📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 স্বপ্ন এবার সত্যি করুন

📄 স্বপ্ন এবার সত্যি করুন


অধিকাংশ ক্ষেত্রে মনোযোগ তৈরির উপায় হলো এক জায়গায় দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা। আর সেই সময়টাতে একটার বেশি কাজে জড়িয়ে পড়া অনুচিত। যেকোনো একটি কাজে নিজের মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে, শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ সরানো যাবে না। এভাবে চিন্তার একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়, বিক্ষিপ্ততা থেকে মুক্তি মেলে। সকল শক্তি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ব্যয় হয়, স্বপ্নপূরণ তখন অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ হয়।
আমার জীবনে আমি এই বিষয়টা কাজে লাগিয়েছি, বিশেষ করে বই লেখার ক্ষেত্রে। এতে এত বেশি উপকৃত হয়েছি যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমার বেশিরভাগ বই এই অভ্যাসেরই ফসল। ইবদা কিতাবাতা হায়াতিকা বইটা আমি ১০ দিনে লিখেছি। ফি যিলালিস সীরাতিন নাবাউইয়্যা বইয়ের কাজ শুরু করার পর শেষ না করা পর্যন্ত আমি কলম বন্ধ করিনি। আর রিহলাতু তাদাব্বুর-এর সাথে তো আমার সেরা স্মৃতিটুকু মিশে আছে। আমি টানা ছয় মাস কাজ করে বইটা শেষ করেছি। তার মাঝে একদিন টানা ১৩ ঘণ্টাও কাজ করেছি, মাঝে কেবল সালাত আর ঘুমের জন্যই বিরতি নিয়েছি। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমাকে সেটা পূর্ণ করার তৌফিক দিয়েছেন। কুরআনের এমন কিছু সুরাও আছে যেগুলোর তাদাব্বর[১] আমি এয়ারপোর্টে লিখেছি, প্লেনে বসে লিখেছি, এমনকি রাস্তাঘাটেও লিখেছি। আর ভূমিকাটা লিখেছি কোনো এক সফরের সময় হোটেলে বসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, এখনো আমার অধিকাংশ প্রকল্প আমি এভাবেই বাস্তবায়ন করি। অনেক সময় এমনও হয়েছে, আমি অন্য কাজগুলো করি না। এমনকি আমার লাইব্রেরি গুছাই না, বই সরাই না। যেন একদমই সময় নষ্ট করতে না হয় সে উদ্দেশ্যে বিশৃঙ্খলার মাঝে কাজের মনোযোগকে শৃঙ্খলিত করি।
কোনো মানুষ যদি কিছু করতে চায়, চেষ্টা থাকলে সে অবশ্যই তা করতে পারবে ইনশাআল্লাহ। কোনো পরিকল্পনার সাথে যদি তার হৃদয়-মন এঁটে যায়; তাহলে সে সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। সব ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

চিন্তার খোরাক
নিজের জন্য অল্প সময়ের (১৫/২০ মিনিট) একটা ভালো অভ্যাস গড়ে নিন। শুরুর একটা তারিখ ঠিক করুন। তারপর তাকে এমনভাবে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিন যাতে কোনো বাধাতেই থেমে না যায়, কোনো কিছুতেই ছুটে না যায়। প্রথম বছরের শেষে আপনার অনুশীলন ও চর্চার হাল-হাকিকত পর্যবেক্ষণ করুন, আপনি অবাক হবেন।



টিকাঃ
[১] চিন্তা-গবেষণা

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 মোক্ষম সময়

📄 মোক্ষম সময়


জীবনে সফল হতে নিজেকে আদ্যোপান্ত জানতে হবে। নিজের সুবিধা-অসুবিধা, আগ্রহ, মনোযোগ—এসবের প্রতি নজর দিলে সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো অনেক সহজ হয়ে যাবে। আসলে সাফল্য ও ব্যর্থতার মাঝে পার্থক্য গড়ে দেয় আমাদের মেধা, শ্রম আর সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার।
আমরা প্রত্যেকে চাই আমাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে জানতে। আমাদের কেউ রাত জেগে কাজ করতে পছন্দ করে। কেউ আবার রাতে ঘুমিয়ে ভোরবেলায় কাজ শুরু করতে ভালোবাসে। কেউ নিজের চিন্তা ও পরিকল্পনাকে জাগ্রত রাখতে পারে। কেউ আবার একটা কাজ বেশিক্ষণ করতে পারে না। বহু রকমের মানুষ আছে এই দুনিয়ায়। তবে আমাদের প্রত্যেকেরই একটা পিক আওয়ার থাকে, ভালো লাগার একটা সময়সীমা থাকে, যে সময়গুলোতে আমরা বেশ সতেজ আর প্রফুল্ল থাকি; নিজের মাঝে অপরিমেয় শক্তি আর প্রাণচাঞ্চল্যের স্ফুরণ দেখতে পাই। অন্য সময় হয়তো আমরা তেমন একটা চাঞ্চল্য অনুভব করি না। তাই আমাদের উচিত এই সময়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা যেন নিজের পরিকল্পনা আর চিন্তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেগুলো ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়।
দিনের কোন সময়টা আপনার জন্য মোক্ষম সময়, তা জানতে পারাটা পরিকল্পনা ও লক্ষ্যপূরণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ আপনি যখন মোক্ষম সময়টা জানবেন, তখন ঐ সময়টুকুতে নিজের সবটুকু শ্রম আর মনোযোগ ঢেলে দিন। যে মানুষটা নিজের পিক আওয়ার কোনটা তা-ই জানে না, তার জন্য লক্ষ্যে পৌঁছনো বেশ কঠিন। ঐ সময়টা তাকে সবচেয়ে সহজ পথ ধরে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।
আমাদের কারো পিক আওয়ার তথা মোক্ষম সময় ফজর থেকে যুহর পর্যন্ত সময়টা। এই সময়ে তারা বেশ সতেজ অনুভব করে, একাগ্র থাকে কাজের প্রতি। আরেকজন এই সময়টাতে কিছুই করতে পারে না। ঘুমিয়ে কাটাতে পছন্দ করে অথবা অপ্রয়োজনীয় কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মাথাটা কাজে লাগাতে পারে না কোনোভাবে। আমাদের কারো কারো পিক আওয়ার শুরু হয় যুহরের পর থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত। আবার কারো অন্য কোনো সময়। এভাবে মানুষ যদি নিজের পিক আওয়ারটা নির্ণয় করতে পারে, তাহলে তার লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করতে সমর্থ হবে। তারপর তার চিন্তা, অনুভূতি ও শক্তি বিনিয়োগ করতে পারবে, লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
একজন মানুষ তার মোক্ষম সময়ে অন্যসব কাজ করা থেকে বিরত থাকবে, এটাই বুদ্ধিমত্তার দাবি। দৈনন্দিন কাজকর্ম এই সময়ের জন্য না। সবার সাথে আলাপচারিতা, দেখা-সাক্ষাৎ, সামাজিকতা—এই কাজগুলো এ সময়ের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। যেকোনো বাধা-বিপত্তি বা বিক্ষিপ্ততাকে এই সময় থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে যেন একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 বিশ্রাম সাফল্যের সোপান

📄 বিশ্রাম সাফল্যের সোপান


মানুষজন যুগ যুগ ধরে ‘অতিরিক্ত পরিশ্রম’-এর নীতি অবলম্বন করে এসেছে। অর্থাৎ আপনি যত কায়িক পরিশ্রম বাড়াবেন, তত বেশি সফলতা অর্জন করবেন। এ বিষয়টা যদিও গুরুত্বের দাবিদার, তবু আগের মতো এর কার্যকারিতা এখন আর নেই। অর্থাৎ, কায়িক শ্রম বেশি দিলেই যে আপনার প্রোডাক্টিভিটি বাড়বে, এমন নয়। কঠোর পরিশ্রম যেমন জরুরি, তেমনি নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়াটাও অপরিহার্য। মাত্রাতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম আপনার সফলতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এই সাফল্য এক সময় কোয়ালিটি বা গুণগত মানকে ছাড়িয়ে কোয়ান্টিটি বা পরিমাণের দিকে ঝুঁকে যাবে। আর সেই পরিমাণটা আসবে ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা কতটুকু ধারালো আর কতটুকু ভোঁতা তার ওপর ভিত্তি করে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে সেটা এত দুর্বল হয়ে পড়বে যে, কাজ হবে নিষ্প্রাণ।
জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাদ দিয়ে তবেই একজন মানুষ তার লক্ষ্যের পেছনে দিনরাত শ্রম দিতে পারে। সেসব গুরুদায়িত্ব পালন করতে পরিশ্রম পরিমিত হওয়া চাই। নয়তো এক সময় সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে পাপের অনুভূতি আচ্ছন্ন করে বসবে। ফলে ব্যক্তির স্বাস্থ্য, পারিবারিক জীবন, ঈমানি শক্তি কিংবা বুদ্ধিমত্তা—সব কিছুতে ভাঙন ধরে। দিনে দিনে তার সতেজতা কমে যায়।
প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে আমরা চিন্তা আর বুদ্ধি দিয়ে যত কিছু অর্জন করতে পারি তা কায়িক পরিশ্রমের চেয়ে বহুগুণ কার্যকর। আপনি ইতঃপূর্বে ৮০/২০ নিয়মটা জেনেছেন। অর্থাৎ ২০ ভাগ কাজ করে আপনি ৮০ ভাগ অর্জন করতে পারবেন।
সাধারণত একজন মানুষের দিনে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। জীবনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত হওয়ার আগে আপনাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছি, আপনি যখন কর্মমুখর জীবনে প্রবেশ করবেন তখন যেন আপনার সামগ্রিক প্রস্তুতি থাকে। আপনি যেন তখন অভিনব সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হন। আমরা কোয়ান্টিটি চাই না, কোয়ালিটি চাই। আপনার কাছে অল্প সময় সজীব, প্রাণবন্ত ও কার্যকর উপস্থিতি চাই। আপনার জীবন থেকে বেশি সময় চাই না। আপনাকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দেওয়ার ইচ্ছা আমাদের নেই।
কুরআন-সুন্নাহ পড়লে দেখবেন এমন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মানুষ যেন নিজেকে কষ্ট না দেয়, তার প্রতি সতর্ক করা হয়েছে। সে যেন সহজ-সরল, স্বাভাবিকভাবে তার কাজকর্ম আর ইবাদত করতে পারে। দিনশেষে যাতে একঘেয়েমি তাকে পেয়ে না বসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।[১]

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 ছুড়ে ফেলুন বিশৃঙ্খলা

📄 ছুড়ে ফেলুন বিশৃঙ্খলা


একাগ্র হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী উপায় হলো বিশৃঙ্খলাকে ছুড়ে ফেলা। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যাকে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সাথে তুলনা করা যায়, যে তীরে দাঁড়িয়ে থাকলে যেকোনো সময়ে ডুবে যেতে পারেন, এজন্য সমুদ্রে নামার দরকার পড়বে না। এ সময়টাতে আপনার হৃদয় নানারকম চিন্তাভাবনায় ভরপুর হয়ে যেতে পারে। আপনি স্থির হয়ে কোনো কিছু ভাবার মতো সময়ও পাবেন না। কারণ বাস্তবে বিক্ষিপ্ততার অনেক উপকরণ চারপাশে আছে।
রাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ একবার বিশৃঙ্খলা ছুড়ে ফেলার বিষয়টাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন সাংস্কৃতিক অবগাহন। যেমন : কোনো মানুষ যদি ইতিহাস নিয়ে লিখতে চায়, তাহলে তাকে ইতিহাসের সব বই পড়তে হবে। ব্যাপক সময় নিয়ে ইতিহাসে এমন একটা ডুব দেবে যে, তার রক্তে ইতিহাস ঢুকে পড়বে। সেসব বিক্ষিপ্ততা থেকে সে মুক্তি পাবে, যেগুলো তার চিন্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। একইভাবে যে লোকটা কবিতা, গদ্য কিংবা সিরাত লিখতে ইচ্ছুক, তার উচিত আশপাশের সব কিছুর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক অবগাহন করা; যাতে তার চিন্তা ও পরিকল্পনার জন্য মনটা একনিষ্ঠ হয়। পরবর্তীতে সে তার পরিকল্পিত চিন্তায় মনোযোগ দিতে পারে।
আপনি যদি এই বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে চান, তাহলে এমন কোনো লোকের কথা কল্পনা করুন, যে কোনো চিন্তায় গভীরভাবে ডুব দিয়েছে এবং এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বাস্তব জগতে ফিরে আসার আগে সে তা শেষ করেই আসবে। কিন্তু সে লক্ষ করে সারা বিশ্বের সর্বত্র হত্যা, ভাঙচুর এবং বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন রকমের খেলাধুলা ও বিনোদনে ছেয়ে গেছে সব কিছু। এদিক-ওদিক থেকে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে তার ওপর বিভিন্ন দায়িত্ব, প্রোগ্রাম এবং কাজ এসে চেপে বসেছে। তারপরও কি তার কাছ থেকে আপনি ফলপ্রসূ কিছু আশা করতে পারেন? তার চিন্তা-ভাবনায় গভীরতা থাকবে, এটা কি নিছক দিবাস্বপ্ন নয়?
নীরবতা হিরণ্ময়—Silence is golden. আমরা যদি কার্যকরী ও ফলপ্রসূ কোনো চিন্তায় মগ্ন হতে চাই, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই নির্জনতার কাছে যেতে হবে, নীরব পরিবেশ বেছে নিতে হবে। চিন্তার ক্ষেত্রে সব রকম বিক্ষিপ্ততা থেকে মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের চিন্তা-পরিকল্পনা-ভাবনায় অভিনবত্ব এনে সম্ভাবনাময় কাজ করতে চাইলে এই পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। আমি বলছি না, মানুষজন ছেড়ে বনবাসে যেতে। বরং প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অনর্থক সময় অপচয়কারী লোকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই একান্তকাম্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00