্বর ২০২০, অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্সের প্রধান আফগানিস্তানে তাঁদের সেনাদের খেলাচ্ছলে হত্যা/খুনের বিস্তারিত রিপোর্ট হাতে পান (Afghanistan Inquiry, ২০২০)। কী ছিল সেই রিপোর্টে? সেখানে ছিল পশ্চিমা মানবাধিকার পৌঁছানোর অস্ট্রেলিয়ান ভার্শনের বিবরণ। অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা—
* হত্যার সংখ্যা গণনার প্রতিযোগিতা করত,
* হেলিকপ্টারে করে আফগান গ্রামে আক্রমণ করত, অতঃপর পলায়নপর বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালাত গণহত্যা,
* হেলিকপ্টার হামলার পর স্পেশাল ফোর্স পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে গ্রামের পুরুষ ও ছেলেদেরকে গ্রামের শেষ প্রান্তে 'গেস্ট হাউসে' নিয়ে যেত।¹⁰ তারপর তাঁদের দিনের পর দিন নির্যাতন করা হতো। অবশেষে স্পেশাল ফোর্স যখন 'অতিথিদের আপ্যায়ন' শেষ করে চলে যেত, তখন ছেলে ও পুরুষদের পাওয়া যেত মাথায় গুলিবিদ্ধ কিংবা চোখবাঁধা, গলা কাটা অবস্থায় (2020, p. 120)।

২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্স মিনিস্টার স্বীকার করেন, ২০১০ এর ২২ মে নিউজিল্যান্ডের সৈন্যরা এক হামলায় ছয় জন বেসামরিক অসহায় আফগানকে হত্যা ও পনেরো জনকে আহত করে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে এসে টিভিতে দেখতে পান, তাঁর সৈন্যরা তিন বছর বয়সী এক বাচ্চাকে হত্যা করছে। তারপরও তিনি বলেন, যুদ্ধে এরকম হতেই পারে। এসব কথাও তিনি স্বীকার করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বই Hit and Run-এ উল্লিখিত ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ হবার পর (Oakes, 2017a)। পরবর্তীকালে পলিটিশিয়ান ও সামরিক অগ্রনায়করা সম্মিলিতভাবে এ ঘটনা ধামাচাপা দেয় (Oakes, 2017b)।

লক্ষ্য করার একটি বিষয় হলো, ইরাকের নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশিত হবার পর চারিদিকে যেভাবে হাহাকার পড়ে যায়, আফগানিস্তানে ঠিক সেরকম নির্যাতনই হয়েছে। বরং নির্যাতনের শুরুটাই হয়েছে আফগানিস্তানে। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে তাঁদের 'কথিত মানবতা'র কোনো অংশ বরাদ্দ রাখেনি। এমনকি অনেক স্কলার ইরাকের ক্ষেত্রে যেসব অকথ্য নির্যাতনকে অবৈধ মনে করতেন, তারা সেই নির্যাতনগুলোকে শুধু আফগানিস্তানের জন্য 'খাস' হিসেবে বৈধ ধরে নিয়েই ইরাকে নির্যাতনের বিরোধিতা করেন।

এই ছিল আফগানিস্তানে পশ্চিমা স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের প্রকৃত চেহারা। হত্যা, নির্যাতন আর ধর্ষণের যে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা, তাঁর শেষটা হয়েছে নিদারুণ অপমানের মধ্য দিয়ে। সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত অ্যামেরিকার সৈন্যরা হালকা অস্ত্র নিয়ে লড়াই করা তালিবানদের অপসারণের চেষ্টায় বিশটি বছর জান-মাল অপচয় করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। কিন্তু 'সাম্রাজ্যের কবরস্থান' আফগানিস্তান থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারেনি। পরাজিত হয়ে নতমস্তকে ফিরে গেছে নিজ দেশে। তালিবানদের বিজয়ে একটা বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেটি হলো— মুমিনরা যদি একতাবদ্ধ হয়ে, নিজেদের লক্ষ্যে অটল থেকে লড়াই চালিয়ে যায়, তাহলে শক্তির ভারসাম্যহীনতা তখন গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন, পৃথিবীর কোনো শক্তি তাঁর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবার সক্ষমতা রাখে না।

একটা ঘটনা বলে আফগানিস্তানের বীরত্বগাথা শেষ করি। ২১ সেপ্টেম্বর, ২০০১, পবিত্র জুমাবার। আমিরুল মুমিনিন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর রহিমাহুল্লাহর বারো মিনিটের এক ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। সেখানে সাংবাদিক মোল্লা ওমরকে প্রশ্ন করেন, আপনি কি জানেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে?
এর জবাবে তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় উক্তিটি বলেন। তিনি উত্তর দেন, [আজ] আমার সামনে দুইটি ওয়াদা রয়েছে। এক আল্লাহর ওয়াদা, অন্যটি বুশের। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, আমার জমি বিশাল। যদি তুমি রবের পথে জিহাদ করো, তুমি পৃথিবীর যেখানেই থাকো না কেন, তুমি [আল্লাহর] নিরাপত্তা লাভ করবে... আর বুশ শপথ করেছে, দুনিয়ায় এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তুমি লুকিয়ে থাকলে আমি তোমাকে খুঁজে বের করতে পারব না। আমরা দেখব এই ওয়াদা দুটির মধ্যে কার ওয়াদা সত্যি হয় (Guardian, 2001)। তাঁর সেদিনের কথার উত্তর আজ আমরা জানি। মার্কিনীদের নাকের ডগায় আরও এক দশক বাস করে আল্লাহর ওয়াদার বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে স্বাভাবিকভাবে তিনি মারা যান। আর বুশের পর আরও তিন প্রেসিডেন্ট এসেও আফগানিস্তানে বিজয়ের মুখ দেখতে পায়নি।

টিকাঃ
১. প্রচুর 'প্রগতি' হলো।
২. Gul Mudin
৩. Calvin Gibbs
৪. David Bram
৫. Andrew Holmes
৬. Jeremy Morlock
৭. Adam Winfield
৮. Blackwater, পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে Xe Services রাখা হয়
৯. Robert Bales
১০. বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা আবরার ফাহাদকে যেভাবে হত্যা করেছিল, ঠিক যেন সেরকম ঘটনা।

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 ইরাক যুদ্ধ

📄 ইরাক যুদ্ধ


সাংবাদিক রন সাসকিন্ড বুশ প্রশাসনের একজন অফিশিয়ালের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, যিনি গর্ব করে বলেছিলেন, 'বর্তমানে আমরাই একটি সাম্রাজ্য। কাজ করার সময় আমরা আমাদের নিজস্ব বাস্তবতা সৃষ্টি করে নিই। আর তোমরা [সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী] যখন বিচক্ষণ দৃষ্টিতে সেই বাস্তবতা সম্পর্কে অধ্যয়ন করবে, আমরা পুনরায় অন্যান্য নতুন সব বাস্তবতা সৃষ্টিতে লিপ্ত হবো। সেগুলোও তোমরা অধ্যয়ন করবে, আর এভাবেই বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়। আমরা ইতিহাসের [মঞ্চে] অভিনেতা... আর তোমরা, তোমাদের প্রতিটি ব্যক্তি সেখানে পড়ে থাকবে শুধুমাত্র আমরা কী করি তা অধ্যয়ন করার জন্য' (Robinson, 2015)।

ইরাক যুদ্ধ শুরুর পূর্বে বুশ প্রশাসন বারবার অ্যামেরিকার সৈন্যদেরকে 'মুক্তিদাতা' ও 'শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী' হিসেবে ঘোষণা করত। যারা জীবন বাজি রেখে ইরাকে শান্তি, প্রগতি আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে এবং নির্যাতিত ইরাকি নাগরিকগণ তাদেরকে দু'বাহু মেলে সাদর আমন্ত্রণ জানাবে। যুদ্ধের পূর্বাপর সময়ে মার্কিনীরা কিছু বিমূর্ত পরিভাষা ব্যবহার করে। যেমন: দেশপ্রেম, গৌরব, শৌর্য-বীর্য, বীরত্ব—যেগুলোর প্রত্যেকটি ছিল বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু, বুশের এসকল বাগচাতুর্যকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার পরিবর্তে মার্কিন মিডিয়াগুলো মহিমান্বিত করে তুলে।

প্রথমে ফেব্রুয়ারি ২৮ (Bush G. W., 2003e) ও পরে মার্চ ১, ২০০৩-এ প্রেসিডেন্ট বুশ বলেন, 'ইরাকি জাতি তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, প্রচুর সম্পদ আর দক্ষ ও শিক্ষিত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্রের দিকে এগোবার ও স্বাধীনতার সঙ্গে বসবাস করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে' (Carruthers, 2016)। মার্চ ১৭, ২০০৩, যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পূর্বে বুশ ইরাকি জনগণকে 'ভরসা' দেওয়ার লক্ষ্যে বলেন, 'যদি আমাদের সামরিক কার্যক্রম শুরু করতেই হয়, (তাহলে) সেটি হবে চরমপন্থী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের শাসন করে। (এই হামলা) তোমাদের বিরুদ্ধে নয়' (Bush G. W., 2003)।

এপ্রিল ৯, ২০০৩, একদল ইরাকি বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের মূর্তিতে ভাঙচুর শুরু করে। এক ইরাকি হাতুড়ি নিয়ে সেটাতে আঘাত করতে শুরু করে, আরও কিছু লোক তাঁর সাথে যোগ দেয়। পরে অ্যামেরিকান মেরিন সদস্যদের সাহায্যে মূর্তিটি ভূপাতিত করা হয়। মার্কিন মিডিয়াতে মূর্তি ভাঙার এই ঘটনাটি যুদ্ধ জয়ের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়। যদিও 'প্রকৃত' যুদ্ধ, অর্থাৎ অ্যামেরিকা আর ব্রিটিশ আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কিন্তু তখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। মিডিয়াতে মূর্তির ঘটনাটিকে ইরাকের জন-সমর্থিত বিশাল ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়।¹ কিন্তু, পরবর্তীকালে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ঘটনার সময় সেখানকার অধিকাংশ স্থান ছিল ফাঁকা। আর সেখানে উপস্থিতও ছিল মাত্র কয়েকশত মানুষ, যাদের মধ্যে সাংবাদিক আর অ্যামেরিকান সৈনিকদের সংখ্যাই ছিল বেশি। আর মূর্তিতে আক্রমণ করা ইরাকি বাসিন্দাদের অধিকাংশ-ই ছিল মার্কিন সমর্থিত ইরাকি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির সদস্য, যার নেতা ইরাকের কুখ্যাত গাদ্দার আহমেদ চালাবি। এই লোকটি ইরাকে মারণাস্ত্র থাকার ব্যাপারে মিথ্যা সংবাদ প্রচারে অ্যামেরিকাকে সহায়তা করে (Kellner, 2007)।

এইদিন সকাল এগারোটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সিএনএন প্রতি ৭.৫ মিনিট পরপর, ফক্স নিউজ প্রতি ৪.৪ মিনিট পরপর ভিডিওটি পুনঃপ্রচার করে (ProPublica, 2010)। পরের দিন সকল পত্রিকায় বিজয়ের 'সুসংবাদ' ছাপা হয়। সান ফ্রান্সিস্কো ক্রনিকেলস-এর সম্পাদক ও রিপোর্টার রবার্ট কলিয়ার-এর রিপোর্ট পরিবর্তিত করে ইরাকিদের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হিসেবে লিখে : ‘বিজয়! আমরা স্বাধীন!’ জনগণ (উল্লসিত হয়ে) চিৎকার করছে। ‘ধন্যবাদ! প্রেসিডেন্ট বুশ!’ (Collier & Squatriglia, 2003)। এই আর্টিকেলের সঙ্গে যুক্ত ছবিতে দেখা যায়, ইরাকি শিশুরা হাস্যোজ্জ্বল মুখে মার্কিন সেনাদের গালে চুমু দিচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এ ঘটনাকে বর্ণনা করে 'সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত প্যারিসবাসীদের মিত্রপক্ষের ট্যাংকে ফুল ছিটিয়ে দেওয়ার মতো, সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত জার্মানদের বার্লিন ওয়াল ভাঙার মতো, ... সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ইরাকিরা তাঁদের অত্যাচারীর মূর্তি ধ্বংস করেছে, সাদ্দাম হোসেনের মুখে জুতো ঘষে দিয়েছে' (Safire, 2003)।

