📄 ইতিহাসের সোনালি পাতা
ইতিহাসের সোনালি পাতাগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে মনোযোগের মাধ্যমে জীবন গড়া যায়। মনোযোগ ঠিক রেখে এক পর্যায়ে সফলতায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়। একাগ্রতার মাধ্যমে স্বপ্নপূরণ করতে তারাই সক্ষম হয়েছে যারা দিনে দিনে আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে।
আবু বকর সিজিস্তানির জীবন থেকে নেওয়া—তিনি বলেন, আমি এক দিরহাম হাতে নিয়ে কুফা নগরীতে প্রবেশ করলাম। সেটা দিয়ে ৩০ মুদ্দ[১] পরিমাণ শিমের বিচি কিনলাম। এরপর থেকে আমি আবু সাঈদ আল-আশাজ্জ থেকে হাদিস লিখতাম আর শিমের বিচি খেতাম। ঐ ৩০ মুদ্দ শিমের বিচি যখন শেষ হলো, তখন আমার ৩০ হাজার হাদিস লেখা হয়ে গিয়েছে।[২]
ইবনু আবি হাতিম আর-রাযি তার আল-জারহ ওয়াত-তা‘দিল গ্রন্থের শুরুতে বলেন, বাবাকে বলতে শুনেছি, প্রথম যখন আমি হাদিস অন্বেষণে বের হই, তখন ৭ বছর ভ্রমণ করেছি। পায়ে হেঁটে হাজার ‘ফারসাখ[১]’ অতিক্রম করেছি যতদূর হিসেব করে বুঝি।[২]
এ কথা লেখার পর ইমাম যাহাবি বলেন, ‘দৃঢ়তার সাথে পথ চললে প্রায় চার মাসের পথ।’ ইবনু আবু হাতিম বলেন, ‘তারপর আমি হিসেব করা ছেড়ে দিই। বাহরাইন থেকে হেঁটেই মিশরে যাই। সেখান থেকে রামলা, দামেস্ক, এন্টিক, তারতুস, হিমস, রাক্কা এবং ইরাকে যাই। এসব শহরে আমি প্রথম যখন যাই তখন আমার বয়স ২০ বছর।[৩]
আবুল আব্বাস আস-সালাব বলেন, আমি গত ৫০ বছরে ইবরাহিম হারবিকে ভাষা বা নাহুর কোনো মজলিসে অনুপস্থিত দেখিনি।[৪]
আবু মাসউদ আব্দুর রহিম আল-হাজি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু তাহিরকে বলতে শুনেছি, হাদিসের অন্বেষণে আমি পথে দুবার রক্তপেশাব করেছি। এক বার বাগদাদে, আরেক বার মক্কায়। আমি গরমের মাঝে খালি পায়ে হাঁটতাম, তাই আমার এমন পরিণতি হয়েছিল। হাদিস অন্বেষণে কখনো আমি কোনো বাহনে চড়িনি। আমার সব বই বহন করতাম পিঠে।[৫]
জাহিযের জীবনী লিখতে গিয়ে যাহাবি বলেন, তিনি ছিলেন জ্ঞান-সমুদ্র। তার রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। তিনি হাতে যে বই পেতেন তা-ই পড়ে শেষ করে ফেলতেন। এমনকি তিনি বইয়ের দোকানে রাতে থাকার জন্য দোকানিকে ভাড়া দিতেন। মুখস্থশক্তিতে একজন অতুলনীয় মানুষ ছিলেন তিনি।[৬]
মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-বুখারি বলেন, আমি একরাতে মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাইল আল-বুখারির বাড়িতে ছিলাম। রাতের বেলা একটু পরপর তার কিছু একটা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আর তখন তিনি বিছানা থেকে বারবার উঠে গিয়ে বাতি জ্বালিয়ে সেগুলো লিখে রাখছিলেন। আমি গুণে দেখি, সেই রাতে তিনি মোট ১৮ বার এমনটা করেন।[১]
খতিব বাগদাদি বলেন, ভাষাবিদ আলি ইবনু উবাইদিল্লাহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু জারির বিগত ৪০ বছর ধরে প্রতিদিন ৪০টি কাগজ[২] লিখে আসছেন।[৩]
মহান ব্যক্তিদের ঘটনা এমনই, আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের চেষ্টা সফল হয়েছে। এই একাগ্রতার গল্প মাথায় রেখে কোনো মানুষ যদি তার চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা থেকে দীর্ঘ বছর পিছপা না হয়, তবে সে একজন প্রত্যয়ী হিসেবে বিবেচ্য। সে নিজের স্বপ্ন পূরণে সক্ষম এবং এরই সূত্র ধরে লক্ষ্যে পৌঁছায়, গড়ে তোলে তার মর্যাদার প্রাসাদ।
