📄 লেখকের কথা
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম সকল প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি আসমান ও জমিনে থাকা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। দরুদ ও সালাম পেশ করছি সেই মহান রাসূলের প্রতি, যাঁর আগমনে উদ্ভাসিত হয়েছে বিশ্ব মানবতা। দূরীভূত হয়েছে সকল তাগুতের কালিমা। মানুষ আবারও খুঁজে পেয়েছে মহান আল্লাহকে পাওয়ার সরল পথ। সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
প্রোপাগান্ডা বহির্বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় শব্দ হলেও আমাদের দেশে আম পর্যায়ে শব্দটির তেমন প্রচলন নেই। তবে, শব্দের পরিচিতি কম থাকলেও আমাদের দেশে যে এর প্রয়োগ নেই, তেমনটি ভাবা বোকামি হবে। ডিজিটাল ডিভাইসের এই শতাব্দীতে বহির্বিশ্বের বহু সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে প্রোপাগান্ডাও আমাদের দেশে সয়লাব হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সুবিধাবাদী নানা গ্রুপ ইসলাম, মুসলিম ও এই অঞ্চলের অধিবাসীদের বিপক্ষে নিত্যনতুন প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এসবের বিপরীতে আমাদের অগ্রজ আলিম ও অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবসময়ই সঠিক বিষয়টি তুলে ধরার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আলহামদু-লিল্লাহ।
তবে, মৌলিকভাবে প্রোপাগান্ডা কী, কীভাবে এর প্রয়োগ হয়, প্রোপাগান্ডা কীভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা হ্রাস করা যায়, সেসকল বিষয়ে লেখালেখির দায়বদ্ধতার বিষয়টা হুট করেই আমার চিন্তায় আসে। আর সেখান থেকেই মূলত এই বিষয়ে লেখালেখির শুরু। শুরুতে শুধুই প্রতিবেদন লেখার ইচ্ছা থাকলেও পরবর্তী সময়ে দেখতে পাই, প্রোপাগান্ডার পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাই, লিখতে লিখতে এক সময়ে চিন্তাটা প্রতিবেদনের বদলে মলাটে ঢোকার পরিকল্পনায় রূপান্তরিত হয়।
প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের তথ্য জোগাড় করতে আমি মূলত পশ্চিমা সোর্সের ওপর নির্ভর করেছি। পশ্চিমা শিক্ষক, পণ্ডিত, গবেষকদের দেওয়া তথ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে বইটিতে সকল তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিষয়টি এ জন্য করা হয়েছে, যেন দেশীয় কাণ্ডজ্ঞানহীন সেক্যুলাররা কোনো সোর্সের বিপক্ষে এ কথা বলতে না পারে—সেক্যুলারদের ছড়ানো প্রোপাগান্ডা শুধু ইসলামি সোর্স দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়!
এ বইটি লিখতে গিয়ে আমার অনুপ্রেরণা ছিল এ দেশের সবচেয়ে বড় ইন্টেলেকচুয়াল লেখক (আমার দৃষ্টিতে) ডাক্তার শামসুল আরেফীন শক্তি ভাই। উনার যে চিন্তাধারা, যে কর্মময় জীবন, তা থেকে যে সুবাসিত জ্ঞানের আলোকোজ্জ্বল ধারা প্রতিফলিত হয়ে চারপাশ মাতোয়ারা করে রেখেছে গত দশক। তা-ই আমার জন্য শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। যদিও আমি বা আমার কাজ ভাইয়ের পদতলে স্থান পাবারও যোগ্যতা রাখে না, তবুও নানা সময়ে শক্তি ভাইয়ের পরামর্শ আমাকে উজ্জীবিত রেখেছে। এমনিতে কাজটা সহজ হলেও আমার মতো অধমের জন্য তা বেশ কঠিন ছিল। শুধুমাত্র শক্তি ভাইয়ের কাজগুলো দেখেই আমি দৃঢ়পদ ছিলাম। তাছাড়া করোনা-কালীন বইটা লেখার সময় আমার পরিবারের সদস্যদের সাপোর্টের কথাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ তাদেরকে যথাযথ প্রতিদান দিন।
লেখাগুলো ছাপানোর যোগ্য কি না, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান থাকলেও সন্দীপন প্রকাশনীর শ্রদ্ধেয় ও অগ্রজ প্রকাশক ভাই নিজ অনুগ্রহে এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এছাড়াও দেশের তরুণ সমাজের অন্যতম প্রিয় ব্যক্তিত্ব মুহতারাম জাকারিয়া মাসুদ ভাইও লেখাগুলোকে ছাপার যোগ্য করে তুলতে ব্যাপক খাটাখাটুনি করেন। প্রিয় শক্তি ভাই, শ্রদ্ধেয় প্রকাশক ও জাকারিয়া মাসুদ ভাই ছাড়াও আরও অনেকে আমাকে লেখাগুলো বই আকারে আনতে উৎসাহ দেন। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন আমারই প্রিয় জুনিয়র মোহাম্মদ হোসাইন। এছাড়াও মুহাম্মদ নাফিস নাওয়ার ভাইয়ের অনুগ্রহের কথা হয়তো লিখে প্রকাশ করা যাবে না। তাই সে চেষ্টা আর নাই-বা করলাম। আল্লাহ তাআলা আমার প্রিয় এই মানুষগুলোকে কবুল করে নিন। এই দুআই মহান রবের দরবারে করে যাই বারবার।
আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। প্রোপাগান্ডা বিশ্লেষণে সামান্য কিছু তথ্য জানলেও ইলমের দিক দিয়ে আমি নিতান্তই মূর্খ। তাই কোনো ভুল পেলে তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ এবং তা সরাসরি আমাকে জানালে সর্বোত্তম অনুগ্রহ হয়।
বিনীত নিবেদক
অধম বান্দা সাজিদ হাসান
📄 অধ্যায় ৫ : প্রোপাগান্ডা মডেলের কার্যকারিতা যাচাই
আপনি যদি সতর্ক না হন, তাহলে পত্রিকাগুলো আপনাকে এমন মানুষদের ঘৃণা করতে শেখাবে, যারা অত্যাচারের শিকার। অপরদিকে ঐ সকল ব্যক্তিদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করবে, যারা সেই অত্যাচার চালায়।
— ম্যালকম এক্স
হারম্যান, চমস্কি মিডিয়ার কাজের ধরন ও প্রোপাগান্ডা মডেল সম্পর্কে প্রথম ধারণা পেশ করেন ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে, Manufacturing Consent নামক বইতে। অবশ্য প্রকাশের পর থেকেই তাদের সেই মডেলটি বেশ সমালোচনার মুখে পড়ে। তথাপি মিডিয়ার কর্মপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণে প্রোপাগান্ডা মডেল কার্যকর সিস্টেম হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে ক্ষমতাসীন সিস্টেম কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে, প্রোপাগান্ডা মডেল সে সম্পর্কে বেশ কার্যকরী ব্যাখ্যা প্রদান করে。
৩৩ বছর পর এসে অনেকেই দাবি করতে পারেন, প্রোপাগান্ডা মডেল এখন অচল। এ দাবি ছাড়াও পাঠকদের মনে প্রোপাগান্ডা মডেল সম্পর্কে বেশ কিছু প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। তাই, বর্তমান সময়ে তার কার্যকারিতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর জানা আবশ্যক। প্রশ্নগুলো হচ্ছে :
১. প্রোপাগান্ডা মডেল কি মিডিয়ার কর্মকাণ্ডকে সরলীকরণ করে ফেলে?
২. তিন দশক পেরিয়ে আজকের মিডিয়াতে এই মডেল ও এর ফিল্টারগুলো কি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে?
৩. ওপরের দুটি প্রশ্নের উত্তর যদি 'না' হয়, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন মিডিয়ায় এর কার্যকারিতা কি অক্ষুণ্ণ থাকে?
৪. ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে, অর্থাৎ অ্যামেরিকা ব্যতীত অন্যান্য রাষ্ট্রে মিডিয়ার বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে প্রোপাগান্ডা মডেল কি প্রয়োগ করার উপযোগী?
৫. প্রোপাগান্ডা মডেলটি কি এখন সংস্কারযোগ্য?
এ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পেলে পাঠকদের জন্য প্রোপাগান্ডা মডেল সম্পর্কে অনেকটাই স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। এখানে উল্লিখিত সর্বপ্রথম প্রশ্নটি হলো—
» ১. প্রোপাগান্ডা মডেল কি মিডিয়ার কর্মকাণ্ডকে সরলীকরণ করে ফেলে?
হারম্যান-চমস্কি প্রোপাগান্ডা মডেল থিওরি প্রস্তাবের পাশাপাশি বেশ কিছু গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশ করেন। বিশ্বব্যাপী সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও সে-সকল ঘটনা সম্পর্কে মার্কিন মিডিয়ার আচরণ বিশ্লেষণ করেন তারা। লেখকদ্বয় প্রমাণ করেন যে, শত্রুভাবাপন্ন কোনো রাষ্ট্রে কেউ নির্যাতিত হলে নির্যাতিত ব্যক্তি/গোষ্ঠী মার্কিন মিডিয়ায় সকলের সহানুভূতি লাভের যোগ্য ভিক্টিম হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরদিকে এর মিত্র বা ক্লায়েন্ট সরকারের হাতে নির্যাতিতরা বিবেচিত লাভের অযোগ্য ভিক্টিম হিসেবে (Herman & Chomsky, 1988/2002, p. 37)। মার্কিনিদের এই ধরনের নোংরা কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, তাদের নৈতিকতা খুবই সংকীর্ণ。
লেখকদ্বয় ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ও সর্বাধিক জনপ্রিয় চারটি পত্রিকায় সে-সকল ঘটনাগুলো উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে মোট সংখ্যাগুলোর পারস্পরিক তুলনা করে ও মার্কিন মিডিয়া সেসব ঘটনা কিভাবে মূল্যায়ন করে, তার পর্যালোচনা করে তারা প্রমাণ করেন, ভিক্টিমের মূল্য নির্ভর করে কারা এর জন্য দায়ী তার ওপর, ভিকটিমের ওপর নয় (1988/2002, Table 2-1)। একদিকে শত্রু ও বিরোধী রাষ্ট্রের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্রোপাগান্ডার বিস্ফোরণ ঘটায়, অন্যদিকে বন্ধু ও ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রের সরকারযন্ত্রের হত্যাকাণ্ড গুরুত্বহীনভাবে প্রকাশিত হয় এবং নিয়মিত কভারেজ পায় না。
প্রোপাগান্ডা মডেলের কার্যকারিতা যাচাইয়ে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর নির্বাচনও চমৎকার পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। দেখা যায়, মার্কিন মিডিয়া তাদের সরকার সমর্থিত রাষ্ট্রগুলোর নির্বাচনকে বৈধতা প্রদানে কুণ্ঠাবোধ করে না—যদিও সেটি নিরপেক্ষ না হয়; অন্যদিকে বিরূপভাবাপন্ন বিরোধী মতাদর্শবলম্বী সরকারের ক্ষেত্রে মিডিয়া তাদের সংবাদ পরিবেশনের ধরন, নেতিবাচক বক্তব্য, নির্বাচনের সুষ্ঠুতা যাচাইয়ে অনাগ্রহ-সহ বিভিন্ন বিষয়কে সেই নির্বাচন 'অবৈধ' প্রমাণে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয় (1988/2002, chapter 3)। এ ক্ষেত্রেও লেখকদ্বয় পর্যাপ্ত গবেষণার আলোকে সংবাদ-মাধ্যমের দ্বিচারিতা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলেন。
দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ফলাফল এই প্রোপাগান্ডা মডেল। এর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সাংবাদিকদের কাজের প্রক্রিয়া ব্যাখা করা। কেননা তাদের কাজের পেছনের কী রকম চেতনা কাজ করছে, সেটি নির্ণয় করা প্রোপাগান্ডা মডেল দ্বারা সম্ভব নয় (Hearns-Branaman, 2018)। চমস্কি বলেন, এই বিশ্লেষণটি ব্যক্তির চরিত্র দূরে রেখে কাজ করতে চায়। কেননা, তারা (সাংবাদিকগণ) শুধুই 'প্রতিস্থাপনযোগ্য যন্ত্রাংশ' (Chomsky, 2002, p. 26)। অর্থাৎ, মিডিয়ার যে কাঠামো, তার বাইরে সাংবাদিকরা যেতে অনেকাংশেই অক্ষম। যাই হোক, তার এ ধরনের মন্তব্যের ফলে অনেকেই প্রোপাগান্ডা মডেলের সমালোচনা করে। Comeforo (2010) অভিযোগ করেন যে, প্রোপাগান্ডা মডেল বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকার বিষয়টিকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে না। তাছাড়াও ল্যাং এবং ল্যাংগি (2004a) মডেলটির একই রকম সমালোচনা করেন। উক্ত সমালোচনার জবাবে হারম্যান-চমস্কি বলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি যে, সাংবাদিকদের চিন্তা আর কাজের বিপরীতে মিডিয়ার পারফর্মেন্সের ওপর আমাদের ফোকাস করাটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কোনো রিপোর্টার যদি সরকার ও বিরোধীপক্ষের আয়োজিত নির্বাচনকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সামলায়, তাহলে এই পরস্পর-বিরোধী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তার মস্তিষ্কে কী চলছে সেটা জানা জরুরি নয়। তাদের কাজই তাদের হয়ে কথা বলবে, উক্ত রিপোর্টারের ব্যাখ্যাসমূহ এবং যুক্তি প্রয়োগ এখানে ততটা প্রাসঙ্গিক নয়' (Chomsky & Herman, 2004)。
টিভি ও ম্যাগাজিন জার্নালিজমের ওপর দশ বছর গবেষণা করেন হারবার্ট গ্যান্স। তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, যে-সকল আইডিয়া চাপ সৃষ্টি করতে পারে, সাংবাদিকদেরকে সেসব থেকে দূরে রাখা হয়। যদিও তাদের নিজেদের আগ্রহ, অন্যান্য পেশাদারগণ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ গোড়া থেকেই তাদের ভিন্ন মতো পোষণে নিরুৎসাহিত করে (Gans, 1979/2004)。
কর্মক্ষেত্রের রীতিনীতির শিক্ষা দুই সময়ে হতে পারে : শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন। একইসঙ্গে এই শিক্ষা দুভাবে কাজ করতে পারে—সচেতনভাবে এবং অবচেতনভাবে। সেল্ফ সেন্সরশীপ যেমন সচেতনভাবে হয়ে থাকে, তেমনি তা অবচেতনভাবেও হতে পারে। যেখানে সাংবাদিকরা নিজেরাও এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখে না যে, তারা চাপের মুখে নতিস্বীকার করছে কি না। ফলে মিডিয়াকর্মীদের সচেতন ও অবচেতন কাজের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা গবেষকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। খোদ মিডিয়াকর্মীদের পক্ষেই এই ধরনের পার্থক্য নির্দেশ করা প্রায় অসম্ভব। তাই সাংবাদিকগণ এইরূপ বিশ্লেষণের সাথে একমত হোক বা না-হোক, তথ্য প্রমাণাদি যে নির্দেশনা দেয় সেটাই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন。
লেখকদ্বয় মিডিয়া ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণপূর্বক যে থিওরি প্রদান করেছেন, তাতে প্রান্তিকতা ও সরলীকরণের কোনো স্থান নেই। বরং প্রোপাগান্ডা মডেলের সমালোচনা করতে গিয়ে অনেক স্কলার প্রান্তিকতা ও সরলীকরণ করে ফেলেছেন। এই থিওরি প্রকাশিত হবার পর প্রাথমিক পর্যায়ে এটি সম্পর্কে একাডেমিকদের প্রতিক্রিয়া ছিল—তারা প্রোপাগান্ডা মডেলকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণবাদী, উদ্দেশ্যবাদী, ষড়যন্ত্রমূলক, ভাসা-ভাসা, ত্রুটিযুক্ত, বিপরীতমুখী হিসেবে দাবি করে (Eldridge, 1993, p. 25; Schlesinger, 1989)। পিয়ার্স রবিনসন মন্তব্য করেন, তারা প্রোপাগান্ডা মডেলকে উপেক্ষা করে চলে। অথচ, প্রোপাগান্ডা মডেল যেসব দাবির ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো অনেকাংশেই মিডিয়া কাঠামোর ব্যাপারে অন্যান্য মূলধারার স্টাডির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ (Robinson, 2018)。
একাডেমিকগণ এই মডেলকে 'অযৌক্তিক' দাবি করার পেছনে শক্ত কোনো ভিত্তি দাঁড় করাতে পারেননি। এখন পর্যন্ত মিডিয়া-সরকার সম্পর্ক বিশ্লেষণে প্রোপাগান্ডা মডেলের বিকল্প কোনো মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক স্কলারই প্রোপাগান্ডা মডেলের বিপক্ষে 'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। সম্ভবত এই শ্রেণির সমালোচকরা বিশ্বাস করেন যে, মিডিয়ার সামাজিক উদ্দেশ্য হলো জনগণকে সত্যের আলোয় আলোকিত করা। প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণের দাবি ঘোষণা করতে সহায়তা করা। যাতে জনগণ বুদ্ধিমত্তার সাথে রাজনৈতিক দায়িত্বসমূহ সম্পাদন করতে পারে। কিন্তু, গত শতাব্দীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মিডিয়ার প্রধানতম লক্ষ্য হলো—রাষ্ট্র ও সমাজের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী দলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা রক্ষা ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা (Mullen, 2009)。
Reese ও Shoemaker বলেন, 'রিপোর্টাররা (ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে) খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োগকৃত চাপের মুখে অরক্ষিত থাকে। যদি তারা প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্ন কিছু বলতে শুরু করে, তাহলে তাদের চিহ্নিত করা হয়। সম্পাদকগণ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন' (1991/2014, p. 106)। অন্যদিকে চমস্কি মন্তব্য করেন,
'যেসব ব্যক্তি (নিউ ইয়র্ক) টাইমস-এ সাংবাদিক কিংবা সম্পাদকের পদ লাভ করে, তাদের অধিকাংশ হয় খুবই অনুগত কিংবা অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির। অনুগত ব্যক্তিরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়—তারা (ওখানকার) মূল্যবোধসমূহ আত্মস্থ করে এবং তারা যা বলে তা (নিজেরাই) বিশ্বাস করে' (Chomsky, 2002, p. 114)。
আরও একটি পয়েন্ট হলো : প্রোপাগান্ডা মডেল গণমাধ্যমের সমালোচনা করলেও তার মানে এই নয় যে, সরকার ও কর্পোরেশনগুলো সম্পূর্ণ দায়মুক্ত। সংবাদমাধ্যমের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে তাদেরও দায় রয়েছে। তথাকথিত 'স্বাধীন সাংবাদিকতা' আজ বিশেষ গোত্রের বিশেষ সুবিধাগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করে (Chomsky, 1989/2013)। আর সে কাজটি তারা করে নিজেদেরকে হর্তাকর্তার আসনে বসিয়ে। এক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা মডেল মিডিয়ার চরিত্র অনুসন্ধানে কোনো ত্রুটি করেনি。
» ২. তিন দশক পেরিয়ে আজকের মিডিয়াতে এই মডেল ও এর ফিল্টারগুলো কি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে?
৩৩ টি বছর পেরিয়ে এসে প্রোপাগান্ডা মডেল কি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়নি? এই মডেলের সর্বশেষ ফিল্টারটি যেই মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেই কমিউনিজম বিরোধিতাও সোভিয়েত ভেঙে যাবার ফলে যথেষ্ট দুর্বল হয়ে গেছে। আর ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে প্রোপাগান্ডা মডেল প্রকাশিত হবার মাত্র ৩ বছরের মধ্যে। এত বছর পর কি আর ফিল্টারগুলো কার্যকর আছে?
প্রোপাগান্ডা মডেল প্রকাশিত হবার বহু বছর পর এসেও আমরা প্রত্যক্ষ করছি, নব্য লিবারেলিজমের তীব্র সম্প্রসারণ, জাতীয়তাবাদের প্রসার, আর্থসামাজিক বৈষম্যের ক্রমবিকাশ, বর্ণবাদ আর অভিবাসী বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। গণতন্ত্রের মধ্যে বিদ্যমান দুর্বলতার কারণে আজ তীব্র বৈষম্য, নির্যাতন, নিষ্পেষণ যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, একইসাথে মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ দিন দিন সংকুচিত হয়ে চলেছে। ফলাফল, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ এবং এলিটদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। রাষ্ট্রের সামরিকায়ন, পশ্চিমাদের ধারাবাহিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, গোপনে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অন্যান্য সমস্যাসমূহ নিয়ে এক অভূতপূর্ব যুগ আমরা পার করছি। যেখানে পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসনকে বৈধ রূপ প্রদান করতে ব্যবহৃত হচ্ছে 'মানবতাবাদ' (Zollmann, 2018, p. 224)। এলিট শ্রেণির অকুণ্ঠ সমর্থক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে মিডিয়াগুলো。
অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিডিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে 'সঠিক' নিরপেক্ষ তথ্য প্রচারে ব্যর্থ হয়। বিজ্ঞাপন ধীরে ধীরে প্রিন্ট থেকে টিভি; অতঃপর টিভি থেকে ইন্টারনেটের প্রতি ধাবিত হয়েছে। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি মাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তার ফলে মিডিয়ার প্রভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আরও গভীরে পৌঁছে গেছে। কয়েক দশক আগে মানুষ সংবাদ সংগ্রহ করতে প্রধানত খবরের কাগজ আর রেডিও'র ওপরই নির্ভর করত। আজ তরুণ সমাজের প্রায় প্রতিটি সদস্যই তথ্য সংগ্রহের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। তাহলে, প্রোপাগান্ডা মডেল কি আদৌ বর্তমান সময়ের মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন স্কলার Robert McChesney বলেন,
'...এখন আর কোনো প্রাইভেসি (নেই) এবং (কর্পোরেশনগুলো আমাদের) ইনফরমেশন ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞদের কাছে বিক্রয় করতে... তারা সরকার, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং সামরিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। তারা আক্ষরিক অর্থেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে-সকল পন্থায় তথ্য সংগ্রহ করে, জনগণকে নজরদারিতে রাখে, তা যে কোনো গণতান্ত্রিক তত্ত্ব অনুসারেই একটি স্বাধীন সমাজের জন্য ঐতিকর।'
শিক্ষিত এবং সচেতন জনসাধারণ এলিট শ্রেণির স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকিস্বরূপ। তবুও সুস্পষ্ট বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের প্রতিহত করা গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই, মিডিয়া একাধিক পক্ষের উত্থান সমর্থনের কল্পিত ভান করে। এমনকি কখনো কখনো প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার সমালোচনাও করে থাকে। কিন্তু মিডিয়ার এই কৌশল চলমান ব্যর্থ সিস্টেমের পরিবর্তে বিকল্প সমাধানের প্রশ্নকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র সীমার ভেতরে আবদ্ধ করে ফেলে। সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামোকে সর্বদা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে বিতর্ক, তা কেবল এলিটদের বিভিন্ন শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রচার করে (Herman E. S., 2000)。
চিন্তার স্বাধীনতা ও এলিটদের স্বার্থের প্রতি সমালোচনামূলক মন্তব্য কদাচিৎ দেখা যায়, যখন মিডিয়া 'অসঙ্গতি' ঘটিয়ে ফেলে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের দাবিতে পাঠকদের চাপের সম্মুখীন হয় (Freedman, 2014, p. 28)। প্রকৃতপক্ষে, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হিটলারের মতো ফ্যাসিবাদী স্টাইল নয়। বরং গণতান্ত্রিক সিস্টেমেও মিডিয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অধীনে থাকে (Pedro-Carañana et al., 2018)。
মালিকানা : ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট-এর আপডেটেড (2002, p. xiii) এডিশনে লেখকদ্বয় দাবি করেন, অ্যামেরিকান নাগরিকগণ যে সংবাদমাধ্যমের আওতাধীন, তার প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র দুই ডজন সংস্থা। সাম্প্রতিক অন্য একটি অনুসন্ধানেও দেখা যায়, পরিস্থিতি যথেষ্ট ভয়াবহ। শুধুমাত্র টিভি কিংবা প্রিন্ট মিডিয়া নয়, সংবাদমাধ্যমের প্রায় সকল ফরম্যাটই গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন (anonymous, n.d.)। এছাড়াও ২০২১-এর মে মাসে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের 'দ্যা ফিউচার অব মিডিয়া প্রজেক্ট' এ দেখা যায়, অ্যামেরিকার ৬৭২ টি পত্রিকার মধ্যে ৩৮২টির স্বত্বাধিকারী মাত্র সাতটি কোম্পানি (Anand et al., 2021)। সংবাদ প্রতিষ্ঠান, টেলিভিশন স্টেশন প্রতিষ্ঠায় বেশ বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। ফলে খুব কম ব্যক্তি বা সংগঠনই এটি করার সামর্থ্য রাখে。
অর্থাৎ, টিভি প্রোগ্রামিং-এর মাধ্যমে সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার স্বাধীনতা এমন কিছু ব্যক্তি/সংগঠনের হাতে থাকে, যারা বিভিন্ন কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী। মার্কেটে যাদের আধিপত্য রয়েছে। একই সঙ্গে রেডিও, ম্যাগাজিন, ফিল্ম স্টুডিও, ক্যাবল চ্যানেল-সহ মিডিয়ার অন্যান্য ফরম্যাটগুলোও তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায়শই তারা তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাদের আওতাধীন মিডিয়ার প্রতিটি ফরম্যাটকে একত্রে কাজে লাগায়। বস্তুত এই গুটিকয়েক 'সৌভাগ্যবান' সত্তা ব্যতীত বাদবাকি পৃথিবীর মূলধারার সংবাদ-মাধ্যমে প্রবেশের কোনো অধিকার নেই। খুব কমই এর ব্যতিক্রম ঘটে থাকে (Bergman, 2018, p. 160)。
বিজ্ঞাপন : তিন দশক পূর্বেকার সময়ের তুলনায় বর্তমানে বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব ততটা হ্রাস পায়নি। কারণ, বিজ্ঞাপনের অর্থ অর্জনে গতানুগতিক প্রিন্ট মিডিয়াগুলোর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে এবং তাদেরকে বিজ্ঞাপনদাতাদের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে মিডিয়াগুলো ভূমিকা পালন করে। আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞাপনদাতারা (প্রধানত শিল্পপতিরা) পুঁজিবাদ-বিরোধী কোনো প্রোগ্রাম সমর্থন করবে না (Herman & Chomsky, 1988/2002)। কোনো টিভি চ্যানেল সেরকমটি করলে কিছুদিন পরই হয়তো বিজ্ঞাপনের অর্থের অভাবে বা অন্য কোনো চাপে প্রচারণা বন্ধ করে দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, টেলিভিশন হলো একটি কর্পোরেট হাতিয়ার, যার অন্যতম লক্ষ্য জনতাকে বিজ্ঞাপনদাতার কাছে বিক্রি করা。
টিভি প্রোগ্রামগুলো ভিউ বাড়ানোর এক অদৃশ্য যুদ্ধে লিপ্ত। হাজারও প্রোগ্রামের ভিড়ে দর্শক যেন তাদের প্রোগ্রামকে বেছে নেয়, সেজন্য তাদেরকে বিশেষ কিছু দিতে হবে (Robinson, 2015)। দেখা যায়, দর্শকের চোখ যেন টিভি পর্দায় চুম্বকের মতো আটকে থাকে, সে উদ্দেশ্যে সিনারিও খুবই দ্রুত বদলায়। নজর কাড়তে অনেক সময়ই সজ্ঞানে টিভি প্রোগ্রামগুলোতে বিতর্কিত ও উত্তেজনাকর দৃশ্যের প্রদর্শনী করা হয়। পরিচালকরা জানে যে, তাদের প্রোগ্রাম যখন বিতর্কের জন্ম দেয়, তখন তা অধিক দর্শক আকর্ষণ করে। ফলাফল, বিজ্ঞাপনদাতাদের ভিড়, আর টিভি নেটওয়ার্কের প্রফিট বৃদ্ধি。
উৎস : রাষ্ট্র ও মিডিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের অভিযোজনের ফলে বর্তমান মিডিয়া কাঠামো তারবার্তা, পাবলিক রিলেশন ইন্ডাস্ট্রি, সরকার, বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও প্রেস রিলিজের ওপর পূর্বাপেক্ষা অধিক তীব্রতরভাবে নির্ভরশীল。
ইরাক যুদ্ধের (২০০৩) প্রারম্ভে যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সংবাদগুলো অফিসিয়াল সোর্সের ওপর মিডিয়ার নির্ভরতা ও রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার ক্ষমতার বিষয়টিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে। যুদ্ধের পূর্বে মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকার ইরাকি বাহিনীর কাছে গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা অভিযোগ তুলে। সেই অপবাদ দৃঢ়-প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে তারা যে প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছিল, পরবর্তী সময়ে সেটি ধীরে ধীরে প্রকাশ হয়ে পড়ে। বলা যায়, ইরাক যুদ্ধের মিডিয়া ক্যাম্পেইন বাস্তবতার যথেচ্ছ বিকৃতি সাধন করে এবং জনমত পরিবর্তনে গভর্নমেন্ট সোর্সের সহায়তায় আক্রমণাত্মক ও নিরবচ্ছিন্ন মিথ্যা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে।
যদিও-বা অ্যামেরিকা ও ব্রিটেন-এর উক্ত অপবাদের বিপরীতে প্রচুর নির্ভরযোগ্য বিকল্প সোর্স থেকে সেই দাবির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ইন্টারনেটে এই ধরনের চ্যালেঞ্জ যথেষ্ট সুলভ থাকা স্বত্ত্বেও উভয় রাষ্ট্রের মিডিয়াই রাষ্ট্রীয় দাবির ওপর কোনোরকম যাচাই ছাড়াই সেগুলোকে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে সংবাদ প্রচার করে (Robinson, ২০১৫)。
প্রকৃতপক্ষে, সংবাদ-মাধ্যমের অফিসিয়াল সোর্সের প্রতি যে ঝোঁক, তাতে সহসা পরিবর্তনের তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। মিডিয়া রিসার্চসমূহ আমাদের তেমন কোনো ইঙ্গিত-ও প্রদান করে না। অপরদিকে, সরকারযন্ত্রও তথ্য ও সংবাদ পরিমণ্ডলকে পছন্দনীয় রূপ প্রদানে প্রতিনিয়তই পূর্বাপেক্ষা অধিক বাস্তবধর্মী ও পেশাদার আচরণ প্রদর্শন করছে। সাংবাদিকরা অফিসিয়াল চাপের ওপর তীব্রভাবে নির্ভরশীল নয়—এ মর্মে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ যতদিন পরিবেশিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত প্রোপাগান্ডা মডেলের সোর্স ফিল্টার প্রবলভাবেই কার্যকর আছে। এতে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হবার অবকাশ নেই (Robinson, 2015)。
ফ্ল্যাক : হারম্যান-চমস্কি তাদের চতুর্থ ফিল্টারটির ক্ষেত্রে তেমন স্পষ্ট কোনো বর্ণনা দেননি। জার্মান এই পরিভাষাটির ব্যুৎপত্তি হয়েছিল মূলত সেনাবাহিনীর কথ্যভাষা থেকে। এখনকার সময়ে এসে ফ্ল্যাক শুধু প্রিন্ট মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সোশ্যাল মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ পছন্দ করুক আর না-করুক; নব্য ফ্যাসিজম সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যাধির মতো আক্রান্ত করে ফেলেছে। অনলাইন-ফ্যাসিজমের প্রচারকরা ঘৃণা, শ্বেতাঙ্গবাদ, অভিবাসী ও রিফিউজিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও অন্যান্য উগ্রবাদী ধারণা ছড়াচ্ছে। অফলাইন থেকে তাদের কার্যক্রম অনলাইনে বিস্তৃত হয়েছে, রিফিউজি এবং অভিবাসীদের—বিশেষ করে নারীদের—ওপর সহিংস আক্রমণের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে (Yam, 2021)। অন্যদিকে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপারে হারম্যান-চমস্কি মন্তব্য করেন, মিডিয়াগুলো একত্রিত হয়ে এমন এক 'আক্রমণ করার অস্ত্র' তৈরি করে—যেখানে একই বক্তব্য অন্যরা পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। আমরা দেখতে পাই, বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতি উগ্র-জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, অভিবাসী-বিদ্বেষ আর নব্য ফ্যাসিজমের রাজনীতি। তাই বলা যায়, নব্বইয়ের দশকের তুলনায় বর্তমানে ফ্ল্যাক আরও শক্ত মিডিয়া ফিল্টারিং প্রসেসে পরিণত হয়েছে。
মতাদর্শ : মতাদর্শ এমন একটি জটিল পরিভাষা, যার অনেক রকম অর্থই হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চিন্তাধারা সঠিক বা ভ্রান্ত চেতনার ওপর ভিত্তি করে গঠিত মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি—সবই মতাদর্শের অন্তর্ভুক্ত। কোনো জটিল, সমালোচকধর্মী ও গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শ সাধারণত আপনাকে ভালো ও মন্দের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ নির্ণয়ের আলোচনা অনুমোদন করে এবং সিদ্ধান্ত প্রদান করে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। হারম্যান-চমস্কি মতাদর্শের প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা কোনো সংজ্ঞা নির্ধারিত না করলেও কমিউনিজম বিরোধ, নব্য-উদারনীতি, পাশ্চাত্য আদর্শসমূহ, ডানপন্থী এবং জাতীয় নিরাপত্তা—এ মতবাদ গুলোর কথা উল্লেখ করেন (Herman & Chomsky, 1988/2002)。
ভিয়েতনাম যুদ্ধ খেলাকালীন, নীতিমালা প্রণয়নকারী এবং সাংবাদিকগণ একটি কমন গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে স্বীয় বিশ্বাসে অটল ছিলেন; তাদের সেই বিশ্বাসটি ছিল—কমিউনিজমের হুমকি অ্যামেরিকার কাছে এই দাবি রাখে যে, এর প্রসারে বাধা প্রদান করতে হবে; সেই সঙ্গে তারা এটাও নিশ্চিত করে যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধকে শুধুমাত্র ভিয়েতনামীদের কমিউনিস্ট শাসনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার এক ন্যায়নিষ্ঠ সংগ্রাম হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। অথচ ঔপনিবেশিক ফ্রান্স ও পরবর্তীকালে অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে অসংখ্য ভিয়েতনামবাসীদের চলমান যুদ্ধ কমিউনিজম বিরোধিতার ফ্রেমের এতটাই বাইরে পড়ে যে, অধিকাংশ সাংবাদিক সম্ভবত এ রকম ব্যাখ্যা করার চিন্তাও করেননি। হ্যালিনের (১৯৮৬) এর মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির একটি উদাহরণ এবং একটি আগ্রাসী আক্রমণ, এই ধরনের ধারণা মূলধারার মার্কিন মিডিয়াতে কখনো আলোচিতই হয়নি。
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে তথাকথিত স্নায়ু যুদ্ধের সমাপ্তি হলেও মতাদর্শ ফিল্টারটি মার্কিন মিডিয়ায় তার কার্যকারিতা হারায়নি। হারম্যান-চমস্কি বলেন, কমিউনিজম বিরোধিতা মূলত মুক্ত-বাজার অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বাগাড়ম্বর। অন্য রাষ্ট্রে অ্যামেরিকার অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশ ও প্রাইভেট কর্পোরেশনগুলোর জন্য বিরাট অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি সংক্রান্ত এক বৃহৎ এজেন্ডার অংশ। সে এজেন্ডা 'এলিটদের স্বার্থ এবং যেকোনো রাষ্ট্রে—হোক সে ডানপন্থী বা বামপন্থী—অ্যামেরিকার অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে আসা যেকোনো চ্যালেঞ্জের বিরোধিতা করে।
কমিউনিজম বিরোধিতার পতনের পর অ্যামেরিকা তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ'। সূচনা করে বিশ্বকে তাদের নব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সন্ধান দেয়। ডমকি (২০০৪) বুশ প্রশাসন ও মার্কিন মিডিয়া বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অ্যামেরিকা বিশ্বকে গুড এবং এভিল—এই দুই ভাগে ভাগ করার এক নতুন বাইনারি আলোচনার উত্থান ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে বুশ প্রশাসন মতাদর্শ-ভিত্তিক আলোচনার আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা অ্যামেরিকাকে ইউনিক গুণাবলিতে অলঙ্কৃত রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রায়িত করে (Rojecki, 2008)。
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আলোচনা-সমালোচনায় মার্কিন মিডিয়া একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের অনুসরণ করে। তারা যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা, যুদ্ধে হতাহত মার্কিনীদের জীবন এই যুদ্ধের মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে গেল কি না—এই সকল নির্দিষ্ট প্রশ্নে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমালোচনা করে। তাদের যুদ্ধ বিষয়ক বিশ্লেষণের কোথাও এই যুদ্ধের নৈতিকতা ও বৈধতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে দেখা যায় না। অর্থাৎ, মার্কিন মিডিয়া তাদের নিজস্ব মতাদর্শগত সীমানার ভেতরেই অবস্থান করে। আর সেই মতাদর্শ অ্যামেরিকার নৈতিকভাবে উচ্চতর অবস্থান ও ফরেইন পলিসির বৈধতার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ। আর তাই, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রশ্নে মার্কিন মিডিয়া তাদের প্রশাসনের সমর্থকের ভূমিকাই পালন করে。
২৩ নভেম্বর ২০০৮, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর Review of the Week-এ নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে গুটিকয়েক খণ্ডিত পরামর্শের সন্নিবেশ ঘটানো হয়। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে অ্যামেরিকার সেনাবাহিনী বৈধ, এমনকি মহৎ—এই ধারণার ওপর ঐকমত্য থাকা অবস্থায় কয়েকজন বিশেষজ্ঞ উভয় যুদ্ধের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। তাদের সবাই যুদ্ধের ট্যাকটিকস, সামরিক আক্রমণের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত হতে ব্যর্থ হন। তাদের মতে, যুদ্ধ দুটি ব্যর্থ হলে তা শুধুই 'কৌশলগত সাংঘাতিক ভুল' হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া অন্য কোনো অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, সে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ব্যাপারে তারা সকলেই সন্তুষ্ট (Chalabi et al., 2008)。
আজ যারা সতর্ক পাঠক—যারা সর্বদা (গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে) সঠিক তথ্য সন্ধান করেন, তারা হয়তো-বা সংবাদ সন্ধানে আংশিক সফলতা পেতেও পারেন। কিন্তু, সঠিক তথ্যটি তার উপযুক্ত মনোযোগ ও প্রাসঙ্গিক গুরুত্ব লাভ করেছে কিনা, এটি অধিকাংশ পাঠকের বোধগম্য পন্থায় পরিবেশিত হয়েছে কি না, কিংবা এই তথ্যটি কি সফলভাবে বিকৃত ও দমন করা হয়েছে কি না—সে সম্পর্কে পাঠক অনেক সময়ই জানতে ব্যর্থ হয়। যদিও ইন্টারনেটের বদৌলতে ধীরে ধীরে দৃশ্যের কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে। প্রকৃতপক্ষে, যতদিন এই অসম, পক্ষপাতদুষ্ট অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমাজ-ব্যবস্থা টিকে থাকবে, যতদিন কর্তৃত্বশালী এলিটদের স্বীয় কর্মকাণ্ডকে সঠিক প্রমাণ করতে হবে, ততদিন আপম অস্তিত্ব রক্ষার্থে তারা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাবে। মিডিয়া কাঠামোও হয়তো ততদিন পর্যন্ত তাদের অনুগত চর হিসেবে কাজ করবে। ফলস্বরূপ, প্রোপাগান্ডা মডেল ও তার ফিল্টারগুলোও হয়তো-বা ততদিনই প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হবে。
» ৩. ওপরের দুটি প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন মিডিয়ায় এর কার্যকারিতা কি অক্ষুণ্ণ থাকে?
লেখকদ্বয় মডেল প্রস্তাব করেন মূলত প্রিন্ট মিডিয়ার কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে। পরবর্তী যুগে অডিও-ভিজুয়াল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে এই শতাব্দীতে টিভি ও ইন্টারনেট ভিত্তিক সংবাদ বৃহৎ পরিসরে পরিব্যপ্তি লাভ করেছে। ক্যাবল নিউজ, ইন্টারনেটের উত্থানের পর লেখকদ্বয় দাবি করেন, তাদের প্রোপাগান্ডা মডেল আধুনিক নিউজ মিডিয়ার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের চাইতেও অধিক প্রযোজ্য। অবশ্য, তারা কখনোই এমন দাবি করেন না যে, প্রতিটি সংবাদ ও মতামত প্রচারের ক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা মডেল কার্যকরী। তবে, যেসব ক্ষেত্রে এলিট শ্রেণির স্বার্থ বেশ শক্তিশালী ও স্পষ্ট, এবং এলিটদের ঐকমত্য রয়েছে, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের স্বার্থ বিচ্ছিন্ন ও অস্পষ্ট—সেসব ক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা মডেল যথেষ্ট কার্যকরী হয় (Mullen, 2009)。
ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা পেতে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতি লক্ষ করা যাক। পিউ রিসার্চ সেন্টার-এর এক জরিপে দেখা যায়, উক্ত নির্বাচনে ১৮-২৯ বছর বয়স্ক ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছে। ত্রিশোর্দ্ধদের ক্ষেত্রে ৭৮% ব্যক্তি নির্বাচন সম্পর্কে জানতে টিভি নিউজ অনুসরণ করে, ৬৫% ডিজিটাল সংবাদ উৎস (৪৮% নিউজ ওয়েবসাইট, ৪৪% সোশ্যাল নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করে, ৪৪% রেডিও ব্যবহার করে, ৩৬% প্রিন্ট মিডিয়া ব্যবহার করে। অর্থাৎ, ডিজিটাল সংবাদ উৎস ইতিমধ্যেই তরুণদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদ উৎস। আর বয়স্করাও প্রিন্ট মিডিয়া ছেড়ে ক্রমশ টিভি নিউজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন (Gottfried et al., 2016)。
হারম্যান-চমস্কির মতে, বেশ কিছু ফ্যাক্টর মূলধারার মিডিয়ার আধিপত্যকে অদ্যাবধি সুরক্ষিত রেখেছে (Mullen, 2009)— ১. মূলধারার মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করে সেখানে শীর্ষ সংবাদ সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেছে। ২. পূর্ব থেকেই বিদ্যমান পাঠক এবং পুঁজি তাদেরকে সম্ভাব্য অন্যান্য বিকল্প প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর প্রচুর সুবিধা প্রদান করেছে। ৩. গুগল, ফেসবুকের মতো ইন্টারনেট ভিত্তিক বিকল্প সংবাদের উৎসসমূহের কার্যক্রম বিজ্ঞাপনের অর্থের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বিকল্প নিরপেক্ষ সংবাদ-উৎস হিসেবে তাদের বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ থাকে না। ৪. সোশ্যাল মিডিয়াতে যারা সঠিক সংবাদ পরিবেশন করে, তারা সচরাচর প্রফেশনালি সংবাদ-মাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত নয়। বরং প্রধানত সমালোচক ও বিশ্লেষক।
ইন্টারনেটের সূচনালগ্নে এটি তথ্য ও আইডিয়ার অবাধ প্রবাহের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বর্তমানে মুনাফালোভী কর্পোরেশনগুলো ইন্টারনেটকেও পণ্যে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক গণ-নজরদারি, যা স্পষ্টত গোপনীয়তার লঙ্ঘন এবং সরকার-যন্ত্রের করা ক্ষমতার অবৈধ প্রয়োগ। তাই, ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা একাডেমিকদের গণতান্ত্রিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হলো না। গুগল, ফেসবুকের মতো টপ লেভেলের প্লাটফর্মগুলো মৌলিকভাবে সংবাদভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু ইতিমধ্যেই এই প্রতিষ্ঠানগুলো সিআইএ, এফবিআই, এনএসএ, স্টেট ডিপার্টমেন্টের দাবি সমূহের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছে। বর্তমানে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ প্রচারের যে অগ্রগতি, তাতে নিকট ভবিষ্যতে 'হয়তো-বা' সামগ্রিকভাবে নিউজ মিডিয়ার ওপর প্রোপাগান্ডা মডেল প্রয়োগে প্রান্তিকতা ও জটিলতা সৃষ্টির সম্ভাবনা হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত গতানুগতিক মিডিয়া ইন্টারনেটে তাদের আধিপত্য ধরে রেখেছে。
অন্যদিকে টেলিভিশন প্রোগ্রাম ও হলিউড ফিল্মে সিআইএ-র প্রভাব খাটানোর সফল ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং প্রতিষ্ঠিত সত্য। এ বিষয়ে তর্ক করার কোনো অবকাশই নেই। ৯/১১-এর হামলার পর হলিউড এবং অধিকাংশ টিভি নেটওয়ার্কের পরিচালকগণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের একজন শীর্ষ উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল বিনোদন জগত কিভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধতে সহযোগিতা করবে এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্ট্রাকচার প্রতিষ্ঠার সূচনা কিভাবে করবে সে সম্পর্কে আলোচনা করা (Lyman, 2001)。
রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান লক্ষ লক্ষ হতদরিদ্র জনগণের ব্যাপারে টিভি চ্যানেলগুলোর সচেতন কোনো উদ্বিগ্নতা নেই। মুষ্টিমেয় অতি ক্ষুদ্র কিছু ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে সিংহভাগ অর্থ পুঞ্জিভূত; ধনিক শ্রেণি আরও ধনী হচ্ছে, গরিব আরও গরিব হচ্ছে—এ ব্যাপারে তারা চিন্তিত নয়। তাদের জোরালো কোনো বক্তব্যও নেই। অথচ, কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে তাদের মায়াকান্না দেখে জনগণ যৌক্তিকভাবেই উল্টো তাদের চরিত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কর্পোরেট টেলিভিশনের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা আদায়, আর এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম একটি উপায় জনগণকে ভোগবাদিতায় অভ্যস্ত করা। টিভি প্রোগ্রাম ও বিজ্ঞাপনসমূহ নিয়মিতই ভোগবাদিতাকে দেশপ্রেমের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত করে দেয়। অথচ, এ বিষয়ে প্রায় সকল গবেষণালব্ধ তথ্য আমাদের জানায় যে, ভোগবাদিতা মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি ছাড়া কোনো লাভের কারণ হয় না (Kasser, 2002)。
» ৪. অ্যামেরিকা ব্যতীত অন্যান্য রাষ্ট্রে মিডিয়ার বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে প্রোপাগান্ডা মডেল কি প্রয়োগ করার উপযোগী?
প্রোপাগান্ডা মডেল যেহেতু অ্যামেরিকান মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির পারফর্মেন্সের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, এই মডেল কি অন্যান্য রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন মিডিয়া সিস্টেম ও রাজনৈতিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কি না—সে বিষয়ে কর্নার (২০০৩) সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে, প্রোপাগান্ডা মডেলের লেখকদ্বয় এটির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে। ক্ল্যান-এর মতে (২০০৩), প্রোপাগান্ডা মডেল সংবাদ-মাধ্যমের সকল কার্যক্রম ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে না। প্রোপাগান্ডা মডেলের মৌলিক দাবিগুলোর সঙ্গে একমত হওয়া সত্ত্বেও বয়েড ব্যারেট (২০০৪) অভিযোগ করেন যে, প্রোপাগান্ডা মডেল ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রতিটি স্বতন্ত্র ফিল্টারের পরস্পর তুলনামূলক প্রভাব নির্ধারণ করার কোনো পদ্ধতি শনাক্ত করেননি। একই সঙ্গে তিনি ফিল্টারগুলোর চরিত্রায়নের স্পষ্টতার অভাব সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করেন।
এছাড়াও ল্যাং ও ল্যাং প্রোপাগান্ডা মডেল সম্পর্কে গুরুতর একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন। তাদের মতে, সোর্স এবং সাংবাদিকদের স্বার্থ যখন ভিন্নমুখী হয়, তখন সে সম্পর্ক প্রায়শই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়। প্রোপাগান্ডা মডেলের কার্যকারিতার প্রশ্নে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এটির ফিল্টারগুলোর প্রভাবের পারস্পরিক তুলনামূলক পার্থক্য। উদাহরণস্বরূপ, ইরাক যুদ্ধের মতো প্রচণ্ড সহিংস সংঘর্ষে যুদ্ধের ময়দানের সংবাদের ক্ষেত্রে সোর্স ফিল্টারটি অন্যান্য ফিল্টার থেকে অধিক কার্যকর হবার সম্ভাবনা থাকে। অপর দিকে, ফিলিস্তিন ইসরায়েলের নির্যাতনের ব্যাপারে অ্যামেরিকার মিডিয়ার প্রচারের ক্ষেত্রে 'মতাদর্শ' ভিত্তিক ফিল্টার প্রয়োগ করার সম্ভাবনা বেশি (Robinson, ২০১৫)। এ বিষয়ে হারম্যান মত প্রকাশ করেন, যেসব রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও পরিস্থিতি অ্যামেরিকার মতোই প্রোপাগান্ডা মডেলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রে তা কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রোপাগান্ডা মডেল এমন কোনো জাতি, সমাজ বা সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য নয়, যেখানে বিকল্প সংগঠন ও মূল্যবোধ বিদ্যমান (Pedro-Carañana et al., 2018)। এছাড়াও এমন কোনো সমাজেও প্রোপাগান্ডা মডেল প্রযোজ্য নয়, যেখানে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে জনমত কোনো গুরুত্ব রাখে না。
» ৫. প্রোপাগান্ডা মডেলটি কি এখন সংস্কারযোগ্য?
প্রোপাগান্ডা মডেল যদি অদ্যাবধি কার্যকরী সিস্টেম হিসেবে প্রয়োগযোগ্য থাকে, তাহলে সেটি কি আপডেট বা হালনাগাদকরণ, সম্প্রসারণ, সংকোচন ও সংস্কারযোগ্য? প্রোপাগান্ডা মডেলে মিডিয়ার সঙ্গে ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটি সম্পৃক্ত করা হয়েছে; তার মানে এই নয় যে, মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি ব্যক্তিই সুচতুর প্রোপাগান্ডিস্ট, যদিও কিছু সত্ত্বাধিকারী ও প্রোডিউসাররা জানে তারা কী করছে। এর মানে এটিও নয় যে, যারা সংবাদমাধ্যমের গ্রাহক তারা সবাই মূর্খ বা ষ্টুপিড (Bergman, 2018, p. 168)。
প্রোপাগান্ডা মডেল ফিল্টারসমূহ মূলত ঐ সকল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবসমূহ চিহ্নিত করে, যেগুলো সংবাদ-মাধ্যমের সত্য ও সঠিক সংবাদ প্রচারের দায়িত্বকে সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু, যেসব ফ্যাক্টর এলিট শ্রেণির স্বার্থের বিপরীতে সক্রিয় থাকে, এবং যে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে জনসম্মতি সৃষ্টির চক্র অকার্যকর হয়ে পড়ে—উভয় ক্ষেত্রেই প্রোপাগান্ডা মডেল স্পষ্ট কোনো ধারণা দেয় না। উদাহরণস্বরূপ, এলিটদের অন্তঃদ্বন্দ্ব, কিংবা কোনো বিশেষ ঘটনাকে পুঁজি করে পর্যায়ক্রমিক সিরিজ সংবাদ (event driven news) কখনো কখনো মিডিয়ার কর্মকাণ্ডকে তাদের পরিকল্পিত সীমার বাইরে নিয়ে যায়, যদিও সেটি হয় খুবই স্বল্প সময়ের জন্য। প্রোপাগান্ডা মডেলের লেখকদ্বয় তাদের মডেলকে সংবাদ-মাধ্যমের কর্মপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণের একটি উপায় হিসেবেই দাবি করেন। তাদের মতে, সত্য প্রতিষ্ঠার খোঁজে তারা কোনো প্রকার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেননি। তাই অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা মডেল অপেক্ষা ভালো ফলাফল সরবরাহ করতে পারে (Mullen, 2009)。
হারম্যান-চমস্কি তাদের মানুফেকচারিং কনসেন্ট-এ উল্লিখিত প্রোপাগান্ডা মডেল যাচাই করতে যে-সকল ঘটনা বাছাই করেন, সেগুলো প্রধানত ফরেইন পলিসি ও বিশ্ব রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ঘটনা। একই সঙ্গে, অভিজাত শ্রেণি পরিচালিত যে-সকল ঘটনা সম্পর্কে মিডিয়া কভারেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই সহিংস সংঘর্ষ। মিডিয়া যে এলিটদের স্বার্থগুলোকে আরও শক্তিশালী করে—এ ধরনের প্রস্তাবনা প্রদানের ক্ষেত্রে যুদ্ধ তুলনামূলক সহজ ঘটনা। তাহলে প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা মডেল কতটা কার্যকর। সেক্ষেত্রে, দেশীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও মানবিক সংকট-সহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রোপাগান্ডা মডেলের কার্যকারিতা যাচাইয়ে লেখকদ্বয় স্কলারদের উদাত্ত আহ্বান জানান (Robinson, 2015)। তবে, আপাতদৃষ্টিতে বলা যায়, যেখানে মতাদর্শগত বাধা অপেক্ষাকৃত কম, সে-সকল ক্ষেত্রে কখনো কখনো পরিস্থিতিভেদে মিডিয়া নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করে।
ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে প্রোপাগান্ডা মডেলের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করাটা বেশ জটিল বিষয়। মার্কিন মিডিয়া মূলত সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক একটি সেক্টর। অন্যান্য ওয়েস্টার্ন মিডিয়া সিস্টেমে উচ্চ পর্যায়ের অলাভজনক পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিস ও সাংবাদিকতা প্রচলিত রয়েছে। অর্থাৎ, প্রোপাগান্ডা মডেল মার্কিন মিডিয়ার ক্ষেত্রে বেশ গ্রহণযোগ্য হলেও, অন্যান্য রাষ্ট্র ও মিডিয়া স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে এর প্রযোজ্যতায় পার্থক্য হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আমরা বলতে পারি, প্রোপাগান্ডা মডেল লিবারেল মিডিয়া সিস্টেমের ব্যাপারে সামগ্রিক একটি ধারণা পেশ করে (Robinson, 2018)。
টিকাঃ
[১] Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media
[২] Generalize ও Simplify
[১] Lang & Lang
[১] যদিও তা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। অনেক সময়ই সাংবাদিকরা মিথ্যা জেনেও অনেক সংবাদ সত্য হিসেবে প্রচার করে থাকে।
[১] Xenophobia
[২] Built-in
[১] যদিও শাসক-শ্রেণি এই নীতিকে থোড়াই আমলে নেয়।
[২] Broadcasting TV, Broadcasting Radio, Pay TV channel, Newspaper and Print, Telecom and Cable, Tech
[১] ১৮৮৭-১৯৫৪ পর্যন্ত ভিয়েতনাম ছিল ফ্রেঞ্চ ইন্দোচীনের অংশ
[২] Cold War
[৩] War on Terror
[৪] David Domke
[১] Critical analyst
[২] Mass Surveillance
[৩] see Jenkins, 2012, for more details
[১] যেমনঃ 'দেশীয় (কোম্পানির) পণ্য কিনুন, দেশের অর্থ দেশেই রাখুন।' অথচ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কিনলে ক্রেতার আত্মিক, আর্থিক কোনো লাভ হয় না; তার কষ্টার্জিত অর্থ চলে যায় কর্পোরেট ইন্সটিটিউটের সত্ত্বাধিকারীর ব্যাংক একাউন্টে।
[২] Corner
📄 ইটটার জবাব পাটকেলেও হয়
মিডিয়াতে প্রায়ই দেখতে পাবেন, তাদের নির্ধারিত কিছু মানদণ্ডে মুসলিমরা কিভাবে ‘ফেইল’ করে, এর সচিত্র প্রতিবেদন তারা প্রচার করে বেড়ায়। কখনো ইসলাম বনাম বাঙালিয়ানা, কখনো-বা দেশপ্রেম—এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে কেন যেন তারা মুসলিমদের অবস্থানকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তাদেরকে বিব্রত করে মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা বেশ সুখ অনুভব করেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই।
ধরুন, কোনো এক ‘অসাম্প্রদায়িক’ মিডিয়ার অর্বাচীন এক সাংবাদিক হঠাৎ করে এক কওমি মাদ্রাসায় গিয়ে উদয় হলো। সেখানে ক্যামেরা হাতে মাদ্রাসার শিক্ষককে প্রশ্ন করল,
'আপনি এই মাদ্রাসার শিক্ষক?'
সম্মানিত শাইখ বিব্রত হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ। আমি এখানে ছাত্রদের পড়াই' ।
'হুজুর, দয়া করে জাতীয় সঙ্গীত পুরোটা বলুন তো' ।
এই উদ্ভট প্রশ্নে শাইখ যখন বিব্রত, তখন কামান থেকে দ্বিতীয় 'গোলা' ছোড়া হয়, 'আচ্ছা হুজুর, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কয়টি সেক্টর ছিল', 'সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম বলুন তো' ।
যে অর্বাচীন প্রশ্ন প্রস্তুত করে নিয়ে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধে তার জেলা কোন সেক্টরে ছিল সেটাই তো সে বলতে পারবে না। কিন্তু পরের দিন সংবাদপত্রে সচিত্র প্রতিবেদন, 'মাদ্রাসাগুলোতে কী শেখানো হচ্ছে'! নিচে ছোট্ট করে লিখে দেয়া হয়, 'তোয়াক্কা নেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের' ।
এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক অপপ্রচার। অমুক সংগঠন মাদ্রাসা রাষ্ট্রযন্ত্রের করায়ত্ত্বে নেওয়ার দাবি করেন তো তমুক গোষ্ঠী মাদ্রাসা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখেন। চারদিক থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়। এ ধরনের ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার বিপরীতে দেশের আলেম সমাজের প্রতিনিধি সচরাচর রক্ষণাত্মক ভূমিকায় থাকেন। আমাদের ওস্তাদদের পক্ষ থেকে সাধারণত জবাব আসে, মাদ্রাসার ব্যাপারে ভুল ধারণা ছড়িয়েছে, সকলের প্রতি আহ্বান মাদ্রাসা ভ্রমণ করে সঠিক তথ্য জানার, মাদ্রাসায় কখনোই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সকল উত্তর যারা মাদ্রাসার বিরোধী, তারা সকলেই জানে; তাদের এমন উত্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। জবাব দেওয়া হয় আপামর জনতার প্রশ্ন ভাষা চোখগুলোর জন্য, যার প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, আমাদের এই দুর্বল অবস্থা দেখে অনেক মুসলিম ভাইয়ের অন্তরে ব্যথা অনুভূত হয়।
এসব অনাচার দেখলে হতাশ লাগাটাই স্বাভাবিক। আমরা তো সত্য নবীর উম্মত, তবু কেন আমরা এত দুর্বল? এক মুমিন ভাইয়ের ব্যথায় অপর ভাইয়ের ব্যথিত হওয়ার দরকার আছে, তবে সেটাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন বানানো যাবে না। ঈমানের কালিমা যে বুকে ধারণ করেছে, তার তো হতাশ হওয়া মানায় না। মুমিন তো চিরকালই শক্তিশালী, তার সাথে তো আছেন মহান রব, আমাদের সৃষ্টিকর্তা রহমান আল্লাহ; যিনি সকল পরিকল্পনাকারীর মহাপরিকল্পনাকারী। তাই চলুন, দশ বছর পর আমরা কোন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছাতে চাই, সেই মঞ্জিলের দৃশ্যটা একবার মনের চিলেকোঠার জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে দেখি-
চিন্তা করুন, দশ বছর পরের কোনো একদিন। দেশের প্রধান ও প্রভাবশালী দশটা মিডিয়ার কয়েকটা আমাদের। তখন কিন্তু 'খেলার' কৌশল আর রক্ষণাত্মক থাকবে না; তখন আমরা গোলবারে শট নিব, তারা নাকেমুখে সেই শট ঠেকাতে ব্যস্ত থাকবে, খাবি খাবে। সেটা কিভাবে হবে?
ধরুন, আগের দিন পত্রিকায় মাদ্রাসা বন্ধের জোর দাবি জানানো 'লক্ষণ সেন বিশ্ববিদ্যালয়ে'র ভিসির কাছে কোনো মাদ্রাসার সদ্য ফারেগ হওয়া তরতাজা টগবগে তরুণ সাংবাদিক ক্যামেরাম্যান হিসেবে সেই ভার্সিটিরই ছাত্র সহ হাজির হয়ে বলল,
'স্যার আসসালামু আলাইকুম। আমরা “মোল্লা টিভি”র পক্ষ থেকে এসেছি। শোনা যাচ্ছে, দেশের মাদ্রাসাগুলোতে লেখাপড়ার মান ক্রমশ অধঃপতিত হচ্ছে। আমরা মনে করি মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি'?
উত্তরে স্যার তো অবশ্যই হ্যাঁ বলবে। তারপর তরুণ বলবে, 'স্যার, গোসলের ফরজগুলো কি কি বলুন তো' । এ প্রশ্নে ভিসি যখন হতভম্ব হয়ে চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করবে, 'কী বলতে চাচ্ছ তোমরা'? তখন তরুণ জানাবে, 'স্যার, গতকাল আপনি ইসলাম শিক্ষার ঠিক-ভুল সম্পর্কে পেপারে বিশাল প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে আপনি দেখিয়েছেন, দেশের সম্মানিত আলেমরা ইসলামের শিক্ষা কী, সেটাই বুঝে না। কোনটা পড়ানো প্রয়োজন, কোনটি পড়ানো বন্ধ হওয়া উচিত, সেসব নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। তার মানে আপনি নিশ্চয়ই ইসলামের বড় এক পণ্ডিত। স্যার প্লিজ, একটু যদি বলতেন গোসলের ফরজগুলো কী কী'?
এ সম্ভাবনা কোনোমতেই উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, এসকল সুশীলদের অধিকাংশই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না, লেজেগোবরে করে ফেলবে। তারপর প্রশ্ন হবে, 'স্যার, আপনি কি পঞ্চাশোর্ধ/ষাটোর্ধ নন'? ইতিবাচক উত্তর আসলে বলা হবে, 'তাহলে দেশীয় আইন অনুযায়ী আপনি এত বছর ধরে প্রাপ্তবয়স্ক' । এর উত্তরও 'হ্যাঁ' হলে পরের প্রশ্ন হবে, 'তাহলে স্যার আপনি এতগুলো বছর ধরে নাপাক হয়ে ঘোরাঘুরি করছেন'!
তারপর ভিসি যতই চিৎকার চেঁচামেচি করুক, পরের দিন সবগুলো পত্রিকায় হেডলাইন হবে, 'অমুক ভার্সিটির ভিসি এত বছর ধরে নাপাক'! সাথে ছোট্ট করে লেখা, 'একই অবস্থা আরও দশ জনের' ।
বিষয়টা কেমন হবে ভাবতে পারছেন? ইসলাম-বিদ্বেষী মহল্লায় আগুন ধরে যাবে, সবাই মিলে ইসলামি পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করবে। কিন্তু ততক্ষণে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে গুল্মবনে আগুন লেগে গেছে, দাউদাউ করে জ্বলছে দাবানল। 'নেভানোর' ক্ষমতা সেক্যুলারদের নেই। ক্ষমতা আর প্রভাবের কারণে কেউ ইসলামিস্টদের টুপিটাও ছুতে পারবে না। কলকাতামুখী, পুঁজিবাদী সেক্যুলাররা তখন নিজেদের নষ্ট হওয়া ইমেজ উদ্ধারের আশায় নানাভাবে তাদের অবস্থানকে ব্যাখ্যা করবে। এসব সুশীলদের হাল দেখে ইসলাম-বিরোধী, ভূমিদস্যু আর পুঁজিবাদী রক্তচোষা কর্পোরেট কোম্পানির প্রসব করা মিডিয়াগুলোও সতর্ক হয়ে যাবে, মুসলিমদেরকে সমঝে চলবে। নাস্তিকদের ইসলাম-বিরোধী গল্প কবিতা প্রবন্ধ আর শিক্ষাক্রমে প্রবেশ করানো হবে না।
আমরা কখনোই ইসলাম-বিদ্বেষীদের মতো এমন নিচুশ্রেণির কাজে লিপ্ত হবো না। কিন্তু তাদেরকে তাদের ওষুধ দিয়ে নাজেহাল করার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে। এই সক্ষমতার পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে, দ্বীনের প্রচারের জন্য এমন একটি পরিবেশ জরুরি, জরুরি এমন ক্ষমতা। মোট কথা, আমাদের বলার, লেখার, বক্তব্য দেওয়ার প্লাটফর্মের সাথে সাথে প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে হবে, যে প্লাটফর্ম জনসাধারণের দৃষ্টিসীমার আওতাধীন; আর জনগণ যে প্রভাবের আওতাধীন।
আজ তারা আমাদের ওস্তাদ, হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে বসা আলেমদের নিয়ে যেভাবে অপপ্রচার করে, আমাদের হাতে যদি শক্তিশালী মিডিয়া থাকত, তাহলে আমরাও তাদেরকে ঠিক একইভাবে ঘায়েল করার শক্তি হাতে রাখতাম। হয়তো মুসলিমরা এভাবে নিকৃষ্ট পন্থায় আক্রমণ করত না, তবে বিরোধীরা সর্বদা ভয়ে থাকত, মুসলিমদের হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। বাড়াবাড়ি করার আগে প্রতিটি দুশ্চরিত্র দুবার ভেবে নিত, কারণ তখন মুসলিমদের সম্মানের চাদরে হাত দিলে নিজের লজ্জা নিবারণের হাফপ্যান্ট খুলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি। যেদিন আমরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই গন্তব্যে পৌঁছুব। সেদিন আর কোনো অর্বাচীন আমাদের রব, দ্বীন, রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে টিটকারি করার সাহস পাবে না। সেদিন আর কোনো ইমামকে মসজিদ সভাপতি, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দ অকারণে অপমান করার আগে দশ বার ভাববে। যারা তখনো ইসলামের বিপক্ষে বাড়াবাড়ি করবে, তাদের মুখোশ সেদিন খুলে ফেলা হবে সকলের সামনে। তারপরও যারা সেদিন ইসলামের ওপর কুফরের ঝাণ্ডা উড়াতে চাইবে, তাদেরকেও নিজ অবস্থানে নিরপেক্ষ করে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসন, শিক্ষা-সহ গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে তথাকথিত অভিজাত সাংস্কৃতিক জমিদার আর ইসলাম-বিদ্বেষীরা বসে থাকবে? থাকুক, দ্বিতীয় 'প্রশাসন' তখন আমাদের আয়ত্বে, আমরা ইচ্ছা করলে তাদের জায়গায় উঠাতে পারব, আবার ইচ্ছা করলে তাদের যথাযোগ্য স্থানে ধরে নিয়ে বসাতে পারব। এর জন্য দরকার মিডিয়ার লাগামের নিয়ন্ত্রণ। আসুন, আমরা সবাই সেই দিনটির স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করতে কাজ করি। যেদিন নতুন এক সতেজ আকাশের নিচে স্নিগ্ধ ভোরের বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস বুকভরে টেনে নিবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। নাস্তিকতার কালো মেঘে আর ঢাকা পড়বে না কোনো কিশোরের আকাশে উদিত হওয়া ইসলামের রাঙা প্রভাতের সূর্যটা। এতটুকু আশা করা তো বাতুলতা নয় নিশ্চয়ই; সেই সোনালী দিনের স্বপ্ন তো দেখাই যায়, তাই না?
টিকাঃ
১. আমার অল্পজ্ঞানে হয়তো সবকিছু বইয়ের পাতায় তুলে আনতে পারিনি। আমি নিশ্চিত অনেকেই আমার চাইতে এসব বিষয়ে অধিক ইলম রাখেন আলহামদুলিল্লাহ। তাই, এ বিষয়ে কারো কোনো যৌক্তিক পরামর্শ, উপদেশ, আলোচনা, সমালোচনা সাদরে গ্রহণযোগ্য ও কাম্য।
মিডিয়াতে প্রায়ই দেখতে পাবেন, তাদের নির্ধারিত কিছু মানদণ্ডে মুসলিমরা কিভাবে ‘ফেইল’ করে, এর সচিত্র প্রতিবেদন তারা প্রচার করে বেড়ায়। কখনো ইসলাম বনাম বাঙালিয়ানা, কখনো-বা দেশপ্রেম—এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে কেন যেন তারা মুসলিমদের অবস্থানকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তাদেরকে বিব্রত করে মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা বেশ সুখ অনুভব করেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই।
ধরুন, কোনো এক ‘অসাম্প্রদায়িক’ মিডিয়ার অর্বাচীন এক সাংবাদিক হঠাৎ করে এক কওমি মাদ্রাসায় গিয়ে উদয় হলো। সেখানে ক্যামেরা হাতে মাদ্রাসার শিক্ষককে প্রশ্ন করল,
'আপনি এই মাদ্রাসার শিক্ষক?'
সম্মানিত শাইখ বিব্রত হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ। আমি এখানে ছাত্রদের পড়াই' ।
'হুজুর, দয়া করে জাতীয় সঙ্গীত পুরোটা বলুন তো' ।
এই উদ্ভট প্রশ্নে শাইখ যখন বিব্রত, তখন কামান থেকে দ্বিতীয় 'গোলা' ছোড়া হয়, 'আচ্ছা হুজুর, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কয়টি সেক্টর ছিল', 'সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম বলুন তো' ।
যে অর্বাচীন প্রশ্ন প্রস্তুত করে নিয়ে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধে তার জেলা কোন সেক্টরে ছিল সেটাই তো সে বলতে পারবে না। কিন্তু পরের দিন সংবাদপত্রে সচিত্র প্রতিবেদন, 'মাদ্রাসাগুলোতে কী শেখানো হচ্ছে'! নিচে ছোট্ট করে লিখে দেয়া হয়, 'তোয়াক্কা নেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের' ।
এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক অপপ্রচার। অমুক সংগঠন মাদ্রাসা রাষ্ট্রযন্ত্রের করায়ত্ত্বে নেওয়ার দাবি করেন তো তমুক গোষ্ঠী মাদ্রাসা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখেন। চারদিক থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়। এ ধরনের ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার বিপরীতে দেশের আলেম সমাজের প্রতিনিধি সচরাচর রক্ষণাত্মক ভূমিকায় থাকেন। আমাদের ওস্তাদদের পক্ষ থেকে সাধারণত জবাব আসে, মাদ্রাসার ব্যাপারে ভুল ধারণা ছড়িয়েছে, সকলের প্রতি আহ্বান মাদ্রাসা ভ্রমণ করে সঠিক তথ্য জানার, মাদ্রাসায় কখনোই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সকল উত্তর যারা মাদ্রাসার বিরোধী, তারা সকলেই জানে; তাদের এমন উত্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। জবাব দেওয়া হয় আপামর জনতার প্রশ্ন ভাষা চোখগুলোর জন্য, যার প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, আমাদের এই দুর্বল অবস্থা দেখে অনেক মুসলিম ভাইয়ের অন্তরে ব্যথা অনুভূত হয়।
এসব অনাচার দেখলে হতাশ লাগাটাই স্বাভাবিক। আমরা তো সত্য নবীর উম্মত, তবু কেন আমরা এত দুর্বল? এক মুমিন ভাইয়ের ব্যথায় অপর ভাইয়ের ব্যথিত হওয়ার দরকার আছে, তবে সেটাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন বানানো যাবে না। ঈমানের কালিমা যে বুকে ধারণ করেছে, তার তো হতাশ হওয়া মানায় না। মুমিন তো চিরকালই শক্তিশালী, তার সাথে তো আছেন মহান রব, আমাদের সৃষ্টিকর্তা রহমান আল্লাহ; যিনি সকল পরিকল্পনাকারীর মহাপরিকল্পনাকারী। তাই চলুন, দশ বছর পর আমরা কোন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছাতে চাই, সেই মঞ্জিলের দৃশ্যটা একবার মনের চিলেকোঠার জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে দেখি-
চিন্তা করুন, দশ বছর পরের কোনো একদিন। দেশের প্রধান ও প্রভাবশালী দশটা মিডিয়ার কয়েকটা আমাদের। তখন কিন্তু 'খেলার' কৌশল আর রক্ষণাত্মক থাকবে না; তখন আমরা গোলবারে শট নিব, তারা নাকেমুখে সেই শট ঠেকাতে ব্যস্ত থাকবে, খাবি খাবে। সেটা কিভাবে হবে?
ধরুন, আগের দিন পত্রিকায় মাদ্রাসা বন্ধের জোর দাবি জানানো 'লক্ষণ সেন বিশ্ববিদ্যালয়ে'র ভিসির কাছে কোনো মাদ্রাসার সদ্য ফারেগ হওয়া তরতাজা টগবগে তরুণ সাংবাদিক ক্যামেরাম্যান হিসেবে সেই ভার্সিটিরই ছাত্র সহ হাজির হয়ে বলল,
'স্যার আসসালামু আলাইকুম। আমরা “মোল্লা টিভি”র পক্ষ থেকে এসেছি। শোনা যাচ্ছে, দেশের মাদ্রাসাগুলোতে লেখাপড়ার মান ক্রমশ অধঃপতিত হচ্ছে। আমরা মনে করি মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি'?
উত্তরে স্যার তো অবশ্যই হ্যাঁ বলবে। তারপর তরুণ বলবে, 'স্যার, গোসলের ফরজগুলো কি কি বলুন তো' । এ প্রশ্নে ভিসি যখন হতভম্ব হয়ে চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করবে, 'কী বলতে চাচ্ছ তোমরা'? তখন তরুণ জানাবে, 'স্যার, গতকাল আপনি ইসলাম শিক্ষার ঠিক-ভুল সম্পর্কে পেপারে বিশাল প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে আপনি দেখিয়েছেন, দেশের সম্মানিত আলেমরা ইসলামের শিক্ষা কী, সেটাই বুঝে না। কোনটা পড়ানো প্রয়োজন, কোনটি পড়ানো বন্ধ হওয়া উচিত, সেসব নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। তার মানে আপনি নিশ্চয়ই ইসলামের বড় এক পণ্ডিত। স্যার প্লিজ, একটু যদি বলতেন গোসলের ফরজগুলো কী কী'?
এ সম্ভাবনা কোনোমতেই উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, এসকল সুশীলদের অধিকাংশই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না, লেজেগোবরে করে ফেলবে। তারপর প্রশ্ন হবে, 'স্যার, আপনি কি পঞ্চাশোর্ধ/ষাটোর্ধ নন'? ইতিবাচক উত্তর আসলে বলা হবে, 'তাহলে দেশীয় আইন অনুযায়ী আপনি এত বছর ধরে প্রাপ্তবয়স্ক' । এর উত্তরও 'হ্যাঁ' হলে পরের প্রশ্ন হবে, 'তাহলে স্যার আপনি এতগুলো বছর ধরে নাপাক হয়ে ঘোরাঘুরি করছেন'!
তারপর ভিসি যতই চিৎকার চেঁচামেচি করুক, পরের দিন সবগুলো পত্রিকায় হেডলাইন হবে, 'অমুক ভার্সিটির ভিসি এত বছর ধরে নাপাক'! সাথে ছোট্ট করে লেখা, 'একই অবস্থা আরও দশ জনের' ।
বিষয়টা কেমন হবে ভাবতে পারছেন? ইসলাম-বিদ্বেষী মহল্লায় আগুন ধরে যাবে, সবাই মিলে ইসলামি পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করবে। কিন্তু ততক্ষণে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে গুল্মবনে আগুন লেগে গেছে, দাউদাউ করে জ্বলছে দাবানল। 'নেভানোর' ক্ষমতা সেক্যুলারদের নেই। ক্ষমতা আর প্রভাবের কারণে কেউ ইসলামিস্টদের টুপিটাও ছুতে পারবে না। কলকাতামুখী, পুঁজিবাদী সেক্যুলাররা তখন নিজেদের নষ্ট হওয়া ইমেজ উদ্ধারের আশায় নানাভাবে তাদের অবস্থানকে ব্যাখ্যা করবে। এসব সুশীলদের হাল দেখে ইসলাম-বিরোধী, ভূমিদস্যু আর পুঁজিবাদী রক্তচোষা কর্পোরেট কোম্পানির প্রসব করা মিডিয়াগুলোও সতর্ক হয়ে যাবে, মুসলিমদেরকে সমঝে চলবে। নাস্তিকদের ইসলাম-বিরোধী গল্প কবিতা প্রবন্ধ আর শিক্ষাক্রমে প্রবেশ করানো হবে না।
আমরা কখনোই ইসলাম-বিদ্বেষীদের মতো এমন নিচুশ্রেণির কাজে লিপ্ত হবো না। কিন্তু তাদেরকে তাদের ওষুধ দিয়ে নাজেহাল করার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে। এই সক্ষমতার পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে, দ্বীনের প্রচারের জন্য এমন একটি পরিবেশ জরুরি, জরুরি এমন ক্ষমতা। মোট কথা, আমাদের বলার, লেখার, বক্তব্য দেওয়ার প্লাটফর্মের সাথে সাথে প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে হবে, যে প্লাটফর্ম জনসাধারণের দৃষ্টিসীমার আওতাধীন; আর জনগণ যে প্রভাবের আওতাধীন।
আজ তারা আমাদের ওস্তাদ, হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে বসা আলেমদের নিয়ে যেভাবে অপপ্রচার করে, আমাদের হাতে যদি শক্তিশালী মিডিয়া থাকত, তাহলে আমরাও তাদেরকে ঠিক একইভাবে ঘায়েল করার শক্তি হাতে রাখতাম। হয়তো মুসলিমরা এভাবে নিকৃষ্ট পন্থায় আক্রমণ করত না, তবে বিরোধীরা সর্বদা ভয়ে থাকত, মুসলিমদের হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। বাড়াবাড়ি করার আগে প্রতিটি দুশ্চরিত্র দুবার ভেবে নিত, কারণ তখন মুসলিমদের সম্মানের চাদরে হাত দিলে নিজের লজ্জা নিবারণের হাফপ্যান্ট খুলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি। যেদিন আমরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই গন্তব্যে পৌঁছুব। সেদিন আর কোনো অর্বাচীন আমাদের রব, দ্বীন, রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে টিটকারি করার সাহস পাবে না। সেদিন আর কোনো ইমামকে মসজিদ সভাপতি, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দ অকারণে অপমান করার আগে দশ বার ভাববে। যারা তখনো ইসলামের বিপক্ষে বাড়াবাড়ি করবে, তাদের মুখোশ সেদিন খুলে ফেলা হবে সকলের সামনে। তারপরও যারা সেদিন ইসলামের ওপর কুফরের ঝাণ্ডা উড়াতে চাইবে, তাদেরকেও নিজ অবস্থানে নিরপেক্ষ করে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসন, শিক্ষা-সহ গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে তথাকথিত অভিজাত সাংস্কৃতিক জমিদার আর ইসলাম-বিদ্বেষীরা বসে থাকবে? থাকুক, দ্বিতীয় 'প্রশাসন' তখন আমাদের আয়ত্বে, আমরা ইচ্ছা করলে তাদের জায়গায় উঠাতে পারব, আবার ইচ্ছা করলে তাদের যথাযোগ্য স্থানে ধরে নিয়ে বসাতে পারব। এর জন্য দরকার মিডিয়ার লাগামের নিয়ন্ত্রণ। আসুন, আমরা সবাই সেই দিনটির স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করতে কাজ করি। যেদিন নতুন এক সতেজ আকাশের নিচে স্নিগ্ধ ভোরের বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস বুকভরে টেনে নিবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। নাস্তিকতার কালো মেঘে আর ঢাকা পড়বে না কোনো কিশোরের আকাশে উদিত হওয়া ইসলামের রাঙা প্রভাতের সূর্যটা। এতটুকু আশা করা তো বাতুলতা নয় নিশ্চয়ই; সেই সোনালী দিনের স্বপ্ন তো দেখাই যায়, তাই না?
টিকাঃ
১. আমার অল্পজ্ঞানে হয়তো সবকিছু বইয়ের পাতায় তুলে আনতে পারিনি। আমি নিশ্চিত অনেকেই আমার চাইতে এসব বিষয়ে অধিক ইলম রাখেন আলহামদুলিল্লাহ। তাই, এ বিষয়ে কারো কোনো যৌক্তিক পরামর্শ, উপদেশ, আলোচনা, সমালোচনা সাদরে গ্রহণযোগ্য ও কাম্য।