কিন্তু, আসল পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরবর্তীকালে, ওই দিনের ঘটনার সময় সাদ্দাম হোসেনের মূর্তিতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা খাদিম আল-জাবুরি আফসোস করে বলেন, 'সাদ্দাম হোসেন মানুষ হত্যা করত, কিন্তু সেটি এখনকার সরকারের তুলনায় কিছুই নয়। সাদ্দাম বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাঁর স্থানে এখন এক হাজার সাদ্দাম রয়েছে' (BBC News, 2016)। সাদ্দামের মূর্তি ভাঙার এক মাস পর বুশ 'লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে' ব্যানার পিছনে রেখে ঘোষণা দেয়, গুরুত্বপূর্ণ লড়াই সমাপ্ত হয়েছে। ২০০৩-এর এপ্রিলে অ্যামেরিকা নির্বাসিত ইরাকি নেতা চালাবিকে ইরাকে ফেরত পাঠায়, তাঁদের আশা ছিল চালাবি ইরাকে তাঁদের সফল পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু জনগণ তাঁর ও অ্যামেরিকার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি। কারণ, ইরাকে অ্যামেরিকার ধ্বংসযজ্ঞ ইরাকি জনগণের সকল আশঙ্কাকে ছাড়িয়ে যায়।

ভিয়েতনামের মতো ইরাক যুদ্ধেও অ্যামেরিকা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নাপাম ব্যবহার করে। শুরুতে পেন্টাগন তাঁদের চিরায়ত স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাপাম ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে, পরবর্তীকালে অ্যামেরিকান পাইলট ও কমান্ডাররা প্রকৃত সত্য ফাঁস করে দেয় (Buncombe, 2003)। ইরাকের ফাল্লুজাহ শহরে ২০০৪-এর রক্তাক্ত যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অ্যামেরিকান সৈন্যরা বিদ্রোহীদের গ্রেফতার করতে সেখানকার হাসপাতালগুলোতে আক্রমণ করে। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সগুলো মার্কিন হামলায় আহত বেসামরিক নাগরিকদের সেবা দিতে চাইলে তারা অ্যাম্বুলেন্সে গুলি করত। এমনকি সেবাদান বাধাগ্রস্ত করতে সন্তান জন্মদানের টেবিলে কর্মরত থাকাকালীন ডক্টরদেরকেও তারা গ্রেফতার করে (Jamail, 2004)।

২০০৪ সালে ইরাকি নাগরিকদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০% নাগরিক তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ৯২% নাগরিক কোয়ালিশন ফোর্সকে ‘দখলদার' হিসেবে সাব্যস্ত করে, মাত্র ২% ইরাকি সেক্যুলার-উচ্ছিষ্টভোগী রাজাকার তাদেরকে 'ত্রাণকর্তা/মুক্তিদাতা' হিসেবে ঘোষণা দেয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ-ই (৫৫%) জানায়, কোয়ালিশন ফোর্স যদি তাৎক্ষণিক ইরাক ত্যাগ করে, তাহলেই তারা অধিক নিরাপদ অনুভব করবে (Global Policy Forum, 2004)।

পরবর্তীকালে এই চিত্র তেমন বদলায়নি। ২০০৭-এ ইরাকিদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ৫৬%, চাকরির ক্ষেত্রে ৮০%, বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ৯২%, বিশুদ্ধ পানির ক্ষেত্রে ৭৫%, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ৬৭%, মৌলিক জিনিস প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ৬১%, চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৭৪% ইরাকি জানায় যে, উল্লিখিত বিষয়ে পরিস্থিতি 'বেশ খারাপ' বা 'খুবই খারাপ' (Global Policy Forum, 2007)। ৮৫% নাগরিক জানায়, কোয়ালিশন ফোর্সের ওপর তাঁদের কোনো আস্থা নেই।

তাহলে, এ কেমন স্বাধীনতা, যেখানে 'স্বাধীন' হওয়া ব্যক্তিরা স্বাধীনতার বিরোধিতা করে? আর কেনই-বা অ্যামেরিকান আগ্রাসীরা ইরাকি নাগরিকদের মতামত যাচাই করে দেখল না, 'অধিকাংশ' ইরাকিরা অ্যামেরিকানদেরকে ইরাকি ভূখণ্ডে 'স্বাধীনতা' আনয়নকারী হিসেবে চায় কি না? জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া এই শাসনব্যবস্থাকে 'স্বাধীনতা' বলার সায়েন্সটা কী?

নভেম্বর ১৯, ২০০৫, 'কমপক্ষে’ ২৪ জন ইরাকি বেসামরিক (নারী, শিশু-সহ) নাগরিককে মার্কিন সৈন্যরা হত্যা করে। আটজন মেরিন সেনাকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে অভিযুক্ত করা হয়। অথচ, আটজন আসামির মধ্য থেকে মাত্র একজনকে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৯০ দিন জেলে থাকার 'শাস্তি' প্রদান করা হয় (CNN Editorial, 2021)।

অ্যামেরিকার আগ্রাসনের সূচনার তিন বছর পর, ইরাকি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সামিরা তাঁর কর্মস্থল প্রসূতি বিভাগে কিছু 'সমস্যা' লক্ষ করলেন। তাঁর হাসপাতালে মহিলারা তাঁদের এমনসব বাচ্চা নিয়ে আসতে শুরু করল, যাদের পেট থেকে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বের হয়ে আছে, পা দুটি জোড়া লেগে লেজের আকৃতি গঠন করেছে। কারও দেহের চামড়া সাপের মতো দেখতে। কোনো শিশু শ্বাসগ্রহণে প্রায় অক্ষম থাকার কারণে মুমূর্ষু অবস্থায় শয্যাশীন। কারও বাচ্চা মস্তিষ্কে ব্রেইন সুরক্ষিত রাখার স্কাল বা খুলি ছাড়াই জন্ম নেয়, ফলাফল—জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক মৃত্যু (Gottesdiener, 2020)। এই বিশেষ সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম।² একবার চিন্তা করুন তো, ভয়াবহ মরণবাহী যুদ্ধের মাঝে নবজীবনের জয়গান গেয়ে দীর্ঘ দশ মাস গর্ভধারণ করার পর যখন কোনো মা তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তানকে জন্ম দিয়ে দেখতে পান, তাঁর সন্তানের এই নির্মমতম পরিণতি, তখন তাঁর ঠিক কেমন বোধ হয়? কতটা নির্মম সেই মুহূর্তটা? একবার সেই অনুভূতিটা কল্পনা করার চেষ্টা করুন; আর যদি পুরুষ হয়ে থাকেন, তাহলে মাহরাম কোনো নারীকে ছবিগুলো দেখিয়ে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে পারেন, তারা হয়তো তাঁদের সেই অকথ্য কষ্টের কিছুটা ধারণা করতে পারবে।

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের যুদ্ধেও মার্কিন বাহিনী ইরাকে মিলিয়ন রাউন্ড ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে ইরাকি জনগণের ওপর যখন এর বিরূপ প্রভাবের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তখন পেন্টাগন দাবি করে যে, এটি সিরিয়াস কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি বহন করে না। সেই দাবির ওপরই তারা অটল থাকে। হোয়াইট হাউস দাবি করে, ইরাকি সরকার সিম্প্যাথি আদায়ে মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করছে; তাই তারা সুনিশ্চিতভাবে এটির ব্যবহারে ঝুঁকির সম্ভাব্যতা নাকচ করে দেয় (Apparatus of Lies, 2003)।³ অথচ, অ্যামেরিকান বহু সৈন্যও পরবর্তীকালে ইউরেনিয়ামের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, ১৯৯১-এর আক্রমণে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের পরিমাণ ছিল কমপক্ষে ২৮৬ টন, আর ২০০৩-এর আগ্রাসনে তা ছিল ১৩০ টন (Hastings, 2006)।

ইরাকের তিকরিত শহরে যুদ্ধ করা সার্জেন্ট মিলার্ড⁴ নামক এক সৈনিক যুদ্ধে ঘটা এক নির্মম ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ১৮ বছর বয়সী এক মার্কিন সেনা হাস্তায় নিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল পয়েন্টে বসে ছিল। রাস্তা দিয়ে এক ইরাকি গাড়ি দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছিল। মুহূর্তের মধ্যে ওই সৈন্য 'সিদ্ধান্ত' নিয়ে ফেলল, এটি একটি আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী গাড়ি। পরের এক মিনিটে সে গাড়িটি লক্ষ্য করে মোট 'দুইশত' রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। পরে দেখা গেল, গাড়িতে অবস্থানকারী বাবা, মা, দুটি ছোট্ট শিশু—চার বছরের ছেলে ও তিন বছরের মেয়ে—গুলির আঘাতে ওই জায়গাতেই তাৎক্ষণিক নিহত হয়। ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল কর্নেলকে এ ব্যাপারে জানালে তিনি বলেন, 'যদি এই বদমাশ ইরাকিরা গাড়ি চালাতে শিখত, তাহলে এরকম হতো না' (Hedges & Al-Arian, 2008, pp. XIV-XV)। ব্যস, ওইটুকুই। সেখানেই ঘটনার সমাপ্তি, আর কোনো তদন্ত নেই, নেই কোনো সাজা।

যুদ্ধের পরিস্থিতি যখন তিক্ত হতে শুরু করে, তখন সেনাদের অনেকেই নিজেদেরকে আর 'মুক্তিদাতা', 'বিজয়ী' মনে করত না। এক মার্কিন সেনা মিডলটন⁵ বলেন, 'অনেক ব্যক্তিই (সেনা) এই পুরো ব্যাপারটাকে সমর্থন দেয় যে, যদি তারা আমাদের মতো ইংরেজি বলতে না পারে, এবং তাঁদের ত্বক কালো হয়, (তাহলে) তারা আমাদের মতো মানুষ নয়। তাই আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারি।' এটিই ছিল পুরো ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিনীদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার নমুনা। যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়েই অ্যামেরিকানরা শারীরিক আর বস্তুগত অগ্রসরতা অক্ষুণ্ণ রাখে, কিন্তু নৈতিকতার জায়গায় গিয়েই তারা হেরে বসে। অপ্রয়োজনীয়, এলোপাথাড়ি অভিযানে গ্রেফতারকৃত হতভম্ব ইরাকি বন্দিদের কাপড় খুলে নগ্ন করে তাদেরকে তপ্ত রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অসহায় বন্দিদের নিপীড়ন করাটা কোয়ালিশন বাহিনীর জন্য পরিণত হয় একটা বিকৃত খেলায় (Hedges & Al-Arian, 2008)।

অনেক সৈন্যই যুদ্ধে অংশগ্রহণ শেষে স্বদেশে ফিরে হৃদয়ে চেপে রাখা সত্যের ভার সইতে না পেরে তাঁদের দেখা নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্ণনা করেন। সার্জেন্ট ফ্লাট জানুয়ারি ২০০৫-এর একটি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মসুলের হাইওয়েতে এক মার্কিন কনভয় তাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। এর পিছনে থাকা একটি গাড়ি দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের বহরের বেশ কাছে চলে গিয়েছিল; আর তখন মার্কিন কনভয় থেকে সেনারা গাড়িটি লক্ষ্য করে গুলি করে। গাড়িতে বসা এক নারীর মুখমণ্ডলে গুলি লেগে তিনি তৎক্ষণাৎ নিহত হন। মহিলাটির ছেলে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে ছিল, আর মহিলার তিনটি ছোট ছোট কন্যা শিশু পেছনের সিটে বসেছিল। ফ্লাট ওই সময় মসুলের প্রধান হাসপাতালের পাশেই অবস্থান করছিলেন, গাড়িটি দ্রুত সেখানে পৌঁছলে তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। তিনি তখন দেখতে পান, ছোট ছোট বাচ্চাগুলো তখন তাঁদের সদ্য খুন হওয়া মায়ের জন্য কান্না করছে (Hedges & Al-Arian, 2008)।

পশ্চিমা সভ্যতার এই নগ্ন চেহারা সচেতন কোনো ব্যক্তির পক্ষে উপেক্ষা করা অসম্ভব। ইরাক যুদ্ধের ব্যাপারে বুশের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি স্কট মেকলিল্যান্ড মন্তব্য করেন, ইরাকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত একটি 'পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা' মেশিন-এর মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। যেটি মার্কিন নাগরিকদের ইরাক যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে ভুল পথে পরিচালিত করেছে (McClellan, 2008)। বিশ্বের সুপারপাওয়ার রাষ্ট্রের কর্ণধাররা স্বাধীনতার বুলি প্রচার করে ইরাককে এমন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, যে অবস্থা থেকে ইরাকি জনগণ আজও উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়নি। এক সময়ে জ্ঞানের রাজধানী বিবেচিত হওয়া সুপ্রাচীন বাগদাদ আর ইরাককে অ্যামেরিকা রূপান্তরিত করে মৃত্যুপুরীতে। যেখানে জীবনের অনিশ্চয়তাই যেন এক সুনিশ্চিত বাস্তবতা।

টিকাঃ
১. বাংলাদেশের শাহবাগে নাস্তিকরা রাষ্ট্রীয় মদদে যে পৈশাচিক নাটক মঞ্চায়িত করে, বঙ্গীয় সেক্যুলার মিডিয়াও লজ্জাহীনতার চরমতম উদাহরণ দেখিয়ে সে ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সে নষ্টামিতে সারাদেশের সমর্থন রয়েছে বলে প্রচার করে।
২. Depleted Uranium হলো Enriched Uranium উৎপাদনের সময় প্রাপ্ত বাই প্রোডাক্ট। এই উপাদানটি বসনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাকের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।
৩. ১৯৯১-এর উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েত থেকে পলায়নপর ইরাকি সেনাদের ওপর 'Highway of Death'-এ মার্কিন বাহিনী Depleted Uranium সমৃদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে সে এলাকার জনগণের মধ্যে Birth defect ও Cancer-এ আক্রান্ত হবার হার বৃদ্ধি পায়।
৪. Geoffrey Millard
৫. Spc. Josh Middleton

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 আবু গারিব, গুয়ান্তানামো | অসভ্যতার সীমা কোথায়

📄 আবু গারিব, গুয়ান্তানামো | অসভ্যতার সীমা কোথায়


সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বন্দিদের ওপর নির্যাতন পরিচালনার পথকে বাধাহীন করতে ডোনাল্ড রামম্ফেল্ড অ্যামেরিকান মিলিটারিতে রিফর্মেশন নিশ্চিত করে। জেনারেল ও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফরা তাতে সম্মতি দিক বা না-দিক। রামম্ফেল্ড টিমের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী যেকোনো সিনিয়র অফিসার হয় ওনাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, নয়তো-বা তাদেরকে অবসর গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে (Clarke, 2008, p. 52)। ১৭ জানুয়ারি ২০০২, অফিস অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স থেকে দেওয়া পেন্টাগনের ব্রিফিং-এ অ্যামেরিকান মিলিটারির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধতে ধৃত ব্যক্তিদের যুদ্ধবন্দি¹-এর বদলে প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে ডিটেইনি² হিসেবে বিবেচনা করবে। তারা দাবি করে, এসকল বন্দিরা খুবই বিপজ্জনক। তাঁদের নিজেদের এবং অ্যামেরিকার 'সুরক্ষা' নিশ্চিত করতে তাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে বিশ্বের অপর প্রান্তে কিউবার গুয়ান্তানামো-বে নৌঘাঁটিতে নেওয়া হবে।

যুদ্ধনীতি আর জেনেভা কনভেনশন ছুড়ে ফেলা হলো ডাস্টবিনে। আফগানিস্তানের বাগরাম, ইরাকের আবু গারিব, কিউবার গুয়ান্তানামো বে কারাগার এবং বহির্বিশ্বে সিআইএ-র অন্যান্য গোপন কারাগারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের স্থানান্তরিত করা হলো। উল্লিখিত প্রতিটি কারাগারে চালানো শুরু হলো পাশবিক নির্যাতনের স্টিমরোলার। মার্কিন সরকার দাবি করল, তালিবান কারাবন্দিরা যুদ্ধে শত্রুপক্ষের বন্দি (EPW)³ হিসেবে বিবেচিত হবে না। কারণ মুক্তিযোদ্ধা তালিবান বাহিনী আফগান সরকারকে 'উপস্থাপন' করে না। তারা দাবি করল, আফগানিস্তান ছিল একটি 'ব্যর্থ রাষ্ট্র', তাই ১৯৪৯ জেনেভা কনভেনশন-এর সুরক্ষা প্রদানকারী বিধানসমূহ⁴ তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নয় (Greenberg & Dratel, 2005, pp. 38-79)। ২৫ জানুয়ারি, ২০০২, ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস-এর আলবার্তো গঞ্জালেস—পরবর্তীকালে এটর্নি জেনারেল—এক মেমোরান্ডামে মত প্রকাশ করেন যে, প্রেসিডেন্ট চাইলে জেনেভা কনভেনশনকে 'বৈধভাবে' বাইপাস করতে পারেন (Greenberg & Dratel, 2005, pp. 118-121)। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস পরামর্শ দেয় যে, গুয়ান্তানামো প্রিজন উচ্চ পর্যায়ের তালিবান ও আল কায়েদা বন্দিদের জন্য নিরাপদ বন্দিশালা হিসেবে আদর্শ একটি স্থান। কারণ, বন্দিরা সেখানে তাঁদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের কোনো আইনি প্রতিবাদ করতে পারবে না। তাঁদের কাছে আইনজীবীদের পৌঁছানোর রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হবে।

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০২, প্রেসিডেন্ট বুশ সরাসরি বলেন, 'জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট-এর চূড়ান্ত ফয়সালা অনুযায়ী অ্যামেরিকার শত্রুদের বিরুদ্ধে জেনেভার কোনো বিধানই প্রযোজ্য নয়। তবে, পলিসি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীসমূহ “বন্দীদের” সঙ্গে 'মানবিক' আচরণ করবে, সামরিক প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ও যথার্থ উপায়ে, যে পদ্ধতি জেনেভার নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ' (Greenberg & Dratel, 2005, p. 135)।

অ্যামেরিকানরা বন্দীদের সঙ্গে ঠিক কোন পর্যায়ের 'মানবিক' আচরণ করেছে, সেটি একটু পর বিস্তারিত বর্ণিত হবে ইনশাআল্লাহ। এ ধরনের আরও কিছু মেমোরান্ডাম বুশ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে লেনদেন হয়, যার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে 'বৈধ' উপায়ে নির্যাতনের উপায়গুলো খুঁজে বের করেন। অবশেষে, বিচার বিভাগের সহায়তায় বুশ প্রশাসন ১৯৪৯ জেনেভা কনভেনশনকে কার্যত বাতিল ঘোষণা করে। ইরাক আক্রমণের পর অ্যামেরিকা সাদ্দাম হোসেনের ব্যবহৃত প্রিজন সিস্টেম নিজেদের নির্যাতন পরিচালনার কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে। ২২ এপ্রিল ২০০৩ তারা আবু গারিব কারাগার দখল করে নেয়। আগস্টের ৪ তারিখে এটির নাম বদলে রাখা হয় বাগদাদ ডিটেনশন সেন্টার।৫ মার্কিনীরা এখানকার কোনো বন্দিকে 'বিশেষ বিপজ্জনক' মনে করলে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো গুয়ান্তানামো বে-তে।

টিকাঃ
১. prisoner of war, POWs বা যুদ্ধবন্দি।
২. Detainee বলতে এমনসব বন্দিদের বোঝানো হয়, যাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাদেরকে কাস্টডিতে বন্দি করে রাখা হয়।
৩. Enemy prisoner of war, EPW বা যুদ্ধে শত্রুপক্ষের বন্দি।
৪. Provision
৫. Baghdad detention center

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 নির্যাতনের স্বরূপ

📄 নির্যাতনের স্বরূপ


সেপ্টেম্বর ১২, ২০০২, জাতিসংঘের ভাষণে বুশ বলেছিলেন, সাদ্দাম হোসেন মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে এবং ইরাকে নির্যাতন সর্বাত্মক রূপ ধারণ করেছে। তিনি সাদ্দাম হোসেনের 'অবাধ্য গ্রেফতার ও কারাগারে বন্দি করা, তাৎক্ষণিক হত্যা, প্রহার ও পোড়ানোর মাধ্যমে নির্যাতন, ইলেকট্রিক শক, অনাহার, অঙ্গচ্ছেদ ও ধর্ষণের মাধ্যমে নির্যাতন'-এর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, 'ইরাকে স্ত্রীদেরকে তাঁদের স্বামীর সামনে, সন্তানদেরকে তাঁদের বাবা-মার সম্মুখে নির্যাতন করা হয়— এই ধরনের সকল ভয় (সৃষ্টিকারী ঘটনা) সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে বিশ্ব থেকে গোপন রাখা হয়' (Bush G. W., 2002c)।

সাদ্দাম হোসেনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তোলা অ্যামেরিকা ইরাক ও আফগানিস্তানের নাগরিকদের সঙ্গে যে আচরণ করে, সেটি সাদ্দামের করা নির্যাতন থেকে কোনো অংশেই কম নির্মম ছিল না। বরং সকল ক্ষেত্রেই মার্কিনীরা নৃশংসতার সীমা অতিক্রম করেছে। সবচেয়ে পরিহাসজনক বিষয় হলো, জাতিসংঘে সাদ্দামের বিরুদ্ধে বুশ যে অভিযোগের ফিরিস্তি দিল, তাঁর প্রত্যেকটি অপরাধ অ্যামেরিকা পুনরায় করে দেখিয়েছে ওয়ার অন টেররে। সেটিও তারা করেছে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বুলি আওড়িয়ে।

আবু গারিব থেকে তিনি কেলী নামের এক নারীকে নিয়মিত ইমেইল করতেন। গতানুগতিক কয়েকটি মেইল নিয়মিত পাঠাবার পর অক্টোবর ২০, ২০০৩-এ তাঁর লেখা একটি মেইলে বেশ চাঞ্চল্যকর ভাষা ফুটে উঠে। মেইলটিতে লেখা কথাগুলো ছিল এরকম—