যদি ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে বদ্ধপরিকর হন, তাহলে আপনার কাজ হলো নিজের চিন্তায় মনকে পুষ্ট করা, প্রকল্পের সফলতার কথা ভাবা এবং যে কাজে অগ্রসর হচ্ছেন তা আঁকড়ে ধরা। এই পরিকল্পনা দিয়ে আপনার জীবনকে গড়ে তুলুন, জীবনের গল্প লিখুন।
চিন্তার খোরাক
কিছু তালিবুল ইলম আছে যারা ৫ বছরে এমন কিছু করে দেখাতে পারে, যা অন্যরা ৫০ বছরেও অর্জন করতে পারে না। আর তা করা সম্ভব হয় কেবল মনোযোগ, ব্যবস্থাপনা আর ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই।[৪]
টিকাঃ
[১] একটি নির্দিষ্ট আকারের পাত্রের পরিমাণকে মুদ্দ বলা হয়। কাপ বা মগ-জাতীয়। আর আনুমানিক পরিমাণ হলো দুই হাত মোনাজাতের মতো একত্র করে তাতে যতটুকু ফসল নেওয়া যায়।
[২] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খন্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২২৩
[১] ফারসাখ বলতে তিন মাইল বোঝানো হয়।
[২] আল-জারহ আত-তাদিল, খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৫৯
[৩] প্রাগুক্ত
[৪] তারিখু বাগদাদ, খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৩৩
[৫] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৩৬৩
[৬] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড : ৯; পৃষ্ঠা: ৪১৩
[১] তারিখু বাগদাদ, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩২২
[২] তখনকার সময় কাগজ বলতে পৃষ্ঠা বা চ্যাপ্টার বোঝানো হতো।
[৩] তারিখ বাগদাদ, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৪৮
[৪] আব্দুল কারিম আল-খুদাই রাহিমাহুল্লাহর বাণী।
📄 ভিনদেশি মানুষের সফল জীবন
অনেক সময় মহান অর্জন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা শত কষ্ট নিয়ে ভাবার সময় হয় না। এই যে মহান অর্জন, এটার মাত্রা যেমনই হোক, দিনশেষে এটা কোনো একটা অভ্যাসেরই ফল। কালক্রমে বাস্তবতায় রূপ নিতে পেরেছে সেটা।
আপনি যদি জাপানি তাকিও ওশাহেরার জীবনী পড়েন, তাহলে বুঝতে পারবেন কীভাবে মনোযোগ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপান এক সময় অটোমেটেড মেশিন বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র শিল্পে উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তা শেখার জন্য জাপান সরকার একজনকে নির্বাচিত করে। জাপানের শাসক তাকে জার্মানিতে পাঠায়, যাতে সে ঐ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে নিজ দেশে ফিরে আসতে পারে। সে জার্মানিতে গিয়ে টানা ১৮ বছর কাজ শেখে। অবশেষে সে যখন ফিরে আসে তখন সমস্ত চিন্তা তার মাথায় গেঁথে গেছে। সে নিজ দেশে ফিরে তা বাস্তবায়ন করে দেখায়। যখন জাপানের রাষ্ট্রপতি এসে দেখতে পেলেন অটোমেটেড মেশিন চলছে, তখন তাকিও ওশাহেরা বাড়ি ফিরে গেলেন। তিনি বলেন, ‘বাসায় গিয়ে আমি ১০ ঘণ্টা ঘুমালাম। গত ১৮ বছরে এটাই ছিল আমার প্রথম একটানা ১০ ঘণ্টা ঘুম।’
এই ঘটনাটা মাথায় গেঁথে নিন। সময় বের করে চিন্তা করে দেখুন। দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে না রাখলে চিন্তা পরিপক্ব হয় না। সময় ব্যয় না করলে সফল হওয়া যায় না।
কেবল অবসর সময়কে ব্যয় করলে চিন্তা পরিপক্ক হবে, পরিকল্পনা সফল হবে, যুগান্তকারী লক্ষ্য পূরণ হবে—এমনটা আশা কখনো করবেন না। কক্ষনো না! আপনাকে বিশ্বাস রাখতে হবে, দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম, ঠান্ডা-গরম, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, প্রবাস-নিবাস, ভালো-খারাপ সব সময়ে আপনি মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন। যদি এভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেন, তবেই আপনার হৃদয় থেকে অনুভূতি আহরণ করে আপনার চিন্তারাও জীবন্ত হয়ে উঠবে।
জাপানি সেই অগ্রদূত তার জীবনের ১৮টি বছর একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনেই ব্যয় করেছেন। তার অবর্ণনীয় পরিশ্রমের ফলেই জাপান শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে বহুদূর এগিয়ে গেছে। ইউরোপ যখন শিল্পায়নের মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছে, তখন জাপানও তাদের থেকে শিখে নিয়ে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজও তার সুফল ভোগ করে চলেছে জাপান।
১৯৯৮ সালে একই কাজ করেছিল নিঃস্ব হতে যাওয়া অ্যাপল কোম্পানি। দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল তারা, কোম্পানি বন্ধ করে দিতে হবে তিন মাসের মাঝে। তখন পরিচালনা পরিষদের সবাই মিটিংয়ে বসল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, ১৯৯২ সালে কোম্পানি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া স্টিভ জবসকে আবার ফিরিয়ে আনবে। স্টিভ জবস এসে পরিচালনা কমিটির সবাইকে উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি লিখলেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘পরিচালনা কমিটির সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। নতুবা পরদিন আমার পদত্যাগ পত্র পেয়ে যাবেন।’ তারপর বেরিয়ে গেলেন তিনি। বাধ্য হয়ে পরিচালনা কমিটির সবাই পদত্যাগ করে। লোকটাকে তারা সংকটপূর্ণ অবস্থায় রেখে যায়; যেখান থেকে বের হওয়ার উপায় তার ছিল না।
স্টিভ জবস ফিরে এলেন তার কোম্পানিতে। সেখানে তখন প্রায় কোম্পানিতে দুইশটি পণ্য উৎপন্ন করা হতো। স্টিভ জবস মাত্র চারটা রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিলেন যাতে পরিমাণের চেয়ে উন্নত মানের বিষয়টা নিশ্চিত করা যায়। অর্থাৎ, Quality over quantity.
কোম্পানিতে দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরের মাথায় তিনি ঐ কোম্পানির সব উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিকে জড়ো করেন। তাদেরকে আগামী এক বছরের জন্য নতুন কোনো পণ্য উৎপাদন করার কথা ভাবতে বলেন। দশজনের চিন্তা জমা হয়। তিনি কাগজে সেগুলো লিখে ফেলেন। তারপর সাতটা নাম কেটে দিয়ে বলেন, ‘অ্যাপল কোম্পানি মাত্র তিনটার দিকে মনোযোগ দেবে।’
এক লেখক স্টিভ জবসের জীবনী লিখলেন। এতে তিনি স্টিভের সফলতার পেছনে পাঁচটি কারণ নির্ণয় করলেন। সেই তালিকার শীর্ষে ছিল মনোযোগ। একাগ্রতা ধরে রাখার মাধ্যমে দেউলিয়া হতে বসা একটা কোম্পানিকে তিনি এমন একটা কোম্পানিতে পরিণত করেন যে, সেটার বাজেট বেশ কয়েকটা দেশের বাজেটকে ছাড়িয়ে গিয়েছে! দুইশো পণ্যকে কমিয়ে মাত্র তিনটি পণ্যে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত থেকে এটাই প্রমাণিত হয়, মনোযোগ আমাদের জীবন গড়তে পারে।
📄 কেমন হতে পারে আপনার অনুশীলন
চিন্তার খোরাক
আপনি যদি সব কিছুই পেতে চান, আর সব কাজের সময় দিতে থাকেন; তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনি কোনো কাজই শেষ করতে পারবেন না। কীভাবে চিন্তা, পরিকল্পনা বাছাই করবেন; কোনো কিছু কীভাবে সম্পাদন করবেন তা নির্ধারণ করুন। তারপর সেটার পেছনে আপনার শক্তি-দক্ষতা-সক্ষমতা-সময়কে ব্যয় করুন। কোনো একদিন আপনার রচিত সফলতা, অর্জন আর অগ্রগতির গল্প শোনার অপেক্ষায় থাকলাম...
একবার মক্কায় জামিউর রাজিহিতে বেড়াতে গেলাম। এক তলা থেকে আরেক তলায় যাওয়ার পথে সেখানকার কার্যক্রম সম্পর্কে শুনতে লাগলাম। হঠাৎ কুরআন হিফয করার একটা হালাকার কথা কানে এলো, সেখানে মাত্র ৬০ জন ছাত্র। অথচ জামিউর রাজিহির ছাত্রসংখ্যা ছয়শোরও বেশি। এখানে কমসংখ্যক ছাত্র ভর্তি করানো হয় যেন তারা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। অধিকাংশ ছাত্রের একঘেঁয়েমি চলে এলে তারা আর চালিয়ে যেতে পারে না।
মনোযোগের অভ্যাস গড়ে তোলার একটা উপায় এমন যে, একজন ছাত্র প্রতিটি আয়াত চল্লিশবার নির্ভুলভাবে পড়ে। তারপর উস্তাযকে সেটা শোনায়। এভাবে করতে করতে এক সময় ছাত্র পুরো কুরআন মুখস্থ করে ফেলতে সক্ষম হয়। হিফয শেষ করার পর যখন সে কুরআন উপস্থাপন করে তখন একটি হরফও ভুল হয় না তার।
সে সময়টাতে শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন না। আমি তার মোবাইলটা হাতে নিয়ে এ পদ্ধতির ফলাফল কেমন জানতে চাইলাম। সে জানাল, এই পদ্ধতি অনুসরণ করে একজন বয়স্ক মানুষও হিফয শেষ করেছে এ সপ্তাহে। একাধিক মজলিসে কুরআন শোনাতে তার কোনো ভুল হয়নি।
আমি নিজেও এটা যাচাই করে ফল পেয়েছি। যে সুরাগুলো আমি এভাবে বারবার পড়েছি, সেগুলো জাহরি সালাতে[১] মুসল্লিদের নিয়ে পড়তে গিয়ে আমি কোনো ভুল করিনি। কিন্তু যেগুলো এ পদ্ধতিতে মুখস্থ করিনি, সেসবে আমার অগণিত ভুল হয়।
ইউটিউবে চোখে পড়ে খেলোয়াড়রা পায়ে লম্বা সময় ফুটবল ধরে রাখছে; এক মূহূর্তের জন্যও সেটা পড়ে যাচ্ছে না পা থেকে। বল নিয়ে খেলতে খেলতে রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছে, থামার প্রয়োজন হচ্ছে না। তার যেমন থামানোর প্রয়োজন পড়ে না, তেমন পা থেকেও পড়ে যায় না। এমনকি পা দিয়ে লাথি দিয়ে সে একবারেই গোল দিয়ে দিচ্ছে। কখনো পা থেকে সেটা জালে গিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে। কখনো আবার দেওয়াল বরাবর বলে লাথি মারছে এবং সেটা দেওয়ালে লেগে সরাসরি জালে ঢুকে যাচ্ছে। আবার দুইটা বল নিয়ে একটা আকাশে ছুড়ে মারছে। তারপর অন্যটা লাথি মেরে প্রথম বলে লাগাচ্ছে। এ জন্য বারবার চেষ্টাও করতে হচ্ছে না। এমন ভিডিও দেখেছি, বহু দূর থেকে লাথি মেরেও ফুটবলকে জালে জড়াতে পারছে। যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘কীভাবে সে এত দক্ষ হলো?’ তাহলে উত্তর আসবে, ‘একাগ্রতা।’ সে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে, অনুশীলন করেছে; যতদিন আয়ত্ত করতে না পেরেছে সংগ্রাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এরপর একদিন সে এটা অর্জন করেও নিতে পেরেছে।
টিকাঃ
[১] যেসব সালাতে কিরাআত উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হয়।
📄 আরও কিছু বিস্ময়কর উদাহরণ
যে মানুষগুলো ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে, জীবন গড়তে সক্ষম হয়েছে কিংবা ইতিহাস গড়তে পেরেছে; তাদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, একাগ্রতাই ছিল তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি। তারা যা কিছু করতে পেরেছে, যে বিষয়গুলো রেখে যেতে পেরেছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য; সেগুলোর পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে এই মনোযোগ।
উদাহরণ হিসেবে ইমাম ইবনু কুদামা রাহিমাহুল্লাহর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দীর্ঘ দিন তিনি ফিকহের ইমাম ছিলেন। উম্মাহর জন্য ফিকহের সমৃদ্ধ এক ভাণ্ডার রেখে গেছেন, যা থেকে আজও সকলে গ্রহণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত।
হাদিসের ক্ষেত্রে শাইখ আলবানি রাহিমাহুল্লাহর অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। মুসলিমদের দরসে, বিভিন্ন আলোচনায় তার নাম বহুবার উচ্চারিত হয়, এটা সবাই স্বীকার করবে। ‘শাইখ আলবানি সহিহ বলেছেন’, ‘শাইখ আলবানি হাসান বলেছেন’, ‘শাইখ আলবানি দুর্বল বলেছেন’—অহরহ এসব শুনতে পাওয়া যায়। আর তার এ সব অর্জনই মনোযোগের ফসল। তিনি একটি কাজেই নিজের পুরোটা সময়টা ব্যয় করেছেন। তাই ফিকহের ওপর তার আলাদা কোনো বই আপনি দেখবেন না। যদিও তার মতামত নিয়ে আলাদা জ্ঞানগর্ভ গবেষণাপত্র বের হয়েছে। কিন্তু তিনি যে কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন, যে শাস্ত্রের কারণে বিখ্যাত হয়েছেন, যার পেছনে জীবনটা দিয়ে দিয়েছেন, তা হচ্ছে হাদিস। তাই দেখতে পাবেন, মুসলিমরা আজও তার ব্যাপারে আলোচনা করছে, তার সম্পর্কে জানাশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আপনি যদি কোনো সফল ব্যবসায়ী দেখেন, তাহলে ধরে নেবেন, তিনি তার সারাটা জীবন টাকার পেছনে ছুটে সেটার লাগাম ধরে নিজের আঙিনায় আনতে পেরেছেন। সুলাইমান আর-রাজিহি হাফিযাহুল্লাহর জীবনীটা দেখুন। ইন্টারনেটেই বিস্তারিত পাওয়া যাবে। ছেলেবেলা থেকে ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত একটানা এক বিষয়ে মনোযোগ ধরে রেখেছিলেন তিনি। কখনো নিজের পরিকল্পনা থেকে একচুল পিছপা হননি। কখনো স্বপ্নের চিন্তা ছেড়ে দেননি। আমি যখন এই বাক্যটি লিখছি, তখনও তার মনোযোগ অক্ষুণ্ণ। এই স্থিতির মাধ্যমে তিনি নিজের এবং জাতির আশাকে সামনের দিকে ঠেলে দিতে পেরেছেন।
যিনি ডাক্তারির কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হন, তিনি বহু বছর সেটা চালিয়ে যান। এক মুহূর্তও দমে যান না। এর মাধ্যমে তিনি বহু মানুষের উপকার করতে সক্ষম হন।
যে প্রকৌশলী তার পেশাগত কাজকর্মে আনন্দ খুঁজে পায়, সে কতশত রাত যে কেবল আঁকিবুকি আর নকশার মাঝে কাটিয়েছে তা সে নিজেও জানে না। অথচ এ সময়গুলোতে তার বন্ধুরা আনন্দ-ফুর্তি আর খেল-তামাশায় কাটিয়ে দিয়েছে।
ফারা বলেন, কিসায়ি[১] নাহু শিখেছেন বড় হওয়ার পর। কিসায়ি কে সেটা নিশ্চয় আপনি জানেন!
আবু বকর আব্দুল্লাহ ইবনু আহমদ আল-মারওয়াযি। তার অপর নাম ‘আল-কাফ্ফাল’। তার জীবনী লিখতে গিয়ে ইমাম যাহাবি বলেন, ‘তিনি তালা বানানোর কাজে বেশ দক্ষ ছিলেন। জীবনের ৩০টি বসন্ত কেটে যাবার পর তিনি নিজের মাঝে বুদ্ধিমত্তার ছাপ দেখতে পান। ফিকহকে ভালোবেসে ফিকহে পারদর্শিতার কাজে অগ্রসর হন। এক পর্যায়ে তাতে এত বেশি পারদর্শিতা অর্জন করেন যে, বর্তমানে তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ফকিহ নাসির আল-উমরি বলেন, আবু বকর আল-কাফ্ফালের যুগে তার থেকে বড় ফকিহ আর কেউ ছিল না। তার পরেও তার মতো ফকিহ আসেনি। আমরা বলতাম, তিনি মানুষরূপী ফেরেশতা। তিনি কথা বললে লেখক তা লিখে রাখত। ফিকহের একজন স্তম্ভ এবং যুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতায় একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।
ভেবে দেখুন, আবু বকর আল-কাফফাল ফিকহ শিখেছেন ত্রিশে গিয়ে। এর আগে তিনি পেশায় একজন তালাচাবির কারিগর ছিলেন। আর তাতেই অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। নতুন করে একটা জ্ঞানশাস্ত্রে যখন প্রবেশ করেছেন, তখন শুরুতে কিছুই জানতেন না। কিন্তু পরিশেষে তিনি হয়ে গেলেন সেই ইলমের একজন সর্দার, এক আদর্শ। মানুষের জীবন এমনই!
টিকাঃ
[১] তিনি একজন বিখ্যাত আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদ। সেই সাথে সাত কিরাআতের একজন প্রসিদ্ধ ইমাম। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯ হিজরিতে।