📄 দায়িত্ব নিতে শিখুন
কোনো চিন্তায় এককভাবে নিবিষ্ট হওয়া দ্রুত ফলাফল বয়ে আনে। একটা মাত্র পরিকল্পনায় নিবদ্ধ হলে প্রতিদিন আপনার স্বপ্নের সীমানা একটু একটু করে কমতে থাকে, সাফল্যের রেখা একটু একটু করে কাছে আসতে থাকে। দিনশেষে আপনি হয়ে উঠবেন গল্পের নায়ক।
আপনাকে আহ্বান করছি! ঘুম থেকে উঠলে আপনার লক্ষ্য যেন হয় কেবল আপনার পরিকল্পনা, আপনার গল্পের প্লট নির্মাণ। নিরন্তর পা চালান, পথটা সুগম করুন। স্বপ্নের দিকে ছুটে চলুন। আশপাশের সবকটা পথ ছেড়ে দিন, সেগুলো দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন। যে পথে চলেছেন, সেই ঊষর মরুময় পথ কালের আবর্তে বসন্তে পরিণত হবে। আপনি যে মানুষগুলোকে দূর থেকে এতদিন দেখে চলেছেন, একদিন তাদের কাছাকাছি যেতে পারবেন; লক্ষ্যে পৌঁছানোর কারণে তারা আপনাকে স্বীকৃতি দেবে, যদিও তাদের স্বীকৃতি পেতে আপনি কোনো কাজ করেননি।
একেই বলে আগ্রহ-উদ্দীপনার টান। দুনিয়ার যত বাধা-বিপত্তি আসুক, কখনো আপনি এটা ছেড়ে যাবেন না।
পানি আমাদের শেখায় কীভাবে ফোঁটা ফোঁটা করে পতিত হয়েও একটা শক্ত পাথরের বুকে গর্ত করা যায়। দিন যতই গড়িয়ে যাক, আমরা যেন নির্দিষ্ট স্থানে ফোঁটার মতো করে পতিত হওয়া বন্ধ না করি। তাই কখনো বিক্ষিপ্ত হবেন না।
আপনি যখন নিজের পরিকল্পনায় অগ্রসর হবেন, লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে শিখবেন, সেটার জন্য প্রচেষ্টা চালাবেন, পথ ছেড়ে যাবেন না; তখন কোনো একদিন সারাবিশ্ব আপনাকে ঘিরে বসবে আপনার অভিনব অর্জনের কাহিনি শোনার জন্য, যদিও বা তাদের অবাক করা আপনার উদ্দেশ্য ছিল না। তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করবে, ‘কীভাবে আপনি পাহাড়ে উঠলেন? কীভাবে এত পথ পাড়ি দিলেন? কীভাবে নিজেকে এতদূর নিয়ে যেতে পারলেন যেখানে যাওয়ার আগে বহু লোক হতাশ হয়ে মারা পড়ে?’
আমাদের যুগে জীবনের একটা আরাধ্য বিষয় হলো একাগ্রতা ধরে রাখা। বিক্ষিপ্ততার এ ঘোর অন্ধকারে সফলতার মশাল হলো মনোযোগ। দিনশেষে মানুষ জীবনের মিনার হিসেবে যে জিনিসটাকে নিতে পারে সেটা হলো মনঃসংযোগ। আপনি যদি অন্যদের জন্য আদর্শ হতে চান, সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে চান; তাহলে বাকি জীবনটা ‘মনোযোগ’ তৈরিতে কাটিয়ে দিন।
চিন্তার খোরাক
সিবাওয়াই ছিলেন আরবি ব্যকরণশাস্ত্রের ইমাম। ইবনুল মুকাফফা বক্তৃতার সর্দার। আবু তাম্মাম কবিদের রাজা। তারা সবাই ৩৬ বছরের আগে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু আজও তাদের স্মৃতি অমলিন। তারা তাদের লক্ষ্য জীবনের শুরুতেই নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন, তাই অল্প বয়সে সেটার জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
অভিনবত্ব বা বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার অর্থ হলো আপনিই হবেন পতাকাবাহী কিংবা আলোকবর্তিকা বহনকারী।
📄 সঙ্গদোষে লোহা ভাসে
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাটা বেশ চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করে বলেছেন—
‘উত্তম সঙ্গী ও খারাপ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর-বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁ দানকারী ব্যক্তির মতো। আতর-বিক্রেতা তোমাকে সুগন্ধি লাগিয়ে দেবে কিংবা তার পোশাক থেকে তুমি সুগন্ধ পাবে, নতুবা তার থেকে আতর কিনতে হবে। অন্যদিকে হাপরে ফুঁ দানকারী হয় তোমার পোশাক পুড়িয়ে ফেলবে অথবা তুমি তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে।’
যে বন্ধু সফল হতে সাহায্য করে, চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে নিয়ে যায়, মনে উৎসাহ জোগায়; তাকেই তো আপনি বাছাই করবেন।
আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু যে এতটা প্রশংসিত হতে পেরেছিলেন, সাহাবিদের মাঝে শ্রেষ্ঠ হয়েছিলেন, তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যের বদৌলতেই। তার সঙ্গ গ্রহণ করে অবশেষে জান্নাতের আটটি দরজাই তার জন্য খুলে গিয়েছিল।
আবু তালিব যে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে ছিলেন, সেটাও কেবল সঙ্গীদের প্রভাবেই হয়েছিল।
মনোযোগ আনতে হলে, অভ্যাসটা নিজের মাঝে ধারণ করতে হলে, এমন এক সঙ্গী বাছাই করতে হবে যিনি সুচিন্তাকে জাগ্রত করে দুশ্চিন্তা দূর করেন। যিনি বন্ধুকে ঠেলে দেন কর্মমুখর জীবনের দিকে। যার সাথে পৌঁছানো যায় পথের শেষ প্রান্তে। সাবধান! অকর্মণ্যদের সঙ্গ গ্রহণে বিস্তর ঝুঁকি রয়েছে। তাদের কোনো লক্ষ্য থাকে না। তারা পথেই নিজেদের যোগ্যতাকে বিনষ্ট করে আর দুনিয়ার খেল-তামাশায় মগ্ন হয়ে পড়ে।
সাংবাদিক মুহাম্মাদ হাতহুত একটি ঘটনা বর্ণনা করেন—
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের স্কোর খুব কম ছিল। এক পর্যায়ে সে বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনাকে চিরতরে বিদায় জানায়। পরে আমেরিকায় একটা স্কলারশিপ পায়। সেখানেও সে একই ভুল করে বসে। পড়ালেখা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়বার ভুল করার পর একবুক হতাশা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে আসে। তার ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার এটা সে নিশ্চিত হয়ে যায়। তবু সে কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে। সেখানে চান্সও পেয়ে যায়। তখন সে আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে, ‘এটা আমার শেষ সুযোগ, মনে হচ্ছে এবারও আমি ব্যর্থ হব। আপনি প্লিজ আমাকে এমন কোনো উপায় বলে দিন, যার মাধ্যমে আমি হোঁচট খাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারব। অতীতের সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাব।’
আমি তাকে বললাম, ‘আমি তোমাকে বেশি উপদেশ দিয়ে চাপে ফেলব না। কেবল একটি পথ বাতলে দেবো যা অনুসরণ করলে তোমার কষ্টও হবে না, সময়ও ব্যয় হবে না। কিন্তু তুমি তোমার লক্ষ্যে ঠিকই পৌঁছে যেতে পারবে।’ এ বিষয়ে তাকে প্রতিজ্ঞাও করালাম। তারপর বললাম, ‘যে বুদ্ধিটা দেবো সেটা খুবই সাধারণ। নতুন কোনো কিছু না। কিন্তু নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। কাজটা হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি কেবল মেধাবী ছাত্রদের সাথেই চলবে। খাঁটি বাংলায় যাদেরকে আমরা আঁতেল বলে থাকি, তুমি তাদের সাথে চলাফেরা করবে। ক্লাসের ফাঁকে, খেলাধুলা, ঘোরাঘুরি, আড্ডা দেওয়া, চা-কফি খেতে গিয়ে সবসময় তাদের সাথেই সময় কাটাবে।’
সেও জানাল, ‘আমি কথা দিচ্ছি, আপনার এই পরামর্শ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’
প্রায় এক বছর পর সে আমায় আবার ফোন দিলো। আমি তার পড়াশোনার খবর জানতে চাইলে সে ফার্স্ট ইয়ারে তার জিপিএ এসেছে ৪.৯০। সাথে পছন্দমতো বিভাগ বেছে নিতে পেরেছে এবং যে সাবজেক্টে ইচ্ছা পড়তে পারছে। আমার প্রতি সে কৃতজ্ঞতা জানাল।