অক্টোবর ২০, ২০০৩ রাত ১০: ৪০
কেলী
ওকে (Okay), আমি আর এসব (নির্যাতন) পছন্দ করি না। শুরুতে এগুলো (বেশ) মজাদার ছিল, কিন্তু এরা (মার্কিন সৈন্য) খুবই সীমালঙ্ঘন করছে। আমি গত রাতে তোমাকে চিঠি লেখা শেষ করে দিয়েছিলাম। কারণ, এমআই¹ বন্দিদের জাগানো এবং তাদের সঙ্গে 'অসভ্যতা' করার সময় হয়েছিল। কিন্তু সীমা খুব বেশি অতিক্রম করা হচ্ছে, এমনকি যা চলছে তা আমিও (মানসিকভাবে) সামাল দিতে পারছি না। এগুলো আমি আমার মাথা থেকেই বের করতে পারছি না। হুইসেল দেওয়ার পর আমি সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে নিচে যাই আর Asp² দিয়ে সেলগুলোতে আঘাত করতে করতে গিয়ে 'ট্যাক্সি ড্রাইভার'কে খুঁজে পাই (মাথার ওপর দিয়ে হাত) পেছনের দিকে জানালার সঙ্গে হাতকড়া লাগানো, নগ্ন অবস্থায়, তাঁর অন্তর্বাস তাঁর মাথা ও মুখমণ্ডলে রাখা। তাকে যীশু খ্রিস্টের মতো লাগছিল। শুরুতে আমার হাসি পায়, তাই ক্যামেরা দিয়ে আমি তাঁর ছবি তুললাম। আমি ভাবলাম, এটা হাস্যকর। (কিন্তু) তারপর সেটি আমাকে (হৃদয়ে) আঘাত করল, এটা এক প্রকার নির্যাতন। তুমি এটা করতে পারো না। তারা (নির্যাতনকারীরা) তাঁর (ট্যাক্সি ড্রাইভার) সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। শুরুতে সে বলছিল, 'আমি শুধুই একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার, আমি কিছুই করিনি।' সে দাবি করছিল সে কখনোই মার্কিন সৈন্যদের আহত করার চেষ্টা করেনি। তারপর সে চুপ করল। তাকে রেখে তারা সেল #০৪ এ গেল। (সেল #০৪-এর) এই ব্যক্তি এতটাই আহত ছিল যে, যখন তারা সেলের গরাদ দিয়ে তাঁর পা ধরল, সে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে কাঁদতে আরম্ভ করল। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা (দুআ) করার পর সে কয়েক সেকেন্ড পর সারারাত একটানা ক্ষুদ্র 'আহ, আহ' গোঙানির শব্দ করছিল। তারা এ (ব্যক্তি)কে কী করেছে আমার জানা নেই। প্রথম (ড্রাইভার) লোকটা দেড়-দুই ঘণ্টা হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় ছিল। তারপর সে আল্লাহর নাম নিয়ে আর্তনাদ করছিল। তাই তারা ফিরে গিয়ে তাকে উভয় দিকের বিছানার উঁচু পাটাতনের সঙ্গে হাতকড়া পরাল, সে তখন (উভয় বিছানার) পার্শ্বদেশে দাঁড়াল। এক ঘণ্টার কিছু সময় পর সে আবারও আল্লাহর নাম বলে বলে আর্তনাদ শুরু করল। খুব বেশি মানুষ জানে না এখানে কী পরিমাণ অনাচার হচ্ছে। আমি জানি না এসব আমি মানসিকভাবে নিতে পারব কি না। যদি আমি তাঁদের স্থানে থাকতাম তাহলে কী হতো! কেলী, এটা ভয়ংকর, তুমি জানো! আমি আমার চিন্তাভাবনায় কতটা হতবিহ্বল। আমার উভয়সত্তা-ই মনে করে এটা ভুল। আমি ভাবতাম আমি সবকিছু সামলাতে পারব। (কিন্তু), আমি ভুল ছিলাম।
সাবরিনা (Gourevitch & Morris, 2008)

জুন ২০০৩, আবু গারিবে নির্যাতন নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে। নভেম্বরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-ও এ ব্যাপারে রিপোর্ট পাবলিশ করে। ১৩ জানুয়ারি, ২০০৪, মিলিটারি পুলিশ বিগ্রেড-এর স্পেশালিষ্ট ডার্বি³ রিপোর্ট প্রদান করেন যে, আবু গারিবে বন্দি নির্যাতন হচ্ছে। নির্যাতন শুরু হবার এতগুলো মাস পর আর্মির সিআইডি⁴ তদন্ত শুরু করে। কিন্তু, হাই কমান্ড তখন তদন্তে হস্তক্ষেপ করে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল রিকার্ডো সানচেজ সুপারিশ করে, যেন ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এ ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব নেয় (Doyle, 2010)। ফেব্রুয়ারি ২০০৪, জেনারেল McKiernan মেজর জেনারেল অ্যান্টোনিও তাগুবা⁵-কে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করেন। তাঁকে তদন্তের যে আদেশপত্র দেওয়া হয়, সেখানে তাঁকে শুধু নিম্ন পদমর্যাদার সৈন্যদের তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর কারণ ছিল একেবারেই স্পষ্ট—নির্যাতনের আদেশ আসলে এসেছিল সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে। ৩ মার্চ, ২০০৪, তাগুবা টিম McKiernan-এর কাছে প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করে। ওই রিপোর্টে ছয়জন ননকমিশনড অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। সিবিএস-এর ৬০ Minutes II প্রোগ্রামে নির্যাতনের ঘটনাপ্রবাহ সম্প্রচারিত হওয়ার কথা ছিল, এয়ারফোর্স জেনারেল মায়ার্স⁶—জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ-এর প্রধান এবং অ্যামেরিকার তৎকালীন সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার—সিবিএসকে অনুরোধ করেন আবু গারিবের ওপর তৈরিকৃত তাঁদের রিপোর্টটির প্রচার পিছিয়ে দেওয়ার জন্য। সিবিএস তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে। ১ মে, সিমোর হার্শ, তাগুবা রিপোর্ট নিয়ে প্রথম অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীকালে এর ওপর আরও দুটি প্রতিবেদন লিখেন।

দায়িত্বশীলদের নিকট এই নির্যাতনের জবাব চাইল মার্কিন কংগ্রেস। ৭ মে ও ১১ মে, রামম্ফেল্ড ক্যাপিটল হিল-এ কংগ্রেসের সঙ্গে সংলাপে যোগদান করে। তিনি সিনেটরদের বললেন, 'কঠোর' তদন্ত পদ্ধতিগুলো তারা অনুমোদন করেছেন, এবং পেন্টাগনের আইনজীবীরা নিশ্চিত করেছে যে, সেগুলো জেনেভা কনভেনশনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ! প্রেসিডেন্ট বুশ নির্যাতনের ঘটনাকে উড়িয়ে দিতে চাইলেও পরবর্তীকালে রামম্ফেল্ডকে সিনেট আর্মড সার্ভিসেসের সামনে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হয় (Doyle, 2010)।

আবু গারিবে কী ধরনের নির্যাতন ঘটেছিল, যার কারণে পুরো পৃথিবীতে অ্যামেরিকার সমালোচনা শুরু হয়? তাগুবা রিপোর্ট অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০০৩-এর মধ্যবর্তী সময়ে আবু গারিবের অনেক বন্দির ওপর অবাধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। নির্যাতনের অভিযোগ সাক্ষীদের বিস্তারিত বিবৃতি আর অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ফটোগ্রাফি ও ভিডিও দ্বারা প্রমাণিতও হয়। তাগুবা টিম নিম্নোক্ত অপরাধগুলোর প্রমাণ খুঁজে পায় :
* ঘুষি, থাপ্পড়, লাথি; নগ্ন পায়ের ওপর লাফানো
* নগ্ন পুরুষ ও মহিলা বন্দির (Detainee) ছবি তোলা ও ভিডিও করা
* বন্দিদের ছবি তোলার জন্য তাদেরকে নানা রকম অশ্লীল যৌন পজিশনে সাজানো; তারপর ছবি তোলা
* বন্দিদের কাপড় খুলতে বাধ্য করা এবং টানা বহুদিন এভাবে কাপড় ছাড়া থাকতে বাধ্য করা
* বহু পুরুষ বন্দিদেরকে নারীদের অন্তর্বাস পরতে বাধ্য করা
* পুরুষ বন্দিদের ছবি তোলা ও ভিডিও করার সময়ে হস্তমৈথুনে বাধ্য করা
* নগ্ন পুরুষ বন্দিদের স্তূপের মতো জড়ো করে তাদের ওপর লাফানো
* একজন নগ্ন পুরুষ বন্দিকে বক্সের ওপর দাঁড়িয়ে করিয়ে মাথায় বালুর বস্তা পরিয়ে, তাঁর হাত ও পায়ের আঙুলে, এবং পুরুষাঙ্গে তাঁর জড়িয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার ভান করা
* নগ্ন বন্দির গলায় কুকুরের চেইন বেঁধে তাকে নিয়ে নারী সেনার ছবির জন্য পোজ দেওয়া
* নারী বন্দিকে জোরপূর্বক ধর্ষণ
* কুকুর দিয়ে ভয় দেখানো, 'অন্তত' একজনকে কুকুর দিয়ে কামডিয়ে আহত করা
* ইরাকি বন্দির মৃতদেহের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ছবি তোলা (Taguba, ২০০৪)।

এসকল নির্যাতন ছাড়াও তাগুবা অতিরিক্ত কিছু নির্ভরযোগ্য প্রমাণভিত্তিক নিপীড়নের ব্যাপারে রিপোর্ট করেন:
* কেমিক্যাল লাইট ভেঙে বন্দির গায়ের ওপর ফসফরিক লিকুইড ঢেলে দেওয়া
* নগ্ন বন্দিদের ওপর ঠাণ্ডা পানি ঢালা
* বন্দিদের চেয়ার ও ক্রম-হ্যান্ডল দিয়ে প্রহার
* পুরুষ বন্দিকে ধর্ষণের হুমকি
* বন্দির মলদ্বার দিয়ে কেমিক্যাল লাইট এবং (সম্ভবত) ক্রম স্টিক প্রবেশ করানো (Taguba, 2004)।

আবু গারিবের বন্দি নং-১৯৪৪৬-এর সাথে তাগুবা টিমের প্রশ্নোত্তর পর্বটি ছিল এরকম—
প্র : আপনার সঙ্গে যখন গার্ডরা এভাবে আচরণ করছিল তখন আপনি কেমন অনুভব করতেন?
উ : আমি নিজেকে মেরে ফেলতে চাইতাম, কিন্তু আমার কাছে এটা করার কোনো রাস্তা ছিল না।
প্র : গার্ডরা কি আপনাদের হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে বাধ্য করেছিল?
উ: হ্যাঁ, তারা আমাদের এসব করতে বাধ্য করত।
প্র : আপনারা যখন হামাগুড়ি দিতেন তখন গার্ডরা কী করত?
উ: তারা আমাদের পিঠের ওপর চড়ে বসত, যেভাবে কোনো পশুর ওপর চড়ে (Taylor, 1990/2003)।

সাঈদ আল শেইখাস⁷ নামক এক সিরিয়ান বন্দি তাগুবাকে জানায়, অন্যান্য নির্যাতনের পাশাপাশি তাকে শূকরের গোশত খেতেও বাধ্য করা হয়। অ্যামেরিকানরা তাকে হাতকড়া পরিয়ে বিছানায় ঝুলাত। তারপর তাকে বলত ইসলামকে অভিশাপ (গালি) দিতে। সেনারা তাঁর ভাঙা পায়ে আঘাত করতে শুরু করলে সে ইসলামকে অভিশাপ দিতে বাধ্য হয় (Otterman, 2007)।

২০১৪-তে ইরাকের আবু গারিব ও অন্যান্য কারাগারে তোলা অপ্রকাশিত ২,১০০টি ছবি ওবামা প্রশাসন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ACLU-এর স্টাফ অ্যাটর্নি অ্যালেক্স বলেন, 'এ ছবিগুলো কমপক্ষে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কারাগার থেকে এসেছে। আমরা (সাধারণ মানুষ) মনে করি, আবু গারিব (হয়তো) বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল—এই বিশ্বাসকে এটি (ছবিগুলো) চিরতরে মিটিয়ে দেবে।' তাঁর ভাষায়, 'এই নির্যাতন ছিল অবশ্যই অফিশিয়াল পলিসি। বিভিন্ন কারাগারে বিভিন্ন কমান্ডারের অধীনে এই (ঘটনাগুলো) ছিল ব্যাপক' (Walker, 2014)।

