📘 প্রোপাগান্ডা 📄 প্রোপাগান্ডার প্রকারভেদ

📄 প্রোপাগান্ডার প্রকারভেদ


প্রোপাগান্ডা প্রক্রিয়া সম্পাদনের অনেক প্রকার উপায় রয়েছে। তথাপি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, সেটি কিছু পদ্ধতিকে বেশি অনুসরণ করে কিংবা সেই পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখে। যেকোনো প্রোপাগান্ডার ভেতরের তথ্য, তথ্যের যথার্থতা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট উৎসের ওপর ভিত্তি করে প্রোপাগান্ডাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়— ১. হোয়াইট প্রোপাগান্ডা ২. গ্রে প্রোপাগান্ডা ৩. ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা
১. হোয়াইট প্রোপাগান্ডা এর উৎপত্তি এমন উৎস থেকে হয়ে থাকে, যে উৎস সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি প্রোপাগান্ডামূলক বার্তাটি যে 'তথ্য' সরবরাহ করে, সেটিও আপাতদৃষ্টিতে নির্ভুল বলেই মনে হয়। জরুরি অবস্থা ব্যতীত তথ্যের বিশুদ্ধতা বজায় রেখে সংবাদমাধ্যম যেসব বিকৃত মতবাদ (যেমন : সেক্যুলারিজম, লিবারেলিজম) প্রচার-প্রসার করে, সেটাই হোয়াইট প্রোপাগান্ডা। তারা এই শ্রেণির যেসব সংবাদ পরিবেশন করে, সেসব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্যি। তবে তাতে অনেক সূক্ষ্ম অপপ্রচার মিশে থাকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ব্যতীত তা চিহ্নিত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় বিজ্ঞ ব্যক্তিও এ শ্রেণির প্রোপাগান্ডা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
প্রোপাগান্ডা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, সংবাদ সরবরাহকারীরা নিজেদেরকে সেরা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী 'নিরপেক্ষ ও সৎ' ব্যক্তি হিসেবে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করে। সাধারণত, জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য হোয়াইট প্রোপাগান্ডা পরিচালনা করা হয়। যেন পরবর্তী সময়ে সে 'বিশ্বাসযোগ্যতা' অন্য কোনো কাজে লাগানো যায় (Jowett & O'Donnell, 1986/2012, p. 17)। হোয়াইট প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য প্রচার করা জরুরি। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে এটি অপরিহার্য একটি বিষয়। কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতবাদের যথার্থতা প্রতিষ্ঠা করাই এই ধরনের প্রোপাগান্ডার উদ্দেশ্য (Cull et al., 2003, p. 426)।
২. গ্রে প্রোপাগান্ডা এর অবস্থান ব্ল্যাক ও হোয়াইট প্রোপাগান্ডার মাঝামাঝি। এই ধরনের প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্রে সংবাদের যথার্থতা সঠিকভাবে নির্ণয় করা বেশ কঠিন, এবং তথ্যের উৎস-ও সহজে চিহ্নিত করা যায় না। যেমন : নাইন ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানের জনগণকে মার্কিন আগ্রাসন সম্পর্কে 'সচেতন' করতে অ্যামেরিকা ফুড কন্টেইনার ও কেবলমাত্র একটি সিগনাল ধরতে সক্ষম, এমন রেডিও আকাশপথে ড্রপ করে। আর সেই সিঙ্গেল সিগনালে মার্কিনীদের পরিচালিত রেডিও স্টেশন নিজেদের পরিচয় অফিসিয়ালি প্রকাশ না করে চ্যানেলটিকে আফগান এফএম হিসেবে উল্লেখ করে। চ্যানেলটিতে আফগান সঙ্গীত সম্প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে 'আফগানিস্তানের মহান জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণে' একটি বিবৃতি সম্প্রচারিত হয়। বার্তাঘোষক তাতে ঘোষণা করত : 'মার্কিন বাহিনী তাদের এলাকা অতিক্রম করবে এবং উসামা বিন লাদেন ও তাঁর সমর্থকদের গ্রেফতার করা ব্যতীত সাধারণ জনগণের ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই' (Cull et al., 2003, p. 153)। গ্রে প্রোপাগান্ডার পরিধি যদিও আরও বিস্তৃত। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্জনসমূহের বার্ষিক রিপোর্টে মিথ্যা বিবরণ, প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনে এমন দাবি করা, যে দাবি পূরণে উক্ত প্রোডাক্টটি অক্ষম—এ সবই গ্রে প্রোপাগান্ডার অন্তর্ভুক্ত।
৩. ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা কোনো তথ্যের উৎস যখন গোপন করা হয় কিংবা কোনো অস্তিত্বহীন কর্তৃপক্ষের সাথে জুড়ে দিয়ে জালিয়াতি আর মিথ্যার প্রচারণা করা হয়—তখন তা ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্দিষ্ট সাধনের উদ্দেশ্যে অপপ্রচারকদের জন্য সোর্স গোপন করাটা জরুরি হয়ে পড়ে (Cull et al., 2003, p. 41)। আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মাঝে হওয়া ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ে BBC আর্জেন্টাইন রেডিও স্টেশনে নতুন আদলে প্রোগ্রাম সম্প্রচার শুরু করে। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট বিবিসির চার্টারে একটি অস্পষ্ট শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। যার ফলে তারা এই অধিকার লাভ করে যে, 'সংকটকালীন' সময়ে বিবিসির ট্রান্সমিটার দখলে নিতে পারবে সরকার। বিবিসির প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল 'Ascension Alice', যেখানে একজন নারী ফকল্যান্ডে অবস্থানরত সৈন্যদের মনোবল বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে আবেদনময়ী কণ্ঠে প্রোগ্রাম পরিচালনা করত। উপস্থাপিকা উক্ত প্রোগ্রামে রিপোর্ট পেশ করে, 'আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট জেনারেল লিওপোল্ডো এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফকল্যান্ড আইল্যান্ডের জন্য তিনি তার ৪০,০০০ সৈন্য বলি দিতে প্রস্তুত।' অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) দাবি করে, 'বিবিসি আর্জেন্টিনার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে তাদের মায়ের আকুতিভরা আরজ নিবেদন করে, যেটি স্পষ্টতই মিথ্যা।' বিবিসির কাছে সৈন্যদের মায়ের অনুরোধগুলো কিভাবে পৌঁছেছিল, সেটাও তারা তখন খোলাসা করেনি (Jowett & O'Donnell, 1986/2012, p. 304)। যুদ্ধ যখন সমাপ্ত হয়, তখন বিবিসির নিরপেক্ষ আর যথার্থ সম্প্রচারের জনপ্রিয়তাকে ভিন্ন কাজে লাগানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার বেশ সমালোচনার শিকার হয় (Cull et al., 2003, p. 42)।
ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা তার বৈশিষ্ট্য অনুসারে সর্বদাই ধোঁকা দিতে চেষ্টা করে। এটি ধোঁকাবাজির সকল মাধ্যমকে প্রোপাগান্ডা দিয়ে পরিবেষ্টিত করে ফেলে। যেমন : পোস্টার, লিফলেট, স্ট্যাম্প, রেডিও, টিভি, হাল আমলের ইন্টারনেট ইত্যাদি। এই ধরনের প্রোপাগান্ডার স্বরূপ যখন উন্মোচিত হয়, তখন সেটা উল্লেখযোগ্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষিত করে। ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডার সফলতা-ব্যর্থতা প্রধানত প্রেরকের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গ্রাহকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে (Cull et al., 2003)।
এ তো গেল তথ্যের উৎসের ওপর ভিত্তি করে প্রোপাগান্ডার শ্রেণিবিন্যাস। ফ্রান্সের সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর জ্যাক এলিউল প্রোপাগান্ডাকে চারটি স্পেশাল ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করেন। প্রোপাগান্ডা যে বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত, সেটি অনুধাবন করতে প্রফেসর ইললের ক্যাটাগরিগুলো বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে—
১. রাজনৈতিক বনাম সামাজিক প্রোপাগান্ডা : পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো দ্বারা গঠিত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। সরকার, রাজনৈতিক অথবা স্বার্থবাদী দল এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের প্রোপাগান্ডার সাথে সম্পৃক্ত যে রাজনৈতিক এজেন্ডা, তার মাধ্যমে একে সহজেই অন্য কোনো সংগঠনের সামাজিক প্রচারণা থেকে আলাদা করা যায়। অন্য দিকে, সামাজিক প্রোপাগান্ডা শনাক্ত করাটা বেশ কঠিন। মূলত এর মাধ্যমেই কোনো সমাজের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নতুন কোনো মতবাদকে ঐ সমাজে প্রবেশ করানো হয়। সচরাচর রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হয়ে থাকে—গণমাধ্যম ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে জনগণকে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মতবাদ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু সামাজিক প্রোপাগান্ডা তার থেকে আলাদা। বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র, প্রযুক্তি, শিক্ষা উপকরণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই ধরনের প্রোপাগান্ডা ফ্যাশন, ট্রেন্ড, মূল্যবোধ আর নৈতিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে (Ellul, 1965/1973, pp. 62-64)।
উল্লিখিত উভয় শ্রেণির প্রোপাগান্ডার মধ্যে পারস্পরিক সম্পৃক্ততাও লক্ষ্যণীয়। যেমন : জাতি-রাষ্ট্র, পশ্চিমা গণতন্ত্র ইত্যাদি রাজনৈতিক মতবাদ স্বাধীনতার নামে পৃথিবীর মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, আজকের বস্তুবাদী 'সভ্যতা' শিক্ষাব্যবস্থাকে করেছে সমন্বিত। যেখানে বালেগ হওয়ার পরও অনেকগুলো বছর ছেলে-মেয়েদের একত্রে সময় ব্যয় করতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নামে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়স, সেই সাথে আর্ট আর কালচারের নামে প্রচার করছে নগ্নতা আর অসভ্যতা। সমাজের ফ্যাশন, ট্রেন্ড পরিবর্তন করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে কতিপয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। তারা নারী স্বাধীনতার জয়গান গায়, অথচ পোশাক পাল্টানোর মতো জীবনসঙ্গী পরিবর্তন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। এই উভয় পক্ষের মাঝে মোটা দাগে তেমন কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই। ফলে প্রায়শই দেখা যায়, সামাজিক প্রোপাগান্ডা চালানো এই ব্যক্তি বা সংগঠনগুলোকে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা পোষা কুকুর হিসেবে গ্রহণ করে। অপরদিকে, সামাজিক অপপ্রচারকরা আত্মনিয়োগ করে রাষ্ট্রব্যবস্থার তোষামোদিতে। নগ্ন দালালিতে লিপ্ত হয়ে তারা সময় অতিবাহিত করে জনগণের স্বার্থ-বিরোধী কাজে।
২. উত্তেজিতকারী বনাম একীভূতকারী প্রোপাগান্ডা : উত্তেজিতকারী প্রোপাগান্ডা পরিচালিত হয় প্রকাশ্যে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর ফলাফল হয় ধ্বংসাত্মক। কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমকে বদলে দিতে এর প্রয়োজন হয়। এই ধরনের প্রোপাগান্ডা সর্বশক্তি ব্যবহার করে এর পক্ষে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ক্রুসেড, বিপ্লব (বলশেভিক, ফ্রেঞ্চ) কিংবা আচমকা রাজনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এই ধরনের প্রোপাগান্ডা ব্যবহৃত হয়।
অপরদিকে, একীভূতকারী প্রোপাগান্ডা ব্যবহৃত হয় ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত কোনো সিস্টেমের সাথে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের খাপ খাইয়ে তোলার উদ্দেশ্যে। সমাজ চায়—এর অভ্যন্তরে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তি নিজেকে ঐ সমাজের ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে চিন্তা করুক। যেন সে ঐ সমাজের সকল প্রথা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ আর প্রভাব বিস্তারকারী আচরণের সাথে সম্পূর্ণরূপে ঐকমত্য পোষণ করে। সমাজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক কর্মকাণ্ডকে সানন্দে, বিনা-প্রশ্নে গ্রহণ করে। প্রায়ই তাদেরকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, সকলের সাথে একীভূত হয়েই কেবল তারা নিজেদের 'পরিপূর্ণ' করতে সক্ষম হবে।
উসমানি সালতানাত ধ্বংস হবার পর উপনিবেশবাদীরা প্রায় প্রতিটি মুসলিম জনপদ দখল করে নেয়। তখন ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক-সহ প্রায় সকল জনপদেই তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা চাপিয়ে দিতে শুরু করে। কালের আবর্তে পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা তাদের তাঁবেদার গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তখন হাকিম বদলালেও হুকুমের কোনো নড়চড় হয়নি। উল্টো হুকুমত আরও শক্তিশালী হয়েছে। উপনিবেশবাদীরা পর্যন্ত যেখানে পারিবারিক আইনে হাত দেয়নি, সেখানে তাঁবেদার গোষ্ঠী পারিবারিক আইনেও রদবদল করেছে। ওয়েস্টার্ন কালচারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত শক্তি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধগুলোকেও তাদের নিজস্ব এজেন্ডার সাথে একীভূত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। এছাড়াও (বর্তমানে) মৃতপ্রায় কমিউনিজমও তার জন্মলগ্নে উত্তেজক প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছিল, পরবর্তীকালে কোনো ভূখণ্ড কমিউনিস্টদের দখলে আসলে এর অনুসারীরা সেখানে একীভূতকারী প্রোপাগান্ডা প্রচার করত।
৩. উলম্ব বনাম আনুভূমিক প্রোপাগান্ডা : উলম্ব প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সাধারণত কোনো দল বা গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বতন পদাধারী কোনো ব্যক্তি তার অধস্তন ব্যক্তিদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে। যারা উক্ত প্রোপাগান্ডার সম্মুখীন হয়, তাদের নিষ্ক্রিয়তা এই শ্রেণির প্রোপাগান্ডা সফল করতে বড় ভূমিকা রাখে। যদিও তারা নিজেদের বিচার-বুদ্ধি ও আবেগ সঠিক উপায়ে ব্যবহার করে, তথাপি অনেক সময়ই তারা নেতার ইচ্ছার কাছে নিজেদের মতামত বিলীন করে দেয় বা দিতে বাধ্য হয়。
অপরদিকে আনুভূমিক প্রোপাগান্ডা কোনো দল বা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে পরিচালিত হয়—যেখানে প্রকৃত অর্থে কোনো নেতা নেই। পৃথক পৃথক ব্যক্তি একে অপরের স্পর্শে থাকে, প্রত্যেকেই দলের প্রতি 'সচেতন আনুগত্য' প্রদর্শন করে। উক্ত দলের ছোট ছোট প্যাকের ভিতর অনেক উপদল থাকতে পারে। প্রত্যেক গ্রুপই বৃহৎ দলটির জন্য কাজ করে। বাংলাদেশে এলজিবিটি প্রোমোশনে যারা কাজ করছে, তাদের দলকে এই প্রোপাগান্ডার কাতারে ফেলা যায়। এখানে অবশ্য বিভিন্ন ধরনের গ্রুপ একত্র হয়ে এই প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।
৪. যৌক্তিক বনাম অযৌক্তিক প্রোপাগান্ডা : বেশিরভাগ সময়ই আমরা প্রোপাগান্ডাকে অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত করে থাকি। প্রোপাগান্ডা শুধুই ভুল, ত্রুটিপূর্ণ তথ্য এবং আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত—এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ফ্যাক্ট, পরিসংখ্যান ও বিশেষ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রোপাগান্ডা পরিচালনা করা সম্ভব (Ellul, 1965/1973, p. 84)। যৌক্তিক প্রোপাগান্ডা দাবি করে, সে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটা শুনতে হয়তো সঠিক মনে হতে পারে। অথচ এই প্রোপাগান্ডার ভিত্তিসমূহ সচরাচর সিলেক্টিভ, বিকৃত আর বিভ্রান্তিকর হয়ে থাকে (Soules, 2015, p. 08), যেমন ধরুন : পরিবেশ বিপর্যয় অস্বীকার, LGBTQ+ এর প্রচার।
ওয়েস্টার্ন প্রোপাগান্ডাগুলো অনেকাংশেই তাদের বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। যদিও পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার পেছনের দর্শন অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম, এবং তাদের বহু গবেষণার সঠিক ফলাফল তাদের আমজনতার বিশ্বাস ও কর্মের বিপরীত। তারপরও, সংকীর্ণ যুক্তি আর নির্দিষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট কিছু গবেষণার ফলাফল প্রচার করে ওরা ওদের প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যায়। মানুষের অন্তর্দৃষ্টি সীমাহীন নয়, তার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুক্তি দিয়ে সে জীবনের সব পথ অতিক্রম করতে পারবে না। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, সেই আল্লাহ তাআলা আমাদের এই দুর্বলতা জানেন বিধায় আমাদের গাইডলাইন হিসেবে কুরআন নাযিল করেছেন। আল্লাহর আনুগত্য বাদ দিয়ে নিজেদের বুদ্ধিতে সমাধান খুঁজলে কেউ কেউ হয়তো দুনিয়ার জীবনটা জাঁকজমকের সাথে পাড়ি দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু আখিরাতে সে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে বাধ্য।
বর্তমান সময়ে শিক্ষিত ব্যক্তিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুক্তির ওপর ভরসা করে চলতে চায়। তারা 'কারণ' আর 'অভিজ্ঞতা-লব্ধ' তথ্যের অনুসন্ধান করে। তাই, তথ্য-সমৃদ্ধ প্রোপাগান্ডা বর্তমান সময়ে অধিক কার্যকর। প্রোপাগান্ডাতে যত বেশি সিলেক্টিভ তথ্য প্রবেশ করানো যায়, টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের প্রোপাগান্ডার সমালোচনা করার প্রবণতা, ক্ষমতা এবং প্রতিরোধ শক্তি ততই হ্রাস পায়। তবে, এই 'যৌক্তিকতা'র মানে কী? যুক্তির পাশাপাশি আরও একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—গ্রাহক। সকল গ্রাহক কি 'তথ্য' পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করার যোগ্যতা রাখেন? ধরুন, আপনার সন্তানদের স্কুলে শেখানো হচ্ছে : তোমার যা মনে হবে, তুমি তাই। তোমার যদি মনে হয় তুমি ভুল দেহে এসেছ, সেটাই ঠিক। তুমি আসলে মেয়ে, কিন্তু ভুলক্রমে ছেলের দেহে জন্ম নিয়েছ। সাইন্সও তাই বলে। এসব শুনতে শুনতে আপনার ছেলের মনে হলো সে আসলেই মেয়ে, তার দেহ ভুল। সে এখন জেন্ডার চেঞ্জ করতে চায়। তার এ সিদ্ধান্ত কি সঠিক? আপনি কি তার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাবেন?
এটাই যৌক্তিক প্রোপাগান্ডা। 'বৈজ্ঞানিক' শব্দটা শুনতে বেশ শ্রুতিমধুর মনে হয়। প্রোপাগান্ডা যখন সফল হয়, তখন তা টার্গেটকৃত দর্শকদের হৃদয়ে অযৌক্তিক এক প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করে, আর সেটাই প্রোপাগান্ডার সফলতা। এই ভুল প্রতিচ্ছবিটি এমন সব ভুল যুক্তি আর তথ্যের ওপর নির্ভরশীল যে, প্রকৃত সত্য, বাস্তবতা, চিন্তার সক্ষমতা সবকিছুই এটি ভুলিয়ে দেয় (Ellul, 1965/1968, p. 86)।

টিকাঃ
[১] ইসলামে নারীদের ভূমিকা, নারী ও পুরুষের মাঝে ইসলামের নির্দিষ্ট করে দেওয়া কিছু পার্থক্য, ইসলামি শরীয়াত, ইসলামি শাসনব্যবস্থা, ইসলামি অর্থনীতি ইত্যাদি।
[২] Objective
[৩] Subjective
[১] Agitation
[২] Integration
[১] Vertical
[২] Horizontal
[১] Mass Psychology, এর অর্থ হলো সাধারণ জনগণের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা ও কর্মের প্যাটার্ন

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা

📄 প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা


'প্রোপাগান্ডা' পরিভাষাটির সাথে 'প্ররোচনা'র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। প্ররোচনা পরিভাষাটি এক বিশেষ প্রকারের যোগাযোগ পদ্ধতি, যেখানে অন্যদের প্রভাবিত করতে পরস্পর তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। প্ররোচনা শব্দটি Persuasion-এর কাছাকাছি অর্থ ধারণ করে। অ্যামেরিকান সাইকোলজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন (APA)-এর দেওয়া সংজ্ঞানুসারে প্ররোচনা হচ্ছে—'কোনো বিষয়, ব্যক্তি, মতবাদ বা বস্তু সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস, মনোভাব অথবা অনুভূতি বদলানোর জন্য কারও সক্রিয় প্রচেষ্টা' (APA, 2020)।
প্রোপাগান্ডার আবির্ভাবের কয়েক দশক পর 'মিডিয়া থিওরি'র পথিকৃৎ দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান জনগণকে মিডিয়া সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে তুমুল জনপ্রিয় মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন জনগণকে কিভাবে বিভ্রান্ত করত, ম্যাকলুহান তা সুনিপুণ ভাষায় ফুটিয়ে তোলেন। তার ভাষায়, 'আমাদের যুগটিই অভূতপূর্ব—যেখানে হাজারও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জনগণের চিন্তার অভ্যন্তরে প্রবেশ করাকেই তাদের ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছে। জনগণের চিন্তার গভীরে প্রবেশ করে তাদের চিন্তাধারাকে নিয়ন্ত্রণপূর্বক নিজেদের কাজে লাগানোর জন্য প্ররোচিত করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। আর (জনগণের হৃদয়ে) আলোর পরিবর্তে কামনা সৃষ্টিই (ঐসকল ব্যক্তিদের) অভিলাস' (McLuhan, 1951/2011)।
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে অ্যামেরিকান সাংবাদিক ভ্যান্স প্যাকর্ড বলেন, 'বিজ্ঞাপনদাতা এবং অন্যান্য সমগোত্রীয় পেশাজীবী ব্যক্তিগণ মোটিভেশনাল সাইকোলজি ব্যবহার করতে শুরু করেছে।' বর্তমান সময়ে এসে হয়তো তার এ কথাগুলো বেশ পুরোনো মনে হতে পারে, তথাপি তৎকালীন সময়ের জন্য প্যাকর্ডের দেওয়া তথ্য ছিল বেশ চমকপ্রদ। তিনি মন্তব্য করেন, 'আমাদের অমনোযোগী থাকার (চিরাচরিত) অভ্যাস, ক্রয় করার সিদ্ধান্ত এবং চিন্তার পদ্ধতিকে মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান থেকে উৎসারিত তথ্য ব্যবহার করে (নির্দিষ্ট) গতিপথে আনতে বেশ বড় ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা প্রায়শই চোখ ধাঁধানো সফলতা অর্জন করে। এই ধরনের প্রচেষ্টা সমূহ সচরাচর আমাদের বোধশক্তির আড়ালেই থেকে যায়' (Packard, 1957/2007, p. 31)।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যখন তার উৎকর্ষতার সোনালি সময় পার করছিল, তখন পুরো সমাজটাই যেন ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, প্রোপাগান্ডিস্ট, বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এক বিশাল ল্যাবরেটরিতে রূপান্তরিত হলো (Soules, 2015, p. 96)। মার্কেট রিসার্চ, জরিপ, মানুষের ব্যয় করার অভ্যাসের ওপর গবেষণা—ট্রেন্ড, ডাটা বিশ্লেষণ—এসব বিষয় যেকোনো কাজের পিছনে মানুষের প্রেরণার উৎস আর তার স্বভাবগত ধর্ম অনুধাবনে উপরিউক্ত পেশাজীবী ব্যক্তিদের সহায়তা করল।
প্রফেসর গ্যাস এবং সেইটার (১৯৯৮/২০১৮) বলেন, 'প্ররোচনা হলো বিশ্বাস, মনোভাব, উদ্দেশ্য, প্রেরণা অথবা আচরণকে একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগ সীমার মধ্যে সৃষ্টি, শক্তিশালী, পরিবর্তিত বা প্রশমিত করার পদ্ধতি'। উক্ত সংজ্ঞা থেকে ধারণা লাভ করা যায় যে, প্ররোচনার পরিধি বেশ ব্যাপক। প্ররোচনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি বিশুদ্ধ বা অন্যান্য উদ্দেশ্যের সঙ্গে পাশাপাশি অবস্থায় থাকতে পারে, ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি হতে পারে বা ব্যক্তির নিজস্বও হতে পারে, উদ্দেশ্যমূলক বা অনিচ্ছাকৃত, সফল বা ব্যর্থ, জবরদস্তিমূলক বা কোমল, প্রতীকী কিংবা অপ্রতীকী, মিডিয়া এবং কনটেক্সট দ্বারা প্রভাবিত হয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হয় (Gass & Seiter, 1998/2018)।
প্ররোচনা ব্যক্তির মনোভাব, মূল্যবোধ, বিশ্বাস আর আচরণ এমন উপায়ে পরিবর্তন করতে চায় যে, সেখানে উভয়পক্ষই যেন সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু যখন কোনো সংবাদ এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যার আদান-প্রদানে শুধুমাত্র সংবাদদাতাই তার ফায়দা ভোগ করে, তখন তা পরিণত হয় প্রোপাগান্ডাতে। প্রফেসর এলিউল বলেন, 'প্রোপাগান্ডা (পরিকল্পিত গল্পের সাহায্য নিয়ে) একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে আচরণ করে ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ দখলে নিতে চায়। এটি যে মিথটি তৈরি করে, তা এমন এক স্ব-প্রণোদিত ধারণা আপনার ওপর চাপিয়ে দেয়, যা শুধুমাত্র একটি ব্যাখ্যাই দিতে সক্ষম—যে ব্যাখ্যা প্রোপাগান্ডিস্ট-এর মনঃপূত' (Ellul, 1965/1973, p. 11)।

টিকাঃ
[১] Gass & Seiter

📘 প্রোপাগান্ডা 📄 প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা : পার্থক্য

📄 প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা : পার্থক্য


প্রোপাগান্ডাকে অনেকেই স্বাভাবিক যোগাযোগ পদ্ধতি হিসেবে মনে করে। যার মাধ্যমে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ, কোনোকিছুর ব্যাখ্যা প্রদান বা কোনোকিছুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যেসকল তথ্য সরবরাহ করা হয়, সেগুলো বাস্তব ও নির্ভুল বলেও মনে হওয়া স্বাভাবিক। কেবল প্রোপাগান্ডিস্টরাই জানে যে, এর মধ্যে ভিন্ন হেতু লুকিয়ে আছে। বিশেষ ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই তা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ওদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। কিন্তু আসল হাকিকত টার্গেটকৃত জনগণের আড়ালেই থাকে (Jowett & O'Donnell, pp. 45-48)। যাই হোক, প্রোপাগান্ডা ও প্ররোচনা—উভয়েরই কিছু নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন :
চূড়ান্ত লক্ষ্য : প্রোপাগান্ডিস্টরা তাদের ভাসাভাসা উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে যা প্ররোচনাকারীদের ন্যায় উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। প্রকৃতপক্ষে, প্রোপাগান্ডিস্টরা শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধার করতে চেষ্টা করে। গ্রাহকের লাভ-ক্ষতি সেখানে মুখ্য বিষয় নয়। তারা গ্রাহকের ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপই করে না। আবার যে তথ্য তারা প্রচার করে, অধিকাংশ সময় নিজেরাই তাতে বিশ্বাস করে না。
পরিচয় : কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে স্বীয় পরিচয় গোপন করাটা প্রোপাগান্ডিস্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রোপাগান্ডিস্টরা তাদের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য গোপন রাখতে সচেষ্ট থাকে। তাই তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে টার্গেটকৃত ব্যক্তি বা দলের জনমত নিয়ন্ত্রণ ও উক্ত ব্যক্তি বা দলের আচরণের প্যাটার্ন (নকশা) পরিবর্তন করে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। প্ররোচনাকারীদের জন্য এরূপ করা অতীব প্রয়োজনীয় নয়। যদি প্রোপাগান্ডিস্টদের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়ে পড়ে কিংবা তথ্যের আসল উৎস উদঘাটিত হয়, সেক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যায়。
প্রকৃতপক্ষে, কোনো সুপরিকল্পিত কাজকে তখনই প্রোপাগান্ডা হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন তা বিশেষ গোষ্ঠীর ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই জনগণ এই বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস করে বা সেসব তথ্যের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। যেমন তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের' ক্ষেত্রে জনগণ এমনটি করেছিল (Soules, 2015, p. 04)।
প্ররোচনার ক্ষেত্রে তথ্যদাতার উদ্দেশ্য যেমন সফল হয়, তেমনিভাবে তথ্যগ্রহীতাও তার ইচ্ছা বা প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। যেহেতু উভয়পক্ষই এখানে লাভবান হচ্ছে, সেহেতু প্রোপাগান্ডার চেয়ে প্ররোচনা তথ্যগ্রহীতার জন্য অধিক লাভজনক (Jowett & O'Donnell, 1986/2012)।
উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা স্পষ্ট করা যাক। ধরুন, আপনার বন্ধুরা আপনার বাবা-মা'কে বলছেন, তাদের সাথে ফুটবল খেলতে গেলে আপনার বখে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ আপনারা খেলতে গিয়ে সালাত ছাড়েন না। তাদের এই রাজি করানোর প্রক্রিয়াকে বলা যায় প্ররোচনা। অপরদিকে, কোনো অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে যোগদানের জন্যে দেশের জনগণকে উৎসাহিত করা এবং এর পিছনে যুক্তি-প্রমাণ ফলাও করে প্রচার করা—এটিকে প্ররোচনা না বলে প্রোপাগান্ডা বলাই বাঞ্ছনীয়। এখানেই প্ররোচনা আর প্রোপাগান্ডার মূল পার্থক্য। প্রোপাগান্ডা প্ররোচনার পন্থাগুলো কাজে লাগায়, কিন্তু দুটি বিষয়ের কর্ম পরিকল্পনার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও ফলাফল কিছুটা ভিন্ন।
স্বীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও পরিচয় গোপন করতে প্রোপাগান্ডিস্টরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে— তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, জনমত নিয়ন্ত্রণ এবং আচরণের প্যাটার্ন বা নকশাকে পরিবর্তন। প্রোপাগান্ডা কী—সেটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে চাইলে টার্মগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
১. তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ : তথ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি, সুবিধাজনক সময়ে তা প্রকাশ করা, অন্য কোনো তথ্যের সাথে মিশিয়ে জনমত প্রভাবিত করা ইত্যাদি হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ। প্রোপাগান্ডিস্টরা সাধারণত দুটি উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে : ক) তথ্য সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ খ) নির্ভরযোগ্য মিডিয়াকে ব্যবহার করে বিকৃত তথ্য উপস্থাপন।
সাংবাদিকদের ব্যবহার করে মিডিয়াতে অনুপ্রবেশ, অতঃপর গুজব ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার তথ্য বিকৃত করার অন্যতম উপায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের যুগ্মসচিব ভিক্টোরিয়া ক্লার্ক দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের সময় (২০০৩) পেন্টাগনের মিডিয়া অপারেশনকে সম্প্রসারিত করেন। তখন একটি রুল এমন ছিল যে, প্রতিটি সাংবাদিককে অবশ্যই মার্কিন সৈন্যদের সাথে অবস্থান করে সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে (Kelley, 2003)। এর মাধ্যমে তারা এমনভাবে যুদ্ধের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছিল যেন দর্শকরা মনে করতে বাধ্য হয়—ইরাকিরা মার্কিন সৈন্যদের সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে। অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে অতি দ্রুতই তারা ইরাক জয় করবে। অথচ পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত (Donvan, 2006)।
২. জনমত গঠন : 'জনমত গঠন' প্রোপাগান্ডার মৌলিক উপাদানসমূহের একটি হিসেবে সক্রিয় থাকে। জনমত বলতে কী বোঝায়? কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস প্রফেসর ফিলিন্স ডেভিসন বলেন, 'কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে যেকোনো সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্তৃক প্রকাশিত পৃথক পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব এবং বিশ্বাসের সমষ্টিই (হলো জনমত)' (Davison, 2020)।
জনমত পরিভাষাটিকে বিভিন্ন শাখার একাডেমিকরা বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যেখানে জনমতকে প্রধানত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে গণ্য করেন, সেখানে সমাজবিজ্ঞানীরা জনমত বলতে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও যোগাযোগকেই বুঝিয়ে থাকেন। তবে, প্রোপাগান্ডিস্টদের কাছে জনমতের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটিকে কিভাবে প্রভাবিত করা যায়, সেই কায়দা রপ্ত করা (Davison, 2020)।
৩. জনতার আচরণ পরিবর্তন : প্রোপাগান্ডার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, জনগণের আচরণ এবং তার প্যাটার্নকে প্রভাবিত করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করা। ভোট প্রদান, দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়, যুদ্ধে অংশগ্রহণ, প্রতীকী বেছে নেওয়া, গ্রুপে যোগদান—প্রোপাগান্ডিস্টরা তাদের টার্গেটকৃত জনগণের কাছ থেকে এ ধরনের সক্রিয় সাড়া লাভে আগ্রহী। কিন্তু, জনগণের আচরণ পরিবর্তন সহজ কোনো বিষয় নয়। তাই, প্রোপাগান্ডিস্টদের এ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল থাকতে হয়, এবং সে অনুযায়ী তারা তাদের কর্ম-পরিকল্পনা সাজায়।
প্রোপাগান্ডা একই সঙ্গে যোগাযোগ ও প্ররোচনা—উভয় প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগায়। কিন্তু প্রোপাগান্ডার প্রকৃত উদ্দেশ্য উল্লিখিত প্রক্রিয়াদ্বয়কে ছাড়িয়ে যায়। তবে, এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, একাডেমিক এই সংজ্ঞা সাধারণত কার্যক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রয়োগ করা হয় না। দেখা যায়, বলার সুবিধার্থে কাউকে যেকোনো বিষয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টাকেই সাধারণত প্ররোচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

টিকাঃ
[১] সচরাচর প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকেই প্ররোচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
[২] Persuader
[৩] War on Terror
[১] Interaction
[২] Sign

ফন্ট সাইজ
15px
17px