📘 প্রোপাগান্ডা 📄 যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী পর্যায়ে প্রোপাগান্ডা

📄 যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী পর্যায়ে প্রোপাগান্ডা


ইরাক যুদ্ধের শুরুতে মার্কিনীদের যে উদ্যম ছিল, পরবর্তীকালে সেটি হ্রাস পেতে খুব বেশি সময় নেয়নি। মাত্র এক বছর পরই অধিকাংশ মার্কিনী যুদ্ধের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা প্রকাশ করতে আরম্ভ করে। বুশ প্রশাসন এটি ভালো করেই জানত যে, ইরাক যুদ্ধ চলমান রাখতে চাইলে জনসমর্থন খুবই জরুরি। তাই, যুদ্ধ সূচনার পরও তাদের প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন থাকে অব্যাহত। পরবর্তীকালে তাদের প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে যখন সত্যটা প্রকাশ হয়ে যায়, তখন ইরাকে যুদ্ধ করার ব্যাপারে মারণাস্ত্র-এর বদলে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

ওয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি Scott McClellan-এর ভাষ্যমতে, তাদের লক্ষ্য ছিল 'প্রতিটি সংবাদমাধ্যম জয় (দখল)' (McClellan, 2008, p. 174)। তাদের কাজ ছিল 'জাতীয় নিরাপত্তা ও বিশেষ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফোকাস অব্যাহত রাখা, যেটি প্রেসিডেন্টের পুনঃনির্বাচন ক্যাম্পেইনের প্রধান থিমে রূপান্তরিত হবে। এই দৃষ্টিতে দেখল, ইরাক যুদ্ধ শুধু সমর্থনযোগ্যই নয়; বরং অপরিহার্য।' (McClellan, 2008)।

যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রোপাগান্ডা ও এর বিপরীতে প্রকৃত তথ্যগুলো ছিল অনেকটা এইরকম :

* May ২৯, ২০০৩-এ বুশ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমরা মারণাস্ত্র খুঁজে পেয়েছি। আমরা বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ল্যাবরেটরিসমূহ খুঁজে পেয়েছি।' (Bush G. W., 2003b)।
* জুন ৭, ২০০৩, অ্যামেরিকা ও ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞরা মরণঘাতী রহস্যজনক ট্রেলারের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন (Miller & Broad, 2003b)।
* জুন ৮, ২০০৩, কলিন পাওয়েল বলেন, 'আমরা 'মোবাইল-ভ্যান' উন্মোচিত করেছি...। আমরা জানি যে, তারা (ইরাকিরা) প্রতারণা ও এই সকল বস্তু লুকানোয় পারদর্শী। তাই সামান্য ধৈর্য প্রয়োজন' (Powell, 2003a)।
* জুন ১৫, ২০০৩, ইরাকে পাওয়া দুটি বহনযোগ্য কার্গোর অনুসন্ধানের পর ব্রিটিশ টিম সিদ্ধান্তে আসে যে, সেগুলো জৈব অস্ত্রের ল্যাব ছিল না, যেমনটি বুশ ও টনি ব্লেয়ার দাবি করে আসছিলেন। বরং সেগুলো আর্টিলারি বেলুনে ভরার জন্য হাইড্রোজেন উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো। আর ইরাকিরাও এই কথা বহু আগে থেকেই বলে আসছিল (Beaumont et al., 2003)।
* সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৩, সাবেক জাতিসংঘ অস্ত্র নিরীক্ষক স্কট রিটার বলেন, 'ইরাকে প্রাপ্ত দুটি চলমান বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ল্যাবরেটরির কথা বুশ মজুদকৃত অবৈধ অস্ত্রের সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এটি এখন পরিষ্কার যে, এসকল তথাকথিত 'ল্যাবগুলো' আশির দশকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া হাইড্রোজেন উৎপাদনকারী ল্যাব ছাড়া আর কিছুই নয়' (Ritter, 2003)।

অর্থাৎ, ইরাকের মারণাস্ত্র-এর ব্যাপারে প্রকৃত সত্য সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর পরও নির্লজ্জ মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের প্রোপাগান্ডা বন্ধ করার কথা ভাবেনি। সেপ্টেম্বর ১৪, ২০০৩ এও চিনী নির্লজ্জের মতো বলেছিলেন, সাতটি চলমান ল্যাবের মধ্যে দুটি পাওয়া গেছে (Cheney, 2003)।

ইরাক যুদ্ধে পেন্টাগন কর্মকর্তারা মিডিয়া রিপোর্টারদেরকে সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ফিক্স করে দেওয়ার¹ পলিসি গ্রহণ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা ৬০০-এর মতো সাংবাদিকদের বাছাই করে তাদেরকে সামরিক ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় (Pew Research Center, 2003)। এর ফলে যুদ্ধের ময়দানের সংবাদ পুরোটাই মার্কিন বাহিনীর সমর্থনে কাজ করে। কারণ, বিদ্রোহীদের হামলা মার্কিন বাহিনীর সাথে সাথে রিপোর্টারদের ওপরও হতো, যেহেতু তারা একই সঙ্গে ইরাকে নিজেদের কাজ করত।

সংবাদপত্রের মতোই আরেকটি চমকপ্রদ প্রোপাগান্ডার সোর্স ছিল সামরিক 'বিশেষজ্ঞ'রা। যুদ্ধকালীন সময়ে তারা প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে হাজির হতো নিয়মিত অতিথি হিসেবে। তারা তাদের বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ মতামত পেশ করত। কিন্তু, পেন্টাগন এই সকল বিশেষজ্ঞদেরকে যুদ্ধের ময়দানে অ্যামেরিকার 'পারফরমেন্স'-এর ব্যাপারে ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের লক্ষ্যে নিয়োগ করে। ইরাক যুদ্ধের সূচনালগ্নে চালু হওয়া এই প্রকল্পের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞরাই মিলিটারি কন্ট্রাক্টরদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল, যে কন্ট্রাক্টররা খোদ ইরাক যুদ্ধে অর্থলগ্নি করেছে। বিশেষজ্ঞদের এই দল ১৫০টিরও বেশি মিলিটারি কন্ট্রাক্টরের লবিস্ট, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বার অথবা কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিল। ছোট-বড় কোম্পানি মিলিয়ে মিলিটারি কন্ট্রাক্টরগুলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে শত শত বিলিয়ন অর্থ কামানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। যে প্রতিযোগিতায় 'প্রশাসনের ভিতরকার তথ্য' আর 'সিনিয়র অফিসারদের নিকট প্রবেশাধিকার'-এর মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি।

বিশেষজ্ঞরা সিনিয়র মিলিটারি লিডারদের সঙ্গে শত শত গোপন বৈঠক করে। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরাক, গুয়ান্তানামোতে ভ্রমণ করানোর ব্যবস্থা করা হয়, ক্লাসিফাইড তথ্যে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। কখনো কখনো হোয়াইট হাউস, স্টেট ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের চিনী, আলবার্তো গঞ্জালেস-এর মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিরা ও তাদের ব্রিফিং দিত। এ সকল সুবিধার বিনিময়ে বিশেষজ্ঞরা মিডিয়ায় তাদের বক্তব্যে 'সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি'র প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করল। যদিও প্রায়শই তারা সন্দেহ করত যে, তাদেরকে সরবরাহ করা তথ্যে গড়মিল রয়েছে। কিন্তু তাদেরকে দেওয়া সুবিধা হারাবার ভয়ে তারা স্বীয় সন্দেহগুলোকে দাবিয়ে রাখত। গুয়ান্তানামো কারাগারে নির্যাতনের ঘটনা যখন ফাঁস হলো, সেখান থেকে ঘুরে এসে বিশেষজ্ঞরা গুয়ান্তানামোর পরিবেশকে ‘পেশাদার’ আর মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্টগুলোকে দাবি করে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ হিসেবে।