মামদু হাবিব⁸, ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে মিশরে জন্ম নেওয়া এক অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে সিডনিতে স্থানান্তরিত হয়ে সেখানকার নাগরিক মাহাকে বিয়ে করা হাবিব পরবর্তী বছরগুলোতে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। ধর্মীয় বিধিবিধান মানা শুরু করেন এবং বিশ্বে মুসলিমদের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন। সংক্ষেপে তাঁর সাথে যা ঘটে তা হলো, ১৯৯১ সালে, অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন বা এএসআইও সিডনির মুসলিম সম্প্রদায়ের 'ভেতরের' একজন লোক রাখতে চায়, যে তাঁদের মাঝে গুপ্তচরবৃত্তি করবে। হাবিব তাদের জানায়, সে এতে আগ্রহী নয়। ১৯৯৩, এএসআইও তাঁর বাসায় এসে তাঁদের বিজনেস কার্ড রেখে যায়। এবারে তারা হাবিবের বাবা-মা'কে মিশর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার অফার দেয়, এবং হাবিবকে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণে পাঠাবার প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু এবারও হাবিব তাঁদের অফার খারিজ করে দেয়। পরবর্তীকালে সেখানকার ডিফেন্স হাউজিং অথরিটির সঙ্গে তাঁর তিন বছরের লাভজনক চুক্তি রহস্যজনকভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়। হাবিবের বিশ্বাস, তাতে এএসআইও-এর হাত ছিল। অতঃপর, হাবিবের ব্যবসা শীঘ্রই দেউলিয়া হয়ে যায় (Otterman, 2007)।

হাবিব সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তাঁর পরিবারকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত করবেন। ২৯ জুলাই ২০০১, হাবিব পাকিস্তানে পৌঁছায়। 'আমি সেখানকার পরিস্থিতি দেখতে চাচ্ছিলাম', হাবিব বলে। 'আর বাচ্চাদের জন্য ভালো ধর্মীয় স্কুল খুঁজছিলাম।' ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১, হাবিব যখন ৯/১১-এর ঘটনা জানতে পারে, সে তৎক্ষণাৎ তাঁর স্ত্রী মাহাকে কল করল। সিডনিতে তখন রাত ১১.৩০, তাই ক্লান্ত মাহা জানায়, সে পরে এ বিষয়ে কথা বলবে। কিন্তু, পরের বার কথা বলার পূর্বেই এএসআইও তাঁদের বাসায় হানা দেয়। হাবিব তাঁর স্ত্রীকে আতঙ্কিত হতে মানা করে, কারণ তাঁদের লুকানোর কিছুই ছিল না। এর পরের তিন বছর হাবিব তাঁর স্ত্রীকে আর দেখতে পায়নি।

আরেকজন অস্ট্রেলিয়ান ডেভিড হিকস⁹, ধর্মান্তরিত মুসলিম, যিনি তালিবানদের সঙ্গে ট্রেনিং-এ অংশগ্রহণ করেছিলেন। অ্যামেরিকার অবৈধ হামলাকে সে সমর্থন দিতে অস্বীকার করে। তাই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাওয়ার জন্য আফগানিস্তানে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ সংগ্রহ করতে গেলে আফগান নর্দার্ন অ্যালায়েন্স তাকে ধরে অ্যামেরিকার হাতে তুলে দেয়। হিকসকে প্রথমে আরব সাগরে নোঙর করা USS Peleliu নামক মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে নেওয়া হয়। এখান থেকে তাকে নিকটবর্তী সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হয় দশ ঘণ্টা পেটানোর জন্য। সেখানে তাকে অনেক ধরনের অচেনা ঔষধ জোরপূর্বক খাইয়ে দেওয়া হয়। অন্যান্য বন্দিদের ওপর গোয়েন্দাগিরির দায়িত্ব নিলে সৈন্যরা তাকে ১৫ মিনিটের জন্য পতিতার সার্ভিস অফার করে, সে ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেয় (Otterman, 2007)।

হাবিবকে গ্রেফতারের পর ১৫ দিন তাকে পাকিস্তানের কারাগারে নির্যাতন করা হয়। তারপর তাকে অ্যামেরিকান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে প্রথমেই তাঁর দেহ থেকে কাপড় কেটে ফেলে দেওয়া হলো। অতঃপর কিছু একটা তাঁর মলদ্বারে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হলো; তারপর জাম্পস্যুট পরিয়ে অন্য একটা ফ্লাইটে তাকে তুলে দেওয়া হলো। হাবিব এসে পৌঁছুল কায়রোতে। সেখানে ওমর সুলায়মান, মিশরীয় সিকিউরিটি বাহিনীর প্রধান তাকে বলল—স্বীকারোক্তি দেওয়া প্রতি 'সন্ত্রাসী'কে অ্যামেরিকার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মিশর $১০ মিলিয়ন করে অর্থ পায়। ওমর সুলাইমান তাকে একটি প্রস্তাব দেয়। হাবিব স্মৃতিচারণ করে, 'আমি যদি নিজেকে টেরোরিস্ট হিসেবে স্বীকার করি, তাহলে সে তাঁর প্রাপ্ত অর্থের $৬ মিলিয়ন রেখে দিবে। তারপর সে আমাকে নতুন পরিচয় দিয়ে (বাকি $৪ মিলিয়ন) অর্থগুলো আমাকে দিবে।' সম্ভবত, সুলাইমান হাবিবের পরিবর্তে অন্য কাউকে ধরিয়ে দিত। হাবিব সেই প্রস্তাবটিও নাকচ করে দেয় (Otterman, 2007)।

পরের মাস জুড়ে তাকে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। মিশরে অ্যামেরিকানরা উপস্থিত থাকলেও টর্চারের দায়িত্বে ছিল মিশরীয়রা। মে ২০০২, হাবিবকে মার্কিনীরা নিজেদের দায়িত্বে নিয়ে নেয়। প্রথমে তাকে নেওয়া হলো কুখ্যাত বাগরাম কারাগারে। সেখানকার নির্যাতন পদ্ধতি ছিল 'অ্যামেরিকান'। এর দশদিন পর তাকে নেওয়া হলো কান্দাহারে। সেখানে 'সাধারণ' নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হলো 'যৌন' নিপীড়ন। হাবিব বলেন, 'তারা আমাদের একজনের ওপর অন্যজনকে স্থাপন করে, যেমনটা আপনারা আবু গারিবে দেখেছেন, তারপর তারা ছবি তুলত। তারা এটা করা উপভোগ করত, কিন্তু তাদেরকে এইরকমটি করতে (ঊর্ধ্বতন পক্ষ থেকে) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।' এরপর তাকে নেওয়া হলো গুয়ান্তানামোতে। সেখানে তাকে সরাসরি আইসোলেশনে বন্দি করা হলো। হিকসের মতো তাকেও ইচ্ছার বিরুদ্ধে ড্রাগস দেওয়া হয়। প্রতি দু সপ্তাহে তাকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হতো। 'ড্রাগস দেওয়ার পর আমি (আজব) শব্দ শুনতাম, (অদ্ভুত) বিষয় দেখতাম', হাবিব বলেন। এক সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দিবেন। কারণ, তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল খাবারেও ড্রাগ মেশানো। খাওয়া বন্ধ করার পর তিনি আগের চেয়ে ভালো অনুভব করেন। কিন্তু তারপর তারা তাকে জোর করে খাওয়ানো শুরু করল। হাবিব স্মৃতিচারণ করে, তারা যখন তাঁর নাকে কোনো অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই টিউব প্রবেশ করায়, তখন তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। হাবিবের সামনে গার্ডরা নিয়মিত কুরআনকে অবমাননা করত। তারা কুরআনকে দেওয়ালে ছুড়ে মারত, পাতা ধরে ধরে ছিঁড়ে ফেলত। একজন নারী অফিসার তাঁর গায়ে লাল বর্ণের তরল ছুড়ে তাকে বলে, এগুলো মাসিকের রক্ত (Otterman, 2007)।

১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউএস মিলিটারি SERE প্রোগ্রামের সূচনা করে; প্রোগ্রামটি মূলত মার্কিন সেনাদের নির্যাতন প্রতিরোধী করে তোলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। তাদেরকে হুড পরিয়ে, পানিতে ডুবিয়ে মৃতপ্রায় পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা দেওয়া হতো, যন্ত্রণাদায়ক ও যৌন-অশ্লীল পজিশনে স্থির রাখা হতো। ধর্ম ও বর্ণকে টার্গেট করে নিপীড়ন চালানো হতো। ওই সময়টাতে সিআইএ মন নিয়ন্ত্রণের ড্রাগ আবিষ্কারের প্রোজেক্ট পরিচালনা করে, যদিও তারা তাঁদের প্রত্যাশিত ফল পেতে ব্যর্থ হয় (Otterman, 2007)।¹⁰ অর্থাৎ, সিস্টেমেটিক নির্যাতনের সংস্কৃতি অ্যামেরিকায় আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে আবু গারিবের সেনাদেরকে যখন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়, তখন তারা এই কথা বলে নিজেদের বাঁচাতে চেয়েছিল যে, তাঁদের কার্যক্রম অ্যামেরিকান সৈন্যদের ট্রেনিং-এ সহ্য করা কাজগুলো থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না।

মাহির¹¹, সিরিয়ান বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক। তিউনিসে পরিবারের সঙ্গে অবকাশ যাপনের পর সে বাসায় ফিরে আসছিল। তাঁর পাঁচ বছর আগের এক বন্ধু Nazih Almaki-এর ভাইকে সিআইএ, আল কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে গ্রেফতার করতে চাচ্ছিল। ফেরার পথে নিউইয়র্কে কেনেডি বিমানবন্দরে মাহিরকে পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। তারপর সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় সিরিয়া। সিরিয়ায় দশ মাসের অধিক সময় একটি এক মিটারেরও কম চওড়া ও দু মিটার গভীর বেসমেন্টে তাকে বন্দি করে রাখা হয়। সেখান থেকে মাহির অন্য বন্দিদের নির্যাতনের শব্দ শুনতে পেত, বন্দিরা সেখানে নির্যাতনের যন্ত্রণায় চিৎকার করত অবর্ণনীয় কণ্ঠে। পরবর্তীকালে তাঁর স্ত্রী তাকে বাঁচাতে পাবলিক ক্যাম্পেইন করে, সৌভাগ্যবশত সেগুলো সফলও হয়। অতঃপর তারা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীকালে হোয়াইট হাউস এবং জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের ফাঁস হওয়া মেমোতে দেখা যায়, সিআইএ-র প্রধান চিন্তিত ছিল যে, নির্যাতনমূলক পদ্ধতিগুলো ওয়ার ক্রাইম অ্যাক্ট (WCA) ১৯৯৬-এর অধীনে অভিযুক্ত করা হয় কি না। কেননা, এই আইনের মাধ্যমেই মার্কিন ল জেনেভা কনভেনশনের সঙ্গে সংযুক্ত। ডব্লিউসিএ জেনেভার কমন আর্টিকেল #৩ লঙ্ঘন নিষিদ্ধ করে। চিনী হোয়াইট হাউজ আইনজীবী ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অ্যাটর্নিদের চাপ প্রয়োগ করেন WCA-কে ফাঁকি দেওয়ার পথ খুঁজে বের করতে। তারা তাকে সহজ সমাধান দেয়, জিপিডব্লিউ¹³ থেকে বের হয়ে আসা, যেখানে যুদ্ধবন্দিদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আলবার্তো গঞ্জালেসের মতে, জিপিডব্লিউ থেকে বের হয়ে গেলে ডব্লিউসিএ-র অধীনে দেশীয় আইনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে (Greenberg & Dratel, 2005, p. 119)।

অথচ জেনেভা কনভেনশন সকল সময়ে সব ধরনের লড়াইয়ে সকল মানুষকে অন্তর্ভুক্ত রাখে। কনভেনশনের চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অর্গানাইজেশন আইসিআরসি¹⁴ জানায় যে— 'শত্রুর হাতে বন্দি প্রতিটি ব্যক্তির অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো 'স্ট্যাটাস নির্ধারিত থাকতে হবে। শত্রুর হাতে থাকা কোনো ব্যক্তি আইনের (আওতার) বাইরে থাকতে পারবে না' (Roberts, 2004)। আইসিআরসি আরও জানায় যে, গ্রেফতারকৃত যোদ্ধা হয় একজন যুদ্ধবন্দি বা পিওডব্লিউ, যা তৃতীয় কনভেনশন (জিপিডব্লিউ)-এ উল্লেখ আছে; অথবা একজন সিভিলিয়ান, যা চতুর্থ কনভেনশন (GC) -এ উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যবর্তী কোনো স্ট্যাটাস বা অবস্থান নেই (Roberts, 2004)। কোনো ব্যক্তির স্ট্যাটাস নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলেও জিপিডব্লিউ-এর Article #5-এর মতে সে উক্ত কনভেনশনের সুরক্ষা লাভ করবে, যতক্ষণ না কোনো নির্ভরযোগ্য ট্রাইব্যুনাল তাঁর স্ট্যাটাস নির্ধারণ করে (ICRC, n.d.)।

আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে তারা জাস্ট 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' শব্দদ্বয় ব্যবহার করে দাবি করে, তালিবানরা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর শর্ত 'সম্পন্ন' করতে অক্ষম। জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সিল (OLC) বিবৃতি দেয়, তালিবান ও আল কায়েদা যোদ্ধারা জিপিডব্লিউ-এর সংজ্ঞায়িত যুদ্ধবন্দী নয়। বরং তারা 'অস্বাভাবিক শত্রুগণ¹⁵, যারা জানাশোনা সকল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে (Otterman, 2007)। অথচ জেনেভা কনভেনশনের কমন আর্টিকেল #১ অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী সকলে সকল পরিস্থিতিতে কনভেনশনকে শ্রদ্ধা করতে দায়বদ্ধ। তাই, কমন আর্টিকেল #৩ তালিবান, আল কায়েদা—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।

সিআইএর নির্যাতনগুলোর মাঝে অন্যতম পাশবিক দুটি পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপ— ১. বন্দিকে নগ্ন অবস্থায় ৫০° ফারেনহাইট (১০° সেলসিয়াস) একটি কক্ষে দাঁড় করিয়ে রেখে তাকে ঠাণ্ডা পানিতে ভেজানো হতো। ২. ওয়াটার বোর্ডিং-এ বন্দিকে হেলানো এক তক্তা বা বোর্ডে বাঁধা হয়, যেখানে তাঁর পা থেকে মাথা সামান্য নিচুতে অবস্থান করে। ওই অবস্থায় তাঁর মুখে সেলোফেন বেঁধে তাকে পানিতে ডুবানো হতো। এমন অবস্থার সৃষ্টি করা হতো যে, বন্দির মনে হতো তাকে ওই অবস্থায় চুবিয়ে মেরে ফেলা হবে (Paust, 2007, p. 28)।

পরবর্তীকালে জানা যায়, আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই ২০০১ সালে বুশ সিআইএ-র নির্যাতন পদ্ধতিগুলো অনুমোদন করেন। ২৮ মার্চ ২০০২, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আবু জুবায়দাকে গ্রেফতার করে অ্যামেরিকার হাতে তুলে দেয়। পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় থাইল্যান্ডে। সেখান থেকে নতুন তৈরিকৃত একটি সিআইএ ব্ল্যাক সাইটে। আবু জুবায়দা যখন নির্যাতনের মুখেও তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত 'সহায়তা' করতে অস্বীকার করে, তখন সিআইএ কর্মকর্তারা ওএলসি আইনজীবী Yoo-এর কাছে যায় আরও নির্মম পদ্ধতি অনুমোদনের আশায় (Barry, 2004)। সিআইএ-র ব্ল্যাক সাইটের নির্যাতন ছিল উপরিউক্ত নির্যাতনগুলোর চাইতেও নির্মম। সেখানকার আসল ইতিহাসও তেমন প্রকাশিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, নভেম্বর ২০০২-এ একজন সিআইএ এজেন্ট ব্ল্যাক সাইটে কর্মরত আফগান গার্ডদের বলে কোনো এক আফগান বন্দির সকল কাপড় সরিয়ে তাকে বেঁধে সারারাত বাইরে কংক্রিটের ফ্লোরে ফেলে রাখতে। ওইদিন রাতেই ওই ব্যক্তি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় (Hypothermia) মারা গেলে পরের দিন তাকে গোপন কারাগারের পাশে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। এক রাতেই জলজ্যান্ত একটা লোক পৃথিবীর জমিন থেকে তাঁর সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নিয়ে উধাও হয়ে গেল। সেখানে যেহেতু নির্যাতন ছিল লাগামহীন, কেউই সেই এজেন্টকে অভিযুক্ত করেনি। পরে অবশ্য খুন করার পুরস্কারস্বরূপ তাকে প্রোমোশন দেওয়া হয় (Otterman, 2007)।

গুয়ান্তানামোর একজন বন্দি শফিক রাসূলের মতে, তাঁদের টয়লেট ব্যবহার করার দরকার হলে প্রথমে গার্ডের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করতে হতো। প্রায়ই গার্ডরা তাদেরকে টয়লেটে নিয়ে যেতে অস্বীকার করত। ফলে বাধ্য হয়ে তারা তাঁদের কক্ষেই ধোঁয়ামোছার জন্য দেওয়া বালতিকে টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করত। সেখানে থাকা অনেক বন্দিই নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেকেই আমাশয় বা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ছিল। ফলে গার্ডের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী অপেক্ষা করা তাঁদের জন্য সম্ভব হতো না। শফিক বলেন, গার্ডরা জানত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা মুসলিমদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা মুসলিমদের এইরকম সংকটাপন্ন দেখে বিকৃত আনন্দ লাভ করত। আর গার্ডরা যদি তাঁদের টয়লেটে নিতে রাজি হতো, তাহলে প্রথমে বন্দিকে বেড়ি পরানো হতো, তারপর তাকে ডিটেনশন ব্লকের বাইরে পোর্টেবল টয়লেটে নেওয়া হতো। সেখানে তাঁদের বেড়ি পরা অবস্থায় টয়লেট ব্যবহার করতে হতো দরজা খোলা থাকা অবস্থায়, গার্ডরা সরাসরি তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় (Otterman, 2007)। প্রগতিশীল পৃথিবীর স্বাধীনতা আর প্রগতিশীল মানবাধিকারের কি অপূর্ব এক দৃষ্টান্ত!

'Tipton Three' হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই তিন বন্দী—শফিক রাসূল, আসিফ ইকবাল এবং রুহেল আহমেদকে মূলত নর্দার্ন অ্যালায়েন্স আফগান রিফিউজিদের মাঝে ত্রাণ বিতরণরত অবস্থায় গ্রেফতার করে। এরপর অ্যামেরিকানদের কাছে হস্তান্তর করে। এর পিছনে আর্থিক কারণও রয়েছে। আফগানিস্তানে অ্যামেরিকার ফেলা প্রোপাগান্ডা লিফলেটগুলোর মধ্যে একটিতে সম্মুখ পৃষ্ঠায় ছাপানো সাধারণ আফগান শহর ও হাস্যোজ্জ্বল আফগান প্রবীণের ছবির নিচে লেখা, 'তোমার স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থ-ক্ষমতার অধিকারী হও। আফগানিস্তানকে খুনি ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করতে (তালিবান-বিরোধী শক্তিকে) সহায়তা করো।' পেছনের পৃষ্ঠায় লেখা, 'আল কায়েদা ও তালিবান খুনিদের ধরতে তালিবান-বিরোধী শক্তিকে সাহায্য করে তুমি মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারো' (Otterman, 2007)।

এছাড়াও সিনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্সের এক রিপোর্ট অনুসারে, কমপক্ষে পাঁচজন বন্দির মলদ্বার¹⁶ দিয়ে খাদ্য বা পানীয় প্রবেশ করানোর মতো নিকৃষ্টতম পাশবিক আচরণ করা হয় (2014)। উইঘুরদের ওপর চীনের নির্যাতন ছাড়া সম্ভবত বিশ্বের আর কোথাও কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের এতটা পশুর পর্যায়ে নামার উদাহরণ নেই। আরও দুঃখের বিষয়, খোদ সিআইএরই ২০০২ সালের এক জরিপের ফল অনুযায়ী, গুয়ান্তানামোর অর্ধেকের বেশি বন্দি কোনোভাবেই অ্যামেরিকার সমস্যার সঙ্গে জড়িত নন। অন্যদিকে, এক ইউরোপিয়ান অনুসন্ধানী দলের ২০০৬-এর জরিপ অনুযায়ী মাত্র ৩০-৪০ জন 'প্রকৃত সন্ত্রাসী' সেখানে বন্দি, বাকি সবাই মানবাধিকারের এক্সপেরিমেন্টাল গিনিপিগ। এর চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ৮৬% গুয়ান্তানামোর বন্দি অ্যামেরিকান বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হননি, বরং পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কিংবা নর্দার্ন অ্যালায়েন্স জেনারেলরা ডলারের আশায় তাদেরকে অ্যামেরিকার হাতে হস্তান্তর করে (Otterman, 2007)।

গুয়ান্তানামো বে কারাগার থেকে বের হয়ে আসা আফগান নাগরিকরা ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই অভিযোগ করে এসেছে যে, তাদেরকে অপমানিত করতে অ্যামেরিকান সৈন্যরা মহাপবিত্র কুরআনকে টয়লেটে ছুড়ে ফেলত। বন্দীদের অনেকেই ছিল কৃষক, ছাত্র বা ট্যাক্সি ড্রাইভার। কোনো কারণ ছাড়াই তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৯ বছর বয়সী এহসানউল্লাহ বলেন, মার্কিন বাহিনী কান্দাহারে জেরা করার সময় তাকে প্রচণ্ড প্রহার করত। টয়লেটে কুরআন ফেলে দিয়ে তারা তাকে মানসিক নির্যাতন করত। এহসানউল্লাহর ভাষায়, সে সময়টা ছিল খুবই মর্মান্তিক, 'আমরা প্রচণ্ডভাবে কাঁদছিলাম আর চিৎকার করে বলছিলাম, দয়া করে পবিত্র কুরআনের সঙ্গে এইরকম করো না।' কিন্তু, 'বধির'কে কি আর কথা শোনানো যায়? মীর্জা খান নামক আরেক বন্দিকে কান্দাহারে নির্যাতন করার সময় অ্যামেরিকান সৈন্য কুরআন মাটিতে ছুড়ে ফেলে কুরআনের ওপর আসন গেড়ে বসে (Kaufman & Witt, 2003)।

মার্কিন সেনাদের কাছে কুরআন অবমাননা ছিল খুবই 'স্বাভাবিক' বিষয়। আসিফ ইকবালের মতে, 'তারা (কখনো কখনো) কুরআনকে লাথি মারত, সেটিকে টয়লেটে ছুড়ে মারত, আর সচরাচর অবমাননা করত।' পেন্টাগন শুরুতে কুরআন অবমাননার কথা অস্বীকার করলেও পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, মার্কিন সেনারা 'অন্তত' পাঁচবার কুরআন অবমাননা করেছে। এর মধ্যে একবার কুরআনে অশ্লীল দুটি শব্দ লেখা হয়; একজন সেনা কুরআনকে লাথি মারে, আরেকবার একজন গার্ডের মূত্র কুরআনে ছিটকে পড়ে। আসল বাস্তবতা হলো, তারা নিয়মিতই কুরআনের পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দিত। এ নিকৃষ্ট কাজ দেখতে বাধ্য হওয়া ব্যক্তির হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, তাঁর প্রাণে অনুভূত অনুশোচনা, সৃষ্ট তীব্র তিক্ততার পরিমাণ পৃথিবীর কারো পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয় (Otterman, 2007)।

এ তো গেল ইসলাম অবমাননা আর পুরুষদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা। উম্মাহর সম্মানিতা নারীদের সাথে তারা যেসব অসভ্য আচরণ করেছে, তাঁর ভার যদি কোনো পাহাড়ের ওপর ন্যস্ত করা হতো, সে পাহাড়ও ভার সইতে না পেরে ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। ইন্টারন্যাশনাল অকুপেশন ওয়াচ সেন্টার নামক এক এনজিও সাবেক এক বন্দিনীর জবানবন্দি থেকে জানায়, তিনি বন্দি থাকাকালীন তাঁর সেলের এক নারীকে এক দিনে কমপক্ষে সতেরো বার ধর্ষণ করা হয়। পরে ওই বন্দিনী টানা দুই দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। ইরাক ভিত্তিক অন্য আরেকটি সংগঠন ইউনিয়ন অব ডিটেইনীস অ্যান্ড প্রিজনার্স জানায়, আবু গারিবে চার সন্তানের জননী এক নারীকে মার্কিন সেনারা তাঁর স্বামীর সামনে ধর্ষণ করে; পরে ওই নারী লজ্জায় অপমানে আত্মহত্যা করে। সংগঠনটির প্রধান দাহাম বলেন, মহিলাটির বোন হতভাগা সেই নারীর দুর্ভাগ্যের ইতিহাস তাকে খুলে বলেছেন। ভদ্রমহিলার স্বামীকে জেলখানার বারের সঙ্গে আটকে রাখা হয়, অতঃপর একজন মার্কিন সেনা তাঁর চুল টেনে ধরে তাকে তাঁর স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে; এবং তাঁর বস্ত্র হরণ করে তাকে সেখানেই ধর্ষণ করে। সেখানকার সাবেক বন্দি আমির জানায়, 'তাদেরকে (নারীদেরকে) আমাদের তাঁবুর সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে হতো, আর তারা চিৎকার করে বলত, আমাদের মেরে ফেলার একটা উপায় খোঁজো' (SBS News, 2013)।

মেজর তাগুবা তাঁর রিপোর্টে আবু গারিবে বন্দি নির্যাতন ও ধর্ষণের কথা উল্লেখ করলে ও বন্দি অপারেশন-এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্যারি জনসন দাবি করে, 'বন্দি সকল নারীদের সঙ্গে মানবতাপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে।' কী সহজে হয়ে গেল বলা, কাঁপল না গলা। চলুন দেখা যাক, ওয়েস্টার্ন মানবতাবাদীরা মুসলিম নারীদের সঙ্গে আর কী কী 'সভ্য' আর 'প্রগতিশীল' আচরণ করেছে। ২০০৩-এ এক নারী বন্দি আবু গারিবের বাইরে তাঁদের দুর্দশার কথা নোটের মাধ্যমে সবাইকে জানাতে সক্ষম হয়। দুর্ভাগা সেই নারী—আজ যাকে সকলে 'নূর' নামে জানে—কারাগারের বাইরের অসহায় পুরুষদের জানায়, মার্কিন গার্ডরা ভেতরে তাঁদের মুসলিমাহ বোনদের ধর্ষণ করছে, যাদের মধ্যে অনেকেই গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। বেগানা কাফিররা তাদেরকে পুরুষদের সামনে নগ্ন হতে বাধ্য করে। আমাল—বন্দি নারীদের জন্য কাজ করা সাতজন নারী আইনজীবীর একজন—জানায় যে, এ ঘটনা শুধু আবু গারিবেই হচ্ছে না, বরং সমগ্র ইরাক জুড়েই ঘটছে। তিনি At Kharkh নামক এক মার্কিন মিলিটারি বেইসে গেলে এক নারী কান্নায় ভেঙে পড়ে তাকে জানায়, বহু অ্যামেরিকান সৈন্য তাকে ধর্ষণ করেছে। মহিলাটি তাকে অনুরোধ করে বলে, 'আমাদের কন্যা, স্বামী আছে। আল্লাহর দোহাই লাগে, কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলবেন না।' এছাড়াও সত্তরোর্ধ্ব এক নারীকে অ্যামেরিকান ও ব্রিটিশ সৈন্যরা গ্রেফতার করে তাকে গাধার সাজে সাজিয়ে তাঁর ওপর সৈন্যরা চড়ে বসে। ব্রিটিশ লেবার এমপি Ann Clwyd তদন্ত করে এ ঘটনার সত্যতা খুঁজে পান (Harding, 2004)।

নির্যাতনের এই লোমহর্ষক ঘটনাগুলো ফাঁস হবার পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দেও জানা যায়, ইরাকী মুসলিম নারীদের গ্রেফতার করে পতিতাবৃত্তি, খুন আর সন্ত্রাসের মিথ্যা অভিযোগে বন্দি করে তাদেরকে ওয়েস্টার্ন স্টাইলে পাশবিক নির্যাতন করা হচ্ছে (Tarabay, 2006)। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্টে জানা যায়, ইরাকে অ্যামেরিকার পুতুল সরকার হাজার হাজার নারীকে অবৈধভাবে জেলে বন্দি করে রেখেছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই নেই। নির্যাতিতাদের মধ্যে দু'জন নারী জানায়, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাদেরকে পুলিশি হেফাজতে ধর্ষণ করে। অন্যদিকে, এক বন্দিনীর পরিবার জানায়, উচ্চপদস্থ এক পুলিশ অফিসার তাঁদের মেয়েকে ধর্ষণ করে, যখন তাঁর মা পাশের রুমে আটক অবস্থায় ছিল (Evers, 2014)। ২০১৪ সালে এসেও ইরাকে মার্কিন পুতুল সরকার প্রায় ৪৫০০ নারী কারাগারে বন্দি করে রাখে। মাসের পর মাস কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাদেরকে আটকে রেখে চালানো হয় অবর্ণনীয় নির্যাতন (Human Rights Watch, 2014)।

ফারাহ-রা ২০০৪-এ আবু গারিবে বন্দি ছিল। ওই সময়টাতে 'নূর' এর লেখা চিঠিতে নূর সবাইকে আকুতি জানিয়ে বলেছিল, 'দয়া করে আমাদের হত্যা করুন,.... আমাদের প্রত্যেকে মার্কিন সেনাদের দ্বারা গর্ভধারণের শিকার।' চিঠিতে আরও লেখা ছিল, 'প্রতিটি দিন তারা আমাদের উলঙ্গ করে সেনা ও অন্যান্য বন্দিদের সামনে দিয়ে হাঁটায়।'¹⁷ অথচ ব্যারি জনসনের ভাষ্যমতে, বন্দি তিনজন নারীকে 'অন্য পুরুষ বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা হয়েছে, তাঁদের নিজেদের "ভালোর" জন্য এবং তাঁদের গোপনীয়তাকে “পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন” করতে'। ২০০৩-এর ডিসেম্বরে ফারাহর মা ও তাঁর বোনকে (ফারাহর খালাকে) একত্রে গ্রেফতার করা হয়। এর পাঁচ মাস পরও ফারাহ জানতে পারেনি, তাঁদের অপরাধটা কী। ফারাহ তাঁর বন্দি খালার মেয়েকে নিয়ে আবু গারিবে তাঁর মামাকে দেখতে যান। তাঁর মামাও সেখানে প্রহারের শিকার হয়ে নাক ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল। তিনি তাঁর ভাগ্নেদের জানান, ভেতরে তাঁদের দুজনের মা'কে চুল ধরে টেনে এখান থেকে সেখানে নেওয়া হয়। ফারাহ আরও জানতে পারে, তাঁর মা'কে টয়লেট থেকে খাবার খেতে বাধ্য করা হয়। এমনকি, মানবতাবাদী কোয়ালিশন বাহিনীর মুক্তিদাতা সৈন্যরা উনার গায়ের ওপর প্রস্রাব করে (Ciezadlo, 2004)।

সাল ২০০৪, ইরাকি এক নারী তাঁর আইনজীবীকে জানায়, তাকে পুরুষ কোয়ালিশন গার্ডদের সামনে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়। অপর এক নারীকে অনেক অনুরোধ করার পর তিনি ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা তাঁর আইনজীবীর কাছে বর্ণনা করে। এই ঘটনা বর্ণনা করার পরপরই হতভাগা সেই নারী অজ্ঞান হয়ে যান। অ্যামেরিকানরা আর তাঁদের ইরাকি দাসেরা ইরাকি নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠন করত বন্দুকের নলের মুখে। ইরাকি নারীরা সচরাচর ধর্ষণের কথা খুব কম ক্ষেত্রেই খুলে বলে, তাঁদের আইনজীবীরাও ধর্ষণের কথা সহজে প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন না। ২০০৪-এর মার্চে আইনজীবীরা আবু গারিবে প্রবেশের অনুমতি পায়। আইনজীবীদের মধ্যে একজন সাহরা জানাবি জানায়, '(সেখানকার) নারীরা ছিল বিধ্বস্ত। তারা (আমাদের দেখেই) কান্নায় ভেঙে পড়ে।' এক মধ্যবয়সী নারী আইনজীবীদের বলে, তাকে পুরুষ গার্ডদের সামনে কাপড় খুলতে বাধ্য করা হয়। সেখানে উপস্থিত ইরাকি পুরুষ দোভাষীর কাছে এ ঘটনা এতটাই লজ্জাজনক ছিল যে, তিনি লজ্জায় তাঁর মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলেন। চরম লজ্জাজনক এই ঘটনাগুলো ঘটানোর সেই সময়টাতে খোদ অ্যামেরিকান সৈন্যরা স্বীকার করেছেন, তারা শুধুমাত্র পুরুষ আত্মীয়দের বন্দি করার ফাঁদ হিসেবে তাঁদের নারী আত্মীয়াদেরকে 'গ্রেফতার' করেন। অন্য আরেকজন আইনজীবী Amul Swadi জানায়, তাঁর মক্কেলও ধর্ষণ ও ছুরিকাহত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া পাঁচ জন সাবেক বন্দিনী ভেতরে প্রহারের কথা স্বীকার করলেও ধর্ষণের ব্যাপারে বলেন, 'আমরা আপনাকে বলতে পারব না। আমাদের পরিবার আছে। কী হয়েছে সে ব্যাপারে আমরা কিছুই বলব না' (Wilkinson, 2004)।

মি লাই-এর ঘটনা প্রকাশকারী সাংবাদিক সিমোর হার্শ জানায়, আবু গারিবে যে-সকল নারীদের বাচ্চাসহ গ্রেফতার করা হয়, তাঁদের বাচ্চাকে মলদ্বার দিয়ে ধর্ষণ করা হয়, আর সৈন্যরা সেগুলো বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ক্যামেরায় ধারণ করে রাখে। হার্শের কাছে সবচেয়ে নির্মম লেগেছে এই বাচ্চাগুলোর কান্নার শব্দ (Scaley, 2004)। মাথায় হুডি পরানো সেই কুখ্যাত ছবিতে থাকা ইরাকি বন্দি আলী¹⁸ এক বিশেষ নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করেন; যেখানে মার্কিন সেনারা এক দশ বছর বয়সী ছেলে শিশুকে প্রস্রাব করা থেকে বিরত রাখে। এক সময় তাঁর চোখ বেঁধে তাকে প্রস্রাব করতে দেওয়া হয়। ছেলেটির প্রস্রাব করা শেষ হলে যখন তাঁর চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো, সে দেখতে পেল তাকে তাঁর পিতার শরীরে প্রস্রাব করতে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তিনি আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেন, যেখানে নয় বছর বয়সী এক বাচ্চাকে তাঁর পিতার সামনে প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির দোভাষী ধর্ষণ করে (geneva International Centre for Justice, n.d.)।

ইরাকের মতো রক্ষণশীল রাষ্ট্রের নারীরা ধর্ষণকে তাঁদের পুরো পরিবারের অপমান হিসেবে মনে করে। কারণ, তারা পশ্চিমাদের পতিতা-সংস্কৃতি গ্রহণ করেনি; তাই ধর্ষণের চাইতে মৃত্যুই তাঁদের কাছে শ্রেয়। এছাড়াও ইরাকে সংঘটিত পৃথক পৃথক ঘটনায় জানা যায়, আবু গারিব কারাগারে 'কমপক্ষে' তিনজন গ্রাম্য তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। আর হাজারও অপ্রকাশিত ঘটনা, ভুক্তভোগী আর অন্যান্য কারাগারগুলোর কথা না হয় বাদই থাকল।

