📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 ভিনদেশি মানুষের সফল জীবন

📄 ভিনদেশি মানুষের সফল জীবন


অনেক সময় মহান অর্জন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা শত কষ্ট নিয়ে ভাবার সময় হয় না। এই যে মহান অর্জন, এটার মাত্রা যেমনই হোক, দিনশেষে এটা কোনো একটা অভ্যাসেরই ফল। কালক্রমে বাস্তবতায় রূপ নিতে পেরেছে সেটা।
আপনি যদি জাপানি তাকিও ওশাহেরার জীবনী পড়েন, তাহলে বুঝতে পারবেন কীভাবে মনোযোগ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপান এক সময় অটোমেটেড মেশিন বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র শিল্পে উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তা শেখার জন্য জাপান সরকার একজনকে নির্বাচিত করে। জাপানের শাসক তাকে জার্মানিতে পাঠায়, যাতে সে ঐ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে নিজ দেশে ফিরে আসতে পারে। সে জার্মানিতে গিয়ে টানা ১৮ বছর কাজ শেখে। অবশেষে সে যখন ফিরে আসে তখন সমস্ত চিন্তা তার মাথায় গেঁথে গেছে। সে নিজ দেশে ফিরে তা বাস্তবায়ন করে দেখায়। যখন জাপানের রাষ্ট্রপতি এসে দেখতে পেলেন অটোমেটেড মেশিন চলছে, তখন তাকিও ওশাহেরা বাড়ি ফিরে গেলেন। তিনি বলেন, ‘বাসায় গিয়ে আমি ১০ ঘণ্টা ঘুমালাম। গত ১৮ বছরে এটাই ছিল আমার প্রথম একটানা ১০ ঘণ্টা ঘুম।’
এই ঘটনাটা মাথায় গেঁথে নিন। সময় বের করে চিন্তা করে দেখুন। দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে না রাখলে চিন্তা পরিপক্ব হয় না। সময় ব্যয় না করলে সফল হওয়া যায় না।
কেবল অবসর সময়কে ব্যয় করলে চিন্তা পরিপক্ক হবে, পরিকল্পনা সফল হবে, যুগান্তকারী লক্ষ্য পূরণ হবে—এমনটা আশা কখনো করবেন না। কক্ষনো না! আপনাকে বিশ্বাস রাখতে হবে, দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম, ঠান্ডা-গরম, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, প্রবাস-নিবাস, ভালো-খারাপ সব সময়ে আপনি মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন। যদি এভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেন, তবেই আপনার হৃদয় থেকে অনুভূতি আহরণ করে আপনার চিন্তারাও জীবন্ত হয়ে উঠবে।
জাপানি সেই অগ্রদূত তার জীবনের ১৮টি বছর একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনেই ব্যয় করেছেন। তার অবর্ণনীয় পরিশ্রমের ফলেই জাপান শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে বহুদূর এগিয়ে গেছে। ইউরোপ যখন শিল্পায়নের মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছে, তখন জাপানও তাদের থেকে শিখে নিয়ে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজও তার সুফল ভোগ করে চলেছে জাপান।
১৯৯৮ সালে একই কাজ করেছিল নিঃস্ব হতে যাওয়া অ্যাপল কোম্পানি। দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল তারা, কোম্পানি বন্ধ করে দিতে হবে তিন মাসের মাঝে। তখন পরিচালনা পরিষদের সবাই মিটিংয়ে বসল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, ১৯৯২ সালে কোম্পানি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া স্টিভ জবসকে আবার ফিরিয়ে আনবে। স্টিভ জবস এসে পরিচালনা কমিটির সবাইকে উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি লিখলেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘পরিচালনা কমিটির সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। নতুবা পরদিন আমার পদত্যাগ পত্র পেয়ে যাবেন।’ তারপর বেরিয়ে গেলেন তিনি। বাধ্য হয়ে পরিচালনা কমিটির সবাই পদত্যাগ করে। লোকটাকে তারা সংকটপূর্ণ অবস্থায় রেখে যায়; যেখান থেকে বের হওয়ার উপায় তার ছিল না।
স্টিভ জবস ফিরে এলেন তার কোম্পানিতে। সেখানে তখন প্রায় কোম্পানিতে দুইশটি পণ্য উৎপন্ন করা হতো। স্টিভ জবস মাত্র চারটা রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিলেন যাতে পরিমাণের চেয়ে উন্নত মানের বিষয়টা নিশ্চিত করা যায়। অর্থাৎ, Quality over quantity.
কোম্পানিতে দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরের মাথায় তিনি ঐ কোম্পানির সব উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিকে জড়ো করেন। তাদেরকে আগামী এক বছরের জন্য নতুন কোনো পণ্য উৎপাদন করার কথা ভাবতে বলেন। দশজনের চিন্তা জমা হয়। তিনি কাগজে সেগুলো লিখে ফেলেন। তারপর সাতটা নাম কেটে দিয়ে বলেন, ‘অ্যাপল কোম্পানি মাত্র তিনটার দিকে মনোযোগ দেবে।’
এক লেখক স্টিভ জবসের জীবনী লিখলেন। এতে তিনি স্টিভের সফলতার পেছনে পাঁচটি কারণ নির্ণয় করলেন। সেই তালিকার শীর্ষে ছিল মনোযোগ। একাগ্রতা ধরে রাখার মাধ্যমে দেউলিয়া হতে বসা একটা কোম্পানিকে তিনি এমন একটা কোম্পানিতে পরিণত করেন যে, সেটার বাজেট বেশ কয়েকটা দেশের বাজেটকে ছাড়িয়ে গিয়েছে! দুইশো পণ্যকে কমিয়ে মাত্র তিনটি পণ্যে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত থেকে এটাই প্রমাণিত হয়, মনোযোগ আমাদের জীবন গড়তে পারে।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 কেমন হতে পারে আপনার অনুশীলন