Military এক্সপার্টদের পরিচালিত এই প্রোপাগান্ডার ফলাফল কী? জনসংযোগ কর্মকর্তা ক্লার্কের জ্যৈষ্ঠ সহকারী ব্রেন্টাস-এর ভাষায়, কোনো কোনো দিন ‘বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি [টিভি] স্টেশনে হাজির হতে সক্ষম হয়। আর তাদের প্রত্যেকেই প্রশাসনের মতবাদ প্রচারে সফল হয়।’ ক্লার্কের উদ্দেশ্যে দেওয়া রামম্ফেল্ড-এর এক মেমোতে দেখা যায়, তিনি বিশেষজ্ঞদের কাজে খুশি হয়ে বলেন, ‘...যারা বক্তা হিসেবে ভালো দক্ষতা দেখিয়েছে, তাদের নিয়ে ভাবা যায়’ (Barstow, 2008)।² পরবর্তীকালে নিউ ইয়র্ক টাইমস অ্যামেরিকার ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে ৮০০০ পৃষ্ঠা ইমেইল, ট্রান্সকিপ্ট, প্রাইভেট ব্রিফিং-এর রেকর্ড ও গুয়ান্তানামো, ইরাকে যাত্রার তথ্য আইনগত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। অতঃপর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ডেভিড বারস্টো এ পরিকল্পিত প্রজেক্টের বিস্তারিত রিপোর্ট পাবলিশ করেন।

এই ধরনের সমন্বিত প্রোপাগান্ডাগুলো সংবাদ গ্রাহকদের প্রাপ্ত সংবাদের বৈশিষ্ট্যকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। ফলে বিশেষ বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে জনগণের মনে সৃষ্ট ধারণায় পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৮০% অ্যামেরিকানদের প্রাথমিক সংবাদ উৎস হিসেবে ছিল টিভি ও রেডিও; অন্যদিকে মাত্র ১৯% জানায়, তাদের সংবাদ গ্রহণের প্রধান উৎস প্রিন্ট মিডিয়া। ইরাক যুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত অ্যামেরিকার পক্ষে থাকার ব্যাপারে উত্তরদাতাদের ‘ভুল ধারণা’র ব্যাপারটা বিভিন্নভাবে প্রমাণিত হয়। দেখা যায়, ৮০% ফক্স নিউজ দর্শক এক/একাধিক বিষয়ে ভুল ধারণা রাখেন, সিবিএস ৭১%, এবিসি ৬১%, এনবিসি এবং সিএনএন ৫৫%, প্রিন্ট মিডিয়ার অনুসারীদের ক্ষেত্রে ভুল ধারণা শতকরা ৪৭% (Kull, 2003)।

কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, এখানে দোষটা অনেকাংশে ভোক্তাদেরও হতে পারে। হতে পারে, সংবাদে গ্রাহকের মনোযোগের অভাব কিংবা অপর্যাপ্ত সংবাদ গ্রহণের কারণে এরকমটি হয়েছে। কিন্তু, জরিপের ফলাফল সেরকম কোনোকিছুর ইঙ্গিত দেয় না। অধিকাংশ নিউজ কোম্পানির ক্ষেত্রেই বাড়তি মনোযোগ ‘ভুল ধারণা’ সৃষ্টির সম্ভাবনা হ্রাস করে না। ওপরন্তু, ফক্স নিউজ যাদের সংবাদের প্রাথমিক উৎস, তাদের ক্ষেত্রে সংবাদে অধিক মনোযোগ ‘ভুল ধারণা’ সৃষ্টির সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তোলে (Kull, 2003)।

মার্কিন প্রশাসনের পরিচালিত প্রোপাগান্ডা তাদের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সামগ্রিক ক্ষেত্রে ঠিক কতটা ‘সফল’ হয়? ২০০৩ এর জানুয়ারিতে PIPA/KN এর পোলের ফলাফলে দেখা যায়, ৬৮% নাগরিক ইতিমধ্যেই বিশ্বাস করে ফেলেছিল তা, ৯/১১-এর হামলায় ইরাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে! এছাড়াও ১৩% নাগরিক ধারণা করতেন যে, ইতিমধ্যেই ইরাক ও ৯/১১-এর মধ্যে সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেছে! এর পরের মাসের জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৭% নাগরিক মনে করতেন, ইরাক ও ৯/১১ এর মাঝে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আগস্টের জরিপে ৬৭% বলেন যে, সাদ্দাম হোসেন ব্যক্তিগতভাবে ৯/১১-এর সঙ্গে জড়িত। জুন থেকে আগস্টের মধ্যে পরিচালিত জরিপে করা প্রশ্ন—‘আমেরিকা কি আল কায়েদা এবং সাদ্দাম হোসেনের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে?’—এর উত্তরে প্রতিবারই ৪৫%-৫২% মার্কিন নাগরিক জবাব দেন, অ্যামেরিকা সেরকম প্রমাণ পেয়েছে (Kull, 2003)।

২০০২-এ যখন সম্ভাব্য ইরাক যুদ্ধের বিষয়ে সর্বপ্রথম মিডিয়া রিপোর্ট শুরু হলো, তখন থেকে আফগানিস্তান যুদ্ধ হেডলাইন থেকে চলে যায় দৃশ্যপটের আড়ালে। পরবর্তীকালে ওবামা জনমন থেকে হারিয়ে যাওয়া আফগান যুদ্ধকে গতিশীল করে তালিবানদের হারানোর পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। কিছু রিসার্চে দেখা যায়, মার্কিনীদের যুদ্ধের বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল এই ধারণা যে, অ্যামেরিকা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। আবার কোনো স্কলার বলেন, সেনা হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধের বিরোধিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। John Mueller বলেন, ইরাক যুদ্ধে সহজ একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়—হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সমর্থন হ্রাস পায়। জনগণের মনের উদ্যম ধীরে ধীরে কমে আসে (Mueller, 2005)। ২০০৯-এ যখন আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্য হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল, তখন মিডিয়া পুনরায় আফগানিস্তানে তাদের ক্যামেরা তাক করে। ওই সময়ে আফগানিস্তানে সহিংসতা ও মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মার্কিনীদের যুদ্ধবিরোধিতা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে ওবামা ২০০৯-এর শেষে যুদ্ধ অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেন। এই দাবির মাধ্যমে আবারও মার্কিন জনগণের যুদ্ধবিরোধিতা কমে আসে (DiMaggio, 2015, p. 11)।

জানুয়ারি ২০০৯-এ অ্যামেরিকান নাগরিকরা আফগানিস্তান যুদ্ধের সমর্থনের বিষয়ে সমান অংশে দ্বিধাবিভক্ত ছিল। ৪৫% মনে করত যে, যুদ্ধ ‘ভালো’ যাচ্ছে, আর ৪৫% মনে করত যে, যুদ্ধ ‘ভালো’ যাচ্ছে না। এক মাস পর CNN/ORC-এর পোলে দেখা যায়, ৪৭% যুদ্ধের সমর্থন করেন, আর ৫১% করেন যুদ্ধের বিরোধিতা (Quinnipiac University Poll, 2021)। ওই সময়ে সাংবাদিকরা যুদ্ধের হতাহতের বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করত। ফলে, জনমত যুদ্ধের বিপরীতে ঝুঁকে পড়ে (DiMaggio, 2015, p. 29, Figure 1.8)।

জনমতের ওপর মার্কিন হতাহতের সংখ্যার প্রভাব ওবামা ক্ষমতাসীন হবার পর বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করেন। ডিসেম্বর ২০০৯-এ ওবামা ১৮ মাসের টাইমলাইন ঘোষণা করে বলেন, সৈন্য অপসারণ শুরু করা হবে। বুশ যেরকম সন্ত্রাসের ভয়কে পুঁজি করে যুদ্ধে জড়িয়েছেন, ওবামা তেমনি প্রত্যাশার কৌশল খাটানো আরম্ভ করেন। তিনি মার্কিনীদের অনুধাবন করানোর চেষ্টা করেন, অ্যামেরিকা আফগানিস্তানে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু, তালিবানের কারণে আফগানের ‘বৈধ’ (পুতুল) সরকারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই আফগানিস্তানকে সুরক্ষা দিতে ওবামা আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন।

২০০৯-এর নিউজ ও মিডিয়ায় প্রকাশিত মতামত যাচাই করলে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমগুলো ২০০৯-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যাপারে নেগেটিভ সংবাদ প্রচার করছিল। কিন্তু বছরের শেষার্ধে ওবামার প্রতি তাদের সমর্থন বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ২০০৯-এ অ্যামেরিকার জনমত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, শুরুর দিকে মার্কিনীদের হতাহতের সংবাদ জনমতকে যুদ্ধবিরোধী করে তোলে। আর পরবর্তীকালে ইতিবাচক সংবাদ যুদ্ধের সমর্থন আবারও বৃদ্ধি করে (DiMaggio, 2015, pp. 51-52, Figure 1.12)।³

টিকাঃ
১. তারা এর নাম দেয় Embedded পলিসি, যার অর্থ বেঁধে দেওয়া।
২. Brent T. kruger
৩. Rhetoric of Hope

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 আমেরিকার ফেরি করা স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ

📄 আমেরিকার ফেরি করা স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ


ইরাকে হামলা চালানোর পূর্বে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন বুশ। তিনি দাবি করেন, তারা ‘(ইরাক) এর জনগণকে মুক্ত করার জন্য এবং মারাত্মক বিপদ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার জন্য’ (Saleh, 2021, p. 21), ‘বিপদের এই সময় পার করতে এবং শান্তি (প্রতিষ্ঠা)র কাজ চালিয়ে যেতে’ (Bush G. W., 2003a), ইরাকে হামলা চালাতে যাচ্ছে। এর পরের দিন জাতির উদ্দেশ্যে বুশ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সমস্যা জর্জরিত বিশ্বের শান্তি ও নির্যাতিত মানুষের আশা’ অ্যামেরিকার সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে (Bravin, 2013, p. 64)।

আসলেই কি তাই? বুশ প্রশাসন আর মার্কিন মিডিয়া কি সত্যিই বিশ্ব-শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছে? ইরাক, আফগানিস্তানে কি পশ্চিমারা শান্তি আর সুখের বন্যা বইয়ে দিয়েছে? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধতে ইরাক ও আফগানিস্তানের অবস্থার পরিবর্তন যাচাই করলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই, যুদ্ধ আরম্ভ করার অজুহাত হিসেবে অ্যামেরিকা যেমন মিথ্যা বলেছিল; তেমনি ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও অ্যামেরিকা আর তাঁদের দোসরদের ঘোষিত প্রায় সবগুলো ঘোষণা ছিল একরাশ প্রবঞ্চনার অংশ। অন্যদিকে, অফিশিয়াল প্রোপাগান্ডা-ব্যাখ্যার বাইরে যাওয়াটাও সাংবাদিকদের জন্য ‘স্বাভাবিক’ কোনো বিষয় ছিল না। কারণ, তারা অফিশিয়াল সংবাদের ‘পরিবেশনকারী’ হিসেবে কাজ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। ইরাক ও আফগান যুদ্ধে সাংবাদিকরা যেভাবে নিজেদের স্বার্থবাদী মতবাদ অনুসারে সংবাদ পরিবেশন করেছেন, তাতে সংবাদ হয়ে ওঠে ভারসাম্যহীন মিথ্যার জাল। জনগণ যেন তাঁদের প্রণীত নীতিমালাকে সমর্থন দেয়, সেই লক্ষ্যে সরকার মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে গণসমর্থন সৃষ্টির শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে।

যুদ্ধ শেষে মার্কিন সেনারা যখন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে, তখন তারা প্রকৃত বাস্তবতা অনুভব করতে সক্ষম হয়।¹ ওই মুহূর্তে তারা চতুর্দিকে বিদ্যমান পৃথিবী (রাষ্ট্র) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যে পৃথিবীর নাগরিকরা তখনো অন্ধভাবে নিজ রাষ্ট্রের সর্বোৎকৃষ্ট 'নৈতিকতা'র মিথের ওপর বিশ্বাসী। তখন তারা অনুধাবন করতে পারে, নৈতিকতার ওপর তাঁদের কোনো একাধিপত্য নেই। তারা যে 'বর্বরত' আর 'আদিম সভ্যতা'র বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে বয়ান দিয়ে বেড়ায়, যুদ্ধের ময়দানে খোদ তারাই সেই বৈশিষ্ট্যগুলো আপাদমস্তক ধারণ করে। বিশ্বাসের জগতে এটি সৃষ্টি করে চরমতম এক সংকট। এই দৃশ্য তাঁদের জাতিগত সকল মিথ ভেঙে চুরমার করে দেয়। বস্তুত, তখনই প্রথম তারা তাদেরকে বলা মিথ্যাগুলোর আড়ালে প্রকৃত বাস্তবতা ধরতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আসা সৈন্যরাই আমাদের যুদ্ধের সবচেয়ে বিশুদ্ধ 'গল্প' শোনাতে পারে (Hedges & Al-Arian, 2008)। নিরপরাধ মানুষদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পেছনের মিথ্যাটা তারা তখন সকলের সামনে প্রকাশ করে দেয়—কথায় কিংবা কাজে।

কেন তাঁরা আমাদের ঘৃণা করে' (Bricmont, 2006)। সেই সঙ্গে তারা এটাও অনুধাবন করতে পারবে যে, আজকের ইউরোপীয় বা অ্যামেরিকানরা ইরাক কিংবা আফগানিস্তানের বাসিন্দা হলে তারাও ঠিক সেখানকার জনগোষ্ঠীর মতোই পশ্চিমাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করত।

টিকাঃ
১. যুদ্ধের ময়দানেও অবশ্য অনেকেই প্রকৃত চিত্র অনুভব করতে সক্ষম হয়, তবে জীবন মরণ যুদ্ধের ময়দানের মাঝে এত জটিল বিষয়ে ভাবার সময় কোথায়?

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 আফগানিস্তান যুদ্ধ

📄 আফগানিস্তান যুদ্ধ


আফগানিস্তানে হামলা করে তালিবান সরকার হটানোর পর সেখানে অ্যামেরিকা ও তাদের তাঁবেদাররা কায়েম করে এক ত্রাসের রাজত্ব। আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর পর অ্যামেরিকা সেখানে মানুষ হত্যা করে লাশের পাহাড় জমাতে শুরু করে, যাদের সংখ্যার কোনো হিসেবই তারা রাখত না। মার্চ ২০০২-এ রামম্ফেল্ড সিবিএসকে বলেন, '... (অ্যামেরিকা) ভিয়েতনামে (মৃতদেহ গণনার) চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটি (আল্টিমেটলি) কাজ করেনি।' পরে আফগানিস্তানের দায়িত্বে থাকা চিফ জেনারেল টমি ফ্র্যাঙ্কস বলেন, 'তোমরা তো জানোই, আমরা মৃতদেহ গণনা করি না' (Moses, 2010)। ২০০৩-এ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্টে দেখা যায়, আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থিত বাহিনী কিভাবে আফগানিস্তানকে ধর্ষণ, খুন, অরাজকতার স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে। তারা যখন-তখন যে-কারও বাসায় হামলা করে ধর্ষণ, লুটতরাজ চালাত। এমনকি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থার মহিলা কর্মীকে ধর্ষণ করেও তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আফগানিস্তানে অ্যামেরিকার কায়েম করা সন্ত্রাসের রাজ্যের যে চিত্র আমাদের সামনে দৃশ্যমান, তার সাথে সেক্যুলার আগ্রাসী অ্যামেরিকা-ব্রিটেন ও তাদের সেবাদাসদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতির কোনো মিল নেই (HRW, 2003)। পুতুল সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিলিশিয়া বাহিনীরা তখনো দেদারসে সাধারণ জনগণকে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করত। হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ এ সকল নির্যাতন নিয়ে বিশদ রিপোর্ট-ও পাবলিশ করে (HRW, 2015)।

শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষই নয়; ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেরাও অ্যামেরিকা আর তাদের পোষা বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায়নি। আফগানিস্তানে মার্কিনীদের সহযোগী আঞ্চলিক যুদ্ধবাজরা তালিবানের বিদায়ের পর তালিবানের লুপ্ত করা ছেলেশিশুদের বলাৎকার করার সংস্কৃতি পুনরায় 'উজ্জীবিত' করে। মার্কিনীদের কাছে তারা এতটাই 'স্বাধীনতা' পায় যে, মিলিটারি বেইসেও তারা এ ঘৃণ্য অপরাধটি করত। কোনো মার্কিন সৈন্য এ বিষয়ে বিরোধিতা করলে তাকে নির্দেশ দেওয়া হতো চুপ থাকতে (Goldstein, 2015)। আফগানিস্তানে এই অপসংস্কৃতিকে বলা হয় 'বাচ্চাবাজি'। অ্যামেরিকান মিলিটারিরা আঞ্চলিক সাহায্যকারী যুদ্ধবাজদের বিভিন্ন গ্রামের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিত—সেখানে তারা শিশু ধর্ষণের মৃত 'সংস্কৃতি'র গোঁড়ায় পানি ঢালে।

ড্যান কুইন নামের সাবেক এক স্পেশাল ফোর্স ক্যাপ্টেন বলেন, তারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে যায়; কারণ তারা শুনেছিল, তালিবানরা 'মানবাধিকার' কেড়ে নিয়েছে। 'কিন্তু এখন আমরা এমন লোকদের ক্ষমতায় এনেছি, যারা তালিবানদের থেকেও বাজে কাজ করছে...'। অ্যামেরিকা-সমর্থিত এক মিলিশিয়া কমান্ডার এক ছেলেশিশুকে শেকল দিয়ে ওর বিছানার সঙ্গে যৌনদাস হিসেবে বেঁধে রেখেছিল। কুইন এজন্য ওই কমান্ডারকে ধরে পেটায়। তাকে পেটানোর 'অপরাধে' অ্যামেরিকান আর্মি কুইনকে তাঁর ক্যাপ্টেন্সি থেকে অব্যাহতি দেয় এবং তাকে অ্যামেরিকায় ফেরত পাঠায়। এছাড়াও অ্যামেরিকান কন্ট্রাক্টররাও আফগান শিশুদের পেছনে অর্থ ব্যয় করত, যাদেরকে তারা বলত 'ড্যান্সিং বয়েজ'। মিডিয়াতে এ খবর প্রকাশ হলে আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হানিফ আতমার মার্কিন দূতাবাসে এ সংবাদ জোরপূর্বক ধামাচাপা দেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরে উইকিলিকস সে তথ্য ফাঁস করে দেয় (Boone, 2010)। ড্যান্সিং বয়েজদের কাজ কী ছিল? এই ছোট ছোট ছেলে শিশুদের নারী সাজিয়ে পুরুষদের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে মনোজ্ঞ 'সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা'য় নাচানো হতো, আর তারপর তাদেরকে করা হতো ধর্ষণ।¹

শিশুগামিতা সমর্থন করা এক জাতি যখন মুসলিমদের সভ্যতা শেখাতে যায়, তখন তা আশ্চর্যের কারণই বটে! তালিবানদের শাসনামলে 'বাচ্চাবাজি'র শাস্তি ছিল প্রাণদণ্ড। পরবর্তীকালে অ্যামেরিকা আফগানিস্তানে গিয়ে মৃতপ্রায় এই কুকর্মকে পুনরায় বাঁচিয়ে তুলল। আর মুসলিমদের জনপদগুলোতে এইসব শিশুধর্ষকদের সেবাদাস, (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধর্ষিত) সেক্যুলার-লিবারেল মতাদর্শে বিশ্বাসী তথাকথিত 'সংস্কৃতিমনা' লেজকাটা শিয়ালগুলো আজ শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্তাব্যক্তি সেজে বসে আছে। আর নিজেদের মতাদর্শকে দাবি করছে সার্বজনীন!

অক্টোবর ২০০৯, তৎকালীন আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমাদ জিয়া মাসউদ—সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সাবেক নেতা আহমাদ শাহ মাসউদ-এর ছোট ভাই—$৫২ মিলিয়ন অর্থসহ দুবাই বিমানবন্দরে আটক হন। পরবর্তীকালে কোনো জবাব দেওয়া ছাড়াই তাকে যেতে দেওয়া হয়। এই সংবাদ পরে ফাঁস করে উইকিলিকস (Steele & Boone, 2010)।

জানুয়ারি ১৫, ২০১০, কান্দাহারে গুলমুদ্দিন² নামক এক পনেরো বছর বয়সী আফগান কিশোরকে অ্যামেরিকান সৈন্যরা যুদ্ধের 'মঞ্চ' সাজিয়ে নাটকীয়ভাবে হত্যা করে। তারা গুলমুদ্দিনকে একটি মাটির দেয়ালের পেছনে দাঁড়াবার নির্দেশ দিয়ে তাঁর দিকে গ্রেনেড ছুড়ে মারে, অতঃপর কাছ থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করে। শিকারিরা পশু শিকারের পর যেভাবে ফটোশুট করে, তার অনুকরণে তারা গুলমুদ্দিনের লাশকে উলঙ্গ করে চুল টেনে ধরে হাস্যোজ্জ্বল ছবি তোলে। তাদের মধ্যে একজন, সার্জেন্ট গিবস³ ছুরি দিয়ে ওর আঙুল কেটে ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংগ্রহ করে। পরে গিবস শহীদ গুলমুদ্দিনের আঙুলটি আফগানিস্তানে তাঁর প্রথম 'হত্যা'র স্মৃতি হিসেবে প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস হোমসকে উপহার দেয়। হোমস সে আঙুলটি সংরক্ষণ করে তাঁর ব্যাগে রেখে দেয়। গিবস আফগান মুক্তিযোদ্ধাদের শহীদ করার পর তাঁদের সঙ্গে কোনো অস্ত্র পেলে সেটি সংরক্ষণ করে রাখত। যাতে করে পরবর্তীকালে কোনো বেসামরিক নাগরিক হত্যা করলে সেই অস্ত্র পাশে রেখে তাদেরকে 'তালিবান যোদ্ধা' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। অ্যামেরিকান সৈন্যরা যখন গাড়িতে করে গ্রামে যেত, অনেকেই ছোট বাচ্চাদের চকলেট ছিটিয়ে দিত। বাচ্চারা চকলেট নিতে ছুটে আসলে কখনো কখনো তাদের দিকে ছোড়া হতো গুলি। কখনো হয়তো বাচ্চাদের ওপরই গাড়ি তুলে দেওয়া হতো। আবার কখনো সাধারণ কৃষকদের হত্যা করে প্রচার করা হতো তালিবান হিসেবে (Rolling Stone, 2011)।

২০০৯-২০১০, এই সময়ে অ্যামেরিকান পাঁচজন সৈন্য—যারা নিজেদের 'কিল টিম' হিসেবে পরিচয় দিত—‘অন্তত’ তিনজন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে, যাদের মধ্যে গুলমুদ্দিন একজন। পরে হত্যার দায়ে এই পাঁচজনকে এবং ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার দায়ে আরও সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়। নির্মম হত্যার দায়ে দায়ী এই পাঁচজন নিকৃষ্ট খুনির কী সাজা হয়, জানেন?
* স্টাফ সার্জেন্ট ডেভিড ব্রাম⁴: তিন বছর চার মাস পর প্যারোলের অপশন-সহ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড (Porterfield, 2011)।
* স্টাফ সার্জেন্ট গিবস: দশ বছর পর প্যারোলের অপশন-সহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (Oppmann, 2011)।
* প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস হোমস⁵: সেপ্টেম্বর ২০১১-তে সাত বছরের সাজা ঘোষণার পর ২০১৫ সালেই বের হয়ে যায় (Idaho soldier convicted, 2015)।
* স্পেশালিষ্ট মোরলক⁶: সাত বছর পর প্যারোলের সুবিধা-সহ ২৪ বছরের সাজা (Reuters Staff, 2011)।
* স্পেশালিষ্ট উইনফিল্ড⁷: তিন বছরের সাজা (Cole, 2011)।

অবশ্য শুধু এই পাঁচজনের বেলায়ই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার ক্ষেত্রে অ্যামেরিকার আগে থেকেই যথেষ্ট 'সুখ্যাতি' রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর যে সংস্কৃতি, তাতে অপরাধ প্রকাশ হয় কম, আর হলেও তারা খুব বেশি সাজাপ্রাপ্ত হয় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ৭০ জনের মতো যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করেন। ব্ল্যাকওয়াটার⁸-এর মতো প্রাইভেট ভাড়াটে খুনি প্রতিষ্ঠানের সন্ত্রাসীদের যেসব খুনের ঘটনা (কোনো কারণ ছাড়া সতেরো জন হত্যা, বিশজন আহত) প্রকাশ হয়ে পড়ে, সেগুলোতেও খুনিদের নিঃশর্ত ক্ষমা ঘোষণা করা হয় (VanLandingham & Corn, 2020; Haberman & Schmidt, 2020)।

চলুন, পুরো চিত্রটা আরও একবার আমরা কল্পনা করি। কোনো ভিনদেশী বাহিনী এসে আপনার ভাইয়ের সন্তানকে খেলাচ্ছলে হত্যা করে। তাঁর আঙুল কেটে নিয়ে শিকারের 'ট্রফি' হিসেবে সংরক্ষণ করে। আর এত বড় অপরাধের পর তাঁদের সাজা হয় কয়েক মাস জেল। অথচ দিনশেষে ওরাই আবার নিজেদের ঘোষণা করে 'স্বাধীনতা' আনয়নকারী হিসেবে! কী, দৃশ্যটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে? এর উত্তরে কেউ যদি বলেন এগুলো স্বাভাবিক কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাহলে তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন খাঁটি, বিকৃত মস্তিষ্কের পশ্চিমা সভ্যতার গোলাম। গৃহপালিত পশুর গলায় বাঁধা শেকল খালি চোখে দেখা যায়, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দাসদের গলায় থাকা শেকল হয় অদৃশ্য, ওরা আল্লাহর পরিবর্তে ভিনদেশী জাতির গোলামির চিহ্ন নিজেদের কথায়-কাজে ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু, কোনো স্বাভাবিক মানুষের কাছে এই দৃশ্য স্বাভাবিক, সহনীয় মনে হবে না। আর এই দৃশ্যগুলোই আফগান যুদ্ধ জুড়ে আফগানিস্তানের মানুষদের নিকট পরিচিত আর 'স্বাভাবিক' ছিল।

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, অ্যামেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সকল জাতীয় (ও আন্তর্জাতিক) ফোনকল রেকর্ড ও স্টোরিং করছে। পরবর্তীকালে উইকিলিকস প্রকাশ করে, নির্দিষ্ট সেই দেশটি হলো আফগানিস্তান (Assange, 2014)। স্বীয় 'নৈতিক উচ্চমর্যাদা'র ব্যাপারে লিবারেল সেক্যুলারদের ধারণার স্বরূপ দেখুন। তারা আফগানিস্তানের সকল জনগণের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে। তাঁর ওপর তারা জানায়, উক্ত রাষ্ট্রের নাম প্রকাশ করলে 'সহিংসতা' বৃদ্ধি পাবে, তাই তারা নাম প্রকাশ করবে না। অর্থাৎ, আফগানিস্তানের মতো কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের গোপনীয়তা যে লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটা জানার অধিকার পর্যন্ত তাঁদের নেই। এই হলো লিবারেল-সেক্যুদের 'হিউম্যান রাইটস'।

১১ মার্চ, ২০১৬, মার্কিন সার্জেন্ট রবার্ট বেলস⁹ তাঁদের ঘাঁটি থেকে আফগান বসতিতে গিয়ে ষোলো জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে, এর মধ্যে নয়জনই শিশু। বেলস তাঁদের হত্যা করে তাঁদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ষোলো জন তরতাজা অসহায় 'মানুষ' হত্যার আসামি বেলসের সাজা দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (Healy, 2013)।

আদিবাসীদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে 'সভ্য' হওয়া আরেক রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার ডিফেন্স ফোর্সের লিক হওয়া গোপন ফাইলের শত শত পাতা জুড়ে দেখা যায়, ২০০৯-২০১৩ এই পাঁচ বছরে 'অন্তত' দশটি ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা আফগান যোদ্ধাদের সাথে সাথে বেসামরিক পুরুষ ও নারী হত্যা করে (see Oakes & Clark, 2017c, for more details)। ২০১২, কান্দাহারে অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা এক কিশোর ছেলেকে হত্যা করে এবং সে তথ্য উচ্চপদস্থ অফিসারদের কাছ থেকে গোপন করে। সেপ্টেম্বর ২০১৩, উরুজগান প্রদেশে বিসমিল্লাহ আজাদি ও তাঁর ছেলে সাদিকুল্লাহ বিছানার চাদর জড়িয়ে এক সঙ্গে ঘুমাচ্ছিল। অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা সেই অবস্থাতেই তাঁদের দুজনকে একত্রে শহীদ করে দেয় (Oakes & Clark, 2017c)।

১৬ নভেম্বর ২০২০, অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্সের প্রধান আফগানিস্তানে তাঁদের সেনাদের খেলাচ্ছলে হত্যা/খুনের বিস্তারিত রিপোর্ট হাতে পান (Afghanistan Inquiry, ২০২০)। কী ছিল সেই রিপোর্টে? সেখানে ছিল পশ্চিমা মানবাধিকার পৌঁছানোর অস্ট্রেলিয়ান ভার্শনের বিবরণ। অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা—
* হত্যার সংখ্যা গণনার প্রতিযোগিতা করত,
* হেলিকপ্টারে করে আফগান গ্রামে আক্রমণ করত, অতঃপর পলায়নপর বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালাত গণহত্যা,
* হেলিকপ্টার হামলার পর স্পেশাল ফোর্স পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে গ্রামের পুরুষ ও ছেলেদেরকে গ্রামের শেষ প্রান্তে 'গেস্ট হাউসে' নিয়ে যেত।¹⁰ তারপর তাঁদের দিনের পর দিন নির্যাতন করা হতো। অবশেষে স্পেশাল ফোর্স যখন 'অতিথিদের আপ্যায়ন' শেষ করে চলে যেত, তখন ছেলে ও পুরুষদের পাওয়া যেত মাথায় গুলিবিদ্ধ কিংবা চোখবাঁধা, গলা কাটা অবস্থায় (2020, p. 120)।

২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্স মিনিস্টার স্বীকার করেন, ২০১০ এর ২২ মে নিউজিল্যান্ডের সৈন্যরা এক হামলায় ছয় জন বেসামরিক অসহায় আফগানকে হত্যা ও পনেরো জনকে আহত করে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে এসে টিভিতে দেখতে পান, তাঁর সৈন্যরা তিন বছর বয়সী এক বাচ্চাকে হত্যা করছে। তারপরও তিনি বলেন, যুদ্ধে এরকম হতেই পারে। এসব কথাও তিনি স্বীকার করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বই Hit and Run-এ উল্লিখিত ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ হবার পর (Oakes, 2017a)। পরবর্তীকালে পলিটিশিয়ান ও সামরিক অগ্রনায়করা সম্মিলিতভাবে এ ঘটনা ধামাচাপা দেয় (Oakes, 2017b)।

লক্ষ্য করার একটি বিষয় হলো, ইরাকের নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশিত হবার পর চারিদিকে যেভাবে হাহাকার পড়ে যায়, আফগানিস্তানে ঠিক সেরকম নির্যাতনই হয়েছে। বরং নির্যাতনের শুরুটাই হয়েছে আফগানিস্তানে। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে তাঁদের 'কথিত মানবতা'র কোনো অংশ বরাদ্দ রাখেনি। এমনকি অনেক স্কলার ইরাকের ক্ষেত্রে যেসব অকথ্য নির্যাতনকে অবৈধ মনে করতেন, তারা সেই নির্যাতনগুলোকে শুধু আফগানিস্তানের জন্য 'খাস' হিসেবে বৈধ ধরে নিয়েই ইরাকে নির্যাতনের বিরোধিতা করেন।