'নূর' নামে অসহায় সেই নারীর ভাগ্যে কী হয়েছে, আমরা জানি না। জানি না আরও হাজারও অসহায় ইরাকি, আফগান নারী, শিশু আর পুরুষের গল্প। আমরা জানি না, অসহায় সেই নারীদের পরিবারের সদস্যরা বুকে কতটুকু যাতনা নিয়ে দিনাতিপাত করেছে, করছে। কত নির্ঘুম রাত আমাদের এই বোনেরা চোখের জল ফেলে কাটিয়েছে বুকের মাঝে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে, আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছে নিজের মৃত্যুর জন্য। ভেবেছে একমাত্র মৃত্যুই পারে তাকে এই জন্তুদের হাত থেকে মুক্ত করতে। তবে, এটুকু সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই অসভ্য জাতির পতন অতি সন্নিকটে; যারা ভব্যতার সকল সীমা বহু আগেই অতিক্রম করে ফেলেছে।

২০০৪-এ আবু গারিবের নির্যাতনের ছবি প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। তখন বুশ প্রশাসন দাবি করে, অনেক ফলের মাঝে সেগুলো হলো কিছু 'পঁচা আপেল' বা নিম্নপদস্থ সামরিক সদস্যের অপকর্ম (Hersh, 2007)। কিন্তু, আসল বাস্তবতা ছিল, খোদ মার্কিন প্রশাসন সুস্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে সকল টর্চার ক্যাম্পেইন প্রতিষ্ঠা করে, যা বিশ্বব্যাপী তাঁদেরই ফেরি করা মানবাধিকার বিষয়ক চুক্তিগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। পরবর্তীকালে Al-Hurra নেটওয়ার্ক এবং Al Arabiya টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বুশ বলেন, 'ইরাকের জনগণের এটা অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে যে, আমি এই ধরনের আচরণকে জঘন্য হিসেবে দেখি। আর এই কারাগারে যা হয়েছে সেটা আমি যে অ্যামেরিকাকে জানি তাঁর প্রতিনিধিত্ব করে না।'

পরবর্তীকালে সভ্য দুনিয়ার সুশীল সমাজ রক্ষণাত্মক বক্তব্যের পরিবর্তে 'ক্ষমা' চাওয়ার দাবি করল। পরের দিন হোয়াইট হাউজ মুখপাত্র স্কট¹⁹ বললেন, কারাগারে যা হয়েছে তাঁর জন্য প্রেসিডেন্ট 'দুঃখিত'। কন্ডোলিসা রাইসও ইরাক থেকে বুশের ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা শুনতে চাইল। তাই সেই সপ্তাহে (মে, ২০০৪) বুশ বলেন, তিনি ইরাকি বন্দি ও তাঁদের পরিবারের সহ্য করা অপমানের জন্য দুঃখিত। তাঁর ভাষায়, '...যেসকল জনগণ সেসব ছবি দেখছে, তারা অ্যামেরিকার হৃদয় ও প্রকৃত বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে পারছে না। এ জন্য আমি সমান ব্যথিত এবং... (আমি) যা দেখেছি, আমার মতো অ্যামেরিকানরা সেটির তারিফ করছে না এবং এটি আমাদের চরমভাবে অসুস্থ করে দিয়েছে' (Smith N., 2008, pp. 36-37; CNN, 2004)। তিনি আরও বলেন, '...ইরাকে আমাদের যে সৈন্য রয়েছে তারা বিশুদ্ধদের মধ্যে বিশুদ্ধতম।' তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, এই অপরাধের জন্য দায়ীদের 'বিচারের আওতায় আনা হবে।' ৭ মে রামম্ফেল্ড মার্কিন সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সামনে শুনানিতে বলেন, '... ইরাকি বন্দিদের সাথে যা ঘটেছে সে বিষয়ে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। তারাও তো মানুষ।'

আবু গারিবের ঘটনায় হাতেগোনা মোট এগারো জন সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে অধিকাংশের সাজাই হয় 'প্রতীকী'। একজন ব্যক্তিকেও হত্যার জন্য দায়ী করা হয়নি। চলুন তাঁদের সাজার ধরন দেখে আসি:
* কর্নেল থমাসকে তিরস্কৃত করা হয়, $৮০০০ জরিমানা করা হয়, এবং দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় (Associated Press, 2005)।
* চার্লস গ্রেইনারকে তাঁকে দশ বছরের কারাদণ্ড, সেনাবাহিনী থেকে অপসারণের সাজা দেওয়া হয় (CNN, 2005)। আর মাত্র সাড়ে ছয় বছর পর তাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে দেওয়া হয় (Dishneau, 2011)।
* আইভান ফ্রেডরিককে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় (BBC NEWS, n.d.)। কিন্তু, চার বছর পরই তাকেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় (Dishneau, 2007)।
* এছাড়াও সার্জেন্ট Javal Davis-কে ছয় মাস, স্পেশালিষ্ট Jeremy Sivits-কে এক বছর, Specialist Armin Cruz-কে আট মাস, সাবরিনা হারম্যানকে ছয় মাস, আর অন্যতম আসামি লিন্ডে ইংল্যান্ডকে—যে বন্দিদের গলায় কুকুরের মতো দড়ি লাগিয়ে হামাগুড়ি দিতে বাধ্য করত—সাজা দেওয়া হয় দশ বছরের কারাদণ্ড। পরে সেই সাজা কমিয়ে তিন বছরে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকেও মাত্র এক বছর পাঁচ মাস পর সে প্যারোলে বেরিয়ে আসে (Beavers, 2007)।

এ তো গেল হুকুম পালনকারীদের সাজা দেওয়ার নমুনা। আর নির্যাতনের মাস্টারপ্ল্যানারদের কী 'শাস্তি' হয়েছিল?
* নির্যাতন বাস্তবায়নে সহায়তা করে যে Jay Bybee, তিনি পরবর্তীকালে তিনি বুশ কর্তৃক 9th ইউএস সার্কিট কোর্ট অব আপিলস-এর মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হন (Tetreault, 2003)।
* Michael Chertoff, জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট-এর প্রধান ছিলেন, তিনিই সিআইএ-কে 'আইনগতভাবে' নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বাতলে দেন। পরবর্তীকালে বুশ তাকে সেক্রেটারি অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি হিসেবে মনোনীত করেন (Bush names new US security chief, 2005)।

আবু গারিব স্ক্যান্ডালের পর ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে অ্যামেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে, ডিটেইনীদের, বিশেষ করে 'সন্ত্রাসের' বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে অ্যামেরিকা জেনেভা কনভেনশনের আর্টিকেল ৩ অনুযায়ী আচরণ করতে বাধ্য (Doyle, 2010)। ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২, পেন্টাগন তাঁদের নতুন আর্মি ফিল্ড ম্যানুয়ালে সকল SERE টেকনিক ব্যান করে, যেগুলো রামম্ফেল্ড ও রিকার্ডো সানচেজ অনুমোদন করেছিল। অতঃপর ওইদিনই বুশ সর্বপ্রথম সিআইএ-র ব্ল্যাক সাইটের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন; যা সেদিনের আগ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন স্বীকারই করেনি (Wagstaff, 2014, pp. 19-20)। কিন্তু, ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৬, হোয়াইট হাউজ মিলিটারি কমিশন্স অ্যাক্ট অব ২০০৬ ২০ বা এমসিএ রিলিজ করে, যা কার্যত বহির্দেশে বন্দি সকল নাগরিকদের বন্দিত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জের অধিকার বাতিল করে দেয়। এই বিধি অনুযায়ী, বন্দি কোনো ব্যক্তিই—অ্যামেরিকা কিংবা অন্যদেশের নাগরিক—জেনেভা কনভেনশনে উল্লিখিত অধিকার দাবি করতে পারবে না। একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্টই নির্ধারণ করতে পারবে কোনটি যুদ্ধাপরাধ আর কোনটি যুদ্ধাপরাধ নয়!

ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার স্টিফেন কংগ্রেসে নতুন 'তদন্ত' পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে কোনোকিছু জানাতে অস্বীকার করেন। কিন্তু, তারপরও মার্কিন সিনেটে ৬৫-৩৪ ভোটে এমসিএ পাস হলো। আর এই অনুমোদনের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেস বিশ্বজুড়ে সিআইএ-র গোপন বন্দিশালাগুলোতে SERE-পদ্ধতিগুলোকে বৈধতা দান করে। বুশ SERE টেকনিকগুলোকে দাবি করেন 'বিকল্প পদ্ধতির একটি সেট' হিসেবে (McCoy, 2012, p. 46)। তাঁর মতে, এগুলো অ্যামেরিকার জনগণ ও তাঁদের মিত্রদের রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, তাই সেগুলো নিষিদ্ধ করা যাবে না। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে অ্যামেরিকা যখন হাজারও বন্দি নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল, তখনো তারা দাবি করে যে, তারা বন্দিদের 'সন্ত্রাসের' বিরুদ্ধে যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত আটকে রাখতে পারবে। বিষয়াতা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, নব্য-সাম্রাজ্যবাদীদের নির্যাতন আর জুলুমের বিপক্ষে যে-ই প্রতিবাদ করবে, তাকেই মনুষ্য সম্প্রদায় থেকে ছিটকে ফেলা হবে 'না-মানুষ'দের কাতারে। যেখানে তাকে কোনো কারণ ছাড়াই বন্দি করে নির্যাতন করা যাবে দশকের পর দশক। আর সেটি বৈধ করা হবে গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে!

আবু গারিবে নির্যাতনের প্রকাশিত ছবিগুলোতে কিছু বিশেষত্ব ছিল। বন্দি ও কারারক্ষীদের দেহভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায় যে, তারা 'প্রমাণ' করতে চায়, Us vs Them যুদ্ধে অ্যামেরিকা জয়ী হচ্ছে। ছবিগুলোর অবজেক্ট—নির্যাতিত ব্যক্তিগুলো—অত্যাচারিত, অপমানিত, নগ্ন। তাঁদের পাশে বিজয়ী মার্কিন সেনাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। বার্তা পরিষ্কার—তাঁদের যা ইচ্ছা তারা তা-ই করতে পারে। পৃথিবীর চালকের আসনে তারাই রয়েছে (Oliver, 2007, p. 03)। এতকিছুর পরও দেখা গেল, পরের নির্বাচনেই মার্কিনীরা আবারও বুশকেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করলেন। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে এক জরিপেও দেখা যায়, অ্যামেরিকায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়ে ৪৯%-এ এসে ঠেকেছে (Rubin, 2013)। লিবারেল স্কলার মতবাদ বিষয়ক প্রোপাগান্ডার কার্যকারিতার এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ যে, মার্কিনীরা অ্যামেরিকার ইরাকি ও আফগানীদেরকে নির্যাতনের প্রতিবাদ করলেও তাঁদের দখলদারিত্বকে মেনে নেয়। সভ্যতা আর প্রগতিশীলতার কি কুৎসিত, কদাকার এক চেহারা!

টিকাঃ
১. মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (MI) অফিসার
২. লাঠি সদৃশ সামরিক অস্ত্র
৩. Joseph M. Darby
৪. Criminal Investigation Division (CID)
৫. Antonio M. Taguba
৬. Richard Myers
৭. Sa'eed Al-Sheikh
৮. Mamdouh Habib
৯. David Hicks
১০. Survival, Evasion, Resistance and Escape
১১. Maher Arar
১২. War Crimes Act (WCA)
১৩. বন্দিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে জেনেভা কনভেনশন।
১৪. International Committee of the Red Cross (ICRC)
১৫. Enemy aliens
১৬. 'Rectal rehydration', 'Rectal feeding'
১৭. রিপোর্টার Ciezadlo-এর মতে, চিঠিটি বানানোও হতে পারে।
১৮. Ali Shallal al-Qaysi
১৯. Scott McClellan
২০. Military Commissions Act of ২০০৬ (MCA)

ফন্ট সাইজ
15px
17px