📄 কেমন হতে পারে আপনার অনুশীলন


চিন্তার খোরাক
আপনি যদি সব কিছুই পেতে চান, আর সব কাজের সময় দিতে থাকেন; তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনি কোনো কাজই শেষ করতে পারবেন না। কীভাবে চিন্তা, পরিকল্পনা বাছাই করবেন; কোনো কিছু কীভাবে সম্পাদন করবেন তা নির্ধারণ করুন। তারপর সেটার পেছনে আপনার শক্তি-দক্ষতা-সক্ষমতা-সময়কে ব্যয় করুন। কোনো একদিন আপনার রচিত সফলতা, অর্জন আর অগ্রগতির গল্প শোনার অপেক্ষায় থাকলাম...

একবার মক্কায় জামিউর রাজিহিতে বেড়াতে গেলাম। এক তলা থেকে আরেক তলায় যাওয়ার পথে সেখানকার কার্যক্রম সম্পর্কে শুনতে লাগলাম। হঠাৎ কুরআন হিফয করার একটা হালাকার কথা কানে এলো, সেখানে মাত্র ৬০ জন ছাত্র। অথচ জামিউর রাজিহির ছাত্রসংখ্যা ছয়শোরও বেশি। এখানে কমসংখ্যক ছাত্র ভর্তি করানো হয় যেন তারা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। অধিকাংশ ছাত্রের একঘেঁয়েমি চলে এলে তারা আর চালিয়ে যেতে পারে না।
মনোযোগের অভ্যাস গড়ে তোলার একটা উপায় এমন যে, একজন ছাত্র প্রতিটি আয়াত চল্লিশবার নির্ভুলভাবে পড়ে। তারপর উস্তাযকে সেটা শোনায়। এভাবে করতে করতে এক সময় ছাত্র পুরো কুরআন মুখস্থ করে ফেলতে সক্ষম হয়। হিফয শেষ করার পর যখন সে কুরআন উপস্থাপন করে তখন একটি হরফও ভুল হয় না তার।
সে সময়টাতে শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন না। আমি তার মোবাইলটা হাতে নিয়ে এ পদ্ধতির ফলাফল কেমন জানতে চাইলাম। সে জানাল, এই পদ্ধতি অনুসরণ করে একজন বয়স্ক মানুষও হিফয শেষ করেছে এ সপ্তাহে। একাধিক মজলিসে কুরআন শোনাতে তার কোনো ভুল হয়নি।
আমি নিজেও এটা যাচাই করে ফল পেয়েছি। যে সুরাগুলো আমি এভাবে বারবার পড়েছি, সেগুলো জাহরি সালাতে[১] মুসল্লিদের নিয়ে পড়তে গিয়ে আমি কোনো ভুল করিনি। কিন্তু যেগুলো এ পদ্ধতিতে মুখস্থ করিনি, সেসবে আমার অগণিত ভুল হয়।
ইউটিউবে চোখে পড়ে খেলোয়াড়রা পায়ে লম্বা সময় ফুটবল ধরে রাখছে; এক মূহূর্তের জন্যও সেটা পড়ে যাচ্ছে না পা থেকে। বল নিয়ে খেলতে খেলতে রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছে, থামার প্রয়োজন হচ্ছে না। তার যেমন থামানোর প্রয়োজন পড়ে না, তেমন পা থেকেও পড়ে যায় না। এমনকি পা দিয়ে লাথি দিয়ে সে একবারেই গোল দিয়ে দিচ্ছে। কখনো পা থেকে সেটা জালে গিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে। কখনো আবার দেওয়াল বরাবর বলে লাথি মারছে এবং সেটা দেওয়ালে লেগে সরাসরি জালে ঢুকে যাচ্ছে। আবার দুইটা বল নিয়ে একটা আকাশে ছুড়ে মারছে। তারপর অন্যটা লাথি মেরে প্রথম বলে লাগাচ্ছে। এ জন্য বারবার চেষ্টাও করতে হচ্ছে না। এমন ভিডিও দেখেছি, বহু দূর থেকে লাথি মেরেও ফুটবলকে জালে জড়াতে পারছে। যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘কীভাবে সে এত দক্ষ হলো?’ তাহলে উত্তর আসবে, ‘একাগ্রতা।’ সে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে, অনুশীলন করেছে; যতদিন আয়ত্ত করতে না পেরেছে সংগ্রাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এরপর একদিন সে এটা অর্জন করেও নিতে পেরেছে।

টিকাঃ
[১] যেসব সালাতে কিরাআত উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হয়।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 আরও কিছু বিস্ময়কর উদাহরণ

