📘 প্রোপাগান্ডা 📄 যুদ্ধোত্তর জনপ্রতিক্রিয়া

📄 যুদ্ধোত্তর জনপ্রতিক্রিয়া


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে মিত্র পক্ষ; যুদ্ধ জয়ের পর যুদ্ধের সূচনা ঘটানো ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে জার্মানিকে বিশাল অঙ্কের জরিমানা করা হয়। মুসলিমদের শেষ ভরসা ও ঐক্যের প্রতীক উসমানীয় সালতানাত ভেঙে মিত্রশক্তি নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়। পশ্চিমাদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির নেশায় শুরু করা গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারায় ০৮ মিলিয়ন মানুষ, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক ছিল বেসামরিক (Howard, 2002, Appendix-II)। যুদ্ধ চলাকালীন প্রেসিডেন্ট Wilson এর স্লোগান ছিল, 'এই যুদ্ধ সকল যুদ্ধের সমাপ্তির জন্য যুদ্ধ', এবং 'গণতন্ত্রের জন্য পৃথিবীকে নিরাপদ করার যুদ্ধ'।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন সিপিআই-এর কর্মকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়ে গেল, তখন চারদিক থেকে শুরু হলো এর তীব্র সমালোচনা। অ্যামেরিকায় 'যাইহোক, এটা শুধুই একটা প্রোপাগান্ডা' পরিণত হয় জনপ্রিয় একটি প্রবাদে (Manning & Romerstein, 2004)। সেই সময় সর্বপ্রথম প্রোপাগান্ডা শব্দটিকে সকলেই নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করতে শুরু করে। প্রোপাগান্ডা শব্দের প্রতিশব্দ হয়ে গেল প্রতারণা, ধোঁকা ইত্যাদি। জার্মানদের নির্মমতার যে কাহিনী অ্যামেরিকাতে ছড়িয়েছিল, অধিকাংশ তদন্তে দেখা গেল, ওইসব কাহিনিতে সত্য আর মিথ্যা মিলে একাকার। ফলস্বরূপ, জনমনে ধারণা তৈরি হয়ে গেল, প্রোপাগান্ডা মানেই মিথ্যা আর প্রবঞ্চনা।

যুদ্ধ শেষে যারা প্রকৃত ইতিহাস জানতে চাচ্ছিল, তাদের জন্য বিরাট এক বিস্ময় লুকিয়ে ছিল রাশিয়ার সিজারের গোপন আর্কাইভে। বলশেভিক বিপ্লবীরা পশ্চিমা স্কলারদের সেখানে থাকা মিত্রপক্ষের গোপন চুক্তির কপি যাচাই করার অনুমতি প্রদান করে। এই চুক্তিগুলোতে দেখা যায়, যুদ্ধ সমাপ্ত হবার আগেই মিত্রপক্ষ পরিকল্পনা করে রেখেছিল যে, যুদ্ধের পর তারা উত্তর ইউরোপ দখল করবে। এতসব বিতর্কের কোনো সমাধান হলো না; তাই যুদ্ধ পরবর্তী বিশ বছর যাবৎ অ্যামেরিকানরা WWI-এ তাদের অংশগ্রহণের কারণ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত থাকল। অ্যামেরিকা আসলে কীসের জন্য যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল? জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বর্ণ, স্বাধীনতা, ব্রিটেন, গণতন্ত্র নাকি এলিট শ্রেণির স্বার্থের জন্য? (Olmsted, 2009)।

এই যুদ্ধ শেষ হবার এক দশকেরও বেশি সময় পর, ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন সিনেট প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্রশিল্পের সম্পৃক্ততা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং কমিটি গঠন করে। গঠিত কমিটি পরবর্তী দু বছর ধরে প্রায় মার্কিন সরকারের দুই দশক পূর্বে করা ত্রুটিসমূহ তদন্তের কাজ হাতে নেয়। কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর জেরাল্ড নাই-এর তদন্ত কর্মকর্তারা দেখতে পান যে, যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র বাণিজ্যের স্বত্বাধিকারীগণ স্টেট ডিপার্টমেন্ট-এর শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। অনেকেই যুদ্ধে করা বাণিজ্য থেকে বিশাল সৌভাগ্যশালী বনে যায়, আর অন্যান্য ব্যবসায়ীরা যুদ্ধকে দক্ষিণ অ্যামেরিকা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করে। নাই-কমিটির তদন্ত জনগণকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে যে, 'মৃত্যু বণিক' তথা অস্ত্র-ব্যবসায়ীগণ যুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। যদিও 'নাই' কমিটি এই অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় যে, অস্ত্র ব্যবসায়ীগণ প্রেসিডেন্টকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে কি না।

আঠারো মাস তদন্তের পর যুদ্ধের সঙ্গে অস্ত্র-ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ 'অনৈতিক' সম্পৃক্ততা খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়ে নাই-কমিটি যুদ্ধের পর যাদের দিকে প্রথম অভিযোগের তীর ছোঁড়া হয়েছিল, সেই ব্যাংকারদের দিকে ফোকাস করে। ইউরোপে যুদ্ধ শুরুর পর উইলসন প্রশাসন মিত্রপক্ষকে অধিক ঋণ প্রদান করতে ব্যাংকারদের অনুমোদন দেয়, এজন্য তাদের পলিসিতেও পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর এসব ব্যাংকের মধ্যে সর্বপ্রথম অবস্থানে ছিল 'হাউস অব মরগান'। ১৯১৫ থেকে ১৯১৭-এর মধ্যে অ্যামেরিকা থেকে কেনা মিত্রপক্ষের যুদ্ধোপকরণের ৮৪% লেনদেন হয় মরগান ব্যাংক-এর মাধ্যমে। ব্রিটিশদের যখন অস্ত্র ক্রয়ের সক্ষমতা শেষ হয়ে যায়, তখন মরগান ব্যাংক তাদেরকে শত শত মিলিয়ন ডলার ধার দেয়। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াল স্ট্রীট-এর বিনিয়োগকারী ব্যাংকারদের ওপর এক তদন্তে বেরিয়ে এল যে, আগের দু বছর ব্যাংকটির সত্ত্বাধিকারী মরগান কোনো আয়কর পরিশোধ করেননি। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও নাই-কমিটি প্রমাণ করার মতো কিছু খুঁজে পেল না। নাই-কমিটি একটি প্রশ্নের উত্তর বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বের করার চেষ্টা করছিল, মার্কিন সরকার কেন প্রথমে অক্টোবর, ১৯১৪-এ এবং আগস্ট, ১৯১৫-এ পুনরায় মিত্রপক্ষকে ঋণ প্রদানের অনুমোদন দেয়। যেখানে যুদ্ধের শুরুতে অ্যামেরিকায় উভয়পক্ষকেই ঋণ প্রদান নিষিদ্ধ ছিল।

যাইহোক, কমিটির তদন্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয় যে, আগস্ট, ১৯১৫-এ প্রেসিডেন্ট কর্তৃক দ্বিতীয় দফায় লোন অনুমোদনের সময় গুরুতর কিছু ঘটে। ১৯১৫-এ ব্রিটেন অ্যামেরিকার সঙ্গে বিশাল আকারের পণ্য লেনদেন করছিল, যা বাণিজ্যের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ডলারের বিপরীতে পাউন্ড-এর মূল্য পতন ঘটে; উভয়পক্ষই বুঝতে পারে যে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্রিটেনকে অ্যামেরিকান পণ্য ক্রয় বন্ধ করে দেওয়া লাগতে পারে। মার্কিন কোষাগার এর সেক্রেটারি, উইলিয়াম ম্যাকএডু এবং সেক্রেটারি অব স্টেট রবার্ট ল্যানসিং দাবি করে যে, পাউন্ড-এর দরপতন অ্যামেরিকারও অর্থনৈতিক ধ্বংসের কারণ হতে পারে। ম্যাকএডু প্রেসিডেন্টের কাছে লিখল, অ্যামেরিকার সমৃদ্ধি চলমান ও বিশাল বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল; তাই এই সমৃদ্ধি সুরক্ষিত রাখতে তাদের অবশ্যই তাদের ক্রেতাকে ক্রয় করতে সর্বপ্রকার সহায়তা করা উচিত। তার মতে, গ্রেট ব্রিটেন সবসময়ই তাদের সেরা ক্রেতা ছিল এবং আছে। ল্যানসিং আরও এক ধাপ এগিয়ে ধারণা করলেন, অ্যামেরিকা যদি ব্রিটেনকে ক্রয় করার ব্যাপারে সহায়তা না করে, তাহলে শিল্পক্ষেত্রে মন্দা, অলস পুঁজি আর শ্রম, অসংখ্য ঘাটতি, আর্থিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, জনসাধারণের মাঝে অস্থিরতা এবং শ্রমিক শ্রেণির মাঝে ভোগান্তি নেমে আসবে।

এই বিপর্যয় ঠেকাতে দুজন মিলে ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডকে তাদের লোন প্রদানের নীতি শিথিল করতে প্ররোচিত করেন, যা ব্রিটেনকে অধিক অস্ত্র কেনার অনুমোদন দেবে। কমিটির কয়েকজন সদস্যের মতে, তারা দুজন ব্যাংকসমূহের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এই তথ্যের উন্মোচনের ফলে তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশ্বাস এ ব্যাপারে আরও দৃঢ় হচ্ছিল যে, ব্যাংকাররা মার্কিন পলিসিকে যুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছে। দুজন ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড মেম্বার-পল ওয়ারবার্গ ও অ্যাডলফ মিলার, দুজনেই জার্মান বংশোদ্ভূত-ঐ সময়ে আইনে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে বিরোধিতা করেন। ওয়ারবার্গ ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের গভর্নরকে লিখিত মন্তব্য করেন যে, বাণিজ্য চলমান রাখতে এই যুদ্ধ চলমান রাখতে হবে—এ ধরনের চিন্তা কদর্যতা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু ম্যাকএডু প্রেসিডেন্টকে বলেন, তারা দুজন তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি টান থেকে এই বিরোধিতা করছে।

১৯১৫, ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড আইন শিথিল করে, অতঃপর হাউস অব মরগান ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে দ্রুতই বিশাল লোন প্রদান করল। যদিও কমিটি আলাদাভাবে কোনো ব্যাংককে দোষী সাব্যস্ত করতে ব্যর্থ হয়, তথাপি তারা আবিষ্কার করে, অ্যামেরিকান সরকারের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। লোন প্রদানের বিতর্ক কংগ্রেসে না হয়ে হয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গোপন মিটিং-এ। সবচেয়ে বিস্ফোরক যে তথ্য তারা আবিষ্কার করে, সেটি হচ্ছে-প্রেসিডেন্ট উইলসন অ্যামেরিকান নাগরিকদেরকে ও কংগ্রেসকে যুদ্ধে মিত্রপক্ষের প্রকৃত লক্ষ্যের ব্যাপারে মিথ্যা বলেছেন। তদন্তের শেষ দিকে গোপন ডকুমেন্ট থেকে কমিটি জানতে পারে যে, ১৯১৭-এর এপ্রিলে অ্যামেরিকার আক্রমণের পরপরই প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি অব স্টেট মি. ল্যানসিং জানতে পারেন যে, মিত্রপক্ষ যুদ্ধে বিজয় অর্জন করার পর রাজ্যাংশ ভাগাভাগির ব্যাপারে গোপন চুক্তি করে, কিন্তু তিনি সে বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। ল্যানসিং-এর ডায়েরি আর অন্যান্য পূর্ববর্তী গোপন ডকুমেন্ট প্রমাণ করে যে, প্রেসিডেন্ট ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই গোপন চুক্তির কথা জানতেন (Olmsted, 2009)।

নাই-কমিটি তাদের তদন্তে প্রমাণ করে দেয় যে, বিশ-এর দশকে যুদ্ধবিরোধীরা যে দাবি করত, সেটি সঠিক ছিল—প্রেসিডেন্ট সত্য লুকিয়েছিলেন। কমিটির চেয়ারম্যান নাই তাই সরাসরিই মন্তব্য করেন, উইলসন জাতির কাছে মিথ্যা বলেছে।

পরবর্তীকালে বার্নেইস মন্তব্য করেন, ঐ সময়টাতে প্রোপাগান্ডা এতটাই নেতিবাচক শব্দ হিসেবে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি এটিকে পাবলিক রিলেশন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর এভাবেই বার্নেইস সূচনা করেন নতুন এক ইন্ডাস্ট্রির-পাবলিক রিলেশন।

টিকাঃ
[৩] উসমানীয় সালতানাত ভাঙার পর থেকেই মুসলিমদের চূড়ান্ত দুর্দশার সূচনা। মুসলিমরা হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেয়ে উত্তরণের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। অতঃপর কেউ মুক্তির উপায় হিসেবে বিজয়ীদের অনুসরণ করে পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে শুরু করল, কেউ-বা অন্য আরেক ভ্রান্ত মতবাদ সমাজতন্ত্রকে বেছে নিল, কেউ বা জাতীয়তাবাদ, আবার কেউ-বা দুটি মতবাদের মিশেলে নব্য বিপ্লব ঘটাতে চাইল। খুব কম সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীই ইসলামের আদি বৈশিষ্ট্য আঁকড়ে ধরে রাখার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদের পতাকার আশ্রয়ে স্বায়ত্বশাসন লাভ করলেও ইসলামি শাসন আর কেউ ফিরিয়ে আনতে পারেনি, একমাত্র তালিবান ব্যতীত।
[১] প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
[২] Death merchants

ফন্ট সাইজ
15px
17px