📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 লক্ষ্যবিহীন জীবন যেন এক হালবিহীন নৌকা

📄 লক্ষ্যবিহীন জীবন যেন এক হালবিহীন নৌকা


এই পৃষ্ঠায় পৌঁছানোর আগেই আপনি জীবনের পরিকল্পনা সাজিয়ে নিয়েছেন, নিজের ভাবনা-চিন্তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন, এই প্রত্যাশাই করছি।
আপনি ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই আপনার ক্ষেত্র ঠিক করে ফেলেছেন, যেথায় আপনি আজীবন টিকে থাকতে চান। যে পরিচয় আপনি ভবিষ্যতে বহন করবেন, মৃত্যুর সময় আপনি যে স্মরণিকা রেখে যেতে চান সেটাও এর ওপর নির্ভর করে। যেমনটা কুরআনে পাওয়া যায়—
وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ
আমাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখুন।[১]
আপনি বাস্তব জীবনে নিশ্চয় এর প্রয়োগ চান। হয়তো আগামী ১০/১৫ বছরের একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন। নিশ্চয়ই তার ফলাফল কেমন কিংবা ভবিষ্যতে সেই চিন্তার কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে তা বুঝতে পারছেন।
এই দুই ধাপ পেরিয়ে আসলে তৃতীয় ধাপের সূচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আপনি প্রতিদিন লক্ষ্যের কতটুকু অর্জন করতে চান তা নির্ণয় করতে হবে এবার। এটা করলে আপনার রূপরেখা কিংবা স্বপ্ন অনেকাংশে বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। সময়ের পরিক্রমায় আপনাকে পৌঁছে দেবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
রূপরেখা প্রণয়ন জীবনে অনুপ্রেরণা দেয়, চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আগ্রহ সৃষ্টি করে, পুনর্জাগরণের চিন্তা মূর্ত করে তোলে। কিন্তু প্রতিদিন লক্ষ্যের একটা নির্দিষ্ট মঞ্জিল অতিক্রম করা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে দিনশেষে লক্ষ্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। লক্ষ্যহীন জীবন আসলে না থাকার মতোই। এমন অনেক লক্ষ্য আছে যা ব্যক্তিকে উভয় জগতে মর্যাদার স্বাদ অনুভব করিয়েছে!
লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারলেই যুদ্ধের অর্ধেক জেতা হয়ে যায়। স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে যুদ্ধের বাকি অর্ধেক। রূপরেখায় প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট গন্তব্য না থাকলে একসময় তা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
একবার এক লোক তার বন্ধুদের উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছ, যে একাই একটা উট খেয়ে ফেলতে পারবে?’ কেউই হাত তোলার সাহস করল না। তখন সে বলল, ‘তোমরা কিন্তু প্রত্যেকেই আস্ত একটা উট একা খেতে পারবে। কীভাবে জানো? উটটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে রেখে দেবে। এরপর প্রতিদিন অল্প অল্প করে মাংস খেতে থাকবে। একদিন না একদিন উটের সবটুকু মাংস শেষ হবেই।’
পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি নিয়মিত ছোট ছোট লক্ষ্য থাকা খুব জরুরি। এ গল্পটা তারই একটা ব্যাবহারিক উদাহরণ।
আপনার রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়ে গেলে এবার প্রতিদিনকার কাজ নির্ধারণ করে ফেলুন, যেন সেই সুদীর্ঘ পথ নিয়মমাফিক পাড়ি দেওয়া যায়। আপনি যদি কুরআনকে অন্তরে ও মগজে ধারণ করতে চান, তাহলে পূর্ব শর্ত হিসেবে তাজবিদ তো ঠিক করবেনই, সেই সাথে নিয়মিত অল্প করে মুখস্থ করার পাশাপাশি বিশেষভাবে আরবি ভাষা, তাফসির শিক্ষায় সময় দেবেন। অনুরূপভাবে ফিকহ, হাদিস, তাফসির, সিরাত-সহ বিভিন্ন শাস্ত্রের ছাত্রদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
আবার আপনার যদি শিক্ষা, মিডিয়া, সমাজ, অর্থনীতি-কেন্দ্রিক এমন কোনো পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সেটা শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন তার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করাও জরুরি; হোক সেই লক্ষ্য আত্মোন্নয়ন কিংবা পরিকল্পনার যথাযথ পরিচালনা।

টিকাঃ
[১] সুরা শুআরা, আয়াত : ৮৪

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে শেষ করুন

📄 গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে শেষ করুন


এখন পর্যন্ত মনোযোগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপাদান (পরিকল্পনা, রূপরেখা ও লক্ষ্য) আপনি অর্জন করেছেন। আপনার একটি সাপ্তাহিক রুটিন আছে। আপনি দৃঢ় এবং বিচক্ষণ হলে আশপাশের কিছুই আপনাকে পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না, তা যতই ভয়াবহ এবং প্রভাবশালী হোক না কেন।
যার একটা পরিকল্পনা আছে, চমৎকার একটা রূপরেখা আছে, লক্ষ্য আছে—তার স্বপ্ন একদিন পূরণ হবেই। ইতিহাস তার জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী। যারাই জীবনে সফল হয়েছে, ইতিহাস রচনা করেছে, মর্যাদায় আসীন হয়েছে, বড় প্রভাব রাখতে পেরেছে; তারা সবাই পরিকল্পনা, রূপরেখা আর লক্ষ্যকে জীবনে ধারণ করতে পেরেছে।
আপনি যদি আপনার মনোযোগ-সৃষ্টির কাজে এতদূর পৌঁছে গিয়ে থাকেন, তাহলে আপনার জন্য আরেকটা কাজ করা জরুরি হয়ে গেছে। প্রতিদিন কাজ শুরু করার আগে আপনি হ্যান্ডবুক খুলে লিখে রাখা লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করুন, ‘আজকের দিনে কোন তিনটি লক্ষ্য সবার আগে পূরণ করা দরকার?’
প্রত্যেক দিন আপনার লক্ষ্যের তালিকায় থাকা সবগুলো দায়িত্ব পূর্ণ করার পরিকল্পনা থাকবে আপনার। রাতে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে সকল দায়িত্বকে সম্পন্ন করে আসতে পারাই হবে আপনার সর্বাত্মক চেষ্টা। কিন্তু এ-কথা সবারই জানা, সবসময় সব লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে আপনার দিনের সূচনা করবেন সেটাও ভেবে রাখা দরকার। যাতে কখনো কোনো বাধা এসে পড়লেও আপনার খুব একটা অসুবিধা না হয়। আমি আপনাকে বেশ জোর দিয়ে এবং দায়িত্ব নিয়েই বলছি, ‘চারদিক থেকে নানা রকমের বাধা-বিপত্তি এসে পড়লেও কোনোভাবেই এই অগ্রাধিকার তালিকাটি অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না।’
সফল মানুষদের অন্যতম গুণ হলো, তাদের প্রতিদিনের লক্ষ্য আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। আর তাদের সবচেয়ে ভালো গুণ হলো তারা তাদের দৈনিক লক্ষ্যের মধ্যে অগ্রাধিকার তালিকার প্রথম তিনটি কাজ মার্ক করে রাখে। তাই হাজারো সমস্যার সম্মুখীন হলেও তারা সেই কাজগুলো শেষ না করে নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়ে না।
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৮০/২০ বলে একটা কথা আছে। এর মানে হলো আপনার ৮০ ভাগ শ্রম ২০ ভাগ লক্ষ্যে ব্যয় করুন। তাহলে ৮০ ভাগ ফলাফল অর্জন করতে পারবেন।
মূলত প্রত্যেক মানুষের জীবনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। সাথে সাপ্তাহিক একটা টার্গেট সেট করা থাকবে। সেই পরিকল্পনার শর্ত হলো কিছু বিষয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা। যেমন: পরিকল্পনা, ঈমান, চিন্তা, পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্য, অর্থ। আর এ জন্য নিজের পরিকল্পনাটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া ভীষণ প্রয়োজন। প্রতিদিন সকালে অন্য কোনো কাজ সামনে আসার আগে নিজের পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তবেই দিন শুরু করুন। কিন্তু একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না—সবার আগে আমাদের ঈমান! কারণ ঈমানের শক্তিতেই তো জীবন পরিচালনা করতে হবে।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 অল্প কাজে বেশি ফায়দা

📄 অল্প কাজে বেশি ফায়দা


ইবনু শিহাব যুহরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ইউনুস, তুমি জোর করে জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করবে না। জ্ঞানের বেশ কয়েকটা প্রান্তর আছে। কোনো কোনো প্রান্তরে প্রবেশ করলে তুমি সেটাকে অতিক্রম করার আগে তোমাকে সেটা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে জ্ঞানার্জন করো। একবারে সবটুকু জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করবে না কখনো। যে একবারে জ্ঞান লাভ করে, তার জ্ঞান একবারেই হারিয়ে যায়। তাই অল্প অল্প করে বহু দিনরাত ধৈর্য ধরে জ্ঞান আহরণ করতে থাকো।’ [১]
ইবনু শিহাব যুহরি বলতেন, ইলম তো একটা-দুইটা করে হাদিস নেওয়ার নাম।
আজ একটু তো কাল আরেকটু। এভাবে অল্প অল্প করে ইলম কুড়িয়ে নিতে হবে। কবির ভাষায়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল; গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল।

📘 প্রোডাক্টিভ লেসনস > 📄 অল্প হলেও নিয়মিত

📄 অল্প হলেও নিয়মিত


এই চারটি জিনিস (পরিকল্পনা, রূপরেখা, দৈনন্দিন লক্ষ্য এবং অগ্রাধিকার নির্ণয়) ব্যক্তি জীবনে মনোযোগ তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। এটিই তাকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তাকে পথের সমাপ্তি রেখায় নিয়ে যায়। এগুলো মনোযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কোনো মানুষের জীবনে যদি এ বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান থাকে, তাহলে তা তাকে দেরিতে হলেও স্বপ্ন পূরণ করিয়েই ছাড়বে। আর কোনো মানুষ যদি এগুলো আঁকড়ে ধরতে না পারে, তাহলে সে নিক্ষিপ্ত হবে বিক্ষিপ্ততার আস্তাকুঁড়ে।
মনোযোগ স্থাপনে আরো যে বিষয়টি সহায়তা করে তা হলো নবিজির শিখিয়ে দেওয়া ‘অল্প হলেও নিয়মিত’ নীতি [১]। আমি আপনার কল্যাণকামী হিসেবে বলছি, এর ব্যাপারে কখনো অবহেলা করবেন না। যাদেরই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে; তারা সবাই এই বিষয়টিকে অবহেলা করেছেন বলেই হয়েছে। কিন্তু সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর আফসোস করে কি লাভ হয় কখনো?
একজন লোক পুরো ২৩ খন্ড সিয়ারু আলামিন নুবালা এবং ৩৪ খণ্ড মুসনাদু আহমাদ পড়েছে; সে কেবল প্রতিদিন ঘুমানোর আগে মাত্র ২০ মিনিট করে পড়ত।
একদল ছাত্র শাইখ ইবনু উসাইমিনের শারহুল মুমতি বইটি প্রতিদিন এক ঘণ্টা কি আধ ঘণ্টা করে পড়ত। এভাবে আড়াই বছরের মাথায় তারা পুরোটা শেষ করে ফেলেছে।
এক ব্যক্তি একটা মূল্যবান কথা বলেছিলেন, ২২ বছর আগে আমি সফলতা অর্জনের একটা উপায় জেনেছি। সফলতার বিষয়টা কাজের পরিমাণের চাইতে নিয়মিত করার সাথেই বেশি জড়িত। বড় কিছু অর্জন করা কিংবা বৃহত্তর লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য আজীবন কোনো একটা কাজ নিয়মিত করে যাওয়াটাই যথেষ্ট।
সফলতা অর্জনের লক্ষ্য ছাড়াই কেবল প্রতিদিন একটা নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তুলুন। তিন মাসে পুরো কুরআন মুখস্থ করার চিন্তা মাথায় নেবেন না। প্রতিদিন আধা পৃষ্ঠা মুখস্থ করুন। শরীর গঠন নিয়ে ব্যস্ত হবেন না, প্রতিদিন কেবল আধা ঘণ্টা করে শরীরচর্চা করুন। রাতারাতি কোনো একটি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের গুরুভার নেওয়াটা বেশ বোকামি, তারচেয়ে বরং প্রতিদিন সেই বিষয়ের কয়েক পৃষ্ঠা করে পড়তে থাকুন। বড় কোনো কাজ কিংবা দুই মাসে ৩০ কেজি কমানোর মতো দায়িত্ব নিতে যাবেন না। বরং সারাটা জীবন একটা সুষম খাদ্যাভ্যাস ধরে রাখুন।

টিকাঃ
[১] ইবনু আব্দিল বার তার জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহি গ্রন্থে ইউনুস ইবনু ইয়াযিদের সূত্রে বর্ণনা করেন।
]১] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّه تَعَالَى أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প।— সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00