এই ছিল আফগানিস্তানে পশ্চিমা স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের প্রকৃত চেহারা। হত্যা, নির্যাতন আর ধর্ষণের যে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা, তাঁর শেষটা হয়েছে নিদারুণ অপমানের মধ্য দিয়ে। সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত অ্যামেরিকার সৈন্যরা হালকা অস্ত্র নিয়ে লড়াই করা তালিবানদের অপসারণের চেষ্টায় বিশটি বছর জান-মাল অপচয় করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। কিন্তু 'সাম্রাজ্যের কবরস্থান' আফগানিস্তান থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারেনি। পরাজিত হয়ে নতমস্তকে ফিরে গেছে নিজ দেশে। তালিবানদের বিজয়ে একটা বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেটি হলো— মুমিনরা যদি একতাবদ্ধ হয়ে, নিজেদের লক্ষ্যে অটল থেকে লড়াই চালিয়ে যায়, তাহলে শক্তির ভারসাম্যহীনতা তখন গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন, পৃথিবীর কোনো শক্তি তাঁর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবার সক্ষমতা রাখে না।

একটা ঘটনা বলে আফগানিস্তানের বীরত্বগাথা শেষ করি। ২১ সেপ্টেম্বর, ২০০১, পবিত্র জুমাবার। আমিরুল মুমিনিন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর রহিমাহুল্লাহর বারো মিনিটের এক ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। সেখানে সাংবাদিক মোল্লা ওমরকে প্রশ্ন করেন, আপনি কি জানেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে?
এর জবাবে তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় উক্তিটি বলেন। তিনি উত্তর দেন, [আজ] আমার সামনে দুইটি ওয়াদা রয়েছে। এক আল্লাহর ওয়াদা, অন্যটি বুশের। আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে, আমার জমি বিশাল। যদি তুমি রবের পথে জিহাদ করো, তুমি পৃথিবীর যেখানেই থাকো না কেন, তুমি [আল্লাহর] নিরাপত্তা লাভ করবে... আর বুশ শপথ করেছে, দুনিয়ায় এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তুমি লুকিয়ে থাকলে আমি তোমাকে খুঁজে বের করতে পারব না। আমরা দেখব এই ওয়াদা দুটির মধ্যে কার ওয়াদা সত্যি হয় (Guardian, 2001)। তাঁর সেদিনের কথার উত্তর আজ আমরা জানি। মার্কিনীদের নাকের ডগায় আরও এক দশক বাস করে আল্লাহর ওয়াদার বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে স্বাভাবিকভাবে তিনি মারা যান। আর বুশের পর আরও তিন প্রেসিডেন্ট এসেও আফগানিস্তানে বিজয়ের মুখ দেখতে পায়নি।

টিকাঃ
১. প্রচুর 'প্রগতি' হলো।
২. Gul Mudin
৩. Calvin Gibbs
৪. David Bram
৫. Andrew Holmes
৬. Jeremy Morlock
৭. Adam Winfield
৮. Blackwater, পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে Xe Services রাখা হয়
৯. Robert Bales
১০. বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা আবরার ফাহাদকে যেভাবে হত্যা করেছিল, ঠিক যেন সেরকম ঘটনা।

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 ইরাক যুদ্ধ

📄 ইরাক যুদ্ধ


সাংবাদিক রন সাসকিন্ড বুশ প্রশাসনের একজন অফিশিয়ালের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, যিনি গর্ব করে বলেছিলেন, 'বর্তমানে আমরাই একটি সাম্রাজ্য। কাজ করার সময় আমরা আমাদের নিজস্ব বাস্তবতা সৃষ্টি করে নিই। আর তোমরা [সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী] যখন বিচক্ষণ দৃষ্টিতে সেই বাস্তবতা সম্পর্কে অধ্যয়ন করবে, আমরা পুনরায় অন্যান্য নতুন সব বাস্তবতা সৃষ্টিতে লিপ্ত হবো। সেগুলোও তোমরা অধ্যয়ন করবে, আর এভাবেই বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়। আমরা ইতিহাসের [মঞ্চে] অভিনেতা... আর তোমরা, তোমাদের প্রতিটি ব্যক্তি সেখানে পড়ে থাকবে শুধুমাত্র আমরা কী করি তা অধ্যয়ন করার জন্য' (Robinson, 2015)।

ইরাক যুদ্ধ শুরুর পূর্বে বুশ প্রশাসন বারবার অ্যামেরিকার সৈন্যদেরকে 'মুক্তিদাতা' ও 'শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী' হিসেবে ঘোষণা করত। যারা জীবন বাজি রেখে ইরাকে শান্তি, প্রগতি আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে এবং নির্যাতিত ইরাকি নাগরিকগণ তাদেরকে দু'বাহু মেলে সাদর আমন্ত্রণ জানাবে। যুদ্ধের পূর্বাপর সময়ে মার্কিনীরা কিছু বিমূর্ত পরিভাষা ব্যবহার করে। যেমন: দেশপ্রেম, গৌরব, শৌর্য-বীর্য, বীরত্ব—যেগুলোর প্রত্যেকটি ছিল বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু, বুশের এসকল বাগচাতুর্যকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার পরিবর্তে মার্কিন মিডিয়াগুলো মহিমান্বিত করে তুলে।

প্রথমে ফেব্রুয়ারি ২৮ (Bush G. W., 2003e) ও পরে মার্চ ১, ২০০৩-এ প্রেসিডেন্ট বুশ বলেন, 'ইরাকি জাতি তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, প্রচুর সম্পদ আর দক্ষ ও শিক্ষিত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্রের দিকে এগোবার ও স্বাধীনতার সঙ্গে বসবাস করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে' (Carruthers, 2016)। মার্চ ১৭, ২০০৩, যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পূর্বে বুশ ইরাকি জনগণকে 'ভরসা' দেওয়ার লক্ষ্যে বলেন, 'যদি আমাদের সামরিক কার্যক্রম শুরু করতেই হয়, (তাহলে) সেটি হবে চরমপন্থী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের শাসন করে। (এই হামলা) তোমাদের বিরুদ্ধে নয়' (Bush G. W., 2003)।

এপ্রিল ৯, ২০০৩, একদল ইরাকি বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের মূর্তিতে ভাঙচুর শুরু করে। এক ইরাকি হাতুড়ি নিয়ে সেটাতে আঘাত করতে শুরু করে, আরও কিছু লোক তাঁর সাথে যোগ দেয়। পরে অ্যামেরিকান মেরিন সদস্যদের সাহায্যে মূর্তিটি ভূপাতিত করা হয়। মার্কিন মিডিয়াতে মূর্তি ভাঙার এই ঘটনাটি যুদ্ধ জয়ের প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়। যদিও 'প্রকৃত' যুদ্ধ, অর্থাৎ অ্যামেরিকা আর ব্রিটিশ আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কিন্তু তখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। মিডিয়াতে মূর্তির ঘটনাটিকে ইরাকের জন-সমর্থিত বিশাল ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়।¹ কিন্তু, পরবর্তীকালে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ঘটনার সময় সেখানকার অধিকাংশ স্থান ছিল ফাঁকা। আর সেখানে উপস্থিতও ছিল মাত্র কয়েকশত মানুষ, যাদের মধ্যে সাংবাদিক আর অ্যামেরিকান সৈনিকদের সংখ্যাই ছিল বেশি। আর মূর্তিতে আক্রমণ করা ইরাকি বাসিন্দাদের অধিকাংশ-ই ছিল মার্কিন সমর্থিত ইরাকি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির সদস্য, যার নেতা ইরাকের কুখ্যাত গাদ্দার আহমেদ চালাবি। এই লোকটি ইরাকে মারণাস্ত্র থাকার ব্যাপারে মিথ্যা সংবাদ প্রচারে অ্যামেরিকাকে সহায়তা করে (Kellner, 2007)।

এইদিন সকাল এগারোটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সিএনএন প্রতি ৭.৫ মিনিট পরপর, ফক্স নিউজ প্রতি ৪.৪ মিনিট পরপর ভিডিওটি পুনঃপ্রচার করে (ProPublica, 2010)। পরের দিন সকল পত্রিকায় বিজয়ের 'সুসংবাদ' ছাপা হয়। সান ফ্রান্সিস্কো ক্রনিকেলস-এর সম্পাদক ও রিপোর্টার রবার্ট কলিয়ার-এর রিপোর্ট পরিবর্তিত করে ইরাকিদের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হিসেবে লিখে : ‘বিজয়! আমরা স্বাধীন!’ জনগণ (উল্লসিত হয়ে) চিৎকার করছে। ‘ধন্যবাদ! প্রেসিডেন্ট বুশ!’ (Collier & Squatriglia, 2003)। এই আর্টিকেলের সঙ্গে যুক্ত ছবিতে দেখা যায়, ইরাকি শিশুরা হাস্যোজ্জ্বল মুখে মার্কিন সেনাদের গালে চুমু দিচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এ ঘটনাকে বর্ণনা করে 'সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত প্যারিসবাসীদের মিত্রপক্ষের ট্যাংকে ফুল ছিটিয়ে দেওয়ার মতো, সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত জার্মানদের বার্লিন ওয়াল ভাঙার মতো, ... সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ইরাকিরা তাঁদের অত্যাচারীর মূর্তি ধ্বংস করেছে, সাদ্দাম হোসেনের মুখে জুতো ঘষে দিয়েছে' (Safire, 2003)।

কিন্তু, আসল পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরবর্তীকালে, ওই দিনের ঘটনার সময় সাদ্দাম হোসেনের মূর্তিতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা খাদিম আল-জাবুরি আফসোস করে বলেন, 'সাদ্দাম হোসেন মানুষ হত্যা করত, কিন্তু সেটি এখনকার সরকারের তুলনায় কিছুই নয়। সাদ্দাম বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাঁর স্থানে এখন এক হাজার সাদ্দাম রয়েছে' (BBC News, 2016)। সাদ্দামের মূর্তি ভাঙার এক মাস পর বুশ 'লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে' ব্যানার পিছনে রেখে ঘোষণা দেয়, গুরুত্বপূর্ণ লড়াই সমাপ্ত হয়েছে। ২০০৩-এর এপ্রিলে অ্যামেরিকা নির্বাসিত ইরাকি নেতা চালাবিকে ইরাকে ফেরত পাঠায়, তাঁদের আশা ছিল চালাবি ইরাকে তাঁদের সফল পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু জনগণ তাঁর ও অ্যামেরিকার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি। কারণ, ইরাকে অ্যামেরিকার ধ্বংসযজ্ঞ ইরাকি জনগণের সকল আশঙ্কাকে ছাড়িয়ে যায়।

ভিয়েতনামের মতো ইরাক যুদ্ধেও অ্যামেরিকা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নাপাম ব্যবহার করে। শুরুতে পেন্টাগন তাঁদের চিরায়ত স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাপাম ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে, পরবর্তীকালে অ্যামেরিকান পাইলট ও কমান্ডাররা প্রকৃত সত্য ফাঁস করে দেয় (Buncombe, 2003)। ইরাকের ফাল্লুজাহ শহরে ২০০৪-এর রক্তাক্ত যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অ্যামেরিকান সৈন্যরা বিদ্রোহীদের গ্রেফতার করতে সেখানকার হাসপাতালগুলোতে আক্রমণ করে। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সগুলো মার্কিন হামলায় আহত বেসামরিক নাগরিকদের সেবা দিতে চাইলে তারা অ্যাম্বুলেন্সে গুলি করত। এমনকি সেবাদান বাধাগ্রস্ত করতে সন্তান জন্মদানের টেবিলে কর্মরত থাকাকালীন ডক্টরদেরকেও তারা গ্রেফতার করে (Jamail, 2004)।

২০০৪ সালে ইরাকি নাগরিকদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০% নাগরিক তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ৯২% নাগরিক কোয়ালিশন ফোর্সকে ‘দখলদার' হিসেবে সাব্যস্ত করে, মাত্র ২% ইরাকি সেক্যুলার-উচ্ছিষ্টভোগী রাজাকার তাদেরকে 'ত্রাণকর্তা/মুক্তিদাতা' হিসেবে ঘোষণা দেয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ-ই (৫৫%) জানায়, কোয়ালিশন ফোর্স যদি তাৎক্ষণিক ইরাক ত্যাগ করে, তাহলেই তারা অধিক নিরাপদ অনুভব করবে (Global Policy Forum, 2004)।

পরবর্তীকালে এই চিত্র তেমন বদলায়নি। ২০০৭-এ ইরাকিদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ৫৬%, চাকরির ক্ষেত্রে ৮০%, বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ৯২%, বিশুদ্ধ পানির ক্ষেত্রে ৭৫%, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ৬৭%, মৌলিক জিনিস প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ৬১%, চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৭৪% ইরাকি জানায় যে, উল্লিখিত বিষয়ে পরিস্থিতি 'বেশ খারাপ' বা 'খুবই খারাপ' (Global Policy Forum, 2007)। ৮৫% নাগরিক জানায়, কোয়ালিশন ফোর্সের ওপর তাঁদের কোনো আস্থা নেই।

তাহলে, এ কেমন স্বাধীনতা, যেখানে 'স্বাধীন' হওয়া ব্যক্তিরা স্বাধীনতার বিরোধিতা করে? আর কেনই-বা অ্যামেরিকান আগ্রাসীরা ইরাকি নাগরিকদের মতামত যাচাই করে দেখল না, 'অধিকাংশ' ইরাকিরা অ্যামেরিকানদেরকে ইরাকি ভূখণ্ডে 'স্বাধীনতা' আনয়নকারী হিসেবে চায় কি না? জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া এই শাসনব্যবস্থাকে 'স্বাধীনতা' বলার সায়েন্সটা কী?

নভেম্বর ১৯, ২০০৫, 'কমপক্ষে’ ২৪ জন ইরাকি বেসামরিক (নারী, শিশু-সহ) নাগরিককে মার্কিন সৈন্যরা হত্যা করে। আটজন মেরিন সেনাকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে অভিযুক্ত করা হয়। অথচ, আটজন আসামির মধ্য থেকে মাত্র একজনকে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৯০ দিন জেলে থাকার 'শাস্তি' প্রদান করা হয় (CNN Editorial, 2021)।

অ্যামেরিকার আগ্রাসনের সূচনার তিন বছর পর, ইরাকি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সামিরা তাঁর কর্মস্থল প্রসূতি বিভাগে কিছু 'সমস্যা' লক্ষ করলেন। তাঁর হাসপাতালে মহিলারা তাঁদের এমনসব বাচ্চা নিয়ে আসতে শুরু করল, যাদের পেট থেকে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বের হয়ে আছে, পা দুটি জোড়া লেগে লেজের আকৃতি গঠন করেছে। কারও দেহের চামড়া সাপের মতো দেখতে। কোনো শিশু শ্বাসগ্রহণে প্রায় অক্ষম থাকার কারণে মুমূর্ষু অবস্থায় শয্যাশীন। কারও বাচ্চা মস্তিষ্কে ব্রেইন সুরক্ষিত রাখার স্কাল বা খুলি ছাড়াই জন্ম নেয়, ফলাফল—জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক মৃত্যু (Gottesdiener, 2020)। এই বিশেষ সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম।² একবার চিন্তা করুন তো, ভয়াবহ মরণবাহী যুদ্ধের মাঝে নবজীবনের জয়গান গেয়ে দীর্ঘ দশ মাস গর্ভধারণ করার পর যখন কোনো মা তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তানকে জন্ম দিয়ে দেখতে পান, তাঁর সন্তানের এই নির্মমতম পরিণতি, তখন তাঁর ঠিক কেমন বোধ হয়? কতটা নির্মম সেই মুহূর্তটা? একবার সেই অনুভূতিটা কল্পনা করার চেষ্টা করুন; আর যদি পুরুষ হয়ে থাকেন, তাহলে মাহরাম কোনো নারীকে ছবিগুলো দেখিয়ে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে পারেন, তারা হয়তো তাঁদের সেই অকথ্য কষ্টের কিছুটা ধারণা করতে পারবে।

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের যুদ্ধেও মার্কিন বাহিনী ইরাকে মিলিয়ন রাউন্ড ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে ইরাকি জনগণের ওপর যখন এর বিরূপ প্রভাবের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তখন পেন্টাগন দাবি করে যে, এটি সিরিয়াস কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি বহন করে না। সেই দাবির ওপরই তারা অটল থাকে। হোয়াইট হাউস দাবি করে, ইরাকি সরকার সিম্প্যাথি আদায়ে মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করছে; তাই তারা সুনিশ্চিতভাবে এটির ব্যবহারে ঝুঁকির সম্ভাব্যতা নাকচ করে দেয় (Apparatus of Lies, 2003)।³ অথচ, অ্যামেরিকান বহু সৈন্যও পরবর্তীকালে ইউরেনিয়ামের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, ১৯৯১-এর আক্রমণে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের পরিমাণ ছিল কমপক্ষে ২৮৬ টন, আর ২০০৩-এর আগ্রাসনে তা ছিল ১৩০ টন (Hastings, 2006)।

ইরাকের তিকরিত শহরে যুদ্ধ করা সার্জেন্ট মিলার্ড⁴ নামক এক সৈনিক যুদ্ধে ঘটা এক নির্মম ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ১৮ বছর বয়সী এক মার্কিন সেনা হাস্তায় নিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল পয়েন্টে বসে ছিল। রাস্তা দিয়ে এক ইরাকি গাড়ি দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছিল। মুহূর্তের মধ্যে ওই সৈন্য 'সিদ্ধান্ত' নিয়ে ফেলল, এটি একটি আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী গাড়ি। পরের এক মিনিটে সে গাড়িটি লক্ষ্য করে মোট 'দুইশত' রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। পরে দেখা গেল, গাড়িতে অবস্থানকারী বাবা, মা, দুটি ছোট্ট শিশু—চার বছরের ছেলে ও তিন বছরের মেয়ে—গুলির আঘাতে ওই জায়গাতেই তাৎক্ষণিক নিহত হয়। ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল কর্নেলকে এ ব্যাপারে জানালে তিনি বলেন, 'যদি এই বদমাশ ইরাকিরা গাড়ি চালাতে শিখত, তাহলে এরকম হতো না' (Hedges & Al-Arian, 2008, pp. XIV-XV)। ব্যস, ওইটুকুই। সেখানেই ঘটনার সমাপ্তি, আর কোনো তদন্ত নেই, নেই কোনো সাজা।

যুদ্ধের পরিস্থিতি যখন তিক্ত হতে শুরু করে, তখন সেনাদের অনেকেই নিজেদেরকে আর 'মুক্তিদাতা', 'বিজয়ী' মনে করত না। এক মার্কিন সেনা মিডলটন⁵ বলেন, 'অনেক ব্যক্তিই (সেনা) এই পুরো ব্যাপারটাকে সমর্থন দেয় যে, যদি তারা আমাদের মতো ইংরেজি বলতে না পারে, এবং তাঁদের ত্বক কালো হয়, (তাহলে) তারা আমাদের মতো মানুষ নয়। তাই আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারি।' এটিই ছিল পুরো ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিনীদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার নমুনা। যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়েই অ্যামেরিকানরা শারীরিক আর বস্তুগত অগ্রসরতা অক্ষুণ্ণ রাখে, কিন্তু নৈতিকতার জায়গায় গিয়েই তারা হেরে বসে। অপ্রয়োজনীয়, এলোপাথাড়ি অভিযানে গ্রেফতারকৃত হতভম্ব ইরাকি বন্দিদের কাপড় খুলে নগ্ন করে তাদেরকে তপ্ত রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অসহায় বন্দিদের নিপীড়ন করাটা কোয়ালিশন বাহিনীর জন্য পরিণত হয় একটা বিকৃত খেলায় (Hedges & Al-Arian, 2008)।

অনেক সৈন্যই যুদ্ধে অংশগ্রহণ শেষে স্বদেশে ফিরে হৃদয়ে চেপে রাখা সত্যের ভার সইতে না পেরে তাঁদের দেখা নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্ণনা করেন। সার্জেন্ট ফ্লাট জানুয়ারি ২০০৫-এর একটি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মসুলের হাইওয়েতে এক মার্কিন কনভয় তাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। এর পিছনে থাকা একটি গাড়ি দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের বহরের বেশ কাছে চলে গিয়েছিল; আর তখন মার্কিন কনভয় থেকে সেনারা গাড়িটি লক্ষ্য করে গুলি করে। গাড়িতে বসা এক নারীর মুখমণ্ডলে গুলি লেগে তিনি তৎক্ষণাৎ নিহত হন। মহিলাটির ছেলে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে ছিল, আর মহিলার তিনটি ছোট ছোট কন্যা শিশু পেছনের সিটে বসেছিল। ফ্লাট ওই সময় মসুলের প্রধান হাসপাতালের পাশেই অবস্থান করছিলেন, গাড়িটি দ্রুত সেখানে পৌঁছলে তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। তিনি তখন দেখতে পান, ছোট ছোট বাচ্চাগুলো তখন তাঁদের সদ্য খুন হওয়া মায়ের জন্য কান্না করছে (Hedges & Al-Arian, 2008)।

পশ্চিমা সভ্যতার এই নগ্ন চেহারা সচেতন কোনো ব্যক্তির পক্ষে উপেক্ষা করা অসম্ভব। ইরাক যুদ্ধের ব্যাপারে বুশের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি স্কট মেকলিল্যান্ড মন্তব্য করেন, ইরাকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত একটি 'পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা' মেশিন-এর মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। যেটি মার্কিন নাগরিকদের ইরাক যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে ভুল পথে পরিচালিত করেছে (McClellan, 2008)। বিশ্বের সুপারপাওয়ার রাষ্ট্রের কর্ণধাররা স্বাধীনতার বুলি প্রচার করে ইরাককে এমন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, যে অবস্থা থেকে ইরাকি জনগণ আজও উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়নি। এক সময়ে জ্ঞানের রাজধানী বিবেচিত হওয়া সুপ্রাচীন বাগদাদ আর ইরাককে অ্যামেরিকা রূপান্তরিত করে মৃত্যুপুরীতে। যেখানে জীবনের অনিশ্চয়তাই যেন এক সুনিশ্চিত বাস্তবতা।

টিকাঃ
১. বাংলাদেশের শাহবাগে নাস্তিকরা রাষ্ট্রীয় মদদে যে পৈশাচিক নাটক মঞ্চায়িত করে, বঙ্গীয় সেক্যুলার মিডিয়াও লজ্জাহীনতার চরমতম উদাহরণ দেখিয়ে সে ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সে নষ্টামিতে সারাদেশের সমর্থন রয়েছে বলে প্রচার করে।
২. Depleted Uranium হলো Enriched Uranium উৎপাদনের সময় প্রাপ্ত বাই প্রোডাক্ট। এই উপাদানটি বসনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাকের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।
৩. ১৯৯১-এর উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েত থেকে পলায়নপর ইরাকি সেনাদের ওপর 'Highway of Death'-এ মার্কিন বাহিনী Depleted Uranium সমৃদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে সে এলাকার জনগণের মধ্যে Birth defect ও Cancer-এ আক্রান্ত হবার হার বৃদ্ধি পায়।
৪. Geoffrey Millard
৫. Spc. Josh Middleton

ফন্ট সাইজ
15px
17px