📄 ‘না’ বলতে লজ্জা কীসের?
আপনার অগ্রাধিকারে বাধা দেয় এমন প্রতিটি কাজকে ‘না’ বলতে শিখুন, আপাতদৃষ্টিতে সেটা জরুরি মনে হলেও। মনোযোগ তৈরিতে এই কাজটি বড়সড় ভূমিকা রাখে।
আমাদের একটা সমস্যা হলো, আমরা লক্ষ্য লিখে রাখি ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ কোনো কাজ এসে পড়লে সমন্বয় করতে না পেরে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। উড়ে এসে জুড়ে বসা কাজটা আমাদের প্রায়োরিটি লিস্টে স্থান করে নেয়। আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলো তখন গৌণ হয়ে যায়।
আমরা যদি সব কিছুকে গ্রহণ করি, জরুরি যেকোনো আহ্বানে সাড়া দিই; তাহলে দিনশেষে আমরা কিছু মানুষের খেলার পুতুলে পরিণত হব। তারা তাদের ইচ্ছেমতো আমাদেরকে পরিচালিত করবে, যদিও সেটা আমাদের স্বপ্ন পূরণের অন্তরায় হয়।
যেকেউ আপনার কাছে কোনো অনুরোধ করলে প্রথমে তাকে বলুন, ‘আমি আগে আমার শিডিউল দেখে নিই।’ তিনি চেয়েছেন বলে তখনই তাকে হ্যাঁ বা না উত্তর দিতে যাবেন না। তাকে ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করুন। তাড়াহুড়ো করবেন না। তাকে বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন, কারো শিডিউলে প্রবেশ করতে হলে অপেক্ষা করতে হয়। আপনি যেহেতু দেরি করে এসেছেন, কাজেই দেরি করার দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে। আপনার গড়িমসির চাকা দিয়ে আপনি অন্যের স্বপ্নকে পিষ্ট করতে পারেন না।
ভদ্র ভাষায় ‘আমার টাইম-টেবিলটা দেখে নিই’ বলার মাধ্যমে আপনি জায়গামতো ‘হ্যাঁ’ বলা শিখলেন, উপযুক্ত স্থানে সেটা বসাতে পারলেন। এতে করে আপনার পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটবে না। আপনি তাড়াহুড়ো করে নিজেকে এমন কোনো কাজে জড়িয়ে ফেলবেন না যা আপনার প্রায়োরিটি নষ্ট করে, আপনার পরিকল্পনায় বাঁধ সাধে।
যখন ‘আমি পারব না’, ‘ব্যস্ত আছি’, ‘আমার অন্য কাজ আছে’—এগুলো বলতে শিখবেন, তখন মানুষকে সময়ের গুরুত্বের ব্যাপারে ধারণা দিতে পারবেন। তাদেরকে বোঝাতে পারবেন সময় কতটা দামি। তাদের ভবিষ্যতে রুটিনমাফিক জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে হয়তো আপনি সহায়ক ভূমিকা রাখবেন।
আমরা যখন আপনাকে বলি, ‘না’ বলতে শিখুন, তার মানে এই নয়, আপনাকে স্বার্থপর হতে বলছি, মানুষকে সহায়তা করতে নিষেধ করছি কিংবা আপনার কাজে লাগবে এমন কোনো প্রস্তাব প্রত্যাখান করতে বলছি। বরং এটা কেবল আপনার সময়, লক্ষ্য আর অগ্রাধিকারকে সম্মান করার আহ্বান, যাতে আপনি নিজের বৃহত্তর লক্ষ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। এরপর মানুষের প্রয়োজন কিংবা অগ্রাধিকার পূরণে সময় দিলে কোনো অসুবিধা নেই।
আমরা যে লক্ষ্য এবং চিন্তার জন্য জীবন ধারণ করি, সেটার তরে সংগ্রাম করতে শেখায় মনোযোগ। এর জন্য যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে সবার কাছে আমরা দুঃখ প্রকাশ করে ‘না’ বলব।
📄 লেগে থাকুন চর্চার সাথে
আমরা এমন সমাজে বসবাস করি যেখানে এমন অনেক অভ্যাস আছে, যেগুলো আপনার সময় নষ্ট করে, আপনার মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নস্যাৎ করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম, গ্রুপ চ্যাট, অযথা আড্ডা, ঘনঘন আনুষ্ঠানিক দাওয়াতের আয়োজন আমাদের কত বড় ক্ষতি করছে আমরা বুঝতেও পারছি না।
কোনো ভালো কাজ শেখার পর, তার মাঝে আরো নতুনত্ব আনার তাড়না মনোযোগ বৃদ্ধির অসাধারণ উপায়। প্রায় প্রতিটি কাজই বারবার চর্চা করা অত্যাবশ্যক; যাতে কালপরিক্রমায় সেগুলো পরিণত হয় অভিনব অবদানে।
যে কাজে আপনি সময় দেবেন, আপনার সমস্ত অনুভূতি নিয়োজিত করবেন; তার কারণেই হয়তো কবরে পৌঁছে গেলেও আপনার আমলনামায় ভালো কিছু যোগ হতে থাকবে। আল্লাহ চাইলে আপনার অনন্য প্রকল্প শত শত বছর ধরে মানুষের উপকারে লেগে যাবে। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যে কাজে জীবন কাটাবে, তার মৃত্যুও সেটার ওপর হবে এবং সে ঐ অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে। মহান আল্লাহ তার বদান্যতার মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’[১]
অনুশীলন আর চর্চা চালিয়ে গেলে কিছুদিন পর দেখবেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আপনার জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেবে এই অনুশীলনের মানসিকতা। আমরা প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা পড়ার মাধ্যমে অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। অথবা অন্তত ১৫ মিনিট করে হলেও যেন পড়ি, তবে তা হতে হবে নিয়মিত। চাইলে আস্তে আস্তে পরিমাণটা বাড়ানো যায়। আর এই অনুশীলনের জন্য অবশ্যই মোবাইলের মতো মনোযোগ-বিনাশকারী বস্তুগুলো দূরে সরিয়ে রাখুন, বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করুন। মোবাইলের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে আপনি একটা সহজ কিন্তু কার্যকরী পন্থা অবলম্বন করতে পারেন। মাঝে মাঝে মোবাইল ছাড়াই বাসা থেকে বের হয়ে যান। মোবাইল যতই প্রয়োজনীয় মনে হোক না কেন, সপ্তাহের দুয়েক দিন মোবাইল বাসায় রেখেই অফিস চলে যান। দেখবেন, কিছুদিন বাদে এটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে এবং মোবাইল ছাড়াও চলতে-ফিরতে আপনার তেমন একটা কষ্ট হচ্ছে না। এভাবে ধীরে ধীরে নিজের ভেতর একটা দৃঢ়তা আনা সম্ভব। কুরআন মুখস্থ করা এবং নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ফজরের পর থেকে শুরু করে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়টা নির্ধারণ করা যেতে পারে। আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাতের জন্য সপ্তাহে এক ঘণ্টা বরাদ্দ রাখুন এবং এ অভ্যাস যেন ভেঙে না যায় সেদিকেও নজর রাখুন। একদিন ধীরে ধীরে সেটা চমৎকার এক অভ্যাসে পরিণত হবে। বারবার কোনো একটা কাজ করতে করতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারব, নিজেদেরকে সেটার আলোকে গড়ে নিতে সক্ষম হব। দেখা যাবে, এসব কাজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাইলেও আর তা ছাড়তে পারছি না।
টিকাঃ
[১] তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৭
📄 স্বপ্ন এবার সত্যি করুন
অধিকাংশ ক্ষেত্রে মনোযোগ তৈরির উপায় হলো এক জায়গায় দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করা। আর সেই সময়টাতে একটার বেশি কাজে জড়িয়ে পড়া অনুচিত। যেকোনো একটি কাজে নিজের মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে, শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ সরানো যাবে না। এভাবে চিন্তার একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়, বিক্ষিপ্ততা থেকে মুক্তি মেলে। সকল শক্তি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ব্যয় হয়, স্বপ্নপূরণ তখন অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ হয়।
আমার জীবনে আমি এই বিষয়টা কাজে লাগিয়েছি, বিশেষ করে বই লেখার ক্ষেত্রে। এতে এত বেশি উপকৃত হয়েছি যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমার বেশিরভাগ বই এই অভ্যাসেরই ফসল। ইবদা কিতাবাতা হায়াতিকা বইটা আমি ১০ দিনে লিখেছি। ফি যিলালিস সীরাতিন নাবাউইয়্যা বইয়ের কাজ শুরু করার পর শেষ না করা পর্যন্ত আমি কলম বন্ধ করিনি। আর রিহলাতু তাদাব্বুর-এর সাথে তো আমার সেরা স্মৃতিটুকু মিশে আছে। আমি টানা ছয় মাস কাজ করে বইটা শেষ করেছি। তার মাঝে একদিন টানা ১৩ ঘণ্টাও কাজ করেছি, মাঝে কেবল সালাত আর ঘুমের জন্যই বিরতি নিয়েছি। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমাকে সেটা পূর্ণ করার তৌফিক দিয়েছেন। কুরআনের এমন কিছু সুরাও আছে যেগুলোর তাদাব্বর[১] আমি এয়ারপোর্টে লিখেছি, প্লেনে বসে লিখেছি, এমনকি রাস্তাঘাটেও লিখেছি। আর ভূমিকাটা লিখেছি কোনো এক সফরের সময় হোটেলে বসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, এখনো আমার অধিকাংশ প্রকল্প আমি এভাবেই বাস্তবায়ন করি। অনেক সময় এমনও হয়েছে, আমি অন্য কাজগুলো করি না। এমনকি আমার লাইব্রেরি গুছাই না, বই সরাই না। যেন একদমই সময় নষ্ট করতে না হয় সে উদ্দেশ্যে বিশৃঙ্খলার মাঝে কাজের মনোযোগকে শৃঙ্খলিত করি।
