📘 প্রোপাগান্ডা 📄 হারম্যান ও চমস্কির ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’

📄 হারম্যান ও চমস্কির ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’


প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার পক্ষে নিউজ মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করতে চাইলে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক নোয়াম চমস্কির করা কাজগুলো বেশ উপকারী। এডওয়ার্ড হারম্যানের সঙ্গে চমস্কি সম্মিলিতভাবে ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’ প্রণয়ন করেন। এই মডেলটির মাধ্যমে লেখকদ্বয় অ্যামেরিকার পক্ষপাতদুষ্ট কর্পোরেট নিউজ রিপোর্টিং-এর কর্মপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন (Herman & Chomsky, 1988/2002)।

প্রোপাগান্ডা মডেলের নিয়মানুগ বিশ্লেষণ মিডিয়ার দুটি পারস্পরিক সম্পর্কিত বিষয় বিশ্লেষণে সহায়তা করে। প্রথমত, প্রোপাগান্ডা মডেলের ফিল্টারসমূহ মিডিয়া সিস্টেমের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে। ফলস্বরূপ, মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি ‘কেন’ সমাজে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদী, যুদ্ধাসক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর দায়িত্ব আপন কাঁধে তুলে নেয়, তা অনুধাবন করা সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, মূলধারার মিডিয়া ‘কিভাবে’ পাঠকদের জন্য প্রকাশিত তথ্যাদি এবং তাদের আলোচনা, বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার ভূমিকা পালন করে, প্রোপাগান্ডা মডেল সেটি যথাযথভাবে নিরীক্ষণের পথ উন্মোচন করে (Pedro-Carañana et al., 2018)।

প্রোপাগান্ডা মডেলটিতে ‘গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা নিয়ন্ত্রণ’-এর লক্ষ্যে সংবাদ-মাধ্যমসমূহে বিদ্যমান পরিবেশ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। মডেলটিতে মোটা দাগে পাঁচটি ফিল্টার রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে নিউজ রিপোর্টের কাঠামো প্রস্তুত করা হয়। সেই সঙ্গে জনগণের আলোচ্য বিষয়বস্তুসমূহও এই ফিল্টারগুলোর মাধ্যমেই নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। উল্লিখিত পাঁচটি ফিল্টার হচ্ছে— ১. মালিকানা, ২. বিজ্ঞাপন, ৩. উৎস (Source), ৪. কড়া সমালোচনা (Flak), ৫. মতাদর্শ।

প্রোপাগান্ডা মডেলের প্রথম দুটি ফিল্টার মূলধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রমের ওপর সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রভাব বিশ্লেষণ করে। সংবাদমাধ্যমের মুনাফা-নির্ভর আচরণের ফলে গণমাধ্যমের কার্যক্রম প্রধানত এলিটদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিফলিত করে। অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও অর্থায়ন সংবাদকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।

১. মালিকানা : অধিকাংশ মিডিয়াগুলো কোনো কর্পোরেট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। সেই সুবাদে এসব সংস্থায় কর্পোরেশনগুলোর স্বার্থরক্ষার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মালিকদের অধিকাংশই ধনাঢ্য ব্যক্তি, রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখে এবং রাজনীতিতে প্রভাব খাটাতে সক্ষম। মূলত স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদকগণ সংবাদ-সংস্থাগুলোর রুলস তৈরি ও রদবদল করে থাকে। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ৯৭টি দেশের মিডিয়ার ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায় যে, সেসব দেশের সবচেয়ে বড় মিডিয়াগুলো সরকার কিংবা ব্যক্তিগত পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (Djankov et al., 2003)। অর্থাৎ, প্রভাবশালী সংবাদপত্রের ওপর তাদের প্রভাব খাটানোর যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।

