📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস 📄 জ্ঞানীরা যেভাবে মনোযোগী হয়েছিলেন

📄 জ্ঞানীরা যেভাবে মনোযোগী হয়েছিলেন


বর্তমান সময়ে উম্মাহ অজস্র মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি। তার মধ্যে একটি হলো, বাস্তব জীবনের সাথে তাত্ত্বিক ইলমের সংযোগ ঘটাতে পারে এমন তালিবুল ইলমের অভাব। উম্মাহ শুধু পূর্ববর্তীদের করে যাওয়া কাজই দেখে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। আশা যত বাড়ে, অপেক্ষারাও বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই অন্তহীন শূন্যতা, অতলান্ত নিরাশার নিগূঢ় রহস্য কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আমরা খানিকটা অনুমান করতে পারি সম্ভবত। তালিবুল ইলমের আশা পূরণের পথে যে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি রয়েছে, সেগুলো তাকে অর্জিত ইলমের বাস্তব প্রয়োগ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। সে যা অর্জন করতে চায়, সেদিকে মনোযোগী হতে পারছে না। তার দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে। আশা-আকাঙ্ক্ষা কমে এসেছে। স্বপ্নের মখমলি বসন ছিঁড়তে বসেছে। তাই সে না পারছে নিজের দৈন্য বুঝে নিয়ে মনোযোগের মাধ্যমে তা সামলে নিতে, আর না পারছে উম্মাহর জন্যও দীর্ঘমেয়াদি কিছু করতে।
লক্ষ্যপূরণের পথে হাজারো বাধা-বিপত্তি আসে আমাদের জীবনে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এসব ঝুটঝামেলার সাথে তালিবুল ইলমদের ঝুটঝামেলা মিলিয়ে ফেললে চলবে না। কারণ যে ব্যক্তি সদা সচেতন, যার ওপর সবার অগাধ আস্থা ও সীমাহীন আশা রয়েছে, সে এসব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু একজন তালিবুল ইলমের সবচেয়ে বড় মসিবত হলো, ইলম অর্জনের পথে সে মনোযোগ পায় না। তাই সারাজীবন বইয়ে মুখ গুঁজে কাটিয়ে দিলেও তার অর্জিত জ্ঞানের পরিমাণ খুব সামান্য। একজন সত্যিকারের আদর্শ ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া তার জন্য দিবাস্বপ্নই থেকে যায়। ভেবে দেখুন, কী ভয়াবহ ব্যাপার!
এ বইটি হয়তো এমন সংকট থেকে উত্তরণের একটা সিঁড়ি হয়ে দাঁড়াবে, আগামী দিনগুলোতে কিছু করার জন্য এবং নিজেকে নতুন করে সংশোধনের জন্য একটা উপকরণে পরিণত হবে।
অনেক তালিবুল ইলমের সমস্যা হলো তারা তাদের জীবনের সবচেয়ে দামি সময়টা ইলমের শাখা-প্রশাখা মুখস্থ করার কাজে কাটিয়ে দেয়, অথচ মৌলিক বিষয়ে থাকে বেমালুম বেখবর। মাসআলা শেখায় তার ক্লান্তি নেই, অথচ সে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করে না। তাই জীবনের দীর্ঘ সময় চলে যায় এই শাখা-শাখায় ঘোরাঘুরি করেই। অথচ তারা যদি মূলকে আঁকড়ে ধরত, তাহলে তাদের কাছে শাখা-প্রশাখা সশ্রদ্ধ মস্তকে ধরা দিত, কিছুই বাদ থাকত না।
সুলাইমান ইবনু নাসির আল-আবুদি তার মিরকাত গ্রন্থে এ ব্যাপারে খুব দামি একটা কথা বলেছেন—‘জ্ঞানের যে ভূমি, যে মূলনীতিসমূহ, সেটা অর্জনের পেছনে একজন তালিবুল ইলম দিন-রাত ব্যয় করার পর এক সময় তার হৃদয়ে জ্ঞান স্থান করে নেয়। তখন চুম্বকের মতো অন্য সব জ্ঞানের খনিকে নিজের দিকে সে টানতে থাকে, কিছুই আর ভোলে না। জ্ঞানের কোনো এক বিষয়ের ভিত্তিপ্রস্তর সঠিকভাবে স্থাপিত হলে শাখা-প্রশাখা খুবই সহজ হয়ে যায়।’
ইবনু আব্দিল বার বলেন, ‘সর্বোত্তম জ্ঞান হলো যার মূল আত্মস্থ করা হয়েছে আর শাখা-প্রশাখা স্মরণ রাখা হয়েছে।’
এরপর সুলাইমান তালিবুল ইলমের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, ‘কীভাবে একজন তালিবুল ইলম মূলকে আত্মস্থ করবে?’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, এ প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিতভাবে দিতে হবে। তিনি কেবল ইলম অর্জনের একটি উপায় দেখিয়ে দিলেন, যা অতীত-বর্তমানের সকল আলিম অনুসরণ করেন। যে এই পথ অনুসরণ করে, সে-ই সুমিষ্ট ফল লাভ করে। কিন্তু সেটা অর্জনের বিষয়টা নির্ভর করে তালিবুল ইলমের দৃঢ়তা আর এক বইয়ে বারবার নজর দেওয়ার মানসিকতার ওপর। ফসল কাটার মৌসুম পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে পারবে কে? সে পদ্ধতিটা হলো যেকোনো কিছুর সারসংক্ষেপ করে নেওয়া।
তারপর তিনি জানালেন, এটা ইমাম যাহাবির পদ্ধতি। কত বইয়ের যে তিনি সংক্ষেপণ করেছেন! এমনকি মক্কার ঐতিহাসিক তাকিউদ্দিন ফাসি তার ব্যাপারে বলেছেন, ‘তিনি অন্য কারো যে বই পেয়েছেন, অমনি সেটা সংক্ষিপ্ত করে কিছু সংযুক্তি এনে দিয়েছেন এবং নিজের মতো বাছাই করেছেন।
ইমাম যাহাবি কখনো আমাদের মতো বিভিন্ন বইয়ে দুয়েকবার চোখ বুলিয়ে এরপর নতুন কোনো বই হাতে নিতেন না; বরং এক বই-ই বারবার পড়তেন।
যাহাবি রাহিমাহুল্লাহর মতো ছিলেন আল-লিসান প্রণেতা ইবনু মানযুর। তার ব্যাপারে সাফাদি বলেন, আমার জানামতে সাহিত্যের এমন কোনো বড় গ্রন্থ নেই যা থেকে তিনি নির্যাস বের করেননি।’
আমি তালিবুল ইলমদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জ্ঞানের মূলনীতি ও নিয়মকানুনের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতিটি বিষয়ের বিশেষায়িত জ্ঞানের কিছু নিয়মনীতি আছে যেগুলো পড়া, মুখস্থ করা, আত্মস্থ আর পুনরাবৃত্তি করার কাজে সময় দেওয়া অতীব জরুরি।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস 📄 সমাজকল্যাণে মনোযোগের গুরুত্ব

📄 সমাজকল্যাণে মনোযোগের গুরুত্ব


তালিবুল ইলমের জন্য কিছু কিছু বইয়ের সঙ্গ ত্যাগ করা কখনোই উচিত নয়। বারবার সেগুলোর দিকে ফিরে আসা উচিত। সেগুলোর ওপরই বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জনে সময় দেওয়া জরুরি। হোক সেটা ফিকহ, হাদিস, তাফসির কিংবা আকিদার বই। সময় যতই গড়িয়ে যাক, বারবার পড়ে যেতে হবে বইগুলো। এক-দুই কিংবা তিনটি বই যেন তার দিন-রাত, সকাল-বিকাল, প্রবাস-নিবাসের সঙ্গী হয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্যও সেগুলো যেন তার চোখের সামনে থেকে সরে না যায়। সাথে আরো কিছু বই যুক্ত হতে পারে, কিন্তু দিন-রাত সেই বিশেষ কয়েকটি বই কখনো তার হাতছাড়া হবে না। সে যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চায়, তার দুয়েকটা এখানে থাকবে। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, আল্লাহ আমার প্রতি বিশেষ একটি অনুগ্রহ করেছেন, সেটা হলো বই সংক্ষেপণ করা। খুবই উপকৃত হয়েছি আমি। এমনকি দাওয়াতি কাজে কিংবা পড়ানোর ক্ষেত্রেও। নিজের জ্ঞানের ভিত্তি তৈরিতেও সাহায্য পেয়েছি। দিন যত গড়িয়ে যায়, এই নিয়ামতের স্বাদ তত গভীরভাবে হৃদয় দিয়ে অনুভব করি আমি। এই অভ্যাসের ব্যাপারে আমার মনে যা কিছু আছে, তার বিস্তারিত যদি আপনাকে বলি তাহলে হয়তো আমার আনন্দানুভূতি ব্যক্ত করে শেষ করতে পারব না। জ্ঞানার্জনের প্রথম দিকে আমি এমনটা করেছিলাম। আমি যদি দেরি করতাম তাহলে হয়তো কিছুই অর্জন করা হতো না।
তালিবুল ইলম যদি এমন হয় তাহলে জ্ঞান অর্জনের আনন্দ অনুভব করা সহজ হয়। আল্লাহ সহায় হলে শীঘ্রই সে জ্ঞানের স্বাদ নিতে পারবে। ভরসা তো সুমহান রবের ওপরই। দিনে-রাতে সবসময় তাঁর কাছেই প্রার্থনা করি আমরা।

চিন্তার খোরাক
জ্ঞানের মূল ভিত্তিগুলোর দিকে নজর দিন। আশা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে দৃষ্টি সরাবেন না। দুই-তিনটা বই যেন সবসময় আপনার সাথি হয়ে থাকে। বারবার পড়বেন, নোট করবেন, টীকা-টিপ্পনী দেবেন। বাকি জীবন সে বইগুলো পড়বেন এবং পড়াবেন।

এই যুগে উম্মাহর অনেক বড় বড় প্রজেক্ট বিভিন্ন লাইব্রেরি, সংস্থা, ইনস্টিটিউটের মাঝে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। ঠিক যেন পাতায় লুকোনো ফুল, প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোর অপেক্ষায় বসে আছে। সেগুলোতেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। যতদিন সেখানে মনোযোগ দেওয়া না হবে, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে না। দিনশেষে দেখা যাবে, উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি এই খাতগুলোতে।
আলোচ্য খাতগুলো কেউ পর্যবেক্ষণ করলে বেশ কিছু চমৎকার কাজ দেখতে পাবে। কিন্তু সবকটাতেই মনোযোগের অভাব লক্ষণীয়, অযত্নের ছাপ সুস্পষ্ট। এমন কিছু নেই যে কাল-পরিক্রমায় আমাদের গর্বের কারণ হয়ে উঠবে। সত্যিকার প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে বিরাট কিছুর প্রয়োজন। বাস্তবে টিকতে হলে আতশ কাঁচে দেখা বস্তুর মতো মনোযোগকেও বহুগুণে বর্ধিত করা প্রয়োজন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية