📄 প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা : পার্থক্য
প্রোপাগান্ডাকে অনেকেই স্বাভাবিক যোগাযোগ পদ্ধতি হিসেবে মনে করে। যার মাধ্যমে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ, কোনোকিছুর ব্যাখ্যা প্রদান বা কোনোকিছুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যেসকল তথ্য সরবরাহ করা হয়, সেগুলো বাস্তব ও নির্ভুল বলেও মনে হওয়া স্বাভাবিক। কেবল প্রোপাগান্ডিস্টরাই জানে যে, এর মধ্যে ভিন্ন হেতু লুকিয়ে আছে। বিশেষ ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই তা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ওদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। কিন্তু আসল হাকিকত টার্গেটকৃত জনগণের আড়ালেই থাকে (Jowett & O'Donnell, pp. 45-48)। যাই হোক, প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা—উভয়েরই কিছু নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন :
চূড়ান্ত লক্ষ্য : প্রোপাগান্ডিস্টরা তাদের ভাসাভাসা উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে যা প্ররোচনাকারীদের ন্যায় উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। প্রকৃতপক্ষে, প্রোপাগান্ডিস্টরা শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধার করতে চেষ্টা করে। গ্রাহকের লাভ-ক্ষতি সেখানে মুখ্য বিষয় নয়। তারা গ্রাহকের ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপই করে না। আবার যে তথ্য তারা প্রচার করে, অধিকাংশ সময় নিজেরাই তাতে বিশ্বাস করে না。
পরিচয় : কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে স্বীয় পরিচয় গোপন করাটা প্রোপাগান্ডিস্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রোপাগান্ডিস্টরা তাদের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য গোপন রাখতে সচেষ্ট থাকে। তাই তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে টার্গেটকৃত ব্যক্তি বা দলের জনমত নিয়ন্ত্রণ ও উক্ত ব্যক্তি বা দলের আচরণের প্যাটার্ন (নকশা) পরিবর্তন করে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। প্ররোচনাকারীদের জন্য এরূপ করা অতীব প্রয়োজনীয় নয়। যদি প্রোপাগান্ডিস্টদের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়ে পড়ে কিংবা তথ্যের আসল উৎস উদঘাটিত হয়, সেক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যায়。
প্রকৃতপক্ষে, কোনো সুপরিকল্পিত কাজকে তখনই প্রোপাগান্ডা হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন তা বিশেষ গোষ্ঠীর ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই জনগণ এই বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস করে বা সেসব তথ্যের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। যেমন তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের' ক্ষেত্রে জনগণ এমনটি করেছিল (Soules, 2015, p. 04)।
প্ররোচনার ক্ষেত্রে তথ্যদাতার উদ্দেশ্য যেমন সফল হয়, তেমনিভাবে তথ্যগ্রহীতাও তার ইচ্ছা বা প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। যেহেতু উভয়পক্ষই এখানে লাভবান হচ্ছে, সেহেতু প্রোপাগান্ডার চেয়ে প্ররোচনা তথ্যগ্রহীতার জন্য অধিক লাভজনক (Jowett & O'Donnell, 1986/2012)।
উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা স্পষ্ট করা যাক। ধরুন, আপনার বন্ধুরা আপনার বাবা-মা'কে বলছেন, তাদের সাথে ফুটবল খেলতে গেলে আপনার বখে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ আপনারা খেলতে গিয়ে সালাত ছাড়েন না। তাদের এই রাজি করানোর প্রক্রিয়াকে বলা যায় প্ররোচনা। অপরদিকে, কোনো অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে যোগদানের জন্যে দেশের জনগণকে উৎসাহিত করা এবং এর পিছনে যুক্তি-প্রমাণ ফলাও করে প্রচার করা—এটিকে প্ররোচনা না বলে প্রোপাগান্ডা বলাই বাঞ্ছনীয়। এখানেই প্ররোচনা আর প্রোপাগান্ডার মূল পার্থক্য। প্রোপাগান্ডা প্ররোচনার পন্থাগুলো কাজে লাগায়, কিন্তু দুটি বিষয়ের কর্ম পরিকল্পনার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও ফলাফল কিছুটা ভিন্ন।
স্বীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও পরিচয় গোপন করতে প্রোপাগান্ডিস্টরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে— তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, জনমত নিয়ন্ত্রণ এবং আচরণের প্যাটার্ন বা নকশাকে পরিবর্তন। প্রোপাগান্ডা কী—সেটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে চাইলে টার্মগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
১. তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ : তথ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি, সুবিধাজনক সময়ে তা প্রকাশ করা, অন্য কোনো তথ্যের সাথে মিশিয়ে জনমত প্রভাবিত করা ইত্যাদি হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ। প্রোপাগান্ডিস্টরা সাধারণত দুটি উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে : ক) তথ্য সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ খ) নির্ভরযোগ্য মিডিয়াকে ব্যবহার করে বিকৃত তথ্য উপস্থাপন।
সাংবাদিকদের ব্যবহার করে মিডিয়াতে অনুপ্রবেশ, অতঃপর গুজব ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার তথ্য বিকৃত করার অন্যতম উপায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের যুগ্মসচিব ভিক্টোরিয়া ক্লার্ক দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের সময় (২০০৩) পেন্টাগনের মিডিয়া অপারেশনকে সম্প্রসারিত করেন। তখন একটি রুল এমন ছিল যে, প্রতিটি সাংবাদিককে অবশ্যই মার্কিন সৈন্যদের সাথে অবস্থান করে সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে (Kelley, 2003)। এর মাধ্যমে তারা এমনভাবে যুদ্ধের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছিল যেন দর্শকরা মনে করতে বাধ্য হয়—ইরাকিরা মার্কিন সৈন্যদের সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে। অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে অতি দ্রুতই তারা ইরাক জয় করবে। অথচ পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত (Donvan, 2006)।
২. জনমত গঠন : 'জনমত গঠন' প্রোপাগান্ডার মৌলিক উপাদানসমূহের একটি হিসেবে সক্রিয় থাকে। জনমত বলতে কী বোঝায়? কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস প্রফেসর ফিলিন্স ডেভিসন বলেন, 'কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে যেকোনো সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্তৃক প্রকাশিত পৃথক পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব এবং বিশ্বাসের সমষ্টিই (হলো জনমত)' (Davison, 2020)।
জনমত পরিভাষাটিকে বিভিন্ন শাখার একাডেমিকরা বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যেখানে জনমতকে প্রধানত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে গণ্য করেন, সেখানে সমাজবিজ্ঞানীরা জনমত বলতে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও যোগাযোগকেই বুঝিয়ে থাকেন। তবে, প্রোপাগান্ডিস্টদের কাছে জনমতের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটিকে কিভাবে প্রভাবিত করা যায়, সেই কায়দা রপ্ত করা (Davison, 2020)।
৩. জনতার আচরণ পরিবর্তন : প্রোপাগান্ডার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, জনগণের আচরণ এবং তার প্যাটার্নকে প্রভাবিত করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করা। ভোট প্রদান, দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়, যুদ্ধে অংশগ্রহণ, প্রতীকী বেছে নেওয়া, গ্রুপে যোগদান—প্রোপাগান্ডিস্টরা তাদের টার্গেটকৃত জনগণের কাছ থেকে এ ধরনের সক্রিয় সাড়া লাভে আগ্রহী। কিন্তু, জনগণের আচরণ পরিবর্তন সহজ কোনো বিষয় নয়। তাই, প্রোপাগান্ডিস্টদের এ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল থাকতে হয়, এবং সে অনুযায়ী তারা তাদের কর্ম-পরিকল্পনা সাজায়।
প্রোপাগান্ডা একই সঙ্গে যোগাযোগ ও প্ররোচনা—উভয় প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগায়। কিন্তু প্রোপাগান্ডার প্রকৃত উদ্দেশ্য উল্লিখিত প্রক্রিয়াদ্বয়কে ছাড়িয়ে যায়। তবে, এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, একাডেমিক এই সংজ্ঞা সাধারণত কার্যক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রয়োগ করা হয় না। দেখা যায়, বলার সুবিধার্থে কাউকে যেকোনো বিষয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টাকেই সাধারণত প্ররোচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
টিকাঃ
[১] সচরাচর প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকেই প্ররোচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
[২] Persuader
[৩] War on Terror
[১] Interaction
[২] Sign