📄 অল্প কাজে বেশি ফায়দা
ইবনু শিহাব যুহরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ইউনুস, তুমি জোর করে জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করবে না। জ্ঞানের বেশ কয়েকটা প্রান্তর আছে। কোনো কোনো প্রান্তরে প্রবেশ করলে তুমি সেটাকে অতিক্রম করার আগে তোমাকে সেটা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে জ্ঞানার্জন করো। একবারে সবটুকু জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করবে না কখনো। যে একবারে জ্ঞান লাভ করে, তার জ্ঞান একবারেই হারিয়ে যায়। তাই অল্প অল্প করে বহু দিনরাত ধৈর্য ধরে জ্ঞান আহরণ করতে থাকো।’ [১]
ইবনু শিহাব যুহরি বলতেন, ইলম তো একটা-দুইটা করে হাদিস নেওয়ার নাম।
আজ একটু তো কাল আরেকটু। এভাবে অল্প অল্প করে ইলম কুড়িয়ে নিতে হবে। কবির ভাষায়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল; গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল।
📄 অল্প হলেও নিয়মিত
এই চারটি জিনিস (পরিকল্পনা, রূপরেখা, দৈনন্দিন লক্ষ্য এবং অগ্রাধিকার নির্ণয়) ব্যক্তি জীবনে মনোযোগ তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। এটিই তাকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তাকে পথের সমাপ্তি রেখায় নিয়ে যায়। এগুলো মনোযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কোনো মানুষের জীবনে যদি এ বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান থাকে, তাহলে তা তাকে দেরিতে হলেও স্বপ্ন পূরণ করিয়েই ছাড়বে। আর কোনো মানুষ যদি এগুলো আঁকড়ে ধরতে না পারে, তাহলে সে নিক্ষিপ্ত হবে বিক্ষিপ্ততার আস্তাকুঁড়ে।
মনোযোগ স্থাপনে আরো যে বিষয়টি সহায়তা করে তা হলো নবিজির শিখিয়ে দেওয়া ‘অল্প হলেও নিয়মিত’ নীতি [১]। আমি আপনার কল্যাণকামী হিসেবে বলছি, এর ব্যাপারে কখনো অবহেলা করবেন না। যাদেরই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে; তারা সবাই এই বিষয়টিকে অবহেলা করেছেন বলেই হয়েছে। কিন্তু সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর আফসোস করে কি লাভ হয় কখনো?
একজন লোক পুরো ২৩ খন্ড সিয়ারু আলামিন নুবালা এবং ৩৪ খণ্ড মুসনাদু আহমাদ পড়েছে; সে কেবল প্রতিদিন ঘুমানোর আগে মাত্র ২০ মিনিট করে পড়ত।
একদল ছাত্র শাইখ ইবনু উসাইমিনের শারহুল মুমতি বইটি প্রতিদিন এক ঘণ্টা কি আধ ঘণ্টা করে পড়ত। এভাবে আড়াই বছরের মাথায় তারা পুরোটা শেষ করে ফেলেছে।
এক ব্যক্তি একটা মূল্যবান কথা বলেছিলেন, ২২ বছর আগে আমি সফলতা অর্জনের একটা উপায় জেনেছি। সফলতার বিষয়টা কাজের পরিমাণের চাইতে নিয়মিত করার সাথেই বেশি জড়িত। বড় কিছু অর্জন করা কিংবা বৃহত্তর লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য আজীবন কোনো একটা কাজ নিয়মিত করে যাওয়াটাই যথেষ্ট।
সফলতা অর্জনের লক্ষ্য ছাড়াই কেবল প্রতিদিন একটা নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তুলুন। তিন মাসে পুরো কুরআন মুখস্থ করার চিন্তা মাথায় নেবেন না। প্রতিদিন আধা পৃষ্ঠা মুখস্থ করুন। শরীর গঠন নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, প্রতিদিন কেবল আধা ঘণ্টা করে শরীরচর্চা করুন। রাতারাতি কোনো একটি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের গুরুভার নেওয়াটা বেশ বোকামি, তারচেয়ে বরং প্রতিদিন সেই বিষয়ের কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়তে থাকুন। বড় কোনো কাজ কিংবা দুই মাসে ৩০ কেজি কমানোর মতো দায়িত্ব নিতে যাবেন না। বরং সারাটা জীবন একটা সুষম খাদ্যাভ্যাস ধরে রাখুন।
টিকাঃ
[১] ইবনু আব্দিল বার তার জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহি গ্রন্থে ইউনুস ইবনু ইয়াযিদের সূত্রে বর্ণনা করেন।
]১] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّه تَعَالَى أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প।— সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪
📄 ‘না’ বলতে লজ্জা কীসের?
আপনার অগ্রাধিকারে বাধা দেয় এমন প্রতিটি কাজকে ‘না’ বলতে শিখুন, আপাতদৃষ্টিতে সেটা জরুরি মনে হলেও। মনোযোগ তৈরিতে এই কাজটি বড়সড় ভূমিকা রাখে।
আমাদের একটা সমস্যা হলো, আমরা লক্ষ্য লিখে রাখি ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ কোনো কাজ এসে পড়লে সমন্বয় করতে না পেরে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। উড়ে এসে জুড়ে বসা কাজটা আমাদের প্রায়োরিটি লিস্টে স্থান করে নেয়। আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলো তখন গৌণ হয়ে যায়।
আমরা যদি সব কিছুকে গ্রহণ করি, জরুরি যেকোনো আহ্বানে সাড়া দিই; তাহলে দিনশেষে আমরা কিছু মানুষের খেলার পুতুলে পরিণত হব। তারা তাদের ইচ্ছেমতো আমাদেরকে পরিচালিত করবে, যদিও সেটা আমাদের স্বপ্ন পূরণের অন্তরায় হয়।
যেকেউ আপনার কাছে কোনো অনুরোধ করলে প্রথমে তাকে বলুন, ‘আমি আগে আমার শিডিউল দেখে নিই।’ তিনি চেয়েছেন বলে তখনই তাকে হ্যাঁ বা না উত্তর দিতে যাবেন না। তাকে ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করুন। তাড়াহুড়ো করবেন না। তাকে বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন, কারো শিডিউলে প্রবেশ করতে হলে অপেক্ষা করতে হয়। আপনি যেহেতু দেরি করে এসেছেন, কাজেই দেরি করার দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে। আপনার গড়িমসির চাকা দিয়ে আপনি অন্যের স্বপ্নকে পিষ্ট করতে পারেন না।
ভদ্র ভাষায় ‘আমার টাইম-টেবিলটা দেখে নিই’ বলার মাধ্যমে আপনি জায়গামতো ‘হ্যাঁ’ বলা শিখলেন, উপযুক্ত স্থানে সেটা বসাতে পারলেন। এতে করে আপনার পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটবে না। আপনি তাড়াহুড়ো করে নিজেকে এমন কোনো কাজে জড়িয়ে ফেলবেন না যা আপনার প্রায়োরিটি নষ্ট করে, আপনার পরিকল্পনায় বাঁধ সাধে।
যখন ‘আমি পারব না’, ‘ব্যস্ত আছি’, ‘আমার অন্য কাজ আছে’—এগুলো বলতে শিখবেন, তখন মানুষকে সময়ের গুরুত্বের ব্যাপারে ধারণা দিতে পারবেন। তাদেরকে বোঝাতে পারবেন সময় কতটা দামি। তাদের ভবিষ্যতে রুটিনমাফিক জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে হয়তো আপনি সহায়ক ভূমিকা রাখবেন।
আমরা যখন আপনাকে বলি, ‘না’ বলতে শিখুন, তার মানে এই নয়, আপনাকে স্বার্থপর হতে বলছি, মানুষকে সহায়তা করতে নিষেধ করছি কিংবা আপনার কাজে লাগবে এমন কোনো প্রস্তাব প্রত্যাখান করতে বলছি। বরং এটা কেবল আপনার সময়, লক্ষ্য আর অগ্রাধিকারকে সম্মান করার আহ্বান, যাতে আপনি নিজের বৃহত্তর লক্ষ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। এরপর মানুষের প্রয়োজন কিংবা অগ্রাধিকার পূরণে সময় দিলে কোনো অসুবিধা নেই।
আমরা যে লক্ষ্য এবং চিন্তার জন্য জীবন ধারণ করি, সেটার তরে সংগ্রাম করতে শেখায় মনোযোগ। এর জন্য যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে সবার কাছে আমরা দুঃখ প্রকাশ করে ‘না’ বলব।
📄 লেগে থাকুন চর্চার সাথে
আমরা এমন সমাজে বসবাস করি যেখানে এমন অনেক অভ্যাস আছে, যেগুলো আপনার সময় নষ্ট করে, আপনার মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নস্যাৎ করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম, গ্রুপ চ্যাট, অযথা আড্ডা, ঘনঘন আনুষ্ঠানিক দাওয়াতের আয়োজন আমাদের কত বড় ক্ষতি করছে আমরা বুঝতেও পারছি না।
কোনো ভালো কাজ শেখার পর, তার মাঝে আরো নতুনত্ব আনার তাড়না মনোযোগ বৃদ্ধির অসাধারণ উপায়। প্রায় প্রতিটি কাজই বারবার চর্চা করা অত্যাবশ্যক; যাতে কালপরিক্রমায় সেগুলো পরিণত হয় অভিনব অবদানে।
যে কাজে আপনি সময় দেবেন, আপনার সমস্ত অনুভূতি নিয়োজিত করবেন; তার কারণেই হয়তো কবরে পৌঁছে গেলেও আপনার আমলনামায় ভালো কিছু যোগ হতে থাকবে। আল্লাহ চাইলে আপনার অনন্য প্রকল্প শত শত বছর ধরে মানুষের উপকারে লেগে যাবে। ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যে কাজে জীবন কাটাবে, তার মৃত্যুও সেটার ওপর হবে এবং সে ঐ অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে। মহান আল্লাহ তার বদান্যতার মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’[১]
অনুশীলন আর চর্চা চালিয়ে গেলে কিছুদিন পর দেখবেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আপনার জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেবে এই অনুশীলনের মানসিকতা। আমরা প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা পড়ার মাধ্যমে অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। অথবা অন্তত ১৫ মিনিট করে হলেও যেন পড়ি, তবে তা হতে হবে নিয়মিত। চাইলে আস্তে আস্তে পরিমাণটা বাড়ানো যায়। আর এই অনুশীলনের জন্য অবশ্যই মোবাইলের মতো মনোযোগ-বিনাশকারী বস্তুগুলো দূরে সরিয়ে রাখুন, বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করুন। মোবাইলের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে আপনি একটা সহজ কিন্তু কার্যকরী পন্থা অবলম্বন করতে পারেন। মাঝে মাঝে মোবাইল ছাড়াই বাসা থেকে বের হয়ে যান। মোবাইল যতই প্রয়োজনীয় মনে হোক না কেন, সপ্তাহের দুয়েক দিন মোবাইল বাসায় রেখেই অফিস চলে যান। দেখবেন, কিছুদিন বাদে এটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে এবং মোবাইল ছাড়াও চলতে-ফিরতে আপনার তেমন একটা কষ্ট হচ্ছে না। এভাবে ধীরে ধীরে নিজের ভেতর একটা দৃঢ়তা আনা সম্ভব। কুরআন মুখস্থ করা এবং নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ফজরের পর থেকে শুরু করে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়টা নির্ধারণ করা যেতে পারে। আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাতের জন্য সপ্তাহে এক ঘণ্টা বরাদ্দ রাখুন এবং এ অভ্যাস যেন ভেঙে না যায় সেদিকেও নজর রাখুন। একদিন ধীরে ধীরে সেটা চমৎকার এক অভ্যাসে পরিণত হবে। বারবার কোনো একটা কাজ করতে করতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারব, নিজেদেরকে সেটার আলোকে গড়ে নিতে সক্ষম হব। দেখা যাবে, এসব কাজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাইলেও আর তা ছাড়তে পারছি না।
টিকাঃ
[১] তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৭