📄 মনোযোগ কেন এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ
চিন্তার খোরাক
'জীবনের একটা মুহূর্ত নষ্ট করার কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না। এমনকি জিহ্বা যখন পড়া কিংবা আলোচনা থেকে বিরত থাকে, চোখ যখন বই থেকে দূরে থাকে; তখন বিশ্রামরত অবস্থায় চিন্তাকে কাজে লাগাই। যখন আমি আবার উঠি তখন কিছু লেখার আগে সেটা আমার মগজে গেঁথে যায়। আমার খাওয়ার সময় যতটুকু পারি কমাই। এমনকি আমি রুটির বদলে পানি দিয়ে কেক গিলে ফেলি, কারণ কেক চিবানোর প্রয়োজন হয় না। এতে করে আমি আরেকটু বেশি পড়তে পারি, উপকারী কিছু লিখতে পারি।'[১]
যে আঙুল দিয়ে তাসবিহ, তাহলিল, তাহমিদ গোনার কথা, সে আঙুল ব্যস্ত মোবাইলের টাচ-স্ক্রিনে। জায়েযের সীমারেখায় থাকার আত্মতৃপ্তিতে সন্দেহজনক বিষয়কে তুচ্ছজ্ঞান করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়ের মতো নিয়ামতকে যথেচ্ছ খরচ করছি। এভাবে বহু মানুষের জীবন হয়ে গেছে অনর্থক, মূল্যহীন। কর্মহীনতার অতল গহ্বরে তারা ডুবে যাচ্ছে। সময়, লক্ষ্য আর প্রকল্পে বড় ধরনের অসংলগ্নতা প্রতীয়মান, তাই আমাদের আলোচনা মনোযোগ নিয়েই।
আজকাল অনেক মানুষ এতটাই বিক্ষিপ্ত, অস্থিরতায় ভরপুর জীবনযাপন করে যে, তাদের কাউকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, তার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী? কোন লক্ষ্য বাস্তবায়নে আত্মত্যাগের প্রয়োজন? কোন কাজের জন্য বেঁচে থাকা জরুরি? অথবা, কোন বিষয়ে সে পারদর্শী হতে চায়? কোন বিষয়টা তার দক্ষতা, সম্ভাবনা আর চিন্তাধারার সাথে মিলে যায়? কোন কাজ করলে সে সমাজ, রাষ্ট্র আর জাতির জন্য কোনো অবদান রাখতে পারবে? এত সব প্রশ্নের কোনো উত্তর আপনি তাদের কাছে পাবেন না। বরং তাদের মাঝে পাবেন অহেতুক আত্মতৃপ্তির আকাশকুসুম অনুভূতি।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ এতটুকুও বলতে পারবে না, সে দিনে অন্তত আধা ঘণ্টা সময় গঠনমূলক কোনো কাজে ব্যয় করে। দিনে তিন ঘণ্টা কোনো লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হওয়া তো তাদের জন্য ‘দিল্লি হনুজ দূরাস্ত’— ‘দিল্লি বহু দূর’! অনর্থক কাজ তার সকল সম্ভাবনাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। অসৎ সঙ্গ, গুরুত্বহীন চিন্তা, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ইত্যাদি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। কথার চমকে চমকিত করতে খটাখট টাইপ করে যায় একালের কিবোর্ড-যোদ্ধারা, কখনো সরাসরি আড্ডা দিয়ে, একসাথে হইহুল্লোড় করে দিনের পর দিন সময় নষ্ট করে দ্বীনি সোহবতের অজুহাতে। দিনশেষে সে যখন বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, তখন হয়তো কেউ কেউ বোঝে, কী ভীষণ ক্ষতির মাঝে তার জীবন কেটে যাচ্ছে! সে আফসোস করে হারানো সময়ের জন্য। বুকভরা অনুতাপ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর সকাল এলে সে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
মনোযোগ নিয়ে কথা বলছি, যাতে করে এই কম্পাসের মাধ্যমে উদ্ভ্রান্ত জনতাকে ঠিক পথটি দেখানো যায়, তাদেরকে ‘উত্তর-দক্ষিণ’ চেনানো যায়। একাগ্রতার আলো যেন তাদের জীবনের জমাটবাঁধা ঘোর অমানিশাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। একনিষ্ঠতাই তাদেরকে ফিরিয়ে আনবে সম্ভাবনা আর উচ্চাশার আঙিনায়। তেমনিভাবে যারা কোনো লক্ষ্য, উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে জীবনের গল্প রচনা করে চলে, তাদের জন্যও এ এক বার্তা। এর মাধ্যমে তাদের চিন্তা কিংবা প্রকল্পে অভাবনীয় প্রভাব পড়তে পারে। তাদের প্রত্যেকের দরকার মনোযোগের মহৌষধ, যাতে তারা নিজেদের মাঝে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
অনেকের ধারণা চিন্তা আর উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা থাকলেই একনিষ্ঠতা অর্জিত হবে। মূলত এটা অসম্ভব। এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের চিন্তা স্পষ্ট, পরিকল্পনা নির্ধারিত, কাজের ক্ষেত্র জানা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা বিশেষ কিছু করতে পারেননি। কারণ পথ চেনা কিংবা দিক জানা থাকাটাই সবটা নয়। মনোযোগ ধরে রাখতে না পারলে কিছুই অর্জন করা সম্ভব না, যত চেষ্টাই করা হোক না কেন।
মূলত একাগ্রতা সম্পর্কে বলার উদ্দেশ্য হলো লোকজনকে অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো। যে উপকারী চিন্তা আর লক্ষ্যের জন্য মানুষ বাঁচে, যে বার্তাকে উপজীব্য করে জীবনের খেয়াঘাটে আগমন ঘটে পণ্যবোঝাই জাহাজের; তার খোঁজের জন্য মানচিত্র এঁকে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য। প্রজন্মকে কাজের আধিক্য, দায়িত্বের ভিড় আর ছকে-বাঁধা-জীবন থেকে বেরিয়ে এসে এমন কিছু করার এক আহ্বান যা ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।
টিকাঃ
[১] ইবনু আকিল আল-হাম্বলি রাহিমাহুল্লাহর বাণী।
📄 মনোযোগের নিগূঢ় তত্ত্ব
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, ‘মনোযোগ’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
আপনার এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য হোক আর বইয়ের শুরুতে শব্দটার ব্যবচ্ছেদের জন্য হোক, পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করা দরকার।
মনোযোগের অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে আপনার হৃদয়াবেগ, অনুভূতির মতিগতি আর সময় ব্যয় করতে থাকা, যতক্ষণ না আপনি গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন।
একাগ্রতা মানে হলো একটা বিষয় সারাদিন আপনার ভাবনাজুড়ে থাকবে। সকাল থেকে সেটার পেছনে ছুটতে শুরু করবেন, সমস্ত দিন তাকেই তাড়া করে বেড়াবেন, সন্ধ্যাবেলাতেও আপনার মন ও মননে সেই বিষয়টাই থাকবে।
একনিষ্ঠতা হচ্ছে সারাদিনে আপনার লক্ষ্যকে ততক্ষণ ছেড়ে যাবেন না, যতক্ষণ আপনি পুরোপুরি তৃপ্ত না হচ্ছেন, শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে না পড়ছে।
মনোযোগের অর্থ হলো, সারাক্ষণ আপনার মাথায় থাকবে আপনি কোথায় যাচ্ছেন। আপনি যখন কর্মক্ষেত্রে যাবেন, তখন আপনার মনে কেবল সেই লক্ষ্য আর দায়িত্ববোধ কাজ করবে। দিবা-দ্বিপ্রহর আসার আগেই আপনি সে কাজের বড় একটি অংশ শেষ করে ফেলবেন।
এ বিষয়ে এক জার্মান প্রাচ্যবিদ ও মাহমুদ আত-ত্বানাহির মধ্যকার একটি গল্প বলা যাক। একদিন তারা প্রাচীন নথিপত্র নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হঠাৎ কবিতার এই পঙ্ক্তিটি তাদের চোখে পড়ল—
ملك منشد القريض لديه... يضع الثوب في يدى بزاز
প্রাচ্যবিদ ত্বানাহিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই পঙ্ক্তিটা কোন প্রকার ‘বাহ্র’ (ছন্দ)-এর?’
ত্বানাহি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলেন। তারপর একটা লজ্জামাখা হাসি দিয়ে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। প্রাচ্যবিদ বিস্ময়ের সাথে বললেন, ‘আযহারের দারুল উলুম থেকে পাশ করা একজন ছাত্র ছন্দশাস্ত্র জানে না, এ কেমন কথা!’
ত্বানাহি বলেন, সেদিন আমি যখন বসা থেকে উঠি, তখন আমার মাথায় দুশ্চিন্তার ঝড় বইতে শুরু করেছে। প্রাচ্যবিদের কথা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমি বাড়ি ফিরে সরাসরি লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ি। শাইখ আব্দুল ফাত্তাহ শারাকি রচিত আল-মুযাক্কিরাতুল ওয়াফিয়া ফি ইলমাইল আরুদ ওয়াল কাফিয়া বইটি বের করে নিলাম। এই বই আযহারে পাঠ্য ছিল। বইটিতে আমি পুরোপুরি ডুবে গেলাম। সকাল-বিকাল এভাবে কেটে যেতে লাগল। অবশেষে একদিন আমার জন্য কবিতার ছন্দ একদম পানির মতো সহজ হয়ে গেল, যাকে বলে একেবারে জলবৎ তরলং। আমি নতুন করে সেগুলো আবার শিখলাম।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এরই নাম মনোযোগ, যা নিয়ে আমরা কথা বলছি।