২. বিজ্ঞাপন : বিজ্ঞাপনের প্রচলন হবার পূর্বে সংবাদপত্রগুলোকে শুধুমাত্র পত্রিকা বিক্রয় করেই খরচ পোষাতে হতো। এছাড়া অন্য কোনো পন্থা তাদের কাছে ছিল না। যখন থেকে বিজ্ঞাপনের প্রচলন শুরু হলো, সেই সময় থেকেই পত্রিকার মালিকগণ প্রতিটি সংবাদপত্রের বিক্রয়মূল্য সেটির উৎপাদনব্যয় থেকেও কম নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। ফলে যেসকল পত্রিকা বিজ্ঞাপনদাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত না, তারা টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় নিস্তেয হয়ে পড়ে। বর্তমানে মিডিয়াগুলোর নিজেদের মধ্যে বিজ্ঞাপনের প্রতিযোগিতা অধিক। ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপনের ওপর আরও অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অপরদিকে বিজ্ঞাপনের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বিজ্ঞাপনদাতাদের খায়েশও প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে (An & Bergen, 2007)। তাই বিজ্ঞাপনদাতা ব্যক্তি/দল/প্রতিষ্ঠান সংবাদ প্রচারের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। প্রয়োজনে চাপও প্রয়োগ করছে। যদিও সাধারণ জনগণ এই শ্রেণির চাপ প্রয়োগের ঘটনা সম্পর্কে ততটা অবগত নয় (An & Bergen, 2007)।

অ্যামেরিকার ১৪৭ জন সম্পাদকদের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয় (Craig & Soley, 1992)। সেখানে প্রায় ৯০% পত্রিকার সম্পাদক বলেন যে, বিজ্ঞাপনদাতা তাদের নিউজের উপাদান প্রভাবিত করতে চেয়েছেন। ৭০% সম্পাদক স্বীকার করেছেন, বিজ্ঞাপনদাতা সংবাদপত্রের কোনো সংবাদ উধাও করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শতকরা ৯২ শতাংশেরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা কোনো সংবাদের বিষয়বস্তুর কারণে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। শতকরা ৮৯ জন সম্পাদকের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা সংবাদের বিষয়বস্তুর কারণে বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

ওয়েভার এবং ইউলটখ (1996, as cited in Price, 2003) পুরো দেশজুড়ে বিভিন্ন টিভি সাংবাদিকদের নিয়ে একটি জরিপ করে। তারা তাদের জরিপের ফলাফলে দেখতে পান, জরিপে অংশগ্রহণকৃত সাংবাদিকদের মধ্যে শতকরা ৩৪ জনই মনে করে, কারও বল প্রয়োগ সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতায় গুরুতর বাধা সৃষ্টি করেছে। যেমন : প্রভাবশালী ব্যক্তি, সরকার কিংবা অন্যান্য বিজ্ঞাপনদাতা।

সংবাদদাতা, প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ও বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যকার সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে এবিসি, সিবিএস, এনবিসি, সিএনএন ও পিবিসি নিউজ সংস্থাসমূহের ১৩২ জন সংবাদদাতাদের নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেন (২০০৩)। দেখা গেল, শতকরা বিশ (২০%) জন সাংবাদিক বলেছেন যে, তারা তাদের মালিকপক্ষ থেকে রিপোর্ট করা এবং রিপোর্ট না-করার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগের শিকার হয়েছেন। অপরদিকে শতকরা সাত জন রিপোর্টার উল্লেখ করেছেন, বিজ্ঞাপনদাতারা তাদেরকে কোনো বিশেষ রিপোর্ট করতে কিংবা কোনো ঘটনা রিপোর্ট না করতে চাপ প্রয়োগ করেছে। এসব নিউজ চ্যানেলগুলোর মধ্যে সিএনএনের অবস্থা সবচেয়ে জঘন্য, সংস্থাটির শতকরা এক-তৃতীয়াংশ সাংবাদিকই স্বত্বাধিকারীদের চাপের শিকার হন। অর্থাৎ, সংবাদ আর বিজ্ঞাপনের মধ্যকার দেয়াল প্রতিনিয়ত অদৃশ্য হয়ে উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান যে পার্থক্যসমূহ রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত দূরীভূত হয়ে পড়ছে। আর তার প্রভাব পড়ছে সংবাদের গুণগত মানের ওপর।

৩. সংবাদের উৎস : প্রোপাগান্ডা মডেলের তৃতীয় ফিল্টারটি সাংবাদিক ও সংবাদের উৎসের গভীর সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে। প্রথমত, সরকার সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের উচ্চতর পর্যায়ের তথ্যাদি দিয়ে সহায়তা করে। অপরদিকে স্বয়ং সরকার প্রকৃত সংবাদকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

যেকোনো গণমাধ্যম-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সচল থাকার জন্য প্রয়োজন সংবাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। প্রতিনিয়তই সংবাদমাধ্যমে তৈরি হয় নতুন ও তরতাজা সংবাদের চাহিদা। আর সংবাদ-সূচী পূরণ করা তাদের জন্য অপরিহার্য একটি দায়িত্ব। এই চাহিদা পূরণে তারা ঐ সকল স্থানে মনোযোগ প্রদান করে, যেখানে প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ উপকরণ পাওয়া যায়। যেমন : পার্লামেন্ট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রেসক্লাব ইত্যাদি। বিভিন্ন কর্পোরেশন এবং ব্যবসা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও মিডিয়ার নিয়মিত সংবাদের উৎস (Herman & Chomsky, 1988/2002, p. 19)।

সরকার ও কর্পোরেট সোর্সগুলো তাদের পদমর্যাদা, প্রভাব ও প্রতিপত্তির ফলে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে জনসাধারণের নিকট গৃহীত হয়। মার্ক ফিশম্যানের (1980, as cited in Herman & Chomsky, 1988/2002, p. 31) মতে, সংবাদপত্রগুলো এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাচাই করার পূর্বেই নিশ্চিতরূপে প্রকৃত তথ্যের উৎস হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ সংবাদ-কর্মীগণ সমাজে প্রতিষ্ঠিত সিস্টেম অনুযায়ী ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষণ করে থাকে। সংবাদ-কর্মীরা সরকারি ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের দাবিকে শুধু একটি দাবি হিসেবেই নয়, বরং তাকে নির্ভরযোগ্য হিসেবেও গ্রহণ করে।

২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে লিভিংস্টোন এবং বেনেট সিএনএনের ১৯৯৪-২০০১ সাল পর্যন্ত ১২০০ নিউজ সেগমেন্ট পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত সংবাদের বিপরীতে ঘটনা-নির্ভর সংবাদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা। সেগমেন্টসমূহ পর্যবেক্ষণ শেষে তারা সিদ্ধান্তে আসেন, ঘটনা-নির্ভর সংবাদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে সংবাদের অংশ হিসেবে সরকারি দায়িত্বশীলগণ পূর্বের যেকোনো সময়ের চাইতে অধিক হারে উপস্থিত (Bennett & Livingston, 2003)।

প্রকৃতপক্ষে, আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমের নিয়মিত চাহিদা পূরণের একটি বড় মাধ্যম। সংবাদের এর নিয়মিত উৎসগুলো সংবাদ-মাধ্যমের সংবাদ আহরণের পেছনে ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে এগুলো সংবাদের কাঁচামাল ও রেডিমেড সংবাদ নিয়মিত সরবরাহ করে। অ্যামেরিকার অন্যতম বৃহত্তম ব্রডকাস্ট কোম্পানি সিংকলেয়ার গ্রুপের ওপর ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে জুন ২০১৮ পর্যন্ত এক সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সেখানে দেখা যায়, উল্লিখিত সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রচারিত ৫৩০টি সংবাদের ৪০.২% সংবাদই ছিল সরকার, রাজনীতি বিষয়ক। লক্ষণীয় ব্যাপার, ৫৩০টি ভিন্ন ভিন্ন সংবাদের সোর্স হিসেবে ২৩.৪% এর সোর্স নির্বাচিত আমলা; ১৩.৫৫% এর সোর্স সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প; সরকারি এজেন্সি ৮.৩%; এবং হোয়াইট হাউস ৮.৭%। অর্থাৎ, প্রায় ৫৩.৯% সংবাদের উৎসই রাজনীতি (Abdenour et al., 2019)। ফলাফল, এই স্পেশাল উৎসগুলো সংবাদমাধ্যমে বিশেষ প্রবেশাধিকার লাভ করে, যা সাধারণ কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য অসাধ্য (Herman & Chomsky, 1988/2002, p. 22)।

মিডিয়া তার সংবাদের নিয়মিত উৎসের ব্যাপারে নেতিবাচক কোনো সংবাদ ছাপাতে চাইলে অনেক সময়ই শক্তিশালী সেই উৎসটি মিডিয়ার সাথে তার সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। অন্য দিকে, গণমাধ্যম-কর্মী ও কর্মকর্তারাও তাদের নির্ভরযোগ্য সংবাদ উৎসকে চটাতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

সংবাদের সাথে উৎসের সম্পর্ক শুধুমাত্র দৈনিক সংবাদ সরবরাহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো সরকারি কিংবা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, অন্য কোনো অপ্রাতিষ্ঠানিক ও জনপ্রিয় সংবাদ উৎস কর্তৃক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তখন সেই উটকো সমস্যা প্রশমিত করা হয় 'বিশেষজ্ঞ' বাছাই করে, তাদেরকে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে, তাদের টার্গেটকৃত প্রজেক্টে অর্থায়ন করে। কিংবা বিভিন্ন সংগঠনে তাদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, যারা ঐ উৎসের নিজস্ব বার্তাসমূহ জোরেশোরে প্রচার করবে। এভাবেই তৈরি হয় বিশেষজ্ঞ দল—সরকার কিংবা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে যারা কাজ করে। কুখ্যাত মার্কিন রাজনীতিবিদ হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায়, 'বিশেষজ্ঞদের এই যুগে, বিশেষজ্ঞ নির্বাচনকারী তারাই, প্রচলিত প্রভাবশালী মতাদর্শগুলোর প্রতি যাদের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। সর্বোপরি সংখ্যাগরিষ্ঠের এই মতকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে সংজ্ঞায়িত ও সম্প্রসারিত করার যোগ্যতাই তাকে বিশেষজ্ঞে হিসেবে পরিণত করেছে’। কখনো কখনো গণমাধ্যম নিজেরাই 'বিশেষজ্ঞ' যোগান দেয়, যারা সরকার বা কর্পোরেশনের তাঁবেদারি করে। সংবাদ উৎসের এই বিক্ষিপ্ততা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকে অধিক প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। পাশ কাটিয়ে নিজেদের অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া ব্যতীত এইসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব তাদের জানা নেই।

৪. কড়া সমালোচনা চর্চা : হারম্যান-চমস্কি তাদের প্রোপাগান্ডা মডেলে 'ফ্ল্যাক' পরিভাষাটির বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে এর দ্বারা তারা মিডিয়ার কোনো বিবৃতি বা প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সমালোচনাকে নির্দেশ করেন। হতে পারে এই সমালোচনা কোনো চিঠি, মেইল, ফোনকল, মামলা, হুমকি বা কোনো অন্যায় অভিযোগ। এটি হতে পারে সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত কাজ। এ ধরনের প্রতিবাদ যখন বড় আকার ধারণ করে, কিংবা প্রতিবাদকারী যখন প্রভাবশালী হয়, তখন তা মিডিয়ার জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো তাদেরকে কোর্টে নিজেদের অবস্থানের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়। কখনো-বা বিজ্ঞাপনদাতাগণ সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

যেকোনো ধরনের ফ্ল্যাক সৃষ্টি করার সামর্থ্যের সঙ্গে ক্ষমতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। শক্তিশালী ফ্ল্যাক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, দু ধরনেরই হতে পারে। প্রভাবশালী দল তাদের সমর্থকদের কাছে অভিযোগ করার মাধ্যমে পরোক্ষ ফ্ল্যাক সৃষ্টি করতে সক্ষম। অপরদিকে প্রত্যক্ষ ফ্ল্যাক হতে পারে রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয় থেকে কোনো মেইল বা ফোনকল। এই ধরনের ফ্ল্যাক একে অপরের শক্তি বৃদ্ধি করে, এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সংবাদ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীকে জোরদার করে। এদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্ল্যাক হলো গভর্নমেন্ট। গভর্নমেন্টের কোনো দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলে গণমাধ্যমকে আক্রমণ করে কথা বলা, হুমকি দেওয়া, গণমাধ্যমের 'সংশোধন' করার 'দায়িত্ব' হাতে নেওয়া—এসবই ফ্ল্যাকের ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

টিকাঃ
[১] যার ভাষায় অ্যামেরিকা এক 'ব্যর্থ রাষ্ট্র'।
[২] Propaganda Model বা PM
[৩] Systematic analysis
[১] উদাহরণস্বরূপ ধরুন, কোনো রঙিন পত্রিকার প্রতি কপি বিশ (২০) পৃষ্ঠা ছাপানোর জন্য সর্বমোট খরচ পনেরো (১৫) টাকা। বিজ্ঞাপন প্রচারের ফলে প্রাপ্ত প্রচুর পরিমাণ অর্থের বদৌলতে প্রতি কপি পত্রিকা দশ (১০) টাকা মূল্যে বিক্রয় করলেও তাদের লভ্যাংশ রয়ে যায়। ফলে, বাকি পত্রিকাগুলোও প্রতি কপির মূল্য হ্রাস করতে বাধ্য।
[১] বর্তমানে পরিস্থিতি ইন্টারনেটের বদৌলতে তিন দশক আগের পরিস্থিতি থেকে কিছুটা বদলেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে।
[২] Weaver and Wilhoit
[৩] সংবাদদাতা বা Correspondent বলতে শুধু তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে, যারা সংবাদ প্রস্তুত করে এবং সংবাদের সঙ্গে তাদের নাম সংযুক্ত থাকে।
[১] Institutionally driven
[২] Event driven
[১] সরকারিভাবে নাচ, গান, সিনেমাসহ যৌন উত্তেজক প্রোগ্রামসমূহ প্রোমোট করা হয়, জনগণের অর্থ খরচ করে কিশোর-কিশোরীদের সংস্কৃতিমনা করার নামে এসবে উৎসাহিত করা হয় (সেই সাথে বিয়ের বয়স আইন করে পেছানো হয়)।
[২] যেমন : বাংলাদেশে সংস্কৃতি 'বিশেষজ্ঞ' কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা সব কিছুতেই চেতনা'র প্রবেশ ঘটিয়ে বিশেষজ্ঞ সাজেন। যেসব দর্শক-স্রোতা 'চেতনা'র আদর্শে উজ্জীবিত, তারা এসকল উটকো 'বিশেষজ্ঞ'দের অন্ধ সমর্থক হিসেবে শব্দ দূষণে লিপ্ত থাকেন।
[৩] বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যারা পশ্চিমা প্রভুদের চর্চিত বিষয়গুলো চোখ বন্ধ করে মডার্ন শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির নামে এ দেশে অনুপ্রবেশ করাচ্ছে, তারাই এই শ্রেণির বিশেষজ্ঞদের কাতারে রয়েছেন।

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 আম আমেরিকায় ফ্ল্যাক : ইসরায়েলি লবিং

📄 আম আমেরিকায় ফ্ল্যাক : ইসরায়েলি লবিং


২০০৯ এর মার্চ মাসে ব্রিটিশ এমপি জর্জ গ্যালয়ে কানাডাতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হন। তার অপরাধ—ফিলিস্তিনে হামাসের সমর্থন এবং আফগানিস্তানে কানাডিয়ান সৈন্যদল পাঠানোর বিরোধিতা করা (Summers, 2009)। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় গ্যালয়ে বলেন, বিচারকের এই সিদ্ধান্ত বাইরের লবিং ও রাজনৈতিক প্রভাবের ফল (Wallace & MacCharles, 2009)। গ্যালয়ে এখানে মূলত প্রো-ইসরায়েলি লবি-এর কানাডিয়ান একটি সংস্করণকে ইঙ্গিত করে কথাটি বলেন। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের অত্যাচারের সংবাদ প্রকাশে এই লবি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁধা।

প্রো-ইসরায়েলি লবি বলতে আসলে কী বোঝায়? মূলত, এর দ্বারা সেসব সংগঠন ও ব্যক্তিদের নির্দেশ করা হয়, যারা সক্রিয়ভাবে মার্কিন বৈদেশিক নীতিকে ইসরায়েল-বান্ধব হিসেবে পরিচালিত করতে কাজ করে থাকে। এই লবি কোনো কেন্দ্রীয় একক নেতৃত্বের অধীনে সমন্বিত কার্যক্রম নয়। বরং অনেক ব্যক্তি বা দলে সমন্বয়। কেউ এই লবির অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তার ইহুদি হওয়া জরুরি নয়। কেননা, অনেক খ্রিষ্টান যায়োনিস্ট নিরবচ্ছিন্নভাবে ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে (Mearsheimer & Walt, 2007, pp. 112-113)। জাতিগতভাবে অ্যামেরিকান ইহুদিরা তুলনামূলক বিত্তশালী। মার্কিন রাজনীতিতেও তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। তাই, অ্যামেরিকার জনসংখ্যার শতকরা তিন ভাগের কম হওয়ার পরও মার্কিন ইহুদিরা ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিক উভয় দলেই প্রচুর অর্থায়ন করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সময়ে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ ছিলেন হ্যামিল্টন জর্ডান। প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি গোপন ফাইলে তিনি বলেন যে, তৎকালীন ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল ফাইন্যান্স কাউন্সিলের মোট ১২৫ জন সদস্যের মধ্যে ৭০ জনই (৫৬%) ইহুদি। অপরদিকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনকালীন ক্যাম্পেইনের ৬০% অর্থ আসে ইহুদি দাতাদের পক্ষ থেকে (Jordan, 1977)। এই ফাইলটি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে উন্মুক্ত করা হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ইহুদিদের অর্থায়নের হার বেশ কম, তথাপি ডেমোক্রেটদের অর্থের একটা বড় অংশ (২০%-৫০%) যোগান দেয় ইহুদিরা (Mearsheimer & Walt, 2007, p. 163)।

রাজনীতির পাগলা ঘোড়ার মুখে লাগাম পরানোর সাথে সাথে ইসরায়েলি লবির অন্যতম এজেন্ডা হলো—গণমাধ্যম, থিংক ট্যাঙ্ক, এমনকি একাডেমিয়াতে ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট আলোচনাকে প্রভাবিত করা। কেননা, এই তিনটি সেক্টরসমূহ জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে (Mearsheimer & Walt, 2007, p. 168)। কোনো ব্যক্তি ইসরায়েলের সমালোচনা করলে তার বিরুদ্ধে ইহুদী-বিদ্বেষের অভিযোগ আনা হয় কিংবা তার ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়। অথচ অ্যামেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (AIPAC) মতো সংগঠনগুলো মার্কিন রাজনীতিতে তাদের প্রভাবের কথা সগর্বে প্রচার করে বেড়ায়, যেটি বহু বছর ধরে চলমান ইসরায়েলি নির্যাতনে ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করে। নিউ ইয়র্ক তে ইসরায়েলি দূতাবাসের সাবেক মুখপাত্র শালেভ বলেন,
'সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদরা যদি জানতে পারে যে, কয়েক ঘণ্টার ভেতর তারা হাজারও উত্তেজিত ফোন কল পেতে যাচ্ছে, তাহলে ইসরায়েলের সমালোচনা করার আগে তারা দুবার ভাববে। চাপ প্রয়োগের বিষয়ে ইহুদি লবির কার্যকারিতা প্রশংসনীয়' (Friedman, ১৯৮৭)।

মিডল ইস্ট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল পাইপস ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের স্টুডেন্টদের নজরদারি করার লক্ষ্যে তার বিতর্কিত ওয়েবসাইট 'ক্যাম্পাস ওয়াচ' তৈরি করেন। পাইপস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টদের মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কিত স্কলারশিপ, ক্লাস ও অন্যান্য কার্যক্রমে ইসরায়েল-বিরোধী কোনো বক্তব্য বা আচরণ সম্পর্কে স্টুডেন্টদের রিপোর্ট প্রদান করতে উৎসাহিত করেন (McNeil, 2002)। জার্নালিস্ট ডেভিয়েস বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম উল্লেখ করেন, যারা ইসরায়েলের সমালোচকদের নিন্দার ব্যাপারে রীতিমতো বিশেষজ্ঞ। অনেস্ট রিপোর্টিং, GIYUS, MEMRI, BICOM এবং অন্যান্য সংগঠনগুলো নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের ওপর ফিলিস্তিনি 'সন্ত্রাস'-এর নিন্দা ও ইসরায়েলি 'শান্তিরক্ষা' মিশনের প্রশংসা করতে চাপ প্রয়োগ করে (Davies, 2008)।

বিংআমটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস প্রফেসর জেমস পেট্রাস বলেন, ইসরায়েলের বিপক্ষে কোনো সমালোচনা করলে একদল প্রো-ইসরায়েলি 'বিশেষজ্ঞ' বাহিনী দ্বারা সকল মেজর পত্রিকাগুলোর অপ-এড পাতায় অসৎ আক্রমণের শিকার হতে হয়। সেই সাথে চাকরিচ্যুত করার দাবি, পদ থেকে বিতাড়ন, কিংবা প্রোমোশন ও নতুন করে এপয়েন্টমেন্ট প্রত্যাখ্যান করার দাবির ঝড় বয়ে যায় (Petras, 2007)। আর এর ফলাফল হিসেবে সংবাদমাধ্যমে ইসরায়েলের স্লো মোশন গণহত্যার ব্যাপারে খুব কমই লেখা ছাপা হয়। তাই ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের বিষয়গুলো অনেক সময়ই মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়。

মতাদর্শ : হারম্যান ও চমস্কি তাদের প্রোপাগান্ডা মডেলের ধারণাটি পাবলিশ করেন ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের মাটিতে চরম মার হজম করে তার সাম্রাজ্যের ক্রান্তিকালে এসে পৌঁছেছে। লেখকদ্বয়ের মতে, তৎকালীন সময়ে মিডিয়ার সর্বশেষ ফিল্টারটি ছিল কমিউনিজম-বিরোধী এজেন্ডা। এই মতবাদটি এক অভিন্ন 'শত্রু'র বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণকে পরিচালিত করতে সহায়ক ছিল। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর এই মতবাদটি আর ততটা শক্তিশালী রূপে অবশিষ্ট রইল না। ফলে অভিন্ন শত্রুর ধারণার সে শূন্যস্থানটি পূরণের লক্ষ্যে তারা নিয়ে আসল 'মুক্ত বাজার', আর 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'-এর মতো মতবাদগুলো (Mullen, 2009)। অর্থাৎ, অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মতবাদের পক্ষে থাকবে মিডিয়া। আর তাদের স্বার্থ-বিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরোধিতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফিল্টারের ভূমিকা পালন করবে।

'অভিজাত' (Elite) শব্দটির মর্মার্থ সুস্পষ্টভাবে নিরূপণ করা বেশ কঠিন। বর্তমান পৃথিবীতে এলিট শব্দটিকে ক্ষমতা, অর্থ, পদমর্যাদা, কর্তৃত্বের মতো বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়। এলিট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে মিডিয়া সচরাচর কোনো আপস করে না। প্রকৃতপক্ষে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ব্যাপারে এলিট শ্রেণির ঐক্যমতই মিডিয়ার বৈধতা প্রদানের ছাড়পত্র। মিডিয়া সর্বশক্তি নিয়ে এলিটদের স্বার্থবিরোধী মতবাদের বিরোধিতা করে আসবে, সে মতবাদ যতই যৌক্তিক হোক না কেন। পুঁজিবাদী স্বত্বাধিকারীগণ পুঁজিবাদকে বৈধতা প্রদান করতে মিডিয়া সিস্টেমকে এমন ছাঁচে গড়ে নিয়েছে, যেন এটি তাদের স্বার্থবিরোধী যেকোনো মতাদর্শকে নেতিবাচক হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়। যেসব সাংবাদিক এই ফ্রেমওয়ার্কের নির্ধারিত সীমার বাইরে কাজ করে, তাদেরকে মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

লিবারেল মিডিয়া সংস্থাসমূহ সমালোচনাকারী পাঠকদের দাবি পূরণ করতে অল্প সংখ্যক সমালোচক ব্যক্তি ও সাংবাদিকদেরকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে। যদিও ঐ সকল ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের পরিবেশিত তথ্যাদি নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবহিত রাখতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই সকল সাংবাদিকগণ সংবাদ জগতের অত্যন্ত নগণ্য একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এটা প্রমাণ করে যে, কর্পোরেট-বান্ধব মিডিয়া-সিস্টেমে তাদের সে অবস্থান মূলত পূর্বপরিকল্পিত নিস্ফল অর্থহীন কর্মকাণ্ড (Pedro-Carañana et al., 2018)।

এই ধরনের নাটকীয়তার মাধ্যমে কর্পোরেট মিডিয়া গণতান্ত্রিক সমাজের বহুমুখিতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় এক দুর্লভ বিভ্রমের সৃষ্টি করে। এলিটদের সেবাদাস সংবাদমাধ্যমের সৃষ্ট সুবিশাল ও তপ্ত এক পৃথিবীতে কপূরের ন্যায় উড়ে যায় এই কয়েক ফোঁটা বিকল্প চিন্তা। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান প্রগতিশীল মিডিয়া কাজ করে নব্য লিবারেল প্রভাবের আওতাধীন হয়ে। এই মিডিয়া নিজেরাই নিজেদের বৈধতা প্রদান করে, অতঃপর স্বীয় তৃপ্তির কথা সগর্বে প্রচার করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে। প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার 'মূলধারা'র সমালোচকরা যে ধরনের সমালোচনার অনুশীলন করেন, চমস্কির ভাষায় তা হলো 'বিরোধিতার ছল'। যদিও এগুলো ক্ষমতার দোষ কিছুটা তুলে ধরে, কিন্তু আদতে তা ক্ষমতার শক্তিই বৃদ্ধি করে (Chomsky, 1988/2004)। হারম্যান বলেন, মেইনস্ট্রীম মিডিয়াগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সরবরাহে উদাসীন থাকে। তারা বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করার চাইতে বিনোদনমূলক সংবাদ প্রদানে বেশি সফল বলা চলে (Pedro-Carañana et al., 2018)। এলিটশ্রেণি যেসব সমস্যার কথা বলতে প্রস্তুত নয়, মিডিয়া সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সেসব থেকে সরিয়ে অন্য কোনো ইস্যুর দিকে নেওয়ার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশে মিডিয়ার এই সর্বশেষ ফিল্টারটি যে কাল্পনিক মতাদর্শকে টার্গেট করে ব্যবহৃত হয়, সেটি হলো 'মৌলবাদ'। এর আভিধানিক অর্থ মূলের দিকে ফিরে যাওয়া। যারা কলকাত্তাই উদ্ভট বাঙালি তত্ত্ব সংস্কৃতি ত্যাগ করে ইসলামের দিকে ফিরে যায়, তাদেরকেই মৌলবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। মিডিয়া ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে বাঙালিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে এক অভিনব ন্যারেটিভ সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা মানে ১৪০০ বছর পিছিয়ে যাওয়া। তাই মৌলবাদ একটি ঘৃণিত কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের বোরকা, ছেলেদের দাড়ি, টাখনুর ওপর জামা মানেই 'জঙ্গি' বলে সন্দেহ করার ট্রেন্ড বেশ ভালোভাবেই চালানো হয়েছিল। তখন বামপন্থী পরগাছাদের সাথে সাথে জুড়ে গিয়েছিল অপর একটি সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন। জঙ্গিবাদের ধোঁয়া তুলে বহু সাধারণ ছাত্রদের জীবন যারা নষ্ট করেছে।

মাঝে বেশ কয়েক বছর দেশীয় ইসলাম-বিদ্বেষী কাফির-মুরতাদগুলো 'হীরক রাজার দেশে'র মতো স্বাধীনতা পেয়ে তরুণ সমাজকে নষ্ট করার পাঁয়তারা করছিল। কিন্তু মুসলিমদের জাগরণে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ মাঠে মারা গেছে। ইসলামপ্রেম মানেই 'পাকিস্তান-প্রেম', মৌলবাদী মুসলিমরা সব নব্য 'রাজাকার'—এই গাঁজাখুরি ন্যারেটিভ বেচে খাওয়ার দিন শেষ। সেক্যুলাররা খোঁড়া যুক্তি নিয়ে আর কতদিন বিশুদ্ধ ইসলাম চর্চাকে ট্যাকল দিতে পারে, মুসলিমরা এই নাটকের শেষটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।

সর্বোপরি, মূলত এই পাঁচটি ফিল্টার মিডিয়ার 'সংবাদ' বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত ও সংকীর্ণ করে তোলে। এবং কোন ধরনের সংবাদ প্রচারণা পাবার উপযোগী—সেটি নির্ধারণ করে (Herman & Chomsky, 1988/2002, p. 31)। আরও অনেক ছোটখাটো ফ্যাক্টর রয়েছে, তবে সেগুলো এই পাঁচটি ফিল্টারের মতো এতটা প্রভাব বিস্তারকারী নয়。

টিকাঃ
[১] Confidential Memorandum
[২] Anti-Semitism
[১] Campus Watch
[২] Honest Reporting, Give Israel Your United Support, the Middle East Media Research Institute, Britain Israel Communications and Research Center
[৩] Binghamton University
[৪] Op-ed: সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার বিপরীতে একটি পৃষ্ঠা, যা পাঠকদের মন্তব্য, অনুভূতি ইত্যাদি প্রকাশ করে থাকে。
[১] Feigned Dissent

ফন্ট সাইজ
15px
17px