📄 সশস্ত্র সংগঠনের সম্পৃক্ততা
বুশের প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু করার আগেই সিআইএ জানিয়েছিল যে, ‘সাদ্দাম হোসেন ইরাকের অভ্যন্তরে সক্রিয় ইসলামি ‘চরমপন্থীদের’ হুমকি হিসেবে দেখে (Williams, 2017)। সাদ্দাম হোসেন ও ওসামা বিন লাদেন স্বভাবগত পার্টনার হবার কথা নয়' (Byrd & Reid, 2009)। তবে, ইরাকের কাছে মারণাস্ত্র থাকা যেহেতু অ্যামেরিকার জন্য ততটা হুমকিস্বরূপ নয়, তাই 'হুমকি'র কালোমেঘ সৃষ্টি করতে মঞ্চে উপস্থিত করা হলো আল কায়েদার গল্প। ইরাকের সঙ্গে আল কায়েদা ও অন্যান্য সংগঠনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও বুশ প্রশাসন বারবার একই মিথ্যা উচ্চারণ করতে থাকল। বুশ প্রশাসনের আল কায়েদা বিষয়ক প্রোপাগান্ডা টাইমলাইনের চিত্র (Hinchey, 2007) অনেকটা এরকম :
* ডিসেম্বর ৯, ২০০১, এনবিসিতে চিনী বলেন, 'এটা বেশ ভালোভাবে নিশ্চিত (করা হয়েছে) যে, সে [৯/১১ হামলার অন্যতম মুহাম্মাদ আতা] প্রাগে যায়, আক্রমণের কয়েক মাস পূর্বে সে 'ইরাকি' ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের এক সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে' (LaMonica, 2014)। যদিও সিআইএ, এফবিআই উভয় সংগঠনই জানত, এরকম কিছু আসলে কখনোই ঘটেনি। কিন্তু হোয়াইট হাউসের প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।
* সেপ্টেম্বর ১২, ২০০২, জাতিসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে বুশ দাবি করে, ইরাক নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরির চেষ্টায় লিপ্ত এবং আল কায়েদার সদস্যরা ইরাকে অবস্থান করছে (Bush G. W., 2002f)।
* সেপ্টেম্বর ২৫, ২০০২, বুশ বলেন, 'আপনি যখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে কথা বলবেন, তখন আপনি আল কায়েদা ও সাদ্দামের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন না' (Pincus, 2006)।
* সেপ্টেম্বর ২৬, ২০০২, বুশ বলেন, '... অতিবাহিত প্রতিটি দিন হতে পারে সেই দিন, যখন ইরাকি সরকার পারমাণবিক অস্ত্র কোনো সন্ত্রাসী মিত্রকে দিয়ে দিয়েছে' (Bush G. W., 2002b)।
* অক্টোবর ১৪, ২০০২, বুশ বলেন, '(সাদ্দাম) হলো সেই ব্যক্তি, যে আমার মতে, আল কায়েদাকে সম্মুখ বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে।'
* নভেম্বর ৭, ২০০২, বুশ বলেন, 'সাদ্দাম একটি হুমকি। কারণ, সে আল কায়েদার সঙ্গে কার্যক্রম চালাচ্ছে।'
* জানুয়ারি ২৮, ২০০৩, স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অ্যাড্রেসে বুশ দাবি করেন, 'ইন্টেলিজেন্স সোর্স-এর প্রমাণাদি, গোপন যোগাযোগ ও কাস্টডিতে থাকা ব্যক্তিদের জবানবন্দি প্রমাণ করে যে, সাদ্দাম হোসেন আল কায়েদা সহ (অন্যান্য) সন্ত্রাসী গ্রুপকে অর্থায়ন ও সুরক্ষা প্রদান করে' (Bush G. W., 2003)।
* জানুয়ারি ৩১, ২০০৩, বুশ বলেন, 'কোনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আক্রমণ ও হত্যা করা এবং কোনো প্রমাণ পেছনে ফেলে না রাখার চাইতে বেশি কিছু সাদ্দাম হোসেন আশা করে না।'
* মার্চ ১৬, ২০০৩, চিনী বলেন, 'আমাদের এই প্রশ্নও উত্থাপিত করতে হবে যে, সন্ত্রাসীরা কোথা থেকে মারণাস্ত্র, কেমিক্যাল অস্ত্র, বায়োলজিক্যাল অস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্র লাভ করবে। এ ক্ষেত্রে সাদ্দাম হোসেন প্রধান সন্দেহভাজনে পরিণত হয়। কারণ আমরা জানি, সে প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সক্ষমতা, কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্রাদি অর্জন করেছে। আমরা জানি, সে কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আমরা জানি, সে উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে এই প্রোগ্রামগুলো পুনরায় চালু করেছে। আমরা জানি, সে আবারও পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা করেছে এবং আমরা জানি আল কায়েদা সহ অন্যান্য দলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক রয়েছে।'
* মার্চ ১৭, ২০০৩, বুশ বলেন, 'বিপদ সুস্পষ্ট : কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল বা একদিন ইরাকের সহায়তায় পাওয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা তাদের ব্যক্ত করা অভিলাষ পূর্ণ করবে এবং হাজারও কিংবা লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করবে, হয়তো আমাদের রাষ্ট্রে বা অন্য কোথাও' (Bush G. W., 2003d)।
* মে ১, ২০০৩, যুদ্ধে আপাত বিজয় লাভের পর বুশ তাঁর কুখ্যাত 'মিশন সফল’ স্পীচ-এ বলেন, 'আমরা আল কায়েদার এক মিত্র, সন্ত্রাসী অর্থায়নের একটি উৎসকে (সাদ্দাম) হারিয়েছি।' (Bush G. W., 2003c)।
* সেপ্টেম্বর ১৪, ২০০৩, চিনী বলেন, 'ইরাকি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, যা ৯০-এর দশকে বিকশিত হয়। এটি সুস্পষ্ট অফিশিয়াল পলিসি।'
ইরাক আক্রমণের পর সেখানকার ৬০০,০০০ ডকুমেন্ট ও গ্রেফতারকৃত ইরাকি কর্মকর্তাদের জবানবন্দি যাচাই করেও তারা ইরাক ও আল কায়েদার মধ্যে কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাননি (Schor, 2008)। পাবে কোথা থেকে, যে মিথের সৃষ্টি অ্যামেরিকার যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদীদের মগজে, সেটি কি আর ইরাকের মাটিতে খুঁজে পাওয়া যাবে? পরবর্তীকালে বুশের সাবেক টপ কাউন্টার টেররিজম উপদেষ্টা ক্লার্ক বুশ ও রামম্ফেল্ড-এর বিরুদ্ধে ইরাক ও আল কায়েদার সম্পর্কহীনতার তথ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করার কথা প্রকাশ করেন। এর আগে বুশ যখন ইরাক-আল কায়েদা সংযোগ খুঁজে বের করার জন্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিল, তখন তিনি এ ব্যাপারে রিপোর্ট পেশ করেন। ক্লার্কের ভাষায়—
আমরা সকল এফবিআই বিশেষজ্ঞ, সকল সিআইএ বিশেষজ্ঞ একত্রিত হলাম।... সিআইএ ও এফবিআই-তে আমরা রিপোর্ট পাঠালাম। ... তারা রিপোর্টকে ত্রুটিমুক্ত সাব্যস্ত করল। অতঃপর আমরা সেটি প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠালাম, আর সেটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মাধ্যমে ফেরত এল। সেটি ফেরত পাঠিয়ে বলা হলো : 'ভুল উত্তর। ... কাজটি আবার করো” (Leung, 2004)।
তারা 'সঠিক' উত্তর বা সোজা ভাষায় আল কায়েদার সঙ্গে ইরাকের কাল্পনিক সম্পর্কের তথ্য চাচ্ছিল। ইন্টেলিজেন্স এজেন্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক সাসকিন্ড¹ বলেন, 'ওয়াইট হাউস (ইরাকি ইন্টেলিজেন্স প্রধান তাহির জলিল) Habbush-এর পক্ষ থেকে সাদ্দামের নিকট ১ জুলাই, ২০০১ তারিখে লেখা একটি ভুয়া চিঠি সাজায়। এটিতে বলা হয়, সেপ্টেম্বর ১১ ঘটনার নায়ক মুহাম্মাদ আত্তা তাঁর মিশনের জন্য ইরাকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এভাবে পরিশেষে দেখানো হয়, সাদ্দাম ও আল কায়েদার মধ্যে অপারেশনের যোগসূত্র ছিল...।' ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে Habbush-এর বৈঠকের পর বুশকে যখন জানানো হলো সেখানে কোনো মারণাস্ত্র নেই, তখন তিনি বেপরোয়া হয়ে বলেন, 'তারা (সিআইএ) ওকে আমাদের “কেইস” তৈরিতে সহায়ক কিছু (তথ্য) দেওয়ার কথা জিজ্ঞেস করে না কেন' (Suskind, 2009)?
টিকাঃ
১. Ron Suskind
📄 ইরাক যুদ্ধে বৈশ্বিক ‘জনসমর্থন’
মার্কিন প্রশাসন ও মিডিয়ার প্রোপাগান্ডায় অ্যামেরিকানরা কী পরিমাণ বিভ্রান্ত হয়-তার দৃষ্টান্ত দেখা যায় ইরাক যুদ্ধের জরিপগুলোতে। মার্চ ২০০৩-এর এক জরিপে ইরাক যুদ্ধের ব্যাপারে বৈশ্বিক মনোভাবের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে মাত্র ৩৫% মার্কিন নাগরিক এই সঠিক উত্তরটি প্রদান করতে সক্ষম হয় যে, বিশ্বের অধিকাংশ জনগণই ইরাক-যুদ্ধের বিরোধী। আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০০৩-এ প্রায় ৪৮% অ্যামেরিকানদের ধারণা ছিল, মুসলিম বিশ্ব মার্কিন যুদ্ধনীতিকে সমর্থন করে (!)। অথচ এই ধারণা (এক মাত্র কুয়েত ব্যতীত) প্রায় সকল মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভুল (Kull, 2003)।
অর্থাৎ, ইরাকের বিধ্বংসী অস্ত্র, 'সন্ত্রাসী' সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বৈশ্বিক জনসমর্থন, পরবর্তীকালে ইরাকি বিদ্রোহ, অ্যামেরিকার তথাকথিত 'জাতি গঠন প্রক্রিয়া'-প্রায় সব ক্ষেত্রে অ্যামেরিকান প্রশাসন ও মার্কিন মিডিয়া তাদের জনগণকে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখে। একদিকে সর্বাধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত সন্ত্রাসী কোয়ালিশন ফোর্স ইরাকে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। অন্যদিকে ইরাকের জনগণের প্রাণরক্ষার্থে সৃষ্ট বিদ্রোহকে তারা 'সন্ত্রাসী', 'শত্রু' হিসেবে প্রচার করে। বিশ্বের কাছে তাদেরকে পশু হিসেবে চিত্রায়িত করে। মার্কিনীরা মানব-জাতির পাতা থেকে তাদের নাম-নিশানা মুছে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা অব্যহত রাখে।
ইউনাইটেড স্টেট হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস কমিটি অন গভর্নমেন্ট রিফর্ম এর রিপোর্ট অনুযায়ী, (ওই রিপোর্ট পাবলিশ হওয়ার পূর্বে) বুশ, চিনী, রামম্ফেল্ড, কলিন পাওয়েল, রাইস মিলে ইরাকের ব্যাপারে সর্বমোট ২৩৭টি বিভ্রান্তিকর বিবৃতি দিয়েছেন। এই বিবৃতিগুলো ১২৫টি ভিন্ন ভিন্ন উপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি ভাষণ, ২৬টি প্রেস কনফারেন্স ও ব্রিফিং, ৫৩টি সাক্ষাৎকার, ৪টি লিখিত বিবৃতি, ২টি কংগ্রেশনাল টেস্টিমনি (২০০৪)।¹
দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের পথ পরিষ্কারের এ প্রোপাগান্ডার সূচনা হয় মার্চ ২০০২-এ; যখন চিনী বলেন, 'আমরা জানি তাদের (ইরাকের) কাছে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্র রয়েছে।' ২৩৭টি বিবৃতির মধ্যে ১৬১-টিই করা হয় যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বে, যুদ্ধের সম্মতি আদায়ের লক্ষ্যে। সেপ্টেম্বর ১২, ২০০২ থেকে জুলাই ১৭, ২০০৩-এর মধ্যে বুশ ৫৫টি; মে ২২, 2002 থেকে নভেম্বর ০২, ২০০৩ এর মধ্যে রামস্কেল্ড ৫২ টি; এপ্রিল ০৩, ২০০২ থেকে অক্টোবর ৩, ২০০৩ এর মধ্যে Powell ৫০ টি; এবং সেপ্টেম্বর ৮, ২০০২ থেকে সেপ্টেম্বর ২৮, ২০০৩ এর মধ্যে Rice ২৯ টি 'বিভ্রান্তিকর' বিবৃতি প্রদান করে (২০০৪)।
প্রোপাগান্ডা সমরের সম্মুখ সারির এই পাঁচ সৈনিক সম্মিলিতভাবে ইরাকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক হামলার আশঙ্কার ব্যাপারে ১১টি, ইরাকের নিউক্লিয়ার কার্যক্রমের ব্যাপারে ৮১টি, কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ব্যাপারে ৮৪টি এবং ইরাকের সঙ্গে আল কায়েদার সম্পৃক্ততার ব্যাপারে ৬১টি মিথ্যা বিবৃতি প্রদান করে (২০০৪)।
বলাই বাহুল্য, এই প্রোপাগান্ডা প্রজেক্ট পরিচালনার প্রায় পুরোটা সময় মিডিয়া সম্পূর্ণরূপে তাদের সহায়তা করে। যুদ্ধ শুরুর পরে টিভি নিউজ চ্যানেলগুলোর ওপর করা এক জরিপে দেখা যায়, যুদ্ধ সংক্রান্ত টিভি নিউজে উপস্থিত হওয়া দুই-তৃতীয়াংশ সংবাদ অতিথি ছিলেন সাবেক বা তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা। যুদ্ধবিরোধী অতিথির সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬ জন; যা মোট অতিথির মাত্র ১%। এদের মাঝে কেউই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। অ্যামেরিকার ৭১% অতিথি ও ৯৭% সংবাদের উৎস ছিল যুদ্ধপন্থী। ব্রিটিশ নিউজ সোর্সের ৯৫% উৎস ছিল সরকারি, বাকি ৫%-ও ছিল সাংবাদিক। ইরাকের ক্ষেত্রে সংবাদে যে-সকল সাধারণ নাগরিকের বক্তব্য তুলে ধরা হয়, তাদের ৪৯% সাদ্দামবিরোধী বক্তব্য রাখে, ওই সময়ে মাত্র ১৮% যুদ্ধ বিরোধী বক্তব্য প্রচার করা হয়। সংবাদ-মাধ্যমে দেখানো ৩% মার্কিন যুদ্ধবিরোধী মতামতের বদলে ওই সময়ে প্রকৃতপক্ষে ২৭% অ্যামেরিকান যুদ্ধবিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন। পার্থক্যটা বিশাল, প্রায় নয় গুণ (Rendall, 2003)।
সামগ্রিকভাবে, অ্যামেরিকায় প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শ আর ১৯৯১ থেকে চলমান প্রোপাগান্ডার কারণে মার্কিন জনমত বুশের ইরাক এজেন্ডার প্রতি আগে থেকেই পজিটিভ ধারণা রাখত। তবে, প্রশাসনিক প্রোপাগান্ডা আর মিডিয়া প্রোপাগান্ডার কম্বিনেশনে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন অধিকতর তীব্রতর হয়। ২০০২-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৩-এর মার্চে হামলা শুরুর সময় পর্যন্ত জনমত জরিপ করলে তাতে রাজনৈতিক-মিডিয়া সংযোগের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের শুরুর সময়টাতে ৫৫% নাগরিক সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে সরানোর সিদ্ধান্ত যথার্থ মনে করতেন। সেখানে মার্চ ২০০৩-এ যুদ্ধের আগ মুহূর্তে আক্রমণে সমর্থনের হার প্রায় ১০% বৃদ্ধি পায়। এর মাঝে ডেমোক্রেটদের যুদ্ধ বিরোধিতার সময় জনসমর্থন হ্রাস পেয়েছিল। পরবর্তীকালে আক্রমণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবার পর প্রচার-প্রচারণায় সমর্থন আবারও বৃদ্ধি পায় (DiMaggio, 2015, p. 92, Figure 2.10)।
টিকাঃ
১. সাক্ষ্য বা বিবৃতি।
📄 যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী পর্যায়ে প্রোপাগান্ডা
ইরাক যুদ্ধের শুরুতে মার্কিনীদের যে উদ্যম ছিল, পরবর্তীকালে সেটি হ্রাস পেতে খুব বেশি সময় নেয়নি। মাত্র এক বছর পরই অধিকাংশ মার্কিনী যুদ্ধের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা প্রকাশ করতে আরম্ভ করে। বুশ প্রশাসন এটি ভালো করেই জানত যে, ইরাক যুদ্ধ চলমান রাখতে চাইলে জনসমর্থন খুবই জরুরি। তাই, যুদ্ধ সূচনার পরও তাদের প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন থাকে অব্যাহত। পরবর্তীকালে তাদের প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে যখন সত্যটা প্রকাশ হয়ে যায়, তখন ইরাকে যুদ্ধ করার ব্যাপারে মারণাস্ত্র-এর বদলে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ওয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি Scott McClellan-এর ভাষ্যমতে, তাদের লক্ষ্য ছিল 'প্রতিটি সংবাদমাধ্যম জয় (দখল)' (McClellan, 2008, p. 174)। তাদের কাজ ছিল 'জাতীয় নিরাপত্তা ও বিশেষ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফোকাস অব্যাহত রাখা, যেটি প্রেসিডেন্টের পুনঃনির্বাচন ক্যাম্পেইনের প্রধান থিমে রূপান্তরিত হবে। এই দৃষ্টিতে দেখল, ইরাক যুদ্ধ শুধু সমর্থনযোগ্যই নয়; বরং অপরিহার্য।' (McClellan, 2008)।
যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রোপাগান্ডা ও এর বিপরীতে প্রকৃত তথ্যগুলো ছিল অনেকটা এইরকম :
* May ২৯, ২০০৩-এ বুশ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমরা মারণাস্ত্র খুঁজে পেয়েছি। আমরা বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ল্যাবরেটরিসমূহ খুঁজে পেয়েছি।' (Bush G. W., 2003b)।
* জুন ৭, ২০০৩, অ্যামেরিকা ও ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞরা মরণঘাতী রহস্যজনক ট্রেলারের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন (Miller & Broad, 2003b)।
* জুন ৮, ২০০৩, কলিন পাওয়েল বলেন, 'আমরা 'মোবাইল-ভ্যান' উন্মোচিত করেছি...। আমরা জানি যে, তারা (ইরাকিরা) প্রতারণা ও এই সকল বস্তু লুকানোয় পারদর্শী। তাই সামান্য ধৈর্য প্রয়োজন' (Powell, 2003a)।
* জুন ১৫, ২০০৩, ইরাকে পাওয়া দুটি বহনযোগ্য কার্গোর অনুসন্ধানের পর ব্রিটিশ টিম সিদ্ধান্তে আসে যে, সেগুলো জৈব অস্ত্রের ল্যাব ছিল না, যেমনটি বুশ ও টনি ব্লেয়ার দাবি করে আসছিলেন। বরং সেগুলো আর্টিলারি বেলুনে ভরার জন্য হাইড্রোজেন উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো। আর ইরাকিরাও এই কথা বহু আগে থেকেই বলে আসছিল (Beaumont et al., 2003)।
* সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৩, সাবেক জাতিসংঘ অস্ত্র নিরীক্ষক স্কট রিটার বলেন, 'ইরাকে প্রাপ্ত দুটি চলমান বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ল্যাবরেটরির কথা বুশ মজুদকৃত অবৈধ অস্ত্রের সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এটি এখন পরিষ্কার যে, এসকল তথাকথিত 'ল্যাবগুলো' আশির দশকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া হাইড্রোজেন উৎপাদনকারী ল্যাব ছাড়া আর কিছুই নয়' (Ritter, 2003)।
অর্থাৎ, ইরাকের মারণাস্ত্র-এর ব্যাপারে প্রকৃত সত্য সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর পরও নির্লজ্জ মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের প্রোপাগান্ডা বন্ধ করার কথা ভাবেনি। সেপ্টেম্বর ১৪, ২০০৩ এও চিনী নির্লজ্জের মতো বলেছিলেন, সাতটি চলমান ল্যাবের মধ্যে দুটি পাওয়া গেছে (Cheney, 2003)।
ইরাক যুদ্ধে পেন্টাগন কর্মকর্তারা মিডিয়া রিপোর্টারদেরকে সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ফিক্স করে দেওয়ার¹ পলিসি গ্রহণ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা ৬০০-এর মতো সাংবাদিকদের বাছাই করে তাদেরকে সামরিক ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় (Pew Research Center, 2003)। এর ফলে যুদ্ধের ময়দানের সংবাদ পুরোটাই মার্কিন বাহিনীর সমর্থনে কাজ করে। কারণ, বিদ্রোহীদের হামলা মার্কিন বাহিনীর সাথে সাথে রিপোর্টারদের ওপরও হতো, যেহেতু তারা একই সঙ্গে ইরাকে নিজেদের কাজ করত।
সংবাদপত্রের মতোই আরেকটি চমকপ্রদ প্রোপাগান্ডার সোর্স ছিল সামরিক 'বিশেষজ্ঞ'রা। যুদ্ধকালীন সময়ে তারা প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে হাজির হতো নিয়মিত অতিথি হিসেবে। তারা তাদের বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ মতামত পেশ করত। কিন্তু, পেন্টাগন এই সকল বিশেষজ্ঞদেরকে যুদ্ধের ময়দানে অ্যামেরিকার 'পারফরমেন্স'-এর ব্যাপারে ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের লক্ষ্যে নিয়োগ করে। ইরাক যুদ্ধের সূচনালগ্নে চালু হওয়া এই প্রকল্পের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞরাই মিলিটারি কন্ট্রাক্টরদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল, যে কন্ট্রাক্টররা খোদ ইরাক যুদ্ধে অর্থলগ্নি করেছে। বিশেষজ্ঞদের এই দল ১৫০টিরও বেশি মিলিটারি কন্ট্রাক্টরের লবিস্ট, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বার অথবা কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিল। ছোট-বড় কোম্পানি মিলিয়ে মিলিটারি কন্ট্রাক্টরগুলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে শত শত বিলিয়ন অর্থ কামানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। যে প্রতিযোগিতায় 'প্রশাসনের ভিতরকার তথ্য' আর 'সিনিয়র অফিসারদের নিকট প্রবেশাধিকার'-এর মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি।
বিশেষজ্ঞরা সিনিয়র মিলিটারি লিডারদের সঙ্গে শত শত গোপন বৈঠক করে। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরাক, গুয়ান্তানামোতে ভ্রমণ করানোর ব্যবস্থা করা হয়, ক্লাসিফাইড তথ্যে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। কখনো কখনো হোয়াইট হাউস, স্টেট ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের চিনী, আলবার্তো গঞ্জালেস-এর মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিরা ও তাদের ব্রিফিং দিত। এ সকল সুবিধার বিনিময়ে বিশেষজ্ঞরা মিডিয়ায় তাদের বক্তব্যে 'সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি'র প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করল। যদিও প্রায়শই তারা সন্দেহ করত যে, তাদেরকে সরবরাহ করা তথ্যে গড়মিল রয়েছে। কিন্তু তাদেরকে দেওয়া সুবিধা হারাবার ভয়ে তারা স্বীয় সন্দেহগুলোকে দাবিয়ে রাখত। গুয়ান্তানামো কারাগারে নির্যাতনের ঘটনা যখন ফাঁস হলো, সেখান থেকে ঘুরে এসে বিশেষজ্ঞরা গুয়ান্তানামোর পরিবেশকে ‘পেশাদার’ আর মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্টগুলোকে দাবি করে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ হিসেবে।
Military এক্সপার্টদের পরিচালিত এই প্রোপাগান্ডার ফলাফল কী? জনসংযোগ কর্মকর্তা ক্লার্কের জ্যৈষ্ঠ সহকারী ব্রেন্টাস-এর ভাষায়, কোনো কোনো দিন ‘বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি [টিভি] স্টেশনে হাজির হতে সক্ষম হয়। আর তাদের প্রত্যেকেই প্রশাসনের মতবাদ প্রচারে সফল হয়।’ ক্লার্কের উদ্দেশ্যে দেওয়া রামম্ফেল্ড-এর এক মেমোতে দেখা যায়, তিনি বিশেষজ্ঞদের কাজে খুশি হয়ে বলেন, ‘...যারা বক্তা হিসেবে ভালো দক্ষতা দেখিয়েছে, তাদের নিয়ে ভাবা যায়’ (Barstow, 2008)।² পরবর্তীকালে নিউ ইয়র্ক টাইমস অ্যামেরিকার ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে ৮০০০ পৃষ্ঠা ইমেইল, ট্রান্সকিপ্ট, প্রাইভেট ব্রিফিং-এর রেকর্ড ও গুয়ান্তানামো, ইরাকে যাত্রার তথ্য আইনগত প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। অতঃপর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ডেভিড বারস্টো এ পরিকল্পিত প্রজেক্টের বিস্তারিত রিপোর্ট পাবলিশ করেন।
এই ধরনের সমন্বিত প্রোপাগান্ডাগুলো সংবাদ গ্রাহকদের প্রাপ্ত সংবাদের বৈশিষ্ট্যকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। ফলে বিশেষ বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে জনগণের মনে সৃষ্ট ধারণায় পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৮০% অ্যামেরিকানদের প্রাথমিক সংবাদ উৎস হিসেবে ছিল টিভি ও রেডিও; অন্যদিকে মাত্র ১৯% জানায়, তাদের সংবাদ গ্রহণের প্রধান উৎস প্রিন্ট মিডিয়া। ইরাক যুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত অ্যামেরিকার পক্ষে থাকার ব্যাপারে উত্তরদাতাদের ‘ভুল ধারণা’র ব্যাপারটা বিভিন্নভাবে প্রমাণিত হয়। দেখা যায়, ৮০% ফক্স নিউজ দর্শক এক/একাধিক বিষয়ে ভুল ধারণা রাখেন, সিবিএস ৭১%, এবিসি ৬১%, এনবিসি এবং সিএনএন ৫৫%, প্রিন্ট মিডিয়ার অনুসারীদের ক্ষেত্রে ভুল ধারণা শতকরা ৪৭% (Kull, 2003)।
কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, এখানে দোষটা অনেকাংশে ভোক্তাদেরও হতে পারে। হতে পারে, সংবাদে গ্রাহকের মনোযোগের অভাব কিংবা অপর্যাপ্ত সংবাদ গ্রহণের কারণে এরকমটি হয়েছে। কিন্তু, জরিপের ফলাফল সেরকম কোনোকিছুর ইঙ্গিত দেয় না। অধিকাংশ নিউজ কোম্পানির ক্ষেত্রেই বাড়তি মনোযোগ ‘ভুল ধারণা’ সৃষ্টির সম্ভাবনা হ্রাস করে না। ওপরন্তু, ফক্স নিউজ যাদের সংবাদের প্রাথমিক উৎস, তাদের ক্ষেত্রে সংবাদে অধিক মনোযোগ ‘ভুল ধারণা’ সৃষ্টির সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তোলে (Kull, 2003)।
মার্কিন প্রশাসনের পরিচালিত প্রোপাগান্ডা তাদের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সামগ্রিক ক্ষেত্রে ঠিক কতটা ‘সফল’ হয়? ২০০৩ এর জানুয়ারিতে PIPA/KN এর পোলের ফলাফলে দেখা যায়, ৬৮% নাগরিক ইতিমধ্যেই বিশ্বাস করে ফেলেছিল তা, ৯/১১-এর হামলায় ইরাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে! এছাড়াও ১৩% নাগরিক ধারণা করতেন যে, ইতিমধ্যেই ইরাক ও ৯/১১-এর মধ্যে সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেছে! এর পরের মাসের জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৭% নাগরিক মনে করতেন, ইরাক ও ৯/১১ এর মাঝে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আগস্টের জরিপে ৬৭% বলেন যে, সাদ্দাম হোসেন ব্যক্তিগতভাবে ৯/১১-এর সঙ্গে জড়িত। জুন থেকে আগস্টের মধ্যে পরিচালিত জরিপে করা প্রশ্ন—‘আমেরিকা কি আল কায়েদা এবং সাদ্দাম হোসেনের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে?’—এর উত্তরে প্রতিবারই ৪৫%-৫২% মার্কিন নাগরিক জবাব দেন, অ্যামেরিকা সেরকম প্রমাণ পেয়েছে (Kull, 2003)।
২০০২-এ যখন সম্ভাব্য ইরাক যুদ্ধের বিষয়ে সর্বপ্রথম মিডিয়া রিপোর্ট শুরু হলো, তখন থেকে আফগানিস্তান যুদ্ধ হেডলাইন থেকে চলে যায় দৃশ্যপটের আড়ালে। পরবর্তীকালে ওবামা জনমন থেকে হারিয়ে যাওয়া আফগান যুদ্ধকে গতিশীল করে তালিবানদের হারানোর পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। কিছু রিসার্চে দেখা যায়, মার্কিনীদের যুদ্ধের বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল এই ধারণা যে, অ্যামেরিকা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। আবার কোনো স্কলার বলেন, সেনা হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধের বিরোধিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। John Mueller বলেন, ইরাক যুদ্ধে সহজ একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়—হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সমর্থন হ্রাস পায়। জনগণের মনের উদ্যম ধীরে ধীরে কমে আসে (Mueller, 2005)। ২০০৯-এ যখন আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্য হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল, তখন মিডিয়া পুনরায় আফগানিস্তানে তাদের ক্যামেরা তাক করে। ওই সময়ে আফগানিস্তানে সহিংসতা ও মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মার্কিনীদের যুদ্ধবিরোধিতা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে ওবামা ২০০৯-এর শেষে যুদ্ধ অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেন। এই দাবির মাধ্যমে আবারও মার্কিন জনগণের যুদ্ধবিরোধিতা কমে আসে (DiMaggio, 2015, p. 11)।
জানুয়ারি ২০০৯-এ অ্যামেরিকান নাগরিকরা আফগানিস্তান যুদ্ধের সমর্থনের বিষয়ে সমান অংশে দ্বিধাবিভক্ত ছিল। ৪৫% মনে করত যে, যুদ্ধ ‘ভালো’ যাচ্ছে, আর ৪৫% মনে করত যে, যুদ্ধ ‘ভালো’ যাচ্ছে না। এক মাস পর CNN/ORC-এর পোলে দেখা যায়, ৪৭% যুদ্ধের সমর্থন করেন, আর ৫১% করেন যুদ্ধের বিরোধিতা (Quinnipiac University Poll, 2021)। ওই সময়ে সাংবাদিকরা যুদ্ধের হতাহতের বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করত। ফলে, জনমত যুদ্ধের বিপরীতে ঝুঁকে পড়ে (DiMaggio, 2015, p. 29, Figure 1.8)।
জনমতের ওপর মার্কিন হতাহতের সংখ্যার প্রভাব ওবামা ক্ষমতাসীন হবার পর বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করেন। ডিসেম্বর ২০০৯-এ ওবামা ১৮ মাসের টাইমলাইন ঘোষণা করে বলেন, সৈন্য অপসারণ শুরু করা হবে। বুশ যেরকম সন্ত্রাসের ভয়কে পুঁজি করে যুদ্ধে জড়িয়েছেন, ওবামা তেমনি প্রত্যাশার কৌশল খাটানো আরম্ভ করেন। তিনি মার্কিনীদের অনুধাবন করানোর চেষ্টা করেন, অ্যামেরিকা আফগানিস্তানে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু, তালিবানের কারণে আফগানের ‘বৈধ’ (পুতুল) সরকারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই আফগানিস্তানকে সুরক্ষা দিতে ওবামা আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন।
২০০৯-এর নিউজ ও মিডিয়ায় প্রকাশিত মতামত যাচাই করলে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমগুলো ২০০৯-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যাপারে নেগেটিভ সংবাদ প্রচার করছিল। কিন্তু বছরের শেষার্ধে ওবামার প্রতি তাদের সমর্থন বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ২০০৯-এ অ্যামেরিকার জনমত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, শুরুর দিকে মার্কিনীদের হতাহতের সংবাদ জনমতকে যুদ্ধবিরোধী করে তোলে। আর পরবর্তীকালে ইতিবাচক সংবাদ যুদ্ধের সমর্থন আবারও বৃদ্ধি করে (DiMaggio, 2015, pp. 51-52, Figure 1.12)।³
টিকাঃ
১. তারা এর নাম দেয় Embedded পলিসি, যার অর্থ বেঁধে দেওয়া।
২. Brent T. kruger
৩. Rhetoric of Hope
📄 আমেরিকার ফেরি করা স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ
ইরাকে হামলা চালানোর পূর্বে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন বুশ। তিনি দাবি করেন, তারা ‘(ইরাক) এর জনগণকে মুক্ত করার জন্য এবং মারাত্মক বিপদ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার জন্য’ (Saleh, 2021, p. 21), ‘বিপদের এই সময় পার করতে এবং শান্তি (প্রতিষ্ঠা)র কাজ চালিয়ে যেতে’ (Bush G. W., 2003a), ইরাকে হামলা চালাতে যাচ্ছে। এর পরের দিন জাতির উদ্দেশ্যে বুশ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সমস্যা জর্জরিত বিশ্বের শান্তি ও নির্যাতিত মানুষের আশা’ অ্যামেরিকার সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে (Bravin, 2013, p. 64)।
আসলেই কি তাই? বুশ প্রশাসন আর মার্কিন মিডিয়া কি সত্যিই বিশ্ব-শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছে? ইরাক, আফগানিস্তানে কি পশ্চিমারা শান্তি আর সুখের বন্যা বইয়ে দিয়েছে? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধতে ইরাক ও আফগানিস্তানের অবস্থার পরিবর্তন যাচাই করলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই, যুদ্ধ আরম্ভ করার অজুহাত হিসেবে অ্যামেরিকা যেমন মিথ্যা বলেছিল; তেমনি ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও অ্যামেরিকা আর তাঁদের দোসরদের ঘোষিত প্রায় সবগুলো ঘোষণা ছিল একরাশ প্রবঞ্চনার অংশ। অন্যদিকে, অফিশিয়াল প্রোপাগান্ডা-ব্যাখ্যার বাইরে যাওয়াটাও সাংবাদিকদের জন্য ‘স্বাভাবিক’ কোনো বিষয় ছিল না। কারণ, তারা অফিশিয়াল সংবাদের ‘পরিবেশনকারী’ হিসেবে কাজ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। ইরাক ও আফগান যুদ্ধে সাংবাদিকরা যেভাবে নিজেদের স্বার্থবাদী মতবাদ অনুসারে সংবাদ পরিবেশন করেছেন, তাতে সংবাদ হয়ে ওঠে ভারসাম্যহীন মিথ্যার জাল। জনগণ যেন তাঁদের প্রণীত নীতিমালাকে সমর্থন দেয়, সেই লক্ষ্যে সরকার মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে গণসমর্থন সৃষ্টির শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে।
যুদ্ধ শেষে মার্কিন সেনারা যখন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে, তখন তারা প্রকৃত বাস্তবতা অনুভব করতে সক্ষম হয়।¹ ওই মুহূর্তে তারা চতুর্দিকে বিদ্যমান পৃথিবী (রাষ্ট্র) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যে পৃথিবীর নাগরিকরা তখনো অন্ধভাবে নিজ রাষ্ট্রের সর্বোৎকৃষ্ট 'নৈতিকতা'র মিথের ওপর বিশ্বাসী। তখন তারা অনুধাবন করতে পারে, নৈতিকতার ওপর তাঁদের কোনো একাধিপত্য নেই। তারা যে 'বর্বরত' আর 'আদিম সভ্যতা'র বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে বয়ান দিয়ে বেড়ায়, যুদ্ধের ময়দানে খোদ তারাই সেই বৈশিষ্ট্যগুলো আপাদমস্তক ধারণ করে। বিশ্বাসের জগতে এটি সৃষ্টি করে চরমতম এক সংকট। এই দৃশ্য তাঁদের জাতিগত সকল মিথ ভেঙে চুরমার করে দেয়। বস্তুত, তখনই প্রথম তারা তাদেরকে বলা মিথ্যাগুলোর আড়ালে প্রকৃত বাস্তবতা ধরতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আসা সৈন্যরাই আমাদের যুদ্ধের সবচেয়ে বিশুদ্ধ 'গল্প' শোনাতে পারে (Hedges & Al-Arian, 2008)। নিরপরাধ মানুষদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পেছনের মিথ্যাটা তারা তখন সকলের সামনে প্রকাশ করে দেয়—কথায় কিংবা কাজে।
কেন তাঁরা আমাদের ঘৃণা করে' (Bricmont, 2006)। সেই সঙ্গে তারা এটাও অনুধাবন করতে পারবে যে, আজকের ইউরোপীয় বা অ্যামেরিকানরা ইরাক কিংবা আফগানিস্তানের বাসিন্দা হলে তারাও ঠিক সেখানকার জনগোষ্ঠীর মতোই পশ্চিমাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করত।
টিকাঃ
১. যুদ্ধের ময়দানেও অবশ্য অনেকেই প্রকৃত চিত্র অনুভব করতে সক্ষম হয়, তবে জীবন মরণ যুদ্ধের ময়দানের মাঝে এত জটিল বিষয়ে ভাবার সময় কোথায়?