কোনো মানুষ যদি কিছু করতে চায়, চেষ্টা থাকলে সে অবশ্যই তা করতে পারবে ইনশাআল্লাহ। কোনো পরিকল্পনার সাথে যদি তার হৃদয়-মন এঁটে যায়; তাহলে সে সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। সব ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
চিন্তার খোরাক
নিজের জন্য অল্প সময়ের (১৫/২০ মিনিট) একটা ভালো অভ্যাস গড়ে নিন। শুরুর একটা তারিখ ঠিক করুন। তারপর তাকে এমনভাবে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিন যাতে কোনো বাধাতেই থেমে না যায়, কোনো কিছুতেই ছুটে না যায়। প্রথম বছরের শেষে আপনার অনুশীলন ও চর্চার হাল-হাকিকত পর্যবেক্ষণ করুন, আপনি অবাক হবেন।
টিকাঃ
[১] চিন্তা-গবেষণা
📄 মোক্ষম সময়
জীবনে সফল হতে নিজেকে আদ্যোপান্ত জানতে হবে। নিজের সুবিধা-অসুবিধা, আগ্রহ, মনোযোগ—এসবের প্রতি নজর দিলে সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো অনেক সহজ হয়ে যাবে। আসলে সাফল্য ও ব্যর্থতার মাঝে পার্থক্য গড়ে দেয় আমাদের মেধা, শ্রম আর সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার।
আমরা প্রত্যেকে চাই আমাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে জানতে। আমাদের কেউ রাত জেগে কাজ করতে পছন্দ করে। কেউ আবার রাতে ঘুমিয়ে ভোরবেলায় কাজ শুরু করতে ভালোবাসে। কেউ নিজের চিন্তা ও পরিকল্পনাকে জাগ্রত রাখতে পারে। কেউ আবার একটা কাজ বেশিক্ষণ করতে পারে না। বহু রকমের মানুষ আছে এই দুনিয়ায়। তবে আমাদের প্রত্যেকেরই একটা পিক আওয়ার থাকে, ভালো লাগার একটা সময়সীমা থাকে, যে সময়গুলোতে আমরা বেশ সতেজ আর প্রফুল্ল থাকি; নিজের মাঝে অপরিমেয় শক্তি আর প্রাণচাঞ্চল্যের স্ফুরণ দেখতে পাই। অন্য সময় হয়তো আমরা তেমন একটা চাঞ্চল্য অনুভব করি না। তাই আমাদের উচিত এই সময়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা যেন নিজের পরিকল্পনা আর চিন্তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেগুলো ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়।
দিনের কোন সময়টা আপনার জন্য মোক্ষম সময়, তা জানতে পারাটা পরিকল্পনা ও লক্ষ্যপূরণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ আপনি যখন মোক্ষম সময়টা জানবেন, তখন ঐ সময়টুকুতে নিজের সবটুকু শ্রম আর মনোযোগ ঢেলে দিন। যে মানুষটা নিজের পিক আওয়ার কোনটা তা-ই জানে না, তার জন্য লক্ষ্যে পৌঁছনো বেশ কঠিন। ঐ সময়টা তাকে সবচেয়ে সহজ পথ ধরে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।
আমাদের কারো পিক আওয়ার তথা মোক্ষম সময় ফজর থেকে যুহর পর্যন্ত সময়টা। এই সময়ে তারা বেশ সতেজ অনুভব করে, একাগ্র থাকে কাজের প্রতি। আরেকজন এই সময়টাতে কিছুই করতে পারে না। ঘুমিয়ে কাটাতে পছন্দ করে অথবা অপ্রয়োজনীয় কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মাথাটা কাজে লাগাতে পারে না কোনোভাবে। আমাদের কারো কারো পিক আওয়ার শুরু হয় যুহরের পর থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত। আবার কারো অন্য কোনো সময়। এভাবে মানুষ যদি নিজের পিক আওয়ারটা নির্ণয় করতে পারে, তাহলে তার লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করতে সমর্থ হবে। তারপর তার চিন্তা, অনুভূতি ও শক্তি বিনিয়োগ করতে পারবে, লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
একজন মানুষ তার মোক্ষম সময়ে অন্যসব কাজ করা থেকে বিরত থাকবে, এটাই বুদ্ধিমত্তার দাবি। দৈনন্দিন কাজকর্ম এই সময়ের জন্য না। সবার সাথে আলাপচারিতা, দেখা-সাক্ষাৎ, সামাজিকতা—এই কাজগুলো এ সময়ের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। যেকোনো বাধা-বিপত্তি বা বিক্ষিপ্ততাকে এই সময় থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে যেন একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়।