📘 প্রোপাগান্ডা 📄 যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান

📄 যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান


অ্যামেরিকানরা চলে যায়, কিন্তু পিছনে ফেলে যায় তাদের দুষ্কৃতি আর লালসার রক্তাক্ত ক্ষত চিহ্ন। আনুমানিক দশ লক্ষ ভিয়েতনামের বাসিন্দা এই যুদ্ধের ফলে অসুস্থ হয় কিংবা জন্মকালীন ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে; যার প্রধান কারণ এজেন্ট অরেঞ্জ¹ ও অন্যান্য উদ্ভিদনাশক ব্যবহার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, যুদ্ধ শেষ হবার এত বছর পরও আজ পর্যন্ত আনুমানিক ৩৫ মিলিয়ন ল্যান্ড মাইন এবং অন্যান্য অবিস্ফোরিত অস্ত্র হাজার হাজার ভিয়েতনামী, কম্বোডিয়ান ও লাওস-এর বাসিন্দাদের অঙ্গহানি বা মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।

মার্চ ১৬, ১৯৬৮, কোয়াং নাই² প্রদেশের মি লাই³ নামের ছোট্ট একটি গ্রাম। অ্যামেরিকান বাহিনীর ধারণা, উক্ত প্রদেশটি এনএলএফ-দের শক্ত একটি ঘাঁটি। তাই অ্যামেরিকা ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম বাহিনী কোয়াং নাই-তে প্রায়ই বোমা হামলা করত। তারা সেখানকার পুরো এলাকা জুড়েই এজেন্ট অরেঞ্জ স্প্রে করে। অ্যামেরিকার চার্লি কোম্পানি ডিভিশনের ১১শ ইনফ্যান্ট্রি⁴ বিগ্রেডের ফার্স্ট ব্যাটালিয়ন 'তথ্য' পায় যে, ভিয়েত কঙ গেরিলারা মি লাই গ্রাম দখল করে নিয়েছে। তাই চার্লি কোম্পানিকে তাদের ধ্বংস করার মিশনে সেখানে পাঠানো হলো। আর্মি কমান্ডাররা হামলা করতে প্রস্তুত বাহিনীকে জানায়, সেখানে যাদের পাওয়া যাওয়া যাবে তাদের সকলেই ভিয়েত কঙ বা এর সমর্থক। তাই তারা তাদেরকে গ্রামটি ধ্বংস করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে অ্যামেরিকা প্রায়শই বিপজ্জনক এলাকাকে ফ্রি-ফায়ার জোন হিসেবে ঘোষণা করত, যেন সেখানে বিনা বাধায় বেসামরিক নাগরিকদের কথা চিন্তা না করেই হামলা করা যায়। যাইহোক, কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন আর্নেস্ট তাদেরকে বলেন যে, 'চলতে সক্ষম এমন (যা কিছু পাবে) সবকিছু হত্যা করো'। ১৬ তারিখ সকালে সেখানে গিয়ে ভিয়েত কঙ বা এনএলএফদের পাওয়ার বদলে তারা দেখল, সেখানে শুধুমাত্র নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা অবস্থান করছে। অনেকে তখনো সকালের ভাত রান্না করছিল। মিশনটির লিডার উইলিয়াম ক্যালি সবাইকে দলে দলে জড়ো করে তাদের কুঁড়েঘরে পরীক্ষা করালেন। সব কিছু খুঁজেও কোনো ভিয়েত কঙ-এর অস্তিত্ব না পেয়েও ক্যালি সৈনিকদের নির্দেশ দিলেন গ্রামবাসীদেরকে হত্যা করার। তার নির্দেশে একে একে সবাইকে হত্যা করা হলো। যেসব নারীরা তাদের সন্তানকে বাঁচাতে চাইলেন, তাদেরকেও গুলি করা হলো, বাচ্চাদেরও ছাড়া হলো না। যারা পালাতে চাইল, তাদের হত্যা করা হলো পেছন থেকে ধাওয়া করে।

উক্ত গণহত্যার সময় উপস্থিত থাকা সার্জেন্ট মাইকেল বলেন, তিনি সেখানে যুদ্ধ করতে সক্ষম পুরুষ একজনও দেখেননি—মৃত কিংবা জীবিত। হত্যা করার পূর্বে তারা অনেক নারীকে ধর্ষণ করে, তারপর পুরো গ্রামটাকে জ্বালিয়ে দেয়। ওয়ারেন্ট অফিসার থম্পসন আর্মি হেলিকপ্টার দিয়ে টহলরত অবস্থায় সেখানে পৌঁছান। তিনি বলেন, '...আমরা সেখানে ইতস্তত অবস্থায় উড্ডীন ছিলাম। আর কিছু সময় পরই আমরা লক্ষ্য করলাম, চারদিকে শুধু মৃতদেহ, যেদিকেই তাকাই, মৃতদেহ দেখতে পাই। সেখানে নাবালক ছিল—দুই, তিন, চার, পাঁচ বছর বয়সী, নারী, বৃদ্ধ; যুদ্ধ করতে সক্ষম কেউ সেখানে ছিল না।' সেদিনের গণহত্যায় কমপক্ষে ৫০৪ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে ১৮২ জন ছিল নারী (১৭ জন গর্ভবতী) এবং ১৭৩ টি শিশু, যাদের মধ্যে একেবারেই নাবালক ৫৬ জন। কিন্তু অফিশিয়ালি রিপোর্ট করা হয়, ১২৮ জন ভিয়েত কঙ নিহত হয়েছে, এবং ৩ টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, সাথে 'আনুমানিক' ১০-১১ জন নারী-শিশু 'অসাবধানতাবশত' মারা গেছে।

এই ঘটনা অনেকদিন চাপা ছিল, যতদিন না রাইডেনআওয়ার⁵ এই ঘটনা জনসম্মুখে আনার চেষ্টা করলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সন, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ এবং কয়েকজন কংগ্রেস সদস্যকে চিঠি লিখেন এবং সব শেষে তিনি ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট সিমোর হার্শকে নভেম্বর ১৯৬৯-এ এই ঘটনা নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার দেন। হার্শ মি লাই-এর গণহত্যার ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন লিখতে শুরু করলেন। ১২ নভেম্বর ১৯৬৯, মি লাই গণহত্যা নিয়ে সিমোর হার্শ-এর প্রথম আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়। গণহত্যার ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়ার ফলে জনগণের ক্ষোভের মুখে পরবর্তীকালে মার্কিন আর্মি ঘটনাটি তদন্তের ঘোষণা দেয়। চার মাস পর সেই তদন্তে মি লাই-এর গণহত্যার বিস্তারিত আর ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই সময়ে তারা এই ঘটনার বাকি প্রমাণগুলো ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা আরম্ভ করে। এই ঘটনায় ইউএস আর্মি ১৪ জনকে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করে, কিন্তু লেফটেন্যান্ট ক্যালি ব্যতীত সবাই খালাস পেয়ে যায়। মার্চ, ১৯৭১, ক্যালিকে যাবজ্জীবন শাস্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নির্দেশে তাকে জেলখানার বদলে তার আরামদায়ক এপার্টমেন্টে গৃহবন্দী করার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে ক্যালির শাস্তি কমিয়ে দশ বছর করা হয়। আর নভেম্বর মাসে সে প্যারোলে মুক্তি পায়। এই ছিল বিশ্বজুড়ে মোড়লগিরি চালানো অ্যামেরিকার দেশীয় আইনে ভিনদেশে গণহত্যা চালানোর সর্বোচ্চ শাস্তির নমুনা।

মার্কিন বাহিনী অভ্যন্তরীণভাবে দ্বিতীয় আরেকটি তদন্তের ঘোষণা দেয়, যেটির সম্পর্কে সাধারণ জনগণ কিছুই জানত না। আর্মির চিফ অব স্টাফ অফিসারদের একটি দল গঠন করেন, যারা এ ধরনের অন্যান্য অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করবে। তারা গোপনে পাঁচ বছর তাদের এই গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই সময়ে তারা অ্যামেরিকান বাহিনীর সকল প্রকার বর্বরতা সম্পর্কে নয় হাজার পৃষ্ঠার প্রমাণ সংগ্রহ করে। পেন্টাগন কালেকশনের পুরো ব্যাপারটাই গোপন রাখে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন সংগঠন NARA পেপারগুলো পরীক্ষার জন্য সর্বপ্রথম অনুমোদন প্রদান করে। আর্কাইভ কালেকশনটিতে শত শত সৈন্যের বক্তব্য রয়েছে—যারা ভিয়েতনামে ধর্ষণ, খুন, গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস কাজ করেছেন বা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। শুধুমাত্র পেন্টাগনের নিজস্ব তদন্তেই ৩০০টি ঘটনা প্রমাণিত হয়। ৫০০টি ঘটনা প্রমাণিত হয়নি বা সম্পূর্ণ তদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। যেসব অফিসার ঘটনাগুলো সংকলিত করেন, তাদের মতে এই সংখ্যাগুলোও ভিয়েতনামে ওয়ার ক্রাইমের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

VVAW-এর নেতৃবৃন্দের একজন, জন কেরি, এপ্রিল ১২, ১৯৭১-এ ক্যাপিটাল হিল⁶-এ যুদ্ধের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, 'মার্কিন আর্মি ধর্ষণ, কান কেটে ফেলা, যৌনাঙ্গে পোর্টেবল টেলিফোনের তার বেঁধে পাওয়ার অন করা, মুখাবয়ব ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা, বিস্ফোরক ব্যবহার করে মৃতদেহ উড়িয়ে দেওয়া, যথেচ্ছভাবে বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করা, চেঙ্গিস খানের বাহিনীর মতো গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়া, গবাদি পশু-কুকুরকে খেলাচ্ছলে হত্যা করা, মজুদকৃত খাদ্যে বিষ মেশানো... এগুলো সহ অন্যান্য অপরাধে লিপ্ত ছিল'। অর্থাৎ, মি লাই গণহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন পাশবিক ঘটনা ছিল না—যেমনটা অ্যামেরিকানরা মনে করেন। বরং এটি অনেকগুলো অপারেশনের মধ্যে 'একটি' অপারেশন। কিন্তু অন্যান্য অপারেশনগুলো মি লাই-এর মতো প্রকাশিত হয়নি। ঘটনাগুলো ধামাচাপা দিতে মিলিটারির ভেতরের হুইসেলব্রোয়ারদের⁷ শাসিয়ে, ভয় দেখিয়ে চুপ করানো হয়। গুরুতর অভিযোগের তদন্ত শেষ হলে তদন্ত রিপোর্টগুলো গুম হয়ে যায় ক্লাসিফায়েড⁸ ফাইলের অন্ধকার রাজ্যে।

১৯৫৪ থেকে ১৯৭৫, এই সময়ের ভেতর প্রায় ৩ মিলিয়ন ভিয়েতনামী নাগরিক মৃত্যুবরণ করে, যাদের বেশিরভাগই নিহত হয় অ্যামেরিকা ও তার মিত্র দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাদের হাতে। অন্যদিকে, অ্যামেরিকার নিহত সৈন্যের সংখ্যা মাত্র ৫৮,২০০। ভিয়েতনামের নিখোঁজ নাগরিকের সংখ্যাই প্রায় ৩০০,০০০, যা অ্যামেরিকার মোট হতাহতের সংখ্যা থেকেও কয়েকগুণ বেশি। যুদ্ধে মার্কিন এয়ারফোর্স প্রায় ৫০০,০০০ একর জমির ফসলে উদ্ভিদনাশক স্প্রে করে। এই বিশাল কেমিক্যাল অ্যাটাক প্রজেক্ট আক্ষরিকভাবেই দক্ষিণ ভিয়েতনামের অর্ধেক বনাঞ্চল ধ্বংস করে দেয়। অ্যামেরিকা ও তার মিত্র দক্ষিণ ভিয়েতনাম মিলে সর্বমোট ০৫ মিলিয়ন একর জমিতে ৭৩ মিলিয়ন লিটার কেমিক্যাল এজেন্ট স্প্রে করে, যার ৬২%-ই এজেন্ট অরেঞ্জ—একটি উদ্ভিদনাশক—যেটির সবগুলো ধ্বংসাত্মক প্রভাব কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে এসেও এখন পর্যন্ত অজানা।

উদ্ভিদনাশক স্প্রে-র বিধ্বংসী প্রভাবে ভিয়েতনামের বিশাল আয়তনের চাষযোগ্য ভূমি সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়। কেমিক্যালের অবশিষ্টাংশ রয়ে যায় মাটি, নদী, ফুড চেইনে। VAVA⁹ ধারণা করে যে, ৩ মিলিয়নেরও বেশি ভিয়েতনামের নাগরিক ডাইঅক্সিনের সংস্পর্শে আসার কারণে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। ডাইঅক্সিনের প্রভাব কখনো কখনো এক প্রজন্মে সুপ্ত অবস্থায় থেকে পরের প্রজন্মে ক্ষতিকর লক্ষণ তৈরি করতে সক্ষম। এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার, মানসিক সমস্যা, রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ত্রুটি, হরমোন-জনিত সমস্যা, স্নায়ুবিক সমস্যা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব। ভিয়েতনামের হতভাগ্য নাগরিকরা কেমিক্যাল আক্রমণের 'পুরস্কার' হিসেবে বাহু বা পা ছাড়া শিশু, অদ্ভুত বিকৃত চেহারা, বেঢপ আকৃতির মাথা, অস্বাভাবিক ত্বক, কালো চুল কিংবা দাগে ভরা দেহ সম্পন্ন শিশু; আংশিক বা সম্পূর্ণ প্যারালাইজড শিশু—এই ধরনের হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সঙ্গে বেশ পরিচিত।

অনেক মার্কিন যোদ্ধা কেমিক্যাল পয়জনের সংস্পর্শে আসার ফলে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন গুরুতর পর্যায়ের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে শুরু করে। অনেকের সন্তান জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে আরম্ভ করে। বিভিন্ন পরীক্ষায় এজেন্ট অরেঞ্জ-এ ব্যবহৃত কেমিক্যাল ডাই-অক্সিন-এর সঙ্গে এই সকল রোগ ও লক্ষণের সংযোগ প্রমাণিত হয়। তথাপি মার্কিন যোদ্ধাদের সেবায় নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান VA¹⁰ এই সব লক্ষণকে যুদ্ধ সম্পর্কিত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে অস্বীকার করে। মার্কিন ভিয়েতনাম যোদ্ধা ও তাদের সমর্থন প্রদানকারীগণ বহু বছর ধরে এ সকল প্রাণঘাতী কেমিক্যাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারের নিকট ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসে। কিন্তু উভয়ই তাদের দাবিকে শুরু থেকেই অগ্রাহ্য করতে থাকে। অনেকেই ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগে মারা যায়, তাদের সঙ্গিনীদের বহু সংখ্যক গর্ভপাত হয়। অনেকে সেরিব্রাল পালসি, স্পাইনা বাইফিডার মতো জন্মগত ত্রুটি-সহ সন্তান জন্মদান করে।

এজেন্ট অরেঞ্জ-এর 'বুমেরাং'¹¹ ভুক্তভোগী ও VVAW মোট ২০০,০০০ যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে এর উৎপাদনকারীদের বিপক্ষে মামলা করে। কিন্তু, আদালত তাদের সুবিচার প্রদান করতে 'ব্যর্থ' হয়। ছয় বছর পর ১৯৮৫-এর মে মাসে কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো আদালতের কার্যক্রমের বাইরে $১৮০ মিলিয়ন দিয়ে মামলার এডভোকেটদের সঙ্গে ব্যাপারটার দফারফা করে। ইচ্ছে না থাকলেও ভুক্তভোগীদের এটি মেনে নিতে হয়। আইনজীবীরা বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে চলে যায়, আর ভুক্তভোগীদের জন্য অবশিষ্ট থাকে অর্থের ক্ষুদ্র একটা অংশ। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন কংগ্রেস এজেন্ট অরেঞ্জ অ্যাক্ট পাস করে, যার ফলে ভিয়েতনাম যোদ্ধারা নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। যদিও কোনো আইনগত দায়বদ্ধতা থেকে এমনটি করা হয়েছে, সে কথা তারা স্বীকার করেনি। ১৯৯৪ সালে ন্যাশনাল একাডেমি অব সাইন্স-এর অন্তর্ভুক্ত ইন্সটিটিউট অব মেডিসিন সিদ্ধান্তে আসে যে, কোনো ব্যক্তি এজেন্ট অরেঞ্জের সংস্পর্শে আসার ফলে Soft-tissue Sarcoma, non-Hodgkin's lymphoma, Hodgkin's disease, Chloracne এবং porphyria cutanea-এর মতো জটিল সব রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়াও এটি বিভিন্ন ক্যান্সারও সৃষ্টি করতে পারে। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ইন্সটিটিউটটি এজেন্ট অরেঞ্জ-এর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির সন্তানদের রিপোর্টে Type 2 diabetes ও spina bifada-এর মতো রোগ দুটি যোগ করে। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ক্লিনটন প্রশাসন ইন্সটিটিউট অব মেডিসিন কর্তৃক স্বীকৃত এজেন্ট অরেঞ্জ-এর প্রভাবে সৃষ্ট রোগগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়। VA ধারণা করে, এটি পরবর্তী দশ বছরে প্রায় $৩৫০-$৬০০ মিলিয়ন ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে। এ তো গেলো ভিয়েতনামে নিযুক্ত অ্যামেরিকান যোদ্ধাদেরকে দেওয়া ক্ষতিপূরণের পরিমাণ। কেমিক্যাল ওয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত ভিয়েতনামী ভুক্তভোগীদের এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। ভবিষ্যতে দেওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

আইজেনহাওয়ার, কেনেডি, জনসন, নিক্সন—যুদ্ধ চলাকালীন প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করে, তারা কেবল স্বাধীন দক্ষিণ ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের তীব্রতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় মার্কিন ঐতিহাসিক আর্থর¹² ভিয়েতনামে অ্যামেরিকার পলিসিকে তাদের 'আন্তর্জাতিক-প্রীতির সাধারণ কার্যক্রম'-এর একটি অংশ হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু, বাস্তবতা তো এই যে, ওয়াশিংটন চাচ্ছিল একটি অনুগত রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র অ্যামেরিকার বৈদেশিক নীতি চোখবুজে অনুসরণ করবে। আর যুদ্ধ জটিল অবস্থায় চলে গেলে যুদ্ধের নামে অ্যামেরিকার সম্মান রক্ষাই তাদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়। অ্যামেরিকানদের সেই সম্মানের মূল্য ১-৩ মিলিয়ন ভিয়েতনামী নাগরিক পরিশোধ করে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে, যার ধারা আজও চলমান। কেমিক্যাল যুদ্ধের শিকার মানুষগুলোর প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখনো পর্যন্ত অ্যামেরিকার পৌঁছে দেওয়া 'স্বাধীনতা'র মূল্য পরিশোধ করে চলেছে। মিটিয়ে চলেছে তাদেরকে 'সভ্যতা'র দুয়ারে পৌঁছে দিতে 'অক্লান্ত পরিশ্রমী' শ্বেতাঙ্গদের বহন করা বোঝার দেনা।

টিকাঃ
১. Agent Orange
২. Quang Ngai
৩. My Lai
৪. 11th Infantry
৫. Ron Ridenhour, ১১শ বিগ্রেডের একজন সৈন্য, যিনি সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না কিন্তু এ ঘটনা সম্পর্কে জানতেন।
৬. Capitol Hill
৭. যে ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে চলা অবৈধ কোনো বিষয়ের কথা ফাঁস করে দেয়।
৮. কোনো পেপারকে অফিসিয়াল সিক্রেট পেপার হিসেবে নির্ধারিত করা, যে পেপারে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির প্রবেশাধিকারের অনুমোদন রয়েছে।
৯. The Vietnamese Associations of Victims of Agent Orange
১০. Veterans Administration
১১. ভিয়েতনামবাসীদের ধ্বংস করতে গিয়ে যারা নিজেরাও কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার-এর ধ্বংসাত্মক রূপ দেখতে বাধ্য হয়।
১২. Arthur Schlesinger

ফন্ট সাইজ
15px
17px