📄 মোক্ষম সময়
জীবনে সফল হতে নিজেকে আদ্যোপান্ত জানতে হবে। নিজের সুবিধা-অসুবিধা, আগ্রহ, মনোযোগ—এসবের প্রতি নজর দিলে সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো অনেক সহজ হয়ে যাবে। আসলে সাফল্য ও ব্যর্থতার মাঝে পার্থক্য গড়ে দেয় আমাদের মেধা, শ্রম আর সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার।
আমরা প্রত্যেকে চাই আমাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে জানতে। আমাদের কেউ রাত জেগে কাজ করতে পছন্দ করে। কেউ আবার রাতে ঘুমিয়ে ভোরবেলায় কাজ শুরু করতে ভালোবাসে। কেউ নিজের চিন্তা ও পরিকল্পনাকে জাগ্রত রাখতে পারে। কেউ আবার একটা কাজ বেশিক্ষণ করতে পারে না। বহু রকমের মানুষ আছে এই দুনিয়ায়। তবে আমাদের প্রত্যেকেরই একটা পিক আওয়ার থাকে, ভালো লাগার একটা সময়সীমা থাকে, যে সময়গুলোতে আমরা বেশ সতেজ আর প্রফুল্ল থাকি; নিজের মাঝে অপরিমেয় শক্তি আর প্রাণচাঞ্চল্যের স্ফুরণ দেখতে পাই। অন্য সময় হয়তো আমরা তেমন একটা চাঞ্চল্য অনুভব করি না। তাই আমাদের উচিত এই সময়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা যেন নিজের পরিকল্পনা আর চিন্তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেগুলো ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়।
দিনের কোন সময়টা আপনার জন্য মোক্ষম সময়, তা জানতে পারাটা পরিকল্পনা ও লক্ষ্যপূরণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ আপনি যখন মোক্ষম সময়টা জানবেন, তখন ঐ সময়টুকুতে নিজের সবটুকু শ্রম আর মনোযোগ ঢেলে দিন। যে মানুষটা নিজের পিক আওয়ার কোনটা তা-ই জানে না, তার জন্য লক্ষ্যে পৌঁছনো বেশ কঠিন। ঐ সময়টা তাকে সবচেয়ে সহজ পথ ধরে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।
আমাদের কারো পিক আওয়ার তথা মোক্ষম সময় ফজর থেকে যুহর পর্যন্ত সময়টা। এই সময়ে তারা বেশ সতেজ অনুভব করে, একাগ্র থাকে কাজের প্রতি। আরেকজন এই সময়টাতে কিছুই করতে পারে না। ঘুমিয়ে কাটাতে পছন্দ করে অথবা অপ্রয়োজনীয় কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মাথাটা কাজে লাগাতে পারে না কোনোভাবে। আমাদের কারো কারো পিক আওয়ার শুরু হয় যুহরের পর থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত। আবার কারো অন্য কোনো সময়। এভাবে মানুষ যদি নিজের পিক আওয়ারটা নির্ণয় করতে পারে, তাহলে তার লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করতে সমর্থ হবে। তারপর তার চিন্তা, অনুভূতি ও শক্তি বিনিয়োগ করতে পারবে, লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
একজন মানুষ তার মোক্ষম সময়ে অন্যসব কাজ করা থেকে বিরত থাকবে, এটাই বুদ্ধিমত্তার দাবি। দৈনন্দিন কাজকর্ম এই সময়ের জন্য না। সবার সাথে আলাপচারিতা, দেখা-সাক্ষাৎ, সামাজিকতা—এই কাজগুলো এ সময়ের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। যেকোনো বাধা-বিপত্তি বা বিক্ষিপ্ততাকে এই সময় থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে যেন একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়।
📄 বিশ্রাম সাফল্যের সোপান
মানুষজন যুগ যুগ ধরে ‘অতিরিক্ত পরিশ্রম’-এর নীতি অবলম্বন করে এসেছে। অর্থাৎ আপনি যত কায়িক পরিশ্রম বাড়াবেন, তত বেশি সফলতা অর্জন করবেন। এ বিষয়টা যদিও গুরুত্বের দাবিদার, তবু আগের মতো এর কার্যকারিতা এখন আর নেই। অর্থাৎ, কায়িক শ্রম বেশি দিলেই যে আপনার প্রোডাক্টিভিটি বাড়বে, এমন নয়। কঠোর পরিশ্রম যেমন জরুরি, তেমনি নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়াটাও অপরিহার্য। মাত্রাতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম আপনার সফলতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এই সাফল্য এক সময় কোয়ালিটি বা গুণগত মানকে ছাড়িয়ে কোয়ান্টিটি বা পরিমাণের দিকে ঝুঁকে যাবে। আর সেই পরিমাণটা আসবে ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা কতটুকু ধারালো আর কতটুকু ভোঁতা তার ওপর ভিত্তি করে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে সেটা এত দুর্বল হয়ে পড়বে যে, কাজ হবে নিষ্প্রাণ।
জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাদ দিয়ে তবেই একজন মানুষ তার লক্ষ্যের পেছনে দিনরাত শ্রম দিতে পারে। সেসব গুরুদায়িত্ব পালন করতে পরিশ্রম পরিমিত হওয়া চাই। নয়তো এক সময় সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে পাপের অনুভূতি আচ্ছন্ন করে বসবে। ফলে ব্যক্তির স্বাস্থ্য, পারিবারিক জীবন, ঈমানি শক্তি কিংবা বুদ্ধিমত্তা—সব কিছুতে ভাঙন ধরে। দিনে দিনে তার সতেজতা কমে যায়।
প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে আমরা চিন্তা আর বুদ্ধি দিয়ে যত কিছু অর্জন করতে পারি তা কায়িক পরিশ্রমের চেয়ে বহুগুণ কার্যকর। আপনি ইতঃপূর্বে ৮০/২০ নিয়মটা জেনেছেন। অর্থাৎ ২০ ভাগ কাজ করে আপনি ৮০ ভাগ অর্জন করতে পারবেন।
সাধারণত একজন মানুষের দিনে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। জীবনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত হওয়ার আগে আপনাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছি, আপনি যখন কর্মমুখর জীবনে প্রবেশ করবেন তখন যেন আপনার সামগ্রিক প্রস্তুতি থাকে। আপনি যেন তখন অভিনব সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হন। আমরা কোয়ান্টিটি চাই না, কোয়ালিটি চাই। আপনার কাছে অল্প সময় সজীব, প্রাণবন্ত ও কার্যকর উপস্থিতি চাই। আপনার জীবন থেকে বেশি সময় চাই না। আপনাকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দেওয়ার ইচ্ছা আমাদের নেই।
কুরআন-সুন্নাহ পড়লে দেখবেন এমন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মানুষ যেন নিজেকে কষ্ট না দেয়, তার প্রতি সতর্ক করা হয়েছে। সে যেন সহজ-সরল, স্বাভাবিকভাবে তার কাজকর্ম আর ইবাদত করতে পারে। দিনশেষে যাতে একঘেয়েমি তাকে পেয়ে না বসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।[১]
📄 ছুড়ে ফেলুন বিশৃঙ্খলা
একাগ্র হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী উপায় হলো বিশৃঙ্খলাকে ছুড়ে ফেলা। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যাকে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সাথে তুলনা করা যায়, যে তীরে দাঁড়িয়ে থাকলে যেকোনো সময়ে ডুবে যেতে পারেন, এজন্য সমুদ্রে নামার দরকার পড়বে না। এ সময়টাতে আপনার হৃদয় নানারকম চিন্তাভাবনায় ভরপুর হয়ে যেতে পারে। আপনি স্থির হয়ে কোনো কিছু ভাবার মতো সময়ও পাবেন না। কারণ বাস্তবে বিক্ষিপ্ততার অনেক উপকরণ চারপাশে আছে।
রাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ একবার বিশৃঙ্খলা ছুড়ে ফেলার বিষয়টাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন সাংস্কৃতিক অবগাহন। যেমন : কোনো মানুষ যদি ইতিহাস নিয়ে লিখতে চায়, তাহলে তাকে ইতিহাসের সব বই পড়তে হবে। ব্যাপক সময় নিয়ে ইতিহাসে এমন একটা ডুব দেবে যে, তার রক্তে ইতিহাস ঢুকে পড়বে। সেসব বিক্ষিপ্ততা থেকে সে মুক্তি পাবে, যেগুলো তার চিন্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। একইভাবে যে লোকটা কবিতা, গদ্য কিংবা সিরাত লিখতে ইচ্ছুক, তার উচিত আশপাশের সব কিছুর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক অবগাহন করা; যাতে তার চিন্তা ও পরিকল্পনার জন্য মনটা একনিষ্ঠ হয়। পরবর্তীতে সে তার পরিকল্পিত চিন্তায় মনোযোগ দিতে পারে।
আপনি যদি এই বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে চান, তাহলে এমন কোনো লোকের কথা কল্পনা করুন, যে কোনো চিন্তায় গভীরভাবে ডুব দিয়েছে এবং এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বাস্তব জগতে ফিরে আসার আগে সে তা শেষ করেই আসবে। কিন্তু সে লক্ষ করে সারা বিশ্বের সর্বত্র হত্যা, ভাঙচুর এবং বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন রকমের খেলাধুলা ও বিনোদনে ছেয়ে গেছে সব কিছু। এদিক-ওদিক থেকে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে তার ওপর বিভিন্ন দায়িত্ব, প্রোগ্রাম এবং কাজ এসে চেপে বসেছে। তারপরও কি তার কাছ থেকে আপনি ফলপ্রসূ কিছু আশা করতে পারেন? তার চিন্তা-ভাবনায় গভীরতা থাকবে, এটা কি নিছক দিবাস্বপ্ন নয়?
নীরবতা হিরণ্ময়—Silence is golden. আমরা যদি কার্যকরী ও ফলপ্রসূ কোনো চিন্তায় মগ্ন হতে চাই, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই নির্জনতার কাছে যেতে হবে, নীরব পরিবেশ বেছে নিতে হবে। চিন্তার ক্ষেত্রে সব রকম বিক্ষিপ্ততা থেকে মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের চিন্তা-পরিকল্পনা-ভাবনায় অভিনবত্ব এনে সম্ভাবনাময় কাজ করতে চাইলে এই পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। আমি বলছি না, মানুষজন ছেড়ে বনবাসে যেতে। বরং প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অনর্থক সময় অপচয়কারী লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই একান্তকাম্য।
📄 আজকের কাজগুলো আজই করে ফেলুন
আপনার চিন্তা-চেতনা আর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো কাজ জমিয়ে রাখা। মনোযোগ নামক অভ্যাসটিকে ধ্বংস করার সব থেকে সহজ উপায় হলো এই মুলতবি রাখার মানসিকতা।
i
আমরা প্রায়ই ভাবি, অমুক কাজটা কাল থেকে শুরু করব। এখনো হাতে অনেক সময় আছে! এই রকম চিন্তা এলেই তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। এই অভ্যাসটিকে বড় হতে দেবেন না; তা আপনি যেমন পরিস্থিতি বা সমস্যারই মুখোমুখি হোন না কেন।
যতই বাধা-বিঘ্ন আসুক না কেন, হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা রাখা যাবে না। আপনার পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করুন। আপনি দৈনিক যে প্রায়োরিটি লিস্ট ঠিক করেছেন তা থেকে একচুলও নড়বেন না। যদি অন্যকোনো কাজ একান্তই জরুরি হয়ে পড়ে এবং কোনোভাবে ঠেকানো সম্ভব না হয়, কিংবা স্থগিত রাখাও না যায়; তাহলেও কৌশলে কাজ সারতে হবে। আপনার লক্ষ্য থেকে যতখানি সম্ভব অল্প পরিমাণে হলেও কাজ করতে হবে, যাতে কোনোভাবে আপনার দিনটা একেবারে বিফলে না যায়। এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েই তো ইমাম শাওকানি বলেছেন, ‘দুয়েক লাইন হলেও লিখি।’
আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, পরিকল্পনা নিয়ে থেমে যাওয়াটা মারাত্মক ক্ষতিকর। বড় মানুষদের কাজ কখনো এমন হতে পারে না। নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাটাই সাফল্যের পূর্বশর্ত। আপনার জীবনে উন্নতির সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না, সাবধান!
আখিরাতে সফলতা অর্জনের কত সুযোগ যে এভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, আর দুনিয়ার সুযোগ তো বাদই দিলাম। কুরআনে আছে, ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা লাভের প্রয়াসে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হও।’[১] এসব কিছু ইতিবাচক কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ করে বলা, জীবনের সময়টা অনর্থক নষ্ট না করার দিকে আগ্রহী করে তোলার জন্য বলা।
বুখারিতে উকবা ইবনু হারিসের বর্ণিত হাদিসে আছে, আমি মদিনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে আসরের সালাত আদায় করলাম। সালাত শেষ হলে তিনি সালাম ফিরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এরপর মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে তার কোনো এক স্ত্রীর ঘরে চলে গেলেন। লোকজন নবিজির এমন তাড়াহুড়ো দেখে বেশ অবাক হলো। পরে তিনি ফিরে এসে সবাইকে বললেন, ‘আমার মনে পড়ল ঘরে একটি সোনা কিংবা রুপার টুকরো রয়ে গেছে। আমার ভয় হচ্ছিল, না-জানি কাল হাশরের ময়দানে এর জন্য আমার কত কঠিন হিসেব নেওয়া হবে। তাই সালাত শেষ করে তাড়াতাড়ি সেগুলো বিলিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়ে এলাম।’[২]
টিকাঃ
[১] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২১
[২] সহিহ বুখারি: ১২২১