📄 আরও কিছু বিস্ময়কর উদাহরণ


যে মানুষগুলো ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে, জীবন গড়তে সক্ষম হয়েছে কিংবা ইতিহাস গড়তে পেরেছে; তাদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, একাগ্রতাই ছিল তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি। তারা যা কিছু করতে পেরেছে, যে বিষয়গুলো রেখে যেতে পেরেছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য; সেগুলোর পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে এই মনোযোগ।
উদাহরণ হিসেবে ইমাম ইবনু কুদামা রাহিমাহুল্লাহর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দীর্ঘ দিন তিনি ফিকহের ইমাম ছিলেন। উম্মাহর জন্য ফিকহের সমৃদ্ধ এক ভাণ্ডার রেখে গেছেন, যা থেকে আজও সকলে গ্রহণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত।
হাদিসের ক্ষেত্রে শাইখ আলবানি রাহিমাহুল্লাহর অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। মুসলিমদের দরসে, বিভিন্ন আলোচনায় তার নাম বহুবার উচ্চারিত হয়, এটা সবাই স্বীকার করবে। ‘শাইখ আলবানি সহিহ বলেছেন’, ‘শাইখ আলবানি হাসান বলেছেন’, ‘শাইখ আলবানি দুর্বল বলেছেন’—অহরহ এসব শুনতে পাওয়া যায়। আর তার এ সব অর্জনই মনোযোগের ফসল। তিনি একটি কাজেই নিজের পুরোটা সময়টা ব্যয় করেছেন। তাই ফিকহের ওপর তার আলাদা কোনো বই আপনি দেখবেন না। যদিও তার মতামত নিয়ে আলাদা জ্ঞানগর্ভ গবেষণাপত্র বের হয়েছে। কিন্তু তিনি যে কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন, যে শাস্ত্রের কারণে বিখ্যাত হয়েছেন, যার পেছনে জীবনটা দিয়ে দিয়েছেন, তা হচ্ছে হাদিস। তাই দেখতে পাবেন, মুসলিমরা আজও তার ব্যাপারে আলোচনা করছে, তার সম্পর্কে জানাশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আপনি যদি কোনো সফল ব্যবসায়ী দেখেন, তাহলে ধরে নেবেন, তিনি তার সারাটা জীবন টাকার পেছনে ছুটে সেটার লাগাম ধরে নিজের আঙিনায় আনতে পেরেছেন। সুলাইমান আর-রাজিহি হাফিযাহুল্লাহর জীবনীটা দেখুন। ইন্টারনেটেই বিস্তারিত পাওয়া যাবে। ছেলেবেলা থেকে ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত একটানা এক বিষয়ে মনোযোগ ধরে রেখেছিলেন তিনি। কখনো নিজের পরিকল্পনা থেকে একচুল পিছপা হননি। কখনো স্বপ্নের চিন্তা ছেড়ে দেননি। আমি যখন এই বাক্যটি লিখছি, তখনও তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ। এই স্থিতির মাধ্যমে তিনি নিজের এবং জাতির আশাকে সামনের দিকে ঠেলে দিতে পেরেছেন।
যিনি ডাক্তারির কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হন, তিনি বহু বছর সেটা চালিয়ে যান। এক মুহূর্তও দমে যান না। এর মাধ্যমে তিনি বহু মানুষের উপকার করতে সক্ষম হন।
যে প্রকৌশলী তার পেশাগত কাজকর্মে আনন্দ খুঁজে পায়, সে কতশত রাত যে কেবল আঁকিবুকি আর নকশার মাঝে কাটিয়েছে তা সে নিজেও জানে না। অথচ এ সময়গুলোতে তার বন্ধুরা আনন্দ-ফুর্তি আর খেল-তামাশায় কাটিয়ে দিয়েছে।
ফারা বলেন, কিসায়ি[১] নাহু শিখেছেন বড় হওয়ার পর। কিসায়ি কে সেটা নিশ্চয় আপনি জানেন!
আবু বকর আব্দুল্লাহ ইবনু আহমদ আল-মারওয়াযি। তার অপর নাম ‘আল-কাফ্ফাল’। তার জীবনী লিখতে গিয়ে ইমাম যাহাবি বলেন, ‘তিনি তালা বানানোর কাজে বেশ দক্ষ ছিলেন। জীবনের ৩০টি বসন্ত কেটে যাবার পর তিনি নিজের মাঝে বুদ্ধিমত্তার ছাপ দেখতে পান। ফিকহকে ভালোবেসে ফিকহে পারদর্শিতার কাজে অগ্রসর হন। এক পর্যায়ে তাতে এত বেশি পারদর্শিতা অর্জন করেন যে, বর্তমানে তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ফকিহ নাসির আল-উমরি বলেন, আবু বকর আল-কাফ্ফালের যুগে তার থেকে বড় ফকিহ আর কেউ ছিল না। তার পরেও তার মতো ফকিহ আসেনি। আমরা বলতাম, তিনি মানুষরূপী ফেরেশতা। তিনি কথা বললে লেখক তা লিখে রাখত। ফিকহের একজন স্তম্ভ এবং যুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতায় একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।
ভেবে দেখুন, আবু বকর আল-কাফফাল ফিকহ শিখেছেন ত্রিশে গিয়ে। এর আগে তিনি পেশায় একজন তালাচাবির কারিগর ছিলেন। আর তাতেই অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। নতুন করে একটা জ্ঞানশাস্ত্রে যখন প্রবেশ করেছেন, তখন শুরুতে কিছুই জানতেন না। কিন্তু পরিশেষে তিনি হয়ে গেলেন সেই ইলমের একজন সর্দার, এক আদর্শ। মানুষের জীবন এমনই!

টিকাঃ
[১] তিনি একজন বিখ্যাত আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদ। সেই সাথে সাত কিরাআতের একজন প্রসিদ্ধ ইমাম। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯ হিজরিতে।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 জ্ঞানীরা যেভাবে মনোযোগী হয়েছিলেন

📄 জ্ঞানীরা যেভাবে মনোযোগী হয়েছিলেন


বর্তমান সময়ে উম্মাহ অজস্র মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি। তার মধ্যে একটি হলো, বাস্তব জীবনের সাথে তাত্ত্বিক ইলমের সংযোগ ঘটাতে পারে এমন তালিবুল ইলমের অভাব। উম্মাহ শুধু পূর্ববর্তীদের করে যাওয়া কাজই দেখে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। আশা যত বাড়ে, অপেক্ষারাও বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই অন্তহীন শূন্যতা, অতলান্ত নিরাশার নিগূঢ় রহস্য কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আমরা খানিকটা অনুমান করতে পারি সম্ভবত। তালিবুল ইলমের আশা পূরণের পথে যে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি রয়েছে, সেগুলো তাকে অর্জিত ইলমের বাস্তব প্রয়োগ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। সে যা অর্জন করতে চায়, সেদিকে মনোযোগী হতে পারছে না। তার দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে। আশা-আকাঙ্ক্ষা কমে এসেছে। স্বপ্নের মখমলি বসন ছিঁড়তে বসেছে। তাই সে না পারছে নিজের দৈন্য বুঝে নিয়ে মনোযোগের মাধ্যমে তা সামলে নিতে, আর না পারছে উম্মাহর জন্যও দীর্ঘমেয়াদি কিছু করতে।
লক্ষ্যপূরণের পথে হাজারো বাধা-বিপত্তি আসে আমাদের জীবনে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এসব ঝুটঝামেলার সাথে তালিবুল ইলমদের ঝুটঝামেলা মিলিয়ে ফেললে চলবে না। কারণ যে ব্যক্তি সদা সচেতন, যার ওপর সবার অগাধ আস্থা ও সীমাহীন আশা রয়েছে, সে এসব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু একজন তালিবুল ইলমের সবচেয়ে বড় মসিবত হলো, ইলম অর্জনের পথে সে মনোযোগ পায় না। তাই সারাজীবন বইয়ে মুখ গুঁজে কাটিয়ে দিলেও তার অর্জিত জ্ঞানের পরিমাণ খুব সামান্য। একজন সত্যিকারের আদর্শ ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া তার জন্য দিবাস্বপ্নই থেকে যায়। ভেবে দেখুন, কী ভয়াবহ ব্যাপার!
এ বইটি হয়তো এমন সংকট থেকে উত্তরণের একটা সিঁড়ি হয়ে দাঁড়াবে, আগামী দিনগুলোতে কিছু করার জন্য এবং নিজেকে নতুন করে সংশোধনের জন্য একটা উপকরণে পরিণত হবে।
অনেক তালিবুল ইলমের সমস্যা হলো তারা তাদের জীবনের সবচেয়ে দামি সময়টা ইলমের শাখা-প্রশাখা মুখস্থ করার কাজে কাটিয়ে দেয়, অথচ মৌলিক বিষয়ে থাকে বেমালুম বেখবর। মাসআলা শেখায় তার ক্লান্তি নেই, অথচ সে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করে না। তাই জীবনের দীর্ঘ সময় চলে যায় এই শাখা-শাখায় ঘোরাঘুরি করেই। অথচ তারা যদি মূলকে আঁকড়ে ধরত, তাহলে তাদের কাছে শাখা-প্রশাখা সশ্রদ্ধ মস্তকে ধরা দিত, কিছুই বাদ থাকত না।
সুলাইমান ইবনু নাসির আল-আবুদি তার মিরকাত গ্রন্থে এ ব্যাপারে খুব দামি একটা কথা বলেছেন—‘জ্ঞানের যে ভূমি, যে মূলনীতিসমূহ, সেটা অর্জনের পেছনে একজন তালিবুল ইলম দিন-রাত ব্যয় করার পর এক সময় তার হৃদয়ে জ্ঞান স্থান করে নেয়। তখন চুম্বকের মতো অন্য সব জ্ঞানের খনিকে নিজের দিকে সে টানতে থাকে, কিছুই আর ভোলে না। জ্ঞানের কোনো এক বিষয়ের ভিত্তিপ্রস্তর সঠিকভাবে স্থাপিত হলে শাখা-প্রশাখা খুবই সহজ হয়ে যায়।’
ইবনু আব্দিল বার বলেন, ‘সর্বোত্তম জ্ঞান হলো যার মূল আত্মস্থ করা হয়েছে আর শাখা-প্রশাখা স্মরণ রাখা হয়েছে।’
এরপর সুলাইমান তালিবুল ইলমের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, ‘কীভাবে একজন তালিবুল ইলম মূলকে আত্মস্থ করবে?’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, এ প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিতভাবে দিতে হবে। তিনি কেবল ইলম অর্জনের একটি উপায় দেখিয়ে দিলেন, যা অতীত-বর্তমানের সকল আলিম অনুসরণ করেন। যে এই পথ অনুসরণ করে, সে-ই সুমিষ্ট ফল লাভ করে। কিন্তু সেটা অর্জনের বিষয়টা নির্ভর করে তালিবুল ইলমের দৃঢ়তা আর এক বইয়ে বারবার নজর দেওয়ার মানসিকতার ওপর। ফসল কাটার মৌসুম পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে পারবে কে? সে পদ্ধতিটা হলো যেকোনো কিছুর সারসংক্ষেপ করে নেওয়া।
তারপর তিনি জানালেন, এটা ইমাম যাহাবির পদ্ধতি। কত বইয়ের যে তিনি সংক্ষেপণ করেছেন! এমনকি মক্কার ঐতিহাসিক তাকিউদ্দিন ফাসি তার ব্যাপারে বলেছেন, ‘তিনি অন্য কারো যে বই পেয়েছেন, অমনি সেটা সংক্ষিপ্ত করে কিছু সংযুক্তি এনে দিয়েছেন এবং নিজের মতো বাছাই করেছেন।
ইমাম যাহাবি কখনো আমাদের মতো বিভিন্ন বইয়ে দুয়েকবার চোখ বুলিয়ে এরপর নতুন কোনো বই হাতে নিতেন না; বরং এক বই-ই বারবার পড়তেন।
যাহাবি রাহিমাহুল্লাহর মতো ছিলেন আল-লিসান প্রণেতা ইবনু মানযুর। তার ব্যাপারে সাফাদি বলেন, আমার জানামতে সাহিত্যের এমন কোনো বড় গ্রন্থ নেই যা থেকে তিনি নির্যাস বের করেননি।’
আমি তালিবুল ইলমদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জ্ঞানের মূলনীতি ও নিয়মকানুনের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতিটি বিষয়ের বিশেষায়িত জ্ঞানের কিছু নিয়মনীতি আছে যেগুলো পড়া, মুখস্থ করা, আত্মস্থ আর পুনরাবৃত্তি করার কাজে সময় দেওয়া অতীব জরুরি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00