📄 আপনাকে আমি খুঁজিয়া বেড়াই
আলোচনা শুরুর আগে সবচেয়ে দামি আর গভীর একটি প্রশ্নের উত্তর বের করা দরকার। প্রশ্নটি হলো, ‘আমি কে?’
এ প্রশ্নটি আপনাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। প্রথমেই আপনাকে পথের শুরু আর শেষ দেখিয়ে দেবে। প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কে?’ ‘আমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে?’ ‘কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি আমি?’
এ আলোচনার উদ্দেশ্য হলো জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করা, অভিনব কিছু করা, ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু রেখে যাওয়া যা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, হয়তো সেই অভিনব কাজ সাদাকায় জারিয়াহ হয়ে আখিরাতের জীবনকে সহজ করবে।
যদি ব্যক্তির মনে উচ্চাশা থাকে, তাহলে তা অর্জন করতে শরীর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। সেজন্যই এ প্রশ্নগুলো আসছে। আপনি যেন চিন্তার জগতে ঘুরে বেড়াতে পারেন, জীবনের আঙিনায় আনতে পারেন বসন্ত-কিশলয়ের নতুনত্ব—এ তারই প্রয়াস মাত্র।
নিজেকে চিনুন। আপনার শরীর-মন কি বিশাল কোনো উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে এগুতে চায়? আমরা বড় কিছু করার কথা বলছি, যা করতে প্রয়োজন দৃঢ় মানসিকতা।
একাগ্রতার অভ্যাসটা সব ধরনের মানুষের সাথে আলোচনা করার মতো বিষয় না। এটা কেবল তাদের জন্য, যারা জীবনকে ঢেলে সাজাতে চায়। যারা হতাশার খাদ থেকে প্রত্যাশার পাহাড়ে উঠতে চায়। যারা জীবনে চলার পথে নানা প্রকারের বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
তুলতুলে নরম বিছানা ছেড়ে এখনই উঠে পড়ুন। ঝেড়ে ফেলুন সব রকম আলস্য। এমন ইতিহাস রচনা করুন, যা থেকে যুগ যুগ ধরে বিশ্ববাসী তার মনের রসদ জোগাতে পারবে।
আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, এই ঘরের প্রবেশপথে প্রচণ্ড ভিড়। জীবন থেকে মনোযোগ হারিয়ে যাওয়ার অর্থ, আপনি সেই ভিড়ে আটকা পড়ে যাবেন। যে আঁধারে আটকে ছিলেন, সে আঁধারেই আজীবন পচে মরতে হবে। আপনার মতো লোকের জন্য এমন প্রান্তিক জীবনযাপন করা কিংবা প্রবেশপথের ভিড়ে থেমে থাকা মানায় না। জীবনে এ অভ্যাসটা কাজে লাগাতে যেসব পথ ও পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন, সেগুলোর জন্য স্বপ্নবাজ হতে হবে, কর্মতৎপর ব্যক্তিদের মতো স্বপ্ন দেখতে হবে।
চিন্তার খোরাক
হলরুমে প্রবেশের জন্য লোকে লোকারণ্য। অথচ আপনি ভিড়ে থেমে থাকার মতো লোক নন!
আলোকপাত
আপনি যদি ইবনু কুদামার আল-মুগনি, ইবনু আব্দিল বারের আত-তামহিদ, ইবনু হাজারের ফাতহুল বারি, ইবনু আশুরের আত-তাহরির ওয়াত-তানওয়ির, আলবানির সহিহুস সুন্নাহ ও যয়িফুস সুন্নাহ-র মতো বইগুলো ভালো করে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন—এগুলো ১ দিন কিংবা ১ মাস কিংবা ১ বছরে আসেনি। বরং এগুলো মনোযোগ আর দীর্ঘসময় ধৈর্য ধরে লেখার ফল। ধীরে ধীরে এগুলো বড় হয়েছে। অবশেষে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর চূড়ান্ত রূপ থেকে উপকৃত হচ্ছে।
📄 ক্রস চিহ্নের সন্ধানে
একবার এক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলো। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামগ্রিক কার্যক্রম মন্থর হয়ে পড়ল। প্রকৌশলীরা অক্লান্ত চেষ্টা করার পরেও সমস্যা নির্ণয় কিংবা সেটার সমাধান করতে ব্যর্থ হলেন। অবশেষে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্য চাইলেন।
যথাসময়ে সাদা এপ্রোন পরা সেই বিশেষজ্ঞ হাজির। একটি কাগজ হাতে নিয়ে টানা দুই দিন কেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ চষে বেড়ালেন তিনি। কন্ট্রোল ইউনিটের বিভিন্ন অংশ যাচাই করে দেখলেন। কাগজে মন্তব্য টুকে রাখলেন, গাণিতিক হিসাব করলেন। দ্বিতীয় দিন শেষে তিনি একটি কালো মার্কার বের করে একটা যন্ত্রের ওপর বড় করে ক্রস চিহ্ন দিলেন। আর বললেন, ‘সমস্যাটা এখানে। এই যন্ত্রটা ঠিক করতে হবে নয়তো পাল্টাতে হবে। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
তারপর সাদা এপ্রোনটা খুলে তিনি গাড়িতে করে বিমানবন্দরে গেলেন। সেখান থেকে ফিরলেন নিজের দেশে। এদিকে প্রকৌশলীরা সেই যন্ত্রটার বিভিন্ন অংশ খুলে দেখেন আসলেই সমস্যাটা সেখানে। সেটা ঠিক করা হলো। পারমাণবিক কেন্দ্রে এরপর আগের মতো পুরোদমে কাজ চলতে থাকে।
এক সপ্তাহ পর সেই পারমাণবিক কেন্দ্রের পরিচালকের কাছে একটি বিল আসে। বিলের ওপর চোখ বুলিয়ে তিনি দেখতে পেলেন, বিশেষজ্ঞ লোকটি তার কাজের বিনিময়ে ১০ হাজার ডলার দাবি করছেন। মাত্র দুদিনের কাজের বিনিময়ে এমন মোটা অঙ্কের দাবি দেখে পরিচালক তো রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লেন! তিনি সেই বিশেষজ্ঞের কাছে চিঠি পাঠালেন—
‘আপনার বিলটি আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। অর্থের পরিমাণটা কি আরো কমানো যায় না? আপনি তো কেবল একটা যন্ত্রে ক্রস চিহ্ন দিয়েছেন। মাত্র দুদিনের সামান্য কিছু কাজ করে ১০ হাজার ডলার দাবি করা তো অনেক বিশাল ব্যাপার!’
কিছুদিন পর একটি ফিরতি চিঠি পেলেন পরিচালক সাহেব। তাতে লেখা ছিল—
যন্ত্রের ওপর যে ক্রস চিহ্নটা দিয়েছি তার বিল এক ডলার। কিন্তু কোন যন্ত্রের ওপর ক্রস চিহ্ন দিতে হবে তা দেখানোর বিল ৯,৯৯৯ ডলার।[১]
📄 কোথায় আপনি ক্রস দেবেন?
ওপরের ঘটনা থেকে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট—সফল হতে হলে, সমস্যা সমাধান করতে হলে আগে মূল বিচ্যুতিটা খুঁজে বের করতে হবে। নয়তো অক্লান্ত শ্রম, অমূল্য চিন্তা আর অঢেল অর্থই কেবল ব্যয় হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।
অনেক সময় আমাদের কাজে ছিদ্র বা ফাটল থেকে যায়। আমাদের শ্রম, শক্তি আর ক্ষমতার একটি বিরাট অংশ সেই ছিদ্রপথে বেরিয়ে যায়, নষ্ট হয় আমাদের ভেতরকার অমিত সম্ভাবনা। সেসব ফাটল আমরা যখন খুঁজে পাই ততক্ষণে হয়তো সুযোগ হাতছাড়া ।
রোগ নিরাময় করতে হলে আগে রোগ নির্ণয় জরুরি। সফল হতে হলে কাজে লাগাতে হয় নিজের শক্তিকে। তাই ঠিকভাবে ক্রসচিহ্ন দিতে পারা অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের সেই জায়গায় ক্রসচিহ্ন আঁকতে হবে, যা আমাদের শক্তি আর সম্ভাবনাকে ক্রমাগত দুর্বল করে তোলে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এমন কিছু আছে যার জন্য আমরা অন্যদের থেকে আলাদা। নিজেদের সেই শক্তি আর দক্ষতাকে খুঁজে বের করুন। কেননা এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভবিষ্যতে আপনাকে স্বতন্ত্র স্থানে পৌঁছে দেবে, অনন্য করে তুলবে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কোন কোন সমস্যা বা ভুলের জন্য ক্রস দিতে হবে?’
সমস্যার তো শেষ নেই। যেমন : সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম। অন্যের জীবনের টুকিটাকি খবর জানতে গিয়ে নিজের জীবনের অমূল্য সময়কে পায়ে ঠেলে দিচ্ছি আমরা। সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে না পারা আরেকটি কারণ। হতে পারে অতিরিক্ত ঘুম, আড্ডাবাজির মতো কিছু বদভ্যাস আপনার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আরেকটা প্রশ্ন হলো, কোন কোন পারদর্শিতাকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন? কোন দক্ষতাকে চিহ্নিত করলে তা সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করবে, ভবিষ্যতে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানের কারণ হবে?
কেবল নিজের সম্ভাবনার ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারাই আপনার সাথে অন্যদের বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এই একটি কাজই আপনার মর্যাদাকে উন্নীত করতে সক্ষম, সফলতার মুকুট পরাতে পারঙ্গম।
এক মুহূর্ত থেমে নিজের দক্ষতার জায়গাগুলো যাচাই করে দেখুন। এগুলো কি আপনার জীবনের উদ্দেশ্যের সীমারেখার মধ্যেই আছে নাকি পুরোপুরি আওতার বাইরে চলে গেছে?
সফলতার জন্য আমরা যেমন সমস্যা ও সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করি, একই সাথে পর্যবেক্ষণ করা উচিত আমাদের বৈবাহিক জীবন, কর্মজীবন, স্বাস্থ্য ও অর্থ-সংক্রান্ত ক্ষেত্রগুলোকে। এভাবে জীবনের এমন প্রতিটা বিষয়কে আমরা চিহ্নিত করতে পারি যেগুলো ভবিষ্যতে আমাদের অর্জন আর সফলতাকে প্রভাবিত করবে।
চিন্তার খোরাক
কল্পনার রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসুন। সকল দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। আত্মসমালোচনায় দৃঢ় হোন। জীবন একটাই, বারবার আসবে না!
টিকাঃ
[1] Focal Point, Brian Tracy
[২] সুরা কিয়ামাহ, আয়াত: ১৪-১৫
📄 ঝেড়ে ফেলুন সব অস্থিরতা
আপনার মনোযোগ স্থাপনে প্রধান বাধা হচ্ছে অস্থিরতা আর বিক্ষিপ্ততা। আপনার যদি নিজের ওপর আস্থা থাকে, আল্লাহর দেওয়া দক্ষতা ও প্রতিভার গুরুত্ব বুঝতে পারেন, মনোযোগ বাড়াতে চান তাহলে সবার আগে এই বাধাকে দূর করতে হবে।
আমরা একেবারেই প্রান্তিক এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে ডুবে থাকি। এমন সব বিষয় নিয়ে রাতদিন ব্যস্ত থাকি যার সাথে সংস্কার, গঠন বা পরিবর্তনের বিন্দুমাত্র সম্পর্কও নেই। একে বলা চলে ব্যাপক বিক্ষিপ্ততা। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এটা এখন প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষিপ্ত জনতার কাছ থেকে কীই বা আশা করা যায়?
মোবাইল ফোন, বিশেষ করে ফেসবুক এবং মেসেঞ্জার আমাদের সীমাহীন ক্ষতি করছে। অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের কথা বাদ দিলেও এ দুটোর ক্ষতিকর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এসব আমাদের অনুভূতিকে ভোঁতা করে আমাদেরকে ব্যক্তিত্বহীন মানুষে পরিণত করছে, ঠেলে দিচ্ছে বিষণ্ণতার দিকে। ফলে আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর বিরক্ত হয়ে পড়ছি। সেই বিরক্তির জায়গাটা এমন কিছু দিয়ে পূরণ করতেও পারছি না, যা সত্যি সত্যিই আমাদের জীবনে আনন্দ বয়ে আনবে।
যে লোকটি মোবাইলের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করে, তার কাছ থেকে কি আদৌ কল্যাণকর কিছু আশা করা যায়? চারদিকে এত এত সমস্যা, রক্তপাত, দুর্দশা আর দুর্নীতির গল্প কেবল আমাদের অস্থিরতাই বাড়িয়ে দেয়, চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করে তোলে। আমাদের মন-প্রাণ আর সময়ের বারাকাহ নষ্ট করে দেয়।
আমরা যদি মনোযোগ দিতেই চাই, তাহলে দীর্ঘসময়ের জন্য হাত থেকে মোবাইল সরিয়ে ফেলার অভ্যাস করতে হবে। এটাই মনোযোগী হবার দ্বিতীয় ধাপ। মোবাইলের আকর্ষণ উপেক্ষা করা না গেলে, কাজে মনোযোগ পাওয়া দুষ্কর। আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হচ্ছে সময়। আর সেটাই কেড়ে নিচ্ছে এই মুঠোফোন।
সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম যে কেবল আমাদের সময় কেড়ে নিচ্ছে তা নয়, বরং আমাদের চিন্তা ও মননে, কাজে ও কর্মে প্রতিনিয়ত অস্থিরতা তৈরি করছে। সারা বিশ্বের খবরাবর জানা দোষের কিছু নয়। কিন্তু যেকোনো চলমান ঘটনা জানার জন্য আমরা এত বেশি সময় ব্যয় করি, যা আমাদের অকল্যাণ ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না। কখনো কি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এত এত খারাপ খবরের ভিড়ে আমরা শান্ত থাকব কী করে? এমন দুঃসহ বাস্তবতার মুখে কতটুকুই আর আত্মোন্নয়ন আশা